ছেলেধরা

আমি উত্তমকুমার।

হাবরা থানার সেকেন্ড অফিসার টেবিল থেকে মুখ তুলে দুটো ভ্রূ যথাসম্ভব কাছাকাছি আনলেন। তাঁর চোখের শ্লেষ ও বিরক্তির জিজ্ঞাসায় কিছুটা থতমত, টেবিলের অপর প্রান্তের দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি গড়গড় করে বলতে থাকে– মানে আমি উত্তমকুমার দাম। আজ ২টো ২০-র বনগাঁ লোকালে আমার পিক্পকেট হয়েছে। হাজার দেড়েক টাকা ছাড়াও ওয়ালেটে ছিল ব্যাংকের ডেবিট কার্ড। আর পকেটের মোবাইলটাও গেছে। হাবরা থানার সেকেন্ড অফিসারকে এটুকু বলতেই ঘেমে একসার। আসলে থানা-পুলিশ নিয়ে তার দুর্বলতা আছে।

সেদিনও ঘেমে নেয়ে দুপুর রোদের ভেতর এক সংবাদপত্রের অফিসের বিজ্ঞাপন বিভাগে ঢুকে কাগজে লেখা টুকরোটি দিয়েছিল। ‘আমি উত্তমকুমার দাম। বয়স পঁয়ত্রিশ। অবিবাহিত। কর্পোরেট সংস্থায় চাকুরে। বিবাহে ইচ্ছুক। দ্রুত যোগাযোগ করুন।’সেদিন মঙ্গলবার, পরের রোববারের কাগজে বেরিয়ে যাবে বিজ্ঞাপন। সুইং ডোর ঠেলে পথে নেমে পড়ে। দেখা যাক। নীরদ চৌধুরির কথাটা প্রেমে ল্যাং খাবার পর প্রতিদিনই চোখের সামনে ভেসে উঠছে– ‘বাঙালিরা কোনও কাজ নিজে নিজে করতে পারে না, এমনকী নিজের বিবাহটাও নয়।’ দেখা যাক। গোটা ব্যাপারটাই নিজের হাতে করব। ছাঁদনাতলা থেকে রাঁধুনি– সব নিজের হাতে করব। এমনকী করবীকে নিজের হাতেই বিয়ের আমন্ত্রণপত্রটি দিয়ে চা খেয়ে আসব। বিয়ের একটা ডেট ঠিক করে ফেলা যাক। ১৮ অগ্রহায়ণ। শুক্রবার। ঠিক থাকল। না অন্য কেউ দিন ঠিক করবে না। যে মেয়ে বিয়ে করবে তাকেও ওই দিনেই বিয়ে করতে হবে। কোনও পালটাপালটি নয়। কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে আজই কার্ডের নমুনা টমুনা দেখে আসতে হবে। বিয়ের কার্ড অন্তত শ’পাঁচেক ছাপতে হবে। রাসবিহারী কানেক্টরে বোসপুকুরের কাছে বিয়ে বাড়িটার যেন কী নাম– ‘নীলিমা’! অগ্রিম দিয়ে আসতে হবে। ভাবতে ভাবতে দুপুর রোদের ভেতর হেঁটে হেঁটেই ডালহউজি নিজের অফিসে ফিরে আসে।

বেশ ছটফট করছে সে। বুকের ভেতর অশান্তি নামে নাছোড় এক পদার্থ গড়িয়ে গড়িয়ে ছেয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীরে। রক্তের প্রবাহ পথে, তার মনে হচ্ছে সমস্ত শরীরেই এই আনচান ভাবটা ঢুকে পড়েছে। মনে পড়ছে গত পরশু দিন বিকেল বেলায় ওই যে শব্দের ছোবল কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করল– তারপর থেকেই এই অস্থিরতা। গত দুবছরে কতদিনই তো রেস্তোরাঁয় বসে চা-কফি খেতে খেতে পায়ের আশ্লেষে হূদয়ের আকুলতা প্রকাশ করেছে উত্তম। তাতে তো সায়ই দিয়েছে করবী, ওর নগ্ন দু-পা আরও প্রলম্বিত করে। অথচ পরশু শান্তনুর কথাটা তুলে পার্ক স্ট্রিটের ফেলিনি-তে টেবিলের তলায় পা দিয়ে পায়ে ছোঁয়া লাগাতেই, খাঁচার বাঘিনীর মতো গর্জে উঠেছে করবী। ইউ রাসকেল্ হোয়াই আর ইউ প্রেসিং সো হার্ড! মাইন্ড ইট দ্যাট ইউ আর অ্যাবভ থার্টি-ফাইভ, হোয়ারআজ  আই এম টোয়েন্টি টু অনলি। থতমত উত্তম করুণ করে বলেছিল– মানে!

কোনও মানে নেই। সব কথার উত্তর তোমাকে দিতে হবে তার কোনও মানে নেই। শান্তনুও আমার ভালো বন্ধু, তার সাথে আমি সিঙ্গাপুরে যেতেই পারি। বড়ো কথা কোম্পানি আমাদের পাঠাচ্ছে সিঙ্গাপুরে, কোম্পানির স্বার্থেই। উত্তম ভালো করে জানে না কী কোম্পানি, তাদের কী ব্যাবসা সিঙ্গাপুরে। একটা দম নিয়ে পুনরায় করবী বলে, তোমার গায়ে জ্বালা হচ্ছে যখন, লেট মি সে টাটা, বাই। করবী টেবিলটাকে এমন পুশ্ করে উঠে পড়েছিল যে ঝুঁকে থাকা উত্তমের বুকে এসে সজোরে ধাক্বা মারে। উত্তম কোনও কথা বলতে পারেনি। বুকে হাত বোলাতে বোলাতে করবীর তেজী ভঙ্গির ক্ষীপ্র গমনটিকে চোখে গেঁথেছিল, বুঝে উঠতে পারেনি। যেভাবে ভারী কোনও আঘাত প্রথমে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে অনুভবহীন করে দেয়– কিছু পরে মস্তিষ্কের নিউরনে যন্ত্রণা পাঠাতে থাকে, তেমনই।

বিয়ে করল উত্তমকুমার। পাত্রীও তার পছন্দের। নম্রস্বভাব। সুশ্রী, সুন্দরী। বিয়ের পরেই প্রেম করবে ভাবল সে। অনেক ভালোবাসবে। ওকে ভালোবেসেই বুকের জমানো অন্ধকার দূর করে ফেলবে। বিয়ের রাতে তৃণাকে উত্তম এক অবসরে জিজ্ঞাসা করেছে– কি, বর পছন্দ? মুখে সলজ্জ হাসি টেনে মাথা নেড়ে ইতিবাচক মতামত জানিয়েছে। উত্তম জানিয়েছে দিন দশেকের মধ্যেই তারা বেরিয়ে পড়বে হানিমুনে। কাঠমান্ডু যাবে। সেখান থেকে ফেরার পথে বেনারস, লখনউ হয়ে একমাস পরে বাড়ি ফিরবে। দশ লাখ টাকা খরচ করবে হনিমুন টুরে।

এসব শোনার পর তৃণা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছিল উত্তমের। মেয়েবাড়িতে এর বেশি এগোনো যায় না। শুধু ছোঁয়াছুঁয়ি আর আকার-ইঙ্গিতে ভালো লাগা ব্যক্ত করা যায়। বউভাত ও তার পরের কয়েকদিন উত্তমের অসাধারণ কেটেছে। বউভাতে করবীও এসেছিল শান্তনুকে নিয়ে। উত্তম করবীকে নিয়ে বউ-এর সাথে আলাপ করিয়েছে। উদ্দেশ্য আরও কাছ থেকে দ্যাখো, দ্যাখো কে বেশি সুন্দরী– তুমি না আমার বউ। খুব বয়স নয় তৃণার, ২৫-এর কাছাকাছি হবে। উত্তম করবীর মুখের নানা পরিবর্তন দেখে নিজেকে তারিফ করেছে। করবীকে বিট্ করতে পারার এই আনন্দেই যেন কটা দিন চলে গেল। এরপর দ্বিরাগমনের প্রথা ট্রথা কাটিয়ে অফিসে জয়েন করেছে। হনিমুন ট্রিপের জন্য গোছগাছ।

এসময় উত্তমের জন্য আবার একটি ভয়ংকর আঘাত অপেক্ষা করে ছিল। অফিস ফেরত দেখে বউ বাড়ি নেই। বৃদ্ধা মা জানায় সকাল বেলায় এগারোটা নাগাদ ট্যাক্সি ডেকে একটা বড়ো সুটকেশ নিয়ে বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে। উত্তম ফোন বাজায় কেউ ফোন ধরে না। উদ্বিগ্ন উত্তম ঠিক করেছে সকাল হলেই সে শ্বশুড়বাড়ি যাবে খোঁজখবর নিতে। পরের দিন সকালের ঘুম ভাঙে তার কলিং বেলের আওয়াজে। ঘুম চোখেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে দেখে একজন পুলিশ অফিসার, সঙ্গে দু-তিনজন কনস্টেবল।

– আপনি উত্তমকুমার দাম?

ভ্যাবাচ্যাকা উত্তম কিছু না বুঝেই ঘাড় নাড়ে।

আপনি আমার সঙ্গে চলুন, কড়েয়া থানায়। আপনার উপর বধূ নির্যাতনের অভিযোগ আছে। আপনাকে দেখে সম্ভ্রান্ত মনে হয়, কিন্তু টাকার জন্য এরকম ফুটফুটে মেয়ের শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকায় বীভৎস দাগ করে দিতে পারেন? ক্যাশ টাকা দিয়েছিল ওরা তিন লাখ, আর আপনার আরও দু লাখের ডিমান্ড ছিল!

উত্তমের মাথায় কিছু ঢুকছে না। একটা বড়ো বিপদ যে আসছে বুঝতে পারল। মোবাইল থেকে সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেন্ড-ফিলসফার অফিসের শম্ভুদাকে ফোন করে বলল, কড়েয়া থানায় আসতে। শম্ভুদা ওকে জামিনে ছাড়িয়ে আনল বটে তবে উত্তমের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তিন লাখ টাকা নিঃশব্দে চলে গেল ওর বউ, মানে তৃণা নামে সেই মেয়েটির বাড়িতে। সোনা-গয়না বিয়ের দামি উপহার সামগ্রী-সহ আরও লাখ দুয়েক টাকার জিনিস মেয়েটা সুটকেস ভর্তি করে নিয়ে গিয়েছিল। হাজতেই ডিভোর্স পেপার সই হয়ে গিয়েছিল। এই তিন লাখের এক লাখ নিঃসন্দেহে থানার বড়োবাবু পেয়েছিল। না হলে এত নিখুঁত, সাজানো নাটক করা যেত না। থানার বাইরে চার-পাঁচজন মহিলাকে ও দেখেছিল পোস্টার হাতে স্লোগান দিতে– নারীনির্যাতনকারী উত্তমকুমার দামের শাস্তি চাই। এত দ্রুত, এত সকালে চলে এসেছে ওরা! বড়োবাবুও খুব ভালোমানুষের মতো উপদেশ দিয়েছে ওদের টাকাটা ফিরিয়ে দিন, আর বিয়েটা যখন ভেঙেই যাবে এখনই ডিভোর্স পেপারে সইটই করে মানসম্মান বাঁচান। এখনও লোক জানাজানি হয়নি তেমন। উত্তম বোঝাতেই পারেনি যে পণ নিয়ে ও বিয়ে করেনি। আর বধূ-নির্যাতনের কথা তো দূরঅস্ত, একটু জোরে বউয়ের নাম ধরে ডাকাও হয়ে ওঠেনি তখনও।

টাকার ক্ষতি, ক্ষতি নয়, নিজের উপর থেকে বিশ্বাসটাই চলে গেল। বুক ভেঙে গেছিল, শোবার ঘর থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে বাইরেই বের হয়নি। এক সময়কার কলকাতার মাঠের ডাকসাইটে স্টপার ছিল। যত গোল করেছে তার চেয়ে ঢের বেশি করিয়েছে। কিন্তু এখন পরপর গোল খেয়ে যাচ্ছে। করবীকে টেক্বা দিতে তেমন কোনও খোঁজখবর না নিয়েই খুব দ্রুত বিয়েটা সেরেছিল। কিন্তু কী করে পারল মেয়েটা! আজও ভেবে পায় না। এখন হাবরা থানায় ডিউটিরুমে বসে এফআইআর লেখাতে লেখাতে উত্তমের মনে পড়ছিল এসব কথা। পাশের কনস্টেবল দাদার কাছ থেকে বিড়ি চেয়ে একটা বিড়ি ধরাল। মাথাটা উত্তর কলকাতার ট্র্যাফিক জ্যামের মতো জমাট হয়ে আছে।

এখন সে বিড়ি খায়। বলে, বিড়ি না ফুঁকলে মাটির কাছাকাছি যাওয়া যায় না। আমার কাজই মাটির সাথে, মাঠের সাথে– বলে অল্প করে হাসে। এবছর উত্তম বড়ো ক্লাবের স্পটার। গোদা কথায় ছেলেধরা। ফুটবল মরশুমের আগে কলকাতার মাঠের বড়ো ক্লাবগুলির রিক্রুটারদের কাছে ওর ডিমান্ড এখন বেশ। গত নয় বছর ও এই ছেলেধরা, মানে স্পটারগিরি করছে। আচমকাই এই কাজটা শুরু হয়। করবীর কাছ থেকে আঘাত ও বিয়ের পর বউ পালানো ও থানা-পুলিশ ইত্যাদির ধাক্বায়, উত্তমকুমার বেশ গভীর একটা ডিপ্রেশনের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল। অফিসে যেত মাসে হাতে গোনা কয়েকদিন। মানুষজন পছন্দ করত না। নিজের কাছে নিজেকেই লুকোতে চাইত। সারাদিন গোটা কলকাতার খোলা মাঠের কোণটোনে বসে কাটিয়ে, অনেক রাতে ঘরে ফিরত। এরকম করতে করতে গোটা কলকাতার মাঠের ফুটবল খেলা দেখে ফেলেছিল সে বছর। একদিন উত্তর কলকাতার একটা মাঠে স্কুল ফুটবল দেখছিল। একটা বছর ১৪-১৫ ছেলের খেলা ওকে নাড়িয়ে দেয়। স্টপার। খেলা শেষে নাম জিজ্ঞাসা করে। ওর নাম হাসান। বস্তিতে থাকে। দেশবন্ধু স্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র। উত্তম ছেলেটার ভেতর একদম নিজের গড়ন দেখল। বেশ লম্বা। ছ’ফুটের উপর হবে। দারুণ সম্ভাবনা। রাতে ঘুম হল না। পরের দিন অফিসে গিয়ে শম্ভুদাকে বলল, ওই ছেলেটিকে একটা ক্লাব দিতে হবে। সেই শুরু। ছেলেটিও ইতিমধ্যে ভারতীয় জার্সি গায়ে দিয়ে ফেলেছে।

গত দু’বছরে কলকাতার মাঠের তাঁবুগুলোতে তার নাম একটা বিষয়। এভারেডি ইলেভেন ২ঙ্মঙ্মজ্জ-এর ক্লাব ফুটবলের হিসেব-টিশেব সব বদলে দিয়েছে। চারটে বড়ো ক্লাবকেই গোল মেরে দিয়েছিল। দু’টোর সাথে ড্র, দুটো জয়। সেই এভারেডির দুটো স্টপারই এবছর, ২০০৭-এ গোটা ভারতের মাঠ শাসন করছে। বিড়িখোর উত্তমই ওই স্টপার দুটোর স্পটার ছিল। এবছর বড়ো ক্লাবের স্পটার হিসেবে তিনটে জায়গাতে অ্যাসাইনমেন্ট আছে। গোলকিপার, ডিপ ডিফেন্স আর তার নিজস্ব প্রিয় জায়গা স্টপার পজিশনের জন্য। মোটা টাকার চুক্তি। বছরে বিশ লাখ। দশ লাখ টাকা অ্যাডভান্স পেয়েছে। অফিসে হাজিরা খাতায় সই করে দু-এক কাপ চা খেয়ে, শম্ভু-দার সঙ্গে একবার দেখা করে কেটে পড়ে। প্লেয়ার কোটায় চাকরি হয়েছিল বছর ষোলো আগে। গ্রুপ ডি। এখন পদোন্নতি হয়েছে। গ্রুপ সি। ওর শুধু আসা-যাওয়া। কাজের মধ্যে নিয়ম করে শম্ভুদার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো। এই মানুষটাকে ও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে আর শ্রদ্ধা করে। শ্রদ্ধা করারই মতো।

প্রথম দিন শম্ভুদার কাছে গল্পটা শুনেই সে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিল। গল্পটা শম্ভুদার স্ত্রী আত্রেয়ীকে নিয়ে যতটা, তার চেয়ে ঢের শম্ভুদা নিজেই। লাখোটিয়া কম্পিউটার সেন্টার, কলকাতার প্রথম যুগের কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারের অন্যতম। সেখান থেকে এক বছরের কোর্স করেই এন্টালির ডাকাবুকো বিএ পাস শম্ভু রাহা, এই কোম্পানির কম্পিউটার অপারেটরের চাকরিটি পায়। মাঝে মধ্যেই শম্ভুদার সহকর্মী দীপকের খোঁজ করে অফিসের ল্যান্ড ফোনে কল আসত আত্রেয়ীর। দীপক অফিসে বেশ অনিয়মিত ছিল, তাই ফোনটা ধরতেন শম্ভুদাই। প্রথম প্রথম আড়ষ্ট আলাপ, ক্রমশ বন্ধুত্ব। তারপর অন্তরঙ্গতা। এদিকে অনিয়মিত হওয়ার কারণে দীপকের চাকরিটি গেল। একদিন আত্রেয়ী চাইল দেখা সাক্ষাৎ হোক। শম্ভুদা বলল, বেশ। কোথায়, কখন তা আত্রেয়ী ঠিক করে। প্রথম দিন ছিল শনিবার, ধর্মতলায় মেট্রো সিনেমার সামনে, সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। কিন্তু কী করে চিনব, শম্ভুদা জিজ্ঞাসা করেছিল। আত্রেয়ী জানায় সে কালো রঙের চুড়িদার পরবে।

শম্ভুদা বলেছিল, আমি থাকব পিংক টি-শার্ট আর ব্লু জিনসে। শনিবার দুটোর পরেই ছুটি। শম্ভুদা ক্লাব, ক্যান্টিন করতে করতে চারটে বাজিয়েছে মাত্র। আরও দেড় ঘন্টা! সময় আর কাটতেই চায় না। অফিস থেকে এসপ্ল্যানেড হেঁটে দশ মিনিটের পথ। আর এই বিশেষ দিনে তো হাঁটা যায় না, ট্যাক্সি করতে হবে। শম্ভুদা সাড়ে চারটের মধ্যেই চলে এসেছে। এত আগে কী করবে, ফুটপাথে বইপত্রের দোকান থেকে বইপত্র দু-একটা তুলে তুলে দেখছে। ইতিমধ্যে সিনেমার শো ভেঙেছে। অনেক মানুষ। খুঁজে পাবে তো! মনে মনে একটা আশঙ্কাও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, কই কালো-চুড়িদারে কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। শম্ভুদা মনে মনে ভাবল, আমার ঘড়িটা ঠিক আছে তো! ঠিক এখানটাতেই তো বলেছিল! তখনও মোবাইল ফোনের যুগ চালু হয়নি। ফলে প্রতীক্ষার দীর্ঘতা অস্বস্তি বুনে চলে মাথার ভেতর। প্রায় একঘন্টা কেটে গেছে, সাড়ে ছ’টা নাগাদ নীল শিফন শাড়ি পরা একটা মিষ্টি মেয়ে তার দিকে এগিয়ে এল। ঘন্টাখানেক আগেই ওই দীর্ঘাঙ্গী সুশ্রী মেয়েটা ওর চোখে পড়েছে। শম্ভুদা ভেবেছিল সিনেমা দেখতে এসেছে, ওর সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল, আপনি শম্ভু রাহা?

হ্যাঁ। কিন্তু আপনি?

মেয়েটি হেসে জবাব দেয়, সে-ই আত্রেয়ী। বড়ো একটা শ্বাস নিয়ে শম্ভুদা অনেকক্ষণ ওর চোখে তাকিয়ে ছিল। কোনো অনুযোগ করেনি। পোশাক পালটানোর কারণও জিজ্ঞাসা করেনি। পরে অবশ্য জেনেছিল, ইচ্ছা করেই আত্রেয়ী নিজের পোশাকের ভুল বিবরণ দিয়েছিল যাতে না-দেখা পরিচয়ের শম্ভুদাকে অপছন্দ হলে নিঃশব্দে কেটে পড়তে পারে। শম্ভুদা বলল কোথায় বসে কথা বলা যায়! চলুন কাছেই কাফে দ্য মণিকা-র দোতলায় কফি খেতে খেতে গল্প করা যাক। কফি খেতে খেতে শম্ভুদা আত্রেয়ীর রূপে মজে যায়। বলে সংশয় ছিল, না না-দেখা আত্রেয়ীর ঘোর, দেখা আত্রেয়ী এসে যদি নষ্ট করে দেয়। কিন্তু এখন দেখছি আমার ভাবনা পেরিয়েও আপনি অপরূপা। আত্রেয়ী অল্প হাসে এবং ঘড়ির কাঁটা দ্রুত সাড়ে আটটা পার করে দেয়। আত্রেয়ী উঠব উঠব করে। শম্ভুদা বলে, রাত হয়ে গেছে। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। আত্রেয়ী সশব্যস্ত হয়ে বলে, না না আমি একাই যেতে পারব। শ্যামবাজার। আপনি আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দিন শুধু। তারপর হাতব্যাগ খুলে ব্যাগের ভেতর খুঁজতে খুঁজতে মুখ চুন করে বলে, কিন্তু আমার মানিপার্স বাড়িতে ফেলে এসেছি। শম্ভুদা ব্যস্ত সমস্ত হয়ে নিজের মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকা বার করে হাতে গুঁজে দিয়ে তাকে ট্যাক্সিতে তুলে দেয়। এরপর প্রায় প্রতিদিনই শম্ভুদার বিকেল কেটেছে আত্রেয়ীর সাথে আড্ডায়। কখনও সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের কফিহাউসে, কখনও ইডেনে, কখনও গঙ্গার ঘাটে, কখনও সেন্ট্রাল লাইব্রেরির চত্বরে, কখনও মেট্রো সিনেমা হলে। প্রায় একবছর শম্ভুদা হাবুডুবু। এই হাবুডুবুতে শম্ভুদা নজর করেনি আত্রেয়ী তার বাড়ির ঠিকানা, পরিবার পরিজন নিয়ে কোনও কথাই বলেনি কোনও দিন। কিন্তু প্রতিদিনই আত্রেয়ী হাত পেতে তার কাছ থেকে দুশো-পাঁচশো টাকা নিয়ে গেছে। এই রহস্যটা ভেঙেছিল দুর্গাপুজোর সময়। হঠাৎ কলেজস্কোয়ারের ঠাকুর দেখতে এসেছিল, ভিড়ের ভেতর একটু ছাড়াছাড়ি হয়েছে। শম্ভুদা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে, একটা ছেলে আত্রেয়ীর হাত ধরে টানাটানি করছে। শম্ভুদা কাছে এসে সজোরে এক থাপ্পড়। ছেলেটি ছিটকে পড়ে, আর সোরগোল ফেলে দেয়। এন্টালিতে থাকা শম্ভুদাকে কলেজস্কোয়ারের অনেকেই চেনে। তখনই ও জানতে পারে, আত্রেয়ী বউবাজারের হাড়কাটাগলির যৌনকর্মী। পাঁচ মিনিটেই সামলে নিয়েছিল এই সত্যতার ঝটকা।

তারপর সেই প্যান্ডেল থেকে সোজা লালবাজার। পরিচিত পুলিশ অফিসারকে সব ব্যাপারটা খুলে বলে। রাত্রেই পুলিশ রেইড ক’রে হাড়কাটাগলি থেকে এক মাসি সহ গোটা চারেক মাস্তানকে তুলে আনে। লালবাজারে আত্রেয়ীকে দেখিয়ে অফিসার বলেছিল, এ আমার বোন, এর দিকে আর কোনও দিন চোখ তুলে যদি তাকিয়েছিস তোরা, মার্ডার কেসে সোজা সবকটাকে যাবজ্জীবন ফাঁসিয়ে দেব। তারপর দিনই কোর্ট-ম্যারেজ। ওই অফিসার তার নিজের বোনের পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে শম্ভুদার বাড়িতে আত্রেয়ীকে তুলে দিয়েছিল। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে শম্ভুদার সুখী পরিবার এখন! শম্ভুদা সে গল্পও করে। শম্ভুদার এই সোজা-সাপটা খাদহীন ভালোবাসার কাহিনিকে আদর্শ মেনেছে উত্তম।

উত্তম, মানে উত্তমকুমার দাম এই মধ্য-চল্লিশেও মেদহীন ধনুকের ছিলার মতো শরীর রেখেছে। মাথায় কদমছাঁট চুল। শহর, শহরতলীর কোথায় কোন পাড়ায় ফুটবল টুর্নামেন্ট সেসব ওর এখন মুখস্থ। কলকাতার মাঠে কম যায়। জেলায় জেলায় খেলোয়াড় হিসেবে নিজের পরিচয়ের সুযোগে সোর্স কাজে লাগায়। যেভাবে পুলিনের কথায় আজ দুটো কুড়ির বনগাঁ লোকালে উঠে যাবে হাবরা। পুলিন হাবরা লিগ ম্যাচে রেফারিগিরিও করে। আজ সবুজ সংঘ ও প্রগতির ম্যাচ। সোর্স পুলিন টেলিফোনে প্রথমে নাটা দেবাশিসের কথা বলেছিল। অসাধারণ ট্যালেন্ট। বল পায়ে চুম্বকের মতো লেগে থাকে আর দারুণ প্রেডিক্ট করতে পারে। মাঠে নামলেই একটা না একটা গোল করবেই। উত্তম সরাসরি নাকচ করে দেয়। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির নীচের কোনও প্লেয়ার নিয়ে ও ভাববে না। ফুটবল বডি গেমও।

ক্রমে যত দিন যাচ্ছে, বিদেশিরা যত আসছে তত রাগবির মতো হতে চলেছে ফুটবল। শরীর কতটা ধকল নিতে পারবে তা কিছুটা উচ্চতা নির্ভরও। সোর্স পুলিন দু’নম্বরটির কথা জানায়। সবুজ সংঘের গোপাল। ভালো হাইট, আর ফুটবলারের চেয়ে বেশি ও দৌড়বীর। এমন চোঁ চোঁ দৌড় লাগায় এদিক ওদিক মনে হয় কিছু একটা যেন হতে চলেছে। অথচ বল হয়তো উলটো দিকে আছে। উত্তম সোর্সের এই তথ্যটাকেই আজকের প্রাইম হিসেবে ঠিক করেছে। চোখে মুখে কিছুটা উল্লাস। এরকমই খুঁজছিল। নাস্তানাবুদ করা স্প্রিন্টার। তারপর ফুটবল তো কোচের হাতে পড়লে কথা বলবে।

উত্তম যা ভেবেছিল তার চেয়ে বেশি। এ একদম ইউরেকা। ছেলেটা একটাও গোল করেনি। কিন্তু ওর টিম দু’গোলে জিতল। বিরতির পরপরই ছেলেটা মাঝমাঠ ক্রস করে হঠাৎ লেফ্ট উইং থেকে

চোঁ-চোঁ করে দৌড় লাগাল রাইট উইং-এর দিকে। দু’টো ডিফেন্ডার কেটে গেল। পেছন থেকে ওই নাটা ছেলেটা সম্ভবত উইথড্রয়াল স্টপার খেলছিল– গোল মেরে দিল মাখনে ছুরি দেবার মতো। ব্রিলিয়ান্ট! গোলটা হবার পরে উত্তম চ্যাঁচাল, তারপর পকেটে হাত দিল পেন আর কাগজ নেবে বলে। কী যেন নাম! হাত চালিয়ে বুক পকেটে পেন, ছোটো ডায়েরি খুঁজে না পেয়ে চোখ নামাল।

আরে আশ্চর্য! আমি তো পেন-টেন নিয়েই বেরিয়েছি। কী মনে করে পেছনের পকেটে হাত দিয়ে দেখে লেপাপোছা। অর্থাৎ জিনসের হিপ্পকেটে তখন কিছুই নেই। উত্তমের বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। সোর্স পুলিনের জন্য হাজার খানেক টাকা ছাড়াও যাতায়াতের খরচ ইত্যাদির জন্য আরও শ’পাঁচেক ছিল। এসবিআই ডেবিট কার্ড, জরুরি কাগজপত্র, কিছু তথ্য, নোট– এতক্ষণের আনন্দে এসময় ভাঁটার টান।

বনগাঁ লাইনের ভিড়। শিয়ালদা থেকেই বসার জায়গা পায়নি। ভেতরের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল মনে পড়ছে। দমদম আসতে চারপাঁচজন তরুণী ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়েছিল। সকলেই খুব উচ্ছ্বল। নিজেদের ভেতর নানারকম কথাবার্তা চালাচ্ছিল। টুকরো ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা মিশিয়ে। মাই নেম ইজ খান থেকে ম্যানিকিউর সবই তাদের বিষয়। উত্তম এসময় খেলাপাগল। নারী নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। ও মাঠের কথা ভাবতে ভাবতে চলেছে। ভিতরে একটা আর্জ। এবছর এই বড়ো তিনটি ক্লাবের জন্য অন্তত গোটা পাঁচ-ছয় সোনার ছেলে তুলে দিতে হবে। আনকোরা কিন্তু সলিড। বড়ো ক্লাবগুলিরও তাতে লাভ। দু’তিন বছর খুব কম পয়সায় এদেরকে কাজে লাগাতে পারে। হিসেবে অন্তত কোটি টাকার ফয়দা। উত্তমের মনে হচ্ছে আজ একটা হিল্লে হবে।

একটা মেয়ে ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। ভিড়ের ভেতর প্যাসেজেও ডাবল লাইন। মেয়েটির সমুন্নত বুক মাঝে মাঝেই ওর খোলা কনুই ঘষে দিচ্ছিল। উত্তম একবার তাকাতেই মেয়েটি মিষ্টি হাসে। দীর্ঘ সুশ্রী চেহারার। চুড়িদারে লোকাট ফ্রেম। উত্তাল বুকের অনেকটাই প্রকাশমান। ডান দিকের অপেক্ষাকৃত শ্যামাশ্রী মেয়েটি একটু চেপে দিলে ও আরও একটু বাঁয়ে এই সুন্দরীর দিকে ঘেঁষে আসে। এ মেয়েটি তেমন নড়ে না আর তার কোমল বুক সেঁটে উত্তমের গোটা বাহুতে লগ্ন হয়ে যায়। এবার মেয়েটির দেহ থেকে একটা সুগন্ধ টের পায় যা ওর চেনা চেনা লাগে। উত্তমের তখন কাঠকাঠ ভাব। হাত-পা নড়ানোর জায়গা রাখেনি সপ্রতিভ মেয়ে দুটো। জগন্নাথপম অবস্থা। এই স্থির অবস্থায় উত্তম অনুভব করে দুদিক থেকেই দু’টো মেয়ে বুক মেলে ওকে ঘঁষে চলেছে।  ও কোনও দিকে তাকাতে পারছে না। অসহায়ের মতো নিম্নগামী মুখমণ্ডল। উত্তম মাঠের ফুটবল, বল দখল, পজিশন মেকিং– এসবের ভেতর ভাবনা চারিয়ে দিয়ে রাস্তাটুকু পার করে দিতে চাইল।

এই মেয়েগুলিই কি ওকে এতখানি বিপদে ফেলল! এত সুন্দর সুন্দর কথা বলছিল মেয়েগুলো– তবে সেটা ট্র্যাপ! অন্তত ডেবিট কার্ড আর মোবাইল ফোনের জন্য থানায় কমপ্লেইন লজ করতেই হবে। পুলিনকে নিয়ে তাই ও হাবরা থানায় এসে বসেছে।

বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে হঠাৎ ওর মনে ঝিলিক দিল– বাঁদিকে যে-মেয়েটি বেশি লগ্ন ছিল, একটু বেশি বয়সের, সে কোনও কথা বলছিন না কেন! মেয়েটি হাসবার জন্য মুখ ঘোরাতেই ওর চোখ পড়েছিল কানের নীচের তিলটির ওপর। তখন মাঠের ভাবনায় মত্ত থাকায় ফোকাস্ড ছিল নতুন ছেলে রিক্রুটিং নিয়ে। চুলটা মাথার উপরে চুড়ো করে রেখেছিল সে। ফলে মুখটা একটু গোল লাগলেও ওই তিলটি তো ওর চেনা। ওই-ই কি করবী! বাবুঘাটে কতবার ওই তিলের উপরেই চুম্বন রেখেছে সে। না না, তা কী করে সম্ভব! করবী পকেটমারের গ্যাং করেছে! উত্তমের এই একলা একা জীবনের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্নিগ্ধ প্রতিমা প্রতীম করবী পকেটমার!

থানায় বসে শিউরে উঠল। গা সিরসির করতে লাগল। ওই নিষ্পাপ মুখমণ্ডলের মেয়েটি, যাকে একদিন এই জীবন তুলে দেবে ভেবেছিল, সোনারপুরের ওই গ্রাম্য মেয়ে করবী নিশ্চয়ই ওকে চিনেছে। এখনও সেরকম ছিমছাম চেহারা উত্তমের। শুধু দুটো জুলফির কাছের কিছু চুল পেকেছে। তবুও ও আমার পকেট কাটল! এখন নিশ্চিত হচ্ছে ওই যে চেনা চেনা লাগছিল গন্ধটা, তা করবীই ব্যবহার করত। ভিক্টোরিয়ার মাঠে সন্ধ্যায় অনেকবার করবীই উত্তমের ঝাঁকড়া মাথা ওর আধখোলা বুকে টেনে নিয়েছে। সুগঠিত স্তনের খাঁজে নাক গুঁজে গেছে। কিন্তু উত্তম কখনও শরীরে হাত দেয়নি। শুধু ওর বুকের ওই মিষ্টি গন্ধটা ও প্রাণ ভরে নিত। ও চেয়েছিল অপাপ করবীকে গৃহলক্ষ্মী করবে।

এসময় উত্তমের খুব শীতবোধ হতে থাকে। গা-হাত-পা ছেড়ে দেয়। থানার বেঞ্চে এলিয়ে পড়ে। পুলিন দাস ফুলস্কেপ সাদাকাগজ কিনে এনে মোবাইলে মিসিং কমপ্লেইন ডায়েরি লেখাতে লেখাতে পেছন ফিরে তাকিয়ে বুঝে যায় শরীর খারাপ হয়েছে উত্তমের। থানার গায়েই হাবরা হাসপাতাল। ধরাধরি করে সেখানে নিয়ে যায়। পুরোনো দিনের খেলোয়াড় পরিচয়ে খুব দ্রুত ডাক্তার অ্যাটেন্ড করে। সেরিব্রাল অ্যাটাক। ম্যাসিভ। ডাক্তার রেফার করে এনআরএস। অ্যাম্বুলেন্স দেয়। মুখে অক্সিজেন সিলিন্ডার। সোর্স পুলিন দাস, হাবরা হাসপাতালের একজন নার্স ও অচেতন উত্তম যশোর রোড ধরে চলেছে। এসময় উত্তম দেখে, সাদা পোশাকের এক মিষ্টি মেয়ে, মুখটা খুব চেনা চেনা, কোনও পরি হবে, তার কপালে আলতো করে দু’টো চুমু খেল। আর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি উত্তম। এই প্রথম উত্তম তার সারাজীবনের কাঙিক্ষত শব্দকটি শুনতে পেল। এবং এই প্রথম তার কান্না পেল। বোজা চোখের দুই কোল ঘেঁষে দুফোঁটা জল গড়িয়ে নামল সাদা চাদরে ঢাকা বালিশের উপর।

এনআরএস-এর এমার্জেন্সির ডাক্তার কয়েক মিনিট দেখেই বললেন, অনেকক্ষণ আগেই প্রাণ দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।

 

সেই দিনগুলি

মনটা ভালো নেই দীপ্তির। ফোনটা বেজে চলেছে, কিন্তু তুলতে ইচ্ছে করছে না। তুললেই কথা বলতে হবে। কিন্তু যে ফোন করছে সে নাছোড়বান্দা। ছাড়বার পাত্র নয়। অগত্যা দীপ্তিকে ফোনটা ধরতেই হল, ‘হ্যালো!’

‘হাই, কে দীপ্তি?’

‘হ্যাঁ।’

‘বাবা! কী ব্যাপার তোর? দেড় বছর তোর সঙ্গে কোনও কন্ট্যাক্ট নেই। চিনতে পারছিস তো? আমি সূচি।’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, গলাটা তোর একই আছে। কিন্তু এতদিন কোথায় ছিলি?’

দীপ্তি সাধারণ ভাবেই প্রশ্নটা ছুড়ে দেয়, কিন্তু গলার স্বরে উৎসাহের অভাব লক্ষ্য করে সূচি।

‘কী হয়েছে রে তোর দীপ্তি? গলার স্বরটা কেমন যেন লাগছে। রাগ করিস না প্লিজ। আমারই দোষ, এতদিন তোকে কন্ট্যাক্ট করতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বাস কর, প্রতিটা মুহূর্তে তোর কথা আমার মনে হয়েছে। তোর জন্যই মলয়ের সঙ্গে আমার বিয়েটা হওয়া সম্ভব হয়েছিল।’

‘এখন তুই কোথা থেকে বলছিস?’

‘সবে পরশু দেশে ফিরেছি। জানিস-ই তো মলয়ের সঙ্গে আয়ারল্যান্ড চলে গিয়েছিলাম। ওর ওখানে কোম্পানির সঙ্গে দেড় বছরের কন্ট্র্যাক্ট ছিল। আমিও ওখানে একটা চাকরি খুঁজে জয়েন করে নিয়েছিলাম। তবে এত সব দৌড়াদৌড়ির মধ্যে আমার মোবাইলটা শ্বশুরবাড়িতেই রয়ে গিয়েছিল। গতকাল শহরে পৌঁছেছি। আজ সকালে প্রথম তোকেই ফোন করলাম। এবার দেখবি একদিন তোর বাড়িতে উপস্থিত হয়েছি। এখন বল তো, তোর বাড়ির সকলে কেমন আছে? কাকু-কাকিমা, সৌরভদা আর উজ্জ্বল?’

এক নিশ্বাসে সবকিছু বলে দেবার পর সুচি খেয়াল করে দীপ্তি যেন মুখে তালা দিয়ে রেখেছে। ওর কোনওরকম প্রতিক্রিয়া সুচি বুঝতে পারে না।

ধৈর্য হারায় সূচি, ‘কীরে কী হল তোর? তখন থেকে আমি একাই বকবক করে যাচ্ছি। তুই তো কিছুই বলছিস না… কী হয়েছে? সব ঠিক আছে তো?’ সূচির আওয়াজে ওর অধৈর্য ভাবটা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

‘সবকিছু বদলে গেছে রে সুচি এই দেড় বছরে… বাবা আর নেই, মা বিছানায় পড়ে, প্যারালিসিস। দাদা সারাদিন মদ খেয়ে পড়ে থাকে। মদের নেশা ওকে গ্রাস করছে। বউদি ছোট্ট পারিজাতকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে…’

‘আর উজ্জ্বল?’

‘উজ্জ্বল ঠিক আছে। এখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। কিন্তু ভবিষ্যতে ওর-ও যে কী হবে এখনও জানি না। সুচি, বাড়িতে কিছুই ঠিক নেই… বলতে বলতে, দীপ্তির চোখের জল বাঁধ মানে না।

‘কাঁদিস না দীপ্তি… বি ব্রেভ… কলেজে সবথেকে সাহসী বলে পরিচিত, অন্যের যে-কোনওরকম সমস্যায় এগিয়ে এসে তার সমাধান বার করতে যে এক মুহূর্ত ভাবত না, সেই দীপ্তির কাছে নিজের সমস্যার কোনও সমাধান নেই, এমন কখনওই হতে পারে না… কাম অন ইয়ার। এই কথাটা আগে তুই সবাইকে বলতিস এখন আমি বলছি, সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে। চল, আমি পরের সপ্তাহে আসছি। একদম চিন্তা করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ ফোনটা কেটে গেল।

কলিংবেল-টা বেজে ওঠে। শাড়ির আঁচলে চোখের জলটা মুছে নিয়ে দীপ্তি সদর দরজাটা খুলে দেয়। রোজকার সেই চিরপরিচিত দৃশ্য। মদ এবং সুগন্ধির চেনা গন্ধটা এসে নাকে ঢুকল দীপ্তির। নেশার ঘোরে সৌরভ দরজায় ঠেসান দিয়ে কোনওমতে দাঁড়িয়ে। ওকে ঘিরে আরও চার-পাঁচজন বন্ধু যারা নিজেরাও কেউ সুস্থ নয়, কম-বেশি সকলেই নেশায় বুঁদ। দাদার হাত ধরে দীপ্তি ঘরের ভিতর নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এই সুযোগে কেউ দীপ্তির হাত-টা ছুঁয়ে নেয়, কারও গরম নিঃশ্বাস এসে পড়ে দীপ্তির পিঠে। পেছন থেকে কেউ দীপ্তির কোমরটা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। এক ঝটকায় হাতটা সরিয়ে দীপ্তি দরজাটা বন্ধ করে দেয়। বোনের সম্মান রাখাটা দাদার কর্তব্য কিন্তু সেই দাদা নিজেই যেখানে বেহুঁশ সেখানে বন্ধুদের ও প্রতিরোধ করবে কী ভাবে? দীপ্তির চোখটা আবার জলে ভিজে আসে।

বাবার মৃত্যুর পর, ব্যাবসার সব দায়িত্ব, টাকাপয়সা সবকিছুই সৌরভের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকের ভালো চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ব্যাবসায় মন দেয় সৌরভ। ব্যাবসাও বাড়তে থাকে, সেই সঙ্গে টাকাও। কাঁচা টাকা হাতে আসতেই বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যাও বাড়তে থাকে, সৌরভের পা মাটিতে থাকে না। দামি গাড়ি, দামি শখ, বিদেশি মদ অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায় সৌরভের। মা জয়ন্তী স্বামীর মৃত্যুর পর মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। সৌরভের বিয়ে আগে থেকেই ঠিক হয়ে ছিল কিন্তু জয়ন্তীর মানসিক ও শারীরিক অবস্থার কারণে বিয়ে আটকে যায়। পাত্রীর বাবা রমানাথবাবু চিন্তিত হয়ে পড়েন। অনেক বুঝিয়ে জয়ন্তীকে সুস্থ করে তোলা হয়। রমানাথবাবু জয়ন্তীকে বলে তাড়াতাড়ি ছেলের বিয়ে দিয়ে দিতে অনুরোধ জানান যাতে বাড়ির পরিবেশ কিছুটা হলেও বদলায়। বিয়ে হলে ছেলেও বাড়িমুখো হবে এটাও ওনার বিয়ের জন্য তাড়া দেওয়ার আর একটা উদ্দেশ্য ছিল।

অনেক ভেবেচিন্তে বিয়ের দিন স্থির করা হল। কিন্তু বিয়ের দিন মদের নেশায় সৌরভ বিয়ের আয়োজন ঠিকমতো করা হয়নি বলে রমানাথবাবুর সঙ্গে গণ্ডগোল পাকিয়ে বসল।

ছেলের ব্যবহারে লজ্জিত জয়ন্তী, রমানাথবাবুর হাত ধরে ক্ষমা চাইতে গেলে, পাত্রী সঞ্চিতা উঠে এসে জয়ন্তীর হাত ধরে থামায়। সঞ্চিতা জয়ন্তীর অবস্থা দেখে নিজেই লজ্জিত বোধ করে। ছেলের জন্য মায়ের এই অপমান মেনে নিতে অসুবিধা হয় ওর। শান্তস্বরে জয়ন্তীকে বলে, ‘কাকীমা, এটা আপনি কী করছেন? এরকম ছেলের জন্য আপনি কেন ক্ষমা চাইছেন? সৌরভের স্ট্যাটাস আমাদের থেকে একটু বেশিই মনে হয় উঁচু হয়ে গিয়েছে। আমিই এই বিয়ে করতে অস্বীকার করছি।’

পরিস্থিতি সামলে শেষমেশ সঞ্চিতা, জয়ন্তীর বাড়িতে বউ হয়ে এল। কিন্তু সৌরভকে বদলাতে পারল না সঞ্চিতা। মেয়ে হয়ে যাওয়ার পরও সৌরভকে সঠিক রাস্তায় ফিরিয়ে আনার সব চেষ্টা বিফল হলে, বিয়ের তিন বছরের মাথায় সঞ্চিতা ছোট্ট পারিজাতকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল।

এই ধাক্বা জয়ন্তী সহ্য করতে পারলেন না। সেরিব্রাল হয়ে পক্ষাঘাতে সম্পূর্ণ ভাবে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

সকালে সৌরভ অন্য মানুষ। মদের ঘোর কেটে গিয়ে হুঁশ ফিরে আসলে নিজের ব্যবহারের জন্য লজ্জিত হতো। মা, দীপ্তি, উজ্জ্বল সকলের কাছেই ক্ষমা চাইতে দ্বিধা করত না। কিন্তু হলে কী হবে? সন্ধে হলেই বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আকণ্ঠ গিলে পুরো মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরত।

মাঝেমধ্যে দীপ্তি সৌরভকে বোঝাবার চেষ্টা করত, ‘দাদা, তুই আর কারও কথা না ভাব, বউদি আর পারিজাতকে তো বাড়িতে নিয়ে আসতে পারিস। তাছাড়া উজ্জ্বল এখনও ছোটো আছে। কী অবস্থায় রাত্রে বাড়ি ফিরিস একবারও ভেবেছিস কি? আর তোর বন্ধুবান্ধবগুলোও বা কী? ওদের সঙ্গে মিশিস কেন?’

‘ওদের সম্পর্কে কিছু বলিস না। বাবার ব্যাবসাটা দাঁড় করাতে ওরাও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে, নয়তো আমি ব্যাবসার কী-ই বা জানতাম। ওদের জন্যই এত তাড়াতাড়ি ব্যাবসার এতটা উন্নতি করতে পেরেছি।

আর ওরা সবাই ভালো বাড়ির ছেলে। কমবেশি সকলেই ড্রিংক করে। ওদের নিজেদের উপর যথেষ্ট কন্ট্রোল আছে। শুধু আমারই একটু বেহাল অবস্থা হয় ড্রিংক করলে। কেন, তোর মনে হয় না যে আমার বন্ধুরা তোকে ছোটো বোনের মতো ভালোবাসে?’

মনে মনে হাসে দীপ্তি। কাকে বলবে সত্যিটা কী? সৌরভের মদ্যপ বন্ধগুলোর চোখে লোভ, লালসা ছাড়া আর কিছু নজরে পড়েনি দীপ্তির। ওদের সামনে যেতে ভয়ে, ঘৃণায় দীপ্তির ভিতরটা কুঁকড়ে যায়। কিন্তু কাকে বলবে এই কথাগুলো? সৗরভ মানতে রাজিই নয় যে ওর বন্ধুরা দীপ্তিকে নিজেদের লালসার শিকার বানাতে পারে। দাদা নিজে সুস্থ থাকলে তবেই না বোনের কষ্টটা বুঝতে সক্ষম হবে। সুতরাং সকলের অলক্ষে চোখের জল ফেলা ছাড়া দীপ্তির উপায় কী?

সুচি কথামতো পরের সপ্তাহেই দীপ্তির বাড়ি এসে হাজির হল। সুচিকে দেখে দীপ্তির এতদিনকার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ধীরে ধীরে সব ঘটনা সূচি দীপ্তির কাছ থেকে জেনে নিল। গলা জড়িয়ে দুই বন্ধু অনেকক্ষণ কাঁদল।

চোখের জল ফুরিয়ে এলে, সূচি সোজা হয়ে বসল। দীপ্তির মুখটা দুহাত দিয়ে ধরে সূচি বলল, ‘চোখের জল মুছে ফেল, দীপ্তি। এই সমস্যার কোনও না কোনও বিহিত নিশ্চয়ই আছে। হার স্বীকার কেন করবি? এবার একটু হাস তো।’

‘দীপ্তি, তোর মনে আছে মলয় কী প্রচণ্ড গুটখা খেত? ডাক্তারের বারণ সত্ত্বেও কিছুতেই নেশাটা ছাড়তে পারছিল না। প্রবলেমটা তোকে বলতেই তুই মজা করে যে সমাধানটা দিয়েছিলি সেটা যে কতটা কাজ দিয়েছিল সেটা কি কেউ ভাবতে পেরেছিল? ঘটনাটা ভাবলে এখনও আমার হাসি পায়।’

ঘটনাটা মনে আসতে দীপ্তির মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ওর কথামতো, সুচি একটা বিয়েবাড়িতে যাওয়ার সময় মলয়ের পকেট থেকে গুটখার প্যাকেটগুলো বার করে কনডোমের কয়েকটা প্যাকেট রেখে দিয়েছিল মলয়ের অজান্তে। বিয়েবাড়িতে গিয়ে গুটখা পকেট থেকে বার করতে গিয়ে সকলের সামনে কনডোমের প্যাকেট হাতে উঠে আসতে সকলের ঠাট্টার পাত্র হতে হয়েছিল মলয়কে। ব্যাস পকেটে গুটখা রাখার অভ্যাস ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল মলয়। শেষমেশ দীপ্তির পরামর্শে সুচি মলয়কে কিছুদিন নেশামুক্তি কেন্দ্রে নিয়ে গেলে মলয়ের গুটখার নেশা একেবারেই চলে যায়।

দীপ্তিকে হাসতে দেখে সুচির মুখও হাসিতে ভরে ওঠে।

চোখে-মুখে জল দিয়ে সুচি একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে নিজের ব্যাগ খুলে একটা ক্যামেরা বার করে দীপ্তির দিকে এগিয়ে দিল, ‘এই নে, এটা তোর জন্য, ভিডিও ক্যামেরা।’

‘বাবাঃ, এটা তো খুব দামি ক্যামেরা। এত দাম দিয়ে আমার জন্য এটা আনার কী দরকার ছিল?’ দীপ্তি কৃত্রিম রাগ দেখায়।

‘কী দরকার ছিল…?’ সুচি দীপ্তিকে ভেংচি কাটে। ‘ফালতু বকবক বন্ধ কর। ক্যামেরার ফাংশনগুলো দ্যাখ। দারুণ ভিডিও তোলা যায় ক্যামেরাটায়।’

ইতিমধ্যে উজ্জ্বলও স্কুল থেকে এসে পড়ে। সুচি আর সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা দেখে ও আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ‘সুচিদি এটা বিদেশ থেকে এনেছ? কি দারুণ ক্যামেরাটা। আমি এটা দিয়ে ছবি তুলব।’

‘বাবাঃ! উজ্জ্বল, তুই কত লম্বা হয়ে গিয়েছিস। বেশ একটা বড়োবড়ো ভাব চলে এসেছে।’

‘দিদি, আমি চেঞ্জ করে আসছি। এসে আমি তোমাদের কথাবার্তা সব ভিডিও করব,’ বলে উজ্জ্বল বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

‘দীপ্তি, আমি ভাবছি এটা দিয়ে তোর সমস্যারও একটা সমাধান করা যাবে।’

দীপ্তি অবাক চোখে তাকায় সুচির দিকে, ‘কীভাবে সেটা সম্ভব?’

‘রাত্রে যখন সৌরভদা বাড়ি ফিরবে তখন লুকিয়ে আড়াল থেকে দাদা এবং দাদার বন্ধুদের কীর্তি সব শ্যুট করতে হবে। সকালে পুরো ভিডিওটা সৌরভদার সামনে টিভির পর্দায় চালিয়ে দিলেই দাদা বুঝতে পারবে ওর বন্ধুরা কীরকম এক-একটা রত্ন,’ সুচি মনের মধ্যে থাকা সমাধানটা দীপ্তির কাছে স্পষ্ট করে।

উজ্জ্বল আর সুচি সৗরভের বাড়ি ফেরার আগেই ক্যামেরা নিয়ে রেডি হয়ে যায়। সুচি বরের থেকে তিনদিনের ছুটি নিয়েই দীপ্তির বাড়ি এসেছিল। বিয়ের আগেও বহুবার দুই বন্ধু একে অপরের বাড়ি রাত কাটিয়েছে। কখনও কখনও সপ্তাহ কেটে গেলেও নিজের বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হতো না। দু’জনের বাড়িতেই এটা নিয়ে বাদবিবাদ কখনও হয়নি কারণ সকলেই জানত দু’জনে হরিহরাত্মা। মলয়ও তাই সুচির ইচ্ছায় বাদ সাধেনি।

রাত এগারোটার কাছাকাছি ডোরবেল বেজে উঠতেই সুচি আর উজ্জ্বল, দীপ্তিকে ইশারা করে দরজাটা খুলতে। ওরা দুজন পর্দার পেছনে জায়গা করে নেয় যেখান থেকে সদর দরজাটা পরিষ্কার দেখা যায়। সুচি হাতের ক্যামেরাটার রেকর্ডিং অন করে দেয়।

দরজা খুলতেই সৗরভকে ধরে ওর এক বন্ধু দীপ্তির দিকে এগিয়ে আসে, ‘এই নাও, তোমার ভাইকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলাম।’ আর একটি ছেলে দরজা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করে, ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখী… আমাদেরও একটু এভাবে ধরে ঘরে নিয়ে যেতে পারো তো সোনা।’ ছিটকে সরে আসে দীপ্তি। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সুচির হাতটা নিশপিশ করতে থাকে।

অন্য আরও তিনবন্ধু দরজা ঠেলে সৌরভের সঙ্গে ভিতরে ঢুকে পড়ে। তারই মধ্যে একজন দীপ্তিকে জোর করে জড়িয়ে ধরে। সৌরভের কোনওদিকে খেয়াল নেই। নেশায় বুঁদ অবস্থায় সোফার উপরেই এলিয়ে পড়ে। বোনের প্রতি বন্ধুদের অভব্য ব্যবহার কিছুই চোখে পড়ে না ওর।

দীপ্তি উজ্জ্বলকে ডাকে। সবাই ঘরে ঢুকে পড়াতে ও ভয় পেয়ে যায়। উজ্জ্বল লেবুর জল নিয়ে ঘরে ঢুকে সৗরভের দিকে গেলাসটা বাড়িয়ে দেয়।

‘লেবুর জল আমাদেরও একটু দাও উজ্জ্বলবাবু। তোমার দিদিকে দেখে আমাদের নেশা আরও চেপে বসছে। আমরাও তোমার দিদিকে বড়ো ভালোবাসি…,’ বলতে বলতে একটি ছেলে দীপ্তির হাত ধরে টেনে কোলে বসাতে যায়।

‘আমার দিদির হাত ছাড়ুন,’ উজ্জ্বলের তীক্ষ্ন কণ্ঠস্বরে ছেলেটি দীপ্তির হাত ছেড়ে দিয়ে উজ্জ্বলকে জোরে ধাক্বা মেরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

সুচি আর চুপ থাকতে পারে না। একবার ভাবে পুলিশ ডাকবে কিন্তু তাহলে সৌরভদাকেও পুলিশ ছাড়বে না… দীপ্তি কীভাবে এগুলো রোজ সহ্য করে। পরক্ষণেই মন ঠিক করে নেয়। ভয় ঝেড়ে ফেলে ক্যামেরাটা নামিয়ে টেবিলের উপর রেখে বসবার ঘরে ঢোকে। ক্যামেরাতে প্রুফ রেকর্ড করাই আছে সুতরাং লোকগুলোকে বাড়ির বাইরে বার করতেই হবে। কঠিন গলায় সুচি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কী হচ্ছে এখানে? আপনাদের লজ্জা করে না? সৌরভের বন্ধু হয়ে ছোটো বোনের সঙ্গে এরকম ব্যবহার করছেন। কাকিমা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না, উজ্জ্বল এখনও ছোটো, স্কুলে পড়ে আর সৌরভদা বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে… আর আপনারা এই সুযোগে বাড়ির ভিতর ঢুকে এসে যাচ্ছেতাই আচরণ করছেন। এই মুহূর্তে আপনারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, নয়তো আমি এখুনি পুলিশ ডাকব,’ সুচি মোবাইল উঠিয়ে ডায়াল করতে আরম্ভ করে।

সুচির রণচণ্ডী মূর্তি দেখে আর পুলিশের হাতে পড়ার ভয়ে, সৌরভ ছাড়া সকলে উঠে পড়ে দরজার দিকে পা বাড়ায়। দরজা দিয়ে বেরোতেই উজ্জ্বল দৌড়ে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। সুচিকে ধন্যবাদ জানিয়ে দীপ্তি আর উজ্জ্বল সৌরভকে শোবার ঘর অবধি নিয়ে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

সকালে একটু দেরি করেই ঘুম ভাঙল সৌরভের। মাথাটাও ভারী ভারী ঠেকছে। গতকাল রাতে মাত্রাটা একটু বেশিই হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুগুলো না থাকলে কী যে হতো কে জানে? মনে হল ওদের একবার ফোন করে ধন্যবাদ জানানো দরকার। মুখে চোখে জল দিয়ে ঘরে ঢুকতে যাবে, চোখে পড়ল খাবার টেবিলে বসে দীপ্তি সুচির সঙ্গে গল্প করছে।

‘আরে সুচি না, তুই কখন এলি? হঠাৎ কোথায় চলে গিয়েছিলি? কোনও খবর নেই এতদিন পর? মানসকে পেয়ে আমাদেরই ভুলে গিয়েছিলি?’ মস্তিষ্কে জোর দিয়ে সৌরভ সুচির বরের নামটা মনে করার চেষ্টা করে।

‘দাদা, মানস নয়, মলয়। মলয়ের সঙ্গে দেড় বছরের জন্য বিদেশ চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখছি সবকিছুই কেমন বদলে গেছে। তুমি এখানে থেকেও না থাকারই সমান… নিজের লোকেদেরই তুমি ভুলে গেছ…,’ সুচি গলার দৃঢ়তা বজায় রাখে। জানে যেমন করেই হোক সৌরভের বিবেককে জাগাতে হবে।

‘সুচি তুই কী বলতে চাইছিস?’ সৌরভ সুচির পাশের চেয়ারটা টেনে ওর মুখোমুখি হয়।

‘তোমাদের বাড়ির পরিবেশ খুব বদলে গেছে। …কাকু বেঁচে নেই। কাকিমা বিছানায় পড়ে। বউদি, পারিজাতকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে আর তুমি…?

‘হ্যাঁ, তুই ঠিকই বলেছিস সুচি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু এভাবেই বদলে যায়…’ সৌরভ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, ‘তুই একটু বস সুচি আমি ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে আসছি।’

দীপ্তি চা তৈরি করে ডাইনিং টেবিলে এনে রাখল। ইতিমধ্যে সুচি ডাইনিং হলে রাখা টিভি-টার সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরাটা অ্যাটাচ্ করে রেখেছিল। সৗরভ এসে চেয়ার টেনে চায়ে চুমুক মারতেই সুচি সামনে এসে দাঁড়াল, ‘দাদা, টিভির রিমোট-টা ধরো। টিভিটা অন করো, ভিডিও ক্যামেরায় একটা ভালো ভিডিও বানিয়েছি। ক্যামেরাটা বিদেশ থেকে দীপ্তির জন্য এনেছি… তুমি ভিডিও-টা দেখে বলো আমি কেমন বানাতে পেরেছি শর্ট ফিল্ম-টা। আমি ততক্ষণ দীপ্তিকে রান্নাঘরে একটু হেল্প করে দিই,’ বলে সুচি দীপ্তির সঙ্গে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

সৗরভ চায়ের কাপটা টেনে নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে টিভি-টা অন করে দিল। চোখ টিভির পর্দার দিকে। নড়েচড়ে বসল সৗরভ। ভাবতে পারেনি পর্দায় ওরই ছবি ফুটে উঠবে। টিভির পর্দায় নিজের অবস্থা, নিজেরই ড্রইংরুমে বন্ধুদের হাতে দীপ্তি আর উজ্জ্বলের হেনস্থা দেখে লজ্জায়, রাগে সৗরভের মুখ লাল হয়ে উঠতে লাগল। যে বন্ধুদের ও অগাধ বিশ্বাস করেছে, যাদের বিরুদ্ধে একটা কথাও শুনতে চায়নি দীপ্তির মুখ থেকে, তারা যে এত বড়ো বিশ্বাসঘাতক হতে পারে নিজের চোখে না দেখলে, ও কি এটা কোনওদিন বিশ্বাস করত? নিজের দুঃখ, লজ্জা ঢাকবার জন্য সৗরভ দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নেয়। নিজের ওপরেই ঘৃণা বোধ করে সৗরভ।

সুচি এসে দাঁড়ায় টেবিলের পাশে। টিভি বন্ধ করে দেয় টেবিল থেকে রিমোটটা নিয়ে। ভিডিও-টা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

‘সরি… দাদা’, বলে সৌরভের মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে দেয় সুচি। ‘দীপ্তি আর কাকিমার বারণ সত্ত্বেও তুমি বন্ধুদের অগাধ বিশ্বাস করে এসেছ। কোনওদিন ওদের আসল চেহারাটা জানারও চেষ্টা করোনি। এর জন্য দীপ্তিকে কী কী সহ্য করতে হয়েছে নিজের চোখেই দেখলে। বাধ্য হয়ে আমাকে এটা করতে হয়েছে… আমি এর জন্য সত্যিই দুঃখিত।’

‘তুই কেন ক্ষমা চাইছিস? দোষ তো আমি করেছি। এত বড়ো অন্যায় করেছি। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে তুই ভালো কাজই করেছিস। আমার জন্য দীপ্তিকে অসম্মানিত হতে হয়েছে, উজ্জ্বলের উপরেও না জানি এই সব ঘটনার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে কে জানে? মদের নেশায় আমি এতটাই নীচে নেমে গেছি যে বাড়ির লোকদের ছেড়ে আমি বাইরের লোককে বিশ্বাস করেছি। ওদের বোঝানোতেই সঞ্চিতাকেও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে আমিই প্ররোচিত করেছি। ছোট্ট পরি-কে নিয়ে চলে যেতে ও বাধ্য হয়েছে। রোজ ভাবি মদ ছোঁব না কিন্তু সন্ধে হলে কী যে হয়… জানি না… আমার কী ভবিষ্যৎ?’

‘দাদা, এতটাও ভেঙে পোড়ো না,’ সুচি বোঝাবার চেষ্টা করে, ‘তুমি মনে জোর আনলে অবশ্যই মদ ছাড়তে পারবে… যাবে আমার সঙ্গে দাদা?’

‘কোথায়?’

‘দাদা আজকেই চলো আমার সঙ্গে যেখানে গুটখার নেশা ছাড়াবার জন্য মলয়কেও নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের বাড়ির কাছেই নেশা ছাড়াবার রিহ্যাব। যাবে তো দাদা?’

সৗরভ সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। দীিঀ৫ এসে পিছনে দাঁড়িয়েছিল সৗরভ বুঝতে পারেনি। আনন্দে দীপ্তি পিছন থেকেই দাদার গলা জড়িয়ে ধরে। চোখ দিয়ে বইতে থাকে আনন্দাশ্রু। সৌরভ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দীপ্তিকে বুকে টেনে নেয়। ভাই-বোনের ভালোবাসা দেখে সুচির চোখেও জল চলে আসে।

সুচির দু’বছরের বিবাহবার্ষিকীর দিন দীপ্তি সকাল থেকেই উপস্থিত। দুই বন্ধুর কথার যেন কোনও শেষ নেই। মলয় দু’জনকে কিছুটা প্রাইভেসি ছেড়ে দিতে বাইরের ছোটোখাটো কাজগুলো সারতে বেরিয়েছে। অনুষ্ঠান তো সেই সন্ধেবেলা। ক্যাটারার বলাই আছে সুতরাং বাড়িতে রান্নার কোনও ঝামেলা নেই।

‘হ্যাঁরে দীপ্তি, সৗরভদা তো এখন সম্পূর্ণ সুস্থ তাই না,’ একা পেয়ে সুচি প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় বন্ধুর দিকে, ‘বউদিকে কবে বাড়ি নিয়ে আসছিস? তাড়াতাড়ি করে বউদিকে বাড়ি আন তবেই না আমি আমার বউদিকে বাড়ি নিয়ে আসতে পারব।’

‘মানে? কী যে বকিস, কোনও মাথামুন্ডু থাকে না।’

‘সেই! এখন আমার কথা তোর ফালতুই মনে হবে,’ কপট রাগ দেখায় সুচি, ‘তুই তো জানিস না দীপ্তি, আমার জ্যেঠুর ছেলে সিদ্ধার্থ দিল্লিতে চাকরি করে। ও আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে আর তোকেও।’

‘আমাকে?’ আশ্চর্য হয় দীপ্তি।

‘হ্যাঁ, কলেজে ছিলাম যখন তখন দু’তিনবার ও কলেজে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। তখনই ও তোকে আমার সঙ্গে দেখেছে। তাছাড়া তোর অনেক গল্পই আমি ওর সঙ্গে করেছি যার মধ্যে মলয়ের গুটখার নেশা ছাড়াবার ঘটনাটাও রয়েছে। বিকেলে সিদ্ধার্থ-ও আসছে।’

লজ্জায় দীপ্তির মুখ রাঙা হয়ে ওঠে। সুচির কাছে মনের ভাব লুকোবার জন্য উঠে অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করলে, সুচি দীপ্তিকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

রক্তের রাজনীতি

উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির ধরনটাই একটু ভিন্ন। নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা এখানে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় গোড়া থেকেই। এখানে অঙ্কুরিত হয় বৃহত্তর রাজনীতির ক্ষেত্রে পদার্পণ করার স্বপ্ন। ক্ষমতা দখলের খেলায় খুব সহজেই মেতে ওঠে ইয়ং জেনারেশন। বদলে যায় তাদের জীবনদর্শন। জীবনযাপন আর সাদামাটা থাকে না তখন।

মণীশ যখন প্রথম এরকমই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র‌্যাজুয়েশন করতে এসেছিল, সে ভাবেনি জীবন তার জন্য ঠিক কী কী নির্দিষ্ট করে রেখেছে। ফার্স্ট ইয়ার-এ র‌্যাগিং-এর সময়টাতেই প্রথম সিনিয়রদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল মণীশকে। সেখানেই প্রথম সে দেখেছিল দেবেন্দ্র ওরফে দেব-কে। ইউনিয়নের জিএস হওয়ার দরুন সবাই চিনত দেব-কে। তার ব্যক্তিত্বকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই কারও। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে বলেই সে এমএ-টাও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই করবে ঠিক করেছিল। দেব-এর পড়াশোনার ব্যাপারে যত না আগ্রহ, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল পাকাপাকি রাজনীতিতে চলে আসার। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু থেকেই সে নিজেকে চোখে পড়ার মতো জনপ্রিয়তার স্তরে তুলে এনেছিল।

র‌্যাগিং-এ খুব বেশি নাজেহাল হতে হয়নি মণীশ-কে। কারণ দেব-এর চোখে পড়ে গিয়েিল সে, ভালো টেবিল টেনিস খেলার জন্য। দেব বড়ো ভাইয়ে মতোই মণীশকে আগলাতে শুরু করেছিল, সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকেই। তারপর থেকে নানা প্রযোজনে মণীশ, দেব ভাইয়া-কে পাশে পেয়েছে। কখনও তাকে সাহায্য না করে ফেরায়নি দেব। মণীশ যে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, সেখান থেকে তার বাড়ি বেশ খানিকটা দূরে। একটু মফস্সল বললেও ভুল হয় না। দেব-ই ব্যবস্থা করে দিয়েিল, যাতে কোনও কোনও দিন বাড়ি ফিরতে না পারলেও, সে হোস্টেলে দেব-এর ঘরে থেকে যেতে পারে।

গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর মণীশ বেশ কিছুটা মানসিক অবসাদে ভুগছিল। তার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। একটা ট্রেন দুর্ঘটনায় বাবার পা কাটা গিয়েছিল। বোন-কে খুব কষ্ট করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াচ্ছে বাবা, তাঁর শেষ সম্বল ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে। এই অবস্থায় মণীশ

এমএ-তে ভর্তি হবে, নাকি একটা চাকরি খুঁজবে সেটা নিয়ে সে কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। টাকার খুব প্রযোজন তার। দু-একটা টিউশনি করে কিছু টাকা সে আয় করে ঠিকই কিন্তু পরিবারের প্রযোজন মেটাতে সেটা যথেষ্ট নয়। বোন রিঙ্কুর জন্য এখনই একটা ল্যাপটপ-এর প্রযোজন। কিন্তু সেই টাকাটাও জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মণীশকে। চাকরির চেষ্টা যে সে করছে না তা নয়, কিন্তু ভালো চাকরি পাওয়াও তো মুখের কথা নয়।

এসব ক্ষেত্রে তার একমাত্র ভরসা দেব ভাইয়া। দোনামোনা করে দেব-এর

হোস্টেল-এর দিকেই পা বাড়ায় মণীশ। হোস্টেলের ঘরে বসে দেব তখন তার চ্যালাচামুণ্ডাদের নিয়ে কলেজের ইলেকশনের ব্যাপারে আলোচনা করছে। ইশারায় মণীশকে বসতে বলে কাজের কথাগুলো সেরে নেয় ছেলেগুলোর সঙ্গে। তারপর ওরা চলে গেলে, মণীশকে বলে

বল ভাই, সকাল সকাল আজ কী মনে করে?

দেব ভাইয়া আর কী বলব তোমায়, তুমি তো সবই জানো।

আরে নির্দ্বিধায় বল। তুই আমার নিজের ভাইয়ে মতো। দাদাকে বলবি না তো কাকে বলবি?

আসলে তুমি তো জানোই, বোনের এটা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর সেকেন্ড ইয়ার। ওকে এবার একটা ল্যাপটপ না কিনে দিলেই নয়। খুব মেধাবী আমার বোনটা। আমার মতো নয়।

হ্যাঁ জানি রে। তা রিঙ্কু তো আমারও বোন। তার জন্য কিছু করতে পারলে আমারও ভালো লাগবে।

আমি অল্প কিছু টাকা জমিয়েছি, কিন্তু…

ওই টাকাটা তুই রেখে দে। রাখিতে একটা মোবাইল কিনে দিস। আপাতত তোর দেব ভাইয়া ওর জন্য ল্যাপটপ-এর ব্যবস্থা করছে।

কথাটা বলে দেব সত্যি সত্যি পকেট থেকে ফোন বের করে মণীশের অ্যাকাউন্ট-এ পঁচিশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করে দিল। কৃতজ্ঞতায় প্রায় নুয়ে পড়েছে মণীশ। পায়ে হাত দিতে যায় দেব-এর। দেব তাড়াতাড়ি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

পাগল, তুই আমার ভাই।

সে জানি দেব ভাইয়া, কিন্তু এটা ধার হিসেবে নিচ্ছি আমি। টাকাটা আমি শোধ দিয়ে দেব যত তাড়াতাড়ি পারি।

ধুর বোকা। বললাম না রিঙ্কু আমারও বোন। এটা আমি আমার বোনকে উপহার দিলাম।

এরকম ভালোবাসা পেয়ে মণীশ সত্যিই অভিভত। প্রায়ই এমন হয়, দেব তাকে ভালো ভালো হোটেলে খাওয়ায়, মাঝে মাঝে পাঁচশো-হাজার এমনিই পকেটে গুঁজে দেয়। মণীশ বুঝতে পারে না, কী এমন দেখল দেব ভাইয়া তার মধ্যে, যে এত ভালোবাসে!

বোন ল্যাপটপ পেয়ে তো দারুণ খুশি। দাদাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদেই ফেলল। মা শুধু একবার অবাক হয়ে আড়ালে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হ্যাঁ রে মণীশ, এত টাকা কীভাবে জোগাড় করলি?

সত্যি-মিথ্যের মাঝামাঝি একটা উত্তর দিয়ে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল মণীশ।

এর কিছুদিন পর দেব ভাইয়া কলেজে ডেকে পাঠাল মণীশকে।

বুঝলি মণীশ জোর ক্যাম্পেন করতে হবে তোকে আমার হয়ে এবারও ইলেকশনটা জিততেই হবে। দেখিস সব জায়গায় যেন ঠিকঠাক পোস্টার লাগানো হয়।

ইলেকশনে এবারও দেবের জয় নিশ্চিত ছিল। মণীশও দারুণ খুশি এই জয়ে দেবকে কাঁধে তুলে তারা গোটা ক্যাম্পাস ঘুরল, বিজয় মিছিলে।

এর কিছুদিন পর রাখি। মণীশ ঠিক করল রিঙ্কুকে রাখিতে একটা ভালো মোবাইল ফোন কিনে উপহার দেবে। সেইমতো একটা ফোন কিনে বোনের কাছে রাখি পরতে বসল মণীশ। রিঙ্কু খুশিতে দিশেহারা হয়ে উঠল। বলল,

তোমার মতো দাদা যেন জন্ম জন্ম ধরে পাই।

এই আনন্দঘন ঘটনার দিনদুয়েক পরে, হঠাত্-ই দেবের ফোন।

মণীশ, ভাই একবার ক্যাম্পাসে আয় তো, একটু জরুরি কথা আছে।

হ্যাঁ ভাইয়া, এখুনি যাচ্ছি আমি।

ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেখে সকলে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিধানসভা অভিযানের। দলের একটি ছেলেকে অপোনেন্ট পার্টির ছেলেরা মারধর করেছে। তাদের শাস্তি আর অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে এই অবস্থানের পরিকল্পনা। দেব, মণীশকে আলাদা করে একটু সাইডে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল এসব সিরিয়াস কিছু না, চল একটু স্লোগান দিবি, দুটো মিডিয়ার সামনে বাইট দেব, তারপর খাওয়া দাওয়া করে ফিরে আসব।

মণীশ এসব ব্যাপারে আগে কখনও থাকেনি। কিন্তু বিষয়টা যে এতটাই অন্যরকম, সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করার লোভ সে সামলাতে পারল না। এভাবেই দেবের সংস্পর্শে আস্তে আস্তে সেও পরোক্ষ ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে লাগল।

মাস খানেক পরে ঘটল আরও এক অভাবনীয় ঘটনা। বাজারে সবজি কিনতে এসেছিল মণীশ। সেই সময় মোবাইলটা বেজে উঠতেই দেখে দেবের ফোন। ডান হাতে সবজির বোঝাটা নিয়ে বাঁ হাতে ফোনটা ধরতেই ওপাশে দেবের অস্থির কণ্ঠ ভেসে এল।

কোথায় আছিস? জরুরি দরকার। না, না ফোনে বলা যাবে না। হোস্টেলে চলে আয়।

হোস্টেলে পৌঁছে আজ একটু যেন অন্যরকম লাগল দেবকে। গোটা ঘরে অস্থির ভাবে পায়চারি করছে। আর তার খুব ক্লোজ, জনাদুয়েক ছেলে রয়েছে ঘরে। মণীশকে দেখে বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠে দেব।

ভাই এসেছিস! বোস। খুব মন দিয়ে শোন যা বলছি।

হ্যাঁ বলো ভাইয়া

তুই আমার জন্য কী করতে পারিস?

আরে, এ কেমন প্রশ্ন ভাইয়া। তোমার জন্য জান হাজির।

একটা ছেলেকে তুলতে হবে। পারবি?

তুলতে মানে?

কথাটা বলার সময় একটু যেন ঘাবড়ে গেল মণীশ। কী বলছে দেব ভাইয়া, কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না! দেব ভাইয়া তার অবাক হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে একটু যেন শ্লেষের সঙ্গে বলে,

বড্ড সরল তুই মণীশ। আমি যে এই ছাত্র সংগঠনটা করছি, এটাই তো শেষ নয়। আমার একটা বড়ো ফোকাস আছে, তুই জানিস। এবার আমি যুব সংগঠনের সেক্রেটারি হতে চাই। কিন্তু এই পথে একটা বাধা আছে। আমার পথের কাঁটা। অপোনেন্ট পার্টির এই ছেলেটাকে তুই-ও এক-আধবার দেখেছিস। সুরজিত্। এই ছেলেটা ক্রমশ পপুলার হওয়ার চেষ্টা করছে। শালাকে এমন শিক্ষা দেব, যাতে ও আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। তোর হেল্প চাই, ভাই।

কাঁপা গলায় মণীশ বলে কী ভাবে সাহায্য করতে বলছ আমায়?

কিছু না। তুই যখন টেবল টেনিস খেলতিস কমন রুমে, আমি তোকে খুব ভালো ভাবে লক্ষ্য করতাম, দারুণ রিফ্লেক্স তোর। পারলে তুই-ই পারবি। সুরজিত্ হালওয়াই সরাই-এ থাকে। রোজ ভোরবেলা জগিং করতে আসে দিলবাগ-এ। ঠিক পাঁচটায় রোজ ও দিলবাগ-এর গেট-এ পেঁছোয়। ওখানেই একটা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবি তুই আর এই দুজন।

ঘরে যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা। দেব যে দুজনের কথা বলছে, তাদের দিকে এক বার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেয় মণীশ। তার বুকের ভিতর ঢিপঢিপ আওয়াজটা যে দ্রুততর হচ্ছে, সে টের পায়। দেব পকেট থেকে একটা রামের নিপ বের করে ছোট্ট চুমুক দেয়। তারপর আবার মণীশকে বলে,

সুরজিত্ জগিং করতে করতে গাড়ির পাশে এলেই, তুই ঝট করে বেরিয়ে ওর মুখে কাপড় বেঁধে তুলে নিবি গাড়িতে। তোর মুখে মাস্ক থাকবে। তোর ভয় নেই।

আমতা আমতা করে মণীশ বলার চেষ্টা করল,

কিন্তু দেব ভাইয়া, এটা তো অপহরণ।

তো?

না আমি এসব কখনও করিনি।

সব কিছুরই একটা প্রথমবার হয় মণীশ। তুই পারবি।

দরদর করে ঘামছে মণীশ। ঠিক তখনই একটা মোক্ষম কথা বলল দেব।

কাজটা করার পরই তোর

অ্যাকাউন্ট-এ পাঁচ হাজার টাকা ঢুকে যাবে। আর এখন পাঁচ। ভেবে দ্যাখ, কড়কড়ে দশ হাজার টাকা। ছেড়ে দিবি?

মণীশের অভাবের সংসারে দশ হাজার টাকার ভ্যালু সে জানে। মায়ে চোখের ছানিটা অপারেশন না করালেই নয়। সে আর কিছু ভাবতে পারে না। খপ করে দেবের হাতটা ধরে নিয়ে বলে,

কবে করতে হবে কাজটা ভাইয়া?

মুখে একটা নিষ্ঠুর হাসি খেলে যায় দেবের। বলে,

কালই। বাকিটা তোকে আমার এই দুই শিষ্য বুঝিয়ে দেবে।

ঠিক পাঁচটার সময় একটা কালো রঙের অলটো পিক আপ করল দেব-কে। ভেতরে আগের দিনের দুজন, আছে। আর অপরিচিত একজন ড্রাইভার। ঠিক হয়ে আছে সুরজিত্-কে গাড়িতে তোলার পরই একজন ভালো ভাবে বেঁধে ফেলবে তার মুখ আর হাত দুটো। কিছুটা দূর গিয়ে একটা সিনেমা হলের সামনে গাড়ি থেকে নেমে পড়বে মণীশ। তার পরিবর্তে অন্য একজন গাড়িত উঠবে। ব্যস তার দাযিত্ব শেষ।

ভেতরে ভেতরে উত্কণ্ঠা টের পাচ্ছে মণীশ। এরকম কাজ আগে কোনওদিন করা তো দূরে থাক, ভাবেওনি যে সে করতে পারে। তাকে চিরকাল তার বাবা-মা একটু খাটো নজরেই দেখে এসেছে। পড়াশোনায় খুবই সাধারণ সে। নিজে হাতে এই প্রথম অনেকগুলো টাকা রোজগার করেছে একদিনের কাজে।

পাশের ছেলেটা সিগারেট খেতে খেতে গাড়ির সাইড মিরর দিয়ে খেয়াল রাখছিল জগিং করতে করতে সুরজিত্ আসছে কিনা। এবার সে মুখ দিয়ে একটা ইঙ্গিতপূর্ণ আওয়াজ করতেই, সচকিত হয়ে উঠল মণীশ। একটা নেভি ব্লু ট্র‌্যাক সুট পরে ধীর পায়ে জগিং করতে করতে গাড়ির পাশে আসতেই, তার মুখ চেপে ধরে সবলে তাকে গাড়িতে ঢুকিয়ে নিল মণীশ। সুরজিত্ ঘটনার আকস্মিকতায় এবং মুখ বাঁধা অবস্থায় গোঙাতে লাগল। মাস্ক পরা আগন্তুকদের সে ভালো চিনতে পারছে না। শুধু মণীশের চোখের নীচে বড়ো আঁচিলটা খুব চেনা মনে হতে লাগল তার।

মণীশের বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি পিটছে। সে অধীর হয়ে রইল সিনেমা হলটার সামনে গাড়িটা না পেঁছোনো অবধি। তারপর দরজা খুলে নেমে যেতেই অন্য একজন তার জায়গায় উঠে পড়ল। গাড়িটা একরাশ ধুলো উড়িয়ে গোমতী নদীর দিকে চলে গেল।

সবে সকাল হচ্ছে। একটা ফাঁকা চায়ে দোকানে বেঞ্চ-এ বসে চা-এর অর্ডার দিল মণীশ। তারপর খুব মৃদু গলায় ফোন করে দেবকে জানাল কাজটা হয়ে গেছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ব্যাংক অ্যালার্ট এল। তার অ্যাকাউন্ট-এ এখন সদ্য উপার্জিত দশ হাজার টাকা।

আর অতটা খারাপ লাগছে না মণীশের। এটা জাস্ট একটা কাজ। ক্রাইম তো নয়। তাছাড়া ছেলেটাকে হয়তো ওরা একটু শাসানি দেবে, হুমকি দেবে, চড়চাপড় মেরে ছেড়ে দেবে। যাতে সে আর দেবের বিরুদ্ধে ফণা না তুলতে পারে। দেবের এখন অনেক ওপর লেভেল-এ চেনাজানা। যেভাবে রাজনীতির সোপানে সে তরতর করে উপরে উঠছে, ভবিষ্যতে তার বড়োসড়ো নেতা হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না।

কিন্তু যতটা নিশ্চিন্তে থাকবে ভেবেছিল মণীশ, তা আর পারা গেল না। দিন দুয়ে পরে গোমতী নদীতে লাশ ভেসে উঠল সুরজিতের। মিডিয়া, পুলিশ, তোলপাড়। খবরটা পাওয়া মাত্র ছুটতে ছুটতে দেবের কাছে গিয়ে পৌঁছোল মণীশ।

দেব ভাইয়া, এরকম তো হবার কথা ছিল না! দেব তখন তার ইয়ার দোস্তদের সঙ্গে হোস্টেল-এর পেছনের মাঠের ঝুপসি অন্ধকারে মদের আসর বসিয়েে। লাইটার জ্বেলে সে মণীশের মুখের খুব কাছে ধরে বলল,

ন্যাকা আমার। জলে নামব আর চুল ভিজবে না। রাজনীতিতে এসব হয়?

কিন্তু ওকে মারার কথা তো বলোনি ভাইয়া! আমি… আমি কিছুতেই করতাম না এই কাজ, তুমি ওকে জানে মারবে জানলে।

চুব বে! শত্রুর শেষ রাখতে নেই। যা করেছিস বেশ করেছিস মেরা শের। আয় বুকে আয়। তোকে কত ভালোবাসি জানিস ভাই আমার। নে মদ খা। অ্যায়ে কর।

দেব নেশাগ্রস্ত। মণীশকেও বাকিরা প্রচুর মদ খাওয়াল সে রাতে। মদ খাওয়ার পর মণীশের খারাপ লাগাটা কমে গেল। দেবের হোস্টেলের ঘরে শুয়ে শুয়ে সে জড়ানো গলায় বলল

মিডিয়া, পুলিশ, এসব কুত্তাদের চিত্কার কী করে সামলাবে ভাইয়া?

তুই কিছু ভাবিস না ভাই। ওসব আমার বাঁ হাতের খেল। তুই শুধু কটা দিন আন্ডারগ্রাউন্ড-এ চলে যা।

মাসখানেক কেটে গেছে। একটা কন্ট্রাক্টে কিছু কাজের অফার পেয়েছে, এই বলে কিছুদিন বাড়ির বাইরে রইল মণীশ। ঘরে নিয়মিত টাকা পৌঁছোনোর ব্যবস্থা করেছে দেব। পরিবারের সবাই খুব খুশি মণীশ উপার্জন করছে শুনে। সুরজিত্-এর খবরটা ধামাচাপা পড়ার পর আবার যখন সব স্বাভাবিক, আবার প্রকাশ্যেই দেবের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত্ শুরু হল মণীশের।

একদিন কমনরুমে দেবের সঙ্গে টেবিল টেনিস খেলছিল মণীশ। ক্যাম্পাস এখন ফাঁকা। দেওয়ালির ছুটিতে বেশির ভাগ ছাত্ররাই যে-যার বাড়িতে গেছে। খেলতে খেলতে হালকা ভাবেই দেব বলল, এবার আর-একটা দাযিত্ব দেব তোকে ভাই। তুই ছাড়া আমার ভরসাযোগ্য কে আছে বল? খেলা থামিয়ে সরাসরি দেবের মুখের দিকে তাকায় মণীশ।

কী হয়েছে, আমায় বলো ভাইয়া। কী দায়িত্ব?

কিছু না, খুব সাধারণ একটা কাজ। একজনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে ভাই। শুট করতে হবে।

এত সহজ স্বাভাবিক ভাবে কথাগুলো বলছিল দেব, যে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছিল মণীশ। সে নার্ভাস হয়ে বলল, কী বলছ ভাইয়া, আমি কী করে… মানে মার্ডার!

হ্যাঁ ভাই। মার্ডার। শুট করতে হবে।

কঠিন হয়ে উঠেছে দেবের চোয়াল, তবু তার মুখে ঝুলে আছে একটা নিষ্ঠুর হাসি। সরাসরি মণীশের চোখের দিকে চোখ রেখে তাকে জরিপ করছে দেব।

মণীশ কোনও রকমে তোতলাতে তোতলাতে বলে,

আমি তো বন্দুক চালাতেই পারি না ভাইয়া। আমি পারব না।

দেবের পা দুটো ধরে বসে পড়ে মাটিতে মণীশ।

দেব তাকে তুলে দাঁড় করায় কাঁধ দুটো ধরে।

তোকে আমার লোক ট্রেনিং দিয়ে দেবে। তুই কাল থেকে দশ দিনের জন্য আমার ফার্ম হাউসে থাকবি। ওখানেই হবে তোর ট্রেনিং। টার্গেট যেন মিস না হয়।

আমি পারব না ভাইয়া। হাত জোড় করে মণীশ।

পারতে তো তোকে হবেই। আর পারলেই ৫০ হাজার টাকা সোজা ঢুকে যাবে তোর অ্যাকাউন্ট-এ।

না ভাইয়া। এ কোন অন্ধকারে তুমি আমায় টেনে নামাচ্ছ। ছেড়ে দাও আমায়।

একটা পৈশাচিক হাসি হেসে ওঠে দেব। তারপর বলে,

ভাই এটা এমনই একটা অন্ধকার, যেখানে ঢোকা সহজ, বেরোনোটাই কঠিন। এই দ্যাখ এটা।

বলার সঙ্গে সঙ্গে দেব তার মোবাইলটা অন করে একটা ভিডিয়ো প্লে করল মণীশের সামনে। সেদিনের গাড়ির অপহরণের ভিডিয়ো। মণীশের মুখে মাস্ক থাকলেও তাতে মুখের নীচের দিকটা ঢাকা পড়েছে। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে জ্বলজ্বল করছে তার চোখের নীচের বড়ো আঁচিলটা। মানুষের চোখও তার একটা আইডেন্টিফিকেশন। মণীশ পালাতে পারবে না। সে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে পাঁকে। যে-পাঁক থেকে তার নিস্তার নেই।

টার্গেট মিস যেন না হয়। এটাই মন্ত্রের মতো এই কদিনে মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েে মণীশ। আজ সেই দিন। সেই গাড়ি। সেই একই সওয়ারি। স্থান কাল পাত্র শুধু আলাদা। পাত্র বলা ভুল হল। পাত্রী। দেবের গার্ল ফ্রেন্ড। গদ্দারি দেব সহ্য করতে পারে না। তাকে আর একটা অন্য লোকের সঙ্গে বিছানায় দেখে খুন চেপে গেছে দেবের মাথায়। মেয়েটি দেবের অনেক কুকীর্তি এবং প্ল্যান জেনে ফেলেছে। তাই, চিরতরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চায় সে তার প্রেমিকাকে। আর আজ তাকে মারার বরাতটাই পেয়েছে মণীশ।

প্ল্যান মাফিক নিখুঁত কাজ করল মণীশ॥ গাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যওয়ার সময় পেছন থেকে শুট করল মেযোকে। গুলিটা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল মেযোর শরীর। কিন্তু সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকের আওয়াজ কারও কানে গেল না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রক্তাক্ত কবুতরির মতো ছটফট করছিল যখন মেযো, গাড়িটা তখন স্পিডে বেরিয়ে গেল। সন্ধ্যার মুখে স্ট্রিট লাইটগুলো তখন সবে একটা একটা করে জ্বলতে শুরু করেছে।

আর কোনও অপরাধ বোধ হচ্ছে না মণীশের। দেবের হোস্টেলের ঘরে ঢুকে চিল্ড বিয়ার খেতে খেতে, সে গা এলিয়ে ভাবছিল ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কী কী করবে। বোনের মাস দুয়ে পর ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল। খুব পরিশ্রম করছে রিঙ্কু। তাকে খুশি দেখলে বড্ড ভালো লাগে মণীশের।

কিন্তু সব ভালো বোধহয় চিরস্থায়ী হয় না। কিছুদিন পরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উত্তপ্ত হয়ে উঠল সিএএ অর্থাত্ নাগরিকত্ব প্রমাণের বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার দুদলে ভাগ হয়ে গেল মানুষ মতাদর্শের নিরীখে। যুব ও ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ল। সরকারের পক্ষে ও বিপক্ষে ভাগ হয়ে মারামারি শুরু হল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। এরকমই একদিন, গেট ক্র‌্যাশ করে নানা কলেজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্ল্যান করে ফেলল দেব। যড়যন্ত্রে সামিল করল মণীশকেও। টুকরো টুকরো দলে ভাগ হয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ল নানা কলেজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে বলে। বিকেলের দিকে গেটের মুখে দেশনায়কের মতো পুলিশের জিপে ওঠার আগে, মিডিয়াকে বাইট দিল দেব, আমাদের লড়াই চলছে চলবে… ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দিল পুলিশ। মণীশ বিপদ বুঝে বাড়িতে চলে এল।

এর কিছুক্ষণ পরই বাড়ির সামনে একটা শোরগোল শুরু হল। গাড়ির আওয়াজ পেয়ে জানলা দিয়ে উঁকি মারতেই দেখে, একটা পুলিশের জিপ ও একটা অ্যাম্বুল্যান্স এসে হাজির। দরজা খুলে বেরোতেই মণীশের বাকরুদ্ধ অবস্থা। অ্যাম্বুল্যান্স-এর দরজা খুলে যাকে নামানো হল মাটিতে সে রিঙ্কু। তার চোখ দুটো বন্ধ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে গোটা দেহ। টুপি খুলে এসআই এগিয়ে এলেন।

হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মৃতু্য হয়েে ওনার। কলেজের বইখাতা ঘেঁটে ঠিকানা পেলাম। আজ একদল ছেলে চড়াও হয়েিল এদের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। দুদলের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। ইটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইনি। তারপর আমরা রেসকিউ করে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার পথেই…

মণীশ হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়ে। হাউ হাউ করে কাঁদছে সে। মা-ও বেরিয়ে এসেছেন ঘরের ভিতর থেকে। বাবা ক্রাচটা ধরে থরথর করে কাঁপছেন। কাকে সামলাবে মণীশ। এ তো তারই পাপের শাস্তি পেল তার ফুলের মতো বোনটা! রিঙ্কুর নিথর রক্তাক্ত দেহটাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে সে। হাতে রক্ত লেগে যায় তার। এ রক্ত কি সারাজীবনেও ধুতে পারবে মণীশ!

কুড়ি বছর আগে পরে

খুব গরম আজ।

একটা কোল্ড ড্রিংক্ আনি? – আরে না না। ঠিক আছে। বরং একটু ঠান্ডা জল পেলে ভালো হয়।

– হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই…

বলে লোকটা জল আনতে গেল। লোকটার চামচাগিরি এই গরমে একদমই ভালো লাগছিল না। কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি। আমি একটু একা থাকতে চাইছিলাম।

পার্কটার এককোণে বিরাট স্টেজ করেছে। বড়ো বড়ো স্ট্যান্ড ফ্যান চললেও গরমের তাতে বিশেষ যাচ্ছে-আসছে না। কারণ স্টেজটার মাথায় ত্রিপল। যেটা থাকলে হাওয়া চলাচল করতে পারে না। ফলে গরম আরও বেড়ে যায়। যদিও পার্কটায় প্রচুর বড়ো বড়ো গাছ ভর্তি। বিশ বছর আগেও জায়গাটা এমনই ছিল। আসার সময় দেখছিলাম সেই বাড়িটা এখনও একই ভাবে আছে, কুড়ি বছর আগের মতো।

আসলে আজ এখানে আমার সংবর্ধনা। সরকারের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান প্রাপ্ত হবার পর এরকম অনেক জায়গাতেই আমার এমন সংবর্ধনা পর্ব চলছে। তবে অধিকাংশ আমন্ত্রণই আমি গ্রহণ করছি না। যেগুলো কোনও ভাবেই এড়াতে পারছি না কেবল সেগুলোতেই যাচ্ছি। ওরা যখন আজকে এখানে আসার জন্য আমন্ত্রণ করেছিল তখন জায়গাটার নাম শুনে এককথায় রাজি হয়ে যাই। কারণটা কি? কারণ হল, কুড়ি বছর আগে এখানে আমি থাকতাম।

সেই লোকটা একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে আবার হাজির হল। সাথে একটা দামি সিগারেট প্যাকেট। আমার দিকে সেসব বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

– নিন স্যার।

জলটা বেশ ঠান্ডা। গলায় ঢালতেই শরীরটা জুড়িয়ে গেল। এবার একটা সিগারেট ধরালাম।

– আপনি এখানে আসতে এককথায় রাজি হয়ে যাবেন আমরা ভাবতেও পারিনি…

লোকটা আবার আহ্লাদে গদগদ হয়ে বকতে লাগল। যে-ক্লাবটা আমায় সংবর্ধনা দিচ্ছে ও তার সেক্রেটারি। নিমন্ত্রণ করার সময় যখন এসেছিল তখন জেনেছিলাম ও এই এলাকার সব থেকে বড়ো চালের কারবারি। ও সবসময়, মানে আমি যে দু’বার দেখলাম দুধসাদা জামা প্যান্ট জুতো পরে থাকে। কুড়ি বছর আগে অবশ্য ও এত সাদা জামা প্যান্ট পরত না। সিগারেটটা টানতে টানতে মনে পড়ে গেল কুড়ি বছর আগের কথা। তার আগে সিগারেট প্রায় খেতামই না বলা চলে। এখানে এসেই ধরেছিলাম একরকম। সিগারেট ধরাতে দেখলেই সুতপা রাগ করত খুব।

– আগে তো খেতে না। হঠাৎ ধরলে কেন?

অনুযোগ করেছিল ও। ভাবত টেনশন থেকেই আমার এই সিগারেট ধরা।

আস্তে আস্তে পার্কটার নির্জনতা কমে আসছে। টুকটাক করে লোকজন আসতে শুরু করেছে। মাইকে ঘোষণা চলছে– আর কিছুক্ষণ পরেই আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। বিখ্যাত সাহিত্যিক হীরক মিত্র আমাদের মধ্যে এসে গেছেন…

বাড়িটা সেই একইরকম আছে। কোথাও কোনও বদল নেই। শুধু রংটা বেশ আবছা হয়ে গেছে। দু’একটা সবুজ পাতা এদিক ওদিক কার্নিশে দেখা যাচ্ছে। পুরোনো পুরোনো একটা ভাব এসেছে বাড়িটার শরীরে। যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম তখন বাড়িটা সবে হয়েছে মাত্র। যাকে বলে সদ্যোজাত। আমরাই প্রথম ব্যবহার করি তিনতলার ফ্ল্যাটটা।

বাড়িটা সাহাদের। আমাদের চুক্তি হয়েছিল বড়ো ভাই শংকর সাহার সাথে। তিন ভাইয়ের যৌথ সম্পত্তি। আগে টিনের বাড়ি ছিল। কলোনি এলাকা। তখনই সবে শেষ হয়েছিল টিনের বাড়ি থেকে ফ্ল্যাট বাড়িতে উত্তরণের। পুরো এলাকাটাই এরকম ছিল। আস্তে আস্তে বদল ঘটেছিল কলোনির চরিত্রে।

সুতপা ভাবত আমি সিগারেট খাই টেনশনের জন্য। আমি কিছুতেই ওকে বোঝাতে পারতাম না যে আমার কোনও টেনশন নেই। সামান্য একটু-আধটু টেনশন থাকলেও ওটা বলার মতো বা ভাবার মতো কিছু না। অমন একটু-আধটু সকলেরই থাকে। আসলে সুতপা যবে থেকে আমার জীবনে এসেছিল তবে থেকে আমার সব টেনশন ভ্যানিশ হয়ে গেছিল। একটা সময় অবধি আমার অনেক অনেক বাঁচতে ইচ্ছে করত। সুতপা আসার পর সে ইচ্ছেটা চলে গেছিল। কথাটার ভুল মানে করলে হবে না। যেটা ঘটনা হয়েছিল, সেটা হল সুতপা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। আর ভালো জিনিসের দীর্ঘায়ু হয় না। আমি তাই বুঝতে পারতাম এর কোথাও একটা শেষ আছে। আর সেই শেষের আগে চলে যেতে পারলে ভালো। মানে সুখ ফুরোবার আগে পালাও। ফলত, আগে সিগারেট খাবার যে অস্বস্তিটা ছিল, এসব ভাবনায় তা হারিয়ে গেল। সুতপা ভাবত আমি হতাশা থেকে মৃত্যুর কথা ভাবছি। আসলে ব্যাপারটা একদমই উলটো।

স্টেজের সামনের চেয়ারগুলো প্রায় ভরে গেছে। মাইকের গমগমানি বেড়েছে। স্থানীয় কলেজের একদল ছাত্র-শিক্ষক আমাকে আলাদা কোণে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বকাল।

আমরা সবাই স্টেজে উঠলাম। আমার বাঁদিকে স্থানীয় এমএলএ। ডানদিকে ক্লাব প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি। শুরুতেই একদল লাল পাড় শাড়ির যুবতি কোরাস গাইল। তারা নেমে যেতে শুরু হল পরের পর ভাষণ পর্ব। ভক্তি গদগদ ভাব নিয়ে এমএলএ, ক্লাব-এর সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট বলে গেল। সবই আমার প্রশংসা, ওদের ক্লাব কত মহান! একটি কমবয়সি ছেলে আমার লেখা থেকে পাঠ করে শোনাল। তারপর আমার হাতে মানপত্র, ফুলের স্তবক, মিষ্টি– আরও কী সব তুলে দেওয়া হল। সেক্রেটারি আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল– ফুলের ভিতর টাকার খামটা আছে।…

কুড়ি বছর আগে সাহাদের ফ্ল্যাটটায় আমি ঘর বেঁধেছিলাম সুতপার সাথে। একটা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। মাত্র তো একটা মাস আমরা ছিলাম। তবু এখনও ভাবলে মনে হয় অনেকদিন।

আমরা দুজনে একটু একটু করে ফ্ল্যাটটাকে সাজাচ্ছিলাম। প্রতিদিন কিছু না কিছু হাতে করে কিনে নিয়ে ঘরে ঢুকতাম। পর্দা, পাপোশ, ফুলদানি, বেডকভার আরও কতো কি! এমনকী দুটো খতম হওয়া রেড ওয়াইনের বোতলে দুটো মানি প্ল্যান্টও এনে লাগাল সুতপা। ওর জন্য আমি পছন্দ করে কিনে এনেছিলাম একটা লাল রঙের নাইটি। প্রতিদিন গল্প করতে করতে রাত ভোর হয়ে যেত আমাদের। রাত্রির গাঢ় অন্ধকার কাটিয়ে যখন সূর্যের হালকা আমেজ দেখা যেত, পাখিদের ডাক শোনা যেত, তখন আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম তৃপ্তির আমেজ মেখে। আমরা দুজনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাকি জীবনটা একসাথে কাটাব। সে প্রতিজ্ঞা শেষ অবধি সুতপা রাখলেও আমি পারিনি। মাত্র একমাস পরেই আমাদের এই তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নমহল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছিল।

এবার আমায় বলতে ডাকা হল। আমি আয়োজক এবং স্থানীয় মানুষদের অভিনন্দন জানিয়ে বলা শুরু করলাম।

‘আপনাদের সকলকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। এই পাড়াটা আমার অত্যন্ত প্রিয় পাড়া। এই পার্ক আমায় অনেক স্মৃতি মনে পড়ায়। আপনারা হয়তো কেউ জানেন না এই পাড়াটায় আমি একসময় থেকে গেছি।’  আমার এই কথায় চারদিকে একটা বিস্ময়ের গুনগুন শুরু হল। এই তথ্য কেউই জানত না। না জানাটাই স্বাভাবিক। বা ভুলে যাওয়াটা। আয়োজক দাদারা মনে হল সবথেকে বেশি অবাক-অপ্রস্তুত হল। এতক্ষণ ওদের ভাষণে মনে হচ্ছিল আমার বিষয়ে ওরা সব জানে। মানে পাবলিককে তাই বোঝাচ্ছিল আর কী। আমি বলা থামালাম না।

– আজ থেকে কুড়ি বছর আগে এই পাড়ায় আমি এসে উঠেছিলাম একটি ভাড়া বাড়িতে। সেই বাড়িটা আজও আছে একই ভাবে। কিছুদিন ছিলাম। মাস খানেকের মতো। এই সময়েই আমি ‘লাইফলাইন চলছে’বলে গল্পটা লিখেছিলাম। এই বাড়িতে বসেই। আপনারা জানেন যা এখন দু-দুটি ইউনিভার্সিটির সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এবং দেশি-বিদেশি মিলিয়ে অন্তত পনেরোটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাই বিশ বছর পর আজ যখন আমি এই গলিতে পা রাখলাম, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি বুঝতে পারলাম আরও একটি গল্পের জন্ম হতে চলেছে… গোটা পার্কটা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল আমার কথা। একটা চিনতে না পারা পোকা পার্কের সব থেকে উঁচু গাছটার টঙে ভনর ভনর করলেও শোনা যাবে এমন এক স্তব্ধতা। বলতে বলতে আমার মন পার্কের আকাশের দিকে উড়ে যেতে লাগল। আমি হারিয়ে যেতে লাগলাম বিশ বছর পিছনে…

আমি হীরক মিত্র। আমার সব থেকে দীর্ঘস্থায়ী পেশা লেখা। যা আমি আজও করে চলেছি। দীর্ঘস্থায়ী পেশা কথাটা বললাম এই কারণে যে, তার আগে আমি অনেক কিছু করেছি। কম্পিউটার অপারেটর, টিউশন, রাজনীতি আরও কত কিছু। কিন্তু শেষ অবধি বুঝলাম আমার দ্বারা ওই লেখাটাই হবে। দুম করে কোনও কিছু ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করে দেওয়াটা আমার মজ্জাগত। কলেজ জীবনে হঠাৎ গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করে একটা সেলসের কাজে ঢুকে পড়েছিলাম। পয়সাটা খুব দরকার মনে হয়েছিল সে সময়। বছর খানেক কাজটা করার পর আমারই মনে হল অন্তত গ্র্যাজুয়েশনটা রাখা প্রয়োজন। সারাজীবন একটা খিঁচ থেকে যাবে। বয়স থাকতে থাকতে করে ফেলা জরুরি। চাকরি ছেড়ে আবার কলেজে ঢুকে পড়লাম। একদম ফার্স্ট ইয়ার থেকে। পাশ করার পর ভাবলাম ফোটোগ্রাফার হব। কোর্স-এ ভর্তিও হলাম। কিন্তু লাস্টে পরীক্ষা দিলাম না। ভেবে দেখলাম ফোটোগ্রাফির প্রাইমারি ইনভেস্টমেন্ট আমার পক্ষে অনেক। অনেক কিছু কিনতে হবে গোড়াতেই। তারপর কম্পিউটার অপারেটর হলাম। কিছুদিন পর সেটাও ছেড়েছুড়ে রাজনীতিতে। ট্রেড ইউনিয়নে হোলটাইমার। তাও ছাড়লাম নেতাদের কারবার দেখে। লাস্টে এই লেখা।

লিখতে লিখতেই আলাপ হয়ে গেল সুতপার সাথে। বিবাহিত। তবে স্বামীর সাথে থাকত না। পেশায় আর্কিটেক্ট। ইন্ডিয়ান রেলে।

ও-ও লিখত। তবে আমার মতো গদ্যের লোক ছিল না। কবিতা লিখত। খারাপ লিখত না। অনেকেই চিনত। প্রথম দেখাতেই ভালোবেসেছিলাম ওকে। লভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট আর কী। বুঝেছিলাম এই আমার মানুষ। এর জন্যই আমি অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন। এর জন্যই জন্মেছি আমি। তখন আমার বছর চল্লিশ বয়স। ভবঘুরে মানুষ। তিনকুলে কেউ নেই। একটা বাড়ি আছে। তাতে থাকি, আর ভাড়ার টাকায় ভাত-বিড়ি হয়ে যায়। কিছুদিন মেশার পর বুঝলাম, ওরও আমাকে ভালো লেগে গেছে। সে সময়ে ওর বর সমানে চেষ্টা চালাচ্ছিল ওকে ফিরিয়ে নিতে। নরমে গরমে নানা ভাবে। সুতপা আমার থেকে বছর তিনেকের ছোটো। অর্থাৎ বয়সটা কম নয়। বাড়বে আরও। একা থাকার যন্ত্রণাও বাড়বে। তাই ও প্রায় সিদ্ধান্ত করেই ফেলেছিল বরের কাছে ফিরেই যাবে। সমস্যা যা আছে মানিয়ে নেবে। ঠিক এরকম একটা সময়ে ওর জীবনে আমি ঢুকে পড়লাম। সুতপার সব ভাবনা চিন্তা সিদ্ধান্ত আমূল বদলে গেল রাতারাতি। ডিভোর্সের মামলা করল ও। ওর বর এরকম পাকা গুটি কেচে যাওয়ায় ব্যাপক খেপল। চাকরি করা বউ কে আর ছাড়তে চায়। আমাদের পিছনে পড়ে গেল লোকটা।

ডিভোর্সের মামলা চলতে লাগল অনন্তকাল ধরে। কবে কি হবে জানি না। আদৌ হবে কিনা বুঝতে পারছিলাম না। তাহলে আমরা কী এভাবেই কাটাব বৃদ্ধবয়স অবধি! শেষমেশ দুজনে একদিন ঠিক করে ফেললাম গোপনে বিয়েটা সেরে একসাথে থাকা শুরু করব। যা আইনের চোখে মান্যতা পায় না। আর সুতপার বর জানতে পারলে এটা নিয়ে ঝামেলা পাকাবেই। যা হয় হোক, আগুনকে সাক্ষী রেখে আমি সুতপার সিঁথি রাঙিয়ে দিলাম এমনই এক বৈশাখে। তারপর এসে উঠলাম সাহাদের তেতলায়।

সংবর্ধনা সভা শেষ হয়ে গেছে। আমি স্টেজ থেকে নেমে এসে মাঠের মধ্যে চেয়ার টেনে বসলাম। সাথে সাথে চারপাশে গুণমুগ্ধদের জটলা তৈরি হল। যাদের মধ্যে অনেকেই আমার নিয়মিত পাঠক, সামনে পেয়ে নানান প্রশ্ন করতে চায়। আবার অনেকে শুধু আমার নামটুকুই জানে। বইপত্তর কিছু পড়েনি। একজন বিখ্যাত লোকের

সংস্পর্শে আসতে ভিড় করেছে শুধু।

এখন আমি সত্যিই একজন বিখ্যাত জন। প্রায়দিনই নানা অনুষ্ঠানে মন্ত্রীদের সাথে আমাকে ডাকা হয়। প্রায় সব পুজো সংখ্যাতেই আমার গল্প বা উপন্যাস থাকে। বিভিন্ন সরকারি কমিটি, আকাদেমিতে আমার নাম থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক পর্যায়ে। কুড়ি বছর আগে যখন এখানে থাকতাম তখন আমায় প্রায় কেউ চিনত না। কলেজ স্ট্রিট, নন্দন চত্বরে ফেকলুর মতো ঘুরে বেড়াতাম। কাঁধে ব্যাগ, মুখে বিড়ি, না-কাটা দাড়ি। সুতপার যে আমাকে কী দেখে ভালো লেগেছিল, জানি না।

অনেকগুলো অটোগ্রাফের খাতা আমার সামনে এখন। একটা একটা করে সারতে লাগলাম সেগুলো। এমএলএ মশায় আমার সামনে চেয়ার টেনে বসলেন।

– আমি এখানে চল্লিশ বছর ধরে রাজনীতি করছি। দু’বারের এমএলএ। তার আগে কাউন্সিলারও ছিলাম বহুদিন। আপনার মতো একজন বিখ্যাত মানুষ এখানে থেকে গেছেন অথচ আমরা কেউ সেটা জানতাম না!

ওনার এই অবাক হওয়া দেখে আমিও হেসে বললাম, আপনিও আমায় চিনতেন। মনে করতে পারছেন না।

– চিনতাম! কোন বাড়িটায় থাকতেন বলুন তো?

– পার্কের উলটোদিকের ওই বাড়িটায়। সাহাদের বাড়ি। তেতলায়। এমএলএ সাহেব জট ছাড়াতে না পেরে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললেন। তারপর ক্লাব প্রেসিডেন্টকে বললেন, শংকরদা? তোমার কিছু মনে পড়ছে?

– নাহ্, তবে যেদিন ওনার বাড়িতে প্রোগ্রামটার ব্যাপারে যাই, সেদিন ওনাকে সামনে থেকে দেখে খুব চেনা চেনা লাগছিল। কোথায় যেন দেখেছি। মনে করতে পারছি না।…

আস্তে আস্তে ভিড়টা হালকা হয়ে এল প্রায়। মাথারা ছাড়া সকলে চলে গেছে একরকম। আমরা ক’জন মিলে পার্কের কোণের ক্লাবঘর খুলে বসলাম। সেক্রেটারি হাত কচলে বলল, একটু জলখাবারের আয়োজন রাখা হয়েছে। বসুন একটু।

এমএলএ সাহেবের কাজ ছিল। কিন্তু উনিও যেন আটকা পড়ে গেছেন আমার সম্বন্ধে পুরোটা জানার কৌতূহলে।

সুন্দর কাচের প্লেটে গরম গরম ফিশফ্রাই এল। সেক্রেটারি আমার একদম সামনে এসে বলল, স্যার, এমন সুযোগ তো বারবার আসে না, আপনি অনুমতি করলে একটু হুইস্কি দিয়ে সেবা করি।

আমি হেসে বললাম,

– তাও আছে! ঢালুন এক পেগ…

প্রথম পেগ শেষ করেই এমএলএ আমায় চেপে ধরলেন,

– দাদা আর হেঁয়ালি করবেন না। বলুন না, আপনার সাথে আগে কি আমার কখনও মোলাকাত হয়েছিল?

কৌতূহলে ওর গোল গোল চোখগুলো চকচক করছিল ওর দু’হাতের তিনজোড়া আংটির মতোই। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান মেরে বললাম, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে সাহাদের তেতলায় আমি থাকতাম। একটা ঘটনার পর আপনার নেতৃত্বে একদল ছেলে এসেছিল আমার ফ্ল্যাটে…

…আমার এখনও মনে আছে দরজাটাকে ঢাকের মতো দুমদুম করে বাজিয়েছিল ওরা ‘দরজা খুলুন’ বলে চিৎকার করে। সুতপা ভয়ে সিঁটিয়ে গেছিল ঘরের কোণে। আমি দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বলেছিলাম, এভাবে দরজা ধাক্বাচ্ছেন কেন, এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।

প্রায় তেড়ে আসার ভঙ্গিতে ওরা বলেছিল, চোপ। বড়ো একেবারে ভদ্দোলোক এয়েছে। শুনে রাখুন, এটা ভদ্দোরলোকের পাড়া। সব শিক্ষিত মান্যগণ্য লোকেরা এখানে থাকে। এসব নষ্টামি এখানে চলবে না। তিনদিনের মধ্যে পাড়া ছেড়ে চলে যাবেন…

পরে শুনেছিলাম সেদিন দুপুরে সুতপার স্বামী এসে বাড়িতে হুজ্জোত করে গেছিল, যখন আমি বা সুতপা কেউ ছিলাম না।

ক্লাবঘরটা মর্গের ঠান্ডা ঘরের মতো হয়ে গেল যেন। অসম্ভব নিস্তব্ধতা। এমএলএ, ক্লাব প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি সবাই মাথা নীচু করে বসে। আমি নিজেই বোতল থেকে আরেকটা পেগ ঢেলে নিলাম গ্লাসে। এক চুমুকে সেটা শেষ করে উঠে পড়লাম।

– আচ্ছা চলি তাহলে। ভালো থাকবেন।

পার্কের গেট অবধি ওরা সবাই চুপ করে অনুসরণ করল আমাকে। সংবর্ধনায় পাওয়া ফুল, মালা ও যাবতীয় সব কিছু ক্লাবঘরেই পড়ে রইল। সেটা দেখেও ওরা কেউ কিছু বলতে সাহস করল না। আমি গেটের কাছে এসে বললাম, আপনাদের আর আসতে হবে না। আমি একটু সাহাদের বাড়ি ঘুরে যাব, যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে।

এমএলএ ভদ্রলোক আমার দু’হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, কি বলছেন! আপত্তি! আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। কুড়ি বছর আগে কম বয়সের তেজে অনেক কিছু বলে ফেলেছিলাম আমরা, জানি আপনি সে অপমান কোনওদিনও ভুলতে পারবেন না। তবু ছোটো ভাই ভেবে ক্ষমাঘেন্না করে দেবার চেষ্টা করবেন।

আমি মাননীয় এমএলএ-র পিঠে হাত রেখে বলি, আমি কিছু মনে রাখিনি। তাহলে কি আসতাম? মনে রেখে কি হবে বলুন, তাতে তো কিছু বদলাবে না।

ক্লাব সেক্রেটারি ছলছলে চোখে জিজ্ঞেস করল, বউদি এখন কেমন আছেন? উনি কি আপনার সাথেই আছেন?

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। মানা করার জন্য তো আর সুতপা নেই। ওরা আমার উত্তরের জন্য প্রতীক্ষারত। পার্কের গেটে দাঁড়িয়ে পরপর দু’তিনটে টান মারলাম সিগারেটে। হুইস্কির নেশাটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে মাথায়। সন্ধ্যা নেমে এসেছে পুরোপুরি। পার্কটা এখন নিকষ কালো। সোডিয়াম ভেপারের আলো তাতে খুব বেশি নাক গলাতে পারছে না বড়ো বড়ো গাছপালার জন্য। আমি ওদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললাম, সেদিনের ঘটনার পরদিন আপনাদের বউদি, মানে আমার সুতপা রেললাইনে সুইসাইড করেছিল।

 

ধন্যবাদ

ঘড়িটাতে প্রায় নিভে যাওয়া টর্চের আলো ফেলতেই সুনন্দর একটা ঝটকা লাগল। অন্ধকারে এগারোটা বেজে গেছে। বাজবে না-ই বা কেন, সেই কতক্ষণ আগে সাড়ে দশটা দেখে গুটিগুটি পায়ে শেষ মোমবাতিখণ্ডটা জ্বালিয়ে, খাওয়া শেষ করেই নিভিয়ে দিয়েছে। কিছুটা গাফিলতি থেকেই ঘরে আর মোমবাতি কিনে রাখেনি। সেরকম দরকারও পড়েনি। কোনওদিন এই তিন বছরে দু পাঁচ মিনিটের জন্য কারেন্ট গেলেও সেটা ধরা ছোঁয়ার মধ্যে নয়। কিন্তু গত রাতে ঝড়ে সব লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর, কত যে ইলেকট্রিকের পোল উপড়ে পড়েছে তার কোনও হিসেব নেই। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোথাও তার ছিঁড়েছে তো কোথাও গাছের ডাল বা আস্ত একটা গাছই পড়ে গেছে পোলে ।

সকালে স্কুলে যে যার খুশি মতো কারেন্টের কথা বলতে আরম্ভ করেছিল। তবে ইতিহাসের তাজমুল সাহেব একটু আশার কথা শোনাল, ‘ম্যাক্সিমাম কালকের দিন, কারেন্ট চলে আসবে, জোর কাজ হচ্ছে।’ সবাই শুনে বলে উঠল, ‘আপনার মুখে ফুল চন্দন পডুক।’ সুনন্দ কিছু মন্তব্য করেনি, যে বিষয় জানে না, সে বিষয়ে কোনও রকমের মন্তব্য করা থেকে সবসময় নিজেকে সরিয়ে রাখে। তাছাড়া মাত্র তিনবছর হল এখানে এসেছে। এখনও এখানকার ইতিহাস ভূগোল সম্পর্কে কোনও জ্ঞান হয়নি বলে নিজে মনে করে। কারেন্ট না থাকলেও অর্থদফতরের একটা বিশেষ বিজ্ঞপ্তির জন্য স্কুলের সবাই বারবার মোবাইলের নেট খুলেছে। সেখানে সুনন্দের মোবাইলটাও বাদ পড়েনি। বাড়িতেও মা, ঝুমা এমনকী বিটকুর সাথে কথাও বলেছে, সকালে সন্ধেবেলাতেও। ঝুমা কারেন্টের কথাও জিজ্ঞেস করেছে। আসেনি, শুনে বলেছে, ‘তাহলে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ো।’

‘সেটা এমনিতেই করতে হবে। যা দু-এক টুকরো মোমবাতি আছে তা দিয়ে কোনও রকমে খাওয়াটুকু হবে।’ সুনন্দ বলে।

ঝুমা প্রতিবারের মতো সেই একই রেকর্ড করা কিছু বুলি আউড়ে ফোন বন্ধ করে। সুনন্দ ফোনটা কাটবার সময় লক্ষ্য করে চার্জ শেষ। ইন্ডিকেটরটাও ব্রিম করছে। উপায় না দেখে ফোনটা পুরোপুরি বন্ধ করে চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। মাঝে একবার উঠে মোম জ্বেলেই খান চার রুটি তৈরি করে দুধ গরম করে নেয়। তরকারি করতে আর ইচ্ছে করে না। আধপো দুধ, একটা মিষ্টি, তিনটে রুটি খাওয়া হয়ে যাবে। একটা বাড়তি করা থাকল। কোনদিন কীরকম খিদে থাকে। না হলে সকালে ভুলো তো আছেই। প্রতি সকালে গোপালদা দুধ দিতে আসার সময় ওটাও চলে আসে, লেজ নাড়ে। সুনন্দ রুটি, বিস্কুট কিছু একটা দিলে খেয়ে পালিয়ে যায়, পরের দিনের আগে আর ওর পাত্তা পাওয়া যায় না। এই বাড়িতে ভাড়া আসার মাস কয়েক পর থেকেই ভুলোর রুটিন মোটামুটি এই রকম। অবশ্য মাঝে কোনওসময় আর ঘুরতে আসে কিনা সুনন্দ জানে না। সারাদিন স্কুল, ফিরে সামনের লাইব্রেরিতে ছোটোখাটো একটা আড্ডা দিয়ে, রুটি তৈরি করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া। বেশির ভাগ শুক্রবার বাড়ি চলে যায়, ফেরে হয় রবিবার রাতে না হয় সোমবার সকালে। এই প্রোগ্রাম বদল বলতে মাঝে মাঝে স্কুলের কোনও স্যার বা দিদিমণিদের বাড়িতে গেট টুগেদার, তাও সব সময় যায় না।

প্রথম প্রথম ভাড়ার এক কামরার এই ঘরটাও গিলে খেতে আসত। কোনওদিন বাবা-মাকে ছেড়ে একা থাকেনি। ভালো কাজ পেয়েও ভিন রাজ্যে যায়নি। তবে সব সময় তো সবকিছু নিজের মর্জি মতো হয় না। বাবা মারা গেল। সেই বছরই আবার স্কুলে চাকরি পেল। প্রথম বছরটা প্রতিদিন আড়াইশো কিলোমিটার আপ ডাউন যাতায়াত করে শরীরের কলকব্জা সব ঢিলে হতে আরম্ভ করল। তারপরেই স্কুলের কয়েকজন স্যার দিদিমণির পরামর্শে বাড়ি ভাড়া করে মাকে এনে রাখলেও, মায়ের শরীর মন কোনওটাই জায়গাটার সাথে খাপ খাওয়াতে পারল না। অগত্যা আবার ডেলি-প্যাসেঞ্জারি। তারপরেই ঝুমা এল, এক বছরের মাথায় বিটকু। বিটকু জন্মাবার পরেও কয়েকটা মাস

ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করে বাধ্য হয়ে স্কুলের কাছাকাছি ঘর ভাড়া নিল, একটাই ঘর সঙ্গে বাথরুম। বাড়ি মালিকের সাথে দেখা হওয়ার কোনও উপায় নেই। তবে ভাড়া দেওয়ার সময় প্রায় কান কামড়ে বলে দিয়েছিল, ‘সামনের স্কুলের মাস্টার তাই ঘরটা দিলাম, না হলে একা পুরুষ মানুষকে কোনওমতেই ঘর ভাড়া নয়।’ সুনন্দ কথাগুলো ঝুমাকে বলতেই সে কি হাসি। মজা করে বলে উঠল, ‘তাহলে আমি সব থেকে নিশ্চিন্ত, কিছু হলে ঠিক খবর পেয়ে যাব, ফোন নম্বরটা দিয়ে আসতে হবে।’

আবার বৃষ্টি নামল। সন্ধে থেকে একভাবে হয়ে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে আবার। মাঝে কয়েকটা ঘন্টা হুডুম হাডুম থাকলেও বৃষ্টিটা পড়েনি। সুনন্দ ঘরে চেয়ারে বসে বসে পাশে গোয়ালঘরের ছাদে বৃষ্টির ফোঁটা পড়বার শব্দ শুনতে পেল। জানলার পর্দা টেনে মশারি খাটিয়ে শুতে যাবে, এমন সময় দরজার কড়া নাড়াবার শব্দ পেল। সুনন্দ প্রথমবার কোনও আমল না দিয়ে আগের মতোই শোওয়ার ব্যাবস্থা করতে লাগল। কিন্তু আবার শব্দটা পেতে চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। ঠিক বিপদে পড়লে কেউ কড়া নাড়লে যেমন শব্দ করে, তেমনি শব্দ।

চেষ্টা করেও মনের ভুল এটা নিজেকে বোঝাতে পারল না। দরজাটাও খুলতে সাহস হল না। কানের বা মনের কোনও ভুল নয় তো? তাও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল কিছু সময়। আবার সব চুপচাপ। অন্ধকার এখন আরও প্রকট। ঘরের ভিতরটা আরেকবার দেখে নিল। একটু গিয়ে দরজার উলটো দিকের জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখবার চেষ্টা করল। সেই অন্ধকার, আর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলকানি। দরজার কড়াটা আবার নড়ে উঠল। সুনন্দ আস্তে আস্তে দরজার কাছে গিয়ে কাঁপা গলায় ‘কে…?’ জিজ্ঞেস করতে ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলা শুনল, ‘একটু দরজাটা খুলবেন, খুব বিপদে পড়ে গেছি।’

মেয়ের গলা পেয়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। মেয়েটিরও গলাতে শব্দগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল। পাশের বাড়ির কাকুর কি কোনও বিপদ হল? বউদি এসেছে নাকি না, বউদি হলে তো নাম ধরে ডাকত। কিছুসময় দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, বাইরের কড়া নড়ে উঠল আবার।

আস্তে আস্তে দরজাটা একটু ফাঁক করে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু মেঘে ঢাকা। অন্ধকার রাত্রি চোখ দুটো আটকে দিল। কিছু বুঝতে পারল না। কিছু সময় পরেই একটা গলা শুনতে পেল, ‘ভিতরে আসব, বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে , দরজাটা ভালো ভাবে খুলুন।’

–আপনি কে, হঠাৎ আমার এ ঘরে তাও রাত্রিবেলা?

–সব পরে বলছি আপনি আগে দরজাটা খুলুন।

সুনন্দ দরজাটা ভালো ভাবে খুলে কিছু বলবার আগেই আগন্তুক ঘরের ভিতর সুনন্দকে পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি ঢুকে দরজার কাছে, সুনন্দের বিপরীতে বাঁদিক থেকে হাত পাঁচ দূরে দাঁড়িয়ে, বলে উঠল, ‘একটা গামছা টামছা কিছু দিতে পারবেন?’

সুনন্দের ঘোর তখনও কাটেনি। অন্ধকার হলেও চোখের সামনে দিয়ে একজন ভিতরে ঢুকল। রোগা নয় বোঝা গেল, সুনন্দের শরীরের সঙ্গে  হালকা ধাক্বা লাগল। চুড়িদার বা পাঞ্জাবি কিছু একটা পরে আছে।

আগন্তুকের পোশাকের জল গায়ে লাগার পরে দরজার ছিটকিনিটা তখনও না লাগিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল ,‘আপনি এভাবে ঘরে ঢুকে গেলেন?’

–দেখছেন না বাইরে কি অবস্থা!

–বাইরে এমন অবস্থা তো আমার বাড়িতে এলেন কেন? আর বাড়ি ছিল না?

–আসলে রাস্তার থেকে এই বাড়িটাই সামনে পেলাম, আলোও জ্বলছিল একটু আগে।

–আমি এ বাড়িতে একা থাকি।

–সেটা আমি বাইরে থেকে কীভাবে জানব?

–এবার তো জানলেন, তাহলে আসুন এবার। আমি আপনাকে পাশের বাড়ির বউদির কাছে দিয়ে আসছি।

–ভয় পাচ্ছেন? আপনার অতো ভয় কীসের?

–দিনকাল তো ভালো নয়।

–সে ভয় তো আমারও থাকবার কথা।

বাইরের বৃষ্টির ঝাপটা খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর আসছে দেখে মেয়েটি বলে উঠল, ‘দরজাটা লাগিয়ে দিন, জল আসছে।’ সুনন্দ বুঝল মেয়েটির কথাগুলো একটু স্বাভাবিক হয়েছে। একটু আগেই হাঁপাচ্ছিল।

ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। সুনন্দ মেয়েটিকে ভালো করে দেখতে না পাবার জন্য মেয়েটির বয়স, কালো না ফরসা, মুখ শরীর কিছুই বুঝল না।

–আপনি এত রাতে আমার দরজায় কড়া নাড়লেন, ঘরে ঢুকলেন, কি অসম্ভব আতান্তরে পড়লাম বলুন তো।

–সব বলছি, তার আগে কিছু একটা দিন মাথাটা মুছতে হবে। একটু খাবার জল পাওয়া যাবে?

একটু কষ্ট করে হেঁটে আগন্তুককে একটা বোতল ধরিয়ে বললাম, ‘জলটা নিন, গামছা দিচ্ছি।’ পিছনের দিকে ফিরতেই মেয়েটির জল পানের শব্দ শুনতে পেল। তার পরে একটা তৃপ্তির শব্দ এল, ‘আঃ।’

সুনন্দর হাত থেকে গামছা নিয়ে মাথাটা মুছে বলে উঠল, ‘আমি নন্দিতা। যাত্রাাদলে কাজ করি, কুশপুর গ্রামে যাচ্ছিলাম, কমলপুর চেনেন? এখান থেকে এক কিলোমিটার হবে নাকি?

–আরও বেশি। আমাদের স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী আসে।

–ও আপনি স্যার? কোন স্কুলে পড়ান?

–এই গ্রামের হাইস্কুলে।

–যাই হোক। কমলপুরে আমার মাসি থাকে। ওখানে দেখা করে ভেবেছিলাম হেঁটে বা ভ্যানে কুশপুরে চলে যাব। বেরিয়েও ছিলাম। মাঝরাস্তায় এই বৃষ্টি।

–আপনি কি পাগল, রাত্রিবেলা এই গ্রামে ভ্যান কোথায় পাবেন?

–না না, রাত্রিবেলা নয়। আমি সন্ধের আগেই বেরিয়ে ছিলাম।

–তাহলেও এই গ্রামে-ঘরে এমনি ভাবে সন্ধেবেলাতে একা বের হতে নেই।

–আসলে আমি তো এদিককার কিছু জানি না। মাসিও একা থাকে। বাসে চেপেছিলাম। ঠিক চললে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতাম। কিন্তু মাঝরাস্তায় বাস খারাপ। বাসেই বলল, ‘ভ্যান পেয়ে যাবেন।’ ভ্যানের আশায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলাম। মোবাইলে চার্জ নেই, তার উপর জল ঢুকে গেছে, দলের কারোর সাথে কথাও বলতে পারলাম না। মাঝরাস্তায় বৃষ্টি নামতে একটা মন্দিরে দাঁড়ালাম।

–কোন দিকে

এই বাড়ির পূর্ব দিকে মনে হয়।

–পূর্ব দিকে কোনও মন্দির নেই, উত্তরে আছে, ধর্মরাজের মন্দির।

–যাই হোক, সেই মন্দিরের চাতালে বসেছিলাম।

–আপনি তো অদ্ভুত, একে অন্ধকার, তার উপর এই বৃষ্টি, আর আপনি একা মন্দিরে বসেছিলেন! যে-কোনও রকম বিপদ হতে পারত।

–প্রথমে একাই ছিলাম, তাতে অসুবিধা হয়নি, কিছুক্ষণ পরে কোথা থেকে তিন-চারজন ছেলে এসে বিরক্ত করতে আরম্ভ করল, তাই পালিয়ে এদিকে চলে এলাম। আপনাদের গ্রামে তো সন্ধেবেলাতেই রাত্রি নেমে আসে দেখছি।

–আপনি এখানে কখন এসেছেন?

–আধঘণ্টা হবে।

–এখন এগারোটার বেশি বাজে, এই বৃষ্টিতে কি সবাই বাইরে নাচবে? কারেন্ট নেই, খেয়ে শুয়ে পড়েছে। আপনি কটার সময় মাসির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?

–ক’টা হবে, সাড়ে ছটা, সাতটা।

–তখন তো বৃষ্টি পড়ছিল।

–সেই রকম জোরে পড়েনি।

–আপনার কথাবার্তাতে কীরকম সন্দেহ হচ্ছে। গ্রামে রাতেরবেলা কেউ বের হয় না, তারপর ওই মন্দিরেও সন্ধেবেলা কেউ যায় না।

–স্যার পৃথিবীর সব কিছু কি অঙ্কের নিয়মে হয়?

কিছু সময় দুজনেই চুপ থাকল। বাইরে তখনও সমানে বৃষ্টি পড়ছে, কমবার কোনও লক্ষণই নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক ঘরের ভিতরের অন্ধকারকে কাঁপিয়ে আরও অন্ধকার করে, অদৃশ্য হয়ে নিজে সেই আগন্তুককে আরও রহস্যের চাদরে ঢেকে দিচ্ছে।

–আমি আজকের রাতটা আপনার ঘরে থাকব।

নিঃশব্দ অন্ধকার ঠেলে কথাটা কানে যেতেই সুনন্দের গলাতেও বজ্রপাত হল– মানে?

–মানে, যেটা বললাম।

–ক্ষ্যাপা পেয়েছেন নাকি আমাকে?

–কাল সকালেই চলে যাব।

–শুনুন একা থাকি, তাতে আবার স্কুলটিচার, কেউ জানতে পারলে আমাকে পিটিয়ে পায়েস বানিয়ে দেবে, সঙ্গে উপরি পাওনা বদনাম। বাড়ি থেকেও বের করে দেবে।

–এই যে বললেন আপনি এখানে একা থাকেন, তাতে আপনাকে কে বের করবে?

– বাড়ির লোক জানতে কতক্ষণ।

–কে আছে বাড়িতে?

–মা, বউ, ছেলে।

–তার মানে আপনি বউকে ভয় পান।

– আপনি খুব বাজে বকছেন।

–কেউ কিছু জানতে পারবে না, আমি খুব ভোরেই বেরিয়ে যাব।

–যত ভোরেই বের হন, এটা হতে পারে না। এমনি ভাবে রাতে আপনাকে আমি থাকতে দিতে পারি না।

–আপনি এক কাজ করুন, বউয়ের ফোন নম্বরটা দিন। আমি সব জানিয়ে দিচ্ছি।

–আপনি তো আমাকে আচ্ছা ঝামেলাতে ফেললেন, এটা সম্ভব নয়। আপনি প্লিজ বোঝবার চেষ্টা করুন। দরজা খুলে দিচ্ছি আপনি বাইরে চলে যান। সুনন্দর গলার উষ্মা বাড়তে লাগল।

–আপনি আস্তে আস্তে কথা বলুন, সবাই চলে আসবে।

সুনন্দ একপা এগিয়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলতে গিয়ে ডান হাতে আরেকটা নরম হাতের ছোঁয়া পেল, সেই সঙ্গে ডান কানে একটা ফিসফিস হাওয়া, ‘আমাকে বের করে দেবেন না প্লিজ।’

সুনন্দর সারা শরীর ঝন্ঝন্ করে উঠল। ছিটকিনি থেকে হাতটা সরিয়ে দরজার ডানদিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতেই সামনের জন বলে উঠল, ‘এই মুহূর্তে আমি যদি বাইরে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করি, কী হবে বলুন তো?’

–মানে! কথাটা বলবার সময় সুনন্দ ঢোঁক গিলল।

–মানে কাল সকালের আগেই আপনার স্কুল, বাড়ি, সবাই জানতে পারবে আপনি…

–কিন্তু আমি তো আপনাকে কিছু করিনি।

–রাতটা থাকি। কাল আলো ফোটার আগে বেরিয়ে যাব, কেউ কিছু জানতে পারবে না, কথা দিলাম।

সুনন্দ একটা শ্বাস ফেললেও বৃষ্টির শব্দে নিজের জায়গায় ঢাকা পড়ে গেল। কিছু সময় চুপ থেকে বলল, ‘আপনি কিন্তু ভোর তিনটে সাড়ে তিনটের সময় বেরিয়ে যাবেন, এখানে চারটে সাড়ে চারটে নাগাদ সবাই উঠে পড়ে। কেউ দেখতে পেলে আমাকে সুইসাইড করতে হবে।

–আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি আমার এত উপকার করলেন আর আমি এইটুকু করব না?

সুনন্দ সামনের দিকে এগোতেই মেয়েটি বলে উঠল, ‘আপনার ঘরে শাড়িটাড়ি তো নেই। আমার সালায়োরটা ভিজে জবজব করছে। এখানটাও ভিজে গেছে। এটা পড়ে থাকলে তো সমস্যা।

– লুঙ্গি চলবে ?

–লুঙ্গি! দারুণ। যাত্রাতে অনেকবার পরেছি। তাছাড়া র‍্যাপার তো পরি।

–তাহলে লুঙ্গি আর একটা শার্ট দিয়ে দিচ্ছি। তবে আর একটা সমস্যা হবে। আপনি এই ভিজে জামা কাপড়গুলো নিয়ে কী করবেন, এখানে তো রাখা যাবে না।

–না না এখানে রাখব কেন? চার পাঁচ ঘন্টাতে জল ঝরে যাবে, তারপর আমি পরে চলে যাব। সুনন্দ অন্ধকার হাতড়ে দেয়ালে ঝোলানো দড়ি থেকে লুঙ্গি আর শার্ট নিয়ে আগের মতোই অন্ধকার হাতড়ে এসে মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, ‘এই যে, সোজা আস্তে আস্তে হেঁটে বাথরুমে গিয়ে পোশাকটা ছেড়ে নিন।’

–অত দূর যাওয়া যাবে না। আপনার ঘরটা পুরো ভিজে যাবে। আমি এখানে চেঞ্জ করে নিচ্ছি, আপনি একটু দূরে দাঁড়ান।

–বাথরুমে গেলে ভালো হতো না?

–এখানেও খারাপ হবে না।

সুনন্দ সেই ছায়ানারীর কথামতো চেয়ারে বসল। অন্ধকারে ছায়ানারীর পোশাক বদলানো না- দেখতে পেলেও, বুঝতে পেরে চোখদুটো বন্ধ করে নিল। বন্ধ চোখেও মাঝে মাঝে ভালো দেখা যায়।

কিছু সময় পরে কানে এল, ‘ঘরে কিছু খাবার হবে?

কথাটা শুনে সুনন্দ চোখ খুললে সামনেটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল।

কিছু বললেন?

–ঘুমিয়ে গেছিলেন?

না না, চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম।

–ও! কিছু খাবার হবে?

–একটা রুটি আছে। মুড়ি হতে পারে। আর তো কিছু নেই।

–চিনি গুড় কিছু?

–চিনি আছে।

–ব্যস ব্যস। একটা রুটি চিনি মুড়ে দিয়ে দিন। প্লেট-ফেট দিতে হবে না।

–তা কি করে হয়, আমি প্লেটেই দিচ্ছি, আপনি ততক্ষণ ভিজে জামাটামাগুলো বাথরুমে মেলে দিয়ে আসুন। সোজা, আস্তে আস্তে হাঁটুন অসুবিধা হবে না। আমার টর্চটারও ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে।

–ভালোই হয়েছে, মাঝে মাঝে অন্ধকার ভালো।

কিছুসময় পর একটা জোরে শব্দ আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উফ্ কথাটা শুনেই সুনন্দ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল, কোথায় ধাক্বা লাগল?’

–এই যে শক্ত মতন কিছুতে।

–বিছানা, একটু আস্তে আস্তে চলুন।

আগন্তুক বাথরুমে গেলে সুনন্দ একটা প্লেটে চারটে বিস্কুট, রুটি, চিনি নিয়ে বিছানাতে রেখে বলল, ‘এই বিছানাতে রাখলাম, খেয়ে নেবেন।’

আবার চেয়ারের জায়গায় ফিরে বসতেই বাথরুম থেকে ছায়ানারীর গলার আওয়াজ পেল, ‘বাথরুমে মেলব কোথায়?’

–একটা দড়ি আছে, দেয়ালের দিকে, সাবধানে দেয়াল ধরে ধরে যাবেন। চেয়ারে বসে থাকবার কিছুসময় পরেই কাঠের আলমারির উপর কিছু একটা পড়বার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠে বলল ‘কিছু ফেললেন নাকি?’

– এখানে ধাক্বা লাগল।

–আপনি ওদিকে গেছেন কেন, সোজা যেভাবে গেছিলেন সেভাবেই চলে আসুন। আস্তে আস্তে আসুন, বিছানাতে খাবার দেওয়া আছে।

চেয়ারে বসেই সুনন্দ পায়ের আওয়াজ এবং কিছুপরে বিছানার ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ পেল। কিছু সময় পরে মেয়েটি বলে উঠল, ‘আপনি বিস্কুটও দিয়েছেন, ভালো।’

সুনন্দের কানে চেবানোর আওয়াজ এল।

–আপনার বাড়িতে বউ মা আর ছেলে, বাঃ বেশ ছোটো পরিবার।

প্রথমবার কথাটার কোনও জবাব না পেয়ে আগন্তুক খেতে খেতেই বলে উঠল, ‘ঘুমিয়ে গেলেন?’

–আপনি তো ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন।

–আপনি রেগে গেছেন?

–কী হবে আপনার এই সব জেনে?

–মাত্র তো কয়েক ঘন্টা, চাপ নেবেন না।

–আপনার খাওয়া হয়ে গেছে?

–হ্যাঁ।

–শুয়ে পডু়ন। আমি মশারি টাঙিয়ে দিচ্ছি।

–আপনি?

–আমার কথা অনেক ভেবেছেন, ঘুমোন।

–ছিঃ ছিঃ। তা কি করে হয়। তার থেকে আপনি ঘুমোন আমি বসে থাকি। আমার রাত জাগা অভ্যাস আছে।

–বিছানাতে শুলে আমি আর উঠতে পারব না। ভোরে আপনাকে ডাকতেও পারব না। ।

–বাঃ বাঃ আপনি সেই একই কথা ভাবছেন। আমি তো আপনাকে কথা দিয়েছি।

–ঠিক আছে আপনি শুয়ে পড়ুন।

–আমি কি এই বিছানাতে শোবো?

–তাছাড়া, মাটিতে শুতে পারবেন না, জায়গাও নেই।

কিছুসময় দুজনেই চুপচাপ। বাইরে বৃষ্টির সাথে ঝড় উঠেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো। ঘরের ভিতর দুজন অচেনা অল্প জানা মানুষদের একে অপরের কাছে কিছুসময়ের জন্য দৃশ্যমান করেই আবার নিজেকে লুকিয়ে দিচ্ছে।

–শুনুন না, আমার খুব খারাপ লাগছে, আপনি এইভাবে সারারাত বসে থাকবেন, আর আমি শুয়ে থাকব। তার থেকে আপনি শুয়ে পড়ুন।

–অনেক জ্বালিয়েছেন এবার একটু ক্ষ্যামা দিয়ে শান্তিতে বসতে দিন। রাতে ঘরে ঢুকেছেন, খেতে পেয়েছেন, শুতে পেয়েছেন, এবার ঘুমোন। আমাকে শুধু চাদরটা বের করে দিন। বালিশের নীচে পাবেন।

চাদর ঢাকা নিয়ে পাদুটো সোজা করে বসতে সুনন্দ স্পষ্ট বুঝতে পারল আগন্তুক শুয়ে পড়েছে।

সুনন্দ চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। এই অন্ধকার বৃষ্টির রাতে ঝুমা থাকলে অন্যরকম সমীকরণ তৈরি হতো। সুনন্দ চারদিকটা আরেকবার দেখে নিল। ছায়ানারী শুয়ে আছে। সুনন্দের শরীরের অনেক অঙ্ক, অসমীকরণ ঝাঁপাঝাঁপি আরম্ভ করলেও উত্তর নেই, পাতা উলটে সমাধান করবার উপায় নেই। এক একটা দিনের উচ্চতা, দূরত্ব বাকি সব দিন বা রাতের সূচক ছাড়িয়ে যায়। উত্তর মেলে না, শুধু পাতার পর পাতা ব্যর্থ কষা। সমীকরণ, অসমীকরণের গ্রাফ, লগ, বা পাটিগণিতে শরীর নষ্ট হয়, পায়জামা, লুঙ্গি ভিজে দাগ হলেও শুধু জয় জগন্নাথ বলে রণে ভঙ্গ দেওয়ার অঙ্ক শিখে নেওয়ার মধ্যেই তো সব গ্রাফ, সব জটিল বিষয়ের মিল!

–মাস্টারদা, ও মাস্টারদা।

বাইরের আওয়াজে থতমত খেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সুনন্দ। ঘরের ভিতরে সব আলো জ্বলছে। মশারিটা এখনও খাটানো রয়েছে। তার মানে গতরাতের মেয়েটা এখনও শুয়ে আছে। মাথার ভিতরটা দপ্দপ্ করতে লাগল। জীবন, জীবিকা সবের বারাটো বেজে যাবে। তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে দুধের বাটি নিয়ে দরজার কাছে আসতেই জলে হালকা পিছলে গেলেও সামলে নিয়ে, ছিটকিনি খুলে ডান হাতটা বের করে দুধ নিল।

–কি ব্যাপার মাস্টারদা, আজ এত ঘুম, কখন থেকে ডাকছি।

–কাল সারারাত কারেন্ট ছিল না, ঘুম হয়নি, ভোরে ঘুমিয়ে গেছি।

বেশি কথা আর না বাড়িয়ে দরজায় ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিল। মেয়েটা কথা রাখল না। বলেছিল ভোরে চলে যাবে। এবার কী হবে? সুনন্দ মশারির কাছে আসতেই দেখল বিছানা ফাঁকা। মেয়েটা? বাথরুমে!

সুনন্দ বাথরুমের কাছে এসে দরজায় টোকা দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল। তাহলে মেয়েটা!

চোখ পড়ল বাথরুমের দেয়ালের টাঙানো দড়িটাতে, ওই তো, লুঙ্গি, শার্ট।

তাহলে মেয়েটা! চলে গেল? না, তাহলে তো দরজার ছিটকিনিটা ভিতর থেকে দেওয়া থাকত না। কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। মেয়েটা তো গতকাল রাতে ঘরে এসেছিল, অন্ধকার হলেও সুনন্দ এতটা ভুল দেখেনি।

সুনন্দ রুটির জায়গাটা খুলল, কী আশ্চর্য এই তো রুটিটা আছে। কিন্তু কাল রাতে নিজে একটা প্লেটে মেয়েটাকে রুটিটা দিয়েছিল, তাহলে!

মশারিটা তাড়াতাড়িতে খুলতে গিয়ে দুটো দড়ি ছিঁড়ে ফেলল। দলা পাকিয়ে একপাশে সরিয়ে রেখে বিছানাতে হাত দিল। এই তো পায়ের দিকটা ভিজে। বালিশটাও সাঁতস্যাত করছে। চাদরটা কুঁচকে আছে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কেউ শুয়ে ছিল।

সুনন্দর শরীরে একটা অসমীকরণের স্রোত বইতে আরম্ভ করলেও, এবারেও কোনও সমাধান বা উত্তর মেলাতে পারল না। বালিশটা সরাতে একটা ভাঁজ করা ছোটো কাগজ দেখতে পেল। হাতে নিয়ে খুলতেই বুঝল বাসের টিকিট। ভাড়ার টাকা কিছু না লেখা থাকলেও টিকিটের নীচের দিকে ধন্যবাদ লেখাটাতে চোখদুটো আটকে গেল।

 

সহমর্মিতা

খোলা হাওয়ায় শ্রীরাধা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। শহরের শেষপ্রান্তে থাকা ঝিলটায় পৌঁছোতে গেলে এই একটাই রাস্তা ধরতে হয়। এদিকটা বেশ নির্জন। চারিদিকে নিবিড় সবুজ গাছগাছালি তাদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। পিচ বাঁধানো ঢালাই মসৃণ রাস্তা। একটাই বেশ বড়ো হাসপাতাল রয়েছে এই চত্বরে, ঝিলের থেকে কিছুটা দূরত্বে। আর কোনও লোকবসতি নেই এই দিকটায়।

আজ অনেক দিন পর গৌতমের সঙ্গে বাইকে শ্রীরাধা বাড়ি ছাড়িয়ে এতটা দূরে এসেছে, একান্তে কিছুটা সময় কাটাবে বলে। জায়গাটা বরাবরই তার বড়ো প্রিয়। চারপাশের নিসর্গ দেখতে দেখতেই সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। তাই গৌতম যখন এখানে আসার কথা বলল, দ্বিধা করেনি শ্রীরাধা মুহূর্তে রাজি হয়ে গিয়েছিল।

ঝিলের চারপাশে কিছু কিছু আগাছার ভিড় থাকলেও একটু পরিষ্কার দেখে ওরা দুজনে একটা কাগজ বিছিয়ে ঘাসের উপর বসল। গৌতম একটু কাছে ঘেঁষে আসতে চাইলে, শ্রীরাধা কপট রাগ দেখিয়ে ওকে দূরত্ব রেখে বসতে বলল। দুজনেই পা মেলে বসল ঘাসের উপর। হঠাৎই ঝিলের জলে একটা মৃদু কম্পন আর তার সঙ্গে ঝুপ একটা শব্দ শুনে, শ্রীরাধা একটু সজাগ হয়ে উঠল।

মনে হচ্ছে জলে কেউ পাথর ফেলল। নিশ্চয়ই আশেপাশে কেউ আছে আর আড়াল থেকে আমাদের লক্ষ্য করছে।

এখানে কেউ প্রায় আসে না। অনেক সময় জলের উপরে মাছ লাফিযে ওঠে। তারই আওয়াজ তুমি শুনে থাকবে। গৌতম নিশ্চিন্ত করতে চায় শ্রীরাধাকে।

শ্রীরাধার শরীর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ এসে গৌতমের দেহ-মনে নেশা ধরিয়ে দিয়েে। নিজেকে সংযত রাখতে কষ্ট হচ্ছিল গৌতমের। কিন্তু শ্রীরাধার যা ব্যক্তিত্ব তাতে কোনও ভাবেই ওর মতের বিরুদ্ধে যাওয়া চলে না। তাই ধীরে ধীরে ওর চুলের লম্বা বিনুনিটা হাতে নিয়ে খেলতে খেলতে হালকা করে জিজ্ঞেস করে, তোমার পারফিউম-টার নাম কী?

উত্তর দেয় না শ্রীরাধা। মৃদু হেসে গৌতমের কাঁধে মাথা রাখে সে। সুযোগ বুঝে গৌতমের চোখদুটো শ্রীরাধার রূপ-মাধুর‌্য পান করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এভাবেই কাটে কিছুটা সময়।

কী দেখছ এমন করে?

তোমার চোখ।

এতে দেখার কী আছে? তোমার সবেতেই বেশি বেশি।

ওই চোখে কী শুধু আমিই জানি।

থামো তো, বাড়িয়ে বলাটা তোমার স্বভাব। এবার চলো উঠি। আর একটু পরেই সন্ধে নামবে। বলে শ্রীরাধা উঠে পড়ল। শাড়িটা ঠিকঠাক করে গুছিযে নিল। সেই সময় দমকা একটা হাওয়ার বেগ ওর আঁচলটা উড়িয়ে নিয়ে গৌতমের মুখ ঢেকে দিল।

গৌতম আঁচলটা হাত দিয়ে ধরতেই শ্রীরাধা বলে উঠল, আঁচলটা প্লিজ ছেড়ে দাও, কেউ দেখে ফেলবে।

আজকের দিনটাই ভালোবাসার জন্য। আমারও প্রাণভরে তোমাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে।

প্লিজ ছাড়ো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ঠিক আছে ম্যাডাম আজ ছেড়ে দিচ্ছি, বলে শ্রীরাধার কোমরের খোলা অংশ হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে গৌতম গভীর চুম্বনে শ্রীরাধাকে সিক্ত করল।

ওদের এই ভালোবাসার সাক্ষী থাকে ঝিলের জল, আশেপাশের গাছপালা আর এক দম্পতি যুগল। ডক্টর সৌম্য বোস এবং ডক্টর শীলা বোস। ঝিলের অনতিদূরেই তাঁদের হাসপাতালটি। কখনও কখনও দুজনের কাজ একই সমযে শেষ হলে, নিজেদের ক্লান্তি দূর করতে, স্বামী-স্ত্রী এই ঝিলটির ধারে এসে বসে কিছুক্ষণ সময় কাটিযে যান।

গৌতম-শ্রীরাধা ওখান থেকে চলে যাওয়ার পর শীলা তাঁর স্বামীকে বললেন, এই ছেলেটিকে আমি চিনি। আমার বাপেরবাড়ির পাড়ায় থাকে। খুব বাজে ছেলে। এক কথায় বলা যায় ধনী বাপের উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে। পড়াশোনা কতদূর করেছে জানা নেই, তবে নিত্য নতুন মেয়েে ফাঁসাতে ওস্তাদ। একবার তো এই ছেলেটির দুশ্চরিত্র স্বভাবের কারণে, একটি মেয়ে আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করেছিল।

ছাড়ো তো ছেলেটার কথা, ওদের সঙ্গে আমাদের তো কোনও লেনদেন নেই, ডা. সৌম্য স্ত্রীকে বলেন।

এই ঘটনার পর ছয়-সাত মাস কেটে গেছে। সৌম্য এবং শীলা দুজনেরই সেদিন নাইট ডিউটি। হঠাৎই একটা ট্যাক্সি এসে থামে হাসপাতালের সামনে। এক দম্পতি একটি মেয়েে নিয়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে হাসপাতালে ঢোকেন। দুজনে মেয়েটিকে ধরে, ধীরে ধীরে এমারজেন্সি-তে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ডাক্তারবাবু দম্পতির দিকে চাইলে, মহিলা এগিয়ে আসেন।

ডাক্তারবাবু, এ আমার মেয়ে আজ দুপুর থেকে ওর পেটে প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে আর সেই সঙ্গে খুব ব্লিডিং-ও হচ্ছে।

ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েির ব্লাড প্রেশার চেক করে একটা ফোন করলেন। ডক্টর শীলা, প্লিজ তাড়াতাড়ি একবার এমারজেন্সি-তে আসুন। একটা ক্রিটিক্যাল কেস এসেছে।

দুমিনিটের মধ্যেই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ শীলা এসে সেখানে পেঁছোলেন। ঝড়ের গতিতে মেয়েিকে বিছানায় শুইযে পর্দা টেনে দিলেন। একটু পরেই বেরিয়ে এসে জানালেন, মাত্রাতিরিক্ত ব্লিডিং হচ্ছে। এখুনি অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যেতে হবে। সার্জারি করতে হবে।

অপারেশনের নাম শুনেই মেয়েটির মা-বাবা ঘাবড়ে গেলেন। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, ডক্টর, ভয়ে কোনও কারণ আছে নাকি?

এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আপনারা ফর্মালিটিজগুলো সেরে, ওটি-র সামনে অপেক্ষা করুন।

ওটি-তে সৌম্যও স্ত্রী-কে জয়েন করলেন। একটু পরেই একজন নার্স বাইরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ওটি-তে থাকা অসুস্থ মেয়েটির অভিভাবক কি আপনারা? নার্স একটি কাগজ এগিয়ে দিল ভদ্রলোকটির দিকে, তাড়াতাড়ি করে এটাতে সাইন করে দিন। অপারেশন করতে হবে। এখনই করুন।

কী হয়েে সিস্টার?

এখন কথা বলার সময় নেই। যা প্রশ্ন আছে অপারেশনের পরে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নেবেন। মেয়েিকে ডিসচার্জ করার আগে এক বোতল রক্ত আমাদের ব্লাড ব্যাংক-এ জমা করতে হবে। এখন আমরা আমাদের স্টক থেকে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।

নার্স চলে গেলে একজন অ্যাটেনডেন্ট-এর সঙ্গে গিয়ে ভদ্রলোক এক বোতল নিজের রক্ত জমা দিয়ে আবার এসে স্ত্রীয়ের পাশে, ওটি-র সামনের বেঞ্চটাতে বসলেন।

হঠাৎ করে শ্রীরাধার কী হল? ভালোই তো ছিল। ভিতরের টেনশন কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিলেন না শ্রীরাধার বাবা।

অপারেশন টেবিলে শ্রীরাধাকে শুইয়ে দিয়ে শীলা জিজ্ঞেস করলেন, যার সঙ্গে তুমি প্রায়শই ওই ঝিলটায় যাও এটা তারই কীর্তি, তাইতো?

চোখের জল বাধ মানে না শ্রীরাধার। হ্যাঁ ডক্টর, আমার একটা ভুলের জন্য এই পরিণতি হবে আমি ভাবতে পারিনি। আমাকে প্লিজ বাঁচাবার চেষ্টা করবেন না। আমার মরে যাওয়াই উচিত।

আমি তোমার মতো বোকা এবং দাযিত্বজ্ঞানহীন নই। আমার কী কর্তব্য সেটা আমি ভালোই জানি।

কিন্তু এই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আমি কী করে বাঁচব? আপনি আমাকে এখন বাঁচিয়ে দিতে পারেন ঠিকই কিন্তু পরেও তো আবার আমি আত্মহত্যা করতেই পারি। দয়া করে আমাকে মরতে দিন।

ঘাবড়ে যেও না, আমি তোমার বদনাম হতে দেব না। এখান থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তুমি বাড়ি যাবে। নিজের পড়াশোনার ওপর বেশি ফোকাস রাখো। এখন থেকে মা-বাবার সম্মানের কথাটা মাথায় রেখো দয়া করে। সম্মতিসূচক মাথা হেলায় শ্রীরাধা। আর কথা বোলো না, এখনই অ্যানাস্থেশিযার প্রভাব ধীরে ধীরে শুরু হয়ে যাবে। তার পরেই আমি অপারেশন শুরু করব।

প্রায় দুঘন্টা পর ওটি থেকে শীলা বাইরে বেরোতেই, শ্রীরাধার মা-বাবা দৌড়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এখন আমাদের মেয়ে কেমন আছে?

ভালো আছে। আপনারা ঠিক সময়ে মেয়েটির হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, নয়তো বেশি ব্লিডিং হওয়ার ফলে প্রাণটাও যেতে পারত। অপারেশন সাকসেসফুল। এখন আর কোনও ভয় নেই আপনাদের মেয়ে।

কিন্তু ডক্টর, আমার মেয়ের কী হয়েছে ? শ্রীরাধার বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

আপনারা আমার কেবিনে আসুন।

শ্রীরাধার মা-বাবা ডা. শীলার সঙ্গে ওনার চেম্বারে গিয়ে বসলেন। শীলা, শ্রীরাধার ফাইলে দেওয়া বিবরণ চোখের সামনে খুলে ধরলেন। পেশেন্টের বাবার দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, আপনি ফাইলে মেয়ে বয়স লিখিয়েেন সতেরো অর্থাৎ নাবালিকা। আপনারা কি জানতেন, শ্রীরাধা গর্ভবতী ছিল?

কিন্তু এটা কী করে সম্ভব?

তার উত্তর তো একমাত্র শ্রীরাধাই দিতে পারবে। ওর একটি ফার্টিলাইজড এগ গর্ভাশয় অবধি পৌঁছোতে পারেনি। ফ্যালোপিয়ন টিউবেই আটকে ছিল। গর্ভের আকার বড়ো হতেই নালি ফেটে গিয়ে ব্লিডিং শুরু হয়েছিল। আমরা নালির ওই অংশ কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছি। এখন আর ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।

ডাক্তারের কথা শুনে শীলার মা-বাবার মুখে আশ্চর্য হওয়ার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ওঁরা লজ্জায় মাথা নীচু করে নিলেন।

সপ্তাহ খানিক পর শ্রীরাধার ডিসচার্জ হওয়ার কথা। শীলার অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে জিজ্ঞেস করল, ডিসচার্জ ফাইলে কী লিখব ম্যাডাম? আপনি বলেছিলেন ডিসচার্জ ফাইল তৈরি করার সময় আপনাকে একবার জিজ্ঞেস করতে।

ওকে, পেশেন্টকে যে ডিসচার্জ স্লিপটা দেওয়া হবে, তুমি তাতে সব সত্যিটা লেখো। আর হাসপাতালের ফাইলে লেখো ডান দিকের ফ্যালোপিয়ন টিউব ফেটে যাওয়ার পরে, সেটা আপারেশন করে বার করে দেওয়া হয়েছে। একটা নোট লিখে দিও যে, সার্জারির ডিটেল রিপোর্ট গাইনিকোলজিস্টের ফাইলে রয়েছে। এই ডিটেল পেপার্স-এর ফাইল আমাকে দিয়ে দিও। এই পুরো ব্যাপারটা যেন আমাদের দুজনের মধ্যেই থাকে। তুমি নিজে একজন মেয়ে হয়ে নিশ্চয়ই এটার গুরুত্ব বুঝতে পারছ।

কথোপকথনের মধ্যেই সৌম্য এসে স্ত্রীয়ের কেবিনে ঢুকেছিলেন। চুপচাপ বসে স্ত্রীয়ের কথা শুনছিলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শীলাকে বললেন, এটা তুমি কী করছ? হাসপাতালের ফাইলেই অপারেশন নোটস থাকতে দাও। এটা তোমার করা উচিত নয়। পেশেন্টের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে বলে, তুমি হাসপাতালের নিয়ম ভাঙতে পারো না।

সৌম্য তুমি যা বলছ, তা একদম ঠিক। কিন্তু ভেবে দ্যাখো মেয়েটি নাবালিকা, বাচ্চা মেয়ে বললেও ভুল হবে না। ওর এই অবৈধ প্রেগন্যান্সি যদি একবার ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মেয়েটির বদনামের শেষ থাকবে না। মেয়েটির ভবিষ্যৎও নষ্ট হয়ে যাবে। আমি ডাক্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন নারী। আমি মেয়েটির ব্যথা খুব ভালো বুঝতে পারি।

শীলা, শ্রীরাধার মা-বাবাকে ডেকে পাঠালেন নিজের কেবিনে। হাসপাতালের নিয়মকানুন বুঝিয়ে বললেন, দেখুন আপনাদের ফাইলে আমাকে সত্যিটা লিখতেই হবে। ফাইল আপনাদের সুতরাং ওটা নিয়ে আপনারা যা খুশি করতে পারেন। চাইলে নষ্ট করেও দিতে পারেন। আপনাদের মেয়ে ভালোর জন্য আমার পক্ষে যতখানি সম্ভব আমি সেটা করেছি। এবার ওর ভবিষ্যৎ আপনাদের হাতে।

মা জিজ্ঞেস করলেন, শ্রীরাধা ভবিষ্যতে আদৌ মা হতে পারবে কি?

হ্যাঁ, মা হতে পারবে। ওর একটা ফ্যালোপিয়ন টিউব সম্পূর্ণ ঠিক আছে।

কিন্তু অপারেশনের দাগ তো পেটে থেকেই যাবে। বিয়ের পর যদি ওর স্বামী দেখে কিছু সন্দেহ করে?

আমি ল্যাপ্রোস্কোপিক পদ্ধতিতে সার্জারি করেছি। ছোট্ট একটুখানি জায়গা কাটতে হয়েছে। সুতরাং পেটে কোনও বড়ো দাগ থাকবে না, তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। শ্রীরাধার বিয়ে এখনও অনেক দেরি আছে। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি, ও এখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়। মাস্টার্স করে তবেই বিয়ে করবে আপনাদের মেয়ে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেওয়ার পর বাড়ি এসে শ্রীরাধা মায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ল। লজ্জা যেন ওকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। মা, আমি আর কারও কাছে মুখ দেখাতে পারব না! বেঁচে থেকে আমি কী করব?

খবরদার রাধা এমন বোকার মতো কথা মাথাতেও আনবি না। একটা দুর্ঘটনা ভেবে ভুলে যা। এটা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা করবি না। এমনকী বিয়ে পর স্বামীর সঙ্গেও না। এখন মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আমরা খুব ধুমধাম করে তোর বিয়ে দেব, চিন্তা করিস না।

শ্রীরাধার মা স্বামীকেও বললেন, এই ব্যাপার নিয়ে রাধাকে তুমি কিচ্ছু বলবে না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি। এই পুরো ঘটনায় ও খুব লজ্জিত। ও এখন পড়াশোনা নিয়ে থাকতে চায়। ভাগ্য ভালো যে, এরকম একজন ভালো লেডি ডক্টর-এর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল। যিনি আমাদের সম্মান বাঁচাবার জন্য যতখানি সম্ভব সহযোগিতা করেছেন।

এই ঘটনার পর আট বছর কেটে গেছে। আজ শ্রীরাধা নিজের স্বামীর সঙ্গে আবার ডা. শীলার হাসপাতালে এসে হাজির হয়েে। আড়াই মাসের গর্ভবতী সে। ওর ডাক্তারই শ্রীরাধাকে, ডা. শীলা বোসের কাছে রেফার করেছেন।

শ্রীরাধা আর তার স্বামীর সঙ্গে কথার শেষে, শ্রীরাধার স্বামীকে কেবিনের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ডা. শীলা চেক-আপের জন্য শ্রীরাধাকে বেডে শুইযে দিলেন। পরীক্ষা করে বললেন, পেটের দাগটা তো একেবারেই মিলিয়ে গেছে দেখছি। এখন ক’মাস চলছে?

আড়াই মাস চলছে ম্যাম।

বাচ্চা একদম ঠিক আছে। খাওয়া-দাওয়ার খেযাল রাখতে হবে আর অ্যাক্টিভ থাকবার চেষ্টা করবে সবসময়। এতে নর্মাল ডেলিভারি হতে সুবিধা হবে। কমপ্লিট রেস্টের কোনও দরকার নেই তোমার। তোমার স্বামী বাইরে বসে ছটফট করছেন, তোমাকে খুবই ভালোবাসেন, তাই না?

হ্যাঁ ম্যাম। আমার অতীতের ঘটনা ওনাকে কিছুই জানাইনি। আমি তো আত্মহত্যা করব বলেই ঠিক করে ফেলেছিলাম, আপনিই আমাকে মরার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আপনার জন্যই এত সুন্দর জীবন পেয়েছি। এই ঋণ কোনও দিন আমি শোধ করতে পারব না। শ্রীরাধার চোখ জলে ভরে আসে।

আচ্ছা ঠিক আছে। এখন শিগগির স্বামীর কাছে যাও। ও বেচারা উত্কণ্ঠায় ছটফট করে মরছে। হাসতে হাসতে শীলা বললেন।

চোখে জল নিয়ে শ্রীরাধা কেবিন থেকে বাইরে এল। ওকে দেখে স্বামী রথীন দৌড়ে এল, কী হল শ্রীরাধা, সব ঠিক আছে তো? তোমার চোখে জল কেন?

রথীন এটা হচ্ছে আনন্দের অশ্রু। শ্রীরাধার শরীর আর বাচ্চা দু-ই একদম ঠিক আছে। পরের বার মিষ্টি নিয়ে আসতে ভুলো না শ্রীরাধা। ওরা দুজনের কেউই খেয়াল করেনি, কখন ডা. শীলাও শ্রীরাধার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওনার কথাতে দুজনের চমক ভাঙে। রথীন আর শ্রীরাধা হাসিমুখে শীলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসে। নবজাতকের আগমনের স্বপ্নে দুজনেই বিভোর হয়ে ওঠে।

আলোয় ফেরা

‘মিত্রা, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। এখুনি বেরোতে হবে। একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিল এজেন্ট। এখন না গেলে যার ফ্ল্যাট সে চলে যাবে’, শংকর তাড়া লাগাল বউকে।

আজ এক সপ্তাহ হল শংকর আর মিত্রা বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি এসে হোটেলে উঠেছে। শংকর বেঙ্গালুরুর চাকরি ছেড়ে আরও ভালো প্যাকেজ পেয়ে দিল্লি এসেছে। বরের সঙ্গে থাকবে বলে মিত্রা ওখানকার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। ও জানে এখানে সেটল করে ঠিক একটা চাকরি ও জোগাড় করে নেবে। বেঙ্গালুরুর ফার্নিশড ফ্ল্যাটটাও ওরা আসার সময় ছেড়ে দিয়ে এসেছে। ওরা ঠিকই করে রেখেছে নিজস্ব ফ্ল্যাট না হওয়া পর্যন্ত ফার্নিশড ফ্ল্যাট-ই ভাড়া নিয়ে থাকবে। এতে সুবিধা হচ্ছে, গুচ্ছের জিনিসপত্র কিনে টানা-হ্যাঁচড়ার কোনও প্রশ্ন নেই। শুধু নিজেদের ব্যবহার্য জামাকাপড় এবং দৈনন্দিন কিছু জিনিস ছাড়া শিফটিংয়ের সময় গুচ্ছের জিনিস বইতে হয় না। সুতরাং দিল্লিতে আসা থেকে ওরা নতুন ফ্ল্যাটের সন্ধানে রয়েছে। কয়েকটা দেখেওছে কিন্তু কোনওটাই ফার্নিশড ছিল না। হোটেলে থাকতেও ওদের আর ভালো লাগছিল না।

নতুন ফ্ল্যাটটা দেখেই দুজনেরই পছন্দ হয়ে গেল। নতুন ফার্নিচারে সাজানো দুটো বেডরুম, ড্রয়িং কাম ডাইনিং, ঝকঝকে মডার্ন কিচেন, বাথরুম– সবই প্রশংসার যোগ্য কিন্তু মিত্রার সবথেকে পছন্দ হল ফ্ল্যাটের সঙ্গে লাগোয়া সার্ভেন্ট কোয়ার্টারটা দেখে। বাড়িওয়ালা জানালেন, ওই সোসাইটিতে প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে একটি করে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার আছে। তাতে একটি রুম সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম এবং রান্নাঘর। কোয়ার্টারে ঢোকার রাস্তাও আলাদা।

ফ্ল্যাটে যে কাজ করবে সে পরিবারের সঙ্গে ওখানে থাকতে পারবে পরিবর্তে কম টাকায় তাকে ওই ফ্ল্যাটের সব কাজ করতে হবে। এটাই নাকী ওই সোসাইটির নিয়ম। যারা এই শর্তে কাজ করতে ইচ্ছুক তারা সিকিউরিটি গার্ডের কাছে নিজেদের মোবাইল নম্বর দিয়ে রেখেছে সুতরাং যোগাযোগ করতে হলে সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

সব দেখেশুনে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ করে দিল শংকর। মিত্রার মুখ দেখে বুঝতে পারছিল ওরও খুব পছন্দ হয়েছে পুরো ব্যবস্থা। টাকা দিতে যাওয়ার একটা দিন ধার্য করে ওরা স্বামী-স্ত্রী বেরিয়ে এল সোসাইটি থেকে। মিত্রা আনন্দ চেপে রাখতে পারল না। বাইরে পা দিয়েই বলল, ‘আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে ফ্ল্যাটটা, বিশেষ করে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার থাকায় চাকরি করাটা খুব সুবিধা হবে তাই না?’

ছোট্ট একটা ‘হ্যাঁ’ বলেই শংকর চুপ করল।

‘এখানে শিফট করেই একজন কাজের লোক রেখে নেব। তাহলে অফিস জয়েন যখন করব কোনও চিন্তা থাকবে না আর অফিস থেকে ফিরেও রান্না করার ঝামেলায় পড়তে হবে না’, মিত্রা আনন্দ কিছুতেই চাপতে পারে না।

তিন দিনের মাথায় শংকর আর মিত্রা নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করল। মিত্রা এসেই সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলে চার-পাঁচজন পরিচারিকার নম্বর নিজের মোবাইলে সেভ করে রাখল, সময় করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলে।

একটু গুছিয়ে বসতেই মিত্রা কাজের লোক খুঁজতে লেগে পড়ল। দুটো তিনটে ফোন করার পর একজনকে পছন্দ হল কিন্তু তার এক মাসের বাচ্চা আছে শুনে পিছিয়ে গেল আবার। অতটুকু বাচ্চা নিয়ে পুরো বাড়ি কীভাবে মেয়েটি সামাল দেবে ভেবে পেল না মিত্রা। অগত্যা তাকেও না করতে হল।

শংকর অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে দেখে মিত্রা রান্নাঘরে ঢুকল। মনটা পড়ে রইল কাজের লোকের চিন্তায়। কী জানি কটা দিন আর অপেক্ষা করতে হবে? আনমনা হয়েই দরজা অবধি এগিয়ে গেল মিত্রা, শংকরকে সিঅফ করতে। দরজা বন্ধ করে সোফায় এসে বসল। এখনও ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়নি। মনে মনে কাজের একটা লিস্ট ছকে নেয় ও। সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে আরও কটা নম্বর জোগাড় করে নিয়ে আসতে হবে। সুতরাং দেরি না করে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে। তক্ষুনি ডোর বেলটা বেজে ওঠে। মিত্রা দরজার দিকে এগোয়। দরজা খুলতেই দ্যাখে সামনে দাঁড়িয়ে মাঝবয়সি একটি মহিলা। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সুতির ছাপা একটি শাড়ি পরনে। গায়ের রং শ্যামলা এবং ছিপছিপে শরীর।

মিত্রাকে দেখে মহিলাটি হাত তুলে নমস্কার জানাল। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই মিত্রার জিজ্ঞাসু এবং উৎসুক মুখ দেখে মহিলাটি বলল, ‘ম্যাডাম, আমার নাম শ্যামা। থাকার জন্য আমার ঘরের খুব দরকার। আপনি লোক খুঁজছেন কাজের জন্য। আমি এখানে কাজ করতে রাজি আছি। আমার স্বামী তিনবছর আগে মারা গেছে, দুটো মেয়ে আছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। পাশেই বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। আগে অনেক বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করতাম কিন্তু এখন আর পারি না। এখন একটা বাড়িতে থেকে সেখানেই রাত-দিনের কাজ করতে চাই। এটুকু বলতে পারি আমাকে নিয়ে বা আমার কাজ নিয়ে আপনাকে নালিশ করতে হবে না। সারাদিন পরিশ্রম করতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।’

মহিলাটির কথাবার্তা শুনে, মিত্রার মহিলাটিকে ভালোই মনে হল, তবে কয়েকটা প্রশ্ন আগে থেকে জিজ্ঞেস করে নেওয়াটা উচিত মনে হল মিত্রার। জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি জানো, এখানে সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে থাকতে হলে, তোমাকে কম টাকায় বাড়ির কাজ করতে হবে? তাহলে তোমার মাসে চলবে কী করে?’

‘সে চিন্তা নেই ম্যাডাম। ছয় মাস বাদে বাদে গ্রাম থেকে আমার চাল, ডাল গম সব আসে। গ্রামে আমাদের জমিজমা কিছু আছে। এছাড়া আমার দুই জামাইও খুব ভালো। টাকাপয়সা দিয়ে ওরা সবসময় আমাকে সাহায্য করে। আমার শুধু থাকার জন্য ঘরের খুব দরকার।’

‘ঠিক আছে, তুমি কবে থেকে আসতে পারবে? মিত্রা জিজ্ঞেস করল।’

‘ম্যাডাম, কাল বাদে পরশু সকালেই আমি জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসব’, বলে শ্যামা চলে গেল। মিত্রাও দরজা বন্ধ করে ভিতরে আসতে আসতে অনেকটা হালকা বোধ করল। মহিলাটি একাই থাকবে সুতরাং ওর নিজের ঝামেলা খুব একটা থাকবে না, ফলে মিত্রার সংসারে ও ভালোমতোই সময় দিতে পারবে। শংকরকে ফোন করে সুখবরটা দিতে হবে ভেবে মিত্রা মুঠোফোনটা হাতে তুলে নিল।

একদিন পরই শ্যামা নিজের জিনিসপত্র নিয়ে মিত্রার কাছে হাজির হল। মিত্রা সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের চাবি খুলে দিয়ে শ্যামার হাতে চাবিটা ধরিয়ে দিল। হাতমুখ ধুয়ে জিনিসপত্র রেখে শ্যামা মিত্রার ফ্ল্যাটে চলে এল এবং বাড়ির সব কাজ বুঝে নিল। শ্যামার গোছালো কাজ দেখে মিত্রা নিশ্চিন্ত বোধ করল এবং নিজের চাকরির জন্য খোঁজখবর নিতে শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে একটা মাসের মধ্যে তিনটে ইন্টারভিউ দেওয়া হয়ে গেল মিত্রার। মাস কাটতেই হঠাৎই শ্যামার ব্যবহারে কিছু অসংগতি মিত্রার চোখে ধরা পড়তে আরম্ভ করল।

গ্রামের থেকে চাল, ডাল, গম আসে, শ্যামার কাছে এই গল্প প্রথমে বিশ্বাসই করেছিল মিত্রা। কিন্তু রোজ রোজ যখন জিনিস চাওয়া আরম্ভ করল শ্যামা তখনই মিত্রার সন্দেহ হওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে সাহস বাড়তে থাকে শ্যামার। মিত্রাকে কিছু না জানিয়েই রান্নাঘর থেকে চাল, আটা, ডাল, ফ্রিজ থেকে দুধ, সবজি নিয়ে যেতে আরম্ভ করল ও।

একদিন মিত্রা এই নিয়ে একটু চ্যাঁচামেচি করতেই শ্যামাও গলার জোর বাড়াল, ‘আমি কি চুরি করেছি নাকি? আপনার সামনেই তো বার করেছি। এখানে কাজ করছি আর গ্রাম থেকেও এখনও কেউ চাল, ডাল দিতে আসেনি। এই অবস্থায় আপনার থেকে নেব না তো আর কোথায় যাব?’

মিত্রা রাগের মাথায় আর কিছু না বলে চুপ করে গেল।

কিন্তু ধীরে ধীরে শ্যামার চাহিদা বাড়তে আরম্ভ করল। কখনও বিছানায় পাতার জন্য চাদর চেয়ে বসে আবার কখনও কোথাও যাওয়ার দরকার হলে মিত্রার থেকে শাড়ি চেয়ে বসে। শুধু চাওয়া নয়, প্রতিটা কথায় মিত্রার আচার আচরণ নিয়ে টিটকিরি দেওয়া শুরু করে দিল। কখনও মিত্রা সিঁদুর পরে না বলে কথা শোনাত তো কখনও বাড়িতে পুজোপাঠ করে না বলে তাচ্ছিল্য করা শুরু করে দিল। অথচ কাজের কথা মিত্রা কিছু বললে, না-শোনার ভান করত। টাকাপয়সাও মাঝেমধ্যেই চাওয়া শুরু করল। মিত্রা দিতে না চাইলে মেজাজ দেখিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যেত শ্যামা। মিত্রার কাছে সব শুনে শংকর ওকে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বললেও মিত্রা কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিল না শ্যামাকে নিয়ে ও কী করবে।

একদিন ফোনে যখন ব্যস্ত মিত্রা, ডোরবেল বেজে ওঠে। শ্যামাকে ডেকে দরজাটা খুলে কে এসেছে দেখতে বলে মিত্রা। ঝনঝন করে রান্নাঘর থেকে বাসন পড়ার শব্দ পায়। মিত্রা বুঝতে পারে দরজা খুলতে বলায় শ্যামা রেগে বেসিনে বাসন ছুঁড়ে দিয়ে দরজা খুলতে গেছে। বিরক্ত বোধ করে মিত্রা। সঙ্গে সঙ্গেই একটা প্যাকেট হাতে করে নিয়ে উপস্থিত হয় শ্যামা। ‘নিন, ধরুন, দরজাটা আপনিও তো খুলে দিতে পারতেন… এই ভাবে কাজই তো শেষ করতে পারব না… সারাদিনটা কি এখানেই কাটাব আমি?’

রাগ সামলে প্যাকেট খোলায় মন দেয় মিত্রা। অনলাইনে বুক করা নতুন জুতোটা পাঠিয়েছে। প্যাকেট খুলতেই নতুন জুতো দেখে শ্যামা চুপ থাকতে পারে না, ‘বাবাঃ, শু-র‍্যাক-টা তো আগে থেকেই উপচে পড়ছে, আবার একটা জুতো কিনলেন? একেবারে বাজে খরচা। এর জন্য আপনাদের কাছে টাকা রয়েছে আর আমরা গরিব মানুষরা একটা জিনিস নিলেই আপনাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়।’

শ্যামার স্পর্ধা দেখে মিত্রা অবাক হয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যে শ্যামার চরিত্রের এই পরিবর্তন মিত্রার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে মিত্রা, শ্যামাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করে দিল আর চার ঘণ্টা সময় দিল কোয়ার্টার ছেড়ে দেবার জন্য।

শ্যামাও রাগ দেখাতে ছাড়ল না, ‘দরকার নেই আমার এরকম কাজের। আমি মেয়ে জামাইয়ের কাছে আরামে থাকব… লোক রেখে দেখুনই না… বুঝতে পারবেন’, বলে দুড়দাড় করে কোয়ার্টারে ঢুকে গেল। খানিক্ষণ পরেই মেয়ে, জামাই এসে শ্যামাকে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় মিত্রা, কোয়ার্টারের চাবিটা ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিল।

রাগের মাথায় শ্যামাকে ছাড়িয়ে দিয়ে আর এতগুলো কথা বলে বড়ো ক্লান্ত অনুভব করছিল মিত্রা। বাড়ির পড়ে থাকা সমস্ত কাজ সেরে মিত্রা একটু গড়িয়ে নিতে বিছানায় এসে বসে। ক্লান্ত শরীরে কখন যে চোখ বুজে এসেছিল ও নিজেও বুঝতে পারেনি। দরজায় ধাক্বা শুনে ঘুমটা ভাঙে ওর। বাইরেটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। শংকরের ফেরার সময় তো এখনও হয়নি। তবে কে এল এই অসময়ে? উঠতে ইচ্ছে করছিল না, জোর করে উঠল।

দরজা খুলে দেখল তেইশ-চব্বিশ বছরের একজন যুবতি মেয়ে। দেখে মনে হচ্ছিল নতুন বিয়ে হয়েছে বেশ হাসি মুখ। পাশেই দাঁড়িয়ে একটি যুবক। মিত্রার মনে হল মেয়েটির স্বামী নিশ্চয়ই।

‘দিদি, আমার নাম সীমা, এ হল রানা… আমার… আমি কাজের জন্য এসেছি।’

ছেলেটি হাতজোড় করে মিত্রাকে নমস্কার জানাল। দুজনের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মিত্রা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কী করে জানলে আমি কাজের জন্য লোক খুঁজছি? আমার লোক তো আজ সকালেই ছেড়ে গেছে। আমি তো এখনও কাউকে কিছু জানাইনি পর্যন্ত’, কথা শেষ করে মিত্রা দুজনকে ভিতরে এসে কথা বলার জন্য ইশারা করল। দুজনে ভিতরে এসে দরজার গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

‘দিদি, আপনার কাছে আমার পিসি এতদিন কাজ করছিল। আজকে রেগে গিয়ে আপনাকে কী বলেছে জানি না কিন্তু বাড়ি গিয়ে নিজেকেই দোষারোপ করছিল। পিসি খুব ভালো করেই জানে ওকে আপনি আর কাজে নেবেন না তাই আমাকে এখানে কাজের কথা বলল’ সীমা মিত্রার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল।

‘ও… তাই বলো! তোমাকে তাহলে শ্যামা আমার কাছে পাঠিয়েছে? তুমি পারবে সব কাজকর্ম ঠিক করে করতে?’ মেয়েটির ব্যবহার মিত্রার ঠিকই মনে হল অগত্যা মেয়েটিকে কাজে বহাল করার কথা ঠিক করে নিল মিত্রা।

‘দিদি, আমি এই হাউজিং-এ আমার ভাসুর-জায়ের সঙ্গে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে থাকি, বাইরের একটা কাজও করি… কিন্তু দিদি থাকার খুব অসুবিধে হচ্ছে। আমার জায়ের দুটো বাচ্চা সঙ্গে আবার আমরা দুজন। একটা ঘরে গাদাগাদি করে কোনওমতে থাকা। এখানে আপনার কাছে কাজ করলে থাকার অসুবিধে থাকবে না। এবার যদি আপনি আমাকে রাখেন।’

সীমাকে রাখার সিদ্ধান্ত আগেই মনে মনে নিয়ে নিয়েছিল মিত্রা। সুতরাং মুখে বলল ‘ঠিক আছে, তোমরা তাহলে চলে এসো। যখন আসবে চাবিটা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিও।’

রাত্তিরেই একটা খাট আর কিছু জামাকাপড় নিয়ে সীমা, রানার সঙ্গে মিত্রার সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে চলে এল।

পরের দিন সকালেই রানা নিজের কাজে চলে গেলে সীমা মিত্রাদের ফ্ল্যাটে চলে এল। মিত্রার কাছ থেকে সব কাজ বুঝে নিয়ে মিত্রাকে জোর করে বসিয়ে দিল, ‘দিদি, আপনি বসে থাকুন, আমি সব কাজ করে দেব। যদি মনে হয় কাজটা ঠিকমতো হয়নি তাহলে আমাকে ডেকে শুধু বলে দেবেন।’

রবিবার সাধারণত সীমা, অর্ধেক দিনের ছুটি চেয়ে নিত মিত্রার কাছে। দুপুরে কাজ সেরে বরের সঙ্গে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যেত ও। কখনও সিনেমা দেখতে, কখনও এমনি ঘুরতে অথবা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িও যেত ওরা। কখনও কখনও বেরোত যখন, মিত্রার চোখেও পড়ত। সীমার সাজগোজ দেখে মিত্রার একটু অবাকই লাগত কারণ ইমিটেশন গয়না থেকে মেক-আপ, পোশাক-আশাক কিছুতেই কোনও খামতি ওর চোখে পড়ত না। এত সব করার টাকা কোথা থেকে আসে বুঝতে পারত না মিত্রা।

মিত্রা যখনই এ বিষয়ে সীমার সঙ্গে কথা বলত, একই উত্তর শুনত, ‘দিদি, আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে… ও সেজেগুজে থাকা খুব পছন্দ করে। সাজগোজের বেশিরভাগ জিনিসই তো ওই কিনে আনে।’

বেশি মাথা ঘামায়নি মিত্রা এই নিয়ে। এটা ওদের ব্যক্তিগত জীবন, যতক্ষণ বাড়ির কাজ ঠিকমতো হয়ে যাচ্ছে এইসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবার কোনও কারণ নেই মিত্রার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চাকরি খুঁজে জয়েন করাটাই মিত্রার লক্ষ্য। এই নিয়েই আপাতত ও ব্যস্ত থাকতে চায়।

ল্যাপটপ-টা খুলে মেলগুলো চেক করতে বসে মিত্রা। হতাশ হয়, কোনও মেল ঢোকেনি দেখে। কী করবে ভেবে না পেয়ে অনলাইন শপিং সাইটগুলো একটার পর একটা দেখতে শুরু করে। অবসাদ কাটাবার একমাত্র উপায় শপিং, সুতরাং তাতেই মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে সে। হঠাৎ চোখ আটকায় একটা কুর্তা দেখে। কিনলে বেশ খানিকটা রিবেট পাওয়া যাবে দেখে প্লাস্টিক কার্ডটা নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। মনে করার চেষ্টা করে পার্সটা কোথায় রেখেছে। খেয়াল হয় কাল থেকে ড্রয়িংরুমের টিভির পাশেই পড়ে রয়েছে পার্সটা। তাড়াতাড়ি ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু ঘরে ঢুকেই যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মিত্রা। সীমা সোফায় গা এলিয়ে বসে মিত্রার পার্সটা নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। সীমার পিঠ মিত্রার দিকে থাকায় ও মিত্রাকে দেখতে পায়নি। মিত্রা সোফা অবধি পৌঁছোতে পৌঁছোতে সীমা পার্স থেকে টাকা বার করে ব্লাউজের ভিতর ঢুকিয়ে নেয়। মিত্রাও বিন্দুমাত্র শব্দ না করে পিছন থেকে সীমার হাতটা ধরে ফেলে। চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়াতে সীমা ঘাবড়ে যায়।

‘দিদি, তুমি!’ মিত্রার মুখ-চোখ দেখে সীমা তোতলাতে থাকে, ‘আমা…কে ক্ষমা করে দাও। আমি কখনও চুরি করি না… আজ শরীরটা ঠিক নেই তাই ডাক্তার দেখাতে যাব… টাকার দরকার ছিল, তাই এই টাকাটা… আর কখনও হবে না দিদি’। ব্লাউজের ভিতর থেকে পাঁচশোর নোটটা বার করতে করতে সীমা বলে।

‘তোমার শরীর খারাপ? কিন্তু সকাল থেকে তো দেখে কিছু মনে হয়নি, বরং আনন্দেই আছ বলে মনে হচ্ছিল। এখন বুঝতে পারছি বাথরুম থেকে শ্যাম্পু, কন্ডিশনার কীভাবে এত তাড়াতাড়ি শেষ হচ্ছে? কয়েকটা লিপস্টিকও আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তারপর তো আরও আছে, মাঝেমধ্যেই কাজ করতে করতে কোয়ার্টারে চলে যাও… এখন বুঝতে পারছি যাওয়ার কারণ। আমি আর কিছু জানতে চাই না। তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারো কোয়ার্টার খালি করে দাও’, রাগে আর কথা বলতে পারে না মিত্রা। ইচ্ছে হয় এখুনি পুলিশ ডেকে সীমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে।

সন্ধেবেলায় শংকর বাড়ি ফেরার পরেই সীমা এসে কোয়ার্টারের চাবি মিত্রাকে ধরিয়ে গেল। চুপচাপ স্বামী-স্ত্রী জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যায়।

আবার সেই কাজের লোকের সমস্যা। মিত্রা মুষড়ে পড়ল তবুও প্রতিজ্ঞা করল এবার আর কোনওরকম তাড়াহুড়ো করবে না। দেখেশুনে তবেই বাড়িতে কাজের লোক ঢোকাবে। সিকিউরিটি গার্ডকেও ফোন করে একটু চেনাশোনা লোকের খোঁজ করতে অনুরোধ করল।

রবিবার শংকরের অফিস ছুটি, ফলে উঠতে একটু দেরিই হয়েছে। মুখ ধুয়ে চা বানিয়ে মিত্রা শোবার ঘরে ঢোকে। শংকর তখনও বিছানা ছাড়েনি। বেডসাইড টেবিলে চায়ের ট্রে টা নামিয়ে বিছানায় গুছিয়ে বসে মিত্রা। কাপটা এগিয়ে দেয় শংকরের দিকে। এই একটা দিনই শংকরের সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটাতে পারে মিত্রা। নয়তো রোজই তো সকালে উঠেই অফিস যাওয়ার তাড়া। আর প্রাইভেট চাকরিতে ফেরার কোনও ঠিক নেই।

সবে গল্প করতে করতে চায়ের কাপটা শেষ করেছে, এমন সময় কলিং বেলটা কারও আসার বার্তা জানায়। এই সময় কে রে বাবা! অজান্তেই ঘড়ির দিকে চোখটা চলে যায় মিত্রার। সবে আটটা বাজছে।

বিরক্ত হয়েই বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে পা বাড়ায় ও। হয়তো সিকিউরিটি গার্ড কাউকে পাঠিয়েছে সকাল সকাল, ভেবে খানিকটা স্বস্তি অনুভব করে মিত্রা।

দরজা খুলতেই দ্যাখে সামনে দাঁড়িয়ে পঁয়ষট্টি-সত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ দম্পতি। সঙ্গে রয়েছে ছোটোখাটো চেহারার কুড়ি-একুশ বছরের একটি যুবতি।

মিত্রাকে দেখতেই বৃদ্ধটি হাতজোড় করে বলে, ‘ম্যাডাম, আমি রিটায়ার্ড সরকারি চাপরাশি। বহুদিন ধরে কৈলাশ কলোনিতে একটি ফ্যামিলির সঙ্গে রয়েছি। আমার বউ আগে ওখানে কাজ করত এখন বয়স হয়ে যাওয়াতে আমার এই নাতনি ওদের সব কাজ করে।’

‘আচ্ছা এটি আপনার নাতনি?’ মিত্রা প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ ম্যাডাম। আমরা ওই সাহেবের বাড়ির সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে এতদিন ধরে রয়েছি। এই মাসে ওই সাহেব দিল্লির বাইরে বদলি হয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং আমাদেরও কোয়ার্টার ছাড়তে হবে। শহরে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকার ক্ষমতা নেই আমাদের। আমার পেনশনে সংসারটা চলে কোনওরকমে। তাই এখানে কোয়ার্টার পাওয়া যাবে শুনেই আমি এসেছি।’

‘আপনাদের ছেলে, ছেলের বউ কোথায় থাকে? নাতনি তো দেখছি আপনাদের সঙ্গেই থাকে।’

‘ম্যাডাম, আমাদের ভাগ্যের কথা আর বলবেন না। মেয়েটির জন্মের সময়ই ওর মা মারা যায়। কয়েক বছর বাদেই মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে আমার ছেলে…’ বলতে বলতে বৃদ্ধের গলা

ধরে আসে।

‘আপনাদের নাম কী’, মিত্রা জানতে চায়।

‘আমার নাম রতন আর আমার স্ত্রী সারদা। নাতনির নাম ওর বাবাই রেখেছিল রেশমি।’

‘একটু দাঁড়ান, আমি আসছি’, বলে মিত্রা শোবার ঘরে এসে ঢোকে। শংকর ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে। শংকরকে রতনের সম্পর্কে সব বলে মিত্রা। দুজনেরই মনে হয় ওদের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে রাখলে কোনওরকম অসুবিধায় পড়তে হবে না। বৃদ্ধের কথায় মিত্রা বুঝে গিয়েছিল রেশমিই ওর কাছে কাজ করবে। সুতরাং বাইরে এসে মিত্রা ওদের জানিয়ে দেয়, ওদের কাজে বহাল করতে ও রাজি।

সন্ধের আগেই রতন, স্ত্রী এবং নাতনিকে নিয়ে মিত্রার কাছে হাজির হল। মিত্রা কোয়ার্টারের দরজা খুলে দিয়ে ওদের সবকিছু বুঝিয়ে দিল। মিত্রার মনেও সামান্য আশার সঞ্চার হল, ওর মনে হল এবারটা শ্চিয়ই ওর কাজের লোকের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে।

পরের দিন দরজা খুলতেই সকালে, মিত্রা দেখে রতন আর সারদা দরজায় দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করতেই রতন জানায়, ‘ম্যাডাম, রেশমির জ্বর এসেছে। ওর বদলে আমরা দুজন মিলে কয়েকদিন আপনার কাজ করে দেব।’

বয়স্ক মানুষকে দিয়ে কাজ করাতে মিত্রার খুবই খারাপ লাগছিল কিন্তু ওর কাছে কোনও উপায়ও ছিল না। ওদের কাজটাও ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না মিত্রার।

দু সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও যখন রেশমি কাজ করতে এল না, মিত্রার সন্দেহ হতে লাগল, ওরা মিথ্যা কথা বলে কোয়ার্টার পাওয়ার লোভে এখানে ঢোকেনি তো? মেয়েটা হয়তো অন্য কোনও বাড়ির কাজ ধরেছে।

এইভাবে তো চলতে পারে না, এই ভেবে মিত্রা ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে কোয়ার্টারের দরজায় কড়া নাড়ল। রতন আর সারদা তখন মিত্রার ফ্ল্যাটে কাজ করছিল। দরজার কড়া নাড়তেই রেশমি এসে দরজা খুলে দিল। মিত্রার ওকে দেখে এতটুকুও অসুস্থ বলে মনে হল না।

‘তুমি তো দেখছি দিব্যি সুস্থ আছ, তাহলে কাজে আসছ না কেন?’ মিত্রা জানতে চাইল।

‘না… মানে… আমার…. আমি একটু….’ রেশমি তোতলাতে থাকে।

মিত্রা কথা না বাড়িয়ে নিজের ফ্ল্যাটে এসে দরজা বন্ধ করতে যাবে, চোখে পড়ল তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের একটি লোক রতনদের কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে গেল মিত্রা। ওদের কাছে কোনও আত্মীয়স্বজনের কথা মিত্রা তো কিছু শোনেনি। তাহলে পুরুষটি কে হতে পারে? চোরের মতন লুকিয়ে পড়ারই বা কী দরকার বুঝে পেল না মিত্রা। কিন্তু মিত্রা মনে মনে স্থির করে নিল, এই রহস্যের অনুসন্ধান ওকে করতেই হবে।

লক্ষ্য রাখা শুরু করল মিত্রা। রতন আর সারদা কাজ করতে সকালেই এসে যেত। ওরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই মিত্রা খেয়াল করত, প্রত্যেকদিনই আলাদা আলাদা পুরুষমানুষ কোয়ার্টারে আসছে। মিত্রা, কয়েকদিন পর পর নতুন নতুন পুরুষকে কোয়ার্টারে আসতে দেখে ভয় পেয়ে গেল, ওখানে এরা দেহব্যাবসা ফেঁদে বসেনি তো? শংকরকে জানানোটা সবথেকে আগে দরকার।

একদিন বাড়ি ফিরে আসার পর মিত্রা শংকরকে সবকিছু খুলে বলল। শংকর সব শুনে প্রচণ্ড রেগে গেল, ‘প্রথম দিনই তোমার আমাকে সব খুলে বলা উচিত ছিল। এতগুলো দিন হয়ে গেল। কিন্তু দোষ চাপালেই তো হবে না! হাতেনাতে ওদের ধরতে হবে। তুমি একটু চোখ কান খোলা রেখো। হতে পারে এটা একটা র‍্যাকেট।’

পরের দিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে শংকর বাড়িতেই থেকে গেল। রোজের মতোই রতন আর সারদা এসে কাজে লেগে পড়ল। মিত্রা আগেই নিজেকে তৈরি রেখেছিল, ওদের কাজের মাঝেই মিত্রা জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার রতনদা? আপনার নাতনির অসুখ এতদিনেও ঠিক হল না? আপনারা আমাকে গাধা ভেবেছেন? আজ আমি সত্যিটা না জেনে ছাড়ছি না।’

কথার মাঝেই শংকরও এসে দাঁড়াল মিত্রার পাশে, ‘হ্যাঁ, রতনদা আজকে উত্তর তো তোমাকে দিতেই হবে। আর একবার আমার সঙ্গে তোমাদের কোয়ার্টারে চলো। আমি একটা ছোটো আলমারি ওখানে রাখব। জায়গাটা তাই আমি আগে একটু দেখে নিতে চাই।’

‘কিন্তু সাহেব… এখুনি…’, রতনের কিন্তু কিন্তু ভাব দেখে শংকর ধমক দিয়ে উঠল জোরে।

শান্ত স্বভাবের শংকরের অগ্নিমূর্তি দেখে রতন ভয় পেয়ে গেল। সারদা ভয়ে রতনের হাত জড়িয়ে ধরল, ‘তুমি এনাদের সব কথা বলে দাও… এভাবে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’

ততক্ষণে রতন নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে। ও বলতে শুরু করে, ‘সাহেব, আমরা মিথ্যা বলেছিলাম, রেশমির বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের জামাই খুব বাজে লোক। সবসময় মদ খেয়ে থাকে। যখন বিয়ে হয় জামাইয়ের একটা ছোটো চায়ের দোকান ছিল। বিয়ের পর আমাদের মেয়ের যে-কটা গয়না ছিল সব বিক্রি করে দিল। যখন দোকানটাও বিক্রি করে দিল তখন রেশমিকে দিয়ে খারাপ খারাপ কাজ করাত। আমরা মেয়েটাকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে আসি কিন্তু সেখানেও সে আমাদের পিছু ছাড়ল না। ওখানেও লোক পাঠাত জামাই। আপনাদের এখানে কোয়ার্টার পেতেই একরকম লুকিয়েই এখানে পালিয়ে আসি… কিন্তু এখানকার ঠিকানাও ও কী করে জোগাড় করল জানি না, এখানেও লোক পাঠানো…’, চোখের জল আর ধরে রাখতে পারে না রতন।

‘পুলিশে জানাওনি কেন’, শংকর প্রশ্ন করে।

‘ও শাসিয়ে গিয়েছিল, পুলিশে জানালে আমাদের মেয়েটাকে মেরে দেবে’, ভীত রতন স্বীকার করে।

‘ভাবা যায়, মাত্র একটা লোক এতগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে খারাপ কাজ করাতে বাধ্য করছে?’ শংকরের উক্তিটা মিত্রার উদ্দেশ্যে হলেও অনেকটা স্বগতোক্তির মতোই শোনাল।

‘সাহেব, রেশমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। আমরা ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। ওই জানোয়ারটা আমাদের জীবন নরক করে তুলেছে’, করুণ শোনায় রতনের স্বর।

মুহূর্ত দেরি না করে সারদা আর রতনকে সঙ্গে নিয়ে শংকর পুলিশের কাছে রিপোর্ট লিখিয়ে আসে। পরের দিনই রেশমির স্বামীর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার খবর আসে। খবরটা শুনেই রতনের পরিবারের মুখে হাসি ফোটে। শংকর আর মিত্রা দুজনেই অনুভব করে, লজ্জা গ্লানির জীবন পিছনে ফেলে আজ এই গরিব পরিবারটি রৌদ্রজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে রয়েছে।

 

শেষযাত্রা

তিনি একমনে ছবি আঁকছিলেন। ক্যানভাস জুড়ে শুধু নীল আর নীল। আকাশ আর সমুদ্র মিশে গেছে। তার মধ্যে দিয়ে একটা নৌকো চলছে। নৌকো না বলে কলার ভেলা বলাই ভালো। এই বিরাট সমুদ্রে তার কখন তলিয়ে যাবার কথা। তবু চলছে। তিনি নৌকোটার গায়ে বাদামি রঙের পোঁচ দিতে লাগলেন জোরে জোরে। না, না, নৗকোটাকে কিছুতেই ডুবতে দেওয়া যাবে না।

ক্যানভাসে যেমন, জানলার বাইরেও তেমন সমুদ্র, ঢেউয়ের পরে ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে। দূরে দূরে নৌকো, জাহাজও দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের ধারে মেলার মতো ভিড়। বড়া পাও, পাপড়ি চাট, কুলফির পসরা। ঘোড়া নিয়ে দর কষাকষি। বেলুন কিনে দেবার জন্যে বাচ্চাদের মার হাত ধরে ঝুলোঝুলি। জানলা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে তাঁর হাত ক্যানভাসের ওপর থমকে গেল। ছোটোবেলায়, খুব ছোটোবেলায়, মা তাঁর হাত ধরে জুহু বিচে নিয়ে আসত। কিন্তু সেটা বিকেলে বা সন্ধেবেলা নয়, খুব ভোররাতে। কার কাছ থেকে শুনেছিল নামিদামি ফিল্ম স্টার আর প্রডিউসাররা একটু নির্জনতার জন্যে নাকি এই সময়টা হাঁটতে আসে বিচে। মা আসত তাদের এক ঝলক দেখার জন্য নয়, ফিলমে একটা ব্রেক পাওয়ার জন্য। মা তখনও ভাবত, আগের মতোই সুন্দরী আছে, একটা, জাস্ট একটা ব্রেক পেলেই মাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। তখন জুহুতেই তাদের বিরাট বাংলো, বিদেশি গাড়ি, সুববু বিদেশে পড়াশোনা করবে। মা তাকে সুববু বলে ডাকত। বাবা-ই সুববু ডাকতে শুরু করেছিল প্রথম থেকে, বাবার দেখাদেখি মা। শুভলক্ষ্মী থেকে সুববু। শুভলক্ষ্মী নামটা অবশ্য সিনেমায় চলেনি। মেহেরা সাবের কথাটা এখনও কানে বাজে ‘ম্যায় কেয়া মইথোলজিকাল ফিল্ম বানাউঙ্গা যাঁহা হিরোইন কা নাম শুভলক্ষ্মী হোগা। আরে মেরে ফিল্ম মে তো তুমকো বিকিনি ভি পেহননা হোগা। বিকিনি অউর শুভলক্ষ্মী –নেহি চলেগা। তুমহারা নাম রাখা হু কায়রা, ভেরি সেক্সি নেম, তুমহারি তরহা’

এইভাবে শুভলক্ষ্মী নামটা হারিয়ে গেলেও সুববু রয়ে গেল সারাজীবন। বাবার ওই একটাই জিনিস মা ফেলে দেয়নি কখনও। শুধু সুববু নামটা নয়, সুববুও তো বাবারই দান। বাবা বলে যে লোকটাকে জানেন তিনি, ফর্ম ভরার সময় কতবার লিখতে হয়েছে, শিবদাস আয়েঙ্গার। সেই শিবদাস একটা নয়, দু দুটো সন্তান দিয়েছিল ললিতাকে। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে চলে গিয়েছিল প্রথম সন্তান, সুববুর দাদা। তার নাম রাখা হয়েছিল শিবললিত, শিবদাসের শিব আর ললিতার ললিত মিশিয়ে তৈরি সে নাম। শিবললিতকে সুববু দেখেনি, সে আসার আগেই চলে গিয়েছিল সেই ছেলে, আর সুববু হবার বছর খানেকের মধ্যে বাবা চলে গেল। মারা যায়নি, অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ভেগে গেল। মা বলত মরে গেলেই ভালো হতো এর চেয়ে। বাবা কিন্তু মরেনি। সেই শীলা বলে মেয়েটাকে ছেড়ে একটা কোংকনী মেয়ের সঙ্গে থিতু হয়েছিল শেষমেশ। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে আসত সুববুর সঙ্গে স্টুডিওয়। টাকা চাইত না, কিচ্ছু না। শুধু সুববু বলে ডেকে মাথায় হাত রাখত আর বলত নিজের টাকা পয়সার খেয়াল রাখতে, ললিতার ওপর সব ছেড়ে না দিতে।

সমুদ্রে আরও একটু নীল রং দিতে দিতে তাঁর আজ হঠাৎ মনে হল, বাবার বদলে মা যদি তাকে ছেড়ে চলে যেত, তাঁর জীবনটা একদম অন্যরকম হতো। পালিয়ে যাবার মতো আশিক তো কম ছিল না মা-র জীবনে। কিন্তু মা তাদের কাউকে চাইত কি আদৌ? ফিল্ম ছাড়া মার মাথায় কোনওদিন কিছু ছিল না। তাই অন্ধকার বিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত একটা ব্রেকের আশায়। সুববুকে একা রেখে যেতে হবে বলে সঙ্গে নিত। আর তাই অতো ছোটোবেলাতেও সুববু বুঝে গেছিল, সাধারণ চোখে যা সুন্দর লাগে, ফিল্ম লাইনে তার কোনও দাম নেই। শরীরের ধকটাই আসল এখানে আর কচ্চি কলি হলে তো কোনও কথাই নেই।  সুন্দরী হলেও তখন মা-র শরীরে এসব কোনওটাই ছিল না। দু দুটো বাচ্চার জন্ম, অভাব, নিত্য অশান্তি মা-র সব গ্ল্যামার কখন যে শুষে নিয়েছিল, মা বুঝতে পারেনি। অথচ সুববু, তখন মাত্র তিন-চার বছরের মেয়ে হলেও বুঝতে পেরেছিল মা কোনওদিন সিনেমায় চান্স পাবে না, বুঝে গিয়েছিল মার মুখের দিকে ছুড়ে দেওয়া লোকজনের উপেক্ষিত দৃষ্টি দেখে। ওইসময় কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যেত বলে এমনিই তার ভালো লাগত না। আরও খারাপ লাগত তখন কোনও বেলুনওলা থাকত না বলে। সে মনে মনে চাইত মা তাকে বিকেলে বা সন্ধের সময় বেড়াতে নিয়ে যাক, আর পাঁচটা বাচ্চার মতো সে যখন বেলুনের জন্য বায়না করতে পারে। বেলুন পায়নি সত্যি, কিন্তু সিনেমায় রোল পেয়েছিল। মার কোলে থাকা তার গাল টিপে একজন প্রডিউসার বলেছিল তার পরের ফিল্মে এইরকম একটা বাচ্চার রোল আছে, ললিতা কি দেবে তার বাচ্চাকে?

তুলি থামিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকালেন। মুম্বাইতে আটটার আগে সন্ধে নামে না। আকাশে এখনও অনেক আলো, সমুদ্র কি তীব্র নীল, হাওয়ায় একগোছা বেলুন উড়ছে। সব, সব আগের মতো আছে। শুধু তাঁর জীবনটাই এমন ঘেঁটে গেল কেন?

ফোনটা বাজছে। ঠিক বাজছে না, কাঁপছে। ভাইব্রেশনে দেওয়া আছে।  আওয়াজটা শুনবেন না বলে ভাইব্রেশনে দিয়ে রেখেছেন। খুব মৃদু সরোদ বাজছে সাউন্ড সিস্টেমে। এ রাগটা তিনি চেনেন, মারুবেহাগ। ভালোবাসার রাগ। আগে চিনতেন না কোনটা মারুবেহাগ, কোনটা দেশ, কোনটা কেদার। অবিনাশ চিনিয়েছে। ভালোবাসার রাগ থেকে ভালবাসা –সব। ওই শিখিয়েছে কাজের সময় ক্লাসিকাল ইন্সট্রুমেন্টাল চালিয়ে রাখতে, এতে নার্ভ ঠান্ডা থাকে, কাজে মন বসে, স্ট্রেস কমে। স্ট্রেসের কারণগুলো জীবন থেকে ছেঁটে ফেলবেন বলেই তো এই স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে এসে উঠেছেন, রং তুলি গান আর খুব দরকারি জিনিসগুলো নিয়ে। এখন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে বুঝতে পারছেন, জীবনে কোন কোন জিনিসগুলো সত্যি দরকারি। সারাজীবন তো মা চালিয়েছে, মা ঠিক করে দিয়েছে সব। নিজের সত্যি কী দরকার, কাকে দরকার, বুঝতেই পারেননি।

মা যখন আর পারল না, প্যারালিসিসে শরীরের ডান দিকটা, এমনকী কথা বলার ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে গেল, ততদিনে তো ভিকি মালহোত্রা তাঁর জীবনে এসে গেছে। মার বদলে ভিকি ঠিক করত সব তাঁর জন্য। ছবি সাইন করা থেকে পার্টির পোশাক, ডায়েট চার্ট থেকে জিম রেজিম– সব। ওর ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন তিনি কিন্তু তার থেকেও বড়ো কথা, ভিকির জীবনটাই তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করেছিল। সেটা এতটাই যে ও নিজের ১৪ বছরের বিবাহিত বউ, ফুটফুটে দুই ছেলেমেয়ে সবাইকে ছেড়ে তাঁর সাথে লিভ ইন করতে শুরু করল।

মা তখন উঠতে পারে না, কথা বলতে পারে না কিন্তু বুঝতে তো পারে সব কিছু। নিজের মেয়ে এভাবে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটা সে একেবারেই মেনে নিতে পারছিল না। ওষুধ না খেয়ে, খাবার না খেয়ে, নানাভাবে জেদ অশান্তি করে সে প্রতিবাদ জারি রেখেছিল। বাধ্য হয়ে মাকে ছেড়ে অন্য একটা ফ্ল্যাটে, মার চোখের আড়ালে থাকতে শুরু করলেন ভিকির সঙ্গে। সমাজ, তারকাদেরও সমাজ থাকে একটা, সেখান থেকে চাপ আসছিল। সবাই ভাবছিল কায়রার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, নইলে কেউ ভিকি মালহোত্রার মতো ফ্লপ প্রডিউসারের সঙ্গে জড়ায়। ভিকি তো স্রেফ চেনে টাকা, আগের বউটাও তো রাইজিং স্টার ছিল, সনিয়া কপূর। ওর টাকা, শরীর, কেরিয়ার, সব ছিবড়ে করে এখন ভিকি কায়রার দিকে ঝুঁকেছে। এটাই ওর আসল ব্যাবসা, সুন্দরী নায়িকাদের সিঁড়ির মতো ব্যবহার করা। এমনিতে তো একটা সিনেমাও চলে না।

এসব বিষে মুম্বাইয়ের বাতাস ভারি হচ্ছিল যখন, ঠিক তখনই তিনি ভিকিকে বিয়ে করলেন। আর বিয়ের দিন রাতে, মা চলে গেল। সেটাও নিঃশব্দে নয়, মেয়ের উপেক্ষার প্রতিশোধ মা নিল সুইসাইড করে। একজন প্যরালিসিস মহিলা কীভাবে এত স্লিপিং পিল জোগাড় করতে পারে– সেটা নিয়ে গুজগুজ ফুসফুস চলতে চলতে পুলিশ পর্যন্ত পৗঁছোল। বলা হল পথের কাঁটা সরিয়ে দেওয়ার জন্য মাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে কায়রা আর ভিকি। খুন করার হলে মাকে তো অনেক আগেই খুন করা উচিত ছিল তাঁর। করতে পারলে জীবনটা অনেক সুন্দর করে বাঁচা যেত। তাঁর জীবনের প্রথম, হয়তো একমাত্র প্রেমকে ওভাবে গলা টিপে মারতে হতো না। শাওন কুমার, আসল নাম শ্রাবণ মুখার্জি, বাংলার ছেলে, তীব্র ভাবে চেয়েছিল তাঁকে। পুণের এক মন্দিরে গোপনে বিয়েও হয়ে গিয়েছিল তাঁদের মালা বদল করে, মা ঠিক জেনে গেল। গুন্ডা বাহিনী নিয়ে হাজির হল মন্দিরে, শাওনকে খুনই করত, কায়রা মা-র হাতে পায়ে ধরে, বিয়ে ভাঙার প্রমিস করে শাওনকে বাঁচান। শাওন সেই নবলব্ধ জীবন নিয়ে আর তাঁর দিকে ফিরেও তাকায়নি, তিনি নানাভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। শাওন ফোন ধরেনি, দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

এক, সব পুরুষ এক। মেয়েদের মন ওরা বোঝে না। ওরা জানে শুধু মেয়ে-শরীর আর নিজেদের ইগো। মার মৃত্যু নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল। নীচ থেকে ওপর সবার মুখ বন্ধ করতে অনেক টাকা খসল, অনেক টেনশন ছুটোছুটি। বিয়ের প্রথম বছরটা এইভাবেই কেটে গেল। যেই ভাবতে শুরু করলেন এবার একটু থিতু হয়েছেন, ভিকির ভালোবাসায় বাকি জীবনটা শান্তিতে কেটে যাবে, তখনই ভিকি স্বমূর্তি ধরল। মদ, উঠতি নায়িকাদের কাজের টোপ দিয়ে ফস্টিনস্টি, সবই তাঁর টাকায়। বাধা দিলে অকথ্য গালাগাল, এমনকী মারধোর।

কিন্তু এত ঝড়ঝাপটার কোনও প্রভাব কায়রার কাজে পড়েনি। মা তার চারপাশে কেমন একটা বায়ুনিরোধক বর্ম তৈরি করে গেছিল, সেটা খুব কাজে লেগেছে সারাজীবন। এই যে এখন কোলাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে একা রয়েছেন, এখান থেকেই শুটিং-এ যাচ্ছেন। এখন তো বেছে বেছে ছবি করা। খুব পাওয়ারফুল চরিত্র পেলে তবেই করেন। সেসব নিজেই সামলে নিচ্ছেন। কিন্তু ভিকির সঙ্গে আর নয়।  এনাফ ইজ এনাফ। শুধু মেয়েটার জন্যে বুকের মধ্যে চিন চিনে ব্যথা। এই মেয়েকে আঁকড়েই তো ভিকির সঙ্গে কাটালেন এতগুলো বছর। কিন্তু আর নয়।

ফোনটা আবার কাঁপছে, চিংকি, তাঁর মেয়ে ফোন করছে। ওর ভালো নাম তিনিও রেখেছেন শুভলক্ষ্মী, তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া নামটা। নামটা যেন তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনও দামি গহনার মতো, যা কেবল একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে চলে যাবে, কিন্তু ব্যবহার হবে না। কারণ তিনি  জানেন এই নামটাও বদলে যাবে, চিংকিও সিনেমায় নামছে যে। ওর বাবারই বিশেষ আগ্রহ। এতদিন কায়রার পয়সায় খেয়েছে, এবার কায়রার মেয়ের পয়সায় খাবে।

চিংকিকে অনেক বুঝিয়েছেন তিনি, বলেছেন তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে আসতে। মেয়ে আসেনি। এখন কেন ফোন করছে? মাকে কীসের দরকার?

অবিনাশ বলেছিল আসবে দেখা করতে। তিনি বারণ করেছেন। অবিনাশকে দেখলে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন না। আর এই বয়সে সে ধাক্বা সামলাতে পারবেন? কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অবিনাশকে ডেকে পাঠাবেন। ফোনটা তাঁকে খুব অস্থির করে দিয়েছে। অবিনাশকে সব বলা দরকার।

চিংকির ডেবিউ এ বছর শেষের দিকে, ওর অপোজিটে আছে শাওনকুমারের ছেলে অঙ্কিত। তাঁর আদৗ ইচ্ছে ছিল না চিংকি সিনেমায় নামুক। তিনি চেয়েছিলেন ও আগে পড়াশোনাটা শেষ করুক। সেই ৪ বছর বয়স থেকে তিনি লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন শুনে আসছেন, এই ইন্ডাস্ট্রির হাড়ে হদ্দ জানেন। তাঁর কাছে খিদে একটা মোটিভেশন ছিল, কাজ না পেলে না খেয়ে মরতে হবে। চিংকির সামনে তো তা নেই, ওর মতো নরম আদুরে মেয়ে এই লাইনের ওঠাপড়া নিতে পারবে না। এই নিয়েই ভিকির সঙ্গে খিটিমিটি শুরু তাঁর। তাও হয়তো মেনে নিতেন, যদি না অঙ্কিতের অপোজিটে কাস্ট করা হতো চিংকিকে। নিউ কামার পেয়ারদের নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি নানা গসিপ বাজারে ছাড়ে ছবি হিট করাবার জন্যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা সত্যি হয়ে যায়। রোমান্টিক সিন করতে করতে সত্যিকারের রোমান্সে জড়িয়ে পড়ে নতুন হিরো হিরোইন। হায় ভগবান! সেরকম যদি হয়! ওরা যে ভাইবোন!

মন্দিরে বিয়ের আগেই শাওনের সন্তান এসেছিল তাঁর গর্ভে। মা যখন সব শেষ করে দিল, তখন জেদ করে শাওনের সন্তানকে অ্যাবর্ট করেননি কায়রা, আর সেই খবরটা শাওনের  নিঃসন্তান স্ত্রী রিতার কানে পৌঁছোয়। এক দুপুরে রিতা এসে তাঁর কাছে প্রায় ভিক্ষে চায় অনাগত সন্তানকে। তাঁকে বোঝায় একে বড়ো করে তুলতে গেলে সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে থাকবে চিরকাল, তার থেকে শাওন আর রিতার বৈধ সন্তান হিসেবে বড়ো হোক সে। তিনি রাজি হয়ে যান, এর থেকে ভালো লালন তিনি কি দিতে পারতেন? সমস্ত পৃথিবী জানে অঙ্কিত শাওন আর রিতার ছেলে। শুধু তাঁরা তিনজন ছাড়া। আর মা জানত। ভিকিও না। জানলে হয়তো ওকে বোঝানো যেত।

চিংকি ফোন করে বলল ‘মা, আজ পার্টিতে কী পরে যাব?’ সেই আদুরে গলা। এমনভাবে বলছে যেন কিছুই ঘটেনি, তিনি চলে আসেননি বাড়ি ছেড়ে। শুনে গলে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ মন কু গাইল ‘কীসের পার্টি রে সপ্তার মাঝে?’

‘অঙ্কিত থ্রো করছে মা, প্রাইভেট পার্টি’

‘না’

‘কি না?’

‘ওখানে যেও না সোনা, আগে ছবি রিলিজ করুক, প্লিজ মার কথা শোনো, প্লিজ চিংকি’

‘কিন্তু মা’

‘কোনও কিন্তু না মা’।

‘আচ্ছা মা তুমি বারণ করলে যাব না কিন্তু একটা ফোন বারবার আসছে দুবাই থেকে, একটা ওয়েডিং রিসেপশনে এক নাইট অ্যাপিয়ারেন্স। হিউজ পে করবে’। থরথর করে কেঁপে উঠল শরীর। দুবাই, ওয়েডিং রিসেপশন, এক নাইট অ্যাপিয়ারেন্স– এই শব্দগুলো ভীষণ চেনা। সারাজীবন কতভাবে মোকাবিলা করতে হয়েছে এগুলোকে। ভীষণ মা-র অভাব বোধ করলেন এই মুহূর্তে। মা বাঘিনীর মতো আগলে রাখত তাঁকে। আর তিনি এই সময় কেন যে চলে এলেন মেয়েটার পাশ থেকে? আসলে ভিকিকে আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। ও মেয়েটাকে শেষ করে দেবে। কে জানে ওই হয়তো ডিল করছে। পিম্প!

তিনি শক্ত গলায় বললেন ‘সোনা, যা বলছি মাথা ঠান্ডা করে শোনো। এখন কোনও পার্টিতে যেও না, যেই ডাকুক। আর ওই নম্বরটা দাও। লিখে নিচ্ছি’ নম্বরটা লিখে অবিনাশকে ফোন করলেন কায়রা।

সাদা ফুলে ঢাকা গাড়িটা জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। পেছনের গাড়িতে কালো চশমায় চোখ ঢাকা চিংকি ভাবছিল মাকে এত লোক ভালোবাসত? মা তো সে হওয়ার পর দীর্ঘদিন কোনও ছবি সাইন করেনি, কিন্তু বারো বছর পরে যখন করল, সে ছবি সুপার ডুপার হিট। কী একটা যেন ছিল মার মধ্যে। যেমন অভিনয়, তেমনি সৌন্দর্য। সেই মা মাত্র পঞ্চান্ন বছরে চলে গেল! মেনে নিতে পারেনি ফ্যানেরা। একজন নাকি সুইসাইড করেছে। আচ্ছা, মা কি কিছু দেখতে পাচ্ছে? তাকে ঘিরে এই উন্মাদনা? এত লোকের ভালোবাসা? যাকে এত লোক ভালোবাসত, সে ভালোবাসত তাকে, শুধু তাকে?

কেমন অবিশ্বাস্য লাগে, অথচ কথাটা সত্যি। তাকে বাঁচাতেই তো চলে গেল মা। ওই অদৃশ্য হাতের বিরুদ্ধে আঙুল যেই তুলবে, তাকেই সরিয়ে দেওয়া হবে। অবিনাশ আংকল বলেছে সব তাকে। বাথটবে পড়ে থাকা নিস্পন্দ শরীর কাটাছেঁড়া করে কী পাওয়া গেছে, সেই তথ্য আর কখনও সামনে আসতে দেওয়া হবে না, চিংকি জানে। আর শুধু দুবাই কানেকশন নয়, তার বাবা লোকটা, মানে ভিকি মালহোত্রা এর মধ্যে আছে। নইলে এত তাড়াতাড়ি ওরা মা-কে মেরে ফেলতে পারত না। অবিনাশ আংকল তাকে বলেছে ‘তোমার মার শেষ ইচ্ছে শুধু সাদা ফুল নয়। তুমি জানো কায়রা চায়নি তুমি সিনেমায় নামো। কিন্তু সে জানত একবার ঢুকলে এখান থেকে বেরনো অসম্ভব, অনেকটা বাঘের পিঠে চড়ার মতো। তাই সে বারবার বলেছে চিংকি যেন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়, কারও হাতের পুতুল হয়ে না থাকে।’

চিংকি চোখের জল মুছে মোবাইলে একটা ফোন করে। যাকে ফোন করছে, সে ঠিক তার পেছনের গাড়িতে সাদা পাঞ্জাবি পাজামায় আপাদমস্তক শোকের প্রতিমূর্তি হয়ে বসে আছে। সমস্ত মিডিয়ায় বিবৃতি দিয়ে চলেছে সে কতটা শোকার্ত কায়রাকে হারিয়ে। চিংকি ওর শোকের বুদবুদ এক লহমায় ফুটো করে দেয় একটা কথা বলে।

‘আপ মম কি ফিউনারেল মে না জায়ে তো আপকো  লিয়ে আচ্ছা হোগা। সবাই জেনে গেছে মম কীভাবে মারা গেছে। পাবলিক খুব ফিউরিয়াস হয়ে আছে। তোমাকে  ওরা ছাড়বে না।’

সেদিন চ্যানেলে চ্যানেলে চর্চার বিষয় ছিল কায়রার শেষযাত্রায় ভিকির অনুপস্থিতি। মুখাগ্নির সময় চিংকির সঙ্গে অঙ্কিতও কেন এগিয়ে এসেছিল, সেটা নিয়েও জল্পনা কল্পনা চলছে। এটাও কি নতুন ছবির প্রমোশানের মধ্যে পড়ে? খানিকটা দূরে বসে থাকা অবিনাশের মনে হচ্ছিল, কায়রাকে কি এতদিনে একটু শান্তি দিতে পারল? আর ওই জনসমুদ্র, কলরব থেকে অনেক অনেক দূরে সমুদ্রের ধারে এক বৃদ্ধ, একা একা, একটার পর একটা রঙিন বেলুন আকাশে উড়িয়ে চলেছিলেন, আর বিড়বিড় করে কীসব বলছিলেন। কেউ যদি কান পাতত, তবে শুনতে পেত ‘সুববু, শুভলক্ষ্মী, মা আমার, তুই ছোটোবেলায় যে বেলুনগুলো ওড়াতে চেয়েছিলি– নীল লাল, হলুদ, ববি প্রিন্ট– সমস্ত বেলুন তোর সঙ্গে দিয়ে দিলাম। এদের সঙ্গে তুই  মনের আনন্দে  উড়ে যা।’

মরমির কথা

অসমের শান্ত সুন্দর প্রকৃতি যেমন খেয়ালি, মরমিও তেমনি খেয়ালি চরিত্রের হয়েছে। কখন কী মুডে থাকে বোঝা মুশকিল। এই হাসিখুশি উচ্ছল, তো পরমুহূর্তেই থমথমে বিষাদ কালো মুখ। ওর সঙ্গে বেশ বুঝেশুনে কথা বলতে হয়। কখন কী ভেবে বসে কে জানে। একবার বর্ষার সময়ে বেশ কিছুদিন অসমে দিদির বাড়িতে থেকেছিলাম। তখন দেখেছি প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা কাকে বলে।

ঘুম থেকে উঠে হয়তো দেখলাম ঝকঝকে সুন্দর একটা দিন, চারদিকে সোনা রোদ্দুর ছড়িয়ে আছে। দেখেই আমি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানোর ছক করে ফেলেছি। কিন্তু পরক্ষণেই আমার সমস্ত প্ল্যানের ওপর জল ঢেলে আকাশে দেখা দিল মেঘের ঘনঘটা! এমনটা প্রায়ই হতো। আবার বৃষ্টি দেখে দিদি হয়তো খিচুড়ির আয়োজন করেছে, একটু পরেই দেখা গেল মেঘ-বৃষ্টি দূরে ঠেলে সূর্যিদেব প্রবল তেজে বিরাজমান হয়েছেন মধ্য গগনে। তখন গনগনে গরমে খিচুড়ি হয়ে উঠত অসহ্য। যতদিন ওখানে ছিলাম মেঘ-রোদ্দুরের খেলা দেখেই কেটেছে। এখন মরমিকে দেখে আমার সেই স্মৃতি মনে এসে যায়। অসমে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বলেই হয়তো প্রকৃতির এই খেয়ালিপনাটুকু ওর চরিত্রে গেঁথে আছে।

মরমি আমার বড়দির একমাত্র সন্তান। বড়দির শ্বশুরালয় অসমের গৌরীপুরে। বিয়ে ইস্তক দিদি সেখানেই আছে। মরমিও ওখানেই জন্মেছে। এতদিন পড়াশোনা, বড়ো হয়ে ওঠাও সেখানেই। এখন কলকাতায় এসে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে কম্প্যারেটিভ লিটারেচার নিয়ে পড়ছে। যাদবপুরেই হোস্টেলে থাকে ও। আমি ওর মামা তো বটেই, ইউনিভার্সিটির নথিতে লোকাল গার্জেনও। ও হোস্টেলে থাকলেও মামা হিসেবে যতটা সম্ভব খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি।

ছুটি-ছাটায় বাড়িতে নিয়ে আসি ওকে। আর প্রতি রবিবার বা শনিবারে নিয়ম করে আমি ওর হোস্টেলে দেখা করতে যাই। কতদিন ওকে বলেছি, ছুটির দিনগুলোতে সবসময় আমার বাড়িতে চলে আসতে। সারা সপ্তাহ তো হোস্টেলের ওই আধসেদ্ধ খাবার খেতে হয়, সপ্তাহান্তে একদিন না হয় বাড়িতে এসে একটু ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া করল।

প্রথম প্রথম মরমি আসতও। কিন্তু ইদানীং আর সেভাবে আসেই না। অনেক বলার পরে হয়তো এক আধদিন এল। আমি সপ্তাহে একদিন ওর ওখানে যাই বলেই যা একটু দেখা হয়, খোঁজখবর পাই। আজকাল যেন মনে হয়, আমি ওর হোস্টেলে গেলে ও যে খুব একটা খুশি হয় সেটা নয়। আমাকে পাশ কাটাতে পারলেই যেন বাঁচে। সেদিন তো বলেই ফেলল, ‘ওফ মামা, তুমি কি আমাকে এখনও সেই ছোট্টটি ভাবো যে সবসময় পিছে পিছে থাকতে হবে? আমার বন্ধুরা এই নিয়ে হাসাহাসি করে জানো?’

আমি বলি, ‘জানি তুই এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছিস, কিন্তু আমাদের কাছে এখনও সেই ছোটোটিই আছিস। আর এতে বন্ধুদের হাসাহাসির কী হল? আমি তোর সুবিধা অসুবিধা না দেখলে কে দেখবে? এখানে তোর আর কে আছে? বড়দি আমার ওপরে কত ভরসা করেই না তোকে এখানে পড়তে পাঠিয়েছে।’

আর কথা বাড়ায়নি। তবে আমি বেশ বুঝতে পারি, আমার ওখানে ঘনঘন যাওয়াটা ওর খুব একটা পছন্দের নয়। তবু যাই। নিজের কর্তব্যবোধেই যাই। হাজার হোক নিজের একমাত্র বোনঝি বলে কথা। যখন যাই তখন মাঝেমধ্যে ওর পছন্দের মোগলাই, চিকেন কাটলেট বা চাউমিনও সাথে করে নিয়ে যাই। পছন্দের জিনিসগুলো পেলে ভারি খুশি হয় মেয়েটা। আর ওকে খুশি দেখলে আমার মধ্যেও খুশির স্রোত বয়ে যায়। মরমিটা যেন একেবারে আমার কৈশোরের বড়দি। সেই গভীর টানা টানা দুটো চোখ, আর তেমনি সেই দুধে আলতা গায়ের রং। সুন্দরী বলেই গৌরীপুরের সেই বনেদি পরিবারে এক দেখাতেই বড়দির বিয়ে হয়ে গেছিল।

মরমিও বড়দির মতোই সুন্দরী হয়েছে। হয়তো বড়দির থেকেও খানিক বেশি। জামাইবাবুর মতো সুঠাম ও দীর্ঘাঙ্গীও হয়েছে। আর এত সুন্দরী বলেই ওকে নিয়ে আমার চিন্তাও বেশি। সুন্দরীরা সহজেই নজরে পড়ে যায় যে। যা দিনকাল পড়েছে, মেয়েদের জন্যে নিরাপত্তা বলতে আর কিছুই রইল না। টিভি বা পত্র-পত্রিকা খুললে চারদিকে একই খবর –শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, খুন এসব ছাড়া যেন আর খবরই নেই! কলেজ, ইউনিভার্সিটির পরিবেশও তো তথৈবচ। এমনকী স্কুলেও নানারকম যৌন অপরাধের ছড়াছড়ি।

সাত থেকে সত্তর, নারী শরীর হলেই হল, একদল নরপিশাচ সবসময় জিভ লকলকিয়ে আছে। সবচাইতে বড়ো কথা, যারা এসব জঘন্য কাণ্ড ঘটাচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা দাগি ক্রিমিনাল নয়। স্কুল শিক্ষক, রিসার্চ গাইড, তুখোড় সাংবাদিক, এমনকী মহামান্য বিচারপতির বিরুদ্ধে পর্যন্ত ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির অভিযোগ শোনা যাচ্ছে! কোথায় যাবে সাধারণ মানুষ? এ দেশে সত্যিই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

নাঃ, এসব ভেবে আর কাজ নেই। আমি অতি সাধারণ মানুষ। আমার ভাবনায় কোনও সুরাহা হওয়ার নয়। বরং যত ভাবব, কেবল নিজের শান্তিই বিঘ্নিত হবে। আমি শুধু নিজের কথা ও নিজের পরিবার, প্রিয়জনের কথা ভাবতে পারি। সেজন্যে মরমিকে সবসময় পই পই করে বলে যাই সাবধানে থাকতে, আর বুঝেশুনে চলতে। কোনও অসুবিধে হলেই যেন আমাকে জানায়। মরমি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ে বটে কিন্তু মুখ দেখে মনে হয় না আমার কথার খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে। একদিন তো বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল, ‘মামা, তুমি না বড়ো ওভার প্রোটেকটিভ’!

শুনে আমি রাগ করিনি। এটা মরমির দোষ নয়, যুগের দোষ আর বয়েসের ধর্ম। এ যুগের ছেলেমেয়েরা গুরুজনদের তেমন শ্রদ্ধা সন্মান করে না। সারাক্ষণ মুখে কেবল ইংরেজির খই ফুটছে। গুরুজনেরা যেটা বলবে, সেটার বিরোধিতা করা যেন এদের অবশ্য করণীয় কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সেজন্যে এদের কিছু বোঝাতে যাওয়া বৃথা। চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। আমাদের শুধু কর্তব্য করে যাওয়া। বাকিটা ভবিতব্য।

বিনতা মানে আমার স্ত্রী হয়তো ঠিকই বলে, কলির হাওয়া লেগে গেছে মেয়েটার। এখন কলকাতা শহর চিনেছে, বন্ধু-বান্ধব হয়েছে, এখন কি আর মামা-মামির নীরস সান্নিধ্য ভালো লাগে? কথাটা যে মিথ্যে নয়, এর প্রমাণ প্রতি পদে পদেই পাই। প্রায়ই ফোন করলে শুনি, বন্ধুদের সাথে শপিং মলে, নয়তো মাল্টিপ্লেক্সে ছবি দেখতে গেছে। কখনও কখনও দল বেঁধে কলকাতার আশেপাশেও ঘুরে এসেছে জানতে পারি। আজকাল মরমির হাবভাব আচার আচরণ দেখলেও বোঝা যায়, অসমের সেই সিধেসাদা সরল মেয়েটি আর সে নেই। যুগের হাওয়া স্পষ্ট। দেখে খারাপই লাগে। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে সর্বস্তরেই যে একটা অবক্ষয় চলছে, সেটা আমাকে ভীষণ ভাবায়। অবশ্য ভেবেই বা কী করব? যে যুগ চলেছে, ঘোর কলি, এতে তো শুধু অবক্ষয় আর অবনতিই দৃশ্য হওয়ার কথা ।

এ পর্যন্ত তবু সব ঠিকই ছিল। অনেক বলতে বলতে বহুদিন পরে গতকাল সন্ধেতে মরমি আমাদের বাড়ি এসেছে। শনি, রবির ছুটিটা কাটিয়ে সোমবার হোস্টেলে ফিরে যাবে। মেয়েটা এলে আমাদের স্বামী-স্ত্রী-র গুমোট সংসারেও যেন প্রাণবায়ু আসে। বিনতাও ওকে সন্তানের মতোই স্নেহ করে। ও আসছে বলে কত কি খাবার বানিয়ে রেখেছে আগে থেকেই। প্রতিবারই তাই করে। অথচ যার জন্যে করে সে তো খায় পাখির মতো যৎসামান্য।

আজকালকার ছেলেমেয়েরা এমন রূপ সচেতন যে, ফিগার বা ত্বক খারাপ হয়ে যাওয়ার ভয়ে কত চর্বচোষ্য আর অমৃতের স্বাদ হেলায় ত্যাগ করে চলে। মরমির মধ্যে সবসময় মোটা হয়ে যাওয়ার ভয়। সেজন্যে একেবারে খেতে চায় না মেয়েটা। আর খেলেও ফলমূল আর স্যালাডে পেট ভরিয়ে রাখে। একদিকে অবশ্য ভালো এই ভেজালের যুগে মানুষ যত প্রকৃতিতে ফিরে যায় ততই মঙ্গল। তবু ভাবি এই বয়েসেই যদি ছেলেমেয়েরা মন ভরে না খাবে, তবে কখন খাবে। আমাদের মতো বুড়ো বয়সে, নানা রোগে ব্যাতিব্যস্ত হলে খেতে ইচ্ছে করলেও তো কত কিছু পেটে সইবে না। কিন্তু ওরা সেটা বুঝলে তো। মরমির সাথে থাকলে নতুন প্রজন্মের সাথে আমাদের ভাবধারার বিস্তর ফারাক প্রতি মুহূর্তে প্রকট হয়ে ওঠে।

আমার চাইতে ওর মামির সাথেই মরমির অন্তরঙ্গতা বেশি। মরমিকে পেলে বিনতাও যেন গল্পের ঝুলি খুলে বসে। ওদের হাসি ঠাট্টায় ভরে থাকে ঘর। ওদের আড্ডায় আমি বিশেষ গুরুত্ব না পেলেও ওদের খুশি আমার মধ্যেও এনে দেয় চোরা সুখ। কিন্তু গতকাল আমার কৌতুহলী মন এমন কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলেছে যে, কাল রাত থেকেই প্রচণ্ড অস্থিরতায় আছি। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। এমন একটা বিষয় যে মরমির সাথেও সরাসরি কথা বলতে বিবেকে বাধছে। নিজের বোনঝি বলে বিনতাকেও জানাতে জড়তা হচ্ছে। লজ্জা ঘেন্নায় আমার মাথা নত হয়ে গেছে। এত অধঃপতন হয়ে গেছে মেয়েটার! অথচ ওকে দেখলে কে বলবে যে এমন একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে বসে আছে?

বাড়িতে আসার পর থেকে ওকে একেবারেই স্বাভাবিক দেখছি। দিব্যি খাচ্ছে দাচ্ছে, গপ্পো, হাসি ঠাট্টা করছে! চোখে মুখে কোনও টেনশনের নামগন্ধ নেই। এসব কী এখন এতই জলভাত হয়ে গেছে এই প্রজন্মের কাছে? সব যেন আমার ভাবনার অতীত। বড়দিকে ব্যাপারটা জানানো দরকার। দিদিই পারবে নিজের মেয়েকে শাসন করতে। তবে তার আগে আমি প্রমানসহ মরমিকে হাতেনাতে ধরতে চাই।

কাল যখন মরমি ওর মামির সাথে গপ্পো গুজবে মশগুল ছিল, পাশের ঘরে টেবিলের ওপরে ওর মোবাইল ফোনটা রাখা ছিল। তখন একটা মেসেজ রিসিভের ‘বিপ’শব্দ শুনে মোবাইলটার প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ হল। নিছকই কৌতূহলবশত ওটা হাতে তুলে নিই। নজর পড়ে, নতুন একটা এসএমএস এসেছে। আমি সেটা খুলে পড়তেই অবাক হয়ে যাই। একটা নার্সিংহোমের ঠিকানা! মরমিকে রবিবার ঠিক সকাল ন’টার মধ্যে ওখানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। নার্সিংহোম যাবে কেন মরমি? ওখানে কী কাজ থাকতে পারে? মনে নানা ভাবনার উথাল-পাতাল চলতে লাগল। দ্রুত ওর মেসেজ বক্সে গিয়ে অন্যান্য মেসেজগুলো পড়তে লাগলাম। সেগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক কেবল দুটো মেসেজ পেলাম যেটা নার্সিংহোমের সাথে সম্পর্কযুক্ত। একটাতে মরমিকে প্রশ্ন করা হয়েছে, ওর রক্তের গ্রুপ কী? দ্বিতীয়টি মরমির জবাব। নিজের রক্তের গ্রুপ জানিয়ে মরমি নার্সিংহোমের ঠিকানা জানতে চেয়েছে। অসংখ্য মেসেজের ভিড়ে এই রিলেটেড আর কোনও মেসেজ আমি পেলাম না। কিন্তু এটুকু তথ্যই আমার জন্যে সাংঘাতিক।

রক্তের গ্রুপ জানতে চাওয়া কেন? তবে কি মরমি এমন কিছু করাতে চলেছে যার জন্যে রক্তের প্রয়োজন হতে পারে? শেষ পর্যন্ত মেয়েটা এমন কাণ্ড বাধিয়ে বসল যে, নার্সিংহোমে ছুটতে হচ্ছে! আর পাপ কাজ বলেই কি আমাদের জানাতে সাহস করেনি? আমার মধ্যে সীমাহীন প্রশ্ন দানা বেঁধে উঠেছে। মাথাটা সেই থেকে ঝিম ধরে আছে। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছি না। আজকাল ভাব-ভালোবাসার নামে যেমন খুল্লামখুল্লা যথেচ্ছ যৌনাচার চলছে সর্বত্র, তাতে কোনওকিছুই আর অস্বাভাবিক নয়। মাঝে একটা পত্রিকায় পড়েছিলাম, সম্প্রতি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের কাছে যৌন সম্পর্কের রাখঢাক ব্যাপারটা অনেকটাই উঠে গেছে। ‘কৌমার্য’ বা ভার্জিনিটি শব্দগুলো অভিধানে বিলীন হতে বসেছে। কৌমার্য রক্ষা করার ধারণাটাই নাকি অনেক আধুনিকার কাছে এখন সাপ্রেশনের আর-এক নাম। ভাবি কোথায় চলে যাচ্ছে সমাজ! বৃহত্তর সমাজের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, এখন তো ঘরেই এ অভিজ্ঞতা হওয়ার দুর্ভাগ্য ঘটছে।

মরমি তখনও মেসেজটি দেখেনি। তবে আগের মেসেজেই যখন নার্সিংহোমের ঠিকানা জানতে চেয়েছিল, সুতরাং এটা নিশ্চিত যে, ওখানে যাওয়ার জন্যে ও মানসিক ভাবে প্রস্তুত। আমার ধারণা, ওর সাথে যুক্ত ছোকরাটিই মেসেজ প্রেরক। সেই সমস্ত ব্যাবস্থাপনা করেছে। নিজের পাপ ঢাকতে এসব তো করতেই হবে। তবে আমি মেয়েটাকে যত দেখছি, ততই অবাক হচ্ছি। চিন্তা ভাবনা বা টেনশনের লেশমাত্র নেই ওর চেহারাতে! এসব এতই জলভাত হয়ে গেছে এদের কাছে?

ঠিক করেছি মরমিকে হাতেনাতে ধরব। ‘টোটাল কিওর’ নার্সিংহোম আমার চেনা। মরমি ওখানে গেলেই আমিও পিছু নেব। সেজন্যেই সকালে দায়সারা প্রাত ভ্রমণ করেই তাড়াহুড়ো করে বাজার সেরে বাড়ি ফিরেছি। এসেই দেখি, যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। মরমি আমি আসার আগেই বেরিয়ে গেছে। ওর মামিকে নাকি বলে গেছে, প্রফেসর ডেকেছেন, তাই কোচিং-ক্লাস এ পড়তে যাচ্ছে। ফিরতে দেরি হবে আর বেশি দেরি হলে এখানে না এসে ও সরাসরি হোস্টেলেই ফিরে যাবে। বিনতা ঘরে মন বিষণ্ণ করে বসে আছে। স্বাভাবিক, কতদিন পরে মেয়েটা এসেছিল, অথচ রাত পোহাতেই এমন আকস্মিক চলে গেল। মনটা আমারও খারাপ লাগছে। কিন্তু তার চাইতে উদ্বিগ্নতা ও অস্থিরতা অনেক বেশি। আমি বাজার রেখেই বিনতাকে তেমন কিছু না জানিয়েই বেরিয়ে পড়লাম।

‘টোটাল কিওর’নার্সিংহোম খুব একটা দূরে নয়। বড়োজোর মিনিট কুড়ির পথ। দুবার অটো পালটাতে হয় কেবল। তবে আজ বারবার সিগনাল আর ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে অনেকটাই সময় লেগে গেল। নার্সিংহোমে যখন পৌঁছলাম, ন’টা বেজে গেছে। গেট দিয়ে টোটাল কিওর-এর চত্বরে ঢুকেই চারদিকে তাকিয়ে মরমিকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। বিনতার কথা মতো মরমি আমারও প্রায় একঘন্টা আগে ঘর থেকে বেরিয়েছে। সুতরাং অনেক আগেই ওর পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু খোলা চত্বরে কোথাও ও নজরে এল না। অগত্যা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।

রিসেপশনের সামনেই ভিজিটরস এনক্লেভ-এ অনেকেই বসে আছে। আমি ওখানেও মরমির দেখা পেলাম না। অথচ আমি শতকরা একশো ভাগ নিশ্চিত যে কোচিং-ক্লাস এর নাম করে মরমি এখানেই এসেছে। এ ধরনের অনেক প্রাইভেট নার্সিংহোমেই চলে যত অবৈধ কাণ্ডকারখানা। কিছু কিছু গাইনি, এমনকী হাতুড়ে পর্যন্ত মালামাল হয়ে যাচ্ছে শুধু অন্যের পাপ ধুয়ে ধুয়ে। আমি জানি শুধু মরমিই নয়, সেই ছোকরাটিও এখানেই আছে।

কোথাও মরমির দেখা না পেয়ে অগত্যা রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গেলাম। মরমি নিশ্চয়ই ভেতরে ঢুকে গেছে। রিসেপশনিস্ট মেয়েটিকে বললাম, একজন পেশেন্টকে দেখতে এসেছি, নাম মরমি ঘোষ।

মেয়েটি কম্পিউটারে চোখ রেখে বলল, সরি, এই নামে কোনও পেশেন্ট নেই এখানে।

– কী বলছেন কী? ভালো করে দেখুন, নামটা নিশ্চয়ই আছে। ও এখানেই আছে আমি জানি। আমি উত্তেজিত হয়ে বলি।

– না স্যার, আমাদের পেশেন্ট লিস্টে এমন কোনও নাম নেই। মেয়েটি একইরকম শান্ত হয়ে জানায়।

টের পাচ্ছি, আমার হূদ্কম্পন ক্রমশ বেড়ে চলেছে, কপালে চিন্তার ভাঁজগুলো গাঢ় হচ্ছে, হাতের তালু ঘেমে উঠেছে। ওরা যাই বলুক, আমি নিশ্চিত মরমি এখানেই আছে। তবে কি এসব অবৈধ কাজগুলো অফ দ্য রেকর্ড হয়? যার জন্যে ওর নাম পেশেন্ট লিস্টে নেই? নাকি মরমি নাম ভাঁড়িয়ে আছে? এও কী সম্ভব? আমি এবারে অনুনয়ের সুরে বলি, দেখুন ম্যাডাম, একটু আগেই সে এখানে এসেছে। লম্বা করে, খুব ফরসা, …সুন্দরী একটি মেয়ে…

মেয়েটি মৃদু হাসল। বলল, দেখুন অনেকেই তো এখানে আসছেন, কারও চেহারা দেখে তো মনে রাখা সম্ভব নয়। আমরা যা রেকর্ডে আছে সেটুকুই বলতে পারি। আমার মনে হয় আপনার কিছু একটা ভুল হচ্ছে।

আমি প্রায় হতাশ, তীরে এসে এভাবে তরি ডুববে ভাবতেও পারিনি। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। অসহায়ের মতো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক তখনই পাশে বসে থাকা অপর রিসেপশনিস্ট মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল, একটু দাঁড়ান, কী নাম যেন বলেছিলেন আপনি?

– মরমি। মরমি ঘোষ। আমি শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠি।

– হ্যাঁ হ্যাঁ নামটা যেন একটু আগেই শুনেছি। একটু আনকমন নাম বলে কানে গেঁথে আছে।

আমি আশার ঝলক দেখতে পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। মেয়েটি কম্পিউটার স্ক্রীন-এ কিছুক্ষণ চোখ রেখে বলতে লাগল, একজন মরমি ঘোষ আছেন। বয়স একুশ। কিন্তু তিনি তো পেশেন্ট নন।

– হ্যাঁ হ্যাঁ ওর কথাই বলছি। সবে একুশ হয়েছে ওর। আমি একরকম উল্লাসেই বলে উঠি।

– কিন্তু তিনি তো পেশেন্ট হিসেবে এখানে আসেননি।

– তবে কী জন্যে এসেছেন? আমি সবিস্ময় প্রশ্ন করি।

– উনি এসেছেন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত একটি ছ’বছরের শিশুকে রক্ত দিতে।

– রক্ত দিতে? কোন শিশুকে? সে কে হয় ওর? আমার বিস্ময় আর প্রশ্নের অন্ত নেই।

মেয়েটি বলে চলে, শিশুটির কেউ হন না উনি। খুব গরিব ঘরের একটা শিশু। আকস্মিক রক্তের প্রয়োজন হওয়ায় পত্রিকায় আবেদন করেছিল শিশুটির পরিবার। খুব রেয়ার রক্তের গ্রুপ কিনা, তাই ডোনার পাওয়াই কঠিন। সেই আবেদনেই সাড়া দিয়ে মিস মরমি ঘোষ রক্ত দিতে এসেছেন।

যা শুনছি, নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। মাথার থেকে একটা ভার যেন আকস্মিক নেমে গেছে। সেই সঙ্গে নিজের হীন্মন্যতার বোঝায় নিজেই নত হয়ে যাচ্ছি। ইশ, কী ভুলটাই না করে চলছিলাম! কেবল অন্ধকারটুকুই দেখে গেলাম এতদিন! নতুন প্রজন্মের এই অপরূপ রূপটি নিজের অজ্ঞতা আর হীন্মন্যতার দরুন দৃষ্টির অগোচরেই থেকে গেছিল। টলমল পায়ে ভিজিটরস এনক্লেভ-এ এসে বসি। মরমির জন্যে অপেক্ষা করছি। মেয়েটাকে সাথে করেই বাড়ি ফিরব। রক্ত দিচ্ছে, এখন ওর পুষ্টিকর খাওয়া ও যত্নের বিশেষ প্রয়োজন। ভাবছি, মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে মনে মনে ওর থেকে ক্ষমা চেয়ে নেব।

 

আত্মজ

রবিদার চায়ের দোকানে বসে সিগারেট টানছিল। ভাবনায় সলিলদা। যাওয়াটা ঠিক হবে? কিছুদিন হল খবর পাঠাচ্ছে। রাস্তায় দেখা হয়েছিল, প্রসঙ্গ তুলতে বলল, বাড়ি আয়। সব কথা রাস্তায় হয় না।

কী কথা কে জানে! হতে পারে সেদিনের জের। বউদি হয়তো কানে তুলেছে। ভয় হচ্ছে। সংকোচও।

পাগলিটার চিৎকার কানে আসে। অশ্রাব্য ভাষায় গাল দিচ্ছে। তেড়ে যাচ্ছে কারও দিকে। হুটোপাটি পালানোর শব্দ। হা হা হো হো…

বিভাসের অস্বস্তি হয়। ভাবনায় চিড় খাচ্ছে। কিছুতেই অনুমান করতে পারছে না সলিলদার বিষয়টা। ভদ্রলোকের সাথে দীর্ঘদিনের পরিচয়। তাকে স্নেহ করেন। তাঁর পরামর্শেই কন্ট্রাকটারি ব্যাবসায় নেমেছে। নিজে পিডব্লউডি-র অফিসার হওয়ায় কন্ট্রাক্ট পেতে সমস্তরকম সাহায্য করেন। বিনিময়ে এতটুকু সুবিধা নেননি কখনও। ভয় হচ্ছে, পাছে সম্পর্কে চিড় ধরে। কেন যে মরতে গৌরী বউদির সাথে সেদিন খারাপ ব্যবহার করল!

‘মর মর খান্কির বাচ্চারা…’

পাগলিটা গালাগাল দিচ্ছে। মাথার প্রতিটি কোশে আঘাত করে শব্দগুলো। রক্তক্ষরণ টের পায়। শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে আরও একটা ধরায়। নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টায় পুরোনো ভাবনায় ফিরে আসতে চায়। দিন পনেরো আগের ঘটনা, ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে সলিলদার বাড়়ি যেতে হয়েছিল। সলিলদা তখন বাড়িতে ছিলেন না। গৌরী বউদি ভেতরে ডাকলেন।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেদিন বসতে হয়েছিল বিভাসকে। ভদ্রমহিলাকে সে পছন্দ করে না। কেবল গৌরী বউদি কেন, কোনও মহিলাকেই সে সহ্য করতে পারে না। ঘৃণা করে। আর গৌরী বউদিকে তো অপছন্দ করার যথেষ্ট কারণ আছে। সেজেগুজে সারাদিন পটের বিবি, দিনভোর বিউটিপার্লার-ফেসিয়াল-ম্যানিকিয়োর কিংবা টিভি সিরিয়াল… শো-কেসের পুতুল যেন একটা। কেন জানে না, গৌরী বউদিকে দেখলে মনোকামিনীর কথা মনে পড়ে। ভদ্রমহিলাকে মা ভাবলেই গা ঘিনঘিন করে। সজ্ঞানে ‘মা’ শব্দটা কখনও উচ্চারণ করেনি সে। ভবিষ্যতেও করবে না।

মাথার ভিতর ঘুণপোকার উপস্থিতি টের পায়। বিভাস তবু সামলে নিতে পারত। সামাজিক ভদ্রতা রক্ষা করতে বহু অভ্যাসে, নিজের সঙ্গে লাগাতার যুদ্ধ চালিয়ে ইদানীং এ ক্ষমতা সে অর্জন করেছে। আচরণে কোনও প্রভাব পড়তে দেয় না। গৌরী বউদি বিয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই সব গোলমাল হয়ে গেল। জানে এ প্রসঙ্গে সে বিরক্ত হয়। একাধিকবার বলেছে, কোনও মেয়ের সাথে এক ছাদের তলায় সারাজীবন কাটানো তার পক্ষে অসম্ভব। সেদিন এমন বাড়াবাড়ি করতে লাগল বউদি যে, নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনি। বেশ দু’কথা শুনিয়ে, রাগ দেখিয়ে উঠে এসেছিল। পরে অবশ্য অনুতপ্ত হয়েছে।

গৌরী বউদি নিশ্চয় অপমানিত হয়েছিল। কথাটা হয়তো সলিলদার কানে তুলেছে। হতে পারে এই জরুরি তলব…

পাগলিটাকে ঘিরে ছেলেগুলোর অসভ্যতা বাড়ছে। বাড়ছে চিৎকার চ্যাঁচামেচি। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পাগলির খিস্তি-খেউড়… সেই সাথে মাথার ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথার অনুভব। রবিদার চায়ের দোকানের সামনেই আইল্যান্ড, তিন রাস্তার সংযোগস্থল। মাঝখানে রবীন্দ্রমূর্তি। মূর্তির নীচে পাগলির বর্তমান ঠিকানা। কিছু কংক্রিটের বেঞ্চ আছে চারপাশে। সকাল-সন্ধে এখানেই আড্ডা মারে ছেলেগুলো। সকলে শিক্ষিত, ভালো পরিবারের। চাকরি জোটাতে না পেরে বাড়ি বাড়ি ছাত্র পড়ায়, বাকি সময়টা এখানেই। এদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ মেনে নিতে পারে না বিভাস।

চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে পায়ে পায়ে পার্কের গেটের মুখে এসে দাঁড়ায়। পাগলিটার একটা হাত স্ফীত পেটের উপর, অন্যহাতে একটা লাঠি– কখনও এর দিকে তেড়ে যাচ্ছে তো কখনও অন্যজনের দিকে। তাড়া খেয়ে প্রথমজন দৌড়ে পালাচ্ছে তো দ্বিতীয়জন এগিয়ে আসছে… পাগলির গর্ভস্থ সন্তান চুরি করার ভয় দেখাচ্ছে। আর তাতেই পাগলির আক্রোশ। পরনের কাপড় অর্ধেকের বেশি মাটিতে লুটোচ্ছে, উপরিভাগ সম্পূর্ণ অনাবৃত।

পাগলির ভারী তলপেটের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বিভাস। অসুস্থ শরীরে এমন দৌড়-ঝাঁপ… ভদ্দর ঘরের বউ হলে বিছানায় কেতরে থাকত। একটা রাস্তার পাগলিকেও, কারা যে এসব করে! আজব দেশ মাইরি!

–কী হচ্ছে এখানে? এত চিৎকার কীসের?

বিভাস প্রায় গর্জন করে ওঠে। মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। ছেলেগুলোর সাথে সাথে পাগলিটাও থতমত খেয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সকলের চোখে ভয়।  এলাকায় একটা ‘দাদা’ ইমেজ আছে বিভাসের।

বিভাস তখনও পাগলিটার দিকে তাকিয়ে। এই প্রথম এত কাছ থেকে, সময় নিয়ে পাগলিটাকে দেখছে। এখানে নতুন এসেছে, শরীরে বয়ে এনেছে বীজ। বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যে। গায়ের রং একসময় ফর্সা ছিল। এখন রোদেপোড়া তামাটে। ছাই-ভস্ম মাখা চুলে জট পাকাতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে আঙুল ডুবিয়ে চুলকোচ্ছে। এসবের মধ্যেও বেশ একটা ঢলঢলে ভাব আছে চেহারায়। সবচেয়ে মারাত্মক পাগলির চোখদুটো। কী এক মায়ায় যেন তার দিকে অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভরসা খুঁজছে।

চোখের এই আকুতি আগে কখনও দেখেনি বিভাস। নিজেকে সে নিষ্ঠুর, পাষাণ হূদয় হিসাবে ভাবতেই  অভ্যস্ত। তবু বুকের মধ্যে কেমন একটা অনুভূতি, শিরশির করে শরীর। পাগলিটার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। অস্বস্তি হয়। চোখ ফিরিয়ে ছেলেগুলোর দিকে তাকায়। ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে, নিজেকে যথাসম্ভব সামলে নিয়ে বলে, তোরা সব শিক্ষিত না?

– সরি বিভাসদা, ভুল হয়ে গেছে…

বিভাস কথা বাড়াল না। শব্দ করে থুতু ফেলল একদলা। পাগলিটার দিকে তাকাল। তখনও তার দিকে তাকিয়ে। চোখে করুণ আর্তি। বিভাস চোখ সরিয়ে নিল। সকলকে চমকে দিয়ে যেভাবে আচমকা ঢুকেছিল সেভাবেই আবার বেরিয়ে এল। রবিদার চায়ের দোকানে এসে ঢুকল।

–এরা কি ভদ্দরলোকের ছেলে!

দোকানে খদ্দের ছিল না, সমস্ত ঘটনা লক্ষ্য করেছে রবিদা। ভিতরে ক্ষোভ জমে ছিল, এতক্ষণে মুখ খুলল, কী বলব বলো! ব্যাবসা করে খাই, কিছু বলতেও পারিনে–

–একটা চা দিও।

মুড অফ হয়ে আছে। কথা বলতে ভালো লাগছে না। রবিদার কথায় সরাসরি উত্তর দিল না।

–কি অমানবিক ব্যাপার বলো তো! চা দিতে দিতে রবিদা আবার আক্ষেপ করল।

যে-কোনও কারণেই হোক, বিভাস জানে, পাগলিটার উপর একটু সহানুভূতি আছে রবিদার। যখনই দোকানে এসে হাত পাতে, কেকটা রুটিটা… যা হোক কিছু একটা দেবে। ফেরায় না কখনও। বাড়ি থেকে বউদির বাদ দেওয়া একটা কাপড়ও এনে দিয়েছে।

চা খেতে খেতে মানুষটাকে খেয়াল করছিল বিভাস। তার দিক থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে মুখ গোমড়া করে আছে। পরিবেশটা আরও গুমোট হয়ে ওঠে। বিভাসের ভালো লাগে না। উঠে পড়ে সে। সলিলদার বাড়ি থেকে বরং ঘুরে আসবে।

কাঁধ অবধি ঝাঁকড়া চুলে ঢেউ তুলে অভ্যর্থনা জানালেন গৌরী বউদি। বাব্বা, এতদিনে মনে পড়ল! আমি ভাবলাম রাগ করেছ, আর বুঝি আসবেই না। এসো ভেতরে এসো–

বিভাস অবাক হল। এমন প্রত্যাশা ছিল না। বরং উলটোটা আশঙ্কা করেছিল। ভয়ে ভয়ে ছিল। ফুরফুরে মেজাজে দেখে ভারটা নেমে গেল।

বিভাসকে বসার ঘরে বসিয়ে ভিতরে চলে গেলেন তিনি। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, একটু বোসো। দাদা আসছে। বাথরুমে ঢুকেছে।

মিনিট দশেক পরে সলিলদা এলেন। স্নান সেরে ধোপদুরস্ত হয়ে এসেছেন। পেছনে গৌরী বউদি, তবে ভেতরে ঢুকলেন না। দরজায় দাঁড়িয়ে রইলেন পর্দা ধরে!

–সারাদিন কী এমন রাজকার্য থাকে, খবর দিয়েও পাওয়া যায় না!

–কিছুদিন আগেই তো এলাম। তাছাড়া আপনার সঙ্গে দেখা হচ্ছে–

– সব কথা সব জায়গায় হয় না। কই গো, এবার বলো কী বলবে বলছিলে।

শেষ কথাগুলো বউদিকে উদ্দেশ্য করে। বউদি মুখ নামিয়ে নিলেন। মেঝেতে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের আঁচড় কাটতে কাটতে সংকোচ জড়ানো গলায় বললেন, তুমি বলো। চায়ের জল চাপিয়ে এসেছি–

কথা শেষ করে ধীর পায়ে পর্দার আড়ালে চলে গেলেন তিনি।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুখ তুললেন সলিলদা। সরাসরি বিভাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, কাজের কথায় আসি। মন দিয়ে শুনবে, বিষয়টা অনুভব করার চেষ্টা করবে।

বিভাস কিছু অনুমান করতে পারে না। বুঝতে পারে না সলিলদার মতো মানুষের কী এমন দরকার থাকতে পারে তার কাছে, যে জন্যে এত হেঁয়ালি। চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে হয়।

–কিছুদিন হল তোমার বউদি খুব করে ধরেছে। চেষ্টা করলে তুমিই নাকি ওর সমস্যার সমাধান করতে পারো। আমিও ভেবে দেখলাম, খুব একটা ভুল বলেনি।

–সমস্যাটা কী? বিভাস কৌতূহল চাপতে পারে না।

–বলছি। তার আগে কথা দিতে হবে, সমস্ত রকম হেলপ পাব তোমার কাছে।

–সম্ভব হলে নিশ্চয় পাবেন।

সলিলদা গম্ভীর, তুমি তো জানো, প্রায় বারো বছর হল আমাদের বিয়ে হয়েছে। সন্তানাদি কিছু হল না। হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। গৌরীকে দু-দুবার অপারেশন করিয়েছি। নিট লাভ জিরো। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এবার অ্যাডপ্ট করব। সেই দু’বছর হতে চলল। বিভিন্ন জায়গায় নাম লিখিয়ে রেখেছি, এখনও কোনও জায়গা থেকে গ্রিন সিগনাল আসেনি। সব জায়গায় লম্বা লাইন। যতদিন যাচ্ছে ভরসা হারিয়ে ফেলছি।

বিভাস বোঝে না এসব অতি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তার সাথে কেন! জিজ্ঞাসাও করতে পারে না। অস্বস্তি হয় তার।

–কিছুদিন আগে একটা পাগলির কথা বলেছিলে না? অচমকা প্রসঙ্গ বদলে ফেলেন, তোমাদের ওই রবীন্দ্রপার্কে থাকে…

–হ্যাঁ, কিন্তু…

–শুনেছি সে প্রেগন্যান্ট। তো, এর মধ্যে একদিন গিয়েছিলাম। দেখলাম তাকে। সাত-আট মাস তো হবেই, বেশিও হতে পারে। দেখে কষ্ট লাগে।

বিভাস ধন্দে পড়ে। এর মধ্যে আবার পাগলি এল কোত্থেকে! বিষয়টা কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। গালে রেখে কথা বলছে সলিলদা। অস্বস্তি হচ্ছে।

–তোমাকে একটা কাজ করতে হবে, সলিলদা আবার মুখ খোলেন, কিছুদিন একটু চোখে চোখে রাখতে হবে পাগলিটাকে। তুমি তো বেশিরভাগ সময় ও দিকেই থাকো, প্রয়োজনে একজন লোক রাখবে দেখাশোনা করার জন্য।

–আপনার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।

–বলছি, সব খুলে বলছি। প্ল্যানটা আমার নয়, তোমার বউদির। তবে আমার সম্মতি আছে। আমরা ঠিক করেছি, পাগলির বাচ্চাটাকে আমরা অ্যাডপ্ট করব।

–এটা কী করে সম্ভব?

–তুমি হেলপ করলেই সম্ভব।

– তা বলে একটা রাস্তার পাগলির বাচ্চা!

–সন্তান সন্তানই। সে যার হোক, যেখানকার হোক।

–তা নয়, আমি ভাবছি…, ইতস্তত করেও শেষ পর্যন্ত কথাটা বলে ফেলল, আমাদের দেশে একটা রাস্তার পাগলিও প্রেগন্যান্ট হয়, এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে! আর এ জন্যে যে বা যারা দায়ী, শিশুটার শরীরে সেইসব পশুর রক্ত রয়েছে।

–রক্তের পরিচয় কী সব! শিক্ষা, পরিবেশ… এসবের কোনও মূল্য নেই। তাছাড়া কোনও হোম থেকে বাচ্চা অ্যাডপ্ট করলেও তার জন্ম পরিচয় আমরা জানতে পারব না। সেখানেও তো এ ধরনের পথ শিশুদেরই ঠাঁই হয়…

–আমি রক্তের পরিচয় নয়, রক্তের সম্পর্কের কথা বলছি। জিনকে তো অস্বীকার করা যায় না।

–আমরা আমাদের ভালোবাসা দিয়ে আমাদের মনের মতো করে মানুষ করে নেব। বিভাস বোঝে, সলিলদা এ বিষয়ে আর কোনও তর্ক চাইছে না। একরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। মাথাটা আবার টিপটিপ করতে শুরু করে তার।

–তুমি শুধু পাগলিটাকে চোখে চোখে রাখবে। দেখবে কোনও অসুবিধা না হয়। আর নিয়মিত খবরগুলো দিতে থাকবে। পারবে না?

–চেষ্টা করব। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হল সে।

–চেষ্টা নয়, পারতেই হবে–

গৌরী বউদির গলা। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে আবার। চোখ দুটো চিকচিক করছে। বিভাস অবাক হয়, ঠিক দেখছে তো! গৌরী বউদির চোখে জল! ভদ্রমহিলা তাহলে কাঁদতে জানে! তাও সন্তানের জন্য!

বিভাস উঠে দাঁড়ায়। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। বেরোতে হবে।

–বিষয়টা তাহলে তোমার উপরেই ছেড়ে দিলাম।

–আপনিও আর একবার ভাবুন।

কথা শেষ করে বেরিয়ে আসে বিভাস।

মাঝে মাঝে রবিদার দোকানে আসছে সলিলদা। দীর্ঘক্ষণ কাটাচ্ছে। ইতিমধ্যে রবিদার সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেলেছে। রবিদাকেও জানিয়েছে বিষয়টা। রবিদা খুশি এমন একটা সিদ্ধান্তে। অকুণ্ঠ সাধুবাদ সহ সমস্তরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে।

দোকানে খদ্দের না থাকলে পাগলিটাকে দেখতে যায় রবিদা। পাগলির সুবিধা-অসুবিধার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে। সময় পেলে বিভাসও যায়। সলিলদার সিদ্ধান্ত হঠকারী মনে হলেও, তাকেও যেন কী এক নেশায় পেয়েছে। মাঝে মাঝে পার্কের ভিতরে ঢুকে যায়। খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে পাগলিটাকে। ছেলেগুলোর সাথেও ভাব হয়েছে। সেদিনের সেই ঘটনার পর আর তারা পাগলিটাকে উত্যক্ত করেনি। বরং পাগলির সুবিধা-অসুবিধার দিকে নজর রাখছে। তবুও একটা অঘটন ঘটে গেল।

পার্কের বাইরে রিকশা স্ট্যান্ড। চালকরা মাঝে মাঝে ভিতরে গিয়ে বসে কাজের চাপ না থাকলে। তাস খেলে, গল্প গুজব করে। সেদিন কেউ একজন পাগলিকে রাগানোর জন্যে বলেছিল, তোর বাচ্চাকে নিয়ে নেব। পাগলি ইট ছুড়ে তার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।

ঘটনাটা জানানোর জন্যে তখনই সলিলদার বাড়ি গিয়েছিল বিভাস। সবটা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল সলিলদা। বউদির মুখেও দুশ্চিন্তার ছায়া।

–কাজটা কি সহজ হবে?

–দেখা যাক। সলিলদার সংক্ষিপ্ত উত্তর।

আরও একটা সংশয় কিছুদিন হল বিভাসের মনে উঁকি মারছে। পাগলিটাকে নিয়ে হয়তো একটু বেশিই ভাবছে, যা আগে কখনও কারও ক্ষেত্রে হয়নি। কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? এতদিন সলিলদাকে বলতে সাহস হয়নি। আজ হঠাৎ আবেগের বশে বলে ফেলল, আমরা বোধহয় অন্যায় করছি।

–কীসের? সলিলদার চোখে সংশয়।

–এভাবে কারও বাচ্চা…

কথা শেষ করতে পারে না, সলিলদার চোখে চোখ পড়তেই থেমে যায়। সলিলদা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখ খোলে, একটা বাচ্চা, আনওয়ানটেড বেবি, এভাবে ফুটপাথে বেড়ে উঠবে! যার ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। সেটা অন্যায় নয়? তাকে ভদ্রসমাজে মানুষের মতো বাঁচার অধিকার দেওয়াটা অন্যায়?

গৌরী বউদি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার তিনিও মুখ খুললেন, নিজেকে দিয়ে ভাবো না, তোমার মাসি যদি দায়িত্ব না নিতেন, তোমার ভবিষ্যৎ কী হতো কল্পনা করেছ কখনও? তিনি কি অন্যায় করেছেন?

–এখানে ব্যাপারটা অন্যরকম।

–কিচ্ছু অন্যরকম না। দুটি ক্ষেত্রেই নির্ভর করছে একটা শিশুর ভবিষ্যৎ। বিনিময়ে সন্তানহীনা সন্তান পাচ্ছে। তিনি তো তোমাকে তোমার মায়ের অভাব কোনওদিন বুঝতে দেননি। তার আত্মত্যাগ, ভালোবাসা… এসব অস্বীকার করতে পারবে?

স্বীকারও করেনি কোনওদিন। আসলে ভাবেইনি মনোময়ীকে নিয়ে। হতে পারে সে মনোকামিনীর বোন, গৌরী বউদির কথায় নাড়া খেল একটু। প্রসঙ্গটা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল। মনোময়ী সত্যিই বিস্ময়কর।

বিভাসের বয়স তখন দু’বছর। মা মনোকামিনী বিনোদ বিশ্বাসের এক বন্ধুর সঙ্গে পালাল। আর ফেরেনি। নিঃসন্তান মনোময়ী ততদিনে বিধবা হয়েছেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে বাপের সংসারে। অন্যদিকে দু’বছরের শিশু সন্তান নিয়ে বিনোদ বিশ্বাসের মানসিক অবস্থাও তখন শোচনীয়। এমন সময় মনোময়ী এসে সংসারের হাল ধরেছিলেন। কোলে তুলে নিয়েছিলেন বিভাসকে। সেই থেকে এ বাড়িতে। এমন নয় যে অস্তিত্বের সংকটে তিনি একাজ করেছেন। মনোময়ীর বাবা অর্থাৎ বিভাসের দাদামশায়ের আর্থিক অবস্থাও ভালো। ইচ্ছা করলেই জীবনটা অন্যরকম হতে পারত। তবু কোন স্বার্থে তিনি এখানে রয়ে গেলেন? বিভাসকে মায়ের অভাব কোনওদিন বুঝতে দেননি। বিভাসের জন্যে তার উৎকণ্ঠা বা দুশ্চিন্তাও অস্বীকার করার মতো নয়। কীসের টানে এই ত্যাগ স্বীকার? প্রশ্নগুলো মাথার ভেতরে পাক খায়। চিনচিন ব্যথাটা টের পায় আবার।

–তোমার মাসির কথা না হয় বাদ দিচ্ছি। এবার সলিলদা। দু’জনে যেন পরিকল্পনা করে তাকে আজ ধরেছে। বললেন, কিন্তু ওই পাগলি? পাগলিটার ক্ষেত্রে কী বলবে? যে-সন্তান এখনও পৃথিবীর আলোই দেখল না, তার জন্যে এখনই একজনের মাথা ফাটিয়ে ফেলল?

বিভাস চুপ করে রইল। কথাগুলো একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছে না। ভাবাচ্ছে। ভাবাচ্ছে বলেই সলিলদার কাছে ছুটে এসেছে সংবাদটা জানানোর জন্যে। পাগলিটাও ভাবাচ্ছে। কী এক আকর্ষণে সময় পেলেই ছুটে যাচ্ছে পাগলিটাকে দেখতে। কীসের টানে? এই মুহূর্তে মনে হল, হঠাৎই মাথায় এল ভাবনাটা, পাগলির গর্ভস্থ সন্তানের সঙ্গে কোথায় যেন তারও একটা যোগসূত্র আছে। নইলে এমন টান অনুভব করবে কেন? কিন্তু সূত্রটা ধরতে পারছে না…

পাগলির জন্যে আরও অনেক ব্যবস্থা নিয়েছেন সলিলদা। পাশের হোটেলে বলে রেখেছেন, কাজের ছেলেটা দু’বেলা শালপাতার থালায় ভাত দিয়ে যায়। এক ডাক্তার বন্ধুকে এনে দেখিয়েছে দুদিন মাঝরাতে। একদিন জোর করে দুটো ইনজেকশন দিয়েছেন তিনি। ডেলিভারির জন্যে নার্সিংহোমও ঠিক করে রেখেছেন, পেইন উঠলেই…

দিন যত এগোচ্ছে, পাগলিটার উপর তাদের সতর্ক দৃষ্টি তত তীক্ষ্ণ হচ্ছে। বিভাস যদিও মানসিক ভাবে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

আরও একটা ঘটনা সেদিন খুব স্ট্রাইক করল। পার্কের এক কোণে বসে আনমনে সিগারেট টানছিল। হঠাৎ পাগলিটার গলা কানে আসতে দেখল পাগলিটা তার স্ফীত তলপেটে হাত বোলাচ্ছে আর নাকি সুরে গাইছে–

খোকা ঘুমোল পাড়া জুড়োল

বর্গি এল দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে…

হঠাৎ বর্গির প্রসঙ্গ কেন? কথাগুলো কি তাকে উদ্দেশ্য করে। তাদের অভিসন্ধি কিছু অনুমান করেছে? যেজন্যে এখন থেকেই গর্ভস্থ সন্তানকে সাবধান করছে। নিজেকে বর্গি বলে মনে হল বিভাসের। –অন্যায়! মনে মনে আবার বিড়বিড় করল, সলিলদা অন্যায় করছে। খবরটা তাকে জানানো দরকার।

বিভাস তখনই বাইক নিয়ে ছুটল।

আর মাত্র কয়েকটা দিন। খাওয়া-ঘুম ছুটেছে সলিলদার।

খাওয়া-ঘুম ছুটেছে বিভাসের। রবিদা এখন রাতে দোকানেই থাকছে। রাতবেরাতে কিছু একটা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে জানাবে। রবিদার মোবাইল ছিল না, সলিলদা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। খবর পাওয়া মাত্র ছুটে আসবে। ড্রাইভারকেও সেইভাবে বলে রেখেছে।

সেদিন সন্ধ্যা থেকে আকাশের মুখ ভার। মাঝে মাঝে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে প্রবল। রাত দশটা পর্যন্ত রবিদার দোকানে কাটিয়ে গেল সলিলদা। লক্ষণ সুবিধার নয়। যাওয়ার আগে বারবার রবিদাকে সাবধান করে গেল। বিভাসকেও বলে গেল মোবাইল খোলা রাখতে।

বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না বিভাস। রবিদাকে পুরোপুরি ভরসা করা যায় না। সন্ধ্যার পর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। বৃষ্টির কারণে আজ আবার বেশি টেনেছে।

এগারোটার পর মুষলধারে নামল। প্রবল বৃষ্টির শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। অস্থির পায়চারি করছিল ঘরের মধ্যে। দুর্যোগের মধ্যেই যদি কিছু একটা ঘটে যায়।

আধ ঘণ্টা হতে চলল, বৃষ্টি থামার লক্ষণ নেই। বরং বাড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে মাঝে মাঝে। উলটোপালটা হাওয়া। আকাশ যেন ভেঙে পড়েছে। ইতিমধ্যে জল জমেছে বাড়ির সামনে। ব্যাং ডাকছে। সবমিলে অদ্ভুত একটা শব্দ। বিভাসের মনে হল, দূরে কোথাও অসংখ্য মানুষ চিৎকার করছে। কে জানে এদের মধ্যে পাগলিটাও আছে কিনা!

বিভাস আর থাকতে পারে না। দরজা খুলে বাইরে আসে। সোজা রাস্তায়। দ্রুত পা চালায় পার্কের দিকে। হাতে টর্চ। ভয় রবিদাকে নিয়ে, যদি ঘুমিয়ে পড়ে! রবিদা কী শুনতে পাবে পাগলির চিৎকার? সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হাঁটার বেগ বাড়িয়ে দেয় যথাসম্ভব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে পৌঁছোতে হবে।

বাড়ি থেকে পার্কের দূরত্ব মাইলখানেক। হাঁটা পথে মিনিট পনেরো-কুড়ি। অথচ পথ যেন শেষ হচ্ছে না। অন্তহীন পথ হেঁটে চলেছে সে। কতদিন, কত মাস, বছর, যুগ ধরে… কিংবা তারও বেশি সময়… তবু গন্তব্যে পৌঁছোতে পারছে না।

বিভাস দৌড়োতে শুরু করে।

বৃষ্টিতে ঝাপসা সবকিছু। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। বিদ্যুতের আস্ফালন। টর্চের আলো বৃষ্টি ভেদ করে বেশিদূর পৌঁছোয় না। মাঝে মাঝে হোঁচট খায় রাস্তার জল জমা খানাখন্দে। তবু ভ্রুক্ষেপ নেই। পাগলের মতো সে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে যখন পার্কের কাছাকাছি, দূর থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ কানে আসে। তবে কী…

সন্দেহ সত্যি। রবিদা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সলিলদা নেই। এদিকে রবীন্দ্রনাথের পায়ের গোড়ায় সদ্যজাতের কান্না। ভিতরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলতেই চমকে গেল। রক্তে ভাসছে চারপাশ। একপাশে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে পাগলিটা, অন্যপাশে রক্তজলে মাখামাখি একতাল মাংস পিণ্ড। গলায় তীব্র চিৎকার। একটু দূরেই ওত পেতে বসে আছে দুটো রাস্তার কুকুর। চোখের তারায় লোভের ঝিলিক।

যে-কোনও মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এমন বীভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি আগে কখনও হয়নি। শিউরে উঠল সে। অস্ফূটে কাতরে উঠল, মাগো–

বহু বছর বাদে সে ‘মা’ শব্দটা উচ্চারণ করল। নিজের অজ্ঞাতেই। তারপর টর্চ হাতে তেড়ে গেল কুকুর দুটোর দিকে। যে-কোনও মূল্যেই হোক এদের সে রক্ষা করবে। নইলে সে নিজের কাছেই মিথ্যে হয়ে যাবে। মিথ্যে হয়ে যাবে তার অস্তিত্ব।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব