যখন আমরা শ্যুটিং করছিলাম, তখন আমি আমার বাচ্চাদের বলেছিলাম (যারা ‘ভিলেজ রকস্টারস’-এ অভিনয় করেছিল) যে, দ্যাখো, এটা আমার শৈশবে তোলা একজনের ছবি, এ ছাড়া আমি আর কিছুই জানি না। তোমরা নিজেদের দেখতে পাবে পর্দায়, তোমাদের শৈশব থেকে যাবে, তোমরা কী করছ, তোমরা স্কুলে যাও কিনা, পড়াশোনা করো কিনা ইত্যাদি। অন্তত এই ভাবে তাদের আমি অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলাম, তাই তারা উপভোগ করেছে। আসলে, শ্যুটিং-এর সেই তিন বছর খুব সুন্দর ছিল।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং সম্মানলাভ কীভাবে প্রভাবিত করেছে আপনাকে?
সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে আমি মানুষের ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করি। নিজের মনে জোর পাই, দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তবে এমন নয় যে, সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে। সমস্যা থাকবে এবং তা কাটিয়ে চলাই তো জীবন। যদি আমি কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাই, আমি তা উপেক্ষা করার চেষ্টা করি। আমি কেবল চলচ্চিত্র তৈরি করতে পছন্দ করি। ছোটো কিংবা বড়ো কোনও পার্থক্য নেই আমার কাছে।

‘ভিলেজ রকস্টারস”-এর সাফল্যের পর হঠাৎ করেই অনেক অফার এসেছিল। লোকেরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু মুম্বইতে আমার সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত জীবন আমাকে আমার শক্তি সংরক্ষণ করতে এবং ধীরে ধীরে ও স্থির ভাবে এগিয়ে যেতে শিখিয়েছে।
অবশ্য এমন নয় যে, আমার বড়ো স্বপ্ন নেই। কিন্তু আমি সেই বড়ো স্বপ্নের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই না। আমি শুধু এই পৃথিবীতে বেঁচে থেকে সুখী হতে চাই এবং আমার মানসিকতার সঙ্গে মেলে এমন মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চাই।

‘ভিলেজ রকস্টারস’-কে আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে কি আপনার কোনও কষ্ট হয়েছে?

আমি শুধু কঠোর পরিশ্রম করেছি। এমন নয় যে, আমি থেমে গিয়ে ভাবি ঠিক আছে, এটাই আমার কাজ, শুধু সিনেমা বানাব। এরপর আমি ভাবলাম কীভাবে OTT প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানো যায়, কীভাবে এটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করা যায়। আমি জানতাম যে, আমাকে আরও ব্যবহারিক এবং স্পষ্টবাদী হতে হবে।

আমি সবসময় এমন একটা সিনেমা তৈরি করার চেষ্টা করি, যা যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। সাফল্য কেবল পুরস্কার জেতা এবং চলচ্চিত্র উৎসবে যোগদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘ভিলেজ রকস্টারস” কিংবা “বুলবুল ক্যান সিং’ ছবিতে আমি যে বার্তা দিয়েছি, তা কেবল বুদ্ধিজীবীদের জন্য নয়।

আপনার সিনেমা বেশিরভাগই অসম এবং অসমিয়া সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে তৈরি। এই গল্পগুলিকে বিশ্বব্যাপী প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার তাৎপর্য কি আপনি ব্যাখ্যা করতে পারবেন?
ইন্টারনেট এবং আরও অনেক কিছুর কারণে এখন কিছু লোক আমাদের চিনতে শুরু করেছে, কিন্তু এখনও অনেক লোক আছে যারা আমাদের চেনে না। তাই, যারা অসমকে চেনেন না, অসমিয়া সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা নেই, আমি তাদের কাছে অসমের শিল্প, সংস্কৃতি, ভালো-মন্দ সবকিছু তুলে ধরতে চাই।

আমাদের প্রযোজনা সংস্থার নাম ‘ফ্লাইং রিভার্স ফিল্মস’। আমরা এই নামকরণ করেছি, কারণ আমাদের নদীগুলির অনেক গল্প রয়েছে আমাদের ছবিতে। আমার ইচ্ছে ছিল সেগুলো বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। উত্তর-পূর্বের অনেক গল্প আছে, অনেক সম্প্রদায় আছে। এটা একটা দীর্ঘ সফর। অনেক কিছু আছে। আমরা যদি আমাদের গল্প না বলি, তাহলে কে বলবে আমাদের গল্প? তাই, নিজেদের গল্প নিজেদেরই বলতে হবে।

চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বর্তমান পরিস্থিতি আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি কী পরিবর্তন দেখতে চান?

আমি মনে করি, এই শিল্পকে এখনও আরও বিশ্বজনীন করা দরকার। কেবল মহিলাদের জন্য নয়, অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের জন্যও। কারণ, নারীরা ক্ষমতায় আসীন, অন্তত তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছেন, যেখানে তারা যা খুশি করতে পারেন। তাই, আবহ প্রতিকূল থাকলে, সেই আবহকে অনুকূল করে নিতে হবে। এর জন্যও অনেক সাহসের প্রয়োজন। সমস্যা সবসময় থাকবেই, কিন্তু যারা সেগুলো ভাঙতে পারে, তারাই এগিয়ে যেতে পারে।

আর যখন তুমি কোনও উচ্চ পদে পৌঁছাবে, তখন তোমাকে অন্যান্য মহিলাদের জন্যও আরও জায়গা তৈরি করতে হবে এবং তাদের এমন পরিবেশ প্রদান করতে হবে, যেখানে তারা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারবে। তাদের সেই ধরনের আরাম এবং নিরাপদ স্থান দেওয়া, একে অপরকে উৎসাহিত করা, একে অপরকে সমর্থন করা, এটাই আমরা করতে পারি। কারণ, এটা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

উদীয়মান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের, বিশেষকরে যারা প্রান্তিক অঞ্চলের, তাদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন?

কিছু একটা করো। তোমার মোবাইল থেকে হোক কিংবা এসএলআর দিয়ে। যদি তুমি মনে করো যে, এতে ঝুঁকি আছে এবং অনেক কিছুই চ্যালেঞ্জিং, তাহলে যতটা সম্ভব স্থানীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে, কম বাজেটে, যে-কোনও উপায়ে একটি ছবি তৈরি করা ভালো হবে। ধীরে ধীরে, তুমি বুঝতে শুরু করবে।

মাঝেমধ্যে আমি ৩০ সেকেন্ডের ডিসপ্লে দেখি এবং তার মধ্যে কয়েকটি অসাধারণ। অনেকে হয়তো বলেন যে, এর ফলে মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং সিনেমা শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের সকলেরই এসব করার স্বাধীনতা আছে। আমি নিজেও এসব দেখে শিখেছি।
একবার যখন তুমি জানতে পারবে এবং বুঝিয়ে দেবে যে, তুমি কে এবং তুমি কী চাও, সে তোমার পথটি বাণিজ্যিক হোক কিংবা না-হোক, তখন তোমার সমস্যা কাটিয়ে সাফল্য পাওয়া সহজ হয়ে উঠবে।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...