অফিস যাওয়ার জন্য যখন তৈরি হয়ে বের হতে যাব, ঠিক সেই সময় মর্মঘাতী সংবাদটি ফের একবার মনে করিয়ে দিয়ে বেলা বলল, ‘তোমার মনে আছে তো, আজ সন্ধেয় কিন্তু রতনবাবুর ছেলের ম্যারেজ রিসেপশন। আমাদের যেতে হবে। আমি একটু পরে বের হব ভাবছি। একটা প্রেজেন্টেশন তো কিনতে হবে। তোমার দ্বারা যদি একটা কোনও সংসারের কাজ হয়।’
বেলার চিরকালীন অভিযোগের কোনও জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “বিয়ে তো অনেক দূরে! তাই না? জায়গাটা কোথায় যেন? আমি তো ভুলেই গেছিলাম!’
বেলা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, ‘ভুলবে যে, সে তো আমি জানি। বিনা পয়সায় এরকম পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট পেয়েছ! যে তোমার সব কথা মনে করে রাখবে।”
আমি তার চিবুক ধরে আদর করে বললাম, “কেন এত রাগ করো?”
সে এক ঝটকায় মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘থামো। আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। আজকাল সব কথাই তুমি ভুলে যাচ্ছ। কী ব্যাপার বলো তো? নতুন করে কারও প্রেমে পড়েছ নাকি! ত
জিভ কেটে বলি, “ছিঃ ছিঃ! কী যে যা-তা কথাবার্তা বলো তুমি ইদানীং। মুখে যেন কিছু আর আটকায় না। অফিসে তো যেতে হয় না, যন্ত্রণাটা বুঝবে কী? কাজের যেন কোনও শেষ নেই। কাজের লোক কম, কিন্তু কাজ গাদা-গাদা। দম ফেলার ফুরসত নেই। যাক গে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমার মোবাইল ফোনে একবার ফোন করে মনে করিয়ে দিও। আমি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব!” এই বলে আমি দরজার দিকে পা বাড়াতে গেছি, বেলা পিছন থেকে আমার জামার হাতা টেনে ধরল।
বিরক্ত মুখে তাকিয়ে দেখি, তার চোখমুখ বিস্ফারিত! বলল, “কী বললে? পাঁচটা? অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে তোমার এক ঘণ্টা সময় লাগে। তারপর তৈরি হতে কম করে আধ ঘণ্টা। তারপর কখন অত দূরে পৌঁছাব? আবার ফিরতে তো হবে, নাকি! ওসব জানি না, তুমি পাঁচটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবে।’
শেষ বাক্যটায় বেলা এমন সুকৌশলে আদুরে অভিমান মেশাল যে ‘না’ করতে পারলাম না। বললাম, ‘আচ্ছা, চেষ্টা করব।’
বেরোনোর মুখে বেলার সঙ্গে কথার মারপ্যাঁচে জড়িয়ে যাওয়ায় অফিসে পৌঁছাতে স্বভাবতই দেরি হয়ে গেল একটু। ব্যস্তসমস্ত হয়ে অফিসে ঢুকে বরং বেশ চমকে গেলাম। সন্দেহের বশে কবজি উলটে হাতঘড়িটা দেখলাম। এই সময়ের মধ্যে গোটা ফ্লোরটাই নানা কিসিমের কর্মীদের কার্যকলাপে ভরে থাকে। অথচ আজ এক অদ্ভুত শান্ত নীরবতা বিরাজ করছে। কম্পিউটারের কী-বোর্ডগুলিতে আঙুলের মার্চপাস্ট নেই। ফাইলগুলি স্কুলের বাধ্য মনিটরের মতো অবাধ্য পাতাগুলিকে সযত্নে সামলে রেখেছে। ফ্যানগুলোর অধিকাংশই বন্ধ আছে বলে, খটখট শব্দটাও বাজি ফাটার মতো কর্ণপটহে এসে আঘাত করছে না। সবটাই যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
নিজের কেবিনে ঢুকে চেয়ার টেনে বসে, ঢকঢক করে পুরো এক গেলাস জল পান করে নিলাম। ইতিউতি তাকাচ্ছি, হঠাৎ মিলন এল। মিলন এই অফিসের একনিষ্ঠ কর্মী। তাকে ছাড়া একটিও ফাইল খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। প্রত্যেক দিনের মতোই সে এসে জানতে চাইল, ‘চা খাবেন তো আবিরদা ?
রোজই খাই। তবু সে রোজই জানতে চাইবে। বারণ করলে বলবে, জিজ্ঞেস করাটা তার দায়িত্ব। উপরন্তু, এ অফিসে তাকে ডাকাডাকির লোক অনেক, কিন্তু তার কথা বলার সুযোগ কম। এই সুযোগে সে একটু খেজুরে আলাপ করে নেয় আর কী!
হাতের মুঠো থেকে সকালের খবরের কাগজের গোছাটা সে টেবিলে আমার চোখের সামনে রাখে। আমি খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, —মিলন, গোটা অফিসটা আজ এত ফাঁকা লাগছে কেন ভাই? সকলে গণছুটি নিল নাকি!”
মিলন কথা না বলে, খবরের কাগজের একটা খবরে আঙুল রেখে দেখাল। শিরোনামে লেখা হয়েছে, শহরে আজ নাকি রেকর্ড সংখ্যক বিয়ে হচ্ছে। কারণ শাস্ত্রমতে এমন শুভদিন নাকি আর হয় না। শহরের বড়ো বড়ো বিয়েবাড়িগুলো তো অনেক আগে থেকেই বুকড। যারা বিয়েবাড়ি পায়নি, তারা রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে শামিয়ানা খাটিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সব মিলিয়ে গোটা শহরে আজ উৎসবের আমেজ। অফিসে হাজিরা মাত্রাতিরিক্ত কম হবে অনুমান করে, অনেক কর্তৃপক্ষ অফিসে ছুটি ঘোষণা করে দিয়েছে আগেভাগে! সরকার চিন্তিত এই ভেবে যে, যত মানুষ সন্ধেবেলা পথে নামবে, তাদের যাওয়াতের জন্য এত বাস কোথায় পাওয়া যাবে। শহরের ট্র্যাফিক পুলিশরা চিন্তিত, নিশ্চিত যানজটকে ছাড়ানো, ঘোরালো ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী নাকি, মন্ত্রী ও অফিসারদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। রাজ্যে বন্যা হলে যেরকম বৈঠক হয়! সকলেই একমত, শহরের বুকে এত বড়ো বিপর্যয় নাকি এর আগে কস্মিনকালেও ঘটেনি!
ওরে বাবা! খবরের কাগজটা দ্রুত ভাঁজ করে শূন্য দৃষ্টিতে তমালের দিকে তাকালাম। আমাকে বিহ্বল দেখে সে দেঁতো হেসে বলল, “কাগজে লিখেছে, শহরে আজ দশহাজার বিয়ে হচ্ছে। যাদের কোনওদিন বিয়ে হবে বলে কেউ ভাবেনি, যারা কনফার্মড ব্যাচেলর, তাদেরও বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আবিরদা। আগামী দু-বছর আর কোনও বিয়ে হবে কিনা, সেই ভেবে বাড়িওলা, ক্যাটারার, ডেকোরেটরদের মাথায় হাত। আজ আমারও নেমন্তন্ন আছে। মিনুর মাকে আসবার সময় বলে এলাম, বিকেলে সেজেগুজে তৈরি থেকো!”
এইসময় ‘আবির তুমি এসেছ?” বলে এগিয়ে এল বিমল মুখোটি। সে আমাদের এই কোম্পানির ম্যানেজার। প্রায় ফাঁকা অফিসে আমাকে দেখে তার যেন হালে পানি পাওয়া অবস্থা। আমার উলটোদিকের চেয়ারটা টেনে বসে বিমলদা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, ‘কী কাণ্ড! কী কাণ্ড!” —শব্দবন্ধটা বিমল মুখোটির একটা অভ্যাস। নিজের পিতৃবিয়োগের সংবাদটিও তিনি অফিসে ‘কী কাণ্ড’ সহযোগে পেশ করেছিলেন, বেশ মনে আছে।
(ক্রমশ…)





