আমি তখন ডুবে গেছি ওর আদরে। কী আমেজ, ওফ। যদি বেঁচে থাকতাম, তাহলে যে কী করতাম জানি না।
ঠিক এমন সময় জয়া এসে হাজির। যা ভেবেছি ঠিক তাই। আবার ফস্টিনস্টি করার মতলব। কিন্তু আমি থাকতে সেটি হচ্ছে না। হুঁ হুঁ বাবা। আমি মিতালি। আমি সটান মিঠুনের কোলে উঠে বসে রইলাম।
জয়াও দেখছি কয়েকদিন ধরে আমাকে ঠিক পছন্দ করছে না। আমাকে মিঠুনের কোলে দেখে মুখটা কেমন বেঁকাল।
—ওকে তো আপনি কোথাও বেঁধে রাখতে পারেন স্যার। সবসময় ডিসটার্ব করে।
আবার ঢঙ দেখিয়ে আপনি আজ্ঞে শুরু করেছে। একটু পরেই নাম ধরে ‘তুমি’ ‘তুমি’ করে ডাকবে।
এবার অবশ্য মিঠুন নিজেই হেসে ফেলল।
—তোমাকে আমি বুঝতে পারি না জয়া। কখনও ‘স্যার’, ‘আপনি’ ছাড়া কথা বলছ না। আবার কখনও ‘তুমি’-‘তুমি’ করে আমার নাম ধরে ডাকছ। তাছাড়া এখন তো আমার প্রোজেক্ট বন্ধ। তাই এখন আর আমি তোমার স্যার নই।
জয়া এবার ঠোঁট টিপে একটু হাসল। চোখে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
—কী করব বলো। তোমাকে তো বুঝতেই পারি না। আজকে বলো তো তোমার কাছে আমার জায়গাটা ঠিক কী?
ইশ! একেবারে খাঁটি ফস্টিনস্টির লক্ষণ। আমার মনে হল এক লাফে গিয়ে ঘ্যাঁক করে একটা কামড় জয়ার পায়ে বসিয়ে দিই। এই জলজ্যান্ত মেয়েটাকে তোর চোখে পড়ছে না? বদ মেয়েমানুষ। আমি থাকতে মিঠুনকে তোর পাওয়া হবে না দেখে নিস।
সমাধান অবশ্য মিঠুনই করে দিল।
—আমার কাছে নিজের জায়গা নিয়ে এখন ভেবো না। বাজারে কয়েক লক্ষ টাকা ধার রয়েছে। আজকে পাওনাদার হুমকি দিয়ে গিয়েছে। একমাসের মধ্যে তারা টাকা চায়। কিন্তু আমি সর্বস্বান্ত। কীভাবে টাকা শোধ করব বলতে পারো?
এই কথাটা শোনার পর জয়া আর সেদিন দাঁড়ায়নি। তারপর থেকে মিঠুনের বাড়িতে জয়াকে আর দেখা যায়নি৷
সেদিনের পর থেকে আমিও খুব চিন্তায় পড়েছিলাম। পাওনাদারদের হাত থেকে মিঠুনকে কী করে বাঁচানো যায়। ক’দিন ধরে শুধু এই কথা ভাবলাম। আর বাড়িটার আনাচে-কানাচে, পিছনের বাগানে ঘুরে বেড়ালাম। বাড়িটার পিছনে অনেকখানি জায়গা। একটা বিরাট পুকুর। গোটা বাড়িতে প্রচুর অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। সব দামি কাঠ দিয়ে তৈরি। তার মধ্যে অনেকগুলো বেশ পুরোনো এবং দুর্লভ। আমার মাথায় একটা পরিকল্পনা এল।
ওদিকে কুরগোশের ছোটো দেহটায় আমার থাকতে অসুবিধা হচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম এই দেহ এবার ছেড়ে দিতে হবে। এরপর কী করব কে জানে!
সেদিন সন্ধ্যায় মিঠুন আবার আমাকে কোলে নিয়ে বসল।
—কী করি বল তো রানি? কতগুলো সংস্থা তোকে কিনে নিতে চাইছে। পেটেন্ট, তোকে বানানোর কৃতিত্ব, সব ওরা নেবে। বদলে আমি পাব মোটা টাকা। কারণ আজ পর্যন্ত প্রজননে সক্ষম সংকর প্রাণী কেউ বানাতে পারেনি। টাকা নিয়ে আমাকে চুপ করে থাকতে হবে। এছাড়া তো আর কোনও উপায়ও দেখি না। পাওনাদারদের টাকা মেটাব কী করে? কিন্তু তোকে ছেড়ে আমি বাঁচব নারে। তুই ছাড়া যে আমার কেউ নেই।
কুরগোশের শরীরে তখন আমি আর থাকতে পারছিলাম না। টুক করে ওর শরীর ছেড়ে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। আর কুরগোশটাও সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারিয়ে মিঠুনের কোল থেকে পড়ে গেল।
মিঠুন হতভম্ব হয়ে সেদিকে তাকিয়েছিল।
—রানি কী হল তোর?
—ওর শরীরে প্রাণ নেই মিঠুন।
প্রথমবার মিঠুনকে দেখা দিলাম আমি।
এই ক’দিন আমি ওর শরীরের ভিতর ছিলাম। তাই ও বেঁচেছিল। তুমি আত্মায় বিশ্বাস করো কিনা জানি না, কিন্তু এটাই সত্যি৷ তোমার গবেষণা সফল হয়নি মিঠুন। কুরগোশ বাঁচেনি।
বেঁচে থাকতে আমার নাম ছিল মিতালি।
মিঠুন বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিল। যা দেখছে সেটা যে তার বিশ্বাস হচ্ছে না, তা বুঝতে পারছিলাম। তবে তার চোখে ভয়ের কোনও চিহ্ন ছিল না। সে একবার আমার দিকে আর একবার মরা কুরগোশটার দিকে তাকাল।
—তাহলে আমার পুরো চেষ্টা, সমস্ত টাকা জলে গেল! আমি হেরে গেলাম। সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলাম। এখন কোথা থেকে পাওনাদারদের এতগুলো টাকা আমি মেটাব?
ওকে সান্ত্বনা দিতে আমি ওর দিকে দু-পা এগিয়ে গেলাম।
—উপায় আছে মিঠুন। তোমার বাড়িতে পুরোনো দিনের অনেক বহুমূল্য আসবাবপত্র আছে। ওগুলো সব নিলামে দাও। ওসব তোমার কাছে থেকে কোনও লাভ নেই। আর পিছনের পুকুরটা অনেক বড়ো। ওটা কাউকে লিজে দাও। এর থেকে যা পাওয়া যাবে, আমার মনে হয় তাতে তোমার দেনা শোধ হয়ে যাবে।
সে করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল।
—বলছ? অবশ্য এছাড়া আর উপায়ও দেখছি না।
—আর সব মিটলে একটা বিয়ে করো মিঠুন। এভাবে একা থাকতে পারবে না।
তার চোখ আরও করুণ হয়ে উঠল।
—আমি একে সর্বস্বান্ত। তায় খ্যাপাটে। কে করবে আমাকে বিয়ে?
আমি। এটা বলতে গিয়েও থমকে গেলাম আমি। আমি যে কায়াহীন ভুলেই গিয়েছিলাম। তবে বেশ বুঝতে পারছিলাম এবার আমার একটা দেহ চাই। অন্তত আরও অনেক বছরের জন্য। কায়াহীনের বিয়ে হয় না। শারীরিক ব্যাপারটা তো দেখতে হবে। মিঠুনের সঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। উড়তে থাকলাম ঝড়ের বেগে। চলে এলাম একটা মর্গে। কী ভাগ্য আমার। সামনের বারান্দায় শোয়ানো ছিল একটা মেয়ের মৃতদেহ। আমার মতোই বয়স। অনেকটা আমার মতোই দেখতে। হঠাৎ সামনে দেখি সেই যমদূতটা। সে আমাকে ইশারা করল।
—এ বেওয়ারিশ মড়া। কেউ দাবিদার নেই। ঢুকে পড়ুন। এই দেহ এখন আপনার। আপনি ঢুকলে আমরা দায়মুক্ত হই।
বলেই সে বেপাত্তা। আর আমি একলাফে দেহের ভিতর। দুটো ডোম বোধহয় দেহটা পোস্টমর্টেমের জন্য নিতে আসছিল। আমাকে উঠে বসতে দেখে কোথায় যে পালাল বুঝলাম না।
তারপর সোজা বেরিয়ে চলে এসেছি মিঠুনের বাড়িতে। কুরগোশ থাকাকালীন আমাকে ও কতরকম ভাবে আদর করেছে সব বলেছি। তারপর… হুঁ হুঁ কেটে গেছে তিন বছর। আমি এখন একটা ফুটফুটে ছেলের মা। মিঠুনকে জোর করে একটা কলেজে চাকরিতে ঢুকিয়েছি। আমাদের এখন সুখী দাম্পত্য জীবন।
আমার জীবনের এই ঘটনাটা শুধু আমি জানি আর মিঠুন জানে। আর মুখ ফসকে আপনাদের বলে ফেললাম। আপনারা কাউকে বলবেন না যেন!
(সমাপ্ত)





