চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই রিমা দাস আজ একজন প্রতিষ্ঠিত পরিচালক। তাঁর দূরদর্শিতা তাঁকে দিয়েছে এই স্বীকৃতি। তাঁর কর্মক্ষেত্র অসমের ভূমির সঙ্গে বেশি জুড়ে থাকলেও, সেই কর্মপ্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাঁর সিনেমাগুলিও স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে চলেছে।

রিমা দাস কখনও ফিল্ম-মেকার হওয়ার কথা ভাবেননি। আসলে, গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের এক ছোটো শহর ছায়গাঁও- ও-এ তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর মতে, “সিনেমা দেখতে ভালো লাগত, মেকিং-এর বিষয়ে কোনও জ্ঞান-ই ছিল না আমার।” অবশ্য যখন তাঁর কম বয়স ছিল, তখন অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অভিনয়ের জন্য যখন তিনি মুম্বই যান, তখন উপলব্ধি করেন যে, অভিনয় করে প্রতিষ্ঠা পাওয়া খুব সহজ কাজ নয়। অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে শেষ পর্যন্ত অভিনয় থেকে মুখ ফেরাতে হয়েছে তাঁকে।

শুধু হিন্দি ফিল্ম-ই নয়, টেলিভিশন ধারাবাহিকেও ছোটো চরিত্রে অভিনয়ের চেষ্টা করেছিলেন রিমা, কিন্তু তাঁর হিন্দি উচ্চারণ সঠিক না হওয়ায় সেই ইচ্ছেও পূরণ হয়নি।

প্রায় ৭ বছর মুম্বইতে চেষ্টা করার পরও যখন কোনও কাজ পেলেন না, শেষ পর্যন্ত তিনি নিরাশ হয়ে ফিরে গেলেন অসমে, নিজের বাড়িতে। তবে বাড়ি ফিরে তিনি বসে থাকেননি, শুরু করেন ফিল্ম-মেকিং। কিন্তু ফিল্ম-মেকিং-এ তাঁর কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছিল না। তিনি শুধু জানতেন কীভাবে কাহিনিকে আকর্ষণীয় ভাবে তুলে ধরা যায়। এভাবেই তিনি ২০০৯ সালে তৈরি করেন শর্ট ফিল্ম— ‘প্রথা’। এরপর ২০১৬ সালে রিমা তৈরি করেন ফিচার ফিল্ম ‘ম্যান উইথ দ্য বাইনোকুলাস”।

তাঁর গ্রামের একদল শিশু-কিশোরের সঙ্গে এক আকস্মিক সাক্ষাৎ তাঁকে ‘ভিলেজ রকস্টার’ তৈরিতে অনুপ্রাণিত করে। ছবিটিতে এমন একজন কিশোরীর কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে, যে সংগীতশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং কোনও অবস্থাতেই হাল ছাড়তে চায় না। তার পরিবার বন্যার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়, যা তাদের ক্ষেতের ফসলের ক্ষতি করে, তবুও মেয়েটি তার স্বপ্ন নিয়ে বিভোর থাকে। রিমা এই ছবির কাহিনি লিখেছেন, পরিচালনা করেছেন, সম্পাদনা করেছেন এবং সহ-প্রযোজনাও করেছেন।

‘ভিলেজ রকস্টারস’ ইতিহাস তৈরি করেছে। এটি ৬৫তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসাবে ‘স্বর্ণকমল’ পুরস্কার জিতেছে। অসমের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রায় তিন দশক পর জাতীয় সম্মান পায় রিমার তৈরি এই অসমিয়া ছবিটি। এটি ৯১তম অস্কারের জন্যও অফিসিয়াল এন্ট্রি পেয়েছিল।

রিমা তখন থেকে ‘ওয়ান পার্সন ক্রু’ হিসেবে অনন্য পরিচয় তৈরি করেছেন। সিনেমার মাধ্যমে রিমা অসমের গভীর সমস্যাগুলিকে তুলে ধরতে থাকেন। ‘বুলবুল ক্যান সিং” একটি নতুন যুগের ছবি, যা একটি কিশোরী মেয়ের যৌনতা আবিষ্কারের গল্প। আবার “তোরা’স হাজব্যান্ড’ ছবিটি বৈবাহিক সম্পর্কের গভীরতা অন্বেষণ করে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর পটভূমিতে তৈরি। 2024 সালে, রিমা পরিচালক কবির খান এবং ইমতিয়াজ আলীর সঙ্গে ‘মাই মেলবোর্ন’-এ সহযোগিতা করেন। রিমার নতুন ছবি ‘ভিলেজ রকস্টারস ২’ তাঁকে নিউ ইয়র্ক ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের পুরস্কার সহ অনেক খ্যাতি দিয়েছে।

আমরা যখন কথা বলছিলাম, তখন রিমা ছায়গাঁও-এ তাঁর বাড়িতে ছিলেন। তাঁর পরনে ছিল কালো মেখলা শাড়ি, যা অসমের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা আকর্ষণীয় পোশাক।

রিমা মুম্বইতে তাঁর শুরুর দিনগুলিতে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন এবং সেখান থেকে মুখ ফেরানোর পর নিজভূমে ফিরে কীভাবে তাঁর সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ফেললেন, সেই কাহিনিই তুলে ধরছি এবার।

রিমা-র মতে, “আমি যতই কাজ করি না কেন, যেভাবেই করি না কেন, যে সেরা খাবার-ই খাই-না কেন, যত অভিজাত জায়গায় থাকি না কেন, যতই সুন্দর প্রকৃতিতে ভ্রমণ করি না কেন, যদি মনে শাস্তি না থাকে, তাহলে সবই আসলে বৃথা। এই উপলব্ধি থেকেই আমার নিজভূমে ফিরে এসে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ।”

ছায়গাঁওয়ে আপনার শৈশবের দিনগুলো কেমন ছিল?

আজকে তোমরা যেমনটা দেখছ, আমার গ্রামটা তখন অনেক আলাদা ছিল, আমার বাড়ির সামনেও অনেক মাঠ ছিল এবং অনেক পুকুরও ছিল। একটু দূরে থাকা নদীতে আমি সাঁতার কাটতাম, গাছে চড়তাম। এই এলাকায় এমন একটা গাছও ছিল না, যে গাছে আমি চড়তাম না। আমার শৈশব সত্যিই অসাধারণ ছিল।

অসম সাংস্কৃতিক ভাবেও অনেক সমৃদ্ধ। বিহু (লোকনৃত্য), শঙ্কর মাধব (হিন্দু সংস্কারক), জ্যোতি প্রসাদ (লেখক, কবি ও ফিল্ম-মেকার), রাভা (শিল্পী), ভূপেন হাজারিকা (সংগীতশিল্পী ও সুরকার) প্রমুখ কৃতি মানুষের পদধূলি বহন করছে আমাদের অসম।

আমার বাবা-মা (ভরত এবং জয়া দাস) শিক্ষা জগতের মানুষ। বাবা ছিলেন একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং অধ্যক্ষ। তবে আমার মা শিক্ষা জগৎ থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন নানারকম কারণে। আসলে ছায়গাঁওয়ে আমাদের একটি বইয়ের দোকান এবং একটি ছাপাখানা ছিল। আমার মনে আছে, বাবা আমার মাকে বলেছিলেন যে, “তোমার চাকরি করার দরকার নেই, অন্য কোনও মহিলা এই চাকরি পেতে পারেন। তুমি বরং বইয়ের দোকান এবং প্রেস দেখাশোনা করতে পারো।’ তাই, আমার মা ছায়গাঁওয়ের অন্যতম প্রথম মহিলা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন।

আমি নাচতে ভালোবাসতাম এবং সর্বত্র অংশ নিতাম। কিন্তু আমার বাবা-মা সবসময় চাইতেন আমি যেন ক্লাসে প্রথম হই, আমার খেলাধুলা যাই হোক না কেন। তারা মাঝেমধ্যে বকাঝকাও করতেন আমাকে। তবে আমি বলতে পারি, ছোটো থেকেই আমি কিছুটা নিজের মর্জিতে চলতাম।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...