গড়িয়াহাট থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা হয় হয়। কিন্তু সোনাগাছিটা ঠিক কোথায় সে জানে না। উত্তর কলকাতায় শোভাবাজারের কাছাকাছি। কিন্তু ট্যাক্সিওয়ালাকে কোথায় দাঁড়াতে বলবে! ট্যাক্সিওয়ালা কী ভাববে! আইজ্যাক গুগল সার্চ করে। গুগল সার্চ করতে গিয়ে মনে হয়, আজকাল তো গুগলেই সে ডেকে নিতে পারে যা চাইছে তা। মানে এসকর্ট সার্ভিসের কাউকে। এখন অ্যাপ্‌সও আছে শুনেছে। কিন্তু কোথায় ডাকবে! নিজের ফ্ল্যাটে ডাকা যাবে না। তাহলে কোথায়! শোভাবাজারের কাছাকাছি এসে গেছে। ট্যাক্সিওয়ালা মিররে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করছে, কোথায় দাঁড়াবে। আইজ্যাক বুঝতে পেরেছে চোখের ভাষা। কিন্তু কী বলবে বুঝতে পারছে না। ডিসিশন নিতে তার আরও কিছু সময় দরকার। সে বলল, ‘আচ্ছা, লেকের দিকে চলুন তো। মানে লেকগার্ডেন্স।”

মদ খেয়েছে বলে তো মনে হচ্ছে না। কিন্তু এই ভদ্রলোকের কি মাথা খারাপ আছে! শোভাবাজার এসে, না নেমে আবার সুদূর দক্ষিণে! ট্যাক্সিওয়ালা সন্দেহের চোখ আয়নায় রেখে গাড়ির জানালা থেকে ডান হাত মেলে দিয়ে পিছনের গাড়িগুলিকে ইউটার্নের ইশারা দেয়।

গুগল খুলতেই একগাদা সার্ভিস প্রোভাইডার ঝাঁপিয়ে পড়ল। ‘জানু এসকর্টস কলকাতা”, “গীতা এসকর্টস কলকাতা”, ‘কলকাতা এসকর্টস সার্ভিস’— কত নাম। তবে ‘মিস কলকাতা” নামে একটা সার্ভিস-এর বিজ্ঞাপন বেশ স্মুদিং লাগছে। ওরা নাইটক্লাব থেকে হোটেল, বাড়ি সর্বত্র সার্ভিস প্রোভাইড করে। ওরা বিজ্ঞাপনে লিখেছে আকাঙ্ক্ষার যত্ন নেওয়া আর তাকে লালন করে পূর্ণতা দেওয়াই ওদের বৈশিষ্ট্য।

এই বিজ্ঞাপনটা মনে ধরল। যদি কোনওভাবে ওর আকাঙ্ক্ষা হাতছাড়াও হয়ে যায়, তবে এরা নাকি রিবিল্ড করে দিতে পারে। ক্যাজুয়াল না ফর্মাল ড্রেসে হবে, ভেবে ক্যাজুয়ালেই টিক মারল আইজ্যাক। তাতে লোকজনের বিশেষ নজরে পড়বে না। ঠিক হিসেব করে নয়, একটা পাহাড়ি মেয়েকেই মনে ধরল। সে নেপালি। তারপর খরচাও ঠিক হয়ে গেল, পাঁচ হাজার। এই পাঁচ হাজার টাকায় সেই অজানা মেয়ে তাকে গোটা রাত সঙ্গ দিতে পারে। আইজ্যাকের গোটা রাতের তো দরকার নেই। ঘণ্টাখানেকেই হয়ে যাবে। মানে বুঝে যাবে তার ভবিষ্যৎ।

সাউথ সিটিতে রাত আটটার শো। সার্ভিস কোম্পানি সিনেমার টিকিটের দাম প্রথমবারের ক্লায়েন্ট হিসেবে গিফট দিয়েছে। মেয়েটার ক্যাজুয়াল পোশাকের ভিতরেও একটা এথনিক টেস্ট আছে দেখল। আইজ্যাক সিনেমা হলের অন্ধকারে ঢুকে যাওয়ার আগে মলের উজ্জ্বল আলোয় ভালো করে দেখে নিতে কফিশপে গিয়ে বসল। তখনও মিনিট কুড়ি সময় হাতে আছে শো শুরু হওয়ার। আর দেরি করে ঢুকলেও বা কী! আইজ্যাক তো আর সিনেমা দেখতে যাবে না। দেখতে যাবে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে। আকাঙ্ক্ষার রং, আকাঙ্ক্ষার শরীর, আকাঙ্ক্ষার অভিনয়হীন নাটকীয় প্রবেশ-প্রস্থান। বাইরে থেকেই হয়ে যেত, মানে মেয়েটিকে দেখে তার ভাবনার কোনও পরিবর্তন আসছে কিনা বোঝা যেত। বা গোদা করে বললে শ্বাস ঘন ঘন পড়তে চাইছে কিনা, শরীরে জ্বরের মতো মৃদু তাপ এসে ঘিরে ধরছে কিনা, মেয়েটির চোখে চোখ রাখতে অস্বস্তি হচ্ছে কিনা— তা আলোতেই বিশেষ করে সম্ভব। কিন্তু ওই যে আজ অন্যদিন নয়, আজ সব গোলমেলে হয়ে আছে। যদি এ যাত্রাও সে ফেল করে। পীরবতের উপস্থিতিতে যে তীব্র ফিলিং আসত, তা যদি ফিল না করে!

পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে দিয়েছে ফোন পে করে। টাকার উশুল করতে হবে না! ওরা বলেছিল, ক্লায়েন্টের চলে যাওয়া আকাঙ্ক্ষা ফিরিয়ে আনতে এদের জুড়ি নেই। তো তা হলে মেয়েটিকেও তো সাহায্য করতে হবে নাকি! তাকে পাশে বসার সুযোগ দিতে হবে।

সিনেমা অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছিল। কফি খেয়ে ওরা যখন হলে ঢুকেছে তখন অন্ধকার। মেয়েটির হাই হিল জুতো। অন্ধকারে হোঁচট খেতে পারে। সে মেয়ে আইজ্যাকের হাত ধরল। বেশ মাখনের মতো নরম হাত। লম্বা লম্বা হাতের আঙুল। গিফট করা টিকিট দুটিই স্পেশাল ছিল। অনলাইনে টিকিট কাটা। দেখেশুনে একেবারে পিছনের রোয়ের টিকিট। পেনসিল টর্চ নিয়ে বসিয়ে দিয়ে গেছে হল অ্যাসিস্ট্যান্ট।

ইংরেজি ছবি। অ্যাকশন মুভি। কার চেজিং। গুলি চালানো, আগুন, রক্তপাত — সব চলতি হলিউডের অ্যাকশনে যা যা থাকার, আছে। কিন্তু সেদিকে কে আর মন দিচ্ছে। মেয়েটি আইজ্যাকের হাত ছাড়েনি। সে হাতের ভিতর দিয়ে আইজ্যাকের হাতে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে চেয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কথা বলার ভঙ্গি নিয়ে কানের লতিতে জিভ দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। আইজ্যাকের অস্বস্তি হচ্ছে। মেয়েটি সেটা করতে করতে আইজ্যাকের হাত ছেড়ে দিয়ে তার থাইয়ের উপর হাত রেখে আস্তে আস্তে চাপ দিতে শুরু করে। আইজ্যাকের অস্বস্তি বেড়ে যায়। তার গা ঘিনঘিন করতে থাকে। সে মেয়েটির দিকে অল্প তাকিয়ে বলে, লেটস এক্সিট ফ্রম হল। মেয়েটি ভড়কে যায়।

আইজ্যাক হলে ঢোকার সময় যেভাবে হাত ধরে ঢুকেছিল, সেভাবেই লাল আলোয় এক্সিট লেখা দরজা পর্যন্ত হাত ধরেই আনে। তখন হাত না ধরলেও চলত। মানে হলের অন্ধকার আর আলো ততক্ষণে চোখ সয়ে নিয়েছিল। হলে ঢোকার সময় যে চোখ একটা বিরুদ্ধ পরিবেশে দেখা কাজটি করতে চায় না, সেই অবস্থা থেকে চোখ খানিকক্ষণের ভিতর ঘুরে দাঁড়ায়। আর একটা যুদ্ধং দেহি মনোভাবে দেখার কাজটি ভালো ভাবেই করা শুরু করে খানিকটা সময়ের পর থেকে।

হলের বাইরে পা রেখেই মেয়েটি ভীত একটা স্বর ফেলে বলল, ‘স্যার, কোনও কাজ তো শুরুই করতে দিলেন না। বেরিয়ে এলেন। আমার কি কোনও অন্যায় হয়েছে?’

মেয়েটির গলায় বিপন্নতা ছিল। অনেকদিনের কর্পোরেটের এক্সিকিউটিভ। আইজ্যাকের বুঝতে অসুবিধে হয় না। সে মেয়েটিকে আশ্বস্ত করে, ‘না না। নাথিং। ইউ আর পারফেক্টলি পারফেক্ট।”

মেয়েটির স্বর আরও আর্ত শোনায়, ‘স্যার, আমাদের কাজ ক্লায়েন্টকে হান্ড্রেড পার্সেন্ট স্যাটিসফাই করা। আপনি দুম করে বেরিয়ে এলেন। আপনি রিপোর্ট করলে আমার চাকরি চলে যাবে। এ লাইনে একবার ব্ল্যাক লিস্টেড হলে কেউই আর আমাকে রাখবে না।’

আইজ্যাক শান্ত আর মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘না না, আপনি ভাববেন না। আমি ফুললি স্যাটিসফায়েড রিপোর্টই দেব।’

বাড়িতে ফিরে স্নান সেরে খাবার গরম করে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ল আইজ্যাক। এসকর্ট সার্ভিসের মেয়েটির কথা মনে করে সে নিজের মনে ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বিড়বিড় করে, একাজ যার তার কম্ম নয়। পীরবতের কাজ পীরবতই শুধু পারবে, এদিক ওদিক হাতড়ালে চলবে না হে। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে সে তাড়াতাড়ি পীরবতের স্বপ্নে ঢুকে পড়বে আজ। আইজ্যাকের কাছে ওই একটা ম্যাজিক আছে। সে ঘুমের ভিতর যে স্বপ্ন দেখতে চায়, তাই-ই সে দেখতে পায়। আর পীরবত ছাড়া খুব কমই অন্য স্বপ্ন সে দেখতে চেয়েছে।

নির্দিষ্ট নিয়মেই ভোর পাঁচটায় অ্যালার্ম বেজেছে। আইজ্যাক ধড়মড় করে উঠে অ্যালার্ম অফ করে বিছানায় বসেছে। তার চোখ জ্বলছে। তবে কি ঘুম হয়নি! আর আজ প্রথম আইজ্যাক টের পেল তার স্বপ্নের ভিতর পীরবত আসেনি। এমন তো এতগুলো বছরে কখনও হয়নি! ফ্যালফ্যাল করে ঘরের সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আইজ্যাক চেঁচিয়ে উঠল, পীরবত পীরবত …।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...