মাত্র মাস ছয়েক হল রায়বাবু কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেছেন। কিন্তু মনে যার অশান্তি, তার জীবনে সুখ কোথায়? জীবন থেকে যতই একটা একটা করে দিন মুছে যাচ্ছে, তিনি ততই ঝিমিয়ে পড়ছেন। বিষণ্ণতায় সমস্ত মন-প্রাণ তার শিথিল হয়ে যাচ্ছে। তিনি কাউকে বলতে পারেন না নিজের মনের কথা। এই বয়সে হাট-বাজার এবং দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় কাজ, ইচ্ছে না থাকলেও তাকেই মুখ বুজে করে যেতে হয়। এছাড়া তার কাছে দ্বিতীয় কোনও বিকল্প নেই। কারণ তিনি অপুত্রক।
জীবনের এতখানি ধাপ পেরিয়ে এসে এখন অপুত্রক হওয়ার ব্যথাটা ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। মনের অতল গভীরে ব্যথাটা এতদিন চাপা থাকলেও, অনুভূত হয়নি। কিন্তু এখন বার্ধক্যে উপনীত হয়ে প্রায়ই মনে হয় তিন তিনটি কন্যা সন্তানের পরিবর্তে একটি যদি পুত্র সন্তান থাকত, তাহলে সংসারের হালটা সে শক্ত হাতে ধরতে পারত। তার অবর্তমানে সংসারটি যে একেবারে তলিয়ে যাবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত রায়বাবু। পিছনে দাঁড়াবার যে কেউ নেই।
আজীবন টানের অসুখে তিনি পর্যুদস্ত। ইদানীং বয়সের কারণে একেবারেই বেহাল। বাড়িতে থাকলে সর্বদা ধ্যান-গম্ভীর ভাবে বসে ঝিমোন। মনের মধ্যে একটা অব্যক্ত আতঙ্ক ছেয়ে থাকে সব সময়। সব কিছুতেই কেমন যেন একটা ছাড়া ছাড়া ভাব। শরীরটা শুকিয়ে গিয়েছে, চোখের নীচে কালো দাগ বসে গিয়েছে। অথচ মুখ ফুটে কারও কাছে তিনি প্রকাশ করতে পারেন না মনের দুঃখ। তিনি যেন জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া এক বিধ্বস্ত সৈনিক। রুখে দাঁড়াবার ক্ষমতা থেকে সে চিরবঞ্চিত। এখন শুধু কোনওমতে জীবনধারণটাই তার একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কি অবসর নেওয়ার পরে বার্ধক্যজনিত একাকীত্বের ফল, নাকি সামান্য পেনশনের টাকায় পঙ্গু স্ত্রী, বিকৃতমস্তিষ্ক অসুস্থ কন্যা এবং জড়বৎ বৃদ্ধা শাশুড়ি মায়ের ভরণ-পোষণের আকাশকুসুম চিন্তা? যদিও স্ত্রী সরমা কিন্তু কর্তব্যপালনে কোনওপ্রকার ত্রুটি করেন না।
ভাঙা পা নিয়ে চলতে কষ্ট হলেও, বাইরে থেকে ঘুরে এলে নিজে থেকেই এক গেলাস জল নিয়ে এসে সামনে দাঁড়ান। দুটো সাংসারিক কথা বলার ইচ্ছে থাকলেও, স্বামীর নীরবতার কারণে পিছিয়ে যেতে হয়। আড়চোখে তাকিয়ে কেবল অনুমানে বোঝার চেষ্টা করেন তার মনোভাব। যথাসাধ্য তিনি স্বামীকে আগলে রাখার চেষ্টা করেন, যেন কোনও কিছুতে তিনি ভেঙে না পড়েন। সেইদিকে থাকে তার প্রখর দৃষ্টি। স্বামীর বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত কোনও অভিযোগ নেই। প্রতিনিয়ত তিনি মনে করেন, এই বয়সে তিনি ছাড়া তাকে দেখার কে বা আছে!
অবসরগ্রহণের পরে সরকারি আবাসন ছেড়ে দিয়ে তাকে সপরিবারে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল মেজো মেয়ের পাওয়া দুই কামরার সরকারি কোয়ার্টারে। বর্তমানে তার পরিবার বলতে চারজন। তারা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের আবাল্য রুম ছোটো মেয়ে। ছোটো মেয়েটির কোনওকালেই বিয়ে হওয়ার নয়। ওর জন্যই সে বিশেষ চিন্তিত। তার অবর্তমানে মেয়েটিকে নিজের মতো করে কে দেখবে? এছাড়া আছেন নব্বই বছর বয়স্কা বৃদ্ধা শাশুড়ি মা। শাশুড়ি মা উঠতে বসতে পারেন না। তার সবকিছুই এখন বিছানায়। বৃদ্ধা শাশুড়ি মায়ের নিত্যদিনের কাজটা তাকেই করতে হয়। নাকে-মুখে কাপড় বেঁধে তাকে রোজ দু’বেলা নিয়মিত পরিষ্কার করিয়ে দিতে হয়। তার জন্যে পৃথক একটা ঘর বরাদ্দ করা আছে। স্থানাভাবের কারণে মেয়েরা বড়ো একটা বাপের বাড়ি আসতে চায় না।
স্ত্রী বাড়ির ময়লা ফেলতে গিয়ে একদিন অতর্কিতে দোতলার সিঁড়ি থেকে পিছলে পা ভেঙে ফেলেছেন। দু’বার প্লাস্টার করানো সত্ত্বেও ফল পাওয়া যায়নি। পা-টা আপাতত অকেজো হয়ে আছে। এখন একটাই উপায়— অপারেশন। কিন্তু রক্তের উচ্চচাপ ও অত্যধিক সুগার থাকার কারণে, ডাক্তারও পিছিয়ে পড়েছেন। বলাবাহুল্য এই বয়সেও রায়বাবুর মুক্তি নেই। সংসার সমস্যায় তিনি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। তবু একেক সময় তিনি নিজেকে একটি বিষয়ে খুব ভাগ্যবান বলে মনে করেন এই ভেবে যে, বড়ো মেয়ে দুটো ভালোই, লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পছন্দমতো পাত্র খুঁজে বিয়ে করেছে। লোকে যে যাই বলুক, তার মনে কোনও ক্ষোভ নেই। রায়বাবু বিশেষ ভাবে অবগত ছিলেন যে, তার সামান্য রোজগারে খাওয়া-পরা যদিও বা একপ্রকার চলে যাবে, কিন্তু মেয়েদের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া তার পক্ষে কোনদিনও সম্ভব নয়।
বলতে বাধা নেই, রায়বাবু অবসর নিয়েছেন কিন্তু জীবনটাকে আর দশজনের মতো গুছিয়ে উঠতে পারেননি। অভিশাপগ্রস্ত তার জীবন। এককথায় ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করে তিনি পেরে ওঠেননি। হেরে গিয়েছেন। চোখের পাতা দুটো এক হওয়া মাত্র সংসারটা যে অথৈ জলে ডুবে যাবে, এটাই তার জীবনের প্রধান বিড়ম্বনা। তিনি যে মরেও শান্তি পাবেন না। কথাটা মনে পড়লেই বুকের পোড়ো খাঁচাটায় রুক্ষ বাতাস উঠে ঝড় বইয়ে দেয়। বিশেষকরে তার সহকর্মী গোপালবাবুর সঙ্গে তুলনা করলে নিজেকে আরও বেশি অসহায় বলে মনে হয়।
চাকরিসূত্রে তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিল কানপুরে। তখন তারা দু’জনেই অবিবাহিত। সে আজ চল্লিশ বছর আগের কথা। বিশাল এক বাড়ির ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া করে তারা একসঙ্গে দু’জনে থাকতেন। অনাগত ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন দেখতেন। অথচ ষাট অতিক্রান্ত জীবনটা আজ একেবারেই অন্যরকম। কল্পনার অতীত। যেমন কথায় আছে— ‘অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়!” এমনই একটা পরিস্থিতি। গভীর তমশায় ঢাকা। মানুষের বার্ধক্য এমন এক অবস্থা, যেখানে প্রতিনিয়ত স্মৃতি রোমন্থন করাই প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তখন সবকিছুকে তুচ্ছ জ্ঞানে দূরে সরিয়ে রেখে অতীত নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই সে বেশি পছন্দ করে। বিগত দিন ফিরে পাওয়ার আশায় মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কিন্তু তবু বর্তমানকে আশ্রয় করেই তাকে এগিয়ে যেতে হয় জীবনের শেষ সীমান্তে। এর কোনও ব্যতিক্রম নেই।
(ক্রমশ…)





