কিছুক্ষণ পর কুরগোশটার চোখ দিয়ে আমি পিটপিট করে চাইলাম। জয়া দেখি ততক্ষণে বৈজ্ঞানিক ভদ্রলোককে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে। আপনি থেকে তুমি তে নেমেছে। নাম ধরে ডাকছে। তাই সেগুলো কাজের কথা না প্রেমের কথা, সেটা আমার মাথায় ঢুকল না। তবে জানলাম লোকটার নাম প্রাঞ্জল। ডাক নাম মিঠুন। জয়া দেখলাম সরাসরি মিঠুন বলে সম্বোধন করছে। অবশ্য তার কোনও কথাই যে মিঠুনের কানে ঢুকছে না, তা আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম। ফস্টিনস্টির চেষ্টাটা বোধহয় একতরফা।

ইতিমধ্যে ওই লোকটার চোখ কুরগোশটার দিকে মানে আমার দিকে পড়ল। আমি তখন ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটা লাফ দিয়ে উঠল।

—জয়া, ও বেঁচে আছে।

এই বলে মিঠুনবাবু আমার দিকে লাফ দিয়ে এগিয়ে এলেন। তারপর কী মনে করে ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। অবশ্য একটু পরেই তার আগমন ঘটল হতাশ ভঙ্গিতে।

—নাহ। ও ঘরেরটা সত্যিই বেঁচে নেই।

এই বলে সে একখানা চেয়ারে বসে পড়ল। জয়া কিন্তু তখন ভীষণ উত্তেজিত।

—ও যখন বেঁচে আছে তুমি তাহলে সবাইকে জানাও। প্রজনন ক্ষমতাধারী হাইব্রিড অ্যানিমাল তুমি তৈরি করতে পেরেছ। মিঠুন ঘাড় নাড়ল।

নাঃ। কেমন একটা খটকা লাগছে। আমি একই পদ্ধতি দু’জনের উপর প্রয়োগ করেছিলাম। ও বাঁচল না। কিন্তু এটা কী করে…। আর কয়েকটা দিন দেখে নিই।

ওর কথা শুনে আমি তো মনে মনে হেসে আর বাঁচি না। এটা যে আমি, সেটা ওরা বুঝবে কেমন করে। আমি এই মিতালি রানি কুরগোশ হয়েছি। আমি এই দেহ ছেড়ে দিলেই এটার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হবে। পদ্ধতি না হাতি। যত্তসব পাগলের কাণ্ড। জয়া একটু পরেই চলে গেল। আর মিঠুন পড়ল আমাকে নিয়ে।

—আয়রে কুরগোশ। এখন শুধু তুই আর আমি। চল আজ থেকে আমরা একসাথে ঘুমাব। তোকে তো আমি মেয়ে করে বানিয়েছি। আজ থেকে তোর নাম রানি।

এই বলে সে করল কী, সটান আমাকে কোলে করে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। সেই ঘরে একটা বিরাট অয়েল পেন্টিং ছিল। এক রাশভারী ভদ্রলোক, আর এক অপূর্ব সুন্দরী ভদ্রমহিলার ছবি। তাদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে মিঠুনের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল। —মা বাবা দ্যাখো, আজকে আমি কত একা। আমাকে ফেলে তোমরা কত দূরে চলে গিয়েছ। আজ এই কুরগোশটা ছাড়া আমার আর কেউ নেই।

এইভাবে আরও কিছুক্ষণ সে ওই ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার অবস্থা দেখে আমারও মনটা কেমন করে উঠল। অত সুন্দর এই ছেলেটা। অথচ এই পৃথিবীতে ওর আর কেউ নেই। যাইহোক কী আর করা যাবে।

কিন্তু তারপরেই হল এক মহা ঝামেলা। আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কী আদর আর আদর। উফ্, ছাড়ে আর না।

আরে ছাড়, ছাড় না। আরে আমি একটা মেয়েরে। কিছুতেই বোঝে না। এই ইঁ। ধ্যাত। ছাড়, ছেড়ে দে আঁউ। সবক’টা ছেলের স্বভাব খারাপ।

অবশ্য একটু পরেই তার আদরের ঠেলা বন্ধ হল। রাতে নরম তুলতুলে বিছানায় আমাকে পাশে নিয়ে সে ঘুমাল। আমি অবশ্য একটু দূরে সরে রইলাম। যতই কুরগোশ হয়ে থাকি আর যাই থাকি, আমি যে আদতে একটা মেয়ে, সেটা ভুলি কী করে।

এইভাবে কয়েকটা দিন কেটে গেল। লোকটা, মানে মিঠুন, সারাদিন আমাকে নিয়েই থাকে৷ কত খেলা করি দু’জনে। লোকটার উপর কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে আমার। বুঝতে পারি লোকটা বড়ো একা। আর লোকটার বাইরে অনেক ধার। সেদিন দুটো ষণ্ডামার্কা লোক এসেছিল। টাকা না পেলে দেখে নেবে বলে মিঠুনকে শাসিয়ে গেছে। তবে মানুষটা বড়ো দৃঢ়চেতা। ও ওদের চোখের দিকে নিজের উজ্জ্বল আর বড়ো বড়ো চোখ দুটো দিয়ে তাকিয়েছিল। তারপর বলেছিল, “টাকা শোধ দেওয়ার সময় এখনও যায়নি কিন্তু। ঠিক সময়ে টাকা শোধ পেয়ে যাবেন।’

আরও একমাস সময় দিয়ে লোক দুটো চলে গিয়েছে। কিন্তু ওদের রকম দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়েছি। লোক দুটো মিঠুনকে কিছু করে না বসে।

ওরা চলে যাওয়ার পর মিঠুন চুপ করে বসে রইল। আমি ওর পায়ের কাছে গুটিগুটি গিয়ে বসলাম। মিঠুন আলতো করে আমার মাথায় আর ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

—কী করি বল তো রানি? কী করে শোধ দেব ওদের টাকা?

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...