মঞ্চের নীচে দাঁড়ানো মানুষজনের চিৎকার আরও বেড়ে যায়। কেউ কেউ আবার উত্তেজিত হয়ে টাকা-পয়সা ছুঁড়তে আরম্ভ করে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা গোস্বামীবাবুর শরীরেও একটা টুনটুন বেজে ওঠে। হাত-পায়ের সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে মনটাও একটা অন্য গ্রহে চলে যায়। ঠিক তখনই তার মোবাইলটা ভাইব্রেট করে। গোস্বামীবাবু পকেট থেকে বের করে দেখলেন বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। তাঁবুর বাইরে এসে ফোনটা ধরলেন। অনেক রাত হয়ে যাওয়ার জন্য স্ত্রী সোমা খোঁজ নিচ্ছে। গোস্বামীবারু ‘আসছি” বলে ফোনটা কেটে দিলেন।

দু’দিন পরে টেন্টে ঠিক ভোররাতে পুলিশ এল। সেই বড়োবাবু, মেজোবাবু সহ দুই ভ্যান পুলিশ। গোস্বামীবাবুকে রাতেই ফোন করে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। উনি অবশ্য কোনও কথা বলেননি। শুধু পুলিশের গাড়িতে চারটে মেয়ে আর জনা পাঁচেক কম বয়সি ছেলে ও একজন বয়স্ক লোককে তোলবার সময় গোস্বামীবাবু ভিড় ঠেলে প্রশান্তর কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, “হিসাব অনুযায়ী তোকেও তোলা উচিত। আমাকে তো এদের এভাবে নাচের কথা কিছুই জানাসনি। এমনকী এরা যে রোজ তোদের পাঁচ হাজার টাকা দিচ্ছে, সেকথাও একবারের জন্যও বলিসনি। সে যাই হোক, এদের যে ক’টাদিনের শো হয়েছে, সব হিসাব করে কালকের মধ্যে সব টাকা ক্লাবে দিয়ে আসবি। বেশি পাকামি করলে গ্রামের সবাইকে সবকিছু জানিয়ে দেব। মেলা শেষ হলেই জিবি ডাকব, সেখানে অনেকের সঙ্গে তোকেও…

আরও কিছু কথা বলবার আগেই আবার ফোনটাতে ভাইব্রেশনের সঙ্গে রিং বেজে উঠল। গোস্বামীবাবু পকেট থেকে বের করে দেখলেন, মাধব কলিং। গোস্বামীবাবু একটু দূরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে বলে উঠলেন, “তোমাদের কোনও অসুবিধা হয়নি তো?”

—না না, আমাদের কী হবে?

—কোথায় আছো এখন?

—আপনার কথামতো কাজ শেষ করে একেবারে হাইরোড ধরে নিয়েছি।

—বেশ, খাওয়া-দাওয়া করে নাও।

—বলছিলাম দাদা, আমরা কিছু পাব না?

—নিশ্চয় পাবে। কালকে কিছু টাকা ঢুকবে, তুমি পরশু বা তারপরে এসে নিয়ে যাবে। কোথা থেকে নেবে আমি ফোনে বলে দেব। তবে একটা কথা মাধব, তাঁবুতে ঢুকে মেয়েগুলোকে ওরকম ভাবে টানাটানি না করলেই পারতে।

—আরে দাদা, বুঝতেই তো পারছেন, সবাই জোশে ছিল। আমাদেরও দু’জনের গায়ে লেগেছে।

গোস্বামীবাবু আর কথা বাড়ালেন না। ঝামেলাটা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল এটাই বিরাট। এবার মেলা চলুক, একমাস কেন, চারমাস চললেও কোনও ব্যাপার নেই। সেদিন অফিসে ভাগ্যিস মাধবের কথা মনে এসেছিল। তারপর জেলা সভাপতিকে দিয়ে পুলিশের বড়োবাবুকে ফোন করা, উফঃ, যা গেল।

মেলা আবার বিগত বছরের মতো তরতরিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল। নাগরদোলা, দোকান, ফুচকা— সব ঠিক আগের বছরগুলোর মতো হয়ে গেছে। শুধু সেই বুগিবুগি নাচের তাঁবুটা একেবার ফাঁকা পড়ে থাকল। বাইরে সেই ভিড় নেই। ভিতরের হুল্লোড় নেই। শুধু কয়েকজন মানুষ পাশের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে আড়চোখে দেখে আপশোশ করছেন। প্রশান্ত নিজে থেকে এসে সব টাকা- পয়সার হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে ক্লাবের সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছে। শুধু প্রশান্ত নয়, আরও কয়েকজন ছাড়বার কথা জানিয়েছে। শুধু এই বছরের মতো মেলাটা তারা চালিয়ে দেবে। গোস্বামীবাবু কাউকেই কোনওরকম জোর করেননি। শুধু সামনের বছর থেকে মেলা একমাসের জায়গায় পনেরো দিন করবার কথা আলোচনা করবেন বলে ঠিক করেছেন।

একদিন সকালবেলা গোস্বামীবাবু একটা কাজে বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। বুগিবুগির তাঁবুর কাছে একটা ট্রাক দেখে একটু চমকে উঠলেন। কাছে যেতেই দেখতে পেলেন বুগিবুগি নাচের তাঁবুর সেই বয়স্ক ভদ্রলোকের তত্ত্বাবধানে চারজন কম বয়সি ছেলে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে ট্রাকে তুলছে।

গোস্বামীবাবু কাছে গিয়ে ‘কী ব্যাপার?” জিজ্ঞেস করতেই বয়স্ক ভদ্রলোক খুব নরম স্বরে বলে উঠলেন, ‘উঠি যেছি, আরেকটো মেলা রইছে।’

গোস্বামীবাবু খুব অবাক চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। এই এত কাঠখড় পুড়িয়ে এত কিছু করা হল, কিন্তু একে দেখে তো…।

একটু আস্তে আস্তেই জিজ্ঞেস করলেন, “থানা থেকে কবে ছাড়া পেলে?”

বয়স্ক ভদ্রলোক খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলেন, “আমাদের একটা রাত রাখিছিল। এতজনকে রাখবেক কুথাকে? এতগুলান প্যাট, ন্যাংটাদের এমনিতেই মানে ভয় নাই।”

গোস্বামীবাবু একটু গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এতদিন কোথায় ছিলে?”

—ঘরকে গেছিলম, বউয়ের শরীরটা ভালো লয়। নাচের বিটিগুলোনের মধ্যে দু’জনের হাতে পায়ে গেদে বেজিছে। গ্রামে ডাক্তারের কাছকে লিয়ে গেলম। সবাই তো উয়াদের দেখতে খুঁজে না।

গোস্বামীবাবু আবারও আগের মতো গম্ভীর ভাবেই বললেন, ‘তোমরা নাচবে নাচো, কিন্তু এমন অশ্লীল ভাবে নাচো কেন? তোমাদের নিজেদের মান সম্মানে লাগে না।’

বয়স্ক ভদ্রলোক গোস্বামীবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কত্তা দু’মুঠো ভাতের লগে অনেক কিছু করিছি। বিটিগুলান পোশাক পরে ভালো ভাবেও নাচত। মানুষ ভালো লয় কত্তা। সারা দেশ বেড়ায় ধরে মেলা করছি, কুথাও কুনু ঝামেলা হয় নাই বলব নাই, তবে বুঝিছি ইচ্ছে করে ফের না করলে তাঁবুতে ফের হয় না। প্যাটের কথা শরীরের চেয়ে অনেক বড়ো। আমাদের বিটিগুলান তো ন্যাংটা হবার জন্যই পোশাক পরে। শরীর দেখায়, দ্যাখে কে? অন্ধকারে মুখ ঢেকে সেটো দেখতেই সবাই ভিড় করে। তারপর নিজেকে ভালো প্রমাণ করবার জন্যে আমাদের…’

গোস্বামীবাবু একটা ঢোঁক গিললেন। আর কথা না বাড়িয়ে বাজারের দিকে চলে যাচ্ছিলেন।

বয়স্ক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘কত্তা, যে দুটো বিটিকে সেদিন টানাটানি করিছে, উয়াদের একটা আমার নিজের বিটি। নাচের সময় উয়াকেও ল্যাংটা হতে হয়, আর আমি বাইরে টিকিট বিক্রি করি!’

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...