শীতকাল হওয়ায় চেরি গাছের ফুল ফুটে এই বাগানের শোভা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেঘছায়ামাখা পথে শীতের হাওয়ায় ইতি- উতি উড়তে থাকে বৌদ্ধমন্ত্র সম্বলিত রঙিন লুংদার। শান্ত পরিবেশে রয়েছে পায়ে হেঁটে চলার সরু পথ। নানা জায়গায় রঙিন গার্ডেন ছাতার নীচে রয়েছে লোহার তৈরি বসার জায়গা। সবুজ উঠোনে রাতে নিঃশব্দে ঝরে পড়া শিশিরবিন্দু সকালের মনোরম আলোয় ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হচ্ছে। চলছে মেঘ-রোদ্দুরের নিরন্তর খেলা। সমগ্র চা-বাগান সবুজ বুনো গন্ধে ভরে গেছে। আরও নীচে দেখা যায় পান্না রঙের তিস্তার আঁকাবাঁকা চলনরেখা। দূরে দেখা যায় কিছু অবাধ্য মেঘের দল কুণ্ডলী পাকিয়ে আটকে আছে চা-গাছের ঝোপে। এক অলৌকিক সৌন্দর্যে আচ্ছন্ন হয়ে আছে চারপাশ।
ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাই এই টি-এস্টেট নির্মাণের পূর্বে এখানে শেরপাদের গ্রাম ছিল। মিশনারি বিল্ডিংয়ের চারপাশে বনবিভাগের প্রায় ১০ একর নার্সারিও ছিল। ব্রিটিশ শাসনের সময় থেকেই এই সাইটটি ১৯ শতকের প্রথম দিকে স্কটিশ মিশনারি বিল্ডিং হিসাবে গৃহীত হয় এবং ১৯৫৪ সালে সিকিম সরকার অধিগ্রহণ করেন। এখানে উৎপাদিত চা কলকাতায় নিলাম কেন্দ্রের নিলামে সর্বোচ্চ দর অর্জন করতেও সক্ষম হয়েছে এবং এই চায়ের রপ্তানির সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১৯৯৪ এবং ১৯৯৫ এই দু’বছর টেমি টি-গার্ডেনকে ভারতবর্ষের চা-বোর্ড ‘অল ইন্ডিয়া কোয়ালিটি অ্যাওয়ার্ড” প্রদান করে। চা-বাগান থেকে খানিকটা নীচে রয়েছে চা-কারখানা। যাওয়ার রাস্তাটিও খুব সুন্দর। এখানে আছে ব্রিটিশদের নির্মিত ‘বড়া বাংলো’ ও অন্যান্য কটেজ। চা-বাগানের মধ্যে নির্মিত এই বাংলোর কটেজগুলো দুর্দান্ত দেখতে। এদিক সেদিক রয়েছে আরও কয়েকটি হোমস্টে ও রিসর্ট। স্বপ্ন দেখি কোনও একদিন চায়ের কাপ হাতে করে বারান্দায় আয়েশ করে সোনালি রঙের চায়ে চুমুক দিয়ে প্রিয়জনের পাশে বসে সন্ধেটা উপভোগ করব। সব পর্যটক, ট্যুরিস্ট স্পটের ভিড়, সাইটসিয়িং-এর জন্য দৌড়াদৌড়ি পছন্দ করেন না। শুধুমাত্র যাঁরা নির্জনতাকেই উপভোগ করতে চান তাঁরা এখানে এসে থাকতে পারেন। চমকপ্রদ নিসর্গ নিয়েই গড়ে উঠেছে টেমি টি-গার্ডেন।
চা-বাগানের মধ্যে কিছুটা সময় কাটিয়ে বাগান সংলগ্ন ক্যাফেটেরিয়ায় এসে বসি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি সামনের বিস্তৃত সবুজ ঝোপের দিকে। নির্মেঘ আকাশ থাকলে এখান থেকেও দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা ও তার সঙ্গী সাথীদের। সবুজ চা-বাগান ও নীল আকাশের বুকে হেলান দেওয়া সাদা বরফের পাহাড় দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। মনে হয় যেন আরও কিছুক্ষণ বসেই থাকি। ফেরার তো কোনও তাড়া নেই। রোদেলা দুপুরে সবুজ নিস্তব্ধতাকে উপভোগ করি আরও কিছুটা সময় ধরে। ড্রাইভারের ডাকে যখন গাড়ির দিকে ফিরে যেতে থাকি তখনও যেন টেমি চা-বাগানে লাট খেতে থাকে এক আশ্চর্য নিঃস্তব্ধতা। সেই মোহময়ী নির্জনতার ছবি মনের মধ্যে এঁকে আনমনে ভাবি, খুব বেশি মনখারাপ হলেই এমন নিসর্গকে আঁকড়ে ধরতে আবার চলে আসব এখানে।

আকাশের নীচে নামচি: এবার আমাদের গন্তব্য দক্ষিণ সিকিমের আরেকটি আকর্ষণীয় জায়গা নামচি। প্রায় ৪৪০০ ফুট উচ্চতায় দক্ষিণ সিকিমের সদর শহর নামচি পর্যটকদের মোহিত করে তার অনন্যসুন্দর প্রকৃতি ও ছবির মতো সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ দিয়ে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত নামচি পর্যটন মানচিত্রে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু বেশ কিছু বছর ধরে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার প্রধান কারণ নামচির মূল আকর্ষণ ১০৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট শিবমূর্তিসহ চারধাম রেপ্লিকা। চারিদিকে সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে কুয়াশাঘেরা নামচি একটি ছোট্ট শহর। রাবাংলা থেকে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যখন নামচির দিকে অগ্রসর হচ্ছি তখন দূর থেকেই দেখা যায় পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছেন শান্তশ্রী, সৌম্য দেবাদিদেব মহাদেব। এক ঝলক দেখেই মন প্রশান্তিতে ভরে যায়। নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে গেটের পাশেই জুতো খুলে প্রবেশ করতে হয়।
পাহাড়ের নির্জন কোলে অপূর্ব শিল্প সুষমায় গড়ে উঠেছে চারধামের মন্দির। পুরীর জগন্নাথ মন্দির, বদ্রিনাথের মন্দির, রামেশ্বরের মন্দির আর দ্বারকার মন্দির— ভারতের বিখ্যাত এই চারধামের মন্দিরের আদলেই এখানে গড়ে উঠেছে চারধাম। একই স্থানে চারধাম অবস্থিত হওয়ায় অনেকেই চারধাম দেখার সুপ্ত মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারেন এখানে এসে। বিশাল চত্বর খালি পায়ে ঘুরতে হয়। তবে বয়স্কদের ও হাঁটাচলায় যাদের অসুবিধা রয়েছে তাদের জন্য ব্যাটারিচালিত গাড়িরও সুব্যবস্থা আছে।
ভারতবর্ষ নানা কাহিনির আধার। চারধাম নিয়েও অনেক পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত। যাইহোক, সাঁইবাবার মন্দিরটি শিরডির সাঁইবাবার মন্দিরের অনুকরণে তৈরি। ১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মহাদেবের মূর্তির ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছে দিগন্তবিস্তৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার গিরিশৃঙ্গ। মেঘমুক্ত আকাশে সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্ঘার উপস্থিতি বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। এই বিশালাকার মূর্তি দেখে মনে এক অনাবিল আনন্দের তরঙ্গ বয়ে গেল। উচ্চতার কারণে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হয় এখানে। মাঝে মাঝেই যখন মেঘবালিকার দল এসে ঘিরে ধরে, তখন ভোলা মহেশ্বর মেঘের অন্তরালে চলে যান। ভক্তরা তখন আকুল হয়ে খুঁজতে থাকে তাঁকে।
মূর্তির পাদদেশে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকতেও খুব ভালো লাগে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মন্দির চত্বর ছেড়ে আসতে মন চায় না। পুজো দেওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। শীতকাল হওয়ার কারণে নানা রঙের ফুলের বাগান এই জায়গার শোভা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে ভেসে আসা অজানা পাখির কলরবে মুখরিত চারিদিক। বাগানের নানা বর্ণের ফুলে উড়ে বেড়ায় মধুলোভী মৌমাছি আর নানা রঙের প্রজাপতি। রাতের শৈত্য আবরণ ঝেড়ে দিনের আলোর উষ্ণতা মেখে নিচ্ছে তারা। মন্দির চত্বরে রয়েছে মেডিটেশন সেন্টার, যেখানে অনেকেই প্রতিনিয়ত ধ্যানের জন্য আসেন। এমন শান্ত সমাহিত পরিবেশে জীবনের সব জটিলতা, নাগরিক জীবনের সব পাওয়া না-পাওয়া ভুলে গিয়ে শুধু ধ্যান করতেই মন চায়।
আশপাশে বেশ কিছু দোকান আছে। সেখানে বিভিন্ন ধরনের স্মারক রয়েছে। রাবাংলা ভ্রমণের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমরাও কিছু জিনিস কিনে এই পবিত্র স্থানের শান্ত সমাহিত গাম্ভীর্য আর মাধুর্যে মোহিত হয়ে গাড়ির দিকে অগ্রসর হলাম। গাড়ির অভিমুখ এখন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের দিকে।
কীভাবে যাবেন: সড়কপথে নিউ জলপাইগুড়ি কিংবা বিমানপথে বাগডোগরা। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি রাবাংলা যাওয়া যায়। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিমি।
কোথায় থাকবেন: থাকার জন্য রাবাংলা, নামচি, রালং— সব জায়গাতেই হোমস্টে আছে।
(সমাপ্ত)





