গুছিয়ে কথা বলতে পারা এক মস্ত গুণ। কোথায়, কীভাবে, কী কথা বলবেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কথাকে মাধ্যম করে অপরকে হাসানো যায়, কাঁদানো যায়, মন জেতা যায় এবং সামগ্রিক ভাবে প্রভাবিত করা যায়। অর্থাৎ, এই ‘কথা বলার কৌশল’ (Speaking techniques) আসলে শ্রোতাদের সামনে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করার অন্যতম দক্ষতা। এটি শুধু একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া নয়, বরং এমন একটি কৌশল, যা বক্তার জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে শ্রোতাদের প্রভাবিত করতে সাহায্য করে। তবে এই ক্ষেত্রে শক্তিশালী উপস্থাপনা, কণ্ঠস্বর এবং বক্তব্যের বিষয়বস্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন মনোশিজ-এর সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর দেবদীপ রায় চৌধুরী।

কথা বলার কৌশল রপ্ত করার ক্ষেত্রে প্রথমেই যা মনে রাখা প্রয়োজন, তা হল— এই কৌশল কোনও প্রসাধনী কৌশল নয়। এটি এমন একটি দক্ষতা, যা স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞান, আচরণ এবং উপস্থিত বুদ্ধির উপর নির্ভর করে। এর দুটি দিক আছে। একটি পদ্ধতিগত এবং অন্যটি ক্লিনিক্যাল। তাই মনে রাখবেন, “স্পিকিং টেকনিক” এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বক্তা তার শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করেন। এর মাধ্যমে শ্রোতাদের চিন্তা ও ধারণাকে প্রভাবিত করা, তাদের অনুপ্রাণিত করা এবং একজন বক্তা হিসেবে নিজের ভালো ইমেজ তৈরি করা যায়। তবে, কথা বলার কৌশল রপ্ত করতে হলে সবার প্রথমে নিজেকে প্রকৃত শিক্ষিত করে তুলতে হবে এবং মস্তিষ্ককে জ্ঞানের ভাণ্ডারে পরিণত করতে হবে। সেইসঙ্গে, রপ্ত করতে হবে বিভিন্ন ভাষা। কারণ, বৃহত্তর ক্ষেত্রে নিজেকে মেলে ধরতে হলে যত বেশি ভাষা জানবেন, তত সহজে সমস্ত ভাষাভাষির লোকেদের মন জয় করে নিতে পারবেন, জড়তাও কাটবে। পোশাক এবং চোখের ভাষাও উপযুক্ত হওয়া উচিত এক্ষেত্রে।

বক্তৃতায় উদ্বেগ

জনসাধারণের কাছে কথা বলার ভয় স্বাভাবিক এবং ব্যাপক। যদিও জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশ কোনও জমায়েতে বা সভা-সম্মেলনে কথা বলার সময় কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রায় ১৫-৩০ শতাংশ বক্তা অনেক লোকের সামনে কথা বলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ অনুভব করেন। অন্যদিকে, অনেকেই পরিস্থিতিগত নার্ভাসনেসের সমস্যায় ভোগেন। এই উদ্বেগগুলিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলি শিক্ষাক্ষেত্রে পিছিয়ে দেয়, কেরিয়ার-এ কুপ্রভাব ফেলে, নেতৃত্বের ক্ষমতাও হ্রাস করে।

কথা বলার মনোবিজ্ঞান

যখন আমরা মনে করি যে, আমাদের সামনের শ্রোতারা আমরা যা বলব তার উপর ভিত্তি করে আমাদের বিচার করবে, হয়তো ভুল বলে ফেলছি, এমন ভয় হবে, তখন মস্তিষ্কের সিস্টেম সক্রিয় হয়ে উঠবে। অ্যামিগডালা এবং এর সঙ্গে যুক্ত সার্কিটগুলি উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে, দ্রুত হৃদস্পন্দন, অক্সিজেনের ঘাটতি, ঘাম এবং সংকীর্ণ মানসিকতা তৈরি হবে। তাই, এই সমস্যা কাটাতে হবে। কারণ, আত্মবিশ্বাস কমে গেলে কথা বলে কাউকে প্রভাবিত করা যাবে না, বরং উপহাসের পাত্র হয়ে উঠবেন।

নানারকম কৌশল

সঠিক উচ্চারণে, সঠিক শব্দে গুছিয়ে কথা বলতে পারা আবশ্যক। অন্যের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয়, এক্সট্রা অর্ডিনারি ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মূল বিষয় হল “স্পিকিং টেকনিক’ অর্থাৎ আকর্ষণীয় এবং হৃদয়গ্রাহী করে মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা। তবে, শুধু শিক্ষিত কিংবা বুদ্ধিমান হলেই ভালো বক্তা হয়ে উঠবেন এমনটা নয়। আপনার ভাব বা ইচ্ছে অন্যকে অনুপ্রাণিত বা মোটিভেট করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্যের উপলব্ধিতে বা চেতনায় তা স্পর্শ বা মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারছে। আর তা সম্ভব তখনই, যখন আপনার বিশ্বাস এবং চেতনা কিংবা ঘটনা সঠিক ভাবে, সঠিক ভাষার মাধ্যমে সঠিক শব্দে এবং উচ্চারণে প্রকাশ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মেডিকেলি-ও ফিট থাকতে হবে। অর্থাৎ, কণ্ঠনালীর (ভোকাল কর্ড) সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে হবে এবং তা নিয়মিত সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তাই, নিয়মিত গলার ব্যায়াম করুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং ভোকাল কর্ড-এর মাসল-কে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখুন। স্বরতন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজনে ভয়েস থেরাপি করাতে পারেন।

যারা সংগীতশিল্পী, আবৃত্তিকার, উপস্থাপক, সংবাদ পাঠক, আইনজীবী, শিক্ষক, রাজনৈতিক বক্তা, তাদের স্বরযন্ত্রের বেশি যত্ন নেওয়া উচিত। শুধু তাই নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব, আবেগকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত এই ক্ষেত্রে। কথা বলার ভঙ্গী এবং টোন এমন রাখা উচিত, যার মাধ্যমে শ্রোতারা চুম্বকের মতো আটকে থাকবে। তাই, স্থান, কাল এবং পাত্র বিশেষে আপনার ভয়েস-কে আপ-ডাউন করতে হবে, ছন্দের পরিবর্তনও করতে হবে। শব্দের উচ্চারণে এমন তরঙ্গ আনতে হবে, যা অন্যের কানে পৌঁছে সুর তৈরি করে। সেইসঙ্গে, কোথায়, কোন শব্দের পর কত সেকেন্ড থামতে হবে, কোন শব্দটি কোন রিদমে বলতে হবে, কোন শব্দটির উপর জোর দিয়ে কথায় আবেগ আনতে হবে, সেই কৌশল রপ্ত করতে পারলেই শ্রোতাদের মুগ্ধ করা যাবে সহজে। মনে রাখতে হবে, শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে যেমন গান শোনেন, ঠিক সেইভাবেই কথাকে মাধ্যম করে মুগ্ধ করতে হবে শ্রোতাদের। এর জন্য হারমোনিয়ামে রেওয়াজ করা উপকারী।

কথা এমন মাত্রায় বলতে হবে, তা যেন অতি উচ্চ স্বরে না হয় আবার অতি ধীরে না হয়। কারণ, অতি উচ্চ স্বরে কথা বললে যেমন স্বরতন্ত্রের ক্ষতি হয়, ঠিক তেমনই ফিসফিস করে দীর্ঘ সময় কথা বললেও স্বরতন্ত্র স্বাভাবিকতা হারায়। এছাড়া, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ধূমপান। তাই, ধূমপান বন্ধ করা দরকার। অতিরিক্ত অ্যালকোহল এবং চা, কফিও স্বরতন্ত্রের ক্ষতি করে। ঠান্ডা জল, আইসক্রিম ইত্যাদিও ভীষণরকম ক্ষতি করে স্বরতন্ত্রের। কথা বলার ধরনও সঠিক রাখা প্রয়োজন। কারণ, দীর্ঘদিন ভুল ভাবে কথা বললেও কথা বলার বিষয়টি আর শিল্পে পরিণত হবে না।

কথার মাধ্যমে অন্যকে মুগ্ধ করার আগে নিজেকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন সঠিক ভাবে। প্রথমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় নানারকম বিষয়ে যুক্তি দিয়ে কথা বলুন এবং জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য মোটিভেশনাল স্পিকার-দের কথা শুনুন। উচ্চারণশৈলি যদি ঠিক না থাকে, তাহলে স্পেশালিস্ট কারওর থেকে স্পিচ থেরাপি-কে মাধ্যম করুন। গভীর জ্ঞান পাবেন এমন বই পড়া কিংবা কথা শোনা যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনই হাস্যরসাত্মক লেখা পড়া, কমেডি শো দেখাও আবশ্যক। তবে কথা বলার সময় অতি-নাটকীয়তা বর্জন করুন। পরিবর্তে, স্বাভাবিকতা বজায় রেখে কথা বলুন। দেখবেন আপনার কথায় যেমন বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে, ঠিক তেমনই শ্রোতাদের মন জয়ও করতে পারবেন অনায়াসে।

প্রতিদিন সকালে হালকা গরম জলে সামান্য নুন যোগ করে গার্গল করতে পারেন, গুনগুন করে গান গাইতে পারেন, যা পাখির মতো আপনার আওয়াজকেও নিখুঁত করতে পারে। প্রতিদিন অন্তত দুবার মাথা এবং ঘাড় ঘুরিয়ে (ব্যায়াম ) মুখের আশপাশের অংশকে সুস্থ- স্বাভাবিক রাখতে হবে। এছাড়া, প্রতিদিন ধ্যান করাও আবশ্যক। এর জন্য মেরুদণ্ড সোজা রেখে বসুন এবং চোখ বন্ধ রাখুন কিংবা কোনও একটি বিন্দুতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাখুন কিছুক্ষণ।

সর্দিকাশি এড়াতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়াও প্রয়োজন। কারণ, সর্দি-কাশি আপনার কথা বলার সময় সমস্যা তৈরি করতে পারে। জিভ বের করে কিছুক্ষণ হালকা আওয়াজ করতে পারলেও স্বর স্পষ্ট হবে। বেশি ঝালযুক্ত খাবার থেকেও মুক্ত রাখতে হবে কণ্ঠনালীকে। কারণ, ঝালযুক্ত খাবার কণ্ঠনালীর ক্ষতি করে। নিয়মিত সকালে এবং রাতে জীবাণুমুক্ত টুথব্রাশ এবং ভালো টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করতে হবে, যাতে মুখের মধ্যে কোনওরকম সংক্রমণ না ঘটে।

এও মনে রাখা জরুরি যে, কথা বলা একটি দৈনন্দিন কাজ, যা আপনার ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। একটি সঠিক এবং সময়োপযোগী শব্দ শিশু-কিশোরের উদ্বেগ যেমন কমাতে পারে, সঠিক ব্যাখ্যা একজন সন্দেহবাতিক সহকর্মীকে স্বাভাবিক করতে পারে, সঠিক বক্তব্য কারওর দিনের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে, এমনকী একজন বিষণ্ণ, বিমর্ষ, আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষকে নতুন ভাবে বাঁচতে শেখাতে পারে। তবে শুধু কৌশল দ্বারা নয়, প্রয়োজনে আবেগ দিয়েও প্রভাবিত করা যায় অন্যকে। কিন্তু যখন কথা বলা কঠিন বলে মনে হয়, কাঁপতে থাকে কণ্ঠস্বর, কথা হারিয়ে যায়, তখন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এটি তখন স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা ধরে নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে হবে। এছাড়া আরও কিছু সমস্যা হতে পারে কথা বলার ক্ষেত্রে। সেই বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

প্রথমে, খুব ছোটো এক্সপোজার দিয়ে শুরু করুন কথা বলা। যেমন— আয়নার সামনে একটি ছোটো লেখা পাঠ করুন, তারপর বন্ধুর সামনে, তারপর একটি ছোটো জমায়েতে কিছু জ্ঞানের কথা বলুন যুক্তি সহকারে। দেখবেন ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। সেইসঙ্গে, আপনার ভয়েস রেকর্ড করে শুনুন এবং বন্ধুদের শুনিয়ে ভালোমন্দের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া নিন।

ডায়াফ্রাম্যাটিক শ্বাস-প্রশ্বাস অর্থাৎ, শ্বাস-প্রশ্বাস দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে জড়তা কাটানো এবং কণ্ঠস্বর উন্নত করা এবং একইভাবে সোম্যাটিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কণ্ঠস্বরের অনুরণন এবং আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে তোলা যায়।

কথা বলার আগে ৬০ সেকেন্ডের একটি ব্যায়াম করুন। অর্থাৎ, ৪ সেকেন্ড জোরে জোরে শ্বাস নিন, এরপর ২ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৬ বার শ্বাস ছাড়ুন (৩-৪ বার পুনরাবৃত্তি করুন), তারপর পা মাটিতে শক্ত করে, কাঁধ পিছনে রেখে, ৩০ সেকেন্ডের জন্য চোখ স্থির রেখে দাঁড়ান। এটি শরীরকে শান্ত করে এবং কণ্ঠস্বরের প্রক্ষেপণ উন্নত করে।

কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার যে, ভালো কথা বলা ভালো শ্রোতার উপরও নির্ভর করে। মনোযোগের সঙ্গে শ্রোতারা শুনলে, বক্তারও ভালো লাগে এবং বক্তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে, সেইসঙ্গে আরও ভালো ভাবে বক্তব্য পরিবেশন করার ইচ্ছে জাগে। অতএব, কোথায়, কাদের সামনে কথা বলছেন এবং তাদের মনোযোগ কীভাবে আকর্ষণ করবেন, সেই বিষয়টি আপনার অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুভব করতে হবে এবং সেইমতো বক্তব্য রাখতে হবে। এছাড়া, স্বরতন্ত্রকে সুস্থ রাখার জন্য একটি সাপ্তাহিক ক্লিনিক্যাল মাইক্রো-প্রোগ্রাম-এ অংশ নিতে পারেন এবং এটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো করা উচিত।

সবকিছুর পরও যদি কথা বলার সময় মাঝেমধ্যে উদ্বেগ হয়, তাহলে তা নিয়ে খুব বেশি বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, কিছু সময় জীবনের অন্যান্য প্রতিকূল পরিস্থিতির কুপ্রভাব পড়ে আমাদের কথায় এবং যা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি কথা বলার উদ্বেগ স্থায়ী, তীব্র কিংবা প্যানিক অ্যাটাকের মতো হতে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল হেল্প নেওয়ার প্রয়োজন আছে অবশ্যই।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...