প্রথমবার যখন আমার পিরিয়ড হয়, তখন থেকে আমার মনে হতে থাকে, আমি বড়ো হয়ে গেছি, নিজের মতো চলতে পারি। কিন্তু আমার পরিবার একটু বেশি রক্ষণশীল ছিল, তাই আমি বাড়িতে থাকতে খুব বেশি পছন্দ করতাম না। আমি সবকিছুতে অংশ নিতে পছন্দ করতাম।
আমি এখানে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। তারপর কটন কলেজে যাই, যেখানে আমি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি। তারপর আমি আরও পড়াশোনার জন্য পুণে যাই এবং সেখান থেকে আমি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি। আপনি কি সবসময় সিনেমার প্রতি আগ্রহী ছিলেন?
সিনেমা জগত একেবারেই আলাদা পছন্দের জায়গা ছিল আমার। প্রথমে আমি একজন অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার যে ধরনের পরিবার ছিল, যে ধরনের পটভূমি ছিল, তা একেবারে সিনেমা জগতের বিপরীত মেরুতে। তাই আমি কখনও-ই ফিল্ম- মেকার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব, তা ভাবতে পারিনি শুরুর দিকে।
আমাদের কাছে সিনেমা দেখার জন্য ছিল, তৈরি করার জন্য নয়। সিনেমা বানানো আমার কাছে দূরের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু আমি সবসময় অভিনয়ে অংশ নিতাম। স্কুলে, কলেজে এবং স্থানীয় নাটকে অংশগ্রহণ করতাম। স্থানীয় এক নাটকের প্রতিযোগিতায় আমি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারও পেয়েছিলাম।
তখন টেলিভিশনে সপ্তাহান্তে সিনেমা দেখানো হতো। আমার মনে আছে, কখনও আমি সিনেমার প্রথম অংশটি দেখার সুযোগ পেতাম, আবার কখনও শুধু শেষ অংশটি দেখতে পেতাম। তারপর, যখন আমি কটন কলেজে ছিলাম, তখন হল-এ গিয়ে নিয়মিত সিনেমা দেখা শুরু করি। লাইন থাকত প্রচুর, তবুও আমি ধৈর্য নিয়ে লাইন-এ দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতাম। আমরা আমাদের হোস্টেলের বন্ধুদের সঙ্গে এই সব করতাম। তখনও আমি ভাবিনি যে, আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা বা গল্পকার হব। আমি ‘বাণিজ্যিক’, ‘সমান্তরাল’ কিংবা ‘আর্ট ফিল্ম’–এই শব্দগুলোর অর্থও বুঝতাম না তখন। আমি শুধু ভালো দর্শক ছিলাম। যে সিনেমাই হোক না কেন, নতুন সিনেমা এলেই আমরা তা দেখতাম। তবে মুম্বইতে থাকাকালীন আমি বিশ্ব সিনেমা, অর্থাৎ প্রচুর বিদেশি সিনেমাও দেখেছি।
আপনি কখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সিনেমা তৈরি করবেন?
স্নাতকোত্তর ডিগ্রি-র পর, নেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। তাই আমার বাবা-মা এমনকী আমার অধ্যাপকরাও বলতেন, “তুমি কি পাগল? ফিল্ম-মেকার হতে চাইছ কেন? যাও, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াও।” আমি অভিনয়ের প্রতি এতটাই পাগল ছিলাম যে, সবকিছু ছেড়ে অভিনয়ের চেষ্টা করি মুম্বই গিয়ে৷ তো পড়াশোনার পর, আমি মুম্বইতে ছিলাম। এটা খুব আকস্মিক ছিল। ২০০৯ সাল থেকে আমি সংগ্রাম করেছি। সাংস্কৃতিক ভাবে এটা আমার কাছে একটা ধাক্কা ছিল। আমাদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ছিল না। আমার আঞ্চলিক ভাষার টানের কারণে আমি সফল হতে পারিনি। হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম যে, এখানে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং এটি কেবল অভিনয়ের ক্ষেত্রে নয়। ওই আবহে মানিয়ে নিতে হলে, আমাকে একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হতো। আমার একটা ভয় তৈরি হয়েছিল। এক ধরনের অজানা ভয়। আর আমি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারছিলাম না।
আসলে এটা খুবই কঠিন লড়াইয়ের জায়গা। এখানে প্রচুর প্রতিযোগিতা। আমার প্লাস পয়েন্টস মিলিয়েও মুম্বইয়ে অভিনেত্রী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার লড়াইয়ের জন্য কম ছিল। আমি কাউকে দোষ দিতে চাই না। আমার মনে হয়, অভিনয়ে সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস এবং দক্ষতা আমার ছিল না।
আমি সবসময় ছোটো ছোটো চরিত্রে অভিনয় করেছি, কখনও রিপোর্টার হয়েছি, কখনও অন্য কিছু। কিন্তু কাস্টিং ডিরেক্টর ছাড়া পরিচালকের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হইনি। আসলে তুমি যদি আকর্ষক হও, ক্যারিশমা এবং সৌন্দর্য থাকে, হিন্দি ভাষায় দখল থাকে, তাহলে হয়তো পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে, তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু তুমি যদি প্রতিষ্ঠা না পাও, তাহলে একটা সময় আসে যখন সমাজ এবং পরিবার তোমার উপর চাপ দেবে এবং ‘পাগল’ বলবে। আমাকেও শুনতে হয়েছে, ‘৬-৭ বছর ধরে তুমি মুম্বইতে কী করছ?’ আমি সিআইডি ধারাবাহিকে অভিনয় করতাম, কিন্তু ছোটো চরিত্রে অভিনয় করার জন্য চেনাজানা লোকেরা উপহাস করত। তারা বলত, “দেখা যায়, তারপর চরিত্রটি মারা যায়, আর দেখা যায় না!”
আপনার কি মনে হয়, আঞ্চলিক পরিচয় কেরিয়ার-এ প্রভাব ফেলেছে?
হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা হিন্দি বলতে পারি না, তাই না? আমি পুনেতে লেখাপড়ার অবসরে অভিনয় শিখতাম, কিন্তু হিন্দি ভাষায় সঠিক উচ্চারণ করা রাতারাতি সম্ভব ছিল না। অবশ্য শুধু ভাষাগত সমস্যা নয়, মুম্বইতে আরও এমন কিছু সমস্যা ছিল, যা সুখকর ছিল না। কোথাও না কোথাও, তোমার যে শক্তি আছে, তা মাঝেমধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তুমি নেতিবাচক শক্তিতে ডুবে যেতে পারো, ওই ধরনের মানুষের সঙ্গে তোমার পরিচয় হয়ে যেতে পারে, তুমি হারিয়েও যেতে পারো। সবকিছু মানিয়ে নিতে না পারলে কেউ তোমাকে ইচ্ছে করে বলবে, ‘তুমি বেঁটে, তোমার চেহারা গাঁইয়া’ ইত্যাদি। আর এসব শুনতে শুনতে তুমি ভিতর থেকে মনোবল হারাতে পারো, তোমার সরলতা নষ্ট হতে পারে। তোমার স্বাভাবিক প্রবাহ ধীরে ধীরে কৃত্রিম হতে শুরু করবে, তুমি একটা নকল জীবনযাপনেও অভ্যস্ত হয়ে পড়তে পারো।
(ক্রমশ…)





