গ্রামের নাম মড়াদিঘি। পশ্চিম মেদিনীপুরের এক অখ্যাত গ্রাম। নামকরণের সার্থকতা বজায় রেখে চলেছে এই গ্রামটি। গ্রামের মন্থর জীবনযাত্রা, ঝিমিয়ে পড়া পরিবেশ গ্রামটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। গ্রামীণ রীতিনীতি, সংস্কৃতি, লোকাচার, উৎসব-অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে মড়াদিঘির গ্রামবাসীরা সযত্নে লালন-পালন করে আসছে। গ্রামে বাইরে থেকে কোনও লোকজনের যাতায়াত নেই বললেই চলে। গ্রামের লোকজনেরও তেমন গ্রামের বাইরে যাওয়ার খুব প্রয়োজন হয় না। চাষবাস, বিভিন্ন হাতের কাজ, মাদুর শিল্প ইত্যাদি করে গ্রামবাসীদের যা উপার্জন হয়, তা দিয়েই তাদের একরকম চলে যায়।
প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা। ধুলোমাখা গ্রামের সঠিক সংজ্ঞা দিতে পারে মড়াদিঘি গ্রাম। গ্রামবাসীরা সভ্য সমাজের আলো থেকে প্রায় বঞ্চিত বললেই চলে। তাদের মধ্যে শিক্ষার তেমন প্রসার নেই। শিক্ষিত লোক হাতে গুনে দশটাও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। অধিকাংশই মাটির বাড়ি। রাস্তাঘাটও তেমন উন্নত হয়নি। শহরের কাছাকাছি পৌঁছাতে গ্রামের লোকজনকে কসরত করতে হয়। ঘরে বিদ্যুৎ নেই। বাড়িতে জল কল নেই। অনাড়ম্বর এক জীবন গ্রামবাসীদের। তবু কোথাও এই জীবনযাত্রায় সুখ শান্তি আছে। তাদের সারল্যের হাসিমুখ তারই প্রমাণ বহন করে।
আষাঢ়ের মেঘাচ্ছন্ন দুপুর। গত দুদিন অঝোরধারায় বৃষ্টি হয়েছে। আজ বৃষ্টিটা একটু ধরে এসেছে। দেড়তলা মাটির বাড়ির বারান্দায় বসে প্রত্যুষা তার বউদি রমার সঙ্গে হাসিঠাট্টায় মশগুল। অদূরে মাঝবয়স্ক একজন লোক একটা ঝোলা কাঁধে নিয়ে হাঁক পাড়ল, ‘তেল নেবেন গো। মাথা ঠান্ডা রাখার এবং নতুন চুল গজাবার এ এক অব্যর্থ ওষুধ। প্রকৃতি থেকে তৈরি। কোনওরকম ভেজাল নেই। এক শিশি নিয়ে যান। অমাবস্যার মেঘের মতো চুলের গ্যারান্টি। বেশি না ভেবে আসুন।”
লোকটি প্রত্যুষার বাড়ির কাছে আসতেই রমা বারান্দা থেকে বলল, ‘চুলের তেলের দাম কত?' লোকটি সরল ভাবে হেসে বলল, ‘মা জননী মাত্র একশো টাকা।” রমা লোকটিকে বলল, ‘দরজার কাছে এসে দাঁড়ান।' প্রত্যুষাকে রমা বলল, “চল তো দেখি একশো টাকার কী তেল! মুঠোভর্তি চুল যা উঠছে, তাতে মাথা ফাঁকা হতে বেশি সময় লাগবে না।”





