জোর-জবরদস্তির জ্বালায় বাধ্য হয়ে কোনওমতে দুধটা শেষ করেন সুবিমল। তারপর শুয়ে পড়েন। ঘরের ডিম লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে কুন্তলাও। স্বামীর দিকে পাশ ফিরে ঘনিষ্ঠ হতে চায়। রোজকার মতোন সুবিমলের মাথার চুলে আঙুল ডুবিয়ে চালনা করে। মিনিট তিনেক পর পাশ ফিরে শোন সুবিমল, বলেন, ‘এবার ঘুমোও কুন্ত, রাত অনেক হল।’ এক ঘুমে রাত কাবার চিরদিনের অভ্যাস সুবিমলের। কিন্তু কেন কে জানে, সেদিন মাঝরাতে আচমকাই ঘুম ভেঙে যায় তার, বোধহয় দুশ্চিন্তায়। হাত বাড়িয়ে পরিচিত দেহটিকে খোঁজেন, পান না। ভাবেন কুন্তলা হয়তো ছোটো বাইরে গেছে।
ঘুম আসে না, আসে কেবল ভাবনারা। এভাবে হেরে ফিরে যাব? ছেড়ে দেব লড়াইয়ের ময়দান? নানা চিন্তার হিজিবিজি শিকড় ডালপালা ছড়ায় তার মস্তিষ্ক স্নায়ুর গভীরে। দূরের পেটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো বাজে। খেয়াল হয় অনেকক্ষণ হল কুন্তলা পাশে নেই। কী মনে হতে হাত বাড়িয়ে নাইটবাল্ব জ্বালেন, চোখ মেলে খোঁজেন স্ত্রীকে। দরজার দিকে তাকান।
দরজাটা ভেজানো মনে হচ্ছে। বিছানা ছেড়ে নামেন সুবিমল, তারপর নিঃশব্দে দরজা খোলেন। টানা বারান্দার ও প্রান্তে টয়লেট। পাশে মায়ের ঘরটা এখন ফাঁকাই পড়ে থাকে। তার পাশের ঘরটা অরুর। তিনি টয়লেটের দিকে এগিয়ে যান।
টয়লেটে ঢুকতে গিয়ে মনে হয় যেন চাপা কিছু কথা এবং শব্দ আসছে অরুর ঘর থেকে। জানালাটা বন্ধ কেন? দরজায় কান পাতেন সুবিমল। শুনতে পান, নারী-পুরুষের অতি পরিচিত কিছু দেহজ শব্দ, মূলত কুন্তলারই। ঘরময় বুঝি সেই শব্দেরা লাফালাফি করছে।
সুবিমলের মনে হয়, শব্দগুলি ক্রমশ এক জন্তুর অবয়ব নিচ্ছে। হিংস্র ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে তার দিকে। হঠাৎ ওরা একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ বীভৎস ভাবে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলছে তাকে চরম নৃশংসতায়। উফ্ ভাবা যায় না! দু’কানে হাত চাপা দেন তিনি। ওভাবে কতক্ষণ কাটে খেয়াল হয় না তার।
আচমকা কোনও রাতচরা পাখির বাজখাই চিৎকারে সংবিৎ ফিরে পান তিনি। টয়লেট সেরে পায়ে পায়ে নিজের ঘরে ফিরে এসে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েন। অনেকক্ষণ পর চোরের মতোন নিঃশব্দে দরজা খুলে পা টিপে টিপে ঘরে এসে বিছানায় ওঠে কুন্তলা৷ নাইটবাল্ব জ্বেলে মশারি গোঁজে। তারপর আলো নিভিয়ে আগের মতোন শুয়ে পড়ে চুপচাপ।
নেয়ামতকে আর খুব একটা দোষী বলে মনে হয় না সুবিমলের।
পরদিন অনেক বেলা করে ঘুম থেকে ওঠেন সুবিমল। খেয়াল হয় যন্ত্রণায় কপালের পাশের রগগুলো দপদপ করছে।
সকাল সকাল স্নান সেরে পুজোয় বসেন রোজকার মতোন। খেতে বসে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়াই সার হয়, দু-তিন গাল খেয়ে ভাত ফেলে উঠে যেতে চান।
স্ত্রী কুন্তলা তার হাত চেপে ধরে, মাথা খাও লক্ষ্মীটি। ভাতটুকু শেষ করে ওঠো।”
মৃদু হেসে সুবিমল বলেন, ‘খেতে ভাল্লাগছে না। একবার ডা. বোসের চেম্বার হয়ে স্কুলে যাব ভাবছি।’
উঠে মুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়েন স্কুলের উদ্দেশে। মাঝের দুটি দিন অত্যন্ত ব্যস্ততায় কেটে যায় সুবিমলের। প্রতিদিনই ফিরতে রাত হয়।
তৃতীয় দিন সকালবেলা তিনি কুন্তলাকে ডেকে বলেন, ‘মনমেজাজ ভালো নেই গিন্নি, চলো আজ টাউন থেকে সিনেমা দেখে আসি।’
“সিনেমা।” বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে, আনন্দের ছটা ফুটে ওঠে কুন্তলার মুখে। সে বলে, ‘অনেকদিন পর, বলো? সেই বছর তিনেক আগে শেষবার সিনেমা দেখেছিলাম।’
স্কুলে যাওয়ার আগে সুবিমল বলে যান, ‘আমি বিকাল বিকাল ফিরে আসবখন, তুমি তৈরি হয়ে থেকো। পাঁচটা সোয়া পাঁচটার মধ্যে না বেরোতে পারলে সাতটার শো দেখা যাবে না। এতটা পথ যেতেই ঘণ্টা দেড়েক লেগে যাবে।’ পাঁচটা নাগাদ সুবিমল বাড়ি ফিরে দেখেন কুন্তলা সেজেগুজে একদম প্রস্তুত।
সে বলে, ‘তুমি এটু হাত-মুখ ধুয়ে নাও। আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি।’
কিন্তু চায়ের কাপ মুখে নিতেই এক বিপত্তি এসে হাজির হয়। রাঘব জানা তার দলবল নিয়ে এসে ভয়ংকর তর্জন-গর্জন শুরু করে। সেই সঙ্গে চলে অশ্রাব্য খিস্তি-খেউড়। জানা বলে, ‘এখনও পর্যন্ত শালা তুই নাম উইথড্র করলি না? ভেবেছিলাম তুই ভালো কথার মানুষ। মনে হচ্ছে সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। শয়তান ঘুষখোর মাস্টার, তোর মুখোশ আমরা খুলে দেব রে শালা। তারপর দেখব, তোর কোথায় থাকে মাস্টারি, আর কোথায় থাকে পার্টি? তোকে আমি দেখে নেব রে শুয়োরের বাচ্চা… শালা, আমার সঙ্গে চালাকি!’
রাঘব জানার চেঁচামেচিতে চারপাশের লোকজন বেরিয়ে পড়ে। তবে কেউ তার সামনে মুখ খোলার সাহস করে না। মিনিট দশ- পনেরো গালি-গালাজ করে রাঘব জানা বীরদর্পে চলে যায় দল বেঁধে।
লোকজন বলাবলি করে, ‘রাঘব বড়ো বাড় বেড়েছে।” মুখ ভার হয়ে যায় কুন্তলার। এমন শুভ দিনে এরকম একটা অলুক্ষণে ঘটনায় মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। সিনেমা দেখাটা বুঝি মাঠে মারা গেল।
স্ত্রীর মুখ দেখেই সুবিমল তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে যান। তিনি বলেন, “ওসব নিয়ে ভেবো না কুন্ত, চলো বেরিয়ে পড়ি। দেরি হয়ে গেল বেশ।’
সবকিছু ভুলে কুন্তলা ও সুবিমল রওনা দিলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “অরু, আমরা একটু বেরোচ্ছি, সাবধানে থাকিস বাবা। ঠিক মতোন দরজা-টরজা বন্ধ করিস। অরু সম্মতিজ্ঞাপক মাথা নাড়ে।
শহরে সিনেমা দেখে খাওয়া-দাওয়া সেরে টুকিটাকি জিনিস কেনা-কাটা করে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়। ফেরার সময় ভ্যান- রিকশা পাওয়া গেল না। দুশ্চিতায় কালো হয়ে আছে কুন্তলার মুখ।
সুবিমল বললেন, “কী আর করা যাবে গিন্নি। মাইল চারেক তো পথ, চলো হেঁটেই মেরে দিই।”
শীত এখনও যায়নি। চাদরটা বেশ করে জড়িয়ে নিয়ে চেনা রাস্তায় পা বাড়ান সুবিমল। মনটা তার আজ বেশ প্রফুল্ল। ফুরফুর করছে জ্যোৎস্না। মাথার উপর ঝকমক করছে অসংখ্য নক্ষত্র। হিমেল হাওয়া দিচ্ছে বেশ। গল্প করতে করতে এগোতে থাকেন দু’জন। জনমানব শূন্য রাস্তায় যেন পৃথিবীর আদিম মানব-মানবী তারা।
(ক্রমশ…)





