খেলার জগৎ এবং পরিবার
দাবা খেলায় অন্যান্য খেলার মতো খেলোয়াড়দের উপর এত শারীরিক চাপ পড়ে না। তবে, যে-কোনও পেশার মতো, বিরতি একজন খেলোয়াড়ের প্রতিযোগিতামূলক প্রবণতাকে ম্লান করে দিতে পারে। অতএব, সবাই দ্রুত এবং নিজের ইচ্ছায় ফিরে আসতে পারে না। গর্ভাবস্থায় হাম্পি দাবা থেকে বিরতি নিয়েছিলেন। তিনি প্রসবপূর্ব জটিলতায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসকেরা তাঁকে বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
‘আমি দাবা খেলা দেখতেও খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না একসময়। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে আরাম করে সময় কাটাতে চেয়েছিলাম। এই নিয়ে আমার কোনও আপশোস নেই। আমি সেই সময়টিকে খুব আনন্দের সময় হিসেবে উপভোগ করেছি।’, জানিয়েছেন হাম্পি।
যদিও হাম্পির জন্য এটা সাময়িক বিরতি ছিল, খেলা থেকে বড়ো কোনও বিরতি ছিল না। তিনি জানতেন, তিনি ফিরবেন, শুধু সময়ের অপেক্ষা ছিল। ২০১৭ সালে তাঁর মেয়ে অহনার জন্মের পরপরই আমন্ত্রণ আসতে শুরু করে, কিন্তু হাম্পি প্রস্তুত ছিলেন না।
২০১৮ সালে, যখন তাঁর মেয়ের বয়স প্রায় ১ বছর, তিনি খেলাধুলায় ফিরে আসার জন্য সদর্থক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ‘এটা সবই পারস্পরিক সহায়তার উপর নির্ভর করে। আমি খুব খুশি যে, আমার বাবা-মা আমার সঙ্গে একই শহরে থাকেন। আমার স্বামীও খুব সহায়ক। সেই সহায়তা ছাড়া সন্তানকে ছেড়ে কোনও পেশায় ফিরে আসা কঠিন। কারণ, একজন মা হিসেবে, আমার কাছে আমার সন্তানের নিরাপত্তা এবং সাচ্ছন্দ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
হাম্পির মা লতা হয়তো কখনও দাবা খেলেননি, কিন্তু তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, তাঁর মেয়ের কাছে এই খেলাটির গুরুত্ব কতটা।
‘আমার মা সবসময় আমার কেরিয়ার-কে গুরুত্ব দেন এবং আমাকে উৎসাহিত করেন।’ স্পোর্টস ম্যাগাজিন স্পোর্ট স্টারকে হাম্পি জানিয়েছেন, ‘আমি এখন আমার খেলাধুলার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে পারি। কিন্তু বিয়ের পর আমাকে রান্না এবং অন্যান্য গৃহস্থালির কাজে অনেক সময় ব্যয় করতে হতো। তাই, আমার মা আমাকে মনে করিয়ে দিতেন যে, এই সবকিছু আমার অনুশীলনের ক্ষতি করতে পারে।’
একটি টুর্নামেন্টের জন্য প্রায়ই ১৫ থেকে ২০ দিনের সফরের প্রয়োজন হয়। হাম্পি যখন সফর করতেন, তখন হাম্পির মেয়ে অহনার দেখাশোনা করতেন তাঁর বাবা-মা। প্রথমদিকে মেয়েকে ছেড়ে থাকা কঠিন ছিল। যখন হাম্পি ফিরে আসতেন, অহনা কয়েকদিন ধরে তাঁর কোল ছাড়ত না। কিন্তু এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে বিষয়টা। এখন ভিডিও কল-এর মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
হাম্পি তাঁর কাম-ব্যাক-এর সময় ২০১৮ সালের দাবা অলিম্পিয়াডকে বেছে নিয়েছিলেন, যা ছিল আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন কর্তৃক আয়োজিত দ্বিবার্ষিক দলগত প্ৰতিযোগিতা। এই সিদ্ধান্তটি তাঁর কাছে সঠিক মনে হয়েছিল, কারণ তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। প্রতিযোগিতামূলক সাফল্য ফিরে পেতে তারা প্রতিযোগিতার এক মাস আগে থেকে প্রশিক্ষণ শুরু করে, কিন্তু দলের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ভারত সামগ্রিক ভাবে ৮ম স্থান অর্জন করেছিল।
সেই বছরের নভেম্বরে আরও একটি টুর্নামেন্ট-এ, হাম্পি দ্বিতীয় রাউন্ডে বাদ পড়েন। ফলাফল চিত্তাকর্ষক ছিল না। কিন্তু ২০১৯ সালে হাম্পি তাঁর ফর্ম ফিরে পেতে শুরু করেন। সেপ্টেম্বর-এ, তিনি রাশিয়ার স্কলকোভোতে ‘উইমেন গ্র্যান্ড প্রিক্স’ জিতেছিলেন। কয়েক মাস পরে, তিনি মোনাকোতে পরবর্তী গ্র্যান্ড প্রিক্স ইভেন্ট-এ রৌপ্য পদক জিতেছিলেন। এই প্রতিযোগিতায় জয়ী খেলোয়াড়রা উচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ পান।
বছরের শেষে, হাম্পি তার কেরিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেন। তিনি প্রথমবারের মতো মহিলা বিশ্ব র্যাপিড দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন। জয়লাভ অব্যাহত ছিল। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, হাম্পি কেয়ার্নস কাপ জিতেছিলেন, যা বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক মহিলাদের দাবা টুর্নামেন্টগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়।
মাতৃত্ব হাম্পিকে কেবল একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিই দেয়নি, বরং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও শক্তিশালী করেছে। ‘আগে, যখন আমি অন্য টাইম জোনে যেতাম, তখন আমার ঘুম ভালো হতো না, যা তাৎক্ষণিক ভাবে আমার খেলায় প্রভাব ফেলত। কিন্তু মা হওয়ার পর, আমি এই বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’
হাম্পির মেধা তাঁকে খেলার জগতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। গত পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী দাবার জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
(ক্রমশ…)





