কোনেরু হাম্পি তাঁর কাঁধে রাখা ডোরাকাটা ধূসর রঙের জ্যাকেটটি নামিয়ে রাখলেন। তারপর তাঁর সামনে ক্রিম রঙের দাবার গুটিগুলো সাবধানে সাজিয়ে নিলেন। তাঁর প্রতিপক্ষ, মহারাষ্ট্রের ১৯ বছর বয়সি প্রতিভাবান দিব্যা দেশমুখ, তাঁর সুইভেল চেয়ারে মৃদু দুলতে দুলতে কোনেরু-র জন্য অপেক্ষা করছিলেন। দিব্যা টাইমার সেট করার জন্য এগিয়ে গেলেন। দুই প্লেয়ার করমর্দন করলেন।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন মহিলা বিশ্বকাপ-এর আয়োজন করেছিল জর্জিয়ায়। প্রথমবারের মতো, দুই ভারতীয় খেলোয়াড় ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিন দিন ধরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলার পর, হাম্পি এবং দিব্যা শেষবারের মতো মুখোমুখি হয়েছিলেন।
খেলা শুরু হল৷ হাম্পি কুইন্স গ্যাম্বিট খেলেন। তিনি কুইনের সামনে প্যানটি এগিয়ে নিয়ে যান, এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যা বোর্ডের কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ অর্জনের চেষ্টা করেছিল। দিব্যা তাকে প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে হারিয়ে দেন। ভারতের প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি বয়সি মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার ভারতের নবীনতম এবং কনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টারের বিরুদ্ধে বিগত ম্যাচে ভুল করেছিলেন।
দুই মাস পর, বিজয়ওয়াড়ায় তাঁর বাড়িতে বসে হাম্পি সেই পরাজয়ের কথা স্মরণ করেন। তিনি একটি সাধারণ পোশাক এবং একটি ছোটো টিপ পরেছিলেন। তাঁর পিছনে একটা হালকা পর্দা উড়ছিল। ‘এটা অবশ্যই একটা কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং ম্যাচ ছিল’, হাম্পি জানালেন। ‘এই স্তরে টিকে থাকতে হলে তরুণদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। কারণ তাদের মধ্যে প্রচুর মেধাশক্তি আছে, তারা আমাদের প্রজন্মের তুলনায় আরও ভালো ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে খেলে এবং ভালো ভাবে প্রশিক্ষিত’, এও জানালেন হাম্পি।
অভিজ্ঞতার প্রতিফলন
হাম্পির প্রতিটি বাক্যে তিন দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতার অনুরণন শোনা যায়। তিনি ১৯৯৩ সালে প্রতিযোগিতামূলক দাবা খেলা শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৬ বছর। তিন বছর পর, তিনি তাঁর প্রথম জাতীয় খেতাব জিতেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি নিজেকে খেলার সেরা খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০০২ সালে, তাঁর ১৫তম জন্মদিনের মাত্র এক মাস পরে, হাম্পি ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার হন, সেই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সি গ্র্যান্ডমাস্টার। ২০০৩ সালে, তিনি দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান অর্জুন পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০০৭ সালে, তিনি দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ অসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মশ্রী’-তে ভূষিত হন। ‘আমি তখন শীর্ষে ছিলাম, কিন্তু অহংকারকে আমার মস্তিষ্কে স্থান দিইনি।’ মুচকি হেসে জানালেন কোনেরু।
২০১৪ সালে, দাসারি অন্বেষকে বিয়ে করেন হাম্পি। দাসারি একজন ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন শিল্পপতির ছেলে। দুই বছর পর, গর্ভাবস্থার কঠিন সময়ে, হাম্পি দাবা বোর্ড থেকে বিরতি নেন।
কিন্তু হাম্পির এই সাময়িক বিরতি তাঁর কেরিয়ারের সমাপ্তির গল্প ছিল না। বরং বলা যায়, এটি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ ধৈর্যের গল্প। ২০১৮ সালে দাবায় ফিরে আসার পর থেকে, তিনি অনেক উল্লেখযোগ্য পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু কষ্টার্জিত জয়ও উদ্যাপন করেছেন। এমনও একটা সময় ছিল, যখন তিনি প্রায় দাবা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
“আমি দাবা খেলা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম, কারণ আমি যদি প্রতিযোগিতায় সফল না হই, তাহলে দাবা খেলে কী হবে! আর যদি আমি খেলি, তাহলে আমাকে কিছু অর্জন করতে হবে, আমাকে কারও জন্য অনুপ্রেরণা হতে হবে’, জানালেন হাম্পি।
যদিও মা হওয়ার ফলে হাম্পির অগ্রাধিকার আরও বিস্তৃত হয়েছে, তবুও খেলাধুলার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তিনি এখন তাঁর কেরিয়ারের দ্বিতীয় পর্যায়ে এবং অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন
হাম্পি বছরের পর বছর ধরে চিত্তাকর্ষক জয়লাভ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে মহিলাদের র্যাপিড দাবা খেলায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়া, যা এই খেলার একটি স্পিডি ফরম্যাট। তিনি এই খেতাব দুবার জিতেছেন, ২০১৯ এবং 2024 সালে। তিনিই একমাত্র মহিলা, যিনি দুবার এই খেতাব জিতেছেন। ২০০৮ সাল থেকে, হাম্পির র্যাংকিং কখনও টপ ফাইভ-এর নীচে নেমে যায়নি৷
অনেক মিডিয়া হাম্পির ‘কাম-ব্যাক’ নিয়ে নিউজ করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত করেছেন, কিন্তু কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর লড়াইকে সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়নি।
‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, সন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব এবং মানসিক চাপ, মা-কেই নিতে হয় এবং খেলার জগতে এর কুপ্রভাব পড়ে’, জানালেন কোনেরু।
সাংবাদিক জেনিয়া ডি’কুনহা ইএসপিএন-এর এক নিবন্ধে লিখেছেন— ‘দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও সংসারে তিনি সেই সমস্ত চাপ নেওয়া একজন মা! আর সেই চাপ সামলে ফিল্ড-এ সাফল্য জারি রাখতে গেলে, প্রচণ্ড লড়াইয়ের মনোভাব প্রয়োজন।”
খেলায় ফিরে আসার প্রসঙ্গে হাম্পি জানিয়েছেন, ‘আমি আমার শক্তি বুঝতে পেরেছিলাম, কোথায় চাপ দিতে হবে এবং কোথায় আটকে রাখতে হবে তা আমি খুব ভালো ভাবে জানতাম। আসলে, খেলা থেকে বিরতি দাবাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে সাহায্য করেছে আমাকে। আমি সম্পূর্ণ অ্যাক্টিভ ছিলাম, আমার মনকে তৈরি রেখেছিলাম এর জন্য।”
কঠোর পরিশ্রম-ই সাফল্যের রসদ
হাম্পির বাবা অশোক সবসময় চাইতেন তাঁর মেয়ে ভালো ভাবে খেলাধুলা করুক। হাম্পি তাঁর বাবার কাছ থেকে টেনিস এবং দাবা শিখেছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক সাক্ষাৎকারে হাম্পির বিষয়ে জানানো হয়েছে যে, নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে যখন হাম্পি বড়ো হচ্ছিলেন, তখন ভেনাস এবং সেরেনা উইলিয়ামস নামের দুই বোন টেনিস-এ বিশ্বব্যাপী খ্যাতির শীর্ষে ছিলেন। হাম্পির বাবা অশোকও এমনই সাফল্য চেয়েছিলেন হাম্পির কাছে।
‘এই কারণেই আমি চেয়েছিলাম হাম্পি টেনিস খেলুক, – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন হাম্পির বাবা অশোক৷ ‘কিন্তু, হাম্পিকে যখন আমি টেনিস শেখাচ্ছিলাম, তখন হাম্পি দাবার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তারপর আমি আমার বাবাকে হারাতে বলি, যিনি ক্লাব স্তরের দাবা খেলোয়াড় ছিলেন এবং মাত্র ৮ বছর বয়সে হাম্পি আমার বাবাকে পরাজিত করে দাবা খেলে। এরপর থেকে হাম্পির বিপরীতে আমি দাবা খেলতে শুরু করি। আমি টুর্নামেন্ট স্তরের খেলোয়াড় ছিলাম দাবায়৷ যাইহোক, ১১ বছর বয়সে হাম্পি আমাকেও হারাতে সক্ষম হয়েছিল।’, জানিয়েছেন হাম্পির বাবা অশোক।
(ক্রমশ…)
—- ভাব্যা ডোৱে





