স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ভুল তথ্য শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করে না, এটি উদ্বেগ বাড়ায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি আস্থা নষ্ট করে এবং প্রকৃত গবেষণা থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়। তাই, বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষ্যে অনকোলজিস্টরা এই রোগের প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কিছু লোক চিকিৎসকের দেওয়া তথ্য কিংবা পরামর্শ না শুনে, ভ্রান্ত তথ্য ছড়িয়ে দেন অনেক সময়, যা অত্যন্ত ক্ষতিকারক। তাই, ভ্রান্ত ধারণা দূর করার উদ্দেশ্যে, এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন দিল্লির শালিমার বাগ অঞ্চলে অবস্থিত, ম্যাক্স হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. আমান রাস্তোগি।
এই যেমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই কিছু খাদ্য উপাদান এবং কিছু পণ্যকে ‘ক্যান্সারজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এমনও দাবি করা হয়েছে যে, সোডিয়াম লরিল সালফেট (SLS) সমৃদ্ধ টুথপেস্ট, যা সাধারণত পাম তেল থেকে তৈরি, তা নাকি ক্যান্সার সৃষ্টি করে! এই তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে অনেকে বিশ্বাস করেছেন এবং ভুল তথ্য ভাইরালও করেছেন। কিন্তু সত্যিটা হল এই যে, SLS-এর সঙ্গে ক্যান্সারের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই এবং এই উপাদানটি বড়ো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্বারা ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। আসলে, ‘ক্যান্সার’ এমন একটি শব্দ, যা গভীর ভয় সৃষ্টি করে এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন ভাবে এই শব্দ ব্যবহার করা হলে ভয় প্রায়ই তথ্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

আসলে, পাম তেল নিয়ে উদ্বেগ প্রধানত উচ্চ তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াকরণের সময় সৃষ্ট দূষক নিয়ে। কিন্তু পাম তেলের ব্যবহারের কারণে কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এখনও। অন্যান্য সমস্ত চর্বির মতোই, এটি একটি সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু যে-কোনও তেল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ রাখার বিষয়টি একটি স্বাস্থ্যগত নীতি। ক্যান্সারের ঝুঁকিকে একটি মাত্র উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা একটি জটিল রোগকে অতিসরলীকরণ করে এবং তামাক ব্যবহার, অ্যালকোহল গ্রহণ, স্থূলতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অতিরিক্ত সূর্যালোকের মতো স্ট্রং ক্যান্সার ঝুঁকির কারণ থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেয়।
এই বিভ্রান্তির অনেকটাই আসে ‘ক্যান্সারজনক’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ না বোঝা থেকে। একটি কার্সিনোজেন হল এমন কিছু, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মাত্রা, সময়কাল এবং জৈবিক প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা পদার্থকে সম্ভাব্য বিপদের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করে, দৈনন্দিন ব্যবহারের ভিত্তিতে নয়। তাই ব্র্যাকেন ফার্ন এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারে ক্ষতি ওই একই শ্রেণিতে থাকতে পারে, যদিও দৈনন্দিন জীবনে এদের প্রকৃত ঝুঁকি ব্যাপক ভাবে ভিন্ন।
আসলে, খাদ্য-সংক্রান্ত ক্যান্সারের মিথগুলো বিশেষ ভাবে স্থায়ী। বাস্তবে, খুব কম খাবারই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় বলে প্রমাণিত হয়েছে। প্রক্রিয়াজাত মাংসের ক্ষেত্রে স্ট্রং প্রমাণ রয়েছে, আর লাল মাংসকে সম্ভাব্য ক্যান্সারজনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। উভয়ই আসলে অন্ত্রের ক্যান্সারের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং অ্যালকোহল, যা অন্তত সাত ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যার মধ্যে স্তন ও অন্ত্রের ক্যান্সার অন্তর্ভুক্ত। এর বাইরে অধিকাংশ খাদ্য-সংক্রান্ত ক্যান্সারের দাবি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় টেকে না। শরীর তার অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক ভারসাম্য শক্ত ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোনও একক খাদ্য এই ব্যবস্থাকে অতিক্রম করতে পারে না।
একই ভাবে বিভ্রান্তিকর হল ‘অ্যান্টি-ক্যান্সার সুপারফুড’- এর ধারণা। গ্রিন টি, টম্যাটো, বেরি এবং মাল্টিভিটামিন ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর বলে প্রচার করা হয়, কিন্তু বড়ো গবেষণায় এর কোনও স্পষ্ট সুরক্ষামূলক প্রভাব পাওয়া যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে এই বিশ্বাস ক্ষতিকরও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এপ্রিকটের বীজে অ্যামিগডালিন থাকে, যা সায়ানাইড বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। বরং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং পুষ্টির ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।
খাদ্য উপকরণ ছাড়াও দৈনন্দিন ব্যবহারের অনেক পণ্যের বিরুদ্ধেও প্রমাণ ছাড়াই ক্যান্সার সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়। সানস্ক্রিন নিয়ে সাম্প্রতিক ভ্রান্ত তথ্য এই ধরনের দাবির ঝুঁকি তুলে ধরে। বেনজিন, যা একটি পরিচিত ক্যান্সারজনক পদার্থ, সানস্ক্রিনের উপাদান নয়। যদিও কিছু পণ্যে খুব কম মাত্রায় বিরল দূষণ শনাক্ত হয়েছে, তবুও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাগুলো নিরাপদ নয়। অতিবেগুনি রশ্মির প্রমাণিত ক্যান্সার ঝুঁকি অনেক বেশি, যা সানস্ক্রিন ব্যবহারের গুরুত্বকে জোরদার করে।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষ্যে ক্যান্সার প্রতিরোধকে আবেগ নয়, প্রমাণের প্রতি অঙ্গীকার হিসেবে নতুন ভাবে ভাবতে হবে। এটি আধুনিক জীবন থেকে প্রতিটি রাসায়নিক কিংবা উপাদানকে বাদ দেওয়ার বিষয় নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকি বোঝার বিষয়। বিজ্ঞান অনিশ্চয়তাকে অস্বীকার করে না, কিন্তু অতিরঞ্জনকে প্রত্যাখ্যান করে। যদি আমরা সত্যিই ক্যান্সারের বোঝা কমাতে চাই, তাহলে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হল— দৃষ্টিভঙ্গি, সামঞ্জস্য এবং প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখা।





