ডিজিটাল জগতে যখন কেউ অতিরিক্ত ডুবে যান, তখন মানসিক বিশৃঙ্খলা এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি হয়। এই পরিস্থিতি ক্রমশ ইন্টারনেট আসক্তি ব্যাধি (Internet Addiction Disorder) নামে পরিচিত একটি গভীর আচরণগত ত্রুটিকে বোঝায়। তবে ডিসকম্বোবুলেশন শব্দটি ঐতিহ্যগত ভাবে বিভ্রান্তি বা ঝামেলার জন্য ব্যবহৃত হলেও, সমসাময়িক আলোচনায় এটি অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট জ্ঞানীয়, মানসিক এবং আচরণগত বিশৃঙ্খলার কারণে, ‘ডিজিটাল ডিসকম্বোবুলেশন’ (Digital Discombobulation) রূপক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিষয়ে সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরী-র দেওয়া তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে।
খুব স্পষ্ট ভাবে বলতে গেলে, ‘ডিজিটাল ডিসকম্বোবুলেশন’ হল তীব্র বিভ্রান্তি, হতবুদ্ধি ভাব বা হতাশার এমন একটি অবস্থা, যার বৈশিষ্ট্য হল, মানসিক ভাবে ‘ভারসাম্যহীন’ বোধ করা। এটি এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তি স্বাভাবিক এবং সুনির্দিষ্ট চিন্তা করতে পারে না কিংবা বলা যায়, ক্ষণিকের জন্য দিশেহারা বোধ করে।
স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, স্ট্রিমিং পরিসেবা এবং অনলাইন গেমিং দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত হওয়ার কারণে, উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমশ। কিন্তু ইন্টারনেট আসক্তি কেবল সাধারণ মানসিক উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে না, বরং ব্যক্তিগত, সামাজিক, আকাদেমিক কিংবা পেশাগত ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য কুপ্রভাব ফেলছে।
এই অতিরিক্ত ইন্টারনেট পরিসেবা যে ভাবে জ্ঞান, যোগাযোগ এবং বিনোদনের জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তা আজ অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের মন-মস্তিষ্ককে জটিল এবং রোগগ্রস্ত করে তুলছে।
ইন্টারনেট আসক্তি ব্যাধি
‘ইন্টারনেট আসক্তি ব্যাধি’ বলতে এমন একটি আচরণগত আসক্তিকে বোঝায়, যা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যস্ততা, তাড়না বা এলোমেলো আচরণ দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। যা যন্ত্রণা বা কার্যকরী দুর্বলতার দিকে পরিচালিত করে। এই ধারণাটি প্রথম জনপ্রিয় করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী কিম্বার্লি ইয়ং, যিনি অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের জটিলতার প্যাথলজিক্যাল অভিজ্ঞতা উপলব্ধি করেছিলেন। যদিও ইন্টারনেট আসক্তি ব্যাধি আনুষ্ঠানিক ভাবে রোগ হিসাবে স্বীকৃত নয়, কিন্তু সতর্ক না হলে নানারকম মানসিক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে।
এই ইন্টারনেট আসক্তি অনলাইন ব্যস্ততার একাধিক রূপকে অন্তর্ভুক্ত করে। যার মধ্যে রয়েছে—
O সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি
O অনলাইন গেমিং আসক্তি
O সাইবার সেক্সুয়াল আসক্তি
O অপ্রয়োজনীয় অনলাইন কেনাকাটা
O তথ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার বা অহেতুক ব্রাউজিং।
ইন্টারনেট-এর এই ধরনের ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার হল, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং নেতিবাচক পরিণতি সত্ত্বেও আচরণ অব্যাহত রাখা।
ডিজিটাল বিশৃঙ্খলার মনোবিজ্ঞান
ডিজিটাল পরিবেশে গভীর ভাবে জড়িয়ে থাকার কারণে, এখন লোকেরা প্রায়ই মানসিক ভাবে বিক্ষিপ্ত, আবেগগত ভাবে ক্লান্ত এবং অনলাইন উদ্দীপনার শিকার হয়ে চলেছেন। এই মানসিক অবস্থা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে থাকা বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত হয়।
ডোপামিন-চালিত চক্র
অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় এবং সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখানো হয়। আর এই প্রলোভনের ফাঁদে পড়ছেন অনেকেই। সোশ্যাল মাধ্যমে সাধারণ বিজ্ঞপ্তি, লাইক, কমেন্ট এবং অদ্ভুত এআই কনটেন্ট-এ ডুবে থাকার কারণে, মস্তিষ্কের পথে ডোপামিন নিঃসরণকে ট্রিগার করছে, যা ক্ষতিকারক।
মিস করার ভয়
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পরিবেশ এমন ধারণা তৈরি করে যে, গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা, কথোপকথন কিংবা সুযোগ যে-কোনও মুহূর্তে ঘটতে পারে। আর এই সুযোগ মিস করার ভয়, উদ্বেগের আচরণকে ইন্ধন জোগায় এবং অনলাইন সংযোগের উপর মানসিক নির্ভরতা বৃদ্ধি করে।
জ্ঞানীয় ওভারলোড
মনে রাখবেন, অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণে তথ্যের মুখোমুখি করে ইন্টারনেট। বার্তা, ভিডিও, নিবন্ধ এবং সামাজিক ফিডের মধ্যে ক্রমাগত মাল্টিটাস্কিং মনোযোগ আকর্ষণকারী সংস্থানগুলিকে অতিরিক্ত চাপ দিতে পারে। যার ফলে মানসিক চাপ এবং বিভ্রান্তি দেখা দেয়, যা সাধারণত ডিজিটাল বিশৃঙ্খলার (ডিজিটাল ডিসকম্বোবুলেশন) সঙ্গে সম্পর্কিত।
মেজাজ হারানোর সমস্যা
অনেকের জন্য ইন্টারনেট একাকীত্ব, একঘেয়েমি, উদ্বেগ কিংবা চাপের মতো নেতিবাচক আবেগের মোকাবিলা করার একটি পদ্ধতি হয়ে ওঠে। অনলাইন পরিবেশ তাৎক্ষণিক মানসিক স্বস্তি প্রদান করে, যা বারবার ব্যবহার করতে ইন্ধন জোগায়, অর্থাৎ ইন্টারনেট আসক্তি বাড়ে। এর ফলে এক সময় অকারণে মেজাজ হারানোর সমস্যা তৈরি হয়।
লক্ষণ এবং আচরণগত সূচক
ইন্টারনেট আসক্তি ব্যাধি আচরণগত, জ্ঞানীয় এবং মানসিক লক্ষণগুলির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই লক্ষণগুলি অন্যান্য আচরণগত আসক্তিতে পরিলক্ষিত প্যাটার্নের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ভারাক্রান্ত মস্তিষ্ক
অফলাইনে থাকাকালীনও ক্রমাগত অনলাইন কার্যকলাপ সম্পর্কে চিন্তা করেন অনেকে, যা তাদের মস্তিষ্ককে অহেতুক ভারাক্রান্ত করে তোলে। অনলাইনে যাওয়ার পরবর্তী সুযোগ পরিকল্পনা করা কিংবা মানসিক ভাবে অনলাইন মিথস্ক্রিয়া পুনরায় মস্তিষ্কে কুপ্রভাব ফেলে।
নিয়ন্ত্রণ হারানো
অনলাইনে কাটানো সময় নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষমতা স্বাভাবিক জীবনযাপন নষ্ট করে। ব্যবহারকারীরা প্রয়োজন মেটাতে মাত্র কয়েক মিনিট ব্যয় করতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রলিং কিংবা গেমিং করতে থাকে। এই অবস্থাকে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারানো বলা যায়। এমনকী যখন ব্যক্তিরা তাদের আচরণের নেতিবাচক প্রভাব বুঝতে পারে, তখনও তারা ইন্টারনেট ব্যবহার কমাতে পারে না।
অসন্তুষ্টি
একই স্তরের সন্তুষ্টি কিংবা উত্তেজনা অর্জনের জন্য ব্যক্তিদের ইন্টারনেটে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয়। যা এক সময় সন্তুষ্টির থেকে অসন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।
অস্বস্তি
ইন্টারনেট অ্যাক্সেস করতে না পারলে, ব্যক্তিরা বিরক্তি, অস্থিরতা, মেজাজের পরিবর্তন, উদ্বেগ কিংবা অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন।
কর্মক্ষমতা হ্রাস
অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার আকাদেমিক কর্মক্ষমতা, কাজের দায়িত্ব কিংবা পারিবারিক কর্তব্যের কর্মক্ষমতা হ্রাস করতে পারে।
ঘুমের ব্যাঘাত
নীল আলো এবং জ্ঞানীয় উদ্দীপনার সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে গভীর রাতে ডিভাইস ব্যবহার সার্কাডিয়ান ছন্দকে ব্যাহত করে, যার ফলে ঘুমের অভাব হয়।
সামাজিকতা হারানো
ডিজিটাল স্পেসে বেশি সময় ব্যয় করার কারণে, অফলাইন সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অসামাজিক হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে।
ঝুঁকির কারণ
অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি সাধারণ বিষয় নয়। কারণ, এর ফলে একাধিক মানসিক, সামাজিক এবং শারীরিক দুর্বলতা বৃদ্ধি করে। যা একসময় মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন
কিছু ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত, যার মধ্যে রয়েছে—
O অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা
O কম আত্ম-নিয়ন্ত্রণ
O উচ্চ স্নায়বিকতা
O সামাজিক উদ্বেগ সন্দেহ প্রবণতা
O ভুল ধারণা তৈরি হওয়া।
ইন্টারনেট আসক্তি প্রায়ই বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত ব্যাধি, মনোযোগ ঘাটতি, অতি সক্রিয়তা ব্যাধি এবং একাকীত্বের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যান্য প্রভাব
উচ্চ-গতির ইন্টারনেটের সহজ অ্যাক্সেস-এর কারণে, অন্য সবকিছুতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা, ন্যূনতম পর্যবেক্ষণ না করা, বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া প্রভৃতির সমস্যা হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে হতাশা এবং উদ্বেগের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, ভার্চুয়াল জগতে অনেকেই পরিচয় গোপন রাখে অথবা প্রতারণার উদ্দেশ্যে মিথ্যে পরিচয় ব্যবহার করে। তাই ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ডিজিটাল আসক্তির ফলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ হ্রাস, অলসতা এবং শিক্ষাগত পারফরম্যান্স হ্রাস পেতে পারে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে, কারণ মুখোমুখি যোগাযোগ ডিজিটাল আসক্তির কারণে বিঘ্নিত হয়।
প্রতিরোধ কৌশল
ডিজিটাল আসক্তি প্রতিরোধের জন্য ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি বিকাশকারীদের মানবিকতার সঙ্গে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি কীভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, তা দেখিয়ে সবাইকে সজাগ এবং সচেতন থাকার পরামর্শ দিতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য স্বাস্থ্যকর রুটিন মেনে চলতে হবে। এর জন্য ছোটোদের অফলাইন কার্যকলাপে আরও বেশি উৎসাহ জোগাতে হবে। শারীরিক ব্যায়াম, সৃজনশীল কাজ এবং সামাজিক মেলামেশা বাড়িয়ে,অনলাইন এবং অফলাইন জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল অ্যাক্সেস মানবজাতির সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলির মধ্যে একটি হলেও কিংবা এটি তাৎক্ষণিক যোগাযোগে সক্ষম এবং তথ্যকে সহজলভ্য করে ভৌগলিক সীমা ছাড়ালেও, এর অতিরিক্ত ব্যবহার চরম ক্ষতিও করতে পারে। অতএব, ডিজিটাল জগৎকে পরিত্যাগ না করেও, শুধু নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর কুপ্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ তৈরি করা দরকার।





