ভারতীয় নারীর পোশাক বলতে প্রথমেই মনে হয় শাড়ির কথা। অনেকেই বিশ্বাস করেন শাড়িই নারীকে আরও মোহময়ী করে তোলে। ভারতীয় শাড়ির ঐতিহ্য তো আজ নতুন নয়, ইতিহাস হয়ে গেছে। সেই কোন যুগ থেকে গোটা বিশ্বের দরবারে ভারতের পরিচয় বাহক হয়েছে ভারতীয় শাড়ি। বিশ্ব বাণিজ্যে ভারতকে শ্রেষ্ঠ আসন এনে দিয়েছিল ভারতীয় সিল্ক শাড়ি। যে পথে সুদূর অতীতে এই বাণিজ্য চলত, তার নামই হয়ে গিয়েছিল সিল্করুট। সেই ধারা আজও বহমান।

তবে শুধু সিল্কই নয়, ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন শাড়ি, যেমন বেনারসের বেনারসি, তামিলনাড়ুর কাঞ্জিভরম, গুজরাটের পৈঠানি, লখনউয়ের চিকন, চেন্নাইয়ের মাদ্রাজি সিল্ক, জয়পুরের জয়পুরি বা বাঁধনি ও বাংলার তাঁত আজও ভারতের গৌরব। এমনকী শাড়ি পরার ধরনও বিশিষ্টতা প্রদান করে। এই সমস্ত শাড়ির মধ্যে বাংলার তাঁত, বিশেষভাবে জনপ্রিয়। পুরোপুরি সুতির এই তাঁতের শাড়ি যে-কোনও উৎসবে বাঙালির Fashion ও অঙ্গশোভায় একেবারে প্রথম পছন্দ হয়ে আছে। তাঁতের শাড়ির বিশেষত্ব হল, একটি একটি সুতো কারিগর নিজের হাতে বুনে, ভাবনার রং ও ডিজাইনে সাজিয়ে তোলেন। আর সব মিলিয়ে বাংলার তাঁত হয়ে ওঠে একটা শিল্প। এই শিল্প আজ আর বাংলার রমণীদের অঙ্গেই শোভাবর্ধন করে না, ভারতের অন্যান্য প্রদেশ, এমনকী বিদেশেও খুব জনপ্রিয়।

বৈশিষ্ট্য

পশ্চিমবাংলার শান্তিপুর, ফুলিয়া, কৃষ্ণনগর ও ধনেখালি প্রভৃতি জায়গার তাঁতের শাড়িগুলি নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে জগৎবিখ্যাত। তাঁতের শাড়ি মূলত সুতির। তবে এখন শাড়িতে ভ্যারাইটি আনতে সুতির সঙ্গে সিল্কের মিশ্রণ করে থাকেন তাঁতিরা। তবে সুতো যে প্রকারেরই হোক, শাড়ি বোনা হয় কিন্তু হাতে। সাধারণত ২৫০ টাকা থেকে শুরু হয়ে শাড়ির অভিনবত্ব অনুযায়ী দাম বাড়তে থাকে। এমন কোনও বঙ্গললনা নেই, যার শাড়ির কালেকশনে তাঁতের ভ্যারাইটি নেই। তাঁতের শাড়ির জন্য বিখ্যাত জায়গাগুলির প্রত্যেকটির তৈরি শাড়ির বৈশিষ্ট্যও আলাদা আলাদা।

ধনেখালির তাঁত

হুগলি জেলার ধনেখালিতে তৈরি তাঁতের শাড়ি বিশ্ব-দরবারে ধনেখালি তাঁত নামে প্রসিদ্ধ। এই শাড়িগুলি সম্পূর্ণ সুতির, একটি একটি সুতো সাজিয়ে শিল্পী তার মনের মতো রং আর ডিজাইনে বুনে থাকেন। এর সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল, ধনেখালির প্রতিটি শাড়ির আঁচলে বিনুনির মতো করে সূতো বোনা থাকে। ধনেখালি তাঁত অত্যন্ত জনপ্রিয় শাড়ি। এর রংও দীর্ঘস্থায়ী হয়। দাম মোটামুটি ২৫০ টাকা থেকে শুরু।

শান্তিপুরের তাঁত

তাঁত দুনিয়ায় শান্তিপুরি তাঁতও খুব জনপ্রিয়। তবে এই তাঁত সুতি ও সিল্ক দুইপ্রকারই হয়ে থাকে। তাঁতশিল্পীরা সিল্কের সুতো খুব সূক্ষ্মভাবে হাতেই বোনেন। এই শাড়িগুলি রূপকথার মতোই সুন্দর। একেবারে পাতলা শাড়িতে ছোটো ছোটো বুটি যেন ফুল ফুটে আছে বলে মনে হয়। শান্তিপুরি তাঁত খুবই জনপ্রিয় শাড়ি।

তাঁত টাঙ্গাইল

এই শাড়িগুলিতে চওড়া সুতোর কাজ করা পাড় থাকে, কিন্তু শাড়ির ভিতরে কোনও কাজ থাকে না। সম্পূর্ণ সুতির এই শাড়িগুলির আঁচল হয় খুব সুন্দর।

তাঁত ঢাকাই

ঢাকাই নাম হলেও, এই শাড়ি শান্তিপুরেই তৈরি হয়। এই শাড়ি সুতি ও সিল্ক দু’ধরনেরই হয়। চাহিদাও খুব এই শাড়ির। রং ও ডিজাইনের ভ্যারাইটিতে এই শাড়ির তুলনা সত্যিই কম।

তাঁত জামদানি

খুবই সূক্ষ সুতোয় বোনা হয় এই শাড়ি। গোটা শাড়িতে দারুণ সব ডিজাইনে সুতোর কাজ করা হয়। যে-কোনও মহিলারই এই শাড়ি প্রথম পছন্দের হয়ে উঠতে পারে।

তাঁত বেনারসি

যে-কোনও বিয়ে বাড়ি এমনকী বিয়ের কনের পোশাকও হয়ে উঠতে পারে তাঁত বেনারসি। এই শাড়ি সুতি ও সিল্ক সুতোর সংমিশ্রণে তৈরি এবং আঁচল ও পাড় ভারী জরির কাজে মোড়া। এই শাড়ি প্রায় প্রত্যেক মহিলাই চান তার কালেকশনে একটা থাকুক।

তাঁত বালুচরি

যারা অনুষ্ঠানে-উৎসবে বেনারসি পরতে একঘেয়ে বোধ করছেন, তাদের জন্য সেরা পছন্দ বালুচরি আর সেটা যদি হয় তাঁত বালুচরি, তাহলে তো কথাই নেই। তাঁত বালুচরি সুতি ও সিল্কের তৈরি হলেও মহিলারা সিল্ক বালুচরিই বেশি পছন্দ করেন। দাম মোটামুটি ২৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে কাজ অনুযায়ী দাম বাড়তে থাকে।

তাঁতের শাড়ি কেনার সময় কী কী বিষয়ে নজর দেবেন :

–    তাঁতের অনেকরকম শাড়ি রয়েছে যেমন, ঢাকাই, ঢাকাই জামদানি, বালুচরি, সাধারণ সুতির তাঁত ইত্যাদি। আগে ঠিক করতে হবে কোনটা কিনবেন।

–    সুতি বা সিল্ক যাইহোক, মেটিরিয়ালটি যেন ভালো হয়। মেটিরিয়াল ভালো হলে রং টেকসই হয়। আর মেটিরিয়াল বুঝতে হলে ঘন বুনন দেখে নিন।

–    দামের উপরও নির্ভর করে শাড়ির কোয়ালিটি। ২০০ টাকার তাঁতের যে কোয়ালিটি হবে, ১০০০ টাকার উপর তাঁতের শাড়ি নিশ্চয়ই তার থেকে অনেক ভালো হবে।

–    শাড়ি কেনার সময় একই রেঞ্জের অনেকগুলি শাড়ি দেখুন, দেখে সেরাটা বেছে নিন।

–    সবচেয়ে ভালো হয় দোকানিকে বিশ্বাস করা। ঠিক যেরকম জিনিসটি চাইছেন, বিক্রেতাকে বুঝিয়ে বলে দিন। বিশ্বাস রাখুন তিনি আপনাকে সেরা জিনিসটিই দেবেন।

–    শপিং-এর সময় এমন কাউকে সঙ্গে নিন, যিনি শাড়ির কোয়ালিটি বোঝেন।

–    দামি তাঁতের শাড়ি কিনতে হলে, নামকরা দোকানে যাওয়াই ভালো, এতে ঠকার ভয় থাকে না।

তাঁতের শাড়ির দেখভাল

–    সাধারণ তাঁতের শাড়ি কাচার সময় সফট ডিটারজেন্ট ব্যবহার করুন।

–    দামি তাঁতের শাড়ি যেমন ঢাকাই, ঢাকাই জামদানি, তাঁত বেনারসি এগুলি জলে না কেচে ড্রাই ওয়াশ করান।

–    তাঁতের শাড়িতে একধরনের পালিশ করানো হয়, ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখার জন্য। মোটামুটি পালিশের খরচ পড়ে ৬০ টাকার মধ্যে।

–    জরির কাজ করা তাঁতের শাড়ি কখনওই হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। এতে জরি আলগা হয়ে যেতে পারে।

–    আলমারিতে শাড়ি রাখার সময় বড়ো ভাঁজে পাট করে রাখুন। এতে শাড়ি ভাঁজে ভাঁজে ছিঁড়ে যায় না।

 

Tags:
COMMENT