অভিনয় থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণে কীভাবে রূপান্তরিত হলেন?

মুম্বইতে অভিনেত্রী হিসেবে প্রাথমিক ভাবে যে সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছিলাম, তার কারণে কোনও পরিচালককে সহায়তা করার ইচ্ছে ছিল না আমার। আমি শুনেছিলাম যে, সহকারী পরিচালক হতে গেলেও একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া লাগে এবং কমপক্ষে ৫ বছর সময় দিতে হয়। আমার সেই ধৈর্য ছিল না।

কোনও ভাবে আমি বুঝতে পারলাম যে, চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দিকগুলি না জেনেও আমি গল্প বলতে পারি। আমি অসমে ‘প্রথা’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র তৈরি করেছি। এতে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল এবং তারপর ২০১১ সালে আমি কোনওভাবে একটি ক্যামেরা কিনতে সক্ষম হলাম এবং সেখান থেকে সবকিছু বদলে গেল। আমি ‘ম্যান উইথ দ্য বাইনোকুলার্স” তৈরি করলাম।

ছোটো একটা কারিগরি দল ছিল আমার। কিন্তু তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া আমার পক্ষে সহজ ছিল না। পরিবার সাহায্য করেছিল, বন্ধুরা সাহায্য করেছিল। আমি কিছু বিয়ের ভিডিও, কিছু কর্পোরেট ভিডিও শ্যুট করেও অর্থ উপার্জন করে সিনেমার প্রযোজক হয়েছি।
আমরা মাত্র ২০ দিনের মধ্যে ‘ম্যান উইথ দ্য বাইনোকুলার্স”-এর শ্যুটিং শেষ করেছি। আসলে যখন তুমি একজন নির্মাতা হবে, তখন তোমারও টাকার প্রয়োজন হবে এবং একটা চাপ থাকবে যে, তোমাকে নির্দিষ্ট টাকার মধ্যে সিনেমাটা বানাতে হবে।

একটা কথা, আমি নিজেই এতে অভিনয় করেছি। বিষ্ণু খারগিরা স্যার প্রধান চরিত্রে ছিলেন, কিন্তু আমিও একটি চরিত্রে অভিনয় করেছি। এটাই ছিল একটা বড়ো সমস্যার কারণ যে, সবকিছু আমার জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে গেল এবং আমি এই সবটা উপভোগ করতে পারলাম না।
হঠাৎ একদিন আমি একদল কিশোর-কিশোরীকে দেখতে পেলাম, যারা তাদের থার্মোকলের তৈরি গিটার এবং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পারফর্ম করছে। আমি তখন খুশি ছিলাম না। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আমার কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল। অভিনয়ের স্বপ্ন আমার সত্যি হয়নি। আমার প্রথম ছবির কাজ নিয়ে আমি খুশি ছিলাম না, একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। কিন্তু আমি সেই মঞ্চে বাচ্চাদের দেখেছি। তারা একটি ভালোলাগার মিশ্রণ তৈরি করেছিল আমার মনে এবং আমি তাদের থেকে নতুন ভাবে কাজ করার প্রেরণা পাই। তাদের দেখে আমার মনে হয়েছিল যে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও কিছু তৈরি করা সম্ভব।

আসলে ওই কিশোর-কিশোরীরা জীবনের আনন্দ উপভোগ করছিল। যদিও তারা গরিব ছিল এবং জানত যে, তাদের কাছে আসল বাদ্যযন্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই, তবুও তাদের স্বপ্ন এবং অনেক উৎসাহ ছিল।

“ভিলেজ রকস্টারস”-এর সময়, যেহেতু আমি নিজেই সবকিছু করছিলাম, তাই আমি এক ভিন্ন ধরনের এবং সৃজনশীল স্বাধীনতা অনুভব করেছি। এটাই ছিল অনুপ্রেরণা এবং নিষ্পাপ কিশোর-কিশোরীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল আমার মানসিক শক্তি। আমার একটা ছোট্ট রেকর্ডার ছিল, যা খুব কাজে লেগেছে ‘ভিলেজ রকস্টারস’ তৈরি করতে। অবশ্য সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের কারণে প্রায় সাড়ে তিন বছর সময় লেগেছে ছবিটি বানাতে। তবে আমরা হার মানিনি, এগিয়ে গিয়েছি আবেগে, স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে।

এটা কি একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল?
হ্যাঁ, আমি খুব খুশি যে, আমি একগুঁয়ে। একজন ফিল্ম-মেকার হিসেবে আমি কী করেছি তা আমি বুঝতে পারিনি, কারণ আমি প্রশিক্ষিত ছিলাম না। আমি কেবল আমার অন্তর্দৃষ্টি অনুসরণ করেছি। আমি প্রচুর সিনেমা দেখতাম এবং দেখেই আমি শিখেছি। সবকিছুই খুব সরল মনে করেছি। আর সেই সারল্যের কারণে, আমি কিছু গুণী মানুষকে ফুটেজটি দেখিয়েছিলাম এবং তাঁরা বলেছিলেন, “এটি খুব সুন্দর। তোমার সত্যিই আরও সিনেমা তৈরি করা উচিত। কারণ তোমার আগ্রহ আছে, প্রতিভাও আছে।’

এটা ছিল বেশ আকস্মিক। আমি অন্তত ৭ বছর ধরে মুম্বইতে অভিনেত্রী হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছিলাম। একটা বড়ো স্বপ্ন ছিল, কিন্তু যখন এই ছবিটা বানানোর কথা এল, বিশেষকরে ‘ভিলেজ রকস্টারস’, তখন আমি বুঝতেই পারিনি যে, আমার সারল্য কীভাবে উধাও হয়ে গেল!
আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম এবং যখন আমি সিনেমা বানাতে শুরু করি, তখন আমি আবার নিজেকে খুঁজে পাই। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় আমি যেমন মেয়ে ছিলাম, ধীরে ধীরে আবার সেই মেয়েতে পরিণত হয়েছি। ‘ভিলেজ রকস্টারস’ তৈরির সেই তিন বছর, যখন আমি আমার শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে শুরু করি, তখন আমার নিজের প্রতি আস্থা আরও বেড়ে যায়। আসলে, মাঝেমধ্যে তোমার সীমাবদ্ধতা তোমার শক্তি হয়ে ওঠে।

‘ভিলেজ রকস্টারস” ছিল একটি রূপকথার সফর। অনেক স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং শিল্পের মানুষ অনুপ্রাণিত হয়েছেন ছবিটি দেখে। অনেকে আমাকে ‘ওয়ান উয়োম্যান আর্মি” বলতে শুরু করে দেন। তারা এখনও আমাকে ছবিটি তৈরির জার্নি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন।
‘ভিলেজ রকস্টারস’ আপনার বেড়ে ওঠা অঞ্চল সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বদলে দিয়েছে?

ছোটোবেলা থেকেই আমি আমার অঞ্চলের সঙ্গে জুড়ে আছি। তারপর আমরা কটন কলেজে পড়তে গেলাম। এখান থেকে ওখানে। তাই, যখন এমন একটা সময় আসে, যখন আমি সবকিছু বেশি পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করি। বন্যার সময়ও স্কুলে যাওয়া, সবকিছুই আমি দেখেছি। কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি যে, মানুষ মাঠে কাজ করে এবং এত পরিশ্রম করার পরেও তাদের ফসল নষ্ট হলে কী কষ্ট হয়। পরে সবকিছু উপলব্ধি করি। যে সময় সবাই প্রেমে পড়ে যায়, বিভ্রান্ত হয়, তখন আমি বুঝতে চেষ্টা করি, মানুষের কী প্রয়োজন, একটি গাছের কতটা কী প্রয়োজন, একটি নদীর কী প্রয়োজন ইত্যাদি।

যখন আমি আমার সিনেমা বানাতে শুরু করি, তখন আমি আমার শিকড় এবং মাটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে শুরু করি। আমি দেখেছি কৃষিকাজ করা কতটা কঠিন। কৃষকদের খুব বেশি ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। যখনই তারা কৃষিকাজ করে, তারা নিজেকে উজাড় করে দেয়। এই সব বিষয় আমার জন্য বেশ জীবন বদলে দেওয়ার মতো ছিল।

আমার ঠাকুরদাদাও একজন কৃষক ছিলেন, আমার ভাইও কৃষিকাজের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। আমরা সেই কৃষকদের কষ্ট বুঝতে পারি, তাদের জন্য জমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, গাছ থাকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং জমির মালিক হওয়ার অনুভূতি, এই জায়গাতেই আমি দাঁড়িয়ে আছি। এখন আমি সবকিছু গভীর ভাবে ভাবি। আসলে যখন তুমি ক্যামেরার পিছনে থাকবে, তুমি সবকিছু দেখছ, আলো, প্রকৃতি, ধ্বনি। তুমি সংযুক্ত। তোমার মনে হবে, তুমি কিছু একটা তৈরি করছ। গাছে ওঠা এবং জলে লাফ দেওয়া, এমনকী লোকেরা আমাকে ‘পাগল’ বলাও শুরু করেছিল। তারা ভেবেছিল যে, আমি হয়তো মানসিক ভাবে অস্থির এবং বাচ্চাদের মাথাও নষ্ট করছি।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...