দেশ-বিদেশে ঘোরা তো কম হল না৷ পাহাড় দেখেছি, শহরের কোলাহল মেপেছি, উড়োজাহাজের জানলায় বসে মেঘের গাল ছুঁয়েছি। তবু কোথাও যেন এক অপূর্ণতা রয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, এবার এমন কিছু চাই, যেখানে গন্তব্য নয়, পথটাই হয়ে উঠবে গল্প। সেই খোঁজ থেকেই সমুদ্রের ডাক।
ক্রুজ সম্পর্কে আমার জ্ঞান তখন শিশুর মতো! কোথায় যাব, কত দিনের সফর, কোন কোম্পানি ভালো— প্রশ্নের পর প্রশ্ন মাথার ভিতর ঢেউ তুলছিল। উত্তর খুঁজতে গিয়ে অবস্থা প্রায় দিশেহারা। ঠিক তখনই এক বন্ধু বলল, জানো, সিডনি থেকে রয়াল ক্যারিবিয়ান দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে ক্রুজ চালায়।
আশার আলো জ্বলে উঠল। অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত টিকিট পাওয়া গেল। নয় দিনের সমুদ্রযাত্রা। শুরু সিডনি থেকে, দু'টি দেশের তিনটি দ্বীপ ছুঁয়ে আবার সিডনিতেই ফেরা। শুনতেই যেন বুকের ভিতর উত্তেজনার ঢেউ উঠল।
তারপর এল প্রস্তুতির পালা। কী কী সঙ্গে নিতে হবে, আবহাওয়া কেমন হবে, খাবার কেমন, সি সিকনেসের জন্য কী ওষুধ— প্রশ্নের শেষ নেই। এর মধ্যেই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে চোখ আটকে গেল— ভানুয়াটু দ্বীপপুঞ্জে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা! ভয় আর উত্তেজনা পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। সাবধানতার জন্য দু'প্যাকেট সি সিকনেসের ওষুধ কিনে রাখলাম। কয়েকটা দিন কেটে গেল অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে, ঘুমের মধ্যে পর্যন্ত যেন সমুদ্রের ঢেউ ডাক দিচ্ছে।

অবশেষে এল সেই দিন। সকালে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল সার্কুলার কী-এর উদ্দেশে। বাড়ি থেকে আধঘণ্টার পথ। ট্যাক্সি যখন সিডনি হারবার ব্রিজের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে, দূর থেকে চোখে পড়ল আমাদের জাহাজ। মনে হল, জলের বুকে ভেসে থাকা এক রাজপ্রাসাদ। ধাতব শরীর, অথচ ভিতরে লুকোনো হাজার গল্প।
গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম। সামনে বড়ো অক্ষরে লেখা—
'রয়াল ক্যারিবিয়ান অ্যানথেম অফ দ্য সিস'।
মনের ভিতর তখন দুটো অনুভূতি পাশাপাশি কাজ করছে— বিস্ময় আর আশ্বাস। বিস্ময় এই ভেবে যে, এত বিশাল এক কাঠামো কীভাবে সমুদ্রের বুকে এত স্বাভাবিক ভাবে ভেসে থাকে। আর আশ্বাস এই কারণে যে, এই জাহাজই আমাদের নিয়ে যাবে অজানার পথে, নিরাপদে। মনে হল, আমি যেন এক অভিজ্ঞতার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছি। যে অভিজ্ঞতা শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর নয়, বরং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের।





