জাহাজে মোট ষোলোটি ডেক। শুরু করলাম একেবারে উপর থেকে ডেক ষোলো। এটাই জাহাজের মাথা, যেখানে দাঁড়ালে সমুদ্র আর আকাশের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। এই ডেকে আনন্দ আর অ্যাডভেঞ্চার হাত ধরাধরি করে চলে। মাঝ সমুদ্রে স্কাইডাইভিংয়ের অনুভূতি দিতে আছে স্কাইডাইভিং সিমুলেটর। ঢেউয়ের বুকের উপর দাঁড়িয়ে সার্ফিংয়ের স্বাদ দিতে ফ্লো-রাইডার। এর সঙ্গে আইস স্কেটিং, বাম্পার কার— এসবের জন্য রয়েছে বিশাল ইনডোর অ্যাক্টিভিটি স্পেস। এক পাশে রয়েছে আধুনিক জিম, জাহাজের অফুরন্ত খাবারের সঙ্গে নীরব যুদ্ধ চালানোর আদর্শ ময়দান।
এই ডেকেই রয়েছে নর্থ স্টার, জাহাজের সবচেয়ে আইকনিক অভিজ্ঞতা। কাচে ঘেরা একটি ক্যাপসুল, যা জাহাজের একপাশ থেকে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠে যায়। ক্যাপসুলটি প্রায় ৩০০ ফুটেরও বেশি উপরে পৌঁছায়। নীচে তাকালে নীল সমুদ্র, দুরে অসীম দিগন্ত, আর মাথার উপরে খোলা আকাশ। ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ, এমন অনুভূতি বর্ণনার জন্য আমার জানা কোনও শব্দই যথেষ্ট নয়। মনে হল, আমি যেন কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবীর নিয়মের বাইরে চলে গেছি।

ডেক পনেরোতে নামতেই আবহটা বদলে গেল। এখানে রয়েছে শরীর আর মনের যত্ন নেওয়ার সব আয়োজন। ডেকের চারপাশ ঘিরে আছে রানিং ট্র্যাক। ভোরবেলায় কেউ কেউ সূর্য ওঠার আগেই উঠে পড়েন। হালকা হাঁটা, কেউ আবার দৌড়ে ঘাম ঝরান। এখানে কোনও তাড়া নেই, কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। সবই নিজের ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল। আর সমুদ্রের উপর সূর্যোদয় দেখতে দেখতে যদি প্রাতঃভ্রমণ শুরু করা যায়, তার চেয়ে বড়ো বিলাসিতা আর কী হতে পারে?
ডেক পনেরোর অনেকটা জুড়ে রয়েছে স্পা আর ম্যাসাজ সেন্টার, শরীর-মনকে একটু আরাম দেওয়ার জায়গা। যদিও এই আরাম পকেটে বেশ বড়োসড়ো ছিদ্র করতে পারে। তবু নিজেকে বোঝালাম— এক-আধবার তো করাই যায়। এই অজুহাতেই হাজির হলাম স্পা রুমের সামনে। ভিতরে ঢুকেই বুঝলাম, প্রতিযোগিতা জমে গেছে। কে আগে বুকিং পাবে, সেই নিয়ে চলছে নীরব যুদ্ধ।
স্পা থেকে বেরোতেই চোখে পড়ল রক ক্লাইম্বিং ওয়াল। রঙিন গ্রিপ আর ধাপে ধাপে সাজানো এই দেয়াল অ্যাডভেঞ্চার- প্রেমীদের জন্য নিঃশব্দ আমন্ত্রণ। নতুনদের জন্য সহজ পথ, অভিজ্ঞদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। হারনেস আর প্রশিক্ষিত স্টাফ থাকায় ভয় কম। উপরে উঠতে উঠতে শুধু শরীর নয়, মনও হালকা হয়ে যায়। চূড়ায় পৌঁছানোর মুহূর্তটা তাই শুধু জয়ের নয়, এক গভীর মুক্তির স্বাদ।
ডেক চোদ্দো এসে পৌঁছানো মানেই ছুটির আসল রং। বড়ো বড়ো সুইমিং পুল, ছোটোদের জন্য আলাদা পুল, বয়স্কদের জন্য শাস্ত সোলারিয়াম। চারপাশে রেস্তোরাঁ আর বার। হাতে ঠান্ডা পানীয়, সামনে নীল দিগন্ত। এখানে সময় ঘড়ি দেখে চলে না। কখন দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়, টেরই পাওয়া যায় না।
ডেক সাত থেকে তেরো— নীরবতার ঠিকানা। এখানেই যাত্রীদের কেবিন। দিনের বেলা এই ডেকগুলো প্রায় ফাঁকা৷ সবাই তখন উপরের আলো, শব্দ আর জীবনের ভিড়ে। রাতে ক্লান্ত শরীর আর ভরা মনে ফিরে আসে নিজের ছোট্ট আশ্রয়ে, সমুদ্রের বুকে ভাসমান ঘরে।
তবে এর মধ্যেও কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা রাতেই জেগে ওঠেন, তাদের জন্য আদর্শ ঠিকানা ডেক নম্বর তিন। এখানে রয়েছে ক্যাসিনো রয়্যাল আর লাইভ মিউজিক শো। এই ডেকে পা রাখলেই বোঝা যায়, এটা দিনের জন্য নয়, এটা বানানো হয়েছে রাতের স্পন্দনের জন্য।
এখানে সূর্যের আলো ঢোকে না। তার বদলে আছে ঝলমলে আলো, লাইট মিউজিক আর উত্তেজনায় ভরা বাতাস। দরজা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে সারি সারি স্লট মেশিন। রঙিন আলোয় ঝিকমিক করছে। কখনও বিজয়ের উচ্ছ্বাসে শব্দ ওঠে, কখনও শোনা যায় চাপা দীর্ঘশ্বাস। তার পাশেই ব্ল্যাকজ্যাক, রুলেট আর পোকারের টেবিল। ডিলারের হাতের গতির সঙ্গে সঙ্গে খেলোয়াড়দের নিঃশ্বাসও যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
(ক্রমশ…)





