প্রসঙ্গত অঞ্জলি জানিয়েছেন যে, ‘২০০৫ সালে তথ্য অধিকার আইন পাস হয় এবং দেশব্যাপী তা কার্যকর করা হয়। আমরা ‘সতর্ক নাগরিক সংগঠন’-এ কাজ শুরু করি এবং প্রচারের মাধ্যমে তুলে ধরি যে, আরটিআই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন, এবং এটি ব্যবহার করে সরকারের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া উচিত। এটা প্রচার করতে গিয়ে কিছু মহিলা অভিযোগ করেন, অনেক রেশন দোকানের মালিক জানিয়েছিলেন যে, সরকার নাকি কারোর নামে রেশন পাঠায়নি, তাই তারা রেশন দিতে পারবেন না।
এরপর রেশনের বিষয়ে দিল্লিতে প্রথম আরটিআই আবেদনটি দাখিল করা হয়েছিল। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত দুই মহিলা, জারিনা বেগম ও সুনীতা দেবী তথ্য অধিকার আইনের অধীনে একটি আরটিআই আবেদন দাখিল করে মালভিয়া নগর এলাকার রেশন দোকানগুলোর নথিপত্র চেয়েছিলেন। তথ্য প্রকাশিত হলে, স্টক রেজিস্টারে স্পষ্ট ভাবে দেখা যায় যে, প্রতি মাসে দোকানগুলোতে রেশন সরবরাহ করা হচ্ছিল।
সেল রেজিস্টারটি সম্পূর্ণ জালিয়াতি ফাঁস করে দেয়। এতে সমস্ত মহিলাদের নাম ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে, তারা তাদের সম্পূর্ণ রেশন পাচ্ছেন এবং এর প্রমাণ হিসেবে একই আঙুলের ছাপ বারবার ব্যবহার করা হয়েছিল। স্টক রেজিস্টারটি স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করে যে, রেশন দোকানের মালিকরা মহিলাদের মিথ্যা বলেছিলেন। তাদের রেশন আসছিল, কিন্তু দোকানের মালিকরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে তা বাজারে বিক্রি করছিলেন। যখন এই তথ্য প্রকাশ্যে আসে, মহিলারা বলেন যে, তারা প্রথমবারের মতো দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছেন। এরপর তারা ‘সতর্ক নাগরিক সংগঠন’-এর সঙ্গে মিলে অসংখ্য অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু খাদ্য বিভাগ নির্বিকার থাকে। এরপর একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গণমাধ্যম ও রেশন দোকানের মালিকদের পাশাপাশি সমস্ত রেশন দোকানের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে মহিলারা তথ্য অধিকার আইনের অধীনে প্রাপ্ত তথ্য পড়ে শোনান। এই পুরো অনৈতিক কাজটি কীভাবে চালানো হচ্ছিল, তা প্রমাণ করার জন্য তারা তাদের রেশন কার্ডের সঙ্গে সেল ও স্টক রেজিস্টারও তুলে ধরেন।
যখন এই পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে, তার ফল সঙ্গে সঙ্গেই দেখা যায়। এই চুরির সঙ্গে জড়িত দোকানদার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সব মহিলাই সময়মতো তাদের পুরো রেশন পেতে শুরু করেন। কারণ অসাধু লোকেদের এই ভয় ছিল যে, আবার চুরি হলে মহিলারা সবকিছু ফাঁস করে দেবেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এখানে নারীরা তথ্য অধিকার আইনের শক্তি উপলব্ধি করেছিলেন। তারা শিখেছিলেন কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হয় এবং দুর্নীতি বন্ধ করতে হয়। তথ্য অধিকার আইনটি এখন ২০ বছর ধরে কার্যকর রয়েছে। প্রতি বছর সারাদেশে প্রায় ৬০ লক্ষ আরটিআই আবেদন জমা পড়ে। মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে, তথ্য চাইতে এবং সরকারকে জবাবদিহি করতে আরটিআই আবেদন করে। এর মাধ্যমে দুর্নীতি উন্মোচিত হয়।’
প্রতিবাদীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা
অঞ্জলি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমাদের দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নাগরিক তাদের মৌলিক অধিকার প্রয়োগের জন্য তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করেন। এমনকী সবচেয়ে জঘন্য কেলেঙ্কারিগুলো ফাঁস করতেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে। গত ২০ বছরে ফাঁস হওয়া যে-কোনও বড়ো কেলেঙ্কারির মধ্যে অন্যতম ছিল সেনা সদস্যদের পরিবার ও বিধবাদের জন্য বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। এই পুরো কেলেঙ্কারিটি আরটিআই আইনের মাধ্যমেই প্রকাশ্যে আসে। এরই পাশাপাশি, ব্যাপম কেলেঙ্কারিতে মেডিকেলে আসন পূরণের জন্য একটি জালিয়াতি করা হয়েছিল। এই কেলেঙ্কারিটি ফাঁস করতে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করা হয়েছিল। একই ভাবে, কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারি ফাঁস করতেও এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।’
অঞ্জলির মতে, ‘আরটিআই আইন হল এমন একটি আইন, যা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে। স্পষ্টতই, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা এই আইনটি অপছন্দ করেন এবং তথ্য জানতে চাওয়া প্রার্থীদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেন, তাদের উপর হামলা চালান এবং ভয় দেখান। ১০০ জনেরও বেশি আরটিআই ব্যবহারকারীকে হত্যা করা হয়েছে।’
(ক্রমশ…)





