চিত্রা কথা না বাড়িয়ে নিজের ফ্ল্যাটে এসে দরজা বন্ধ করতে যাবে, চোখে পড়ল

তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের একটি লোক রতনদের কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে গেল চিত্রা। ওদের কাছে কোনও আত্মীয়স্বজনের কথা চিত্রা তো কিছু শোনেনি। তাহলে পুরুষটি কে হতে পারে? চোরের মতোন লুকিয়ে পড়ারই বা কী দরকার বুঝে পেল না চিত্রা। কিন্তু চিত্রা মনে মনে স্থির করে নিল, এই রহস্যের অনুসন্ধান ওকে করতেই হবে।

লক্ষ্য রাখা শুরু করল চিত্রা। রতন আর সারদা কাজ করতে সকালেই এসে যেত। ওরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই চিত্রা খেয়াল করত, প্রত্যেকদিনই আলাদা আলাদা পুরুষমানুষ কোয়ার্টারে আসছে। চিত্রা, কয়েকদিন পর পর নতুন নতুন পুরুষকে কোয়ার্টারে আসতে দেখে ভয় পেয়ে গেল, ওখানে এরা দেহব্যাবসা ফেঁদে বসেনি তো? শুভংকরকে জানানোটা সবথেকে আগে দরকার।

একদিন বাড়ি ফিরে আসার পর চিত্রা শুভংকরকে সবকিছু খুলে বলল। শুভংকর সব শুনে প্রচণ্ড রেগে গেল, ‘প্রথম দিনই তোমার আমাকে সব খুলে বলা উচিত ছিল। এতগুলো দিন হয়ে গেল। কিন্তু দোষ চাপালেই তো হবে না! হাতেনাতে ওদের ধরতে হবে। তুমি একটু চোখ কান খোলা রেখো। হতে পারে এটা একটা র‍্যাকেট।’

পরেরদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে শুভংকর বাড়িতেই থেকে গেল। রোজের মতোই রতন আর সারদা এসে কাজে লেগে পড়ল। চিত্রা আগেই নিজেকে তৈরি রেখেছিল। ওদের কাজের মাঝেই চিত্রা জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার রতনদা? আপনার নাতনির অসুখ এতদিনেও ঠিক হল না? আপনারা আমাকে গাধা ভেবেছেন? আজ আমি সত্যিটা না জেনে ছাড়ছি না।’

কথার মাঝেই শুভংকরও এসে দাঁড়াল চিত্রার পাশে, ‘হ্যাঁ, রতনদা আজকে উত্তর তো তোমাকে দিতেই হবে। আর একবার আমার সঙ্গে তোমাদের কোয়ার্টারে চলো। আমি একটা ছোটো আলমারি ওখানে রাখব। জায়গাটা তাই একটু দেখে নিতে চাই।’

—কিন্তু সাহেব এখুনি! রতনের কিন্তু কিন্তু ভাব দেখে শুভংকর ধমক দিয়ে উঠল জোরে।

শান্ত স্বভাবের শুভংকরের অগ্নিমূর্তি দেখে রতন ভয় পেয়ে গেল। সারদা ভয়ে রতনের হাত জড়িয়ে ধরল, ‘তুমি এনাদের সব কথা বলে দাও। এভাবে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’

ততক্ষণে রতন নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে। ও বলতে শুরু করে, ‘সাহেব, আমরা মিথ্যা বলেছিলাম। রেশমির বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের জামাই খুব বাজে লোক। সবসময় মদ খেয়ে থাকে। যখন বিয়ে হয়, জামাইয়ের একটা ছোটো চায়ের দোকান ছিল। বিয়ের পর আমাদের মেয়ের যে-কটা গয়না ছিল, সব বিক্রি করে দিল। যখন দোকানটাও বিক্রি করে দিল, তখন রেশমিকে দিয়ে খারাপ খারাপ কাজ করাত। আমরা মেয়েটাকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে আসি। কিন্তু সেখানেও সে আমাদের পিছু ছাড়ল না। ওখানেও লোক পাঠাত জামাই। আপনাদের এখানে কোয়ার্টার পেতেই একরকম লুকিয়েই এখানে পালিয়ে আসি। কিন্তু এখানকার ঠিকানাও ও কী করে জোগাড় করল জানি না। এখানেও লোক পাঠানো…’, চোখের জল আর ধরে রাখতে পারে না রতন।

—পুলিশে জানাওনি কেন, শুভংকর প্রশ্ন করে।

—ও শাসিয়ে গিয়েছিল, পুলিশে জানালে আমাদের মেয়েটাকে মেরে দেবে, ভীত রতন স্বীকার করে।

—ভাবা যায়, মাত্র একটা লোক এতগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে খারাপ কাজ করাতে বাধ্য করছে!

—সাহেব, রেশমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। আমরা ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। ওই জানোয়ারটা আমাদের জীবন নরক করে তুলেছে, করুণ শোনায় রতনের স্বর।

মুহূর্ত দেরি না করে, সারদা আর রতনকে সঙ্গে নিয়ে শুভংকর পুলিশের কাছে রিপোর্ট লিখিয়ে আসে। পরেরদিনই রেশমির স্বামীর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার খবর আসে। খবরটা শুনেই রতনের পরিবারের মুখে হাসি ফোটে। শুভংকর আর চিত্রা দু’জনেই অনুভব করে, লজ্জার জীবন পিছনে ফেলে আজ এই গরিব পরিবারটি রৌদ্রোজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে রয়েছে।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...