উপেন্দ্রবাবু দু’দিক থেকে বেড় দিয়েছেন। একদিকে মাস্টারকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য অমন দাপটের কণ্ঠ। অন্যদিকে মেয়েদের গুডবুকে নিজেকে নিয়ে ফেলা। মেয়ে যদি কোনও দুর্বলতা থেকেও একবার বিয়েতে মন করে। মানে এই বিদেশ যাওয়ার জন্য যদি একজন জীবনসঙ্গীর প্রয়োজন বোঝে, তবে তো কিস্তি মাত। এক মাস সময় আছে। সে বড়ো কম নয়। উপেন্দ্রবাবু জানেন, ম্যাট্রিমনিয়াল আর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অনেক কোম্পানি আছে কলকাতায়। তাদের দায়িত্ব দিলে তারা তুড়ি মেরে সবটা উত্তরে দেবে। পাত্র জোগাড় করা থেকে বিয়ের বাসর পর্যন্ত তাদের দিয়েই সব স্মুথলি সালটে নেবেন।
উপেন্দ্রবাবুর তাড়া খেয়ে অরিত্র মৌলিক খানিক দমে গেলেও নিজেকে ভাঙে না। সে বলে, ‘আপনি আমার মুখেই যদি ঝাল খেতে চান, আমার আপত্তি নেই। আমারও মনে কিন্তু মিন্তু আসেনি যে তা নয়। তবে সাধারণ ভাবে আমি ভাবনাকে সহজ দিকে বইতে দিয়েছি। এখন আপনার মুখে শুনলাম যখন, আপনার তিন মেয়েই বিয়ে করে সংসারী হতে চায় না, তখন ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। মানে আপনার মেয়েরা যদি পুরুষ অপছন্দই করে তবে তো বলতে হবে ওরা লেসবিয়ান নয় তো!”
২৯ চমকে উঠল। নিজের মুখে হাত চাপা দিল! বলে কী ভ্যাবলা-সুন্দর মাস্টার! সে কবে এত বড়ো হয়ে গেল! মেজদিকে পড়াতে পড়াতে তার দিকে চেয়ে ক্যাবলার মতো মুচকি মুচকি হাসত। বড়োদির প্রতি দুর্বল। আর সে নিজে কি এই মাস্টারের প্রতি অনুরক্ত! কে জানে! কিন্তু কিছু একটা কিন্তু কিন্তু আছে। কলেজে, অফিসে সে এই মাস্টারের মতো চেহারার কোনও ছেলেকেই খুঁজেছে অনেকদিন। কিন্তু না, চোখে পড়েনি। সে জানত তার দুই দিদির উপর এই মাস্টারের দুর্বলতা আছে। শুধু দিদিদের গাড়ির ভিতর থেকে রোজ একবার চোখের দেখা দেখবে বলে সকালে বিকেলে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বসে। একজনকে দেখে সকালবেলায়, আর একজনকে সন্ধ্যাবেলায়। দু’বেলা চা খেতে খেতে গাড়ি সহ ঝাড়ি মারার খবর তার কাছে ছিল। কিন্তু সে জানত না অরিত্র স্যারের তার উপর কোনও ভালোলাগার চোখ আছে কি না! সেই জন্যই তো ২৯ আজ তার বিশেষ অস্ত্র পা মেলে দিয়ে বসেছে শিকার ধরতে। তারপর জেনে গেছে শিকার তার পাতা ফাঁদে আপনি এসে ধরা দিয়েছে। ২৯ ভালো লাগায় মরে যাচ্ছে। মানে তার অংক স্যারকে ভালোবাসা যে এক পক্ষের নয়, উলটো দিকও সমান দুৰ্বল, তা জেনে পুলকিত হবেই তো। এসময় সেই ভালো লাগা থেকে ২৯ এক অদ্ভূত আবদার করে বসল।
—শোন বড়দি, তোর প্রোমোশনটা নিয়ে কাজ নেই।
উপেন্দ্রবাবু বললেন, “মানেটা কী? এরকম একটা সুযোগ হাতে এসেছে, তা হাতছাড়া করবে!”
—আমরাও দিদিকে, আর স্যারকে হাতছাড়া করতে পারব না। আমরা মানে, আমি আর মেজদি। কি মেজদি, ঠিক বলছি তো? ৩২ মাথা নিচু করে বোনের কথায় সম্মতির মাথা নাড়ে। তারও তো এই কথা। সে অরিত্র স্যারকে একা দিদির হাতে সঁপে দিতে পারবে না। প্রতিদিন কলেজ যাতায়াতের পথে একবার অন্তত তো চোখের দেখা হতো। দিদির সঙ্গে বিদেশে চলে গেলে, তখন কী করবে! সে তো হাঁপিয়ে মারা যাবে।
৩২ মাথা উঁচু না করেই বলল, ‘ছোটো ঠিক বলেছে। দিদির যাওয়ার দরকার নেই। অংকের স্যারও পাড়ায় থাকুন। দিদি আর স্যার বিদেশে চলে গেলে পাড়াটা শুনশান হয়ে যাবে। পাড়ার ছেলে-মেয়েদের ম্যাথ আর ফিজিক্সের টিচারের জন্য বেপাড়ায় দৌড়াতে হবে। দিদি মনে হয় সম্মতি দেবে। দরকার নেই যাওয়ার।”
৩৪ মানে বড়ো মেয়ে এসময় যেন অপরাধী একজন। সেই-ই যেন পাড়ার মাস্টারকে ছিনতাই করে নিয়ে পালাচ্ছিল। ফলে তাকে তো বিড়ম্বনায় পড়তে হবেই। সে তো তো করল। “ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি না-হয় এই চান্সটা স্কিপ করব।’
অরিত্র মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল, হ্যাঁ, সে যাবে। স্কুলের চাকরি হওয়ার আর আশা নেই। রোজ রোজ টিউশনির বকবক করতে করতেও সে ক্লান্ত। সে একটা ব্রেক চাইছিল। হ্যাঁ পাহারাওয়ালার পরিচয় নিয়ে সেখানে যাবে। তারপর দু’বছর খুব কম কথা নয়। নৈকট্য কি এর ভিতর করে নেওয়া যাবে না! মানে সম্পর্ক! ঠিক যাবে। কিন্তু সে উপর উপর এমন একটা স্মার্টনেস দেখাতে চেয়েছিল যে, তার মাথার উপর যেন আমলা উপেন্দ্র সিংহরায় চেপে বসতে না পারেন। সে এই আমলাকে লেজে খেলাবে। নিমরাজি ভাব দেখিয়ে দুবছরের জন্য এমন একটা টাকা চাইবে, যাতে ভবিষ্যতের অন্নচিন্তা দূরে থাকে। কিন্তু এখন দেখছে যে, সবটা কেঁচে যাচ্ছে। সে একটা মরিয়া চেষ্টা চালায়।
—আমি বলি কী, হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে নেই। বিদেশের ধন হাতে আসতে যাচ্ছে। সেই বিপুল অর্থকে অনর্থক হাতছাড়া করা কোনও শুভবুদ্ধির নয়!
৩২ এবার সরাসরি সিনে এন্ট্রি নেয়। ‘না না। দিদির গিয়ে কাজ নেই। দিদি গেলে আমাদের দলটাই ভেঙে যাবে। দিদি আমাদের তিন বোনের নেত্রী। দিদির অনুপস্থিতিতে বাবা যদি আমাদের ধরে ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়, তখন কে বাঁচাবে! দিদি তুই যাস না তো!”
॥ তিন ॥
বিশুর চায়ের দোকানের মালিক, মক্কেল – সবাই নিমন্ত্রিত। উপেন্দ্র সিংহরায় চাইছিলেন অচল অবস্থাটা ভাঙতে যে-কোনও মূল্যে। ছেড়ে দিয়ে বেড়ে খেলার নিয়ম তিনি জানেন। তিনি যে দুদে আমলা। হাঁড়ির একটা ভাত টিপে যেমন গোটা হাঁড়ির ভাত সেদ্ধ হয়েছে কিনা তা সুগৃহিণী বলে দিতে পারে, তেমনই উপেন্দ্র সিংহরায় সেদিনের নিজের বাড়ির চা-চক্র থেকে বুঝে ফেলেছিলেন। মেয়েদের মনের কথা। তাই তো নিজের গৃহিণীকে দিয়ে মেয়েদের আলাদা আলাদা ভাবে জিজ্ঞেস করে নিয়েছেন, অংকের মাস্টারকে তাদের পছন্দ কি না! সব মেয়েই আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছে তারা এই পাড়ার রোনাল্ডোকে খুব পছন্দ করে। অমন স্মার্ট শিক্ষিত পুরুষ খুব একটা চোখে পড়ে না।
অংকের মাস্টার অরিত্র মৌলিকের বাবা-মা নেই। তার বাড়িতে গিয়েই উপেন্দ্রবাবু পাকা কথা বলে নিয়েছেন। আর সেই কথা মতো ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, নিজের চারতলা বাড়ির সামনের চত্বরে বিরাট প্যান্ডেল উঠেছে। লোহার গেট সরে গেছে, বদলে সেখানে বসেছে নহবত। নেমন্তন্ন পেতে পাড়ার কেউই বাদ যায়নি। সবাই উপেন্দ্র সিংহরায়, আইএএস লেখা উঁচু পাঁচিলের কালো গেটের সামনে এসে হাঁ করে দেখছে, কালো গেট উধাও হয়ে সেখানে নহবতওলা বিরাট প্যান্ডেলের রঙিন প্রবেশদ্বার। সেই দরজার উপরে চুমকি ঝলমল লেখা— সিংহবাড়ির মেয়েদের সমবেত বিবাহ।
চায়ের দোকানের ঝাঁপ সন্ধ্যাবেলায় আজ বন্ধ। দোকানের আড্ডাবাজ সবাই যে দলবেঁধে এখানে। দোকানের মালিক বিশু হাজরা নিজেই নেতৃত্ব দিয়ে দলটাকে নিয়ে ঢুকছে। বাড়ির সামনে এসে তারাই ফিসফাস করছে, কী মন্ত্রে তাদের অরিত্র মাস্টার রাজত্বের সঙ্গে তিন তিনখানি রাজকন্যা হাসিল করে নিল রে!
মাস্টারের কপালে এই লটারির টিকিট মেলায় অনেকেই বন্ধু গর্বে গর্বিত। আবার দু-একজনের বুক থেকে চাপা শ্বাসও বের হচ্ছে! একজন তো বলেই বসে, “তিনজনকে একার হাতে না ছেড়ে, তিন মেয়েকে তিনজনের হাতে উপহার দিলে ব্যাপারটা বেশ মানাত।”
উপেন্দ্রবাবু জানেন এক-পা এগিয়ে দু’পা পিছানোর তত্ত্ব। বাড়িতে যে তিন সম্মিলিত ‘না’-র প্রাচীর তা তো তিনি ভেঙে দিতে সক্ষম হলেন। আর বিয়ে দিয়ে বিয়ে ভাঙানোর কেস তো তিনি তুড়ি দিয়েই সামলে নেবেন। তিন মেয়েকে নিয়ে তিন মাসেই এই মাস্টার যদি নাজেহাল না হয় কী বলেছেন! তিনি জানেন তাঁকে কিছুই করতে হবে না, এক বছরের ভিতরে এই অংক স্যার নিজেই না বিয়ে ভেঙে দিতে আসে। নিজের মেয়েদেরও চেনেন। পান থেকে চুন খসলে তারা তুলকালাম করে। অংকের স্যারের বাড়িতে যত দ্রুত তুলকালাম বাঁধবে, তত তাঁর লাভ। আশা করছেন, পরের বছরই অন্তত দুটিকে আবার বিয়ে দেবেন। দরকারে তিনজনেরই বিবাহ বিচ্ছেদ আর পুনর্বিবাহ হতে পারে।
এজন্য রেজিস্ট্রি বিয়ের ঝুঁকিতে যাননি। এবার নমো নমো করে পুরোহিত আর পাড়ার লোকজন নিয়ে হচ্ছে, পরেরবার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, আমলা-মন্ত্রীরা থাকবে। তিন মেয়ে শিখিপাখা, কুহুকেকা আর নূপুরনিক্বণ-এর সেই সত্যি সত্যি বিয়েটা চোখের উপর ভেসে উঠতেই, উপেন্দ্র সিংহরায় এই নকল বিয়ের আয়োজন সম্পূর্ণ করে ফেলেছেন।
(সমাপ্ত)





