প্রবল আত্মবিশ্বাস
‘১৯৯৯ সালে অনূর্ধ্ব-১২ ছেলেদের এশিয়ান টুর্নামেন্টে হাম্পি ছিলেন একমাত্র মেয়ে, যেটি তিনি জিতেছিলেন। পরের বছর তিনি অনূর্ধ্ব-১৪ ছেলেদের টুর্নামেন্ট জিতেছিলেন, ‘ লিখেছেন সুজন।
এইসব সাফল্য হাম্পির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সময়, তাঁর মনে হয়েছিল, কোর্টে তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সক্ষম মহিলা প্রতিযোগী খুব কমই আছেন।
“মহিলাদের প্রতিযোগিতায় জয়ের চেয়ে পুরুষদের বিরুদ্ধে জয়ের ব্যাপারে আমি বেশি আত্মবিশ্বাস বোধ করেছি। আমি এটা করতে পেরে আরও খুশি হয়েছিলাম, কারণ আমি অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলছিলাম।’, জানিয়েছেন হাম্পি।
হাম্পির ফোকাস সঠিক ছিল। তিনি কখনও দাবা ছাড়া অন্য কোনও কেরিয়ারের কথা ভাবেননি। এর জন্য অবশ্য তিনি এডুকেশন কমপ্লিট করতে পারেননি এবং স্বাভাবিক শৈশব উপভোগ করতে পারেননি। কিন্তু এর জন্য তাঁর কোনও অনুশোচনা নেই। ‘যদি আমি সফল না হতাম, তাহলে আমারও হয়তো অনুশোচনা হতো। কিন্তু যেহেতু আমি সাফল্য পেয়েছি এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেছি, তাই আমি কখনও এমনটা অনুভব করিনি’, জানিয়েছেন আত্মবিশ্বাসী হাম্পি।
লিঙ্গ বৈষম্য হাম্পির উত্থানকে কিছুটা ধীর করে দিয়েছিল। ২০০২ সালে ভারতের প্রথম মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর, তিনি এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন, যাকে তিনি দুঃস্বপ্ন বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি স্মরণ করেন যে, পুরুষ খেলোয়াড়রা তাঁর সমালোচনা করেছিলেন এবং তাঁর দক্ষতা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৫। ‘এরপর, আমি কিছু প্রতিযোগিতায় সফল হইনি’, আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন হাম্পি।
২০০৩ সালে, হাম্পি নাগপুরে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় প্রতিযোগিতায় যোগ্যতা অর্জন বিভাগে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। যদিও তিনি স্বয়ংক্রিয় ভাবে উচ্চতর বিভাগে প্রবেশ করতে পারতেন। তিনি তাঁর সমালোচকদের চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বলা হয় যে, তিনি প্রায় ৩০০ জন পুরুষ ক্রীড়াবিদের একটি দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি স্মরণ করেন, শেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলির মধ্যে একটির সময়, দর্শকদের বিশাল ভিড় হয়েছিল। হাম্পির প্রতিপক্ষ ম্যাচটি ড্র করার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তিনি অনড় ছিলেন। তিনি এই ম্যাচটি জিততে চেয়েছিলেন।
‘পরে আমি খুব খারাপ অবস্থানে ছিলাম, যেখানে সেই প্রতিপক্ষ আমাকে হারাতে পারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, আমি কোনও ভাবে ম্যাচটি জিততে পেরেছি।”, জানিয়েছেন হাম্পি। সেই টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। ‘আমার মনে হয়, তারপর থেকে আমি কোনও সমালোচনার মুখোমুখি হইনি’, হেসে উঠে জানিয়েছেন তিনি।
একাধিক চ্যালেঞ্জ
অন্যান্য চ্যালেঞ্জও ছিল, যেমন স্পনসরের অভাব। প্রাথমিক ভাবে একটি ব্যাংক প্রায় ছয়-সাত বছর ধরে স্পনসর করেছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়, ঠিক যখন ২০০২ সালে তিনি গ্র্যান্ডমাস্টার হন।
‘তারা আমার জায়গায় একজন ক্রিকেটারকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে নিয়োগ করেছিল। তাই সেই বছরগুলিতে কোনও স্পনসরশিপ ছিল না।’, দুঃখ করে জানিয়েছেন হাম্পি।
হাম্পির বাবা অশোক ক্রমাগত কর্পোরেটদের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখতেন, কিন্তু বিনিময়ে তিনি কেবল নীরবতাই পেয়েছিলেন। এক সংবাদ প্রতিবেদনে জানিয়েছেন অশোক।
২০০৬ সালে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কর্পোরেশন-এ (ONGC) একজন প্রশাসক হিসেবে চাকরি পান হাম্পি। প্রতিযোগিতার জন্য তিনি ভ্রমণের অনুমতি পেয়েছেন একাধিকবার এবং কর্তৃপক্ষ তাঁকে হাসিমুখে সেই অনুমতি দিয়েছেন বারবার।
এদিকে, হাম্পি কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যান। ২০০৭ সালের অক্টোবরে, তিনি ELO রেটিং সিস্টেমে ২,৬০৬-এ পৌঁছান, যা একজন দাবা খেলোয়াড়ের শক্তি পরিমাপ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁদের পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে। হাম্পির আগে, মাত্র একজন মহিলা ২,৬০০-এর গণ্ডি অতিক্রম করেছিলেন। একই বছর দ্রোণাচার্য পুরস্কার পেয়েছিলেন হাম্পির বাবা অশোক, যা অসাধারণ ক্রীড়া কোচদের স্বীকৃতি দেয়। ২০০৯ সালে, হাম্পি তাঁর কেরিয়ারের সর্বোচ্চ ELO রেটিং ২,৬২৩ অর্জন করেন।
২০০৯ সালে হাম্পি মহিলাদের গ্র্যান্ড প্রিক্স জিতেছিলেন। এটি আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন দ্বারা আয়োজিত টুর্নামেন্টের একটি সিরিজ। কোনেরু হাম্পি ভারতীয় মহিলাদের দাবার সেই সাফল্য অর্জন করেছেন, যা সানিয়া মির্জা ভারতীয় মহিলাদের টেনিসের জন্য করেছেন এবং সাইনা নেহওয়াল ভারতীয় মহিলাদের ব্যাডমিন্টনের জন্য করেছেন।
নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনে হাম্পির প্রশংসা করে বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর যোগ্যতার মান আরও উঁচুতে তুলে ধরছেন।
২০১৪ সালে, তাঁর বিয়ের ঠিক পরেই, হাম্পি তাঁর হনিমুন বাতিল করে, শারজায় মহিলাদের গ্র্যান্ড প্রিক্সে খেলার জন্য সফর করেছিলেন।
হাম্পি হয়তো টেনিস খেলেন না, কিন্তু সানিয়া মির্জা এবং সেরেনা উইলিয়ামসের সঙ্গে তাঁর একটা মিল আছে, আর এই মিল হল— মাতৃত্বের পর তিনজনই অসাধারণ কাম-ব্যাক করেছিলেন।
(ক্রমশ…)
—- ভাব্যা ডোৱে





