দেখতে দেখতে পাঁচ বছর গড়িয়ে গেল। কুশ বছর পাঁচেক তেলের ব্যাবসায় ভালো লাভ করে দু-কাঠা জমি কিনল। আর্থিক অবস্থার উন্নতি তার শারীরিক অবস্থাকে অনেকখানি বদলে দিল। কঙ্কালসার চেহারায় কিছু মেদ নির্দ্বিধায় এসে বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়াল। মড়াদিঘি গ্রাম তার ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে। ওই গ্রামের কাছে সে কৃতজ্ঞ। পাঁচ বছর হল বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততায় মড়াদিঘি গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তা তার হয়ে ওঠেনি।
কুশের মড়াদিঘি গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে অবশেষে সফল হয়েছে। রথ দেখা এবং কলা বেচার মতো সে মড়াদিঘিকে দেখা এবং ওখানে তেল বিক্রিও করা হবে। ওই গ্রামে তেল বিক্রির পর তার ব্যাবসায় সফলতা আসে। হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে সে রওনা দিল মড়াদিঘির উদ্দেশে। শ্রাবণের প্রথম সপ্তাহ। কালো কালো ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ আকাশের বুকে অবিরাম যাতায়াত করছে। কুশ যখন গ্রামে পৌঁছাল তখন বেলা এগারোটা বাজে। গ্রামের লোকেরা যে যার নিজেদের কাজে ব্যস্ত। গ্রামে নতুন লোক কুশকে দেখে পুকুরঘাটে কিছু মহিলা এর ওর দিকে চেয়ে কী যেন বলাবলি করছিল। তার মনে হল, তাকে বোধ হয় কেউ কেউ চিনতে পেরেছে। তাই তারা আলোচনা করছে।
কুশ ঝোলা ব্যগের শিশির দিকে তাকিয়ে হাঁক পাড়ল, ‘মাথার তেল নেবেন গো আমার মা বোনেরা! ঘন কালো মখমলের মতো চুল পেতে আজই ব্যবহার করুন। আমি আমার মাথার চুল ছুঁয়ে গ্যারান্টি দিচ্ছি। একটা শিশি ব্যবহার করলে উপকার বুঝবেন। এগিয়ে আসুন মা দিদি বোনেরা।
তার গলা শুনে বেশ কিছু অল্পবয়সি মহিলা ভিড় করল। তাদের মধ্যে দু-চারজন ক্রুশের কাছ থেকে তেল কিনল। ওই ভিড় থেকে এক বাচ্চা মেয়ে বলল, “কাকু, তোমার মতো চুল হবে! আমার মায়ের সব চুল উঠে মাথা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে৷’
কুশ উৎসাহভরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমার মতো হবে বইকি! আমার চেয়েও ভালো হবে পুচকি। তোমার মাকে গিয়ে বলো।”
—কাকু, আর একটু গেলেই আমাদের বাড়ি। এসো।
কুশ বাচ্চা মেয়েটিকে অনুসরণ করে তার বাড়ি চলল। মেয়েটির বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে তার মনে পড়ল যে, এই বাড়ির দরজায় সে আগেও এসেছে। কুশের কোনও ভুল হয়নি। এই বাড়ি থেকেই প্রথম তেলের ব্যাবসা শুরু হয়। মেয়েটি দরজায় দাঁড়িয়ে ‘মা মা’ বলে হাঁক পাড়ল। বাড়ি থেকে রমা বেরিয়ে এসে মেয়েকে ঝাঁঝি মেরে বলল, ‘কেন চিল্লাচ্ছিস! সারাদিন টো টো করে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। ঘরে আয়।’
রমা কুশকে লক্ষ্য করে বলল, ‘এই তোমাকে কোথায় দেখেছি বলো তো! ঠিক মনে করতে পারছি না।’
—মা, এই লোকটির কাছে মাথায় চুল গজাবার খুব ভালো তেল আছে।
রমা হঠাৎই কুশের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার বাড়ি বর্ধমান তো! কী যেন নাম তোমার ভুলেই গেছি।’
কুশ সাগ্রহে বলল, “আমার নাম কুশ। আপনাদের গ্রাম থেকেই আমি আমার তেলের ব্যাবসা দাঁড় করাই। আপনি আমার কাছে প্রথম মাথায় মাখার তেল কেনেন।’
রমা খেঁকিয়ে জোর গলায় বলল, ‘তোমার তেলের ব্যাবসা দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু আমার মাথার চুল তো দাঁড়ায়নি। ধাপ্পাবাজির জায়গা পাওনি।’
রমার মাথার দিকে তাকিয়ে কুশের নিজের উপর খুব লজ্জা হচ্ছিল। রমার আগের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে মাথায় চুল উঠে গিয়ে। মুখটাও কেমন অসুন্দর দেখাচ্ছে। রমার গলার আওয়াজে প্রত্যুষা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বাচ্চা মেয়েটি বকুনি খেয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে।
প্রত্যুষা বাড়ির বাইরে এসে বলল, “আঃ, বউদি মেয়েটার পিছনে এত চিল্লােচ্ছ কেন!’ রমার থেকে কোনও উত্তর পাওয়ার আগেই প্রত্যুষার চোখ গেল কুশের দিকে। প্রত্যুষা কপাল সংকুচিত করে বলল, “এই তুমিই তো মাথার তেল বিক্রি করেছিলে আমাদের গ্রামে কয়েক বছর আগে। লোক ঠকানোর ভালো ব্যাবসা পেয়েছ! তোমার তেল মেখে চুলের অবস্থা দেখেছ! উন্নতি তো ছিটেফোঁটা হয়নি, উলটে অবনতি হয়েছে। গ্রামের সব লোককে ডেকে তোমায় পেটাব। তুমি কী ভাবছ আমাদের গ্রামের লোককে!” প্রত্যুষার ডাকে গ্রামের বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে গেল। বাড়ির ভিতর থেকে দাদা উন্মেষ বেরিয়ে এসে বলল, ‘সকাল সকাল এত চেঁচামেচি কীসের! কী হয়েছে রে বোন ? ‘
—দ্যাখ না দাদা, যে লোকটার কাছ থেকে তেল কিনেছিলাম, সেই লোকটা আবার এসেছে তেল বিক্রি করতে। গ্রামের লোককে ঠকিয়ে ব্যাবসায় উন্নতি করছে।
উন্মেষ গ্রামের লোকের উদ্দেশ্যে বলল, “এই লোকটার কাছে কেউ তেল কিনো না তোমরা। আমার বাড়ির লোককে কয়েক বছর আগে ঠকিয়েছে। তোমাদেরও ঠকাবে।”
কুশ পড়ল মহাবিপদে। গ্রামের লোক ক্ষেপে গেলে আর রক্ষে নেই। ক্ষণিকের জন্য কুশ ভাবল, এখানে না এলেই ভালো হতো। দু-চারজন লোক উন্মেষের কথা শুনে শোরগোল তুলল— এই জোচ্চোরটাকে মার ধরে। আমাদের ভালো মানুষ পেয়ে গ্রামশুদ্ধ লোককে বোকা বানানো বার করছি। ভিড়ের মধ্যে থেকে কিছু ছেলে-ছোকরা কুশকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে মারমুখি হয়ে উঠল।
কুশ বলল, ‘এই আমাকে ধাক্কা মারছ কেন! আমি কী করেছি। আমি কাউকে ঠকাইনি।’
তর্কাতর্কির মাঝে রমা বলল, ‘এই লোকটাকে ধরে মারা উচিত। এর কাছ থেকে তেল কেউ কিনবে না। আমি নিজে ঠকেছি। তোমরাও ঠকবে।’ এই কথা শুনে হইচই আরও বেড়ে গেল। কুশ বিরক্ত হয়ে ভিড় ঠেলে বলল, ‘এই তোমাদের কাউকে তেল কিনতে হবে না। আমাকে যাওয়ার রাস্তা দাও। মেঘ করেছে। আমাকে ফিরতে হবে।”
কয়েকটি ছেলে-ছোকরা মাথা গরম করে বলল, “তুমি যাবে কোথায়?” উন্মেষ বেরিয়ে এসে কুশের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “লোক ঠকিয়ে পালানো হচ্ছে।’ ভিড়ের মধ্যে থেকে দু-চারজন বলে উঠল, ‘মারুন দাদা লোকটিকে।”
কথা শেষ না হতেই উপস্থিত মহিলারা কুশের পিঠে কিল ঘুষি মারতে শুরু করল। কুশ দেখল যে, গ্রামবাসীরা সকলেই তার উপর বিরক্ত। সে ভাবল, গ্রামে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না। এরই মধ্যে ঘটল এক বিপত্তি। ধাক্কাধাক্কি করে কুশ ভিড় ঠেলে বেরোতে গেলে উন্মেষ তার মাথার চুলের মুঠি টেনে ধরল, যাতে সে পালাতে না পারে।
এরপরই এক ঘটনা ঘটল। উন্মেষ অবাক চোখে চেয়ে দেখল— -কুশের মাথার চুল তার হাতে! পরচুলা হাতে নিয়ে সে হো হো করে হেসে উঠে বলল, “আরে লোকটারই তো নকল চুল। সত্যিই মানুষ পেটের দায়ে কত ধান্দাই করে।’ এই ঘটনা দেখে গাঁয়ের লোকদের কুশের উপর রাগ বিরক্তি করা তো দূরের কথা, সমবেত মানুষের একটা জোরালো হাসির শোরগোল উঠল!
সেই সুযোগে কুশও ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রাণভয়ে গ্রামের জমির আলপথ ধরে ছুটে চলেছে স্টেশনের দিকে। যেতে যেতে সে বলতে লাগল, “কী গ্রাম রে বাপু! আর এ মুখো হব না। খুব বাঁচা বেঁচেছি!”
শ্রাবণের মেঘ গম্ভীর গর্জন করে দু-একফোঁটা ঝরে পড়ল। কুশের চকচকে টাক মাথায় দুফোঁটা বৃষ্টি শিশির বিন্দুর মতো পড়তেই, কাঁধের ঝোলা ব্যগটা দিয়ে সে সযত্নে মাথা ঢাকল।
(সমাপ্ত)





