প্রশংসা পাওয়ার জন্য নতুন বাড়ি এবং বিলাসবহুল গাড়ির ছবি কিংবা ভিডিও রিল সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর নিজেকে ধনী এবং অভিজাত প্রমাণ করার এই দৌড়ে সবাই নেমে পড়েছেন। এছাড়াও, প্রেমিকা এবং স্ত্রীকে মুগ্ধ করার জন্য অনেক সময় বড়ো বাড়ি এবং বড়ো গাড়িও কেনেন অনেকে। আসলে, সমাজে নিজেকে বড়ো প্রমাণ করার এই প্রবণতা এতটাই সাধারণ হয়ে উঠেছে যে, লোকেরা অপ্রয়োজনীয় ভাবে ব্যয় করছে। এর ফলে অনেকেই সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়াই একটি দামি বাড়ি বা গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে পরিবারের বাজেট নষ্ট করার পুরো খেলা, যার আড়ালে বাড়ির শান্তি কোথাও চাপা পড়ে যাচ্ছে এবং অশান্তির সূত্রপাত ঘটছে।

মনে রাখবেন, বড়ো বাড়ি, বড়ো গাড়ি মানেই মোটা অংকের ইএমআই-এর (ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট) চাপে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আসলে, এ এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে মানুষ তাদের আর্থিক সামর্থ্যের বাইরেও বড়ো বা দামি বাড়ি এবং গাড়ি কেনার জন্য বিশাল ইএমআই-এর বোঝা চাপিয়ে নেয় নিজের মাথায়। এর থেকে প্রমাণিত যে, নিজেদের ‘অভিজাত’ প্রমাণ করার জন্য লোকেরা প্রায়ই তাদের আয়ের একটি বড়ো অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করে, যার ফলে তাদের অন্যান্য ব্যয়ের জন্য কম অর্থ থাকে এবং আর্থিক চাপের সৃষ্টি হয়।

খরচ বৃদ্ধি পায় ক্রমশ

একটি বড়ো বাড়ি এবং দামি গাড়ি কেনার জন্য ইএমআই বৃদ্ধির পাশাপাশি, অন্যান্য খরচও বৃদ্ধি করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি একটি রেফ্রিজারেটর কিংবা টিভি কেনেন, তাহলে খরচের পরিমাণ কেবল তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। টিভির বিদ্যুৎ বিল খুব বেশি বাড়ে না। তবে, বড়ো গাড়ির দৈনিক খরচ, যেমন সার্ভিস, পেট্রোল, যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে বড়ো খরচ, বিমা এবং বড়ো গাড়ির সঙ্গে যুক্ত বর্ধিত ভ্রমণ খরচ, সবই যোগ হবে। আসলে, তখন আপনার জীবনযাত্রা আপনার গাড়ির উপর নির্ভর করবে। আপনারা তখন ছোটো রেস্তোরাঁয় খাবেন না, খাবেন বড়ো রেস্তোরাঁয় এবং এর ফলে খরচও দ্বিগুন হবে।

একইভাবে, একটি বড়ো বাড়ির সাজসজ্জার খরচও বেশি। প্রতিটি ঘরে একটি এয়ার কন্ডিশনার প্রয়োজন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও খরচ বাড়বে, প্রপার্টি ট্যাক্সও বেশি দিতে হবে। গাড়ি পার্কিং-এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হবে এবং খরচ বাড়বে, অভিজাত অঞ্চলের বাজারে সবজির দাম বেশি হবে এবং যদি আপনার এই ধরনের বাড়ি থাকে, তাহলে আপনার বিদ্যুৎ বিলও বেশি হবে।

আসলে, বড়ো কিছু কেনার সময় এই সমস্ত খরচ ধরা হয় না। মানুষ সাধারণত কেবল লোক দেখানোর জন্য সম্পত্তি কেনে। বড়ো গাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বড়ো খরচ, যেমন— – ছোটো গাড়ির তুলনায় বড়ো গাড়িতে পেট্রোল কিংবা ডিজেল বেশি খরচ হয়। যেখানে আপনার ছোটো গাড়ির মাইলেজ প্রতি লিটার ফুয়েল-এ ১৪-১৫ কিমি হতে পারে, সেখানে বড়ো গাড়ির মাইলেজ ৮-১০ কিমি হবে। এতে আপনার খরচও বেড়ে যাবে। বড়ো যানবাহনের সার্ভিসিং এবং যন্ত্রাংশও ব্যয়বহুল।

এই যানবাহনগুলির পরিসেবা প্রদানের খরচ বেশি এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বেশি হয়। যন্ত্রাংশ, যেমন— ব্রেক প্যাড এবং ফিল্টার ইত্যাদি ছোটো মডেলের গাড়ির তুলনায় বেশি দামি হতে পারে। বড়ো গাড়ির টায়ারও দামি এবং সাইড মিররও দামি। উচ্চমূল্যের যানবাহনের জন্য বিমা প্রিমিয়াম এবং রোড ট্যাক্সও বেশি। অতএব, আপনার বাজেট অনুযায়ী গাড়ি কিনুন।

একটি বড়ো বাড়িতে আরও ঘর, আরও আলো, আরও এসি, আরও হিটার থাকবে, যা বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দেবে। রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বেশি হবে। বড়ো সংস্থার মালিকানাধীন একটি বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা সোসাইটিতে বসবাস করলেও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেশি হবে। এমনকী যদি আপনার মাত্র দুটি ঘর থাকে, তবুও আপনাকে একটি বৃহত্তর সমাজে বসবাসের খরচ বহন করতে হবে। বড়ো সিলিং, আরও দেয়াল, আরও জানলা, মেরামত এবং রং করার খরচও দ্বিগুন হবে।

গৃহসজ্জা এবং আসবাবপত্রের জন্যও উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের প্রয়োজন হবে। ঘর সাজানো এবং বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য রং, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সাজসজ্জার সামগ্রীর উপর ব্যয় করা অপরিহার্য। আর ঘর সাজাতে আরও দামি আসবাবপত্র, পর্দা, কার্পেট ইত্যাদির প্রয়োজন হবে। আপনি যে অভিজাত সমাজে বাস করবেন, সেই আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য বাজেটের বাইরে খরচ করার চাপ থাকবে।

একটি বৃহৎ বাড়ির জন্য সম্পত্তি করও বেশি দিতে হবে। অভিজাত অঞ্চলে থাকা সম্পত্তির ‘গভর্নমেন্ট ভ্যালু’ বেশি হলে, সম্পত্তি করও বেশি লাগে। কাজের লোকের খরচও বাড়বে। যদি আপনার বাড়িটি বড়ো হয়, তাহলে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আপনাকে অতিরিক্ত সাহায্যকারী, যেমন একজন পরিচারিকা বা পরিচ্ছন্নতা পরিসেবার ব্যবস্থা করতে হতে পারে, যা আপনার মাসিক খরচ বাড়িয়ে দেবে। একটি বড়ো বাড়ি পরিষ্কার করার জন্যও বেশি খরচ হবে এবং একজন পরিচারিকা দ্বিগুন পারিশ্রমিক নেবে।

বিমার খরচও বাড়বে। বাড়ির দাম বেশি হওয়ার কারণে, গৃহ বিমার প্রিমিয়ামও বেশি। কিন্তু মনে রাখবেন, অন্যদের প্রভাবিত করার জন্য অথবা সামাজিক পরিসরে ধনী দেখানোর জন্য একটি বড়ো বাড়ি এবং গাড়ি কেনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, যার ফলে আপনার বাজেট নষ্ট হয়ে যাবে এবং ঋণের বোঝা বাড়বে।

যা করা উচিত

যদি আপনার পরিবার ছোটো হয় এবং দুই শয়নকক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট-এ অসুবিধা না হয়, তাহলে ৩ কিংবা ৪ শয়নকক্ষের বাড়ি কেনা একেবারেই উচিত নয়। একইভাবে, আপনার পরিবারের চাহিদার উপর ভিত্তি করেই গাড়ি কিনুন।

আপনার চাহিদাগুলি বোঝার পরেই পরিকল্পনা করুন। অন্যথায়, প্রতি মাসে ঋণের ইএমআই পরিশোধের প্রক্রিয়ায়, আপনার সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জরুরি তহবিল কিংবা অবসর তহবিল পরিকল্পনা প্রভাবিত হতে পারে। একটি বড়ো বাড়ি এবং বিলাসবহুল গাড়ির জন্য টাকা খরচ করার পরিবর্তে, স্বাস্থ্য বিমা, জীবন বিমায় টাকা বিনিয়োগ করুন। আপনার মাসিক আয়ের ২৫-৩০ শতাংশের বেশি ইএমআই-তে খরচ করবেন না, বাড়ি কেনার আগে আপনার সমস্ত খরচ হিসাব করুন।

জরুরি অবস্থার জন্য সবসময় কিছু টাকা জমা রাখুন। ইএমআই কমাতে প্রতি মাসে সামর্থ্য মতো প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট (সুদ ছাড়া ঋণের আসল টাকা) যতটা সম্ভব পরিশোধ করুন। এইভাবে, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করুন এবং চিন্তামুক্ত থাকুন।

যদি আপনার বাজেট ৫০,০০০ টাকার মাসিক আয়ের উপর ভিত্তি করে হয়, তাহলে একটি বড়ো গাড়ি কেনা ব্যয়বহুল বলে মনে হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে, কম খরচের ছোটো গাড়ি কেনা একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। আপনার চাহিদা অনুযায়ী উচ্চ মাইলেজ প্রদানকারী গাড়ি বেছে নিন। গাড়ির মডেল এবং এর সার্ভিসিং খরচ আগে থেকেই জেনে নিন। কেনার আগে বিমা এবং রোড ট্যাক্স- এর বিষয়ে জেনে নিন বিশদে। গাড়ি কেনার সময় ২৫-৫-১০ সূত্রটি অনুসরণ করুন।

সূত্র: ০১

২৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট-এর (মোট মূল্যের অগ্রিম অর্থ) ব্যবস্থা করুন। আপনি যে গাড়িটি কিনছেন, তার জন্য বড়ো অংকের ঋণ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। পরিবর্তে, ঋণের পরিমাণ কম রাখতে এবং সুদের খরচ বাঁচাতে, আপনার গাড়ির দামের ২৫ শতাংশ আগে থেকেই পরিশোধ করা উচিত।

সূত্র: ০২

৫ বছর মেয়াদের ঋণ নিন। অর্থাৎ, আপনার গাড়ির ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৫ বছর রাখুন। দীর্ঘ মেয়াদ সুদের বোঝা বাড়ায় এবং চিন্তামুক্ত হতে সময় লাগে।

সূত্র: ০৩

১০ শতাংশ ইএমআই দিন। অর্থাৎ, আপনার মাসিক বেতনের ১০ শতাংশ-র বেশি ইএমআই হওয়া উচিত নয়। কারণ, বেশি ইএমআই-এর বোঝা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। বাড়ির খরচ বেশি হলে, ২৫-৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট-এর ব্যবস্থা করুন। বেশি ডাউন পেমেন্টের ফলে ইএমআই-এর পরিমাণ কমে যায় এবং ঋণের মেয়াদে প্রদত্ত মোট সুদ কমে যায়। তবে আপনার জরুরি তহবিল কিংবা অবসরগ্রহণের মতো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলিকে অবহেলা করবেন না।

এছাড়াও, কমপক্ষে ৬ থেকে ১২ মাসের খরচের সমতুল্য একটি পৃথক জরুরি তহবিল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সুশৃঙ্খল পদ্ধতি নিশ্চিত করে যে, আপনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাড়ি কেনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনার আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে না ফেলে বরং বিচক্ষণতার পরিচয় দিন।

—শিখা জৈন

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...