সন্ধেবেলায় শুভংকর বাড়ি ফেরার পরেই রিমা এসে কোয়ার্টারের চাবি চিত্রাকে ধরিয়ে গেল। চুপচাপ স্বামী-স্ত্রী জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেল৷

আবার সেই কাজের লোকের সমস্যা। চিত্রা মুষড়ে পড়ল, তবুও প্রতিজ্ঞা করল, এবার আর কোনওরকম তাড়াহুড়ো করবে না। দেখেশুনে তবেই বাড়িতে কাজের লোক ঢোকাবে। সিকিউরিটি গার্ডকেও ফোন করে একটু চেনাশোনা লোকের খোঁজ করতে অনুরোধ করল।

রবিবার শুভংকরের অফিস ছুটি, ফলে উঠতে একটু দেরিই হয়েছে। মুখ ধুয়ে চা বানিয়ে চিত্রা শোওয়ার ঘরে ঢোকে। শুভংকর তখনও বিছানা ছাড়েনি। বেডসাইড টেবিলে চায়ের ট্রে-টা নামিয়ে বিছানায় গুছিয়ে বসে চিত্রা। কাপটা এগিয়ে দেয় শুভংকরের দিকে। এই একটা দিনই শুভংকরের সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটাতে পারে চিত্রা। নয়তো রোজই তো সকালে উঠেই অফিস যাওয়ার তাড়া। আর প্রাইভেট চাকরিতে ফেরার কোনও ঠিক নেই।

সবে গল্প করতে করতে চায়ের কাপটা শেষ করেছে, এমন সময় কলিং বেলটা কারও আসার বার্তা জানায়। এই সময় কে রে বাবা! অজান্তেই ঘড়ির দিকে চোখটা চলে যায় চিত্রার। সবে আটটা বাজছে।

বিরক্ত হয়েই বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে পা বাড়ায় ও। হয়তো সিকিউরিটি গার্ড কাউকে পাঠিয়েছে সকাল সকাল, ভেবে খানিকটা স্বস্তি অনুভব করে চিত্রা।

দরজা খুলতেই দ্যাখে সামনে দাঁড়িয়ে পঁয়ষট্টি-সত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ দম্পতি। সঙ্গে রয়েছে ছোটোখাটো চেহারার কুড়ি-একুশ বছরের যুবতি।

চিত্রাকে দেখেই বৃদ্ধটি হাতজোড় করে বলে, ‘ম্যাডাম, আমি রিটায়ার্ড সরকারি চাপরাশি। বহুদিন ধরে কৈলাশ কলোনিতে একটি ফ্যামিলির সঙ্গে রয়েছি। আমার বউ আগে ওখানে কাজ করত। কিন্তু এখন বয়স হয়ে যাওয়াতে আমার এই নাতনি ওদের সব কাজ করে।” –আচ্ছা এটি আপনার নাতনি? চিত্রা প্রশ্ন করে।

—হ্যাঁ ম্যাডাম। আমরা ওই সাহেবের বাড়ির সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে এতদিন ধরে রয়েছি। এই মাসে ওই সাহেব দিল্লির বাইরে বদলি হয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং আমাদেরও কোয়ার্টার ছাড়তে হবে। শহরে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকার ক্ষমতা নেই আমাদের। আমার পেনশনে সংসারটা চলে কোনওরকমে। তাই এখানে কোয়ার্টার পাওয়া যাবে শুনেই আমি এসেছি।

—আপনাদের ছেলে, ছেলের বউ কোথায় থাকে? নাতনি তো দেখছি আপনাদের সঙ্গেই থাকে।

—ম্যাডাম, আমাদের ভাগ্যের কথা আর বলবেন না। মেয়েটির জন্মের সময়ই ওর মা মারা যায়। কয়েক বছর বাদেই মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে আমার ছেলে… বলতে বলতে বৃদ্ধের গলা ধরে আসে।

—আপনাদের নাম কী, চিত্রা জানতে চায়।

—আমার নাম রতন আর আমার স্ত্রী সারদা। নাতনির নাম ওর বাবাই রেখেছিল রেশমি।

—একটু দাঁড়ান, আমি আসছি, বলে চিত্রা শোওয়ার ঘরে এসে ঢোকে। শুভংকর ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে। শুভংকরকে রতনের সম্পর্কে সব বলে চিত্রা। দু’জনেরই মনে হয় ওদের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে রাখলে কোনওরকম অসুবিধায় পড়তে হবে না। বৃদ্ধের কথায় চিত্রা বুঝে গিয়েছিল, রেশমিই ওর কাছে কাজ করবে। সুতরাং বাইরে এসে চিত্রা ওদের জানিয়ে দেয়, ওদের কাজে বহাল করতে ও রাজি।

সন্ধের আগেই রতন, স্ত্রী এবং নাতনিকে নিয়ে চিত্রার কাছে হাজির হল। চিত্রা কোয়ার্টারের দরজা খুলে দিয়ে ওদের সবকিছু বুঝিয়ে দিল। চিত্রার মনেও সামান্য আশার সঞ্চার হল। চিত্রা ভাবল, এবার নিশ্চয়ই ওর কাজের লোক আর কোনও সমস্যা তৈরি করবে না।

পরেরদিন দরজা খুলতেই সকালে, চিত্রা দেখে রতন আর সারদা দরজায় দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করতেই রতন জানায়, ‘ম্যাডাম, রেশমির জ্বর এসেছে। ওর বদলে আমরা দু’জন মিলে কয়েকদিন আপনার কাজ করে দেব।”

বয়স্ক মানুষকে দিয়ে কাজ করাতে চিত্রার খুবই খারাপ লাগছিল, কিন্তু ওর কাছে কোনও উপায়ও ছিল না। ওদের কাজটাও ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না চিত্রার।

দু’সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও যখন রেশমি কাজ করতে এল না, চিত্রার সন্দেহ হতে লাগল। ওরা মিথ্যা কথা বলে কোয়ার্টার পাওয়ার লোভে এখানে ঢোকেনি তো? মেয়েটা হয়তো অন্য কোনও বাড়ির কাজ ধরেছে।

এইভাবে তো চলতে পারে না, এই ভেবে চিত্রা ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে কোয়ার্টারের দরজায় কড়া নাড়ল। রতন আর সারদা তখন চিত্রার ফ্ল্যাটে কাজ করছিল। দরজার কড়া নাড়তেই রেশমি এসে দরজা খুলে দিল। চিত্রার ওকে দেখে এতটুকুও অসুস্থ বলে মনে হল না।

—তুমি তো দেখছি দিব্যি সুস্থ আছো, তাহলে কাজে আসছ না কেন? চিত্রা জানতে চাইল।

—না মানে… আমার… আমি একটু…, রেশমি তোতলাতে থাকে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...