গোস্বামীবাবুর মাথায় ঘুরতে লাগল, ‘ক্লাব প্রতি রাতে পাঁচ হাজার টাকা করে নিচ্ছে? কিন্তু খাতায়-কলমে তো ওরা একমাসের জন্য তিরিশ হাজার টাকা দেবে। তার মধ্যে দশ হাজার টাকা দিয়েছে, বাকি মেলা শেষের আগের দিন। এর মাঝে আরও পাঁচ হাজারের কথা কীভাবে থাকছে? তার মানে কি সমান্তরাল ভাবে আরও টাকা তুলছে? কথাগুলো গায়ে লাগল, এক্কেবারে উড়িয়ে তো দেওয়া যায় না। এতদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, এতদিন পঞ্চায়েতের সঙ্গে আছেন, পার্টিতে অনেকেই টাকা-পয়সা সম্পর্কিত সমস্যাতে জড়িয়ে গেলেও তিনি নিজে কিন্তু কোথাও কোনও ভাবেই জড়িয়ে যাননি। শুধু পুলিশের কাছ থেকে নিজের চুরি যাওয়া জিনিসের টাকা নেওয়া ছাড়া কোথাও এক পয়সা নেওয়ার বদনাম নেই। তাও এই কথাগুলো শুনতে হল।
রেগে গেলেন না। খুব আস্তে আস্তে বললেন, “তোমাদের আর কারও-র কিছু বলবার আছে?”
প্রথম দিকে সেরকম ভাবে নাচেনি, সাধারণ ভাবেই নাচ গান করেছে। কিন্তু দিন তিনেক হল তারা খুব বাড়াবাড়ি করছে। জামা কাপড় না পরে এইরকম অশ্লীল নাচ অন্য রাজ্যে হয় বলে শুনেছি। কিন্তু আমাদের নিজের গ্রামে ঠাকুরের মেলাতে এইরকম নাচ হচ্ছে, ভাবতেই পারছি না।
—কাকা, সব থেকে খারাপ হচ্ছে নাচের প্রভাবটা বাড়িতে গিয়ে পড়ছে।
—আমার পাশের বাড়ির দুলু কাকুর ছেলেটা গতকাল তার মায়ের ব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকা চুরি করেছে। ধরা পড়ে বলেছে, ও নাকি নাচ দেখতে যাবে বলে টাকা নিয়েছে। একেবারে সামনে থেকে দেখবে।
—মেয়েগুলো আবার সকালবেলা মেলা ঘুরতে বেরোচ্ছে। গ্রামের ছেলেরা ঘিরে ধরছে, টোন টিটকিরি তো আছে। আমাদের বাড়ির মেয়েরাও বাইরে বেরোতে পারছে না। আপনি নিজেই বলুন কাকু, এমন তো এই গ্রামে ছিল না।
অফিসের বাইরেটাতেই মেলার আওয়াজ হামলে পড়ছে। গোস্বামীবাবুর এই প্রথম নিজেকে খুব অসহায় মনে হল। যে গ্রামে তার একটা শান্ত দাপট ছিল, সেখানেই এমন ভাবে আঙুল উঠছে! একটা লম্বা শ্বাস ছাড়লেন গোস্বামীবাবু। তারপর সেই চারজন মহিলার দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত ভাবে বলে উঠলেন, “তোমরা যাও, আমি দেখছি। প্রয়োজনে নিজের গ্রামের মেলাতে নিজেই পুলিশ ডাকব।” —ডেকে কিছু লাভ হবে না কাকা। ওরা তো রোজ আসছে। শুনলাম বুগিবুগি নাচের তাঁবু থেকে থানার বড়ো, মেজো, সেজো— সবাইকে আলাদা খাতির করা হয়েছে। রাত দুটোর পর আলাদা নাচ হচ্ছে। তাঁবুর ভিতর লোক থাকছে, বিশেষ বিশেষ লোক। সেখানে এই গ্রাম, এই ক্লাবেরও কয়েকজন…
এবারে গোস্বামীবাবু মাথা তুলে সেই মেয়েটার দিকে চোখ বড়ো করে তাকালেন। ‘তুমি কি প্রশান্তর বউ?’
—হ্যাঁ।
—তুমি এত কথা কী করে জানলে?
অফিসের ভিতরে কেউ কিছু সময় কোনও কথা বলল না। তারপর সেই মেয়েটি বলে উঠল, “সে কথা পরে বলব। আপনি শুধু মিলিয়ে নেবেন, মিথ্যা বললাম কিনা।’
কথাগুলো বলে সবাই অফিসের বাইরে চলে আসবার জন্য পা বাড়াতেই গোস্বামীবাবু বেশ জোরেই বলে উঠলেন, ‘না, তুমি যখন কথাটা তুললে, পুরোটা খোলসা করে যাও।’
মহিলা চোখ দুটো বন্ধ করে একশ্বাসে উত্তর দিলেন, ‘আমার উনি প্রতিদিন ওই তাঁবুতে যাচ্ছেন। কত ধরে রাখব বলুন। ঝগড়া ঝামেলা সব বেকার। তবে সব কথা তার মুখ থেকেই শোনা।’ বাকি সবাই যে যার নিজের মতো করে আরও অনেক কথা বলে গেলেন।
ওই চারজন মহিলা বেরিয়ে যাওয়ার পরে অফিসের শূন্যতা গোস্বামীবাবুকে আরও গ্রাস করে নিল। কী করবেন এখন? তার অনুপস্থিতিতে এই মেলার দায়িত্ব প্রশান্তকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে ডেকে কি সব কথা আবার জিজ্ঞেস করবে? জিজ্ঞেস করলেও যে উত্তর পাবে, সেরকম কোনও গ্যারান্টি নেই। অনেকগুলো প্রশ্ন মাথার ভিতর কিলবিল করতে আরম্ভ করল। যদি টাকা নেওয়ার ঘটনাটা সত্যি হয়, তাহলে এই টাকা কার পকেটে যাচ্ছে? পুলিশের বড়োবাবু, মেজোবাবুরাও আসছেন। গোস্বামীবাবু একটু আমতা আমতা করে বড়োবাবুর মোবাইলে ফোন করলেন। উলটো দিক থেকে খুব স্বাভাবিক প্রত্যুত্তর পেলেন। মেলার কথা ইচ্ছে করে তুলতেই বড়োবাবু হেসে জবাব দিলেন, ‘আপনার গ্রামে তো কোনও সমস্যা হয় না। আমি নিজে প্রতিদিন যাচ্ছি। নাচের তাঁবুটাতেও ভালো ভিড় হচ্ছে, কিন্তু ঝামেলা নেই।’
তার মানে প্রশান্তকে ফোন করলেও একই জবাব আসবে। গোস্বামীবাবু অফিসের আলো নেভালেন, বাইরে চাবি দিয়ে বাড়িতে তার স্ত্রী সোমাকে ফোন করলেন। ‘রুটি হয়ে গেছে? তাহলে এক ফাঁকে গিয়ে খেয়ে আসতাম। আমার সবকিছু মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে দেরি হবে।
ঘর থেকে সবুজ সিগনাল পেতেই আর দেরি করলেন না। খেয়ে রাত দশটা নাগাদ আবার মেলাতে এলেন। মেলা তখন একেবারে জমে ক্ষীর। গোস্বামীবাবু ঘুরতে ঘুরতে সেই তাঁবুর সামনে এলেন। বাপরে বাপ, এত্ত ভিড়! ভিতর থেকে চটুল গানের সঙ্গে চকমকি আলো আর চিৎকার ভেসে আসছে। একদল ঢুকছে, কিছুক্ষণ ভিতরে থেকে হুল্লোড় করছে, তারপর বেরিয়ে আসছে। বিভিন্ন দামের টিকিটের ব্যবস্থা রয়েছে।
কাউন্টার থেকে একটা টিকিট কাটলেন গোস্বামীবাবু। তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে ভিড়ের ভিতর দিয়ে তাঁবুর ভিতরে ঢুকলেন। অন্ধকার আর তার মাঝে বিদ্যুতের ঝলকের মতো আলো এসে মুহূর্তের মধ্যে চোখ দুটো ঝলসিয়ে দেওয়ার মাঝেই শোনা গেল গান। তার মধ্যে মঞ্চে চারটে মেয়ে এক্কেবারে নামমাত্র পোশাক পরে আরম্ভ করে দিল লম্ফঝম্প। সে কী লাফানো। মঞ্চের উপরে ওরা যত লাফাচ্ছে, মঞ্চের নীচে থাকা মানুষগুলোও তত চিৎকার করছে, ঝাঁপাচ্ছে। মেয়েগুলোর কাউকে কাউকে টেনে নিজেদের কাছে আনার চেষ্টা করছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দেবার চেষ্টা করছে, টাকা গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছে। মেয়েগুলো নাচে না, শুধু লাফায় আর মাঝে মাঝে স্বল্প পোশাকটা সবার সামনে তুলে বা নামিয়ে বা খুলে নিজেদের এক্কেবারে উদোম অবস্থায় দাঁড় করায়।
(ক্রমশ…)





