রাত ন’টা নাগাদ হাতরুটির ডিনার খেয়ে হাঁটতে বেরোলাম পাহাড়ি রাস্তায়। প্রতিটি পিঠের ব্যাগ মাপিয়ে পাঁচ কিলোর আয়ত্তে নিয়ে এলাম নিয়মমাফিক। নীচের দিকে তাকালে গভীর গিরিখাত। সবুজ রঙে কালচে ধরেছে রাতে। তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে টুনি বালবের আলো। এক একটা আলো যেন এক একটা ঘর, জীবনের উচ্ছ্বাস। আকাশ তখন পরিষ্কার। মিটিমিটি হাসছে সপ্তর্ষিমণ্ডল। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এই পথ এঁকেবেঁকে উঠে গিয়েছে সীতাপুর হয়ে সোনপ্রয়াগ, গৌরীকুণ্ডের দিকে। হাজার হাজার পুণ্যার্থী এই পথে গৌরীকুণ্ড পৌঁছে চব্বিশ কিলোমিটার পথ হাঁটতে শুরু করে সেই পরমের উদ্দেশ্যে। পিট্টু যায়, ঘোড়া যায়, খচ্চর যায়, ডোলি যায়। আর যায় হেলিকপ্টার। সেই হেলিকপ্টারের ভরসাতেই আমাদের সেরসীতে থাকা।
অনলাইনে IRCTC app থেকে বুক করা ছিল রাউন্ড ট্রিপ। অগত্যা রাতে একটু হাঁটাহাঁটির পর তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া। বাইরে তখন তিন কী চার ডিগ্রি। মানে টেম্পারেচার। আর শরীরে? টগবগিয়ে ফুটছে রক্ত, কী ভীষণ উত্তেজনা! সারারাত সে উত্তেজনা দু’চোখের পাতা মেলাতে দিল না। আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরে স্বপ্নপূরণের সেই দিন, সেই আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। যেন আধো ঘুমে অবচেতনে দেখতে পাচ্ছিলাম তাঁর ঘর, স্বপ্নের মন্দির। আমরা আসছি, আসছি আমরা। ভোররাতের দিকে একবার উঠে গেলাম জানলায়। ওই তো দেখা যাচ্ছে তাঁর চুড়ো। অকৃত্রিম আলোয় উদ্ভাসিত তাঁর রূপ। যেন দেবাদিদেব বসেছেন সাধনায়, ধ্যানে। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে আদিগন্ত প্রকৃতি। জানলা দিয়ে হাত বাড়ালাম। ডেকে নিও হে আমার পরম, হে কেদারনাথ।

তোড়জোড় শুরু। সকাল সকাল স্নান করে সোজা হিমালয়ান হেলি সার্ভিসের অফিসে সকাল দশটার মধ্যে। ওজন মেপে পাঁচ কেজির পিঠব্যাগ তৈরি করে রেখেছিলাম আগেই। তাই এই নিয়ে আর কোনও সমস্যা হল না। বোর্ডিং পাস মিলল। চেপে বসলাম হেলিকপ্টারে। জীবনের প্রথম হেলিযাত্রা। ইতিমধ্যে আকাশের মুড বিগড়েছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। কিন্তু তাতে কী? একবার যখন ডাক পেয়েছি, পৌঁছে যাব ঠিকই। পাইলট এসে সব নিয়মকানুন জানিয়ে গেলেন। মাথার উপরের পাখা জানান দিল, সময় হয়েছে। মাটি ছাড়লাম। একটু একটু করে আমরা উপরের দিকে উঠতে থাকলাম। উপর থেকে নীচের দিকে তাকাতে আমার বরাবরই খুব ভয়। কিন্তু এই প্রথম সমস্ত ভয়কে উপেক্ষা করে তাকালাম নীচে।
সবুজ পাহাড়ে বৃষ্টির রং-ও সবুজ। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে রোদ। রোদ পোহাচ্ছে ছোটো ছোটো ঘর। ঘরের জানলায় উঁকি মারছে সবুজ প্রান্তর। সে প্রান্তরে পাহাড়ের বুকে আলো-আঁধারি। ওই নীচে বয়ে যাচ্ছে মন্দাকিনী, সরু আরও সরু। যেন পাহাড়ি মেয়ে তার বেণী শুকোতে দিয়েছে লম্বা। যতটা উচ্চতায় উঠে গেলে নীচের ছবি অস্পষ্ট হয়ে আসে, আমরা ততটা উচ্চতা পার করে ৭ মিনিটে পৌঁছে গেলাম আর একটা হেলিপ্যাডে। ওই যে সামনে তুষারধবল হিমালয় সাজিয়ে রেখেছে তার শৃঙ্গরাজি। মাটিতে পা রাখতেই সারা শরীরে শিহরণ জাগল। নিজের বিস্ময়ে সংশয় জাগল। স্বপ্ন কখনও যে এমন ঐশ্বরিক উপায়ে বাস্তব হতে পারে, তা বুঝতে বুঝতেই বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল এখানে। কী অসম্ভব তাঁর টান, কী মারাত্মক পজিটিভ এনার্জি এখানে, যাকে উপেক্ষা করার সাহস, ক্ষমতা, ইচ্ছে, স্পর্ধা কোনওটাই আমাদের কখনও ছিল না, হয়নি, হবেও না।

বৃষ্টি তখন হালকা, আকাশে তখন ধোঁয়াধোঁয়া মেঘ। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম সেই পরমের উদ্দেশ্যে, তাঁর ঘরের দিকে। প্রবল ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম মন্দিরের দিকে। হাওয়ায় উড়ে আসা আমরা এই দর্শনার্থীর ভিড়কে প্রণাম করি। গৌরীকুণ্ড থেকে প্রায় চব্বিশ কিলোমিটার হাঁটাপথ পেরিয়ে এই পুণ্যার্থীর ভিড় আজ এখানে মন্দির প্রাঙ্গণে। তাদের মধ্যে কেউ এসেছেন ঘোড়ায় বা খচ্চরে কেউ ডোলিতে (পালকিতে) বা পিটুতে। আর বেশিরভাগই পদব্রজে। এ পথ মহাভারতের পথ। এই যাত্রা পঞ্চপাণ্ডবকে ফিরে দেখার যাত্রা। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম প্রধান জ্যোতির্লিঙ্গ।
কথিত আছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর পাপস্খলন এবং প্রায়শ্চিত্ত করতে পঞ্চপাণ্ডব এই স্থানে এসে পৌঁছান মহাদেব দর্শন করে তাঁর আশীর্বাদ নেওয়ার উদ্দেশ্যে। মহাদেব তাদের এড়িয়ে যেতে ষাঁড়ের রূপ নিয়ে গুপ্তকাশিতে লুকিয়ে থাকেন। ভীম তাঁকে চিনতে পেরে ধরতে যান এবং মহাদেব অদৃশ্য হয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি পঞ্চভাগে ভাগ হয়ে পাঁচটি বিভিন্ন স্থানে ফিরে আসেন। কেদারনাথে ষাঁড়ের কুঁজ, রুদ্রনাথে মুখ, মধ্য মহেশ্বরে নাভি এবং পেট, তুঙ্গনাথে বাহু এবং হৃদয় আর কল্পেশ্বরে তাঁর জটা। এভাবেই সৃষ্টি হয় পঞ্চকেদার। তাঁকে অনুভব করতে গেলে শীতলতার গহনে ঢুকতে হয়, প্রবল শৈত্যকে জয় করতে হয়, কঠিন থেকে কঠিনতম পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় তার কাছে।
(ক্রমশ…)





