এমন একটা মিছিল হোক…

তিতলি শেষমেশ তুই…! আমি ভাবতে পারছি না। কেন…? কেন এসব? তিস্তার কথাগুলো অনেকটা আর্তনাদের মতোন শোনাচ্ছিল।

সিরিয়াসলি আমিও ভাবিনি বউদি। তুমি এতটা রিঅ্যাক্ট করবে। নিজের মনের ইচ্ছেগুলোকে লুকিয়ে রেখে লোকজন যে ঘরে ঘরে ক্রাইম করছে তার থেকে এটা হাজার গুন বেটার। আমি যা করি সামনাসামনি। বুঝলে? আমার কোনও কিছুই যেমন লোকদেখানো নয়, তেমন কোনও কিছুই আড়াল নয়। আমি যা, আমি তাই-ই। প্লিজ তোমাকে একটাই রিকোয়েসট তুমি কথাটা বাবা-মার কানে তুলো না। সবার প্রশ্নের গাদা গাদা উত্তর দিতে দিতে সত্যি সত্যিই আমি হাঁপিয়ে উঠেছি জানো! মুখ ঘুরিয়ে বলে যাচ্ছিল তিতলি।

ওর হাতে তখনও ধরা ছিল আধপোড়া সিগারেটের টুকরোটা। ছাদের ট্যাংকের পাশে দাঁড়িয়ে তিতলি সিগারেট টানছিল। আর ঠাকুরঘরে সন্ধে দিতে এসেই ব্যাপারটা চোখে পড়ে তিস্তার।

ল্যাম্পপোস্ট আর ছাদের ঠাকুরঘর থেকে যে-হলুদ টিমটিমে আলোর রেখাগুলো ত্যারছা ভাবে পড়ছিল দেয়ালের অন্ধকার কোণায়, তাতে ধোঁয়া, আলো, অন্ধকার মেশামেশি করে একটা আলতো জিজ্ঞাসার চিহ্নের আকার নিচ্ছিল।

প্রশ্ন চিহ্ন তো বটেই। তিতলি আজ এতটা ফেরোশাস হয়ে উঠেছে ভাবতে তখনও কোথায় একটা বাধছিল তিস্তার। এমনটা কী সত্যি হবার ছিল? নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।

মনে হচ্ছিল এইতো সেদিনের কথা, যেদিন প্রথম মজুমদার বাড়িতে পা রেখেছিল তিস্তা। ওদের প্রেমের বিয়ে ঠিকই কিন্তু বিয়ের আগে শ্বশুরবাড়ি আসা, আর বিয়ের পরে প্রথমবার সমস্ত আত্মীয়স্বজনের সামনে নিজেকে বউ হিসেবে মেলে ধরার দিনটার মধ্যে যে কতটা ফারাক, তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল তিস্তা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বিয়ের পাত্রী হিসেবে তিস্তার সাতাশ বছর এমন কিছু ছোটো নয়। অনেকে তো এই বয়সে প্রথম মা-ই হয়ে যায়। সেদিনের ঘটনাটা মনে পড়লে আজও একটা চাপা আতঙ্ক দানা বাঁধে বুকের ভীতু তুলতুলে জায়গাটায়।

চৌকাঠে পা দিতে না দিতেই বরেরবাড়ি সমেত গোটা পাড়া অন্ধকার হয়ে গেছিল; হুলুস্থুল কাণ্ড। অপয়া অপবাদের অদৃশ্য খাঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে সায়কের খুড়তুতো, পিসতুতো সবকটা বোন ওই অন্ধকারেই যারপরনাই টাকাপয়সার ক্লেম করতে শুরু করে দিয়েছিল। গুরুজনদের বাঁকা চোখে নতুন বউয়ের দিকে তাকানো আর বোনদের ঠিকঠাক টাকা না পাওয়ায় মন কষাকষির তেমনই একটা বিশ্রী পরিস্থিতিতে তিস্তার চোখের জল মুছিয়েছিল তিতলি। ঠিক যেন ছোট্ট একটা প্রজাপতিই বটে; কত বয়স হবে তখন ওর। এই তেরো-চোদ্দো বছর। দিব্যি হেসেখেলে গল্প করে মন ভুলিয়ে দিয়েছিল তিস্তার। মামাতো একমাত্র বোন হলেও সায়কের বাকি বোনেদের সঙ্গে জোট বেঁধে দাদার পকেট কাটার দিকে যায়নি সে। বরং বউদির দুঃখু দুঃখু মুখ দেখে হাসিমুখে ম্যানেজ করেছিল সবটা।

পাড়াপড়শির, ঘরের লোকের কথার খোঁচা, এমনকী সায়কের সামান্য বেসরকারি অফিসে চাকরি জানা সত্ত্বেও বাকি বোনেদের জোরাজুরিকে বিরক্তির চোখেই দেখেছিল ছোট্ট ননদ তিতলি। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই এই ননদকে দিনে দিনে নিজের বোন বলেই মনে হয়েছিল তিস্তার। একটু একটু করে হাসি-ঠাট্টা, গল্প-গুজবে জেনেও ছিল তিতলি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে চাকরি করতে চায়। পড়তে চায় ওর প্রিয় বউদির মতো সাহিত্য নিয়ে। মিষ্টি একটা ভালোলাগা ডানা ঝাপটে উঠেছিল তিস্তার বুকের মধ্যেও। মন বলেছিল, কেউ তো এখনও আছে, যে অন্তত বাংলা বিষয় নিয়ে পড়াকে কোনও উপায় নেই তাই পড়ছে, এমনটা মনে করে না।

কী গো তুমি এখনও ছাদে? করছটা কী? কখন থেকে পিসাই এসে বসে। তোমার হাতের চা চাইছে। সায়কের গলায় চমকে উঠে তিস্তা সিঁড়ির দরজার কাছে সরে গেছিল। না দেখলেও বুঝতে পারছিল ছাদের কার্নিশ টপকে একটা হলুদ আগুন পাশের জঙ্গুলে জমিটায় ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল।

যাচ্ছি যাচ্ছি। তুমি হঠাৎ ওপরে উঠে এলে কেন? আমি নামছি।

তিতলি কোথায়? ছাদে না? একটা হরর মুভি ডাউনলোড করেছি। কখন থেকে একসঙ্গে দেখব ভাবছি। ম্যাডামের দেখাই নেই।

তিতলি তাড়াতাড়ি নীচে আয়। মুভি দেখবি। বলে তিস্তা প্রায় জোর করেই সায়ককে নিয়ে নীচে একতলায় চলে আসে। বলা যায় না যা রাগ সায়কের। একেই কলকাতায় ওই দলবাজির কলেজটা দুচক্ষে দেখতে পারে না সায়ক। তার ওপর তার নিজের বোন এসব নেশা করছে বিন্দুমাত্র জানতে পারলে, হয়তো সারাজীবনের জন্যই কথা বন্ধ করে দেবে তিতলির সঙ্গে। জানে সব রাগটা গিয়ে পড়বে তিতলির ওপর। কারণ নিজের বাড়ি শক্তিনগরের মতো মফস্সলে রীতিমতো ভালো গভর্নমেন্ট কলেজে চান্স পেয়ে, তিতলি একটা বছর নষ্ট করে অনেকটা নিজের জেদেই কলকাতায় এসে ভর্তি হয়েছে। এখানে নিজের পিসির বাড়ি থাকলেও রয়েছে কলেজেরই কাছাকাছি কোনও একটা মেস-এ। তাছাড়া রয়েছে আরও নানা কারণ।

চোখে আঙুল দিয়ে যেটা দেখা যায় সেটা হল তিতলির স্বাধীনতা। তার অবাধ বাঁধনছাড়া অগ্রাহ্য করার একটা ইমম্যাচিওর মন।

 

তোর দাদা কিন্তু গন্ধটা পেয়েছে তিতলি। এখানে এলে…।

সেটাই করতে হবে। এখানে আসাটাই বন্ধ করে দিতে হবে।

আমি কি তাই বলেছি তিতলি? তোর দাদা কিছু একটা আন্দাজ করেছে, মানুষটাকে তো আমি চিনি। আমাকে কী বলছিল জানিস রাতে? বলছিল, ঠিক মনে পড়ছে না দাদু মারা যাওয়ার আগে তিতলিকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছিল জানো? কিছু না হলেও কবিতার শেষ একটা লাইন আজও মনে আছে আমার, জানলা দিয়ে তিতলিটা ওই খিলখিলিয়ে হাসে। আর ডায়ারির পাতা থেকে সেটাকে বেছেই সবাই ওর এই নাম দিয়েছিল।

উফ্ বউদি তুমি না সাংঘাতিক সেন্টু দাও। সত্যি এত ইমোশন রাখো কোথায়? আমি যতদূর জানি পিছন ফিরলেই সবাই তোমার সেন্টুর গাঁ…। উপ্স সরি সরি…। চোখ মুটকে তিস্তার সামনে ছদ্ম লজ্জার অভিনয় করে তিতলি।

এসব ছাড়। যেটা বলব বলব করেও তোকে বলা হচ্ছিল না, শক্তিনগর থাকতে ওই যে ছেলেটা কী নাম যেন…।

বিতান…।

হ্যাঁ হ্যাঁ দেখা করিস এখন? কথা হয়?

অত ঘুরিয়ে বলার কী আছে? পোঁদে লাথ মেরেছি। বড্ড ঘ্যানঘ্যান করত। একটু কাছাকাছি ছিলাম বলেই ওর সম্পত্তি আমি? তা তো নয়। তাছাড়া কলকাতায় এসে পড়াটা, চাকরি করাটা, আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। যেখানে আমার বাবা-মা সায় দিয়েছে সেখানে এলিতেলি হায়দার আলি, ও কে…?

কিন্তু তুই যে তখন বলেছিলিস ও তোকে…।

চু চু চু মুখ দিয়ে আওয়াজ করে তিতলি। তুমিও না বউদি…। সবাইকেই নিজের মতো ইমোশনের ফুল ট্যাংকার ভাবো। ছাড়ো তো। শোনো তবে কেউ পার করে দেবে না আমায়,

সময় আছে এখনও

চলো নতুন করে কাঁটাঝোপে পা ফেলি একবার…।

কবিতার লাইন বলতে বলতে ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা সিগারেটের প্যাকেট পকেটে পুরে তিতলি মোবাইলটা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়!

অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে তিস্তা। একদম… একদম পালটে গেছে তিতলি। ওর ইনোসেন্সগুলো কোথায় যেন ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। তিতলির এখন কলেজের থার্ড ইয়ার। সেই বাংলা সেই সাহিত্য ভালোবেসে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখা মেযেরা এখন নাকি কলেজের ছাত্র সংগঠনের মিছিলের খাতায় নাম লিখিয়েছে। মিছিলে হাঁটছে। অনশন করছে।

রাজনীতি কী? রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য কি? জানে না তিস্তা। সত্যি কথা বলতে কী জানতেও চায় না। তবে এটা জানে রাজনীতির রং দলভেদে পালটায় না; রাজনীতির একটাই রং স্বার্থ।

কেন জানে না আপনা আপনি মনটায় একটা খারাপ লাগার বুড়বুড়ি কাটছিল।

নিজের বোনের মতো ওর মাথায় হাত রেখে বলতে ইচ্ছে করছিল, এই স্বার্থপর সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে তিতলির একটা পরিচয় হোক। আর কিছু না।

 

খবরটা এত তাড়াতাড়ি এভাবে আসবে ভাবতেই পারেনি তিস্তা। তখনই ওলা বুক করে ছুটে গেছিল মামা শ্বশুরের বাড়িতে। সারাজীবনের সেই চরম অপবাদ অপয়া মাথায় করে নিয়ে নেহাত নির্লজ্জের মতো উস্কোখুস্কো চুলে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল তিতলিদের বাড়িতে। নাহ্ কেউ কোনও আপ্যায়ন করেনি। সেটা যে তার প্রাপ্য হবে না, সেটাও জানত। কারণ শ্বশুরবাড়ির প্রথম দিনে সে পা রাখতেই আলো নেভা, সায়কের হাজার একটা পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও, সরকারি চাকরি না পাওয়া আর শেষমেশ তিতলির…।

প্লিজ প্লিজ আমাকে একটু একা থাকতে দাও। একদম ভালো লাগছে না।

কিন্তু তিতলি…।

তোমাদের কোনও ঝামেলা হবে না বলছি তো! আমি তো সবটা মিটিয়ে এসেছি।

তোর শরীরটা …।

আমার শরীর ঠিক আছে বউদি। এত কষ্ট পেও না। আমি ঠিকই আছি। আজ নতুন কিছু না। আমরা প্রায়ই মেলামেশা করতাম। কোনও কিছুই জোর করে হয়নি।

তিতলি তোর এখন সবে ২৪, আর এই বয়সে বাচ্চা নষ্ট?

আচ্ছা বউদি এটা ধরে নিতে বাধা কোথায়? আমি ছেলেতেও খুশি নই, মেয়েতেও নই, আর যদি বা হিজড়া হতো তাকে সমাজছাড়া করার আগেই সাহস দেখিয়ে তড়িঘড়ি শরীর থেকেই খসিয়ে দিলাম। হ্যাঁ তোমরা অবশ্য এর নাম নষ্টা, বেশ্যা দিতেই পার। তোমরা বড়ো। এসবের লাইসেন্স তোমাদের আছে।

তবে আমি কিনা একটু অন্য ধাঁচের, এসব গায়ে মাখি না। আবার তোমার মতো লুকিয়ে কাঁদবও না। বরং সমাজের পাঁক থেকে তুলে আনব পদ্মফুল। সেই সময় এসে গেছে বউদি। সবার যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। পালটা উত্তর তো দিতেই হবে। তাই না?

তুই ওই ছেলেটাকে বিয়ে করবি? ওর বাড়ি রাজি হবে তো? তোরা যে…।

হাসালে বউদি। এমন খান্ডারনি মেয়ে কেউ বিয়ে করবে না। আর আমিও চাই না। এগারো মিনিটের সুখের জন্য বিয়ে করতে লাগে না। তারপর ভালো না লাগলেই কোর্ট কাছারি হ্যানা-ত্যানা। ধুত্তোরি…।

কিন্তু মামা যে বলছিল…?

ওসব ভাটের কথা। সেদিন ক্লিনিক থেকে ফিরে একটু টান্টু খেয়ে কীসব বকেছিলাম বলে ভয় পেয়ে তোমাদের জানাল। আর তুমিও… মাইরি পারও বটে…! পরশু দুপুরে আমাদের ব্রিগেডে একটা মিটিং…

তিতলি অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল। কিছু কথা কানে আসছিল, কিছু আসছিল না।

তিস্তা দেখছিল শেষ বিকেলের রোদ মাখা কমলা আলোটা পর্দার পাশ দিয়ে তিতলির মুখ, বুক, চিবুক ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর সদ্য মা হওয়ার অস্বীকার করা অস্তিত্বকে। তিতলির স্বপ্ন অন্য রকম। অন্য রঙের। সেই স্বপ্নের রং তিস্তা চেনে না, সেই পথের বাঁকেও কোনও দিন আটকা পড়েনি সে।

তবু দিনশেষে সায়কের কাছে ফিরে যেতে যেতে ওর একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে, সমাজের যে-অন্ধকারকে আলোর পরিচয় দিতে আজ তিতলি বা তার সমবয়সিরা প্রতিবাদী হয়ে উঠছে, গলা ফাটাচ্ছে, পুলিশের লাঠি না মেনে দিনে দিনে আরও আরও বেশি স্বাধীনতার সংজ্ঞায় স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, পাঁক ঘেঁটে গল্প খুঁজে পত্রিকা সাজাচ্ছে তারা নিজেরাও কি সেই একই অন্ধকারের দোষে দোষী নয়? নাহলে তিতলির শরীরে ছোট্ট একটা ভ্রূণকে এভাবে দুহাতে অগ্রাহ্য করার…। মনটা বড্ড খচখচ করছিল। আচ্ছা, চলে আসবার সময় তিতলির চোখের কোলটা কেমন যেন চিকচিকিয়ে উঠেছিল কি! নাকি সবটাই মনের ভুল…?

ওলা ক্যাবটা তিস্তার বাড়ির পথ ধরেছে। দমকা একটা হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছে সামনের রাস্তাটা। ঝড় উঠবে…। অন্ধকার করে এসেছে। একটা ভোঁতা শব্দ হতেই পাশ ফিরে তাকায় তিস্তা। বাইরে থেকে মথ বা প্রজাপতি জাতীয় কিছু ওলার জানলার গায়ে ক্রমাগত ফরফর করে আঘাত করছে। ও কি ভেতরে ঢুকতে চাইছে?

বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। তিস্তা গাড়ির হাতল ঘুরিয়ে কাচটা নামাতে চায়। পারে না, লকটা খুব শক্ত।

কালোমেঘ চিরে শেষবারের মতো একফালি আলো আছড়ে পড়ছে শহরের রাস্তায়। নাহ্ সে আলোর কোনও রং নেই। তিস্তার মন বলছে, এ শহরের বুকে একদিন ঠিক, একদিন এমন একটা মিছিল হবে যে-মিছিলের নির্দিষ্ট কোনও রং থাকবে না, থাকবে না নির্দিষ্ট মত, মতাদর্শ। সব রং তখন মিলেমিশে যাবে। মিলেমিশে যাবে কেবল একটা… একটা মিছিলে। হাজার মানুষের সে মিছিলে একটাই জয়গান হবে। জয়গান হবে মানবতার।

 

স্বীকারোক্তি

ডা. চ্যাটার্জি বললেন, এটা নিশ্চয়ই আপনার সবসময় হয় না?

টেবিলের উলটোদিকের চেয়ারে বসে থাকলেও, অর্পণের চোখ মোটেও ডা. চ্যাটার্জির উপর ছিল না। বরং তার দৃষ্টি ছিল ঘরের দেয়াল ঘড়ি, মানুষের ব্রেনের বিভিন্ন অংশের ছবি, একটা ক্যালেন্ডার বা ওর রিভলভিং-এর একটু উপরে একটা এসির উপর। জায়গাটা চেম্বার আর কর্পোরেট অফিসের এক মিশ্রণ মনে হচ্ছিল।

মুখ ফিরিয়ে এবার বলল, একেবারেই না। হয়তো মনের কোথাও থাকে অনুভূতিটা। কিন্তু তীব্র ভাবে জেগে ওঠে, যখন ও আমার কাছাকাছি থাকে। যেমন ধরুন, খাবার টেবিলে। আমার কাছাকাছি বসে খাচ্ছে বা আমার বাইকে। বেশ ঘনিষ্ঠ ভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে।

আর কোথাও? টেবিলের উপর দুটো কনুই তুলে, হাতের উপর কায়দা করে নিজের চিবুক রাখলেন ডা. চ্যাটার্জি। ফরসা মুখ আর হালফ্যাশনের চশমায় মুখে আগ্রহের রেখা।

না, সবচেয়ে বেশি হয়, গলা এক স্কেল নামিয়ে বলল অর্পণ, যখন আমরা বিছানা শেয়ার করি।

তখন কোনও সমস্যা? মানে, প্রসেসটা চলার সময় আপনার কোনও অনুভূতি?

ঘরে কেউ নেই। তাও বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। ডা. চ্যাটার্জির চোখে চোখ রাখতে পারল না। ভাসা সুরে বলল, প্রবলেম মানে, ব্যাপারটার মধ্যে যেন একশো শতাংশ থাকতে পারি না। একটা নতুন বৈবাহিক সম্পর্কে ব্যাপারটা বেশ অস্বাভাবিক লাগছে। আর সে জন্যেই তো আপনার কাছে…

আসলে, কাউন্সেলিং-এর পরিভাষায় এটাও এক ধরনের ডবল পার্সোনালিটি। এই স্টেজটাকে আমরা অ্যাবনর্মাল সাইকোলজির মধ্যে রাখলেও, আমরা বুঝি নর্মাল আর অ্যাবনর্মাল-এর মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা টানা প্রায় অসম্ভব, ডা. চ্যাটার্জির কাউন্সেলিং সত্তা জেগে উঠেছে।

অর্পণের মনে হচ্ছিল, উনি একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করছেন এগোনোর। মন বলছিল, আরও প্রশ্ন ভেসে আসবে। সেটাই স্বাভাবিক। উত্তর তো দিতেই হবে। না হলে সমাধান মিলবে কেমন করে।

আসলে, সত্যিটা এটাই। আবার বলতে শুরু করেছেন উনি, আমরা যতই বলি, টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার তা কিন্তু নয়। কিছু স্মৃতি অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি থাকলেও, ভীষণ সতেজ থাকে। মানে, আমরা ভিতর থেকে, অবচেতন মনে তার থেকে ডিট্যাচড্ হতে চাই না।

চেম্বারের ভেতরের নিস্তব্ধ হিম পরশে আর ডা. চ্যাটার্জির নরম সাহচর্যে ইতিমধ্যেই অশান্ত ভাবটা কমতে শুরু করেছিল। স্বস্তি নেমে আসছিল। অর্ণব অফিস কলিগ হলেও ইনটিমেট ফ্রেন্ড। ডা. সৌম্যশেখর চ্যাটার্জির নাম সাজেস্ট করে বলেছিল, ওনাকে সব বলতে পারবি। ওনার সমাধান একেবারেই অফবিট। পেশাদারিত্বর সঙ্গে গোপনীয়তাও দারুণ বজায় রাখেন। জাস্ট চেক করে দেখতে এসেছিল। নির্ভরতাটা তৈরি হচ্ছে। শ্রদ্ধা মিশিয়ে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, সমাধান আছে নিশ্চই?

অবশ্যই আছে। আই গ্যারান্টি। বন্ধুর মতো, নিজের মতো করে আপনাকে আমার সঙ্গে কথা বলে যেতে হবে। আমাদের ক্ষেত্রে এই টেকনিকটাকে আমরা বলি, ফ্রি অ্যাসোসিয়েন অবাধ অনুষঙ্গ। এতে আপনি অনেকটা হালকা বোধ করবেন। আর সমাধানটা অনেক মাইনর ব্যাপার। জাস্ট একটা উপসংহার টানার মতো।

থমকাল অর্পণ। এখনও পর্যন্ত ডা. চ্যাটার্জির সঙ্গে এই অ্যাপযে্টমেন্টের বেশ কয়েটা ধাপে প্রথমে থেমে, তারপর এগোতে হয়েছে। সুতো ছাড়ছে কিন্তু নিয়ন্ত্রণে। সমস্যা নিয়ে একজন কাউন্সেলর-এর পরামর্শ নিতে আসা। লাজুক ভাব আর হাসির মোটামুটি ব্যালেন্স যেমন অফিসে করে, সেরকম ভাবে বলল, আসলে, এ রকম অ্যাফেয়ার তো আজকের যুগে সবারই একটা-দুটো থাকে। পাসিং অ্যাফেয়ারের মতো। তা পেরিয়ে সবাই চলেও যায়। বিবাহিত জীবন শুরুও হয়ে যায় জমাটি ভাবে। আমাদের বন্ধুদের বেশির ভাগেরই কাহিনি অনেকটা এ রকমই।

একদম ঠিক বলেছেন। তবে ঘটনার রেখাপাত সবার মনে একরকম ভাবে হয় না। ইনডিভিজুয়াল মানুষের মনের আলাদা আলাদা স্তর।

অর্পণকে দেখে যথেষ্ট ভদ্র আর শিক্ষিত মনে হয় বলেই কি শুরু থেকেই ডা. চ্যাটার্জি এতটা টেকনিক্যাল স্বর বজায় রাখছেন? হতেও পারে। বেশ কিছুটা বাতাস বুকে ভরে নিয়ে অর্পণ বলল, যে-সমাধান আপনি দেবেন, তাতে কি মনের ভারি ভাবটা সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবে?

সঙ্গে সঙ্গে কি আর রেজাল্ট পাবেন, মি. মিত্র? কিন্তু রেজাল্ট আসে। আর সে চেঞ্জ আপনি বুঝতে পারবেন আপনা থেকেই।

ফিল-গুড ভাবটা ক্রমশই ছড়িয়ে পড়ছে। বুঝতেও পারছে অর্পণ। প্রথমে ভেবেছিল, কোনও জ্যোতিষের কাছে যাবে। টিভি খুললেই তিন মিনিটে কালসর্পদোষ, ব্যাংদোষ, টিকটিকিদোষ কাটানো হয়। স্ক্রিনের নীচের ফোন নাম্বারে ফোন করলেই এদের চেম্বারে। সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র-সূর্য এদের হাতের মুঠোয়। জ্যোতিষির ডিগ্রিতে সব এক একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী আর ত্রিকালজ্ঞ। অর্ণবকে বলতেই চোখ কপালে তুলে বলেছিল, কাউকে বলিস না, অ্যাড এজেন্সিতে এই পদে চাকরি করিস। বিজ্ঞাপন এখন তোকেই টুপি পরাচ্ছে! ভাবতে পারি না।

তখন আর কথা এগোয়নি। এখন মনে হচ্ছে অর্ণবের কথা শুনে একদম ঠিক করেছে। চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বলল, ওকে। কিন্তু সলিউশনটা কী?

কিছু না। ছোট্ট একটা কনফেশন।

কনফেশন! কার কাছে? ভ্রূ কুঁচকে গেছে অর্পণের।

হেসে ফেলেছেন ডা. চ্যাটার্জি। নট সো ফাস্ট। কারও-র কাছে না। নিজের কাছে। কেউ থাকবেও না।

মানে?

খুব সহজ মি. মিত্র। নিজের ভেতরে যদি কোনও পাপবোধ থেকেও থাকে, তা খুঁড়ে, তুলে ফেলে দিন স্ট্রেট…

সেটাই তো বলছি। মানে…

দেখুন, আপনি নিশ্চয় চার্চে কনফেশন বক্স দেখেছেন।

হুঁ….

উলটো প্রান্তে একজন পাদরি বসে থাকেন। কিন্তু তাঁর কাজ হল শুধু শুনে যাওয়া। অনেকেই বলে, তা করে তারা রিলিফ পেয়েছে।

তাহলে কি চার্চে, বিভ্রান্ত লাগছে অর্পণের।

না, না। আসলে নিজের ভেতরের কথাগুলো আপনি কোনও দিন কাউকে পুরোটা বলেননি। সেটাই নিজে এবার একটা কাগজে পুরো লিখে ফেলুন।

এক মিনিট। আপনাকে তো…

সরি, মি. মিত্র, আমাকেও আপনি পুরোটা বলেননি। ইনফ্যাক্ট বলতে পারছেন না। তাই বলছি, লিখে ফেলুন পুরোটা।

হ্যাঁ, তারপর?

সিম্পল। কোনও ভরা পূর্ণিমার রাতে, যখন কেউ দেখছে না সেটাকেই কুচিয়ে টুকরো করে চোখের সামনে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিন। এ টুকুই। দেখবেন, অনেকটা রিলিভড হয়ে যাবেন।

সত্যি কি এটা হতে পারে? এর কোনও সাযে্নটিফিক জাস্টিফিকেশনই তো নেই।

সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারের সব সলিউশন, বিজ্ঞান মেনে হয় না মি. মিত্র। একবার ট্রাই করুন শুধু। ডা. চ্যাটার্জি হাতে হাত রেখে মৃদু চাপ দিয়েছেন। টলে যাওয়া বিশ্বাসটা আবার দৃঢ় হচ্ছে। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করল অর্পণ, কিন্তু মুন লাইটই কেন?

মুন ইজ আ লাভ সিম্বল। চাঁদের আলোর একটা ম্যাজিকাল পাওয়ার আছে।

ওকে, কবে করতে বলছেন এটা? কাল বাদ পরশুই কিন্তু পূর্ণিমা আছে। মোবাইল খুলে বং ক্যালেন্ডার-এ ইতিমধ্যেই দেখে নিয়েছে অর্পণ।

দুচোখ বুজে কী যেন ভাবলেন ডা. চ্যাটার্জি। তারপর বললেন, পরে করতে গেলে আবার বেশ কিছুদিনের অপেক্ষা। কামিং ডেটটাই কাজে লাগান।

একটা কথা, একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল অর্পণ, বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা বেশ সিক্রেট। এটা নিশ্চয়ই ডিসক্লোজ হবে না কোনও ভাবেই?

শুনুন মি. মিত্র, কোনও কাউন্সেলরই এক জন পেশেন্ট-এর কেস হিস্ট্রি অন্যের সঙ্গে শেয়ার করে না। নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

থ্যাংক ইউ। পেছনের পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটা বের করে আনে অর্পণ।

 

তোফা দুপুরের ঘুমের পরও আলিস্যি ভাবটা ছেড়ে যাচ্ছিল না। রোববার মানেই শেষ তিন মাসে পাতলা খাসির মাংসের ঝোল আর ভাত। শেষ পাতে একটু টক দই। ঘুম ঘুম ভাবটা খাবার টেবিলেই ফিল করে অর্পণ। নতুন ফ্ল্যাট-এর ইএমআই-এর সময় যত এগিয়ে গেছে, তত বেশি করে এই অলস ভাবটা ঘিরে ধরেছে। উত্তরপাড়ায় জিটি রোড গঙ্গার কোল ঘেঁসে এই ফ্ল্যাট। এক দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেছিল। সে সময় ওর বয়স আঠাশ। কোম্পানি চেঞ্জ করে বহুজাতিকে যোগদান করে, ডিজাইনার হিসেবে তখনই ঈর্ষণীয় পে-স্কেলে চলে গিয়েছিল। আর এখন তো উন্নতির চরমসীমায়।

অ্যাড-এর ফিল্ডে অর্পণ মিত্রকে সমস্ত ক্লাযে্নট এক ডাকে চেনে। গ্র‌্যাজুয়েশনের পর পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েশন না করে স্পেশালাইজড কোর্স করতে গোঘাট থেকে সোজা কলকাতায়। একেবারে রেসিডেন্সিয়াল। দুবছর পর ক্যাম্পাস থেকেই একটা মোটামুটি কোম্পানিতে। দেশের বাড়িতে আর ফিরলই না। বছর তিনেক গড়িয়াতে দুজনের সঙ্গে ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকা। গোঘাটে দাদার সংসারে বাবা-মা থাকলেও, বেশ কয়েবার কাটিয়ে গেছে এখানে।

ঘরে ঢুকে বক্স খাটের পাশের ড্রয়ারের উপরে বিকেলের চা রাখল ঐশিকি। এই তিনমাসে দুপুরে অন্তত ছুটির দিনে তাকে ঘুমোতে দেখেনি অর্পণ। প্রচণ্ড হেলথ কনশাস বলেই কি ঘুমোয় না! তিন মাসের নব বিবাহিত জীবনে, এখনও জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি। চায়ের গন্ধের সঙ্গে ঐশিকির লম্বা চুলের শ্যাম্পুর গন্ধটাও মিশে যাচ্ছে। একটা ইচ্ছে চাগাড় দিচ্ছে। চোখ খুলে দেখলেও এখনই কাছে টানাটা বোধহয় ঠিক হবে না।

সদ্য ঘুমিয়ে উঠেছে। বাসি গন্ধ, মাথা চাড়া দিল যেন। উঠে বসে চা বিছানায় নিল। খোলা ব্যালকনিতে চলে গেছে ঐশিকি। এ সময়টায় ওর বাড়ি থেকে মা বা বাবা কেউ একজন ফোন করে। চোখ সরিয়ে রাখল ড্রেসিং টেবিলের আয়নায়। পুরুষ্ট গোঁফে আর একটু বেড়ে ওঠা ভুঁড়িতে, সুখের ঝলক নাকি স্বামী হয়ে ওঠার আদল প্রকাশ পাচ্ছে!

চা খেয়ে আলিস্যি ভাবটা যাচ্ছে না। আজ রাতে কী করবে ভাবতেই বুকে শান্তির হাওয়া। একটা বোঝা নামিয়ে হালকা হওয়া।

চা শেষ করে চিত হয়ে শুল অর্পণ। স্যান্ডো গেঞ্জিটা উঠে গেছিল। নামিয়ে নিল পাজামার উপর ঠিক ঠাক। সুখের উড়ানকে সারা জীবন ধরে রাখতে চেয়েছে। এমনকী সুদেষ্ণার সঙ্গে কাটানো সময়ে তো তার ব্যতিক্রম হয়নি।

স্কুল বা কলেজে কারও-র সঙ্গে ক্রাশ হয়নি। প্রফেশনাল ইনস্টিটিউটে যখন এসে বলেছিল, রীতিমতো মুখ টিপে হাসাহাসি হয়েছিল। হোস্টেলে অলক বলেছিল, তোরা মফস্সল বা একটু ভিতর দিকের ছেলেরা কেমন যেন একটু বাড়তি চাপা প্রকৃতির হোস। গ্রাম শব্দটা যেন ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাওয়া।

ভ্রূ কুঁচকে অর্পণ বলেছিল, আর তোরা সিটির লোকেরা সত্যি কথা বলে যে ডিক্সনারিতে কিছু হয়, তা বোধহয় বিশ্বাসই করিস না।

অলক চোখ গোল্লা করে বলেছিল, তুই কিন্তু অন্যরকম। আগ লাগা দেগা তু।

তো আগুনই লেগেছিল। সে আগুন যে কী কী পোড়ায়, বুঝতে সময় লাগেনি। ইনফরমাল কমিউনিকেশনের চতুর্থ ক্লাসেই চোখ গেছিল অর্পণের। হ্যাঁ, তবে উপরের ঠোঁটের এক সেমি উপরের তিলটায়। পাশের ডেস্কে বার বার ঘাড় ঘোরাচ্ছিল বলে অলক এক সময়ে ফিসফিসিয়ে বলেও ছিল, পুরো ম্যাডোনা তো রে। ঠোঁটে হাসি চলে এসেছিল।

ক্লাস শেষ করেই সিনেমাটোগ্রাফিক বিস্ফোরণ। তবে ম্যাডোনা না, সুচিত্রা সেন টাইপ। এগিয়ে এসে একেবারে মিসাইল, সোজাসুজি কারও-র সম্পর্কে কিছু বলতে না পারাটা হিপোক্রেসি। বুঝতে পারছিস?

ঠোঁটে হাসিটা রেখে বলে উঠেছিল অর্পণ, ফ্যাকাল্টির সামনে তোর তিল নিয়ে আলোচনা করলে ভালো লাগত?

বাঃ! স্মার্টনেসের তো অভাব নেই।

অভাব কেন হবে। আশির দশকের কেবলু বাংলা সিনেমার নায়ক আর কোথায় পাবি এখন!

সুদেষ্ণা পাত্তা না দিয়ে চলে গেলেও, অলক পিঠ চাপড়ে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় বলেছিল, তেরা হোগা গুরু।

সত্যিই হয়েছিল এবং এগিয়ে গিয়েছিল একটু দ্রুত গতিতে। প্রথম প্রেম আর তার ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া, ভিক্টোরিয়ার মাঠ থেকে লেকের ধার সুদেষ্ণার সঙ্গে সে সম্পর্ক এগিয়েছিল চোখের পলকে। সিনেমার হলে একই ফাউন্টেনে চুমুক, লাইব্রেরিতে স্টাডিনোট লোড করা বা গড়িয়াহাটের ফুট ধরে হাঁটা হু হু করে কেটে গেছিল দিনগুলো। একই গতিতে শেষ হয়েছিল কোর্সের বছর দুটোও।

অর্পণের মনে হয়েছিল ছেদ পড়তে এবার বাধ্য, কারণ সুদেষ্ণা বর্ধমানে নিজের বাড়িতে ফেরার কথা বলছিল। ঠিক সেই সময় অর্পণের হঠাৎ চাকরি। আর সুদেষ্ণার আবার একটা স্পেশাল কোর্সে ভর্তি হওয়া।

 

চব্বিশে চাকরি কি অর্পণকে বেপরোয়া করে দিয়েছিল? ছুটির দিনে নতুন কেনা বাইকে বোম্বে হাই রোড ধরে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়া বা বাইকে রাতের কলকাতা আবিষ্কার ওর আর সুদেষ্ণার। এ ছাড়াও বন্ধুদের অনুপস্থিতিতে ভাড়ার ফ্ল্যাটে সুদেষ্ণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া।

অফিসিয়ালি দাঁড়ি টানলাম, এই জাতীয় কথা কোনও দিন ওরা পরস্পরকে বলে, সম্পর্ক থেকে বেরোয়নি। কেউ কোনও দিন কাউকে পরে ফোন করে বা দেখা করে কৈফিয়তও চায়নি। সেটা সম্পর্কের চোরাটানের মৃত্যু হতে পারে বা, দুজনের ইগো ফ্যাক্টর হতে পারে। এমনকী নিজের তরফে ঠিক কী, সেটাও নিশ্চিত করে অর্পণ বলতে পারে না। মনের গভীরে স্মৃতি থেকে যাওয়াতেই কি কোথাও পাপবোধ! প্রথম কয়েক মাস ব্যস্ত রুটিনের ফাঁকেও মনে হতো, একবার যোগাযোগ করলে কেমন হয়। তারপর একদিন সেখানেও ধাক্কা।

ছোটোখাটো মনোমালিন্য ওদের মধ্যে হলেও তা দীর্ঘস্থাযী হতো না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ম্যানেজ করে নিত সুদেষ্ণাই। তাই কোনও দিন সেভাবে ওর মুখ গম্ভীর দেখেনি। স্পেশাল কোর্স শেষের ঠিক একমাস পর এলগিন রোডের এক ক্যাফেতে রবিবারের দুপুরে হাজির হয়ে দেখতে পেয়েছিল গম্ভীর মুখ। বাইরেও আকাশের মুখ ভার। অসাধারণ সুন্দর মিউজিকের সঙ্গতেও দুকাপ ব্ল্যাক কফি শেষ হয়েছিল নিঃশব্দে।

এই ক্যাম্পাস ইন্টারভিউটা ক্র‌্যাক করতে পারলাম না। অথচ পোস্টিং কলকাতাতে ছিল, আর প্যাকেজও ছিল অ্যাট্রাকটিভ। সুদেষ্ণা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছিল নীচের ঠোঁট।

মৃদু কাঁধ ঝাঁকিয়েছিল অর্পণ, তো?

তো কিছুই নয়। দিল্লিতে একটা এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করেছি। ওরা ইন্টারেস্টেড। এক সেকেন্ড থেমে সুদেষ্ণা যোগ করেছিল, আমিও।

সোজা হয়ে বসেছিল অর্পণ, ভালো খবর। কিন্তু কলকাতাতে আরও দুএকটা ট্রাই করলে হতো না?

ইনস্টিটিউটে শর্মা স্যার বলছিলেন, দিল্লির অফারটা নিয়ে নেওয়া উচিত। ওদের নাকি প্রোমোশনাল ক্যাম্পেনিং স্টাইলটা গোটা ইন্ডিয়ায় খুব খাচ্ছে। আর আহমেদাবাদ আইআইএম-এর দুজন প্রাক্তন মিলে অফিসটা খোলায়, শেখার স্কোপটা বেশি হবে।

অন্যমনস্ক হয়ে খালি কফি কাপটা একবার নাড়াচাড়া করে অর্পণ বলেছিল, ও, তাহলে তো ডিসিশন নিয়ে নিয়েছিস।

এভাবে ভাবছিস কেন, যে-কোনও অবস্থাতেই কলকাতা ফিরে আসতে পারি। আরও অনেক বেটার এক্সপেরিযে্ন্স নিয়ে। অফিসের দুদুটো অ্যাসাইনমেন্ট একসঙ্গে চলতে থাকায় রাতের ফোন ছাড়া সে সপ্তাহে দেখা করা হয়ে ওঠেনি। বর্ধমানে নিজের বাড়ি ফিরে গিয়েছিল সুদেষ্ণা। দিল্লি যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে ওর বাবা-মা ছাড়তে এসেছিল। আগে থেকে কোনও পরিচয় না থাকায় সামনে যেতে বেশ অস্বস্তি হয়েছিল।

দিল্লিতে সেটলড হয়ে ফোনে বেশ কয়েবার কথা হয়েছিল। সে ফোনও কমে আসছিল তিন-চার মাস পর। তারপর দুদুটো নম্বর অস্তিত্বহীন।

শোক করেনি অর্পণ। নিজের প্রেমের নির্লিপ্তিতে নিজেই কিছুটা অবাক হয়েছিল। কিন্তু ভাবার এত সময় ছিল না। নিজের কেরিয়ার গ্রাফ রোজই লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছিল। কোম্পানি চেঞ্জ করে সাধারণ বেসরকারি অফিসে চাকরি থেকে অনেকগুনে বেশি রোজগার মোটেও মাথা ঘুরিয়ে দেয়নি। দুবছরের মাথায় ফ্ল্যাট নিয়ে পরের ছবছর শুধু তার ইএমআই গুনে গেছে নিঃশব্দে।

১৮ লাখের টু বি এইচ কে ফ্ল্যাটে উঠে এসে প্রথম প্রথম উত্তরপাড়া থেকে হাওড়া ডেলি প্যাসেঞ্জারির যুদ্ধটা বাদ দিয়ে বাকি সবকিছুই ভালো লাগত। রাতে ফ্ল্যাটে একা থাকার পীড়া যে-একেবারেই দেখা দেয়নি তা নয়। কিন্তু ক্লান্তি খুব দ্রুত ঘুমের পৃথিবীতে নিয়ে গিয়ে ফেলত।

এ রকম অবস্থাতে ছটা বছর কেটেছিল অনেকটা যান্ত্রিক ভাবে। নতুন করে কারও-র সঙ্গে জড়ানোর সময় ছিল না। ছুটির দিনে বাজার, গোছগাছ, রান্নার লোককে বুঝিয়ে দেওয়া আর বাকি সময়টা ল্যাপটপে প্রোজেক্ট ডিজাইন। গোঘাট থেকে বউদি আর মায়ের অনবরত ফোন ভেসে আসছিল।

বিয়ের প্রস্তাবে খুব বেশি চমকায়নি। হিসেব কষে দেখেছিল ফ্ল্যাটের ঋণশোধে বাকি আর সাত বছর। ইনক্রিমেন্ট স্টেডি রেটে বাড়ছে। জিডিপির লোয়ার গ্রোথের দাঁত ওদের ইন্ড্রাষ্ট্রিতে কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। শরীর-মন একযোগে বলে উঠেছিল বিয়ের এটাই সঠিক সময়। আর তা ছাড়া এতগুলো বছর অন্য কারও-রও তো মনে পড়েনি। সুতরাং দায়ের প্রশ্ন আসছে না বোধহয়। আর নিশ্চিত সমাধান তো এবার হাতের কাছেই।

চন্দননগরে ঐশিকিদের বাড়িতেই ওকে প্রথম দেখা। মোটামুটি খবর নেওয়ার পর মনে হয়েছিল পারফেক্ট চয়েস। বাংলায় অনার্স গ্র‌্যাজুয়েট। তবুও বাইরে দুতিনবার মিট করে নিয়েছিল। লম্বা চুল, হাইট, রং-এ জোরদার লাগলেও, সুদেষ্ণার সঙ্গে তুলনায় যায়নি। চন্দননগর ষ্ট্র‌্যান্ডেই রবিবারের এক সন্ধেতে জিজ্ঞাসা করেছিল ঐশিকীকে, ওর অতীত জীবনের কথা। কোনও পাস্ট অ্যাফেয়ার, এ বিয়েতে রাজি কিনা, ছোটো ছোটো প্রশ্নে জানার চেষ্টা করেছিল।

ঐশিকির সোজা-সাপটা সরল উত্তরে কিছুতেই নিজের অতীতকে সামনে আনার সাহস দেখাতে পারেনি। বিয়ের পরে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তেও নিষ্কলঙ্ক ঐশিকীর আচরণে, নিজের অতীতকে বার বার গিলতে হয়েছে। একটা অ্যাফেয়ার কী করে অপরাধবোধে পরিণত হয়, ভেবে বের করতে পারেনি। অগত্যা ছুটে যাওয়া ডা. চ্যাটার্জির কাছে।

 

ঘুমানোর ভান করেই শুয়েছিল। একটা হালকা উত্তেজনা তো বটেই, দুপুরে ভালো রকম ঘুমের জন্যও ঘুম আসতে চাইছিল না। কাল খুব সকালে উঠে প্রোজেক্টের একটা কাজ ছকে নিতে হবে বলেছিল। তাই ঐশিকি আজ আর কোনও উষ্ণতা চায়নি। ভীষণ কম্প্রোমাইজিং আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং মেয়ে। সম্পর্কের সতেজতা আর স্নিগ্ধতা দুটোই সমান ভাবে মেনটেইন করতে পারে। এভাবেই তিন মাস অর্পণকে যেন অদৃশ্য হাতে জড়িয়ে ধরেছে।

মধ্য কুড়িতে সম্পর্ক উন্মাদনা খোঁজে হয়তো, মধ্য তিরিশে স্থিতাবস্থা। সংসারের বৃত্তে এ ভাবেই বোধহয় ঢুকে পড়তে হয়। আজকের রাতের পর নিশ্চই পুরোপুরি ঢুকে পড়বে। সন্ধেবেলা চেষ্টা করেছিল কিন্তু ঐশিকির চোখ এদিক ওদিক ঘোরে। বিশেষত ছুটির দিনে। মনে হয়েছিল রাতই সঠিক সময়।

রোজের মতো আজও ঐশিকি টয়লেটে উঠল। এসি অফ করল। মিনিট চারেক সময় ব্যয় করে টয়লেটে ও। এটুকু সময়ই যথেষ্ট। এক মিনিট অপেক্ষা করে উঠে পড়ল অর্পণ। ভাগ্যিস অ্যাটাচড্ বাথ নয়। মুখ বাড়িয়ে একবার দেখে নিল। টয়লেটের আলো জ্বলছে, জলও পড়ছে।

দরজা খুলে বেরিয়ে এল ব্যালকনিতে। নিজের ল্যাপটপে কম্পোজ করেছিল প্রায় তিন পাতার কনফেশন। প্রিন্ট আউটও বের করে রেখেছিল। দ্রুত হাতে ছিঁড়ে পাতাগুলো টুকরো টুকরো করে ফেলল। সামনে চাঁদের আলোয় ভরা গঙ্গা। দ্রুত হাওয়ায় বড়ো মায়াবী এ চরাচর। টুকরোগুলো হাত থেকে ছোড়ার আগের মুহূর্তেই, স্থির হতে হয়।

পাশের ঘরের জানালা দিয়ে উড়ে আসে প্রায় একই রকম কাগজের টুকরো। অসংখ্য। চমকে ঘাড় ঘোরাতেই পাশের জানালা থেকে সরে যায় ঐশিকির মুখ। হাতের ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলোকে এবার ছেড়ে দেয় অর্পণ। দুটো স্বীকারোক্তি প্রায় একইরকম হয়ে মিলেমিশে প্রবল হাওয়ায় চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, মিশে যায়। যেমন করে বসন্তের হাওয়া আর চাঁদের আলো মিশে যাচ্ছিল…

 

ভাঙা বনেদ

সুমির সঙ্গে অতনুর পরিচয় হয় একটি আর্ট গ্যালারিতে। পাঁচ মিনিটের আলাপেই দু’জনের মধ্যে বিজনেস কার্ড-এর আদানপ্রদানও সারা হয়ে যায়।

অতনুকে নিজের বিজনেস কার্ড-টা ধরাতে ধরাতে সুমি বলল, ‘এটা আমার কার্ড। এখানে আমার স্টুডিওর নামটা আর ঠিকানাটা দেওয়া আছে। আমার নিজস্ব ওয়েবসাইটও রয়েছে। ওখানেই আমার সব পেইন্টিং-এর ছবি রয়েছে এবং দামও দেওয়া আছে।’ কার্ডে দেওয়া লিংক-টাতে আঙুল রেখে সুমি অতনুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল।

‘হ্যাঁ, ভালোই হল। আমি আপনার সব পেইন্টিংগুলো দেখতে চাই। দেখা হলে টেক্সট ম্যাসেজ করে আপনাকে ফিডব্যাকটা জানিয়ে দেব। এমনিতে প্রায় শহরের কোনও আর্ট এগ্জিবিশন আমি দেখতে বাদ রাখি না, কিন্তু আপনার মতো শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হওয়ার সুযোগ কখনও হয়নি। আপনার প্রত্যেকটা ছবির যেন কোনও না কোনও বক্তব্য আছে। স্টাইলাইজড্ ফর্ম হলেও তা ভীষণভাবে মৌলিক। কার্ডটাতে চোখ বোলাতে বোলাতে অতনু সুমিকে নিজের বক্তব্য জানাল।

‘আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগল। স্টে ইন টাচ।’ সুমি হেসে উত্তর দিল। এই ছোট্ট আলাপে সুমির মনে হল, অতনুর মতো তার শিল্পের এত বড়ো অনুরাগী সারা পৃথিবীতে আর নেই।

পাঁচ মিনিটের বেশি অতনুর সঙ্গে কথা হয়নি কিন্তু গ্যালারিতে সুমির চোখ সর্বক্ষণ অতনুর দিকেই নিবদ্ধ রইল। অতনুর আকর্ষণ সুমি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছিল না। যতক্ষণ অতনু গ্যালারিতে রইল সুমির প্রত্যেকটা ছবি সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল এবং ছোট্ট একটা নোটবুকে অতনুকে কিছু লিখে রাখতেও দেখল। ছেলেটি শিল্পের কদর করতে জানে, এই একটা কথাই অতনুর হাবভাবে সুমির মনে হল।

এই ঘটনার পর প্রায় ছয় মাস কেটে গেছে। এর মধ্যে অতনু সুমিকে কন্ট্যাক্ট করার যেমন চেষ্টা করেনি সুমিও অতনুর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখেনি।

এই ক’মাসের মধ্যে ওয়েবসাইট থেকে সুমির মাত্র দুটো তিনটে ছবিই বিক্রি হয়েছে। সুমি নানা ভাবে নিজের ছবির প্রচার চালাবার চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। চেনা-অচেনা সুমি পরোয়া করেনি। নিজের ওয়েবসাইটের লিংক সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছে। সুমির একটাই লক্ষ্য– পেইন্টিংয়ের জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, নিজের জন্য একটা জায়গা বানানো। মানসিক এই চাহিদা পূর্ণ করার লক্ষ্যে সুমি অতনুকেও একটা মেসেজ করে, ‘আপনি যদি আজকে ফ্রি থাকেন তাহলে একসঙ্গে কফি খাওয়া যেতে পারে।’

পাঁচ মিনিটের মধ্যে অতনুর ‘ফ্রি আছি’ শব্দটা সুমিকে দ্বিধার মধ্যেই ফেলে দেয়। পাঁচ মিনিটের আলাপের পর দীর্ঘ ছ’মাসের বিরতি। আর আজ এতদিন পর সুমি নিজের দরকারে একটা মেসেজ পাঠাতেই সঙ্গে সঙ্গে কফি খাওয়ার জন্য আসতে রাজি! একটু অস্বাভাবিক নয় কি? সুমি, অতনুর হ্যাঁ-এর উত্তরে আর কিছু লিখল না মেসেজে।

‘পৃথিবী-টাই বড়ো অদ্ভুত’, মনে মনে বলল সুমি। ঘটনাটা মনের এক কোণায় সরিয়ে রেখে নিজের আসন্ন আর্ট এগ্জিবিশন নিয়ে সুমি মেতে উঠল।

হঠাৎই কাজের মধ্যে একদিন সুমির কাছে অতনুর ফোন এল, ‘হ্যালো সুমি, সেদিন আপনি কফি খাওয়ার জন্য ডাকলেও যে-কোনও কারণেই হোক প্ল্যান-টা ম্যাচিওর করেনি। চলুন একটা দিন ঠিক করে কফি শপ্-এ দু’জনে বসা যাক।’

‘কিন্তু আপনি আমাকে চেনেন না আর আমাদের পরিচয় মাত্র পাঁচ মিনিটের। দু’জন একে অপরের সম্পর্কে কিছুই জানি না প্রায়। সুতরাং একসঙ্গে বসে কফি খাওয়ার কোনও মানে নেই। আমি আমার কাজের জন্যই আপনাকে আগে মেসেজ করেছিলাম। এর অর্থ এটা ধরে নেবেন না যে, আমি আপনার সঙ্গে বে-ফালতু টাইম পাস করতে আগ্রহী,’ সুমির নিজেরই নিজেকে বড্ড রুড মনে হয়।

‘সুমি, আপনার আর্ট, আপনার শিল্পকলা আমাকে আকর্ষণ করে। আপনার শিল্পের গভীরতায় আমি মুগ্ধ। আপনার ছবিকে মাধ্যম করে আপনাকে চিনতে আমার কষ্ট হয়নি। এতে আপনার প্রতি আমার সম্মান দিনে দিনে বেড়েছে। একদিন দেখবেন আপনার সৃষ্টি আপনাকে তুমুল জনপ্রিয়তা দেবে। প্রতিটি খবরের কাগজে আপনাকে নিয়ে লেখা বেরোবে। এই জার্নিটায় আমি কি আপনার একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু হতে পারি না?’

নিজের প্রশংসা কার না ভালো লাগে? অতনুর কথাগুলোর প্রভাব পড়তে শুরু করে সুমির উপরে। অতনুর প্রশংসা বাক্যের সম্মোহনী শক্তি সুমিকে আকর্ষণ করতে থাকে অতনুর দিকে। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুমি অতনুর সঙ্গে কথা বলতে থাকে। মনের সুপ্ত বাসনাগুলো শিকড় মেলতে শুরু করে।

‘সুমি, তোমার সঙ্গে যত মিশছি, কথা বলছি, তোমার প্রতি সম্মান আমার ততো বাড়ছে। সারা পৃথিবীর মানুষ একত্র হলেও তোমার প্রতি আমার এই মনোভাব কখনও ভাঙতে পারবে না। কতদিন হয়ে গেল, তোমার সঙ্গে ফোনে কথা বলছি, অথচ এখনও একসঙ্গে বসে আমাদের কফি খাওয়া হল না,..’ প্রথম আড়ষ্টতা কাটিয়ে, অতনু এবার অনেকটা স্পষ্টবাক।

সুমির সব প্রতিরোধের দেয়াল মুহূর্তে ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রায় দিনই অতনুর সঙ্গে সুমির দেখা হতে থাকে। সামান্য পরিচয় গভীর বন্ধুত্বে পরিণত হয়। সুমি জানতে পারে অতনু বিবাহিত। ওর তিন বছরের একটি মেয়ে আছে। ওর স্ত্রী মীনাক্ষী কলেজে ইতিহাসের প্রফেসর। অতনু নিজে কোনও কাজ করে না।

‘আমার কাজ করার দরকারটা কী? আমার বাবা বিধায়ক ছিলেন, সারাজীবনে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন। আমিও বিধায়কের টিকিটের জন্য দরখাস্ত দিয়ে রেখেছি। আশা করছি এবার টিকিট পেয়েই যাব। হাজার-দু’হাজার টাকার চাকরি আমার জন্য নয়,’ গর্বের সঙ্গে অতনু সুমিকে বলে।

‘চাকরিতে যখন তোমার এতই ঘেন্না তাহলে মীনাক্ষীর মতো চাকুরিরতাকে কেন বিয়ে করেছ?’ সুমি জিজ্ঞাসা না করে পারে না।

‘মীনাক্ষীকে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু ওর ওই এক জেদ, চাকরি কিছুতেই ছাড়বে না। অথচ বিয়ের আগে ও আর ওর পরিবারের লোকেরা প্রমিস করেছিল বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দেবে। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর মীনাক্ষী এতটা বদলে যাবে বুঝতে পারিনি। চাকরি ছাড়তে কিছুতেই রাজি হল না। আসলে ওর কোনও ধারণাই নেই বিধায়কের বাড়ির বউয়ের চাল-চলন কীরকম হওয়া উচিত।’ আত্মগর্বে এবং অহংকারে অতনুর চোখদুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে।

অতনুর উত্তর শুনে সুমির মাথায় শঙ্কার ঘন মেঘ ঘনিয়ে আসে। সুমির কাছে সংকেত আসে, ভুল মানুষের সঙ্গে সে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু অতনুর প্রশংসা আর ওর বিধায়ক বাবার পরিচিতির বিশাল পরিধির মাঝে থাকতে পারলে সুমির লাভ বই ক্ষতি নেই– এই বোধটাই সুমিকে নিজের মনের বিপদের ঘণ্টাটাকে উপেক্ষা করেই অতনুকে আঁকড়ে ধরতে চায়।

একদিন কফি শপে কফি খেতে খেতে অতনু সুমিকে বলে, ‘মন্দিরের মূর্তির মতো আমি মনে মনে তোমাকে পুজো করি। আমি তোমাকে যা-যা বলি শুধু শুনে যেও তুমি, মনের মধ্যে রেখো না তাহলে কষ্ট পাবে। তবে এটাও ঠিক, আমি বিবাহিত, তোমার হাত ধরে লম্বা পথ পাড়ি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’

‘আমি জানি তুমি বিবাহিত। আমাদের সম্পর্ক নিয়ে আমি কোনও আশা রাখি না। কিন্তু এটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না যখন আমরা দু’জনেই জানি আমরা এই পথে বেশিদূর এগোতে পারব না, তখন মিছিমিছি এই ভাবে দেখা করার কী লাভ?’ সুমি জিজ্ঞেস করে।

‘তোমার প্রতিভা-কে সম্মান করি। তোমাকে সাফল্যের চূড়ায় দেখতে চাই। আমি তোমার কাছ থেকে কিছুই আশা করি না। শুধু ভালো বন্ধু হিসেবে তোমাকে সাফল্য পেতে সাহায্য করতে চাই। আসছে বছর থাইল্যান্ডে ফাইন আর্টস-এর একটা বড়ো প্রদর্শনী আছে। সেখানে যোগদান করার সব ব্যবস্থা করে দেব। তোমাকে ললিত কলা অ্যাকাদেমি স্কলারশিপও পাইয়ে দেব। আমার বাবার বড়োবড়ো কনট্যাক্টস আছে। সুতরাং তোমার জন্য এইটুকু করতে আমার কোনও অসুবিধে হবে না। তোমার দুটো-চারটে ইন্টারন্যাশনাল প্রদর্শনী হয়ে গেলেই দেখবে তুমি বিখ্যাত হয়ে উঠেছ।’

অতনুর কথা শুনে সুমি উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সুমির মনে হল ও বিখ্যাত হতে পারুক চাই না পারুক, অতনুর মতো মানুষ তার প্রশংসা করছে, এর চেয়ে বড়ো পাওয়া আর কী হতে পারে?

রোজই নানা ছুতোয় অতনু আর সুমির দেখা হওয়া শুরু হল। সুমি বুঝতে পারল তার প্রতি অতনুর ব্যবহারটা শুধু বন্ধুত্বে আটকে নেই। অতনু আরও কিছু চাইছে ওর কাছে। আগে দেখা হলেই পেইন্টিং সম্পর্কে আলোচনা হতো কিন্তু ধীরে ধীরে অতনুর কথার ধরন বদলাচ্ছে লক্ষ্য করল সুমি –

‘একটা জিনিস চাইব তোমার কাছে?’

‘কী?’

‘আমি তোমাকে পুরোপুরি পেতে চাই।’

‘একদমই না। এরকম ভুলভাল ইচ্ছা না হওয়াই ভালো।’

‘প্লিজ, শুধু একবার। জানো আমার কী মনে হয়?’

‘কি?’

‘মনে হয় তোমাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে সময়কে বরাবরের মতো থামিয়ে দিই। সময় নেই, অসময় নেই, চোখ খুলে বন্ধ করে সবসময় তুমিই আমার সমস্ত মন জুড়ে থাকো।’

সুমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। মুখে সে যতই বলুক, তার মন-ও তো এটাই চাইছিল। তার শুভবুদ্ধি তাকে সাবধান করা সত্ত্বেও সুমি তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই অতনুর বুকে নিজেকে সঁপে দেয়।

সর্প কুণ্ডলীর মতো অতনুর দুটো বাহু সুমিকে জড়িয়ে ধরে। সুমির মনে হয় কোনও গভীর অতল থেকে ভেসে আসছে অতনুর গলার স্বর, ‘সুমি আমি তোমাকে উচ্চতার শিখরে দেখতে চাই…’

সম্বিত ফেরে সুমির। নিজেকে অতনুর বাহুবন্ধন থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে অতনুকে অনুরোধ করে, ‘প্লিজ এবার আমাকে বাড়ি যেতে দাও। কাল সন্ধের মধ্যে আমাকে আরও দুটো পেইন্টিং শেষ করতে হবে।’

‘ঠিক আছে, যাও ছেড়ে দিলাম… কিন্তু প্রমিস করো কাল-পরশুর মধ্যে আবার দেখা করবে। এই সপ্তাহের শেষে তোমার সম্পর্কে বাবার সঙ্গে কথা বলব। ললিত কলা অ্যাকাডেমির স্কলারশিপটা নিয়ে তাড়াতাড়ি এগোনো দরকার।’

দু’দিন বাদেই অতনু আর সুমি ওদের পছন্দের কফি শপে মুখোমুখি হল। আগের দিনের প্রচণ্ড বৃষ্টির পর সকালের নরম রোদ্দুরে গা ভাসাতে ইচ্ছে করছিল সুমির। অতনুর ফোনটাও এসেছিল সময় বুঝে। রেস্তোরাঁর নিমন্ত্রণটা সুমি তখনই পেয়েছিল। ভাবার জন্যে এক মুহূর্তও নষ্ট করেনি। কফি খেতে খেতে অতনু বলল, ‘চলো পাশের পার্কটাতে কিছুক্ষণ সময় কাটাই। আজ দিনটা বেশ ভালো। কাল বৃষ্টি হওয়াতে গরম নেই বললেই চলে।’

পার্কের বেঞ্চিতে পিঠ এলিয়ে দিয়ে অতনু সহজ হবার চেষ্টা করে। ‘সুমি আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি। একথা আমরা দুজনেই আর অস্বীকার করতে পারি না। মনের বন্ধন যেখানে আছে, সেখানে শরীরকে শাসন করতে চাইছ কেন?’

সুমি চুপ থাকতে পারল না। উত্তর দিল, ‘তুমি ঠিক কী বলতে বা বোঝাতে চাইছ অতনু?’ যদিও অতনুর ইচ্ছা দিনের মতোই পরিষ্কার ছিল সুমির কাছে তবুও না বোঝারই ভান করল সুমি।

আমার এই ইচ্ছে নতুন তো কিছু নয় সুমি। তুমি জানোই যে আমি বিবাহিত এবং শহরে বাবার একটা সম্মান আছে সুতরাং এই সম্পর্কটাকে কোনও পরিণতি দেওয়া হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তোমার সঙ্গে যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তাতে আরও কিছু পাওয়ার অধিকার কি আমার নেই?’

কোনওরকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার আগেই অতনু সুমিকে টেনে নিয়ে একটা মোটা গাছের গুঁড়ির আড়ালে চলে গেল। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই সুমি টের পেল অতনুর তপ্ত নিঃশ্বাস ওর মুখের উপর এসে পড়ছে। তার নিজের ঠোঁটের উপর অতনুর ঠোঁট এসে প্রতিরোধের সব ক্ষমতা সুমির লুপ্ত করে দিল। সমস্ত শরীরময় অতনুকে অনুভব করছিল সুমি অথচ কোনও প্রতিরোধ কাজ করছিল না।

নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এসে সুমি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুদিন ধরে নিজের আঁকা আর অতনুকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে যে ফ্ল্যাটটা অগোছালো হয়েই পড়ে আছে। আজ পরিষ্কার না করলেই নয়। সুমির মা-বাবা নিজেদের পৈত্রিক বাড়িতেই থাকেন শহরের উত্তর অংশে নিজের অন্য ভাইদের সঙ্গে। মেয়ের কাজের সুবিধার জন্য ছোট্ট ফ্ল্যাটটা সুমির বাবাই সুমিকে কিনে দিয়েছেন।

ফ্ল্যাটটা গোছগাছ করে সুমি বিছানায় এসে বসল। আজ অনেক দিন বাদে নিজের বিবেকের সম্মুখীন হওয়ার সুযোগ ঘটল সুমির। পার্কে সময় কাটিয়ে অতনুই নিজের গাড়িতে সুমিকে ফ্ল্যাটে নামিয়ে দিয়ে এসেছিল। অবধারিত ভাবে দুটো প্রাপ্ত বয়স্ক শরীর ডুবে গিয়েছিল, ভেসে গিয়েছিল, পূর্ণতার লক্ষ্যে। অতনুর সঙ্গে তার এই সম্পর্কটার কী নাম দেওয়া যেতে পারে? সুমি ভালো করেই জানে অতনুর সঙ্গে যে রাস্তায় সে পা বাড়িয়েছে তাতে কিছু পাবার আশা নেই বরং চারিদিকে ধূ ধূ করছে প্রান্তর। মুখ লুকোবার কোনও জায়গা নেই। কী করবে সুমি ভেবে স্থির করতে পারে না। সব জেনেশুনে অতনুকে বেছে নেওয়াটা কি সুমির নিয়তি না দুর্বলতা– মনে হতে থাকে সুমির।

অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা সুমির মস্তিষ্কে ভিড় করে আসে। প্রায় দুই বছর হতে চলল সুমি আর অতনুর বন্ধুত্বের। সত্যিই কি অতনু ওকে একজন বড়ো শিল্পী ভাবে? আদৌ কি ওর জন্য অতনুর মনে কোনও সম্মান আছে? অতনু কি সত্যিই কোনওদিন একজন সত্যিকারের বন্ধুর মতো ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে? মুখে যা-ই বলুক, কাজে সেটা সফল হতে এখনও দেখেনি সুমি। এই দুই বছরে সুমির জন্য ও কী চেষ্টা করেছে? কিছুই তো না।

প্রশ্নের বোঝা মাথায় নিয়েই সুমি ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে। পরের দিনও সুমির, ফ্ল্যাটের বাইরে পা রাখতে ইচ্ছে করে না। রাত্রের প্রশ্নগুলোই ঘুরেফিরে সুমির মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। এমন নয়তো উচ্চাশাকাঙক্ষী হতে গিয়ে অতনুর কামনার একটা মাধ্যম হয়ে উঠছে সে? উত্তর জোগায় না। এই দু’বছরে সুমি অতনুকে নিয়ে এতটাই মেতে ছিল যে সুমির অন্য বন্ধুরা ওর থেকে দূরে সরে গেছে। ফ্ল্যাটে একা বসে বসে সুমির পুরোনো স্মৃতি, ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়তে থাকে। শেষমেশ সব গ্লানি, অপরাধের বোঝা ঝেড়ে ফেলে সুমি, বান্ধবী শ্রেয়ার বাড়ি যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নেয়।

‘অনেক দিন পর সুমি, কী ব্যাপার? কোথায় ছিলি এতদিন? তোর কোনও খবরই কারও কাছে ছিল না? শ্রেয়ার বাড়ির দরজাতেই সুমিকে দেখে শ্রেয়ার মা এক নিঃশ্বাসে প্রশ্নগুলি করে গেলেন। সামান্য হাসি টেনে ঘরের ভিতরে ঢুকতেই সুমিকে উনি জড়িয়ে ধরলেন। ওনার আন্তরিকতা সুমির চোখের পাতা ভিজিয়ে তুলল।

‘মাসিমা, কয়েকটা বড়ো পেইন্টিং প্রোজেক্ট নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম, তাই সময় করে উঠতে পারিনি। তবে একটা দিনও এমন যায়নি, যখন আপনাদের কথা আমার মনে পড়েনি,’ রুমাল দিয়ে চোখের কোণটা মুছে নেয় সুমি।

‘চল, ভালোই হল সুমি। এতদিন পরে হলেও তো এসেছিস। কী খাবি? শরবত নাকি গরম কিছু? হাত ধরে সুমিকে সোফায় বসাতে বসাতে শ্রেয়ার মা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘কিছু খাব না মাসিমা, শুধু বলুন শ্রেয়া কোথায়… ওকে তো কোথাও দেখছি না।

‘এতদিন পর এসেছিস, কিছু তো খেতেই হবে। আর ততক্ষণে শ্রেয়াও চলে আসবে। ওর আজকে একটা বড়ো অনুষ্ঠানে সেতার বাজাবার প্রোগ্রাম আছে। প্রোগ্রামটা নিয়ে ও খুব আশাবাদী। কয়েক মাস ধরে এটা নিয়েই লেগে ছিল,’ মেয়ের প্রতিভার উপর গভীর আস্থা ফুটে ওঠে শ্রেয়ার মা-র স্বরে।

‘আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এত বড়ো একটা সুযোগ পেয়েছে আর আমি কিছুই জানি না,’ ভাবতে ভাবতে গ্লানিতে সুমির মন ভরে ওঠে।

গল্প করতে করতে কখন এক ঘণ্টা কেটে গেছে সুমি টের পায়নি। কলিংবেলের আওয়াজে দু’জনের ঘোর ভাঙে। শ্রেয়ার মা দরজা খুলতেই ঝড়ের গতিতে শ্রেয়া ঘরে ঢুকে মা-কে জড়িয়ে ধরে। শ্রেয়ার চোখমুখ উৎসাহ, উদ্দীপনায় জ্বলজ্বল করছে।

‘মা, মা… আজ আমার প্রোগ্রাম দারুণ হয়েছে। জানো অনুষ্ঠান চলাকালীন কী হয়েছে?’ খুশি উপচে ওঠে ওর চোখে-মুখে। মা-কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে ওঠে, ‘মা, আজকে প্রোগ্রামে এখানকার একজন এমএলএ, পরিবারের সঙ্গে এসেছিলেন প্রধান অতিথি হিসেবে। জানো ওদের আমার বাজনার হাত এত ভালো লেগেছে যে ওনার ছেলে অনুষ্ঠানের শেষে আলাদা করে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। ছেলেটি আমাকে বলে যে, আমার বাজনার হাত নাকি এতটাই ভালো যে একদিন আমি রবিশঙ্করের মতোই নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করতে পারব। ছেলেটি ওর বাবার সঙ্গেও কথা বলবে, যদি কোনও স্কলারশিপের ব্যবস্থা আমার জন্য করা যায়।

কথা শেষ করতেই শ্রেয়ার দৃষ্টি পড়ল সুমির উপর। আনন্দে লাফিয়ে উঠে, সুমিকে জড়িয়ে ধরল শ্রেয়া। অনেক কষ্টে সুমি মনের ভাবটা মুখে প্রকাশ হতে দিল না। কিন্তু তার বিশ্বাসের বনেদটা ক্রমশ ভেঙে চৌচির হতে থাকল, অতনুর স্বরূপটা জানতে পেরে। শ্রেয়া কিছু বলার আগেই সুমি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না, খালি মনে হচ্ছিল কতক্ষণে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরবে। শুধু সুমির মনে তোলপাড় হচ্ছিল, অতনুর সঙ্গে ওর দুই বছরের সম্পর্কে এটাই কি তার প্রাপ্য?

‘শ্রেয়া, প্লিজ আজকে আমাকে বাড়ি যেতে দে। শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। একটু বিশ্রাম করলে মনে হচ্ছে ঠিক হয়ে যাবে। আর এক দিন আসব তোর কাছে। জমিয়ে গল্প করব সেদিন দু’জনে,’ কোনওমতে সুমি বলে।

‘ঠিক আছে, তোর মুখটা কেমন যেন রক্তশূন্য হয়ে গেছে। বিশ্রাম নিলেই মনে হয় ঠিক হয়ে যাবে। তোকে আমি আটকাব না, সাবধানে যেতে পারবি তো?’ শ্রেয়ার চোখে-মুখে সুমির জন্য চিন্তা ফুটে ওঠে।

রাতের শহরে স্ট্রিট লাইটগুলোর আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বাসের বদলে ট্যাক্সি নিয়েছে সুমি। পিঠটা ট্যাক্সির সিটে এলিয়ে দিয়েছে, তবু যেন স্বস্তি পাচ্ছে না। উঠেই ড্রাইভারকে গন্তব্য জানিয়ে গুছিয়ে বসেছে ও। চিন্তাগুলো গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। দুই বছরের ছায়া ছায়া অন্ধকার হারিয়ে গেছে। অতনুর ব্যক্তিত্বের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কামুক পুরুষটাই ক্রমশ সুমির চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ছে। যে নিজের বিবাহিত স্ত্রীকে, কলেজের প্রফেসর হওয়া সত্ত্বেও নিকৃষ্ট মনে করতে পারে, তার কাছ থেকে অন্য নারীরা সম্মানের আশা রাখবে কী করে? এই ধরনের লোক কারও প্রতিভার কদর করতেই পারে না। সুমির মনে হল যেটুকু নামডাক ওর হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টাতেই। অতনুর কোনও অবদান সেখানে নেই।

সুমি আর অতনুর পরিচয়ের শুরুটাই ভুল ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যতগুলি অধ্যায় ওর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, ভ্রান্তি আরও বেড়েছে, সম্পর্কের ধাপগুলিতে মলিনতা আশ্রয় পেয়েছে। মনের আয়না কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় সুমি, অতনুকে চিনতে ভুল করেছিল, কিন্তু কুয়াশা সরতেই চেহারা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে তার কাছে। অতনু এসেইছিল সুমিকে টেনে অন্ধকারের অতলে নিয়ে যেতে, উচ্চতার শিখরে নয়। এরপরেও যদি সম্পর্ক এগোতে থাকে তাহলে তা আরও ঘৃণ্যতর হয়ে উঠবে। সুতরাং এখানেই তা শেষ করা দরকার। সুমির পাড়া কাছাকাছি এসে পড়েছে। খুব ঠান্ডা মাথায় ড্রাইভারকে নির্দেশ দিয়ে সুমি ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বার করল। মনে মনে অতনুর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করার বিষয়ে এখন সে নিশ্চিত। মোবাইল অন করে অতনুর ফোন নম্বরটা ব্লক করে দিল সুমি। জীবনটা এবার নতুন করে গুছিয়ে নিতে হবে।

 

অসত্য

সুচন্দ্রা এই পাড়ায় নতুন নয়। সেই নয় বছর বয়সে মা-বাবার হাত ধরে এই পাড়াটায় প্রথম পা রেখেছিল সে। প্রথম প্রথম বন্ধু বলতে কেউ ছিল না। খুব খারাপ লাগত সুচন্দ্রার। স্কুল থেকে ফিরে খেলার সঙ্গী বলতে কেউ ছিল না।

ধীরে ধীরে একই পাড়ার ঘোষ পরিবারের সঙ্গে সুচন্দ্রার মা-বাবার আলাপ-পরিচয় গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে সুচন্দ্রাও ওদের বাড়িতে যাতায়াত আরম্ভ করে। ওর প্রধান আকর্ষণ ছিল ঘোষদের ছোট্ট ছেলেটা। কীরকম ফুটফুটে পুতুলের মতো। ওর থেকে বয়সে চার বছরের ছোটো। সবে সবে সুচন্দ্রার স্কুলেই ভর্তি হয়েছিল। নাম অনির্বাণ। বড়োদের সবার দেখাদেখি সুচন্দ্রাও ওকে ‘অনি’ বলেই ডাকত।

মা শিখিয়ে দিয়েছিল সুচন্দ্রাকে যে, অনি-ই সুচন্দ্রার ছোটো ভাই, তাই অত কম বয়সেই সুচন্দ্রা অনি-র অনেকটা দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল।

স্কুলে অনি যতক্ষণ থাকত সুচন্দ্রা ওকে চোখে চোখে রাখত। একটা ক্লাস শেষ করেই দৌড়ে এসে ভাইকে দেখে যেত। ভাইয়ের ছুটি আগেই হয়ে যেত। স্কুল থেকে ফিরেই সুচন্দ্রা চলে যেত ঘোষদের বাড়ি। সারাটা বিকেল ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতে সময় কেটে যেত সুচন্দ্রার। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়লে সুচন্দ্রা বাড়ি ফিরে আসত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দু’জনে একসাথে বড়ো হতে থাকে। কিন্তু একে অপরের প্রতি স্নেহ ওদের এতটুকুও কম হয় না। অনির্বাণ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বেঙ্গালুরু চলে যায়। আর সুচন্দ্রা কলকাতাতেই থেকে যায়। ও কলকাতার মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে নিজেরই এক সহপাঠীকে বিয়ে করে নেয়। সরকারি হাসপাতালে চাকরিও হয়ে যায় ওর।

এরই মধ্যে অনির্বাণের বাবা অন্য শহরে বদলি হয়ে যান। পরিবার নিয়ে ওরা নাগপুর চলে যায়। দূরত্ব তৈরি হলেও অনির্বাণ ছুটিছাটায় সুচন্দ্রার সঙ্গে এসে দেখা করে যেত। ফোনে যোগাযোগ সুচন্দ্রা কোনওদিনই বন্ধ করেনি।

সউদি আরবে চাকরি পাওয়ার খবর অনির্বাণ ফোনেই জানিয়েছিল। অনির্বাণের সঙ্গে ফোন ছাড়াও, মেলেও সুচন্দ্রা খবরা-খবর রাখত। এরই মধ্যে তিন বছরের জন্য সুচন্দ্রা স্বামীর সঙ্গে আয়ারল্যান্ড চলে যায় পড়াশোনা করতে। ওখানে থাকতেই খবর পায় যে অনির্বাণ দেশে ফিরে এসে একটি বিদেশি সংস্থায় চাকরি নিয়েছে। কলকাতাতেই ওর পোস্টিং।

কলকাতায় ফিরতেই সুচন্দ্রা, অনির্বাণের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেই সন্ধেতেই অনির্বাণ এসে হাজির হয় সুচন্দ্রার বাড়িতে।

‘আয় ভাই, ভিতরে আয়। বাব্বা কতদিন পর তোর সঙ্গে দেখা,’ সহাস্যে সুচন্দ্রা বলে।

‘এত দেরি করে ফিরলে তোমরা, আমার আর সময় কাটছিল না। বাবারা তো নাগপুরেই সেটেল করলেন। আমি এখানে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে রয়েছি। সারাটা দিন অফিসে কাজেই কেটে যায় কিন্তু সন্ধে থেকে কিছুই আর করার থাকে না…’ বলতে বলতে অনির্বাণ বসার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে দেয়।

অনির্বাণের সাড়া পেয়ে ততক্ষণে সুচন্দ্রার স্বামী অর্ক-ও বাইরের ঘরে বেরিয়ে এসেছে। বাড়িতেই চেম্বার অর্ক-র কিন্তু অনির্বাণ আসবে জেনে রুগি দেখা বন্ধ রেখেছে আজ ও।

‘কী ব্যাপার শালাবাবু? একাকিত্বে বড়োই কাহিল হয়ে পড়েছ, বোধ হচ্ছে। তা জানো তো, এর একমাত্র চিকিৎসা হয় কিন্তু ছাদনাতলায়,’ হাসতে হাসতে অর্ক বলে।

‘অর্ক ঠিকই বলেছে অনি, তুই এখনও কেন বিয়ে করিসনি?’ সুচন্দ্রা জিজ্ঞেস করে।

‘প্রথম সউদি আরব আর এখন কলকাতা, একা একা থাকা। বিয়েটা হবে কী করে? তারপর মা আর বাবার শরীরের অবস্থা তো জানোই তুমি। ওঁদের পক্ষে মেয়ে খোঁজা অসম্ভব আর মেয়ে দেখতে সারা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যাই হোক, এখন তোমরা এসে গেছ, সুতরাং মনে হচ্ছে দিদি এবার আমার বিয়েটা হয়েই যাবে।’

‘অনি, হয়েই যাবে মনে হচ্ছে… এই কথাটার মানে কী? আর একলা থাকলে কি বাইরে বিয়ে করে এসে এখানে একটা রিসেপশন দেওয়া যেত না?’ কপট রাগের সঙ্গে সুচন্দ্রা অনি-কে বাগে আনার চেষ্টা করে।

‘দিদি, নাগপুরে কোনও বাবা-মা তাঁদের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবে না কারণ বয়সটা আমার কম হল না। আর আমার পছন্দ মায়ের পছন্দ নয়। এই করে বিয়েটাই আর করা হচ্ছে না। দিদি, তুমি এক কাজ করো, হয় মা-বাবাকে বোঝাও যে আমি নিজের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করব আর নয়তো তুমি নিজেই এই পাত্রী ঠিক করার দায়িত্বটা নাও।’

‘কিন্তু কাকু-কাকিমা, তোর পছন্দের মেয়েকে কেন মেনে নিচ্ছেন না? অন্য কাস্ট ও, নাকি ডিভোর্সি?’ সুচন্দ্রা জানতে চায়।

‘ওই সব কিছুই না দিদি। মেয়েটি অবিবাহিত এবং আমাদেরই কাস্টের। কিন্তু ওর একটাই শর্ত যে ভবিষ্যতে আমাদের যেন কোনও সন্তান না হয়। আর এটাতেই মায়ের আপত্তি।’

‘কিন্তু মেয়েটি কেন সন্তান চায় না আর এখনও কেন মেয়েটি বিয়ে করেনি? এটা একটু অদ্ভুতই মনে হচ্ছে,’ সুচন্দ্রার গলায় স্পষ্ট শঙ্কা ফুটে ওঠে।

‘দিদি, রুমন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আমার সঙ্গে একসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত। ওখানে পড়তে পড়তেই ওর বাবার ক্যান্সার ধরা পড়ে এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই ওর মা-ও, ওই একই রোগে আক্রান্ত হন। অনেক চিকিৎসা করিয়েও ওদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এখন ও চাকরি করে। আমাকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু ওর একটাই শর্ত– মা হতে চায় না,’ অনির্বাণের কণ্ঠে হতাশা ফুটে ওঠে।

‘কিন্তু কেন ওর এরকম জেদ?’

‘এটা আমি জিজ্ঞেস করিনি বা করবও না। ও আমাকে কারণটা বলতে চেয়েছিল কিন্তু ওর অতীত জানার আমার কোনও আগ্রহ নেই। আমি ওকে একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দিতে চাই।’

‘কিন্তু এরকম একটা ডিসিশন নেওয়ার কোনও তো কারণ হবে,’ সুচন্দ্রা বলতে বাধ্য হয়।

‘রুমন আমাকে বলেছিল যে মা-বাবার চিকিৎসায় প্রচুর টাকার দরকার ছিল যার জন্য ওকে রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়েছিল। কিন্তু এমন কাজ ও কোনওদিন করেনি যাতে ওকে পরে লজ্জায় পড়তে হয়। আর ওর মা না হওয়ার ডিসিশনও সম্পূর্ণ ওর নিজের ইচ্ছেয়, এর পিছনেও কোনও অনৈতিক কারণ নেই। দিদি, আমার মনে হয় কাউকে ভালোবাসলে তাকে তার প্রয়োজনীয় প্রাইভেসিটুকু দেওয়া উচিত। আমার সন্তান হোক আর নাই হোক, তাতে মা-বাবার সমস্যা কোথায়? বাড়িতে বংশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তো ভাই রয়েছে।’ একটু চুপ করে থেকে অনির্বাণ বলে, ‘তাছাড়া বাচ্চা দত্তক নেওয়ার অথবা সারোগেসির বিকল্প তো রয়েইছে।’

‘এই ব্যাপারটা নিয়ে রুমনের সঙ্গে কথা বলেছ?’ অর্ক এতক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করে।

‘হ্যাঁ, অর্কদা। ও-ই আমাকে বলেছিল যে আমার বাড়ির লোক যদি আমার মা হওয়া নিয়ে খুব বেশি চাপ দেয়, তাহলে সারোগেসির মাধ্যমে আমি যেন ওদের ইচ্ছে পূরণ করি। ওর কোনও আপত্তি নেই। এত কিছুর পরেও মা-বাবা রাজি হয়নি। এখন তোমরা যদি কোনও ভাবে সাহায্য করো।’ অনির্বাণের কথা শুনে অর্ক চিন্তিত হয়ে পড়ে। সুচন্দ্রার দিকে তাকায় অনির্বাণ, ‘দিদি জানোই তো ভালোবাসা অন্ধ। আর রুমনের প্রতি ভালোবাসাই আমার প্রথম এবং শেষ বলতে পারো।’

‘আর রুমনের ক্ষেত্রেও কি তুই-ই ওর প্রথম এবং শেষ প্রেম?’ সুচন্দ্রা জিজ্ঞেস করে।

অনির্বাণ সম্মতিসূচক ঘাড় হেলায়। সুচন্দ্রার প্রশ্নের উত্তরে ও বলে, ‘হ্যাঁ দিদি। প্রথম থেকেই আমরা দু’জনে একে অপরকে পছন্দ করতাম। ভেবেছিলাম পড়া শেষ করে সকলকে আমাদের সম্পর্কটার বিষয়ে জানাব। কিন্তু তার আগেই রুমনের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আর রুমনও আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইল না। কিন্তু একই শহরে থেকে সেটা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না। সেইসময় আমিও সউদি আরবে চাকরিটা পেয়ে চলে যাই।’

‘তাই জন্যেই কি তুই হঠাৎ বাইরে চলে গিয়েছিলি?’ সুচন্দ্রা, অনিকে কথার মাঝেই থামিয়ে দেয়।

‘হ্যাঁ দিদি, তুমি ঠিকই ধরেছ। রুমনের জীবন থেকে আমি সরেই যেতে চেয়েছিলাম।’

‘কিন্তু তাহলে ফিরে এলি কেন?’

‘আমাদের দু’জনের কমন ফ্রেন্ড শান্তা। ওর সঙ্গে বরাবরই আমার যোগাযোগ ছিল। ওই আমাকে রুমনের বাবা-মায়ের মৃত্যুসংবাদ দেয়। এই খবর পাওয়ার পরেই আমি এখানে চাকরি খুঁজতে আরম্ভ করি। চাকরি পেয়েই কলকাতায় ফিরে আসি। রুমন আর আমি এখন একই অফিসে চাকরি করি।’ অকপটে সবকিছু সুচন্দ্রার কাছে খুলে বলে অনির্বাণ।

‘নাঃ, শালাবাবু! তোমার কেসটা দেখতেই হচ্ছে। সুচন্দ্রা, তোমাকে অনির সাহায্য করতেই হবে। হাসপাতালে কাজের মাঝে মাঝে কীভাবে অনিকে সাহায্য করবে ভাবো,’ অর্ক এবার মুখ খোলে।

‘অনি, আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে, আজ আর কিছু করা যাবে না। কাল দেখি কোথা থেকে শুরু করা যায়,’ সুচন্দ্রা বলে।

‘তাহলে দিদি, আজ আসি। কাল তোমাকে একবার রুমনের বাড়ি নিয়ে যাব কিন্তু তার আগে পারলে মায়ের সঙ্গে একবার ফোনে কথা বলে নিও। দ্যাখো, মা তোমাকে কী বলেন!’ অনির্বাণ বাড়ি চলে যায়।

পরের দিন সকালে সুচন্দ্রা নাগপুরে অনির্বাণের বাড়িতে ফোন করে অনির্বাণের মা-র সঙ্গে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলে এবং নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও কাকিমাকে জানায়।

‘আমার আশ্চর্য লাগছে সুচন্দ্রা, তুই ডাক্তার হয়েও এই সম্পর্কটা মেনে নিতে চাইছিস? তোর মনে হচ্ছে না যে, ওই মেয়েটি কোনওরকম মানসিক অথবা শারীরিক অসুস্থতার শিকার নয়তো অনির সামনে এই ধরনের শর্ত রাখে?’ অনির্বাণের মা সুচন্দ্রার কাছে প্রশ্নটা রাখেন।

‘হ্যাঁ, হতেই পারে কাকিমা… আজ আমি মেয়েটির বাড়ি যাব ওর সাথে কথা বলতে। দেখি কিছু বুঝতে পারি কিনা। কথাবার্তা যাই হোক তোমাকে এসে ফোন করব’, এই বলে সুচন্দ্রা ফোনটা কেটে দেয়।

অর্ক, সুচন্দ্রার কথাগুলো বসে শুনছিল। ও বলে ওঠে, ‘সুচন্দ্রা, এই দিকটা তো আমার মাথাতেই আসেনি। কাকিমা এর মধ্যে অনেক কিছুই ভেবে ফেলেছেন।’

‘যদি এরকম কিছু হয় তাহলে আমরা ওর চিকিৎসা করাতেই পারি। সব রোগেরই চিকিৎসা আছে। কিন্তু এখনই অনিকে ওদের কথা কিছু বোলো না তাহলে ওর মন আরও ভেঙে যাবে,’ সুচন্দ্রা ভেবে বলে।

‘ওনাদের আপত্তি হওয়াটাও স্বাভাবিক সুচন্দ্রা। কোনও রোগগ্রস্ত মেয়ের সঙ্গে কি কোনও মা-বাবা নিজের ছেলের বিয়ে দিতে চাইবেন? অনি আর রুমনকে না জানিয়েই বুদ্ধি খাটিয়ে আসল কাহিনিটা জানতে হবে তোমাকে।’ অর্কর কথাগুলো সুচন্দ্রা মেনে নেয়।

অর্ক আরও বলে, ‘তুমি এক কাজ করো। রুমনের বাড়ি যাওয়ার থেকে অন্য কোথাও ওর সঙ্গে দেখা করো। তুমি বরং আজ না গিয়ে কাল লাঞ্চ ব্রেকে অনির অফিসে চলে যাও। রুমনও তো একই অফিসে চাকরি করে। গিয়ে বোলো, হঠাৎ কাজের জন্য তোমাকে ওদিকে আসতে হয়েছে, একসঙ্গে লাঞ্চ করতে চাও। ও নিজেই হয়তো তোমাকে রুমনকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেবে। কিন্তু যদি না-ও ডাকে তুমিই ওকে ডেকে নিতে পারো।’

সুচন্দ্রা কাজের দোহাই দিয়ে সেদিন রুমনের বাড়ি যাওয়া ক্যানসেল করে দিল। পরের দিন না জানিয়েই অনির অফিসে পৌঁছে গেল। দরজায় ঢুকে লিফটের সামনে দাঁড়াতেই, লিফটের দরজা খুলে দেখল অনি বেরিয়ে আসছে সঙ্গে লম্বা, শ্যামলা একটি মেয়ে, বেশ সুন্দরী।

সুচন্দ্রাকে দেখেই অনির্বাণ বলে ওঠে, ‘আরে দিদি। তুমি এখানে? সব ঠিক তো?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ… সব ঠিক আছে। ঘাবড়াস না। এদিকে একটু কাজে এসেছিলাম, ভাবলাম তোর সঙ্গে দেখা করে যাই। কেন, কোথাও বেরোচ্ছিস নাকি?’ সুচন্দ্রা বলে।

‘রুমনকে লাঞ্চে নিয়ে যাচ্ছিলাম। বিকেলের প্রোগ্রাম ফিক্স করার ছিল… তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে,’ অনির্বাণের অনুরোধে সুচন্দ্রা ওদের সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে যায়।

‘ঠিক আছে, চল। ভালো কোথাও একটু বসি যেখানে শান্তিতে কথা বলা যাবে।’

‘তাহলে একটু এগিয়ে ‘আঙ্গিঠি’ রেস্তোরাঁর ফ্যামিলিরুমে গিয়ে বসা যেতে পারে। ওটা বেশ ভালো আর দুপুরে ওখানে ভিড়টা কম,’ রুমন বলে ওঠে।

পাঁচ মিনিটেই ওরা রেস্তোরাঁয় এসে পৌঁছে যায়।

‘খুব ভালো আইডিয়া দিয়েছ রুমন। নয়তো পার্কিং পেতে আর ব্যস্ত রাস্তায় যাতায়াত করতেই অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যেত,’ সুচন্দ্রা বলে।

অনির্বাণ বলে, ‘রুমনের আইডিয়া কিন্তু সবসময়ই খুব কাজে লাগে দিদি। এটা ওর একটা বড়ো গুণ।’

‘তাহলে তো ওকে খুব শিগগিরই, পরিবারের একজন সদস্য করে নিতে হবে।’

অনির্বাণ হেসে রুমনের দিকে তাকায়। সুচন্দ্রার মনে হয়, রুমনের ঠোঁটে হাসি লেগে থাকলেও চোখ দুটো বিষাদ মাখানো। এই বিষাদটাকে লুকোবার জন্যেই যেন রুমন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

রেস্তোরাঁয় বসে রুমন সুচন্দ্রার কাছে ওর বিদেশে থাকাকালীন দিনগুলো সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে। এই নিয়েই খানিকটা সময় কেটে যায় ওদের। খাবার খেতে খেতে সুচন্দ্রা বলে, ‘আমার বিদেশের এক্সপিরিয়েন্স সবই তো শুনলে, এখন তোমার কথা বলো রুমন।’

‘আমার সম্পর্কে বলার মতো সবকিছুই হয়তো শুনে থাকবেন অনির্বাণের কাছে। বলার মতো কিছুই নেই। অনির্বাণের সঙ্গে কলেজে পড়তাম, এখন এক অফিসে চাকরি করি আর আমি থাকি যাদবপুরে।’

‘যাদবপুরে রুমনের বাবা খুব শখ করে বাড়ি বানিয়েছিলেন। হাজার অসুবিধে হওয়া সত্ত্বেও ও ওই বাড়ি বিক্রি করেনি,’ অনি এরই সঙ্গে জুড়ে দেয়, ‘ওখানে ও একাই থাকে।’

‘ভয় লাগে না?’

‘না, দিদি। ভয় পাওয়া অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছি,’ রুমন হাসে।

‘বাঃ, খুব ভালো। কিন্তু অনিকে ছোটোবেলায় ভীতু বলে ডাকতাম, সেটা জানো কি?’

রুমনা হেসে গড়িয়ে পড়ে, ‘কই না-তো দিদি। ও তো কখনও বলেনি যে ছোটোবেলায় ওকে ভীতু বলে ডাকা হতো। কীসে ভয় পেত দিদি?’

‘বলার দরকার নেই। যখন ওর সাথে থাকবে তখন নিজে থেকেই সব জানতে পারবে,’ হেসে উত্তর দেয় সুচন্দ্রা।

‘ওর সাথে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। অনির মা-কে কষ্ট দিয়ে আমি অনিকে বিয়ে করতে পারব না।’ রুমনের চোখে বিষাদের ছায়া উঁকি মারলেও কণ্ঠস্বরের দৃঢ়তা সুচন্দ্রাকে অবাক করল।

সুচন্দ্রা হাতঘড়ির দিকে তাকায়, ‘এই কথা আলোচনা করার সময় বা জায়গা এটা নয়। আমাকে একবার হাসপাতালে ঢুঁ মারতে হবে। হাতে সময় রয়েছে। তোমার সময় হলে বোলো, আরাম করে বসে এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। হয়তো সমাধানের একটা রাস্তাও পাওয়া যেতে পারে।’

‘আজ সন্ধেবেলা তুমি আর অর্কদা যাবে রুমনের বাড়ি?’ অনির্বাণ জিজ্ঞেস করে।

‘এখন কাজ শেষ করে বাড়ি যাব। একবার বাড়ি গেলে দ্বিতীয়বার আর বেরোবার ইচ্ছে হবে বলে মনে হয় না। আর আজ তো তোদের সঙ্গে দেখা হয়েই গেল।’

‘তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে কিন্তু অর্কদার সঙ্গেও তো ওর আলাপ করাতে হবে।’ অনির্বাণ বলে, ‘তুমি বাড়ি গিয়ে আরাম করো, আমি রুমনকে নিয়ে বরং তোমাদের বাড়ি চলে আসব।’

‘সেটা তো খুব ভালো হয়। চলে আয় রুমনকে নিয়ে। রাত্রে আমার বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া করে বাড়ি ফিরিস।’

সন্ধে হতেই অনির্বাণ, রুমনকে সঙ্গে করে সুচন্দ্রাদের বাড়ি পৌঁছে গেল। একসাথে বসে হাসি, আড্ডায় চারজনেই জমে উঠল। গল্পের মাঝে একপ্রস্থ চা আর স্ন্যাক্স সার্ভ করল সুচন্দ্রা। গল্প চলতে চলতেই অর্ক বলল, ‘সুচন্দ্রা আর একবার চা হলে আড্ডাটা কিন্তু আরও জমে যেত।’

‘চা খাওয়ার তোমার একটা এক্সকিউজ চাই।’

‘প্লিজ, লক্ষ্মীটি…।’

অর্কর মুখের ভঙ্গি দেখে সকলে হেসে ফেলল। অগত্যা সুচন্দ্রাকে উঠতেই হল। রান্নাঘরের দিকে ও পা বাড়াল। চায়ের জলটা গরম করতে করতেই অনির্বাণ এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল, ‘দিদি তুমি কি মাকে ফোন করেছিলে?’

‘হ্যাঁ, ফোন করেছিলাম। কাকিমারা কেমন আছেন সেটা নিয়েই কিছুক্ষণ কথা হল।’

‘ব্যস, আর কিছু বললে না? আমাদের কথা কিছু বলোনি? তোমাকে বলেছিলাম না, মায়ের সঙ্গে আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে একটু কথা বলতে,’ অনির্বাণের স্বরে সামান্য হতাশা প্রকাশ পেল।

‘সুযোগ হয়নি। আর সব কথা আলোচনা করার একটা সঠিক সময় থাকে। রুমন কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে না, বিয়ে করলে তো তোকেই করবে। যখন এতদিন অপেক্ষা করলি তখন না হয় আরও কটা দিন কর।’

‘এছাড়া আর করারই বা কী আছে?’ অনির দীর্ঘশ্বাস সুচন্দ্রার কানে এসে বাজল।

রুমনের সঙ্গে সুচন্দ্রার বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠল। সবদিক দিয়ে সুচন্দ্রা রুমনের বিশ্বাস অর্জন করে নিল। একদিন সুচন্দ্রার সঙ্গে কথা না হলে রুমনের মনে হতো তার জীবন থেকে একটা কিছু বাদ পড়ে গেছে। কিছু একটা অমূল্য জিনিস যেন ও হারিয়ে ফেলেছে।

সুচন্দ্রাও রুমনের প্রতি একটা স্নেহের আকর্ষণ অনুভব করত। মেয়েটার মধ্যে সত্যিই একটা চুম্বকীয় আকর্ষণ ছিল। রুমনের কাছেই সুচন্দ্রা জানতে পারল, অনি অফিসের কাজে কয়েকদিনের জন্য মুম্বই যাচ্ছে। মুম্বই চলে গেলে অনির অনুপস্থিতিতে সুচন্দ্রা একদিন ফোন করে রুমনের বাড়ি এসে উপস্থিত হল। রুমনের বাড়িটা সত্যিই দেখার মতো। বোঝাই যাচ্ছিল যিনি বানিয়েছেন তার পছন্দটা বেশ উঁচুমানের।

‘খুব ভালো করেছ বাড়িটা বিক্রি না করে রুমন। বিয়ের পরেও নিশ্চয়ই তুমি এখানেই থাকতে চাও? অনির্বাণ রাজি তোমার প্রস্তাবে?’ সুচন্দ্রা আস্তে করে রুমনকে জিজ্ঞেস করল।

‘অনি তো কোনও শর্ত ছাড়াই আমার সব প্রস্তাব মানতে রাজি। কিন্তু আমি ওর মা-বাবার আশীর্বাদ না নিয়ে অনিকে কিছুতেই বিয়ে করতে পারব না। মা-বাবার স্নেহ থেকে তাদের সন্তানকে দূরে সরিয়ে দেওয়া কখনও উচিত নয়। স্বার্থপর ভালোবাসায় আমি বিশ্বাস করি না। আমার জন্য অনি সবার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করুক, এ আমি কিছুতেই চাই না।’

‘এটা তো খুবই ভালো কথা রুমন। কাকু, কাকিমা মানে অনির বাবা-মা খুবই ভালোমানুষ। ওদের যদি ঠিকমতো বোঝানো যায় মানে তুমি বিয়ের যে শর্ত রেখেছ, তার কারণ বলা যায়, তাহলে ওনারাও বিনা দ্বিধায় হাসতে হাসতে এই বিয়েতে মত দেবেন। কিন্তু অনি ওদের কোনও কারণও বলেনি।’

‘ও নিজে জানলে তবে তো ও, অন্য কাউকে বলবে। আমি ওকে অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি কিন্তু ও কিছুতেই শুনতে চায় না। অনির কথা হল ভবিষ্যতকে সুন্দর করে তোলার চেষ্টা করো, অতীতকে মনে রেখে কী লাভ।

আমিও অতীতকে মনে করতে চাই না দিদি। কিন্তু অতীত অথবা জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা কিছু ঘটনা এমনও হয় যেটাকে কিছুতেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। সারা জীবন সেটাকে নিয়েই বাঁচতে হয় দিদি,’ রুমনের চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে।

‘তুমি চাইলে তোমার জীবনের এই অধ্যায়টা আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারো,’ সুচন্দ্রা দুই হাত দিয়ে নত হয়ে আসা রুমনার মুখটা পরম স্নেহে তুলে ধরে।

‘কয়েকদিন ধরে আমি এটাই ভাবছিলাম দিদি।’ গভীর নিঃশ্বাস নেয় রুমন। একটু নিজেকে গুছিয়ে নিতে সময় নেয়। বলতে শুরু করে, ‘কলেজের পরেই চাকরি পেয়ে যাই। ততদিনে বাবা আর মা দু’জনেরই ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চাকরি থেকে দেরি করে ফেরা আর বারবার ছুটি নেওয়ার জন্য চাকরিটাও ঠিকমতো করতে পারছিলাম না। আর মা-বাবার দেখাশোনাও ঠিকমতো হচ্ছিল না। অতএব চাকরিটা আমি ছেড়ে দিই। মুম্বই চলে যাই মা-বাবাকে নিয়ে। আত্মীয়ের একটা ফ্ল্যাট খালি ছিল, ওখানে গিয়েই উঠি। বাবার টাকা ছিল। কিন্তু বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ জোগানোর জন্য আমিও কাজ করতে শুরু করি। ভ্যাকিউম ক্লিনার বেচা থেকে শুরু করে, কী না করেছি। হাসপাতালে ক্যান্টিনে কাজ করেছি, বেবি সিটিং করেছি। মা-বাবার আপত্তি সত্ত্বেও বেশি পরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে দু’বার স্যারোগেট মাদার হতেও লজ্জা পাইনি।

সেইসময় মেশিনের মতো বাচ্চার জন্ম দিয়েছি আর টাকার বিনিময়ে যারা টাকা দিয়েছে তাদের হাতে তুলে দিয়েছি বাচ্চাকে। কিন্তু এখন মনে হয় বিয়ের পর যখন নিজের সন্তান হবে তখন তাকে মানুষ করতে গিয়ে আগের দু’টো বাচ্চার কথাও মনে পড়তে পারে। তাদের তো আমি অচেনা লোকেদের হাতে তুলে দিয়ে এসেছি। ওদের কথা মনে পড়লে আমি যদি বিচলিত হয়ে উঠি, তাহলে সেটা অনি বা অনির সন্তানের প্রতি অন্যায় করা হবে। সুতরাং বিয়ের পর নিজের সন্তান যাতে না হয় তারই জন্য অনির কাছে ওই প্রস্তাব রেখেছিলাম। দিদি তুমি, অনি এবং ওর মা-বাবাকে পুরো সত্যিটা খুলে বলো। ওনারা যা সিদ্ধান্ত নেবেন সেটা আমি মাথা পেতে নেব।’

‘ঠিক আছে রুমন, সুযোগ বুঝে আমি ওনাদের সঙ্গে কথা বলব,’ সুচন্দ্রা রুমনকে আশ্বাস দেয়।

সুচন্দ্রা বেরিয়ে আসে রুমনের বাড়ি থেকে। রুমনের স্বীকারোক্তি সুচন্দ্রার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। রুমনের ভাবনাটা সত্যি। অনির সঙ্গে হয়তো ওর কোনও সমস্যা হবে না কারণ অনির রুমনের প্রতি ভালোবাসাটা নিঃস্বার্থ। রুমনের সবকিছুই ও মেনে নেবে কিন্তু অনির মা-বাবা? তারা কী করে এমন মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকার করবেন যে কিনা দু’বার স্যারোগেট মাদার হয়েছে? কাজটা সহজ নয়।

সুচন্দ্রা ভাবতে থাকে। কাকু, কাকিমাকে রুমনের বয়সের দোহাই দেওয়াটা কি খুব অন্যায় হবে? রুমনের যা বয়স তাতে সন্তানের জন্ম দেওয়াটা বিপজ্জনক, এমনটা বোঝানো অসুবিধার নয়। কথাটা খুব একটা মিথ্যাও না। সুচন্দ্রার মনে হয় অনি আর রুমনের ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে এতটুকু ছলনার আশ্রয় তো নেওয়াই যেতে পারে।

 

ছায়াবৃতা

ট্রেনের সফর বরাবরই আমার খুব প্রিয়। জানালা থেকে মুখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না আমার। ভালোবাসি প্রকৃতি দেখতে। ট্রেনের জানলায় বসে দেখতে থাকি কীভাবে প্রকৃতি বদলে যায়, বদলায় মাটির রং, মাটির গঠন। কুলটি ছাড়াতেই এরকমই বদলটা চোখে পড়ছে। কুমারডুবি ছেড়ে ট্রেন এগোতেই বুঝি, রাজ্য বদল হতে যাচ্ছে। ঝাড়খন্ডে প্রবেশ করব এবার।

বহুবছর পরে আবার প্রান্তিক মালভূমি অঞ্চলের ধূ-ধূ আবহে ফিরে এলাম। কুড়ি বছর আগে, আমি ছিলাম এই এলাকার এসডিও। যাকে সোজা ভাষায়, জেলার সর্বেসর্বা বলা চলে। তখন আমার বয়সও কম। গোটা এলাকাটাও ছিল একেবারে অন্যরকম। অনুন্নত কিছু মানুষ, আর ততধিক অনুন্নত পরিকাঠামো। রাস্তা বলতে, দীর্ঘকাল চলতে চলতে পায়ে পায়ে যে-রাস্তা তৈরি হয়ে যায়, সেটাই। বাকিটা কেবলই জঙ্গল। জঙ্গলে বেশিরভাগই পলাশ গাছ।এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পলাশফুল ফোটে। রাঙা পলাশ রক্তিম করে রাখে গাছের শীর্ষ আর শাখা।

এসডিও-র অফিস অর্থাৎ জেলার প্রধান কার্যালয় থেকে এই গভীর জঙ্গলের কাছাকাছি আসতে হলে, একাধিক নদীনালা পার হতে হতো। বর্ষায় এখানে পৌঁছনো তো বলতে গেলে অসম্ভব হয়ে পড়ত, কেন-না তখন নদীনালাগুলিও জল পেয়ে ফুলে উঠেছে। ভীষণ স্রোত। সহায় বলতে ভুটভুটি। নদী এপার-ওপার করার কোনও সেতু ছিল না।

এবার এসে দেখলাম, রাস্তাঘাট পাকা হয়েছে বটে, কিন্তু বড়ো নদীর উপর কোনও সেতু এখনও তৈরি হয়নি। ক্রমাগত কেটে ফেলায় জঙ্গলের ঘনত্বও যথেষ্ট কমে এসেছে। কোথাও কোথাও তো এতটাই কমে গেছে গাছের সংখ্যা যে, সেখানে জঙ্গল নামমাত্র। দেখে অবাক হয়ে গেলাম। মানুষের কি নিজের ভবিষ্যতের জন্যও কোনও আশঙ্কা হয় না! নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এমন নির্বিবাদে গাছ কেটে নেওয়ার পিছনে বড়ো ষড়যন্ত্র আছে। যে-কটি পুরোনো পলাশগাছ এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাদের মাথায় লাল আগুন দেখে মন ভরে গেল নিমেষে।

জঙ্গলের মধ্যে কিংবা আশেপাশে যারা থাকে, তারা সকলেই আদিবাসী। কুড়ি বছর আগে তাদেরকে নিজেদের রীতি-রেওয়াজের রক্ষণশীল চেতনাতেই আবদ্ধ দেখেছি। প্রকৃতির সঙ্গে যেন মিশে ছিল এরা। যেমনভাবে জঙ্গলের আর-পাঁচটা প্রাণী থাকে। মনে হতো, এই জঙ্গলটিই ওদের পৃথিবী। এই পৃথিবীর বাইরেও যে-একটা পৃথিবী আছে, সে সম্পর্কে তারা ছিল উদাসীন। নিজেদের পৃথিবীতে বাইরের কারও আগমন তারা ভালো চোখে দেখত না। বিরক্ত হতো। লুকিয়ে পড়ত ঘন জঙ্গলের মধ্যে।

জঙ্গল ওদের রক্ষা করত। বাঁচিয়ে রাখত ওদের গোপনীয়তাকেও। এ অঞ্চলের আদিবাসী নারীদের ঊধর্বাঙ্গে বস্ত্র বিশেষ দেখিনি। তাতে তাদেরকে লজ্জা পেতেও দেখিনি কখনও। এইবার এসে দেখলাম, আদিবাসী মহিলারাও অনেক বদলে গেছে। ঊধর্বাঙ্গ আর অনাবৃত নয়। পরিবর্তন আরও অনেক জায়গায় ঘটেছে। যেমন, বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গল সাফ করে চাষাবাদ করার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। আগে এরা বনজ সম্পদের উপরই বেশি নির্ভরশীল ছিল। এখন যেন মনে হচ্ছে, এলাকাটির অর্থনীতি কৃষিপ্রধান হয়ে পড়ছে।

বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে, সরকারের পক্ষ থেকে, এই এলাকার উন্নয়নের পরিকাঠামো আর সম্ভাবনা সরেজমিনে দেখতে এসেছি। সঙ্গে, জেলার কালেক্টর, পুলিশ প্রধান এবং অন্যান্য অফিসাররাও রয়েছেন। ঠিক হল, সকলে মিলে জলখাবার খেয়েই একটি বড়ো গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পড়ব। কুড়ি বছর আগে এই গ্রামটিকে আমার প্রভূত সম্ভাবনার আকর মনে হয়েছিল। নানা কারণে সে সময় কাজ আর এগোয়নি। এবার সুযোগ পেয়ে প্রথমেই এই গ্রামটিতে যাব বলে মনস্থ করলাম।

গাড়ি চলাচলের রাস্তা নেই বলে, অনেকটা ঘুরে যেতে হল। ফলে, পৌঁছতে যথেষ্ট বেলা হয়ে গেল। প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে নিতে গিয়ে টেরই পাইনি, কখন ঝুপ করে সন্ধে নেমে পড়েছে, বাদুড়ের বেশে বিস্তৃত পাখা ছড়িয়ে দিয়ে!

এই গ্রামে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। খুব সম্পন্ন পরিবারে সৌরবিদ্যুতের দুটো-একটা আলো জ্বলে। না হলে, অন্ধকার ঘোচাতে লন্ঠনই ভরসা। সরকারি বাবুরা এসেছেন বলে, আজ অবশ্য একটা হ্যাজাক জোগাড় করে আনা হয়েছে। সেটা জ্বালাতে অন্ধকারটা যেন আর একটু গাঢ় হল।কাজকর্ম মিটতে, কালেক্টর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললেন, ‘স্থানীয় ক্লাবের ছেলেরা সামান্য বিনোদনের ব্যবস্থা করেছে।এখানকার ছেলেমেয়েরা নাচে খুব ভালো!’  কবজি উলটে হাতঘড়ি দেখে বললাম, ‘নাচ দেখতে গেলে তো অনেক দেরি হয়ে যাবে মশাই। আর-একদিন এলে হতো না?’

কালেক্টর নিজেই যথেষ্ট উৎসাহী। স্বাভাবিক। বউ-ছেলেমেয়ে-টিভি সিরিয়াল ছেড়ে, এই নির্বান্ধব পৃথিবীতে দিনের পর দিন কাটানো, খুব সহজ কথা নয়। ভদ্রলোক আশ্বস্ত করে বললেন, ‘খুব জরুরি কাজ না থাকলে, আমি বলি কী, একটু দেখেই যান। সঙ্গে তো গাড়ি আছে। পৌছনোর চিন্তা তো নেই। তা ছাড়া এখন পুলিশের যা কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে, তাতে ডাকাতেরাও আর ট্যাঁ-ফোঁ করতে পারছে না!’

আদিবাসীদের নাচের এক নিজস্ব মাদকতা আছে। দু’দশক আগে এখানে যখন ছিলাম, সুযোগ হয়েছিল দেখার। কিন্তু, সেসব তো প্রায় গতজন্মের কথা বলে মনে হয়! বাকি সবকিছুর মতো সেই নৃত্যশিল্পীদের মোহিনী বিভঙ্গেও পরিবর্তন এল কিনা, সেটা লক্ষ্য করার লোভ আমারও কিছু কম ছিল না। আটচালায় পাতা মাদুরের উপর পা মুড়ে বসে পড়ে কালেক্টরকে বললুম, ‘বেশ, আপনি যখন অভয় দিচ্ছেন, থাকাই যাক তাহলে কিছুক্ষণ!’

ক্লাবের সদস্যদের আনন্দ তখন আর দেখে কে! সরকারি বাবুর খামখেয়ালে এত বড়ো আয়োজনটা বানচাল হয়ে যাচ্ছিল দেখে, তারা একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। এখন তেড়েফুঁড়ে উঠে, আর্জি নিয়ে আসা স্থানীয় লোকের ভিড়টা নিমেষে ফাঁকা করে, তারা নাচের জায়গা তৈরি করে নিল।

মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে গান। ক্লাবেরই দুই যুবক, তাদের নিজস্ব ভাষায় গান ধরল। ভাষাটা খানিকটা চেনা ঠেকছে, খানিকটা অচেনা। বোঝা, না-বোঝার আলো-আঁধারিতে গান শেষ হলে, কালেক্টর ফিসফিস করে বললেন, ‘আপনি বোধহয় ভাষাটা বুঝতে পারেননি, তাই না?’

মাথা নেড়ে লজ্জিত গলায় বললাম, ‘বাস্তবিক ভুলেছি। অনেক দিনের ব্যাপার তো!’

কালেক্টর বললেন, ‘আপনাকে স্বাগত জানাল। গাইল, ‘শহর থেকে গাঁয়ে আসা সরকারি বাবু, তোমায় নমস্কার’।’

খানিকক্ষণের বিরতির পর তিনজন আদিবাসী মহিলা মঞ্চে এল। দুজন তরুণী, অন্যজন মধ্যবয়সিনি। বয়স্কার শরীরও একটু ভারী। কিন্তু আশ্চর্যরকম টানা টানা চোখ আর ভারী কালো শরীরকে পেঁচিয়ে রাখা শাড়ি ভেদ করে, উন্নত স্তনদ্বয়ের আভাসে তার রূপ, ভারতীয় সনাতন সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিন মহিলা হাত ধরাধরি করে দাঁড়াল। তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সি যে, তার বয়স খুব বেশি হলে কুড়ি বছর। ছিপছিপে চেহারার ছটফটে মেয়েটির চোখ-মুখ আদিবাসীদের মতো নয়, বরং বেশ চোখা। নাচের লয় যত দ্রুত হল, ততই মেয়েটির শরীরে দেখা দিল তীব্র ঘূর্ণি। কী অনায়াস দক্ষতায় যে নাচতে থাকল সে!

তিনজন নারী ঘুরে ঘুরে নাচছে আর তাদের পিছনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আর-এক দল গান গাইছে বনজ সুরে। যন্ত্রানুষঙ্গ বলতে নেই কিছুই। কেবল একটি স্টিলের থালা আর চামচ। একজন গায়িকা চামচ দিয়ে থালায় আঘাত করে তাল রাখছে। নাচের মুদ্রা এই আদিবাসীদের নিজস্ব। কয়েকটি একেবারে নতুন লাগল। হয়তো শহুরে প্রভাবেই কয়েকটি মুদ্রা নতুনভাবে যোগ হয়েছে নাচে। শহুরে দর্শক সামনের সারিতে বসে থাকায় নর্তকী ও গায়িকারা যেন নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে।

আমি মগ্ন হয়ে আছি। কিন্তু মগ্ন হয়ে যে নাচটাই দেখছি, এমন নয়। আসলে, আমার মন চলে গেছে কুড়ি বছর আগের অন্য একটি ঝাপসা হয়ে আসা দৃশ্যে। সেদিনও এমনই নাচের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। রাতের বেলা, তবে হ্যাজাক বা লন্ঠন জ্বালতে হয়নি। আকাশ ভরা ছিল জ্যোৎস্না। জায়গাও অবশ্য এটা ছিল না। জঙ্গলের মধ্যে, চারদিকে আদিবাসীদের ঝুপড়ি দিয়ে ঘেরা একটা ফাঁকা গোল জায়গায় ঘুরে ঘুরে নাচছিল নর্তকীরা। আজ যেন অলৌকিক মনে হয়। যেন, এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি, যেন এমন কোনও দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শীই আমি ছিলাম না!

আনমনা মনটাকে টেনে বর্তমানে ফিরিয়ে নিয়ে আসি। নর্তকীরা এখনও নাচছে। হঠাৎই মনে হল, ওদের মধ্যে বয়স্কা নারীটি আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে যেন। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া জানতে নর্তকীরা যেভাবে তাকায়, এই তাকানোর ধরনটা সেরকম নয়। একটু অন্যরকম। যেন খুব ঔৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে আছে। বুক কেঁপে উঠল আমার।

আমিও সেই নারীকে ভালো করে দেখলাম। ততক্ষণে নর্তকীদের ঘূর্ণনের গতি বেড়ে গেছে। কিন্তু, তা সত্ত্বেও আমার যেন মনে হল, এই মহিলাকে আগেও কোথাও আমি দেখেছি। এই দৃষ্টি আমার খুব পরিচিত।

পৃথিবীতে কত মানুষের সঙ্গেই না পরিচয় ঘটে! হূদয় খুঁড়ে অনুরূপ একটি অবয়বকে তুলে আনতে চাইলাম। ততক্ষণে নাচের অনুষ্ঠান শেষ। শিল্পীরাও আটচালার বাইরে গিয়ে ভিড় আর অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

আটচালা থেকে বেরিয়ে অন্ধকারের গহ্বরের দিকে একটু এগোলাম। সঙ্গী অফিসারদের মধ্যে দু-একজন পিছু পিছু আসছিলেন। হাত নেড়ে তাদের অনুসরণ করতে বারণ করে বললাম, ‘দূরে কোথাও যাচ্ছি না। এক্ষুনি আসছি।’

শুনলাম, এই আটচালায় পঞ্চায়েত মিটিংয়ে বসে। সন্ধে হয়ে যাওয়ায় চারপাশটা ইতিমধ্যেই বেশ শুনশান। একটু দূরে বেশ খানিকটা খোলা জায়গায় কয়েকটি বড়ো গাছ। ধীর পায়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছিলাম সেদিকে। হঠাৎই পিছনে কারও পায়ের শব্দ শুনে ঘোর ভেঙে গেল। চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখি, আদিবাসী এক মহিলা এদিকেই হেঁটে আসছে। মনে ভাবলাম, সম্ভবত কোনও ব্যক্তিগত কারণেই, এদিকটা নিরালা বলে, এদিকেই আসছে। তাকে শুনিয়ে গলাখাঁকারি দিলাম। কিন্তু, তাতে না থমকে, মহিলা দ্রুত পায়ে হেঁটে কাছে এগিয়ে এল।

এবার রাগত গলায় বলে উঠলাম, ‘কে? কী চাই?’ আসলে ভিতরে ভিতরে একটু ভয়ও হচ্ছিল। সেটাই রাগের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেল।

কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল সেই মহিলা। তারপর নীচু গলাতে বলল, ‘আমায় চিনতে লারছেন, সাহেব?’

এবার একটু সাহস পেয়ে দু-পা এগোতেই মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। এ তো সেই নাচের মেয়েদের দলের মধ্যবয়সিনি মহিলা! নাচতে নাচতে বারবার অদ্ভুত চোখে যে আমায় দেখছিল!

আমি এবার সত্যিই অবাক হয়ে বললাম, ‘কে তুমি? ঠিক চিনতে পারলাম না তো–!’

মহিলার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘মিথিলাকে তুমার সত্যি মনে লাই?’

এক পলকে মন চলে গেল কুড়ি-কুড়ি বছরের পার। সেই জ্যোৎস্নালোকিত, ঝুপড়ি পরিবেষ্টিত গোল নৃত্যাঙ্গন। তাতে জনাকয়েক আদিবাসী তরুণী নাচছে। তাদের কোমরে দুলকি তরঙ্গ উঠেছে। পায়ের গোছে রুপোলি চাঁদের গলিত মায়া। নর্তকীদের মধ্যে মিথিলাও ছিল, এবার মনে পড়েছে। ওর বয়স তখন কুড়ির আশেপাশে। কিন্তু তখনই যথেষ্ট বন্য শরীর। সুডৌল কায়ায় ভয়ংকর পুরুষঘাতী বাঁক। সমুদ্রের তলদেশ থেকে ফুঁসে ওঠা পাহাড়ের মতো উত্তুঙ্গ দুই বুক, নাচের ঘূর্ণিতে দুলছে। অলৌকিক ছিল সেই রাত। অবিশ্বাস্য! তখন আমিও অবিবাহিত। বান্ধবী হয়নি। এমন এক জায়গায় চাকরি সূত্রে এসে পড়েছি, যা তথাকথিত সভ্য জগৎ থেকে সবদিক দিয়ে পৃথক। টেলিফোন নেই, ডাকবিভাগের অস্তিত্বও না থাকার মতো, ইলেকট্রিক আলোর তো কোনও প্রশ্নই ওঠে না!

ফলে, নাচ হচ্ছিল খুঁটিতে বাঁধা মশালের আলোয়। কখনও কখনও মাদলের শব্দকে ছাপিয়ে, দূরের কোনও জঙ্গল থেকে ভয়াবহ বন্যপ্রাণীর চিৎকার ভেসে আসছিল।

একসময় থেমে গেল নাচ-গান। আদিবাসীরা আপ্যায়ন করতে জানে। প্রত্যেকেই দিনএনে দিন খাওয়া মানুষ, হাড় জিরজিরে, অভাবে অর্ধনগ্ন–কিন্তু আন্তরিকতায় কোনও খামতি নেই। এসডিও-বাবু তাদের মহল্লায় এসেছেন, এতেই যেন তাদের মোক্ষলাভ হয়ে গেছে।

এমনিতে সারাটা দিন কেটেছে ভীষণ ব্যস্ততায়। গ্রামের মুখিয়ার সঙ্গে একটার পর একটা স্থানীয় সমস্যার সমাধান করে, একটু ফুরসত পেয়ে দেখি, সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। সমস্যার সমাধানে এলাকার বাসিন্দারা খুশি হল। বোধহয়, সেইজন্যই নাচ-গানের এই আয়োজন! এরপর আবার ঢালাও খাওয়াদাওয়ারও ব্যবস্থা রেখেছে। শোওয়ার বন্দোবস্ত ফাঁকা একটি ঝুপড়িতে। খেয়েদেয়ে নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে কোনওমতে টেনে নিয়ে গিয়ে, বিছানায় ফেলে দিলাম। গরমকাল। তাই শখ করে আনা নাইটসুটের উপরাংশটা খুলে ভাঁজ করে রেখে দিলাম পাশে।

কখন দুচোখ ঘুমে জড়িয়ে এসেছে, নিজেই জানি না। মৃদুমন্দ হাওয়া বয়ে আনছে মহুয়া-পলাশের মিষ্টি গন্ধ। ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এমন নিশ্চিন্ত অবকাশ বেশিক্ষণ রইল না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই হঠাৎ মনে হল, এ ঘরে আমি একা নই, আরও কেউ আছে। আশেপাশের নিস্তব্ধতায় তার নিশ্বাসের শব্দটিও তীব্রতর হয়ে প্রবেশ করছে কানে।

বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। উঠে বসে চিৎকার করে বললাম, ‘কে? কে ওখানে?’ ঘরের মধ্যে থিকথিকে অন্ধকার। তার মধ্যেই একটি ছায়া নড়েচড়ে উঠে, বিছানার দিকে এগিয়ে এল ধীর পায়ে। করউজ তেলের তীব্র গন্ধ নাকে এসে ঠেকল আমার। ছায়া বলে উঠল, ‘বাবু, আমি মিথিলা!’

‘মিথিলা’, আমি সতর্ক গলায় বলে উঠি, ‘তুমি এত রাতে কী করছ এখানে? কী… ক্বী…?’

মিথিলা এগিয়ে এসে আমার পায়ের কাছে বসল। তারপর একটু থেমে থেকে বলল, ‘একজন মেয়ে রাতের বেলা একলা একজন পুরুষলোকের কাছে কেন আসে, তুমি বুঝো লাই বাবু? তুমি আমাদের গাঁয়ের অতিথ্। আমাদের মালিক। তাই, মুখিয়া আমায় বললে, মিথিলা, তুই যখন লাচ করছিলি, তখন সাহেব সবচেয়ে বেশি তুর দিকেই চোখ ঠারছিল। তুকেই সাহেবের বেশি মনে ধরেছে। সত্যি?’

অন্ধকারেও বুঝতে পারি, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ধরে, মিথিলা এদিকেই তাকিয়ে আছে। মেঝের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে চিৎকার করে বলে উঠি, ‘মুখিয়ার এত সাহস? ডাকো তো তাকে–!’

মিথিলা উঠে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ-ই আমার কাঁধে হাত রাখল। সারা শরীরে শিহরণ খেলে গেল আমার। ফিক করে হেসে, সে বলল, ‘আবার মুখিয়াকে কেন ডাকছ গো বাবু? আমি কি এতই খারাপ? এদিকে তাকাও, দ্যাখো না বাবু, কত সোন্দর আমি!’

মিথিলার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করতে পারে, এমন মহাপুরুষ আমি নই। ওই তীব্রতার কাছে হার মানলাম। সে আমায় ঠেলে বিছানার উপর ফেলে দিল। অনুভব করলাম, তার চওড়া ভিজে ঠোঁটজোড়া আমার গলার কাছে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। আমি তাকে ঠেলে উঠতে চাইলাম, কিন্তু সে যেন, এখানকার জঙ্গলের কুখ্যাত মানুষখেকো লতার মতোই আমায় জড়িয়ে ধরেছে।

এভাবে কতক্ষণ ভেসেছি জানি না। তলিয়ে যেতে যেতে, কাঁধের উপর হঠাৎ-ই দুফোঁটা গরম জল এসে পড়ায়, যেন চেতনা ফিরে পেলাম। কানের কাছে অত্যন্ত নীচু গলায় কথা বলে উঠল মিথিলা।

‘বাবু, আমাকে তাড়িয়ে দিয়ো না। তাইলে, মুখিয়া আর তার লোকজন মনে করবে, আমারই কোনও খামতি আছে। আমি পুরা মেয়েমানুষ লই। কারও বউ কি রাখিতো হওয়ারও যোগ্য লই!’

ভোরে ঘুম ভাঙতে পুরো ঘটনাটা স্বপ্ন মনে হল। বেড়ার ফাঁক দিয়ে সকালের সোনালি রোদ্দুর গলে ভিতরে ঢুকে আসছে। ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। চারদিক এখনও বেশ নিরিবিলি। তবে জঙ্গলের উপর থেকে রাতের রহস্যময়তার পর্দা সরে গেছে।

সেদিন সকালেই সদরে ফিরে এলাম। তারপর মাসখানেকের মধ্যে আমার বদলি হয়ে গেল অন্য জেলায়। সেই রাতটা বিস্মৃতির ধুলোর নীচে চাপা পড়ে রইল।

তারপর আজ।

সেই রাত আর কুড়ি বছর পরের এই রাত। জায়গাটা একই। মিথিলাও সেই মিথিলা, মাত্র কয়েক হাত দূরে সংকোচ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাত বাড়ালেই আমি ওকে ছুঁতে পারি, ও এতটাই কাছে। স্তিমিত গলায় বললাম, ‘হ্যাঁ মিথিলা, আমার সব কথা মনে পড়ে গেছে। কেমন আছ? কী করছ আজকাল?’

মিথিলা ম্লান হেসে বলল, ‘আমি ভালো আছি, বাবু। আদিবাসীরা যেভাবে ভালো থাকে! বুড়ি হয়ে গেছি, লয়? এখন আর কেউ কোনও কাজকম্ম দেয় না।’

তারপরই কী মনে পড়ে যেতে, সরাসরি মুখের দিকে তাকিয়ে, আন্তরিক গলায় প্রশ্ন করল, ‘তুমি কেমন আছ বাবু? কত্ত বছর বাদে দেখা হল! আমি তো তুমায় একবার দেখেই চিনে ফেলেছি। মু-কে তুমি ভুলে গেছিলে, লয়?’

তার চোখদুটো অন্ধকারেও জ্বলছে। সে যেন আমার অন্তরের তলদেশ পর্যন্ত দেখে নিচ্ছে।

বললাম, ‘মিথিলা, আমি অনেক দূরে চলে গেছিলাম। এর মধ্যে আমার বিয়ে হয়েছে। দু-দুটো সন্তান হয়েছে। এতদিন পর তোমাকে দেখেও খুব ভালো লাগছে মিথিলা–!’

মিথিলা চোখ নামিয়ে মাটির দিকে দেখছিল। চারদিক নিরালা। হঠাৎ মনে হল, আমাকে খুঁজতে খুঁজতে অফিসাররা যদি এদিকেই আসে, তাহলে ভুল বুঝতে পারে। মিথিলাকে তাই বললাম, ‘চলো, ফিরে যাই। সকলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’

আমি আটচালার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, সে আমার হাত চেপে ধরল। চোখে বিরক্তি নিয়ে তাকালাম। মিথিলা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে। আমি ঘুরে দাঁড়াতে, ও খুব বিব্রত মুখে বলল, ‘একটা কুথা বলার ছিল বাবু। বুঝতে লারছি, কী করে বলি সে কথাটো তুমায়!’

প্রশ্নভরা চোখে ওর মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। টাকাপয়সা চাইবে নাকি? অন্ধকারে ওর মুখের ভাবও স্পষ্ট অনুভব করা যাচ্ছে না। মিথিলা বলল, ‘বাবু, আমার আর তুমার মেয়ে, পুতলি, আটচালাতেই ছিল। দেখেছ কি তাকে?’

বলে কী? আমার গলা থেকে সহসা যেন কোনও আওয়াজ বের হল না। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, মনে হল। কপালে ঘাম দেখা দিল। সেই সূচীভেদ্য অন্ধকারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেয়েটা চায় কী? কী অভিসন্ধি? দুর্বল হলে চলবে না। গলায় যতদূর সম্ভব তীব্রতা এনে বললাম, ‘তোমার আর আমার মেয়ে? বাজে কথা বলার জায়গা পাওনি? কীভাবে হবে? কীভাবে, কীভাবে? আমাকে ঠকানোর চেষ্টা করো না, বুঝলে! আমাকে খাটো করার চেষ্টা করে লাভ হবে না–!’

নিজের কথা নিজের কানেই অসংলগ্ন শোনাল। কপাল থেকে ঘামের বিন্দুগুলি মুছে নিলাম।

মিথিলার গলার স্বর আগের মতোই শান্ত। বলল, ‘চিল্লিয়ো না। সবাই তো জেনে লিবে তাইলে।… বাবু, ওই রাতের পর আমি তো তুমারই হয়ে গেছিলাম। মন থেকে আজও আমি তুমারই। আমারও শাদি-বেহা হয়ে গেছে। আরও সন্তান হয়্যেছে। ওই পুতলি কিন্তু তুমারই বাবু। তুমার এবং আমার!’

আমি সন্দিগ্ধ গলায় শেষ অস্ত্রটা ছুড়লাম, ‘যখন তোমার বিয়ে হয়ে গেছে বলছ, তখন এ ব্যাপারে এতখানি নিশ্চিতই বা হচ্ছ কী করে?’

‘সেই রাতের সাত মাস পরে আমার বেহা হয়ে যায়। ওই সময়ের মধ্যে আর-কোনও মরদ আমায় ছোঁয়নি। ওই রাতের ঘটনার পরে যেদিন বুঝতে পারলাম, পেটে শত্তুর এসেচে, আমাদের রীতি অনুযায়ী মুখিয়া আমার বেহা ঠিক করল। আর তার ঠিক দু-মাসের মাথায় পুতলি জন্মাল। এবার তাইলে বলো?’ সে হেসে আমার দিকে তাকায়।

‘তাহলে, এতদিন এ কথা আমায় জানাওনি কেন মিথিলা? বুঝতে পারার পরপরই যদি জানাতে আমায়…’, আমি অসহায়ের মতো আমতা-আমতা করি, ‘আর, যদি তখন না জানিয়ে থাকো, তাহলে আজ জানানোর কী দরকার ছিল?’

মিথিলা বলল, ‘পুতলি আদিবাসীদের মধ্যেই মানুষ হয়েছে। আমার মরদ ওকে নিজের বাচ্চার মতোই দেখে। তুমি কুথায় থাকো, সে আমি কী করে জানব, বাবু? হাঁ, মুখিয়া বলতে পারত। কিন্তু, উহাকে আমি কিছু বলি লাই। তুমাকে এত বছর পরে দেখ্যে কথাটো মনে পড়্যে গেল। পুতলিকে চিনতে লারছ বাবু? উই যে, যে আমার সঙ্গে লাচছিল!’

আমার মনে পড়ে গেল। কমবয়েসি মেয়েটিকে দেখে অবাক হয়েছিলাম বটে! আদিবাসীদের মধ্যে অমন চোখা নাক-চোখ তো দেখা যায় না! আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল!

কিন্তু আমার কুশলী শহুরে মনটা কথা বলে উঠল, ‘ও? ওকে তো পুরো আদিবাসী মনে হয়! দূর–!’

এবার যেন একটু রেগে যায় মিথিলা। বলে, ‘ও আমার বুকের দুধ খেয়েছে বাবু। আদিবাসী মায়ের বুকের দুধ গো! আদিবাসীদের মধ্যে ও বড়ো হয়্যেছে। তুমি উকে আদিবাসী বললে, এতে আমি খুব খুশি হয়্যেছি, বাবু!’

আমার মনের মধ্যে ঝড় বইছে। শহরে আমার বউ, ছেলেমেয়ে যদি এ কথা জানতে পারে কী হবে? যদি অফিসাররা জেনে যায়, তাহলেই বা কী হবে? যদি সরকারের কাছে খবর যায়? আমি আর ভাবতে পারছিলাম না। একটা বড়ো গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে ক্লান্ত গলায় বললাম, ‘তোমার এ কথা যদিও কেউ মানতে চাইবে না, তবু তর্কের খাতিরে যদি বিশ্বাস করিও, তাহলে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। কী চাও তুমি?’

‘কী চাই?’ মিথিলা ব্যঙ্গ করে হাসে, ‘তুমাকে দেখ্যে পুরোনো কুথাটো মনে পড়্যে গেল। পুতলির বাবা কে, এ কথাটো কেউ জানে না! এক রাত তোমায় ভালোবেসেছিলাম, সাহেব। সেই ভালোবাসার উপহার পুতলি। ও তুমার উপহার। মনে হল, এ কুথাটো জানা তোমার অধিকার বটে!’

মুখে হাত চাপা দিয়ে আমি ডুকরে উঠি, ‘কত বড়ো ভুল! আমাকে সকলে সম্মান করে। আমি বিবাহিত। সন্তানের বাবা। বড়ো চাকরি করি। আমি কোথাও মুখ দেখাতে পারব না–!’

মিথিলা আমার পাশে সরে এসে বলল, ‘ছি বাবু, তুমি আমাকে এতটা খারাপ ভাবলে?’

আমি হঠাৎ আবেগে, মিথিলার হাতদুটো চেপে ধরে বললাম, ‘না, না, কথাটা এখানেই কি শেষ হয়ে যায় মিথিলা? পুতলি যখন আমারই মেয়ে, ওর প্রতি কিছু কর্তব্য তো আমারও আছে! সব জেনে আমিই বা কী করে চুপ করে থাকি? ওকে এখানেই বা ফেলে রেখে চলে যাই কোন প্রাণে!’

‘তুমি কিছু করব্যে বলে তো এ কুথা আমি জানাইনি, বাবু,’ মিথিলা শান্ত গলায় বলে, ‘বিশ বছর ধরে, উকে আমি এই শিমূল-পলাশের জঙ্গলে পালছি। উ গিয়ে তুমার চকচকে বাংলোয় কেমনে রইবে গো? উ তো পাগল হয়্যে যাবে। উ আদিবাসী। উর মা আদিবাসী। উ তাই এখানেই থাকবে। মায়ের কাছে। এই সমাজেই উর বেহা হবে। তুমি উকে লিয়ে যেতে পারবে লাই।’

মিথিলার গলায় হঠাৎ কাঠিন্য ভর করে। আটচালার দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ-ই ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তুমাকে কিছু না জানানোই ভালো ছিল, বাবু!’

ছুটে গিয়ে আমি মিথিলার হাত ধরলাম। অনুনয়ের সুরে বললাম, ‘রাগ কোরো না। তোমার মেয়ে তোমারই থাকবে। কোনওদিন ওর ‘বাবা’ পরিচয়ে ওর কাছে যাব না। আমি জানি, তাহলেই তোমাদের জীবনে ঝড় উঠবে। শুধু মাঝেমধ্যে এসে পুতলিকে একবার দেখে যাব। তুমি অনুমতি দেবে তো?’

মিথিলা আশ্বস্ত হয়ে মাথা নাড়ে।

‘আর-একটা কথা। পুতলি আমার মেয়ে। আমার ইচ্ছে ও স্কুলে পড়বে। বড়ো মানুষ হবে। তোমাদের গ্রামে মাস্টারমশাই তো আসেন! তুমি ওকে নিয়ম করে তাঁর কাছে নিয়ে যেয়ো– আমি খরচা…!’

আমায় থামিয়ে দিতেই যেন মিথিলা আকর্ণ হাসল। তারপর বলল, ‘তুমি সোজা পথে চলে যাও বাবু। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আর একটা চোরা রাস্তা আছে। আমি সেইটো দিয়ে আসছি।’

 

স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

বাথরুম থেকে মাঝেমাঝেই স্মিতার চুড়ির টুং টাং শব্দ আসছে। আর নাকে এসে লাগছে সুন্দর একটা সাবানের গন্ধ। অস্বচ্ছলতার মধ্যেও, এই একটা বিলাস স্মিতা ত্যাগ করতে পারেনি। স্নানের জন্য একটা সুগন্ধী সাবান সে ব্যবহার করে। আজ আর সকালে বেরোয়নি স্মিতা। নিশ্চয়ই অন্য কোনও কাজ আছে। তাই হয়তো একটু সময় নিয়ে স্নান করছে। ভিজে চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে একটা সুন্দর সুগন্ধের ঢেউ তুলে বাথরুম থেকে ঘরের দিকে গেল স্মিতা। একটুক্ষণ মুগ্ধ চোখে তাকিয়েই অনিকেতের মনে হল, খাবারটা বেড়ে দেওয়া দরকার। হয়তো খেয়েই বেরোবে স্মিতা। দুবেলা পরিশ্রম করে মুখ বুজে। এক এক সময় নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয় অনিকেতের।

খাবার বলতে কেবল ভাত, আর আলুভাতে। দুপুরের খাবারের তালিকায় কোনও সবজি নেই। মাসের শেষ। সংসারখরচেও তাই টান পড়েছে। অনিকেত একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে খেতে বসল। ‘তুমিও এসো, একসঙ্গে খাই’– খুব আন্তরিকভাবেই সে ডাকল স্মিতাকে। স্মিতা তার স্ত্রী। তার সন্তানের মা। একটা স্কুলে পড়ায়।

বাইরে থেকে দেখলে অনিকেতকে খুব সংসারী বলে মনে না হলেও দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের যথাযথভাবে পেট ভরানোর মতো খাবারের অভাব প্রতিদিনই সে টের পায়। স্মিতা সংসারের এই বেহাল দশা লুকোনোর চেষ্টা করে। কিন্তু অনিকেত তো লেখক, তার অতিসংবেদি মনের আয়নায় ধরা পড়ে যায় সব কিছুই। সে খাবার তুলতে পারছিল না মুখে। কেন এমন হয় যে, সম্ভাবনাময় লেখকেরা কখনওই কেবল লিখে জীবনধারণ করতে পারেন না? অনিকেত খুব জনপ্রিয় লেখক নয়। তার লেখার আবেদন এক বিশেষ শ্রেণির পাঠককুলের কাছে। সাধারণ পাঠক পাঠিকাদের কাছে সে ‘সিরিয়াস’ লেখক। বারো বছরেরও বেশি সময়ের লেখকজীবনে বিভিন্ন পত্রিকায় তার কমবেশি ৫০টি গল্প প্রকাশিত হয়েছে। যদিও না-ছাপা লেখার সংখ্যা অনেক বেশি।

এ যাবৎ মাত্র একটি গল্পসংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে অনিকেতের। প্রকাশক খুব নামি নয়। প্রত্যেকটি গল্পে অনিকেত ডুব দিয়েছে চরিত্রের মানসিকতার গভীরে। প্রত্যেকটি গল্পের শেষভাগে থাকে টানটান উত্তেজনা। যখনই কোনও পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হয়, অনিকেতের মানসিক জোর সেই সময়ের জন্য অনেকখানি বেড়ে যায়। পাশাপাশি যে সাম্মানিক পাওয়া যায়, তা যত সামান্যই হোক, তা দিয়ে সংসারের কিছু সুরাহা হয়। কিন্তু এরকম তো সবসময় হয় না!

‘বই ভালো বিক্রি হচ্ছে না দাদা’, প্রকাশকের মুখোমুখি হলেই তার এক কথা। কয়েকশোবার সে অনিকেতকে একথাটা বলেছে। অতএব, সে বেচারা আর কী করে রয়্যালটি দেয়। পত্রপত্রিকাগুলোও আজকাল ভালোর কদর না করে সাধারণ মানুষ যা চায় তাই ছাপতে উৎসাহী। ফলে সার্বিকভাবে সাহিত্যের গুণগত মানও কমে যাচ্ছে। ফলে প্রত্যেক মাসেই মূল পান্ডুলিপিসমেত ‘দুঃখিত, আপনার লেখাটি মনোনীত করা গেল না’ লেখা চিরকুট পাওয়ার পরও কোনও মনোজ্ঞ পাঠকের প্রশংসা অনিকেতকে নতুন লেখার উৎসাহ যুগিয়ে দেয়।

এই লেখালেখির প্রবণতাই আগের তিনটি চাকরি খোয়ানোর মূল কারণ। শেষ চাকরিটা যাওয়া ইস্তক অনিকেত খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছে। সে একজন বিবাহিত পুরুষ। বাড়িতে তার যুবতি স্ত্রী রয়েছে। রয়েছে ছোট্টো একটি শিশুসন্তান। কী করে এই সংসার চালাবে সে?

অনিকেতের মনে হয়, গৃহস্থ মানুষের স্বপ্ন দেখাই উচিত নয়। সে মাঝেমধ্যেই ভাবে, শেষ চাকরিটির মালিকের কাছে গিয়ে আবার হারানো চাকরিটি ফিরে পাওয়ার জন্য তদ্বির করে আসবে। যে-কোনও উপায়ে তাকে একটি চাকরি পেতেই হবে।

স্মিতা কিন্তু কোনওমতেই মানতে রাজি হল না সে কথা। সে স্পষ্ট বলল, ‘না অনিকেত। তুমি একজন সৃষ্টিশীল মানুষ । কেরানি নও। আমার তো একটা চাকরি আছে। কোনওরকমে দুমুঠো ডালভাত আমার টাকায় জুটে যাবে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমি জানি, তুমি একজন সর্বসময়ের লেখক হতে চাও। তাই হও। আমি তোমার পাশে আছি। দেখবে একদিন তোমার লেখার জন্য অনেক সম্মান পাবে তুমি। আর, তা যদি না-ও পাও, একথাটা তো ঠিক, এই কাজেই তুমি সবচেয়ে সুখী। সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

অনিকেতের দু’চোখ জলে ভিজে এল। কোনও কথা না বলে নীরবে সে শুধু তার দু’হাত স্মিতার দু’কাঁধে রাখল। আর কীভাবেই বা সে তার কৃতজ্ঞতা জানাতে পারে? স্মিতার স্যাক্রিফাইস ছাড়া তার যাবতীয় প্রচেষ্টা জলে যেত। তার প্রতিভার উপর স্মিতার আস্থা তাকে সাফল্যের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তুলল।

অনিকেতের লেখার ঘর বাড়ির সামনের দিকের ছোটো ঘরটা। সে লেখার টেবিলে বসতে গিয়ে দেখল দরজার কাছে মেঝের উপর ডাকবিভাগের দুটো খাম পড়ে আছে। ডাকপিওন এসে সম্ভবত জানলা দিয়ে ফেলে গেছে। অনিকেত খামদুটি হাতে নিল। সে আগে লম্বা খামটি নিয়েই পড়ল। খুব নামি পত্রিকা থেকে এসেছে।  এক মাস আগে এই ছোটোগল্পটা লিখে পাঠিয়েছিল অনিকেত। সেটাই ফেরত এসেছে, সঙ্গে ‘দুঃখিত, মনোনীত হল না’ লেখা চিরকুট। আলগোছে খামসহ পাণ্ডুলিপিটাকে টেবিলের উপর ফেলে দিল অনিকেত। দ্বিতীয় খামটা দেখে সে খুব খুশি হয়ে উঠল। খামের উপরে বাঁদিকে পত্রিকার নাম লেখা। মাস দুই আগে এই পত্রিকায় একটা অণু-উপন্যাস পাঠিয়েছিল সে। সাধারণ আকৃতির হালকা খামে সব সময় ভালো খবরই আসে।

তবু একটু উৎকণ্ঠা নিয়ে সে খামের মুখটা ছিঁড়ল। এবং দেখল, তার ভাবনাটাই ঠিক। লেখাটা মনোনীত হয়েছে। সম্পাদক অণু-উপন্যাসটি সম্পর্কে চিরকুটে লিখেছেন, লেখাটি ‘সুন্দর আর

সংবেদনশীল’ হয়েছে। সম্পাদকের মন্তব্য উদ্বেল করে তুলল তাকে। সাহিত্যের পাঠক-সমালোচক মহলে পত্রিকাটির গুরুত্ব রয়েছে। খুবই শিল্পমনস্ক ত্রৈমাসিক সাহিত্য-পত্রিকা হিসাবে যথেষ্ট নাম রয়েছে। আর সেই পত্রিকাই কিনা তার লেখাকে বলছে সুন্দর আর সংবেদনশীল!

পত্রিকাটির সাম্প্রতিকতম সংখ্যাটি দশদিনও হয়নি প্রকাশিত হয়েছে। এর একটি কপি সে কিনেওছে। যদি ধরেও নেওয়া হয় তার অণু-উপন্যাসটি আগামী সংখ্যাতেই প্রকাশিত হবে, তা হলেও এখনও তিন মাস দেরি। একটু দমে গেল অনিকেত। সাফল্যের স্বাদ পেতে তিন মাস সময়টা এমন কিছু বেশি নয়। কিছুক্ষণের জন্য চোখ বুজে বসে রইল সে। সাফল্যের স্বাদটা উপভোগ করতে চাইল। এরকম নামি পত্রিকায় আর কয়েকটা লেখা ছাপা হলেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তার একটা স্থায়ী জায়গা তৈরি হতে পারে। লেখাটি ছাপা হবে তিন মাস পরে। সাম্মানিক পাওয়া যাবে লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর। সে কি একবার সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করে কিছু অগ্রিম চাইবে? পেয়ে গেলে আজই পরিবারসমেত রাতে ভালোমন্দ কিছু খাওয়া যেতে পারে। পেটভরে খেয়ে একবার তৃপ্তির চোখে তাকাবে স্মিতা, এই তার সুখ। এই সুখের প্রতি যে খুব লোভ অনিকেতের!

পরমুহূর্তেই তার মনে হল, অগ্রিম চাওয়াটা কি উচিত কাজ হবে? একজন লেখকের কাছে আত্মমর্যাদা অনেক মূল্যবান। কী করে অনিকেত সেই আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেবে? একজন লেখক, যিনি ‘সুন্দর এবং সংবেদনশীল’ লেখালেখি করেন, তার কি এরকম ব্যবহার করা সংগত? স্মিতাই বা কী ভাববে?

‘অনিকেত,’ স্মিতা ডাকল। পরিপাটি সুতির শাড়ি পরে আছে। সুন্দর করে চুল আঁচড়ে ক্লিপে আটকেছে চুলের ঢাল। ডান কাঁধে হ্যান্ডব্যাগ। অন্য হাতে অনিকেত-স্মিতার সন্তান। ‘বেরোচ্ছি, বুঝলে? আজ একবার ডিআই অফিসে যেতে হচ্ছে। বাবানকে খাইয়ে দিয়েছি। দুপুরে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ো। রান্নাঘরে দুধ গরম করা আছে। বিকেলে ওকে খাইয়ে দিয়ো। কেমন? আমি তাড়াতাড়িই ফেরার চেষ্টা করব।’

‘আমি সব করে রাখব। তুমি কোনও চিন্তা কোরো না।’

মঞ্জুরি-চিঠিটাকে খামে ঢুকিয়ে রেখে অনিকেতও লিখতে বসল। সাড়ে চারটে নাগাদ হঠাৎ-ই তার পুরোনো সহকর্মী হরি এসে হাজির। অনিকেতের শেষ চাকরির জায়গায় গৌরহরি ছিল স্টেনোগ্রাফার।

‘কেমন আছো অনিকেত? আশা করি ভীষণ সৃষ্টিশীল হয়ে আছো।’ হাসতে হাসতে বলল হরি।

‘আরে, সেরকম কিছু না। ভেতরে এসো।’ ততোধিক আন্তরিকতা নিয়ে হরিকে আমন্ত্রণ জানাল সে।

‘কিন্তু, একটা কথা মানতেই হবে ভাই, তুমি দুর্দান্ত লেখো। সেদিন তোমার একটা বই পড়ছিলাম। প্রত্যেকটা গল্পই এত উচ্চমানের যে ভাবা যায় না!’

প্রশংসায় অনিকেতের মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে জানত, হরি মন-রাখা কথা বলার লোক নয়। সে সলজ্জ হয়ে বলল ‘থ্যাংক ইউ হরি। আগে তুমি বসো।’

অনিকেত খানিকক্ষণ কথা বলার পর উঠে চা করল। হরি অনেকদিন পরে এসেছে। ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে কফি খাওয়ানোর। কিন্তু কফির চেয়ে চায়ে কম দুধ দিতে হয়। সুতরাং সে চা-ই করল । ইতিমধ্যে ছেলেও উঠে পড়েছে। কিছুক্ষণ ছেলের সঙ্গে খেলল সে। খানিকক্ষণ পরে হরি আবার বলল, ‘এবার আর একটা বই প্রকাশ করো অনিকেত।’

‘ইচ্ছে হয়। যতই বিভিন্ন ম্যাগাজিনে একটা-দুটো করে লেখা বের হোক, বই হচ্ছে এমন একটা জিনিস যা আসলে একজন লেখকের আস্ত পরিচয় বহন করে। কিন্তু, আমার বই বের করবে কে, হরি? আমি সেই অর্থে জনপ্রিয় লেখক নই। আমার পাঠক সীমিত। আমার পাবলিশার তো বলে থাকে, আমার বই নাকি বিক্রিই হয় না।’

‘তাই নাকি? তোমাকে এই কথা বলেছে? বিক্রিই যদি না হবে তাহলে তোমার বই-এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হল কীভাবে?’

‘কী বলছ?’ অনিকেত উত্তেজনায় ঢোঁক গিলে বলল, ‘দ্বিতীয় সংস্করণ?’

‘আসলে আমি যে-বইটা পড়েছিলাম সেটা দ্বিতীয় সংস্করণ।’

‘বলছ কী? তুমি ঠিক দেখেছিলে?’

‘আলবাত।’

‘লোকটা তো পাকা জালিয়াত দেখছি! প্রত্যেকবার যখন রয়্যালটির জন্য গেছি, লোকটা মুখের উপর বলেছে, ‘আপনার বই বিক্রি হয় না’। একবার মাত্র রয়্যালটি দিয়েছে। প্রথম যখন বইটা বের হল, অগ্রিম হিসাবে দু’হাজার টাকা দিয়েছিল। সেও তিন বছর আগে। বলেছিল, বই বিক্রি হলে আস্তে আস্তে বাকি টাকা পাওয়া যাবে।’

‘ভালোমানুষকে কীভাবে ঠকতে হয় দেখেছ? একটা পুরো সংস্করণের জন্য কত পাওনা হয় তোমার?’

‘পনেরো হাজারের মতো।’

‘আর, এই সামান্য টাকার জন্য লোকটা তোমায় ঠকাল! তোমার বই-এর ভালো কাটতি হওয়া সত্ত্বেও!’

সন্ধে নাগাদ চলে গেল হরি। তার মুখ থেকে দ্বিতীয় সংস্করণ বের হওয়ার কথাটা জানা ইস্তক খুবই অশান্ত হয়ে ছিল অনিকেতের মনটা। স্মিতা ফিরতেই সে পুরো ঘটনাটা বিবৃত করল। বলল, ‘কাল বদমাশ লোকটার কলার চেপে ধরে আমি পুরো পাওনা বুঝে নেব।’

কলেজ স্ট্রিটের এক সরু অন্ধকার গলির মধ্যে তার বই-এর দোকানে নিশ্চিন্তে বসে ছিল বিপ্লব দত্ত। দোকানে কোনও দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। দূর থেকে অনিকেতকে আসতে দেখেই জোড়হাত করে উঠে দাঁড়াল সে। চোখেমুখে শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা, উৎসাহের ভঙ্গি মিশিয়ে বলল, ‘আসুন, আসুন অনিকেতবাবু। ভীষণ খুশি হয়েছি, আপনি এসেছেন। বসুন। বলুন, চা না কফি।’ তেতো গলায় বলল অনিকেত, ‘বিপ্লব, আমি তোমার আতিথেয়তা পেতে আসিনি। আমি কাজে এসেছি।’

‘ওঃ কাজ! আপনিও স্যার এমন বলেন–।’ দেঁতো হাসি হেসে বলল বিপ্লব। অনিকেত তার আপাদমস্তক ভালো করে দেখে নিল। চল্লিশের এপাশেই বয়স হবে। উজ্জ্বল সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবিতে খুবই স্মার্ট দেখাচ্ছে। নিষ্পাপ মুখচোখ বজায় রেখে একটা লম্বা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বিপ্লব বলল, ‘আপনি একজন এরকম উঁচুমানের লেখক, আপনিও কিনা সাধারণ লেখকদের মতো বিজনেসের কথা বলেন? মনে বড়ো ব্যথা দিলেন–।’

‘রয়্যালটি চাইছেন? কীসের রয়্যালটি স্যার? কতবার আমি আপনাকে বলব, আপনার বই একেবারেই…’

‘বিক্রি হয় না, তাই তো? বেশ, সেইজন্যে বুঝি বইটার দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপাতে হল?’

‘দ্বি-দ্বিতীয় সংস্করণ?’ হাসার চেষ্টা করে বিপ্লব বলল, ‘এইসব গল্প কে শুনিয়েছে আপনাকে বলুন তো?’ কোনও কথা না বলে অনিকেত উঠে দেয়ালের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত টানা বই-এর র‍্যাকগুলির দিকে এগোল। র‍্যাকের একধারে তার বইটির অসংখ্য কপি রাখা রয়েছে। সুন্দর সোনালি হরফে বইটির শিরোনাম ও তার নাম সে দেখতে পেল বাঁধাই-এর ধার বরাবর। প্রত্যেকবার যখন এই অফিসে বিপ্লবকে সে রয়্যালটির কথা বলতে এসেছে, এই তাকগুলিকে দেখিয়েই বিপ্লব বলেছে, ‘দেখেছেন তো, বইগুলি যেমন ছিল তেমনভাবেই রয়েছে। বিক্রিই হয় না। যদি বিক্রিই হতো, তাহলে কি আপনাকে রয়্যালটি দিতাম না, বলুন! অনিকেত কোনওদিনও তার কথায় অবিশ্বাস করে বইগুলো হাতে তুলে দেখেনি। নতমুখে বের হয়ে এসেছে। কী ভুলই যে করেছে! আজ আর সেই এক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না সে। সে দ্রুত পায়ে র‍্যাকের সামনে এসে দাঁড়াল। একটি কপি তুলে প্রচ্ছদ উলটে দ্বিতীয় পাতায় আসতেই মুদ্রণ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য চোখে পড়ল। হরি ঠিকই বলেছিল, অনিকেতও দেখল, লেখা আছে, ‘দ্বিতীয় সংস্করণ। ফেব্রুয়ারি ২০১৫’। বিপ্লবের টেবিলের উপর সশব্দে বইটির ওই পাতাটি খোলা অবস্থায় রাখল অনিকেত।

‘এর মানে কী বিপ্লব?’ বলতে গিয়ে গলা কেঁপে গেল তার।

‘স্যার, আমায় ভুল বুঝবেন না…আপনি জানেন না, কী ভীষণ আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে আমাকে।’ বিপ্লবের মুখ ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও ক্রমাগত কাহিনির জাল বুনে যাচ্ছিল সে। অনিকেত সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে সাফ বলল, ‘তোমাকে দেখে তা মনে হয় না। এই জায়গাটারও তো যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। শেষবার যখন এখানে এসেছিলাম, এটা ছিল একটা বই-এর দোকান। এখন তো দিব্যি প্রকাশনা সংস্থার মতো মনে হয়।’

বিপ্লব বলল, ‘না স্যার। সেসব কিছু হয়নি। বিশ্বাস করুন। আমার সত্যি অনেক আর্থিক দায়দায়িত্ব রয়েছে।’

‘আরে সে তো জানি! আমাকে আমার পাওনাটুকু মিটিয়ে দেওয়ার দায়িত্বই শুধু তোমার নেই। প্রথম সংস্করণের সবক’টি কপি বিক্রি হয়ে যাওয়ার দরুন আমার পাওনা হয় পনেরো হাজার টাকা। তুমি আমাকে দু’হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছিলে। সুতরাং এখন তোমায় দিতে হবে পনেরো হাজার মাইনাস দু’হাজার… এক্ষুনি আমার টাকাটা আমি চাই।’

‘স্যার, আমি ধারের টাকায় ব্যাবসা চালাচ্ছি। শুধুমাত্র এই আশায় যে, আমার বইগুলো ভালো ব্যাবসা করবে। সব লেখকরাই তো নামকরা। আর আপনি সকলের মধ্যে সেরা…’

‘আমি ওসব অনেক শুনেছি বিপ্লব। আমার টাকা…।’

‘স্যার, একটা কথা বোঝার চেষ্টা করুন। বই বাজারে কাটুক বা না কাটুক, কম্পোজিটর, প্রুফ রিডার, শিল্পী, ছাপাখানা, বাঁধাইওলা, পরিবেশক—ওদের সকলকে আমায় টাকা দিতে হয়।’

‘ওদের কেউ বিনা টাকায় কাজ করবে না, তাই না?’

‘ঠিক। ওরা কি ছেড়ে দেবে বলুন?’

‘অর্থাৎ, সবার সব পাওনা তোমায় মিটিয়ে দিতে হয়, শুধু লেখকদেরই না দিলেও চলে।’

‘স্যার, আমায় শুধু একটু সময় দিন। আমার সময়টা ফিরুক। এই মুহূর্তে আমার কাঁধে পরিবারের অনেক দায়দায়িত্ব রয়েছে। আমার বোনের স্বামী হঠাৎ মারা গেল…।’

‘তোমার অর্নগল মিথ্যে বলা আমায় ক্লান্ত করে বিপ্লব।’ অনিকেত দেখল, মিথ্যে ধরা পড়ে যাওয়ায় সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে বিপ্লবের। সে বলল, ‘আমি তো আপনার শত্রু নই। আমরা তো বন্ধু। এখন একটু টানাটানির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। দেখি, এই মুহূর্তে কতটা দেওয়া যায়…। আমি আপনাকে ইতিমধ্যে দু’হাজার দিয়েছি। এখন আরও হাজার দিচ্ছি। তাহলেই তিন হাজার হয়ে গেল। কী…?’ উৎসুক চোখে সে তাকাল অনিকেতের দিকে।

‘আমি দান-খয়রাত চাইছি না বিপ্লব। আমার পাওনা বুঝে নিতে এসেছি। চলি–।’ অনিকেত উঠে দাঁড়ায় ও চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়।

‘আরে, না না, যাবেন না। আমি না হয় আরও এক হাজার টাকা দিচ্ছি। বাকিটা, সত্যি বলছি, আস্তে আস্তে দিয়ে দেব।’

অনিকেত চলে যেতে গিয়েও দাঁড়াল। এখন হাতে দু’হাজার টাকা মোটেও কম টাকা নয়। বিশেষ করে এই সময়ে। পেলে সংসার নিয়ে ব্যাতিব্যস্ত স্মিতা অন্তত কয়েকদিনের জন্য হাঁফ ছাড়বে। কিন্তু বিপ্লব বাকি টাকাটা দেবে তো?

‘ঠিক আছে দাও দু’হাজার টাকা। এক মাসের মধ্যে বাকি টাকাটা কিন্তু দিতে হবে।’

‘নিশ্চয়ই স্যার, নিশ্চয়ই। তবে আমার অবস্থা…’

‘আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি স্যার। আপনি একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক। আপনার লেখারও আমি একজন ভক্ত। আসলে,’ চশমার উপর দিয়ে অনিকেতকে দেখে নিয়ে সে বলল, ‘আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে আপনার আর একটা বই আমায় দিন। আর একটা গল্পসংগ্রহ।’

অনিকেত একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘মানে?’

‘মানে, বলতে চাইছি, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এমন গল্প কি আছে আপনার কাছে। অপ্রকাশিত গল্প হলেও চলবে।’

‘বই বের করার টাকা কোথায় পাবে?’

‘ধার করব স্যার। এভাবেই তো করি। ঝুঁকি হলেও এবার আমি অনেকটা নিশ্চিত কারণ, আপনি খুব ভালো লেখেন। লোকেও আপনার লেখা নিতে শুরু করেছে। আপনার বই ভালো কাটলে আমার অন্য বইগুলোও পাঠকরা নেবে। আমি একটু সুখের মুখ দেখব স্যার। তখন আপনার সব পাওনাগণ্ডা মিটিয়ে দেব। যতটা ভাবছেন, ততটা অসৎ লোক আমি নই।’

অনিকেতের হূৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। এক আশ্চর্য কিশোরসুলভ উত্তেজনায় বড়ো বড়ো হয়ে গেল তার চোখদুটো। আর একটি বই! সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। ‘কতগুলো গল্প চাই তোমার বিপ্লব?’ বলতে গিয়ে গলা কেঁপে গেল তার।

বিপ্লব মৃদু হাসল। ‘কুড়িটার মতো গল্প দিতে পারবেন?’

‘কুড়িটার বেশি দিতে পারব। প্রকাশিত হয়েছে এমন গল্প, অথচ প্রথম বইতে নেই কিন্তু এবার আর পনেরো নয়, তোমাকে দিতে হবে পঁচিশ।’

অনিকেতের মনে হল, কেউ যেন তার ফুসফুসে বাড়তি কিছু তাজা অক্সিজেন ভরে দিয়েছে। পাবলিশারের অফিসের বাইরে এসে সে লাফিয়ে যখন বাসে উঠল, তার মনে হল, সে যেন নিজের মধ্যে নেই। যেন মাটিতে তার পা নেই। যেন সুখের সমুদ্রে সে ভেসে বেড়াচ্ছে। বসতে জায়গা পেল না সে, তবু একটুও অস্বস্তি হল না তার। বদলে সে ভাবতে লাগল কোন গল্পগুলো যথাযথ হবে। অনিকেতের মনের পটে ভেসে উঠতে লাগল তার প্রিয় সৃষ্টিগুলি। কোনওরকমে বাড়ি পৌঁছে স্মিতার হাতে রয়্যালটির টাকাগুলো তুলে দিতে সে খুব খুশি হয়ে উঠল।

স্মিতা বলল ‘বাঃ। তোমার প্রকাশক তাহলে তোমাকে কিছুটা রয়্যালটি দিল শেষ পর্যন্ত। বাকিটা কবে দেবে গো?’

‘জানি না… কিন্তু আমি আর ওকে এর জন্য চাপ দিতেও চাইছি না। বেচারা। ও নানারকম ব্যাপারে ফেঁসে আছে। তাছাড়া…, ‘এবার নরম আর নীচু হয়ে এল অনিকেতের গলা,’ ও আমার আর একটা বই প্রকাশ করতে চাইছে।’

‘তাই?’ রীতিমতো লাফিয়ে উঠে বলল স্মিতা।

‘আজ দিনটা বড্ডো সুন্দর। চলো স্মিতা, সেলিব্রেট করি। বাইরে কোথাও যাই। রাতের খাবারটা বাইরেই সেরে আসি। অনেকদিন পেটভরে কিছু ভালোমন্দ খাওয়া হয়নি। ছেলের জন্য আইসক্রিমও কিনে আনব।’

পরের সন্ধেয় অনিকেত গেল হরির কাছে। হরি বাড়িতেই ছিল। অনিকেত বলল, ‘হরি, কাল আমি তোমার অফিসে আসছি। ম্যানেজারবাবুকে একবার রিকোয়েস্ট করবে আবার একটা কাজের যাতে ব্যবস্থা করে দেয়? আমি ওকে বলব, আর কোনওদিন অফিসে বসে গল্প লিখব না। আমি একটু আর্থিক অনটনে আছি হরি, তুমি জানো। আমার হয়ে একটু বলবে ম্যানেজারবাবুকে?’

ঝলমলে গড়িয়াহাট, দুপাশে পশরা সাজিয়েছে দোকানদাররা। ট্রামটা এসে থামতেই এক লাফে উঠে পড়ল অনিকেত। বুকের বাঁদিকটা অনেকটা হালকা লাগছে আজ। একটা কিছু সুরাহা যেন হয়ে যাবে। যাবেই। হঠাৎই এই কৃতঘ্ন শহরটাকে যেন, অনেক বেশি উজ্জ্বল মনে হল অনিকেতের।

 

পাকদণ্ডি

কেউ ঝুঁকে পড়ে পায়ে হাত রাখতেই চমকে উঠল বন্দনা। ‘না-না, বলে সংকুচিত হয়ে উঠলেও যে প্রণাম করতে এসেছিল, সে কোনও ওজর-আপত্তি শুনতে আগ্রহী নয়। লোকটি চলে যাওয়ার পরই বন্দনা চোখ বন্ধ করে নিয়েছিল। এই সময়ে তার মন অতীত স্মৃতির নানা গলিপথে ঘুরে বেড়াতে শুরু করে। একের পর এক মুখ ভেসে উঠতে শুরু করল স্মৃতিপটে। অনেকগুলি মুখ ধোঁয়াশায় আবছা হয়ে এসেছে। মুখ মনে আসছে, অথচ মুখের মালিকের নাম মনে পড়ছে না। এখন কারওর উপরেই সে আর ভরসা করতে পারে না। তা সত্ত্বেও শৈশবের এক স্বভাব সে কখনওই ছাড়তে পারেনি। মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসিকান্নার পাশে থাকার অভ্যাসেই সে স্কুলের চাকরির পাশাপাশি সমাজসেবাকেও ব্রত হিসাবে নিয়েছে।

সন্ধে সাতটার সময় সুদর্শন পান্ডের বাড়িতে তার ছোটোছেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিল। বিশেষ ইচ্ছে ছিল না যাওয়ার। কিন্তু সুদর্শন তার সমাজসেবী সংস্থা ‘অর্চনা’র সদস্য। বন্দনা স্নান করল, আলমারি থেকে নামিয়ে একটা ময়ূরকণ্ঠী রঙের উজ্জ্বল শাড়ি পরল, সামান্য সাজল, বেরিয়ে পড়ল তারপর।

সুদর্শনের বাড়িতে আজ উৎসবের মেজাজ। ইতিমধ্যে অন্য অতিথিরাও দলে দলে আসতে শুরু করে দিয়েছেন। সকলের সঙ্গে বন্দনার পরিচয় করিয়ে দিয়ে সুদর্শন বলতে লাগল, ‘ইনি বন্দনা দত্ত, ‘অর্চনা’ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রধান।’কয়েকটি কৌতূহলী চোখ চমকে তাকাল বন্দনার দিকে। বন্দনা এ ধরনের দৃষ্টিপাতে অভ্যস্ত। আগে অস্বস্তি হতো তার। এখন আর হয় না। পঁয়তাল্লিশে পড়ল সে গতমাসে। হয়তো এখনও তার ধারালো চোখমুখ আর টানটান শরীর বাইরে লোকের কাছে আকর্ষক মনে হয়। কিন্তু, এরই পাশাপাশি তাদের চোখে অন্য একটা প্রশ্ন ফুটে উঠতে দেখে বন্দনা ভেবে কুল পায় না। সেই চোখগুলি প্রশ্ন করে, ‘এত সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও কেন আপনি বিয়ে করেননি বন্দনা?’

এককালে এইসব প্রশ্ন তাকে বিরক্ত করত, এখন আর করে না। এরই মধ্যে কোনও কোনও কৌতূহলী সাহসী পুরুষ তার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে। কারওর বাচ্চার অ্যাডমিশন নিয়ে সমস্যা, কারওর বা সংসারে পণ দেওয়া নিয়ে ঝামেলা। এসব কিছু না থাকলে সমাজসেবা করার ঝুটো ইচ্ছের ছুতোয় কাছে আসার প্রক্রিয়া জারি থাকে। অনেকক্ষেত্রে বন্দনা এমনও টের পেয়েছে, হয়তো কোনও সমস্যাই নেই, তবু, কোনও কোনও পুরুষ শুধু তার সঙ্গ পাবে এই আশায় তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে।

চিরকালই বন্দনার মধ্যে তার সামাজিক প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা এবং আত্মমর্যাদাবোধ খুবই বেশি। অভিজ্ঞতা থেকে সে শিখেছে, কার সঙ্গে কতটা কথা বলতে হবে, কার সঙ্গে কতটা দূরত্ব বজায় রাখা সংগত। সুদর্শনের ঘরোয়া পার্টি খুব জমে উঠেছিল। খাওয়াদাওয়ার ভালো বন্দোবস্ত, বন্দনা দেরি করল না। এমনিতেই তার শরীরটা খুব একটা ভালো নেই। সামান্য কিছু খেয়ে সে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছোতে চাইছিল। প্লেটে খাবার নিয়ে দু-এক চামচও খায়নি, এমন সময় পাশে এসে দাঁড়াল বিজন। নিজের প্লেট হাতে নিয়ে সে বন্দনার পাশে দাঁড়িয়ে কথায় কথায় বলল  ‘আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’

বন্দনা একটু অবাক চোখে তাকাতেই সে ফের বলল, ‘আপনিই তো মৃদুলাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক রাস্তায় ফিরিয়ে এনেছেন।’

মৃদুলা বিজনের একমাত্র মেয়ে। যে-স্কুলে বন্দনা অধ্যক্ষ, সেখানেই পড়ে মৃদুলা। অনেকদিন ধরেই তার নামে নানা অভিযোগ আসছিল। ক্লাসরুমে অনুপস্থিত থাকে। ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়, অভিযোগের কোনও অন্ত নেই। উপায়ান্তর না দেখে বিজন তখন বন্দনার দ্বারস্থ হয়। সেই ওদের প্রথম দেখা। তারপর বেশ কয়েকবার বিজন এসেছে তার কাছে। অনেক কষ্টের কথা বলেছে। বন্দনা এখনও বোঝে না, কোনওরকম আকর্ষণ থেকেই কি সে তার কাছে আসত? নাকি, সত্যিই সে ব্যতিব্যস্ত ছিল তার মেয়ের ব্যাপারে?

সে সময় বন্দনা মৃদুলাকে ডেকে অনেক বুঝিয়েছিল। বুঝিয়েছিল, নদীর জল আর সময় কারু জন্য অপেক্ষা করে না। সময় থাকতে থাকতে তার যথাযথ উপযোগিতাটাও জরুরি। তাতে ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর ও সুখের হবে। তার কথায় কী যে জাদু থাকে, যে-শোনে সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো শোনে। এসব ঘটনার পর একদিন হঠাৎ-ই বিজন এসে হাজির। তার নিশ্চিন্ত মুখচোখ দেখে খানিকটা স্বস্তি পেল বন্দনা। বিজন বললছ ‘মৃদুলা খুব প্রশংসা করে আপনার। এখন তো দেখছি বাড়িতেও খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করছে।’উপকারের কথা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু, বিজন সেই বিরল প্রকৃতির মানুষ, যে, কৃতজ্ঞ থাকতে ভালোবাসে আর বারবার সেই কথার পুনরাবৃত্তি করে বন্দনাকেও কিছু ভুলতে দেয় না।

‘আচ্ছা ম্যাডাম, রাজনীতির জগতের মানুষজনও তো সকলেই আপনাকে চেনে। আপনার এক কথায় কত লোকের কত কাজ হয়ে যায়!’

একটু হকচকিয়ে গেল বন্দনা। তার ব্যাপারে বিজন এত খবর রাখে কেন? মনের দোলাচল তার কথাতেও বের হয়ে এল,  ‘আপনি তো দেখছি, আমার সম্পর্কে প্রচুর খবর রাখেন।’

‘সত্যি বলতে কি ম্যাডাম,’ বিজন বলল, ‘ব্যাপারটাকে কাকতালীয় বলতে পারেন, কিন্তু, আপনার অতীত ও বর্তমানের অনেক কথাই আমার জানা।’

বন্দনা হেসে ফেলল, ‘আমার সম্পর্কে এত কিছু যখন জানেন, তখন নিশ্চয়ই আমার ভবিষ্যৎটাও জানেন আপনি!’

একথা শুনে একটু চুপ করে রইল বিজন। তারপর নীচু গলায় কেটে-কেটে বলল, ‘ভবিষ্যৎ তো আপনার নিজেকেই স্থির করতে হবে।’ তারপর হঠাৎ-ই সে খুব গম্ভীর হয়ে গেল।

সেদিন পার্টি শেষ করে বাড়ি চলে আসার পর থেকে বেশ কিছুদিন বন্দনা বিজনের কথাগুলি ভাবছিল। ভাবছিল, কী বিচিত্র মানুষ এই বিজন! বলে কিনা তার অতীত-বর্তমান, সবকিছু সে জানে! বন্দনার অতীত… কোন অতীত?

বন্দনার বাবা ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির সক্রিয় কর্মী। একসময় অনেক লড়াই দেখেছে বন্দনা, ঘরে-বাইরে। পার্টি গড়ে ওঠার সময়ে বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন স্যাক্রিফাইস করেছেন। অত্যধিক পরিশ্রমে বন্দনার বাবার শরীর ভেঙে গিয়েছিল শেষদিকে। সেই টালমাটাল সময়ে বন্দনা দেখেছে কী প্রচণ্ড কষ্টে সংসার সামলেছেন মা! বিএ পাশ করেই তাই বন্দনাকে চাকরির খোঁজে বের হতে হল। অন্য আর পাঁচটা সমবয়সি মেয়ের কাছে সেই সময়টা ছিল চোখে রঙিন স্বপ্নের জাল বোনার। আর তখনই স্বপ্ন দেখার সঙ্গে বন্দনার ছিল আড়ি। কাঁধের উপর যে বিরাট সংসারের দায়! সুজয়, আরাধনা দুই ভাইবোন, আর মা। পুরো সংসারকে টানতে স্কুলের চাকরির পরেও বাড়িতে কোচিংক্লাস খুলতে হল বন্দনাকে। তারপর হঠাৎ-ই একদিন মা’ও মারা গেলেন। মাথার উপর আর রইল না কেউ। ওই সময় বড়ো অসহায় হয়ে পড়েছিল বন্দনা। সময় সব ক্ষত মুছিয়ে দেয়। জীবনের স্বভাবই হল গড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু সুজয় আর আরাধনার সংসার সাজিয়ে দিয়ে যখন সে একটু নিজের দিকে তাকানোর সময় পেল, দেখল, চুলে ততদিনে পাক ধরেছে।

অতীতের ইতিহাসের পাতা উলটালে তার চোখ জলে ভিজে আসে। মনে হয়, এক পলকে সে পৌঁছে গেছে সেই গাঁ-এ, যেখানে দাদু-দিদা’র সঙ্গে কয়েকদিন খুব আনন্দে কেটেছিল। সারাদিন গ্রামের সমবয়সি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ছুটোছুটি করে প্রজাপতি ধরে বেড়ানোর সুখ ভোলা যায় না। ভোলা যায় না, তারপর পাকদণ্ডি পথ বেয়ে অনেক বেশি রাস্তা ঘুরে দেরি করে বাড়ি ফেরা …।

ওই কয়েকটা বছর সংসারের উপর দিয়ে খুবই ঝড়ঝাপটা গেছে। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া বাবা কোনওভাবেই কোনও চাকরির ব্যবস্থা করে উঠতে পারছিলেন না। বাধ্য হয়েই দাদু-দিদা, মা আর ভাইবোনদের নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়িতে। আস্তে আস্তে ভাইবোনরাও বড়ো হচ্ছিল। বাবা বাধ্য হয়ে শহরে নিয়ে এলেন সকলকে। এখন এই নিশ্চিন্ত জীবনের অবসরে চোখ বুজলেই গ্রামের সেই পাকদণ্ডি পথ চোখে ভাসে। পাকদণ্ডি হচ্ছে সেই পথ, যেটি মানুষের চলাচলের মাধ্যমে আপনা-আপনিই তৈরি হয়ে যায়।

বন্দনা নিজেও জানে, সারাজীবন ধরে সে পাকদণ্ডিই হয়ে রইল। চেনাপরিচিত মানুষজনের কাছে, এমনকী ভাইবোনদের কাছেও। একমাত্র বিজন অন্যরকম। যখনই দেখা হয়, অত্যন্ত আন্তরিক হাসিতে সে অভিবাদন জানায়। বিজনের ভাবনাচিন্তার ধরন ভালো লাগে বন্দনার। কিন্তু, সে তার অতীত বিষয়ে কী জানে, সেটা জানার আগ্রহ থাকলেও সংকোচবশত কোনও কথা জিজ্ঞেস করতে পারে না বন্দনা। অতীত… কোন অতীত? এ প্রশ্ন কতবার তার ঠোঁটের ডগায় চলে এসেছে। শেষ মুহূর্তে সামলে নিয়েছে বন্দনা। অনেকদিন হল, বিজন আসেনি। স্কুলে মৃদুলার সঙ্গে দেখা হতে বন্দনা তার কাছে বিজনের কথা জানতে চাইল। মৃদুলা জানাল, তার বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বিজনের ব্যক্তিত্ব আর শালীনতাবোধ সেই প্রথমদিন থেকেই বন্দনাকে মুগ্ধ করে। হয়তো এইজন্যই সে ঠিক করল, এক সন্ধেয় বিজনকে সে দেখে আসবে।

বিজন শুয়ে ছিল, বন্দনাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি উঠে বসল সে। ‘আরে, ম্যাডাম…। আপনি…,’ তার মুখে যেন প্রথমে কোনও কথাই জোগাল না। বিছানা থেকে উঠে বসার চেষ্টা করতে যেতেই বাধা দিল বন্দনা, বলল ‘আপনি উঠবেন না, শুয়ে থাকুন। মৃদুলা বলল আপনি অসুস্থ, তাই, দেখতে চলে এলাম।‘ যেন কোনও ঘোরের মধ্যে থেকে বন্দনার প্রশ্নের জবাব দিতে থাকল বিজন। তারপর হঠাৎ-ই বিছানার উপরে সোজা হয়ে বসে বলল, ‘বন্দনা, এখনও কি তোমার প্রজাপতি ধরার শখ আছে?’

বন্দনা চমকে উঠল। দুটো কারণে। বিজন ‘আপনি’র সম্পর্ক ভেঙে দিল। সচেতনভাবে ভেঙে দিল নাকি? পাশাপাশি, প্রজাপতির পিছনে ছোটার প্রসঙ্গও তাকে খুব আশ্চর্য করে দিল। ‘তুমি… আপনি…,’ কোন সম্বোধনে কীভাবে যে কথা শুরু করবে তাই বুঝে উঠতে পারছিল না বন্দনা।

‘তুমি-ই চলুক না বন্দনা…। তোমার মনে আছে, তোমার প্রজাপতি ধরার অভিযানে একজন থাকত, বিজু নামে?’ বন্দনার দিকে সরাসরি না তাকিয়েই বলল বিজন।

‘আরে…?’ বলতে গিয়ে খুশি উছলে পড়ল বন্দনার গলায়। মনে হল, সত্যি সত্যি আর একবার সে প্রজাপতি ধরার সেই বয়সে পৌঁছে গেছে। ‘ছোটোবেলাটা কী আশ্চর্য, তাই না? ছেড়ে গিয়েও যেন আজীবন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। আরে… সেইজন্যেই তুমি বারবার বলতে আমার অতীতের কথা জানো?’  বালিকাসুলভ খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠল বন্দনার চোখে। সে ঘরের চারদিকে চোখ বুলিয়ে জানতে চাইল, ‘মৃদুলাকে দেখছি না, সে কোথায়?’

‘মৃদুলা বন্ধুর বাড়ি গেছে।’

‘আর ওর মা?’, জিজ্ঞেস করল বন্দনা। একটা কৌতূহলও ছিল। বিজনের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যতবার দেখা হয়েছে, ওকে একাই দেখেছে। ‘সে নেই বন্দনা,’ গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বিজন বলল, ‘মৃদুলার যখন দশ বছর বয়স, তখনই ওর মা…।’

সেদিনের পর থেকে বন্দনার সঙ্গে প্রায়ই বিজনের দেখা হতে থাকল। বন্দনা তার চাকরি ও সমাজসেবা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও কেন কে জানে, বিজনের ফোন এলে সে খুশি হয়ে উঠত, আর বিজনের সঙ্গে দেখা করা আর কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল তার মন। সরষেখেতের পিছনে প্রজাপতি ধরতে যাওয়ার দিনগুলির স্মৃতি তাকে যেন তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত।

বন্দনার জীবনে কখনও প্রেম আসেনি। মাঝেমধ্যে একা থাকলে বন্দনা ভাবতে বসত, এই যে বিজনের জন্য একটা আকুলতা সে টের পায় মনের মধ্যে, একেই কি প্রেম বলে? ভিতরে ভিতরে এক ভীষণ যন্ত্রণা অথচ উপর-উপর সব শান্ত। যে-যার নিজস্ব সামাজিক মর্যাদার জালে বন্দি, যে-যার নিজস্ব খোলসে আবদ্ধ।

সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। বন্দনা যদিও টিচার্স রুম-এ বসে না, তবু, কানে এল, বন্দনা এবং বিজনের একসঙ্গে ঘোরাফেরার বিষয়টিকে অনেকেই রীতিমতো চর্চার বিষয় করে তুলেছে। বন্দনা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। সারাজীবনে অন্য লোকে কী ভাবল তা নিয়ে আদৌ ভাবেনি সে। কিন্তু, এখন তার একটা সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। নিজেকে কি তাহলে সে গুটিয়ে নেবে? কিন্তু, মন কেন চাইছে অন্য কিছু? কেন বালিকার মতো অবুঝ হয়ে উঠছে? আবেগে ভেসে নিজের সব প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদাকে কি সে বিসর্জনের চতুর্দোলায় তুলে দেবে? অনেক ভেবে বন্দনা স্থির করল, মনে লাগাম পরানো দরকার। বিজন এরপর থেকে ফোন করে দেখা করতে চাইলে সে ঘুরিয়ে অসম্মতি জানাতে শুরু করে দিল। বেশ কিছুদিন ‘না’  শোনার পর বিজনও ফোন করা বন্ধ করে দিল।

জীবন দৌড়ে চলছিল। প্রথম-প্রথম একটু অস্বস্তি হলেও বন্দনা কাজকর্মের মধ্যে ভুলে থাকার চেষ্টা করছিল রুদ্ধ আবেগ। কিন্তু হঠাৎই একদিন মৃদুলার এক কাণ্ড বন্দনা আর বিজন দুজনকেই চমকে দিল।

তার সমাজসেবী সংস্থার দফতরে বসে ফাইলপত্র ঘাঁটছিল বন্দনা। দেখা করতে আসা মানুষজন খানিকক্ষণ আগেই বিদায় নিয়েছে। সন্ধে হয়ে এসেছে। হঠাৎ-ই ফোন। বন্দনা ‘হ্যালো’ বলতেই, ওপার থেকে মৃদুলা বলে উঠল, ‘ম্যাডাম, বাবা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আপনি এক্ষুনি একবার আসতে পারবেন? আমি কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।‘ মৃদুলার উদ্বেগ-মাখা কণ্ঠস্বর খুবই বিচলিত করে দিল বন্দনাকে। ফোন রেখে কোনওমতে রাস্তায় নেমেই সে ট্যাক্সি ধরল।

বিজনের বাড়ির দরজায় ট্যাক্সি থামতে নেমে পড়ল বন্দনা। ট্যাক্সিওলাকে ভাড়া মিটিয়ে খুচরোও ফেরত নিল না। কিন্তু বিজনের ঘরে ঢুকে সে সত্যিই চমকে উঠল। বসার ঘরের হেলানো চেয়ারে দিব্যি পা তুলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল বিজন। শরীরে অসুস্থতার কোনও লক্ষণ পর্যন্ত নেই। সে বলে উঠল ‘আরে, তুমি তো দেখছি দিব্যি সুস্থ আছ। মৃদুলা যে বলল তোমার ভীষণ শরীর খারাপ?’

‘তাই নাকি,’ অবাক হওয়া গলায় বিজনও বলে ওঠে, ‘মৃদুলা এরকম বলবে কেন?’ তাদের কথাবার্তার মাঝখানেই পাশের ঘর থেকে বের হয়ে এল মৃদুলা। বলল, ‘আমি বলছি বাবা, কেন ফোন করেছিলাম।’

মৃদুলার কথায় বিজন ও বন্দনা দুজনেই বিব্রত হয়ে পড়ল। দুজনের অর্থবহ দৃষ্টিবিনিময় হল। দুজনের মনেই সম্ভবত একই ভাবনা খেলা করতে থাকল, তাদের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে কোনও গুরুতর অভিযোগ করতে চায় নাকি মৃদুলা! বন্দনার মনে একটা গ্লানি এল। নিজের বয়স ও সম্মান ভুলে তার কখনওই এরকম আচরণ করা ঠিক হয়নি। কেন এত বড়ো ভুলের পথে পা বাড়াল সে! এখন তো এর মাশুল গুনতেই হবে। নিজের হূদস্পন্দনও তার কানে আসছিল।

ঘরের মধ্যের দমবন্ধ ভাবটা কাটিয়ে তখনই মৃদুলা হেসে বিজনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, ‘বাবা, আগে আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।‘ বিজন খুব বিব্রত চোখে দেখল মৃদুলাকে। মৃদুলা হাসি ধরে রেখে বলল, ‘আজকাল তোমরা দুজন আর একসঙ্গে কোথাও বের হও না কেন?’

দুজনের কেউ-ই এই প্রশ্ন আশা করেনি। চমকে উঠে দুজনেই দুজনকে দেখল। খানিকক্ষণ ঘরে যেন হাওয়াবাতাস বন্ধ হয়ে রইল। তারপর বিজনই নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে বলল, ‘সময় কোথায় পাই মৃদু?’ মৃদুলা হাসল না, বলল ‘কথাটা আন্টি বললে মানা যায়। নিজের চাকরি ছাড়াও তার অনেক কাজ। তা সত্ত্বেও তো উনি সময় বের করতেন।’

মৃদুলার এমন স্পষ্ট কথায় লজ্জা পেল বন্দনা। চোখ তুলে একবার মৃদুলার দিকে তাকাতেই তার চোখে দুষ্টুমির রং দেখতে পেল সে। ‘আচ্ছা, সে না হয় ঠিক আছে! কিন্তু, আগে বলো, আমাদের দুজনের একসঙ্গে ঘোরাফেরা করাটা কি তোমার অপছন্দ?’ জিজ্ঞেস করল বন্দনা।

‘একদম নয়,’ মৃদুলা বলল।

মৃদুলা নয়, বরং মা-হারা এক মেয়ের গলায় ভালোবাসা আর স্নেহের চাহিদা ঝরে পড়তে দেখল বন্দনা। তার চোখদু’টিও আবেগে ভিজে এল।

‘বাবা, তুমি নিজেই জানো না, তুমি কতটা অসুস্থ!’ একথা বলেই মৃদুলা বন্দনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আন্টি ওই দিনগুলোতে বাবার চেহারায় কত জৌলুস ছিল! যেন নতুন জীবন পেয়েছে বলে মনে হতো! অথচ, এখন…।’ মৃদুলার কথায় বিজনের দিকে তাকাল বন্দনা। মৃদুলা ঠিকই বলেছে, একই অনুভবের সাগরে সে ও বিজন দুজনেই সাঁতার কেটেছে এতদিন।

‘আর এখন…।’মৃদুলা তার বক্তব্য জারি রাখে, ‘বাবা বিকেল থেকে মনমরা হয়ে বসে থাকে। হয় টিভি দেখে, নয়তো বাসি খবরের কাগজটাই দু’বার, তিনবার করে পড়ে। বাবার মনমরা ভাবটা তুমিই দূর করতে পারো আন্টি।’

বন্দনার মনে হল, মৃদুলাকে যতটা বালিকা ভাবত সে ও বিজন, সে ততটা ছোটো আর নেই। বন্দনাকে, তার এই পরিণত বয়সেও একরাশ লজ্জা যেন ঢেকে ফেলল। তার বিব্রত ভাব কাটাতে এবার বিজনই বলে উঠল, ‘মৃদু, বাকি জীবন একসঙ্গে চলার ফয়সালা তো আমরা করেই ফেলেছি! আমাদের সিদ্ধান্তকে তুমি কীভাবে নিলে সেটাও একবার আমরা যাচাই করে নিতে চেয়েছিলাম।’

‘বাবা…,’ মৃদুলা খুশিতে উদ্বেল হয়ে উঠে এক হাতে বিজন, অন্য হাতে বন্দনার হাত ধরে বলে উঠল  ‘আমি একলা থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছি বাবা। আমারও মায়ের হাতের ছোঁয়া পেতে ইচ্ছে করে…।’ মৃদুলার চোখের কোনে টলটল করা জল বন্দনার মাতৃহূদয়কে উদ্বেল করে তুলল। হঠাৎ-ই মনে হল, এই ভালোবাসার জন্য এতকাল মরুভূমি হয়ে ছিল তার মনের ভিতরটা।

মৃদুলা পাশের ঘরে চলে যেতেই বিজন বলল, ‘বন্দনা, তোমার কোনও আপত্তি নেই তো?’

‘কীসে আপত্তি?’ খুব অবাক চোখে বিজনের দিকে তাকিয়ে বলল বন্দনা। আবার একটা পাকদণ্ডির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বন্দনা। কিন্তু এই পথটা যেন তার আর অচেনা ঠেকছে না।

‘না, মানে…।’ কোনওমতে বলল বিজন।

‘আর না-মানে, না-মানে করতে হবে না। অনেক হয়েছে, এবার ওঠো। মৃদুলাকে নিয়ে আজ রাতের খাবারটা বাইরেই সারব। দেখলে না মেয়েটা কত দুঃখী!’

 

ছেলেধরা

আমি উত্তমকুমার।

হাবরা থানার সেকেন্ড অফিসার টেবিল থেকে মুখ তুলে দুটো ভ্রূ যথাসম্ভব কাছাকাছি আনলেন। তাঁর চোখের শ্লেষ ও বিরক্তির জিজ্ঞাসায় কিছুটা থতমত, টেবিলের অপর প্রান্তের দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি গড়গড় করে বলতে থাকে– মানে আমি উত্তমকুমার দাম। আজ ২টো ২০-র বনগাঁ লোকালে আমার পিক্পকেট হয়েছে। হাজার দেড়েক টাকা ছাড়াও ওয়ালেটে ছিল ব্যাংকের ডেবিট কার্ড। আর পকেটের মোবাইলটাও গেছে। হাবরা থানার সেকেন্ড অফিসারকে এটুকু বলতেই ঘেমে একসার। আসলে থানা-পুলিশ নিয়ে তার দুর্বলতা আছে।

সেদিনও ঘেমে নেয়ে দুপুর রোদের ভেতর এক সংবাদপত্রের অফিসের বিজ্ঞাপন বিভাগে ঢুকে কাগজে লেখা টুকরোটি দিয়েছিল। ‘আমি উত্তমকুমার দাম। বয়স পঁয়ত্রিশ। অবিবাহিত। কর্পোরেট সংস্থায় চাকুরে। বিবাহে ইচ্ছুক। দ্রুত যোগাযোগ করুন।’সেদিন মঙ্গলবার, পরের রোববারের কাগজে বেরিয়ে যাবে বিজ্ঞাপন। সুইং ডোর ঠেলে পথে নেমে পড়ে। দেখা যাক। নীরদ চৌধুরির কথাটা প্রেমে ল্যাং খাবার পর প্রতিদিনই চোখের সামনে ভেসে উঠছে– ‘বাঙালিরা কোনও কাজ নিজে নিজে করতে পারে না, এমনকী নিজের বিবাহটাও নয়।’ দেখা যাক। গোটা ব্যাপারটাই নিজের হাতে করব। ছাঁদনাতলা থেকে রাঁধুনি– সব নিজের হাতে করব। এমনকী করবীকে নিজের হাতেই বিয়ের আমন্ত্রণপত্রটি দিয়ে চা খেয়ে আসব। বিয়ের একটা ডেট ঠিক করে ফেলা যাক। ১৮ অগ্রহায়ণ। শুক্রবার। ঠিক থাকল। না অন্য কেউ দিন ঠিক করবে না। যে মেয়ে বিয়ে করবে তাকেও ওই দিনেই বিয়ে করতে হবে। কোনও পালটাপালটি নয়। কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে আজই কার্ডের নমুনা টমুনা দেখে আসতে হবে। বিয়ের কার্ড অন্তত শ’পাঁচেক ছাপতে হবে। রাসবিহারী কানেক্টরে বোসপুকুরের কাছে বিয়ে বাড়িটার যেন কী নাম– ‘নীলিমা’! অগ্রিম দিয়ে আসতে হবে। ভাবতে ভাবতে দুপুর রোদের ভেতর হেঁটে হেঁটেই ডালহউজি নিজের অফিসে ফিরে আসে।

বেশ ছটফট করছে সে। বুকের ভেতর অশান্তি নামে নাছোড় এক পদার্থ গড়িয়ে গড়িয়ে ছেয়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীরে। রক্তের প্রবাহ পথে, তার মনে হচ্ছে সমস্ত শরীরেই এই আনচান ভাবটা ঢুকে পড়েছে। মনে পড়ছে গত পরশু দিন বিকেল বেলায় ওই যে শব্দের ছোবল কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করল– তারপর থেকেই এই অস্থিরতা। গত দুবছরে কতদিনই তো রেস্তোরাঁয় বসে চা-কফি খেতে খেতে পায়ের আশ্লেষে হূদয়ের আকুলতা প্রকাশ করেছে উত্তম। তাতে তো সায়ই দিয়েছে করবী, ওর নগ্ন দু-পা আরও প্রলম্বিত করে। অথচ পরশু শান্তনুর কথাটা তুলে পার্ক স্ট্রিটের ফেলিনি-তে টেবিলের তলায় পা দিয়ে পায়ে ছোঁয়া লাগাতেই, খাঁচার বাঘিনীর মতো গর্জে উঠেছে করবী। ইউ রাসকেল্ হোয়াই আর ইউ প্রেসিং সো হার্ড! মাইন্ড ইট দ্যাট ইউ আর অ্যাবভ থার্টি-ফাইভ, হোয়ারআজ  আই এম টোয়েন্টি টু অনলি। থতমত উত্তম করুণ করে বলেছিল– মানে!

কোনও মানে নেই। সব কথার উত্তর তোমাকে দিতে হবে তার কোনও মানে নেই। শান্তনুও আমার ভালো বন্ধু, তার সাথে আমি সিঙ্গাপুরে যেতেই পারি। বড়ো কথা কোম্পানি আমাদের পাঠাচ্ছে সিঙ্গাপুরে, কোম্পানির স্বার্থেই। উত্তম ভালো করে জানে না কী কোম্পানি, তাদের কী ব্যাবসা সিঙ্গাপুরে। একটা দম নিয়ে পুনরায় করবী বলে, তোমার গায়ে জ্বালা হচ্ছে যখন, লেট মি সে টাটা, বাই। করবী টেবিলটাকে এমন পুশ্ করে উঠে পড়েছিল যে ঝুঁকে থাকা উত্তমের বুকে এসে সজোরে ধাক্বা মারে। উত্তম কোনও কথা বলতে পারেনি। বুকে হাত বোলাতে বোলাতে করবীর তেজী ভঙ্গির ক্ষীপ্র গমনটিকে চোখে গেঁথেছিল, বুঝে উঠতে পারেনি। যেভাবে ভারী কোনও আঘাত প্রথমে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে অনুভবহীন করে দেয়– কিছু পরে মস্তিষ্কের নিউরনে যন্ত্রণা পাঠাতে থাকে, তেমনই।

বিয়ে করল উত্তমকুমার। পাত্রীও তার পছন্দের। নম্রস্বভাব। সুশ্রী, সুন্দরী। বিয়ের পরেই প্রেম করবে ভাবল সে। অনেক ভালোবাসবে। ওকে ভালোবেসেই বুকের জমানো অন্ধকার দূর করে ফেলবে। বিয়ের রাতে তৃণাকে উত্তম এক অবসরে জিজ্ঞাসা করেছে– কি, বর পছন্দ? মুখে সলজ্জ হাসি টেনে মাথা নেড়ে ইতিবাচক মতামত জানিয়েছে। উত্তম জানিয়েছে দিন দশেকের মধ্যেই তারা বেরিয়ে পড়বে হানিমুনে। কাঠমান্ডু যাবে। সেখান থেকে ফেরার পথে বেনারস, লখনউ হয়ে একমাস পরে বাড়ি ফিরবে। দশ লাখ টাকা খরচ করবে হনিমুন টুরে।

এসব শোনার পর তৃণা আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসেছিল উত্তমের। মেয়েবাড়িতে এর বেশি এগোনো যায় না। শুধু ছোঁয়াছুঁয়ি আর আকার-ইঙ্গিতে ভালো লাগা ব্যক্ত করা যায়। বউভাত ও তার পরের কয়েকদিন উত্তমের অসাধারণ কেটেছে। বউভাতে করবীও এসেছিল শান্তনুকে নিয়ে। উত্তম করবীকে নিয়ে বউ-এর সাথে আলাপ করিয়েছে। উদ্দেশ্য আরও কাছ থেকে দ্যাখো, দ্যাখো কে বেশি সুন্দরী– তুমি না আমার বউ। খুব বয়স নয় তৃণার, ২৫-এর কাছাকাছি হবে। উত্তম করবীর মুখের নানা পরিবর্তন দেখে নিজেকে তারিফ করেছে। করবীকে বিট্ করতে পারার এই আনন্দেই যেন কটা দিন চলে গেল। এরপর দ্বিরাগমনের প্রথা ট্রথা কাটিয়ে অফিসে জয়েন করেছে। হনিমুন ট্রিপের জন্য গোছগাছ।

এসময় উত্তমের জন্য আবার একটি ভয়ংকর আঘাত অপেক্ষা করে ছিল। অফিস ফেরত দেখে বউ বাড়ি নেই। বৃদ্ধা মা জানায় সকাল বেলায় এগারোটা নাগাদ ট্যাক্সি ডেকে একটা বড়ো সুটকেশ নিয়ে বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে। উত্তম ফোন বাজায় কেউ ফোন ধরে না। উদ্বিগ্ন উত্তম ঠিক করেছে সকাল হলেই সে শ্বশুড়বাড়ি যাবে খোঁজখবর নিতে। পরের দিন সকালের ঘুম ভাঙে তার কলিং বেলের আওয়াজে। ঘুম চোখেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে দেখে একজন পুলিশ অফিসার, সঙ্গে দু-তিনজন কনস্টেবল।

– আপনি উত্তমকুমার দাম?

ভ্যাবাচ্যাকা উত্তম কিছু না বুঝেই ঘাড় নাড়ে।

আপনি আমার সঙ্গে চলুন, কড়েয়া থানায়। আপনার উপর বধূ নির্যাতনের অভিযোগ আছে। আপনাকে দেখে সম্ভ্রান্ত মনে হয়, কিন্তু টাকার জন্য এরকম ফুটফুটে মেয়ের শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকায় বীভৎস দাগ করে দিতে পারেন? ক্যাশ টাকা দিয়েছিল ওরা তিন লাখ, আর আপনার আরও দু লাখের ডিমান্ড ছিল!

উত্তমের মাথায় কিছু ঢুকছে না। একটা বড়ো বিপদ যে আসছে বুঝতে পারল। মোবাইল থেকে সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেন্ড-ফিলসফার অফিসের শম্ভুদাকে ফোন করে বলল, কড়েয়া থানায় আসতে। শম্ভুদা ওকে জামিনে ছাড়িয়ে আনল বটে তবে উত্তমের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে তিন লাখ টাকা নিঃশব্দে চলে গেল ওর বউ, মানে তৃণা নামে সেই মেয়েটির বাড়িতে। সোনা-গয়না বিয়ের দামি উপহার সামগ্রী-সহ আরও লাখ দুয়েক টাকার জিনিস মেয়েটা সুটকেস ভর্তি করে নিয়ে গিয়েছিল। হাজতেই ডিভোর্স পেপার সই হয়ে গিয়েছিল। এই তিন লাখের এক লাখ নিঃসন্দেহে থানার বড়োবাবু পেয়েছিল। না হলে এত নিখুঁত, সাজানো নাটক করা যেত না। থানার বাইরে চার-পাঁচজন মহিলাকে ও দেখেছিল পোস্টার হাতে স্লোগান দিতে– নারীনির্যাতনকারী উত্তমকুমার দামের শাস্তি চাই। এত দ্রুত, এত সকালে চলে এসেছে ওরা! বড়োবাবুও খুব ভালোমানুষের মতো উপদেশ দিয়েছে ওদের টাকাটা ফিরিয়ে দিন, আর বিয়েটা যখন ভেঙেই যাবে এখনই ডিভোর্স পেপারে সইটই করে মানসম্মান বাঁচান। এখনও লোক জানাজানি হয়নি তেমন। উত্তম বোঝাতেই পারেনি যে পণ নিয়ে ও বিয়ে করেনি। আর বধূ-নির্যাতনের কথা তো দূরঅস্ত, একটু জোরে বউয়ের নাম ধরে ডাকাও হয়ে ওঠেনি তখনও।

টাকার ক্ষতি, ক্ষতি নয়, নিজের উপর থেকে বিশ্বাসটাই চলে গেল। বুক ভেঙে গেছিল, শোবার ঘর থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে বাইরেই বের হয়নি। এক সময়কার কলকাতার মাঠের ডাকসাইটে স্টপার ছিল। যত গোল করেছে তার চেয়ে ঢের বেশি করিয়েছে। কিন্তু এখন পরপর গোল খেয়ে যাচ্ছে। করবীকে টেক্বা দিতে তেমন কোনও খোঁজখবর না নিয়েই খুব দ্রুত বিয়েটা সেরেছিল। কিন্তু কী করে পারল মেয়েটা! আজও ভেবে পায় না। এখন হাবরা থানায় ডিউটিরুমে বসে এফআইআর লেখাতে লেখাতে উত্তমের মনে পড়ছিল এসব কথা। পাশের কনস্টেবল দাদার কাছ থেকে বিড়ি চেয়ে একটা বিড়ি ধরাল। মাথাটা উত্তর কলকাতার ট্র্যাফিক জ্যামের মতো জমাট হয়ে আছে।

এখন সে বিড়ি খায়। বলে, বিড়ি না ফুঁকলে মাটির কাছাকাছি যাওয়া যায় না। আমার কাজই মাটির সাথে, মাঠের সাথে– বলে অল্প করে হাসে। এবছর উত্তম বড়ো ক্লাবের স্পটার। গোদা কথায় ছেলেধরা। ফুটবল মরশুমের আগে কলকাতার মাঠের বড়ো ক্লাবগুলির রিক্রুটারদের কাছে ওর ডিমান্ড এখন বেশ। গত নয় বছর ও এই ছেলেধরা, মানে স্পটারগিরি করছে। আচমকাই এই কাজটা শুরু হয়। করবীর কাছ থেকে আঘাত ও বিয়ের পর বউ পালানো ও থানা-পুলিশ ইত্যাদির ধাক্বায়, উত্তমকুমার বেশ গভীর একটা ডিপ্রেশনের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল। অফিসে যেত মাসে হাতে গোনা কয়েকদিন। মানুষজন পছন্দ করত না। নিজের কাছে নিজেকেই লুকোতে চাইত। সারাদিন গোটা কলকাতার খোলা মাঠের কোণটোনে বসে কাটিয়ে, অনেক রাতে ঘরে ফিরত। এরকম করতে করতে গোটা কলকাতার মাঠের ফুটবল খেলা দেখে ফেলেছিল সে বছর। একদিন উত্তর কলকাতার একটা মাঠে স্কুল ফুটবল দেখছিল। একটা বছর ১৪-১৫ ছেলের খেলা ওকে নাড়িয়ে দেয়। স্টপার। খেলা শেষে নাম জিজ্ঞাসা করে। ওর নাম হাসান। বস্তিতে থাকে। দেশবন্ধু স্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র। উত্তম ছেলেটার ভেতর একদম নিজের গড়ন দেখল। বেশ লম্বা। ছ’ফুটের উপর হবে। দারুণ সম্ভাবনা। রাতে ঘুম হল না। পরের দিন অফিসে গিয়ে শম্ভুদাকে বলল, ওই ছেলেটিকে একটা ক্লাব দিতে হবে। সেই শুরু। ছেলেটিও ইতিমধ্যে ভারতীয় জার্সি গায়ে দিয়ে ফেলেছে।

গত দু’বছরে কলকাতার মাঠের তাঁবুগুলোতে তার নাম একটা বিষয়। এভারেডি ইলেভেন ২ঙ্মঙ্মজ্জ-এর ক্লাব ফুটবলের হিসেব-টিশেব সব বদলে দিয়েছে। চারটে বড়ো ক্লাবকেই গোল মেরে দিয়েছিল। দু’টোর সাথে ড্র, দুটো জয়। সেই এভারেডির দুটো স্টপারই এবছর, ২০০৭-এ গোটা ভারতের মাঠ শাসন করছে। বিড়িখোর উত্তমই ওই স্টপার দুটোর স্পটার ছিল। এবছর বড়ো ক্লাবের স্পটার হিসেবে তিনটে জায়গাতে অ্যাসাইনমেন্ট আছে। গোলকিপার, ডিপ ডিফেন্স আর তার নিজস্ব প্রিয় জায়গা স্টপার পজিশনের জন্য। মোটা টাকার চুক্তি। বছরে বিশ লাখ। দশ লাখ টাকা অ্যাডভান্স পেয়েছে। অফিসে হাজিরা খাতায় সই করে দু-এক কাপ চা খেয়ে, শম্ভু-দার সঙ্গে একবার দেখা করে কেটে পড়ে। প্লেয়ার কোটায় চাকরি হয়েছিল বছর ষোলো আগে। গ্রুপ ডি। এখন পদোন্নতি হয়েছে। গ্রুপ সি। ওর শুধু আসা-যাওয়া। কাজের মধ্যে নিয়ম করে শম্ভুদার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো। এই মানুষটাকে ও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে আর শ্রদ্ধা করে। শ্রদ্ধা করারই মতো।

প্রথম দিন শম্ভুদার কাছে গল্পটা শুনেই সে আপ্লুত হয়ে গিয়েছিল। গল্পটা শম্ভুদার স্ত্রী আত্রেয়ীকে নিয়ে যতটা, তার চেয়ে ঢের শম্ভুদা নিজেই। লাখোটিয়া কম্পিউটার সেন্টার, কলকাতার প্রথম যুগের কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারের অন্যতম। সেখান থেকে এক বছরের কোর্স করেই এন্টালির ডাকাবুকো বিএ পাস শম্ভু রাহা, এই কোম্পানির কম্পিউটার অপারেটরের চাকরিটি পায়। মাঝে মধ্যেই শম্ভুদার সহকর্মী দীপকের খোঁজ করে অফিসের ল্যান্ড ফোনে কল আসত আত্রেয়ীর। দীপক অফিসে বেশ অনিয়মিত ছিল, তাই ফোনটা ধরতেন শম্ভুদাই। প্রথম প্রথম আড়ষ্ট আলাপ, ক্রমশ বন্ধুত্ব। তারপর অন্তরঙ্গতা। এদিকে অনিয়মিত হওয়ার কারণে দীপকের চাকরিটি গেল। একদিন আত্রেয়ী চাইল দেখা সাক্ষাৎ হোক। শম্ভুদা বলল, বেশ। কোথায়, কখন তা আত্রেয়ী ঠিক করে। প্রথম দিন ছিল শনিবার, ধর্মতলায় মেট্রো সিনেমার সামনে, সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায়। কিন্তু কী করে চিনব, শম্ভুদা জিজ্ঞাসা করেছিল। আত্রেয়ী জানায় সে কালো রঙের চুড়িদার পরবে।

শম্ভুদা বলেছিল, আমি থাকব পিংক টি-শার্ট আর ব্লু জিনসে। শনিবার দুটোর পরেই ছুটি। শম্ভুদা ক্লাব, ক্যান্টিন করতে করতে চারটে বাজিয়েছে মাত্র। আরও দেড় ঘন্টা! সময় আর কাটতেই চায় না। অফিস থেকে এসপ্ল্যানেড হেঁটে দশ মিনিটের পথ। আর এই বিশেষ দিনে তো হাঁটা যায় না, ট্যাক্সি করতে হবে। শম্ভুদা সাড়ে চারটের মধ্যেই চলে এসেছে। এত আগে কী করবে, ফুটপাথে বইপত্রের দোকান থেকে বইপত্র দু-একটা তুলে তুলে দেখছে। ইতিমধ্যে সিনেমার শো ভেঙেছে। অনেক মানুষ। খুঁজে পাবে তো! মনে মনে একটা আশঙ্কাও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, কই কালো-চুড়িদারে কাউকে তো দেখা যাচ্ছে না। শম্ভুদা মনে মনে ভাবল, আমার ঘড়িটা ঠিক আছে তো! ঠিক এখানটাতেই তো বলেছিল! তখনও মোবাইল ফোনের যুগ চালু হয়নি। ফলে প্রতীক্ষার দীর্ঘতা অস্বস্তি বুনে চলে মাথার ভেতর। প্রায় একঘন্টা কেটে গেছে, সাড়ে ছ’টা নাগাদ নীল শিফন শাড়ি পরা একটা মিষ্টি মেয়ে তার দিকে এগিয়ে এল। ঘন্টাখানেক আগেই ওই দীর্ঘাঙ্গী সুশ্রী মেয়েটা ওর চোখে পড়েছে। শম্ভুদা ভেবেছিল সিনেমা দেখতে এসেছে, ওর সঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করছে। মেয়েটি জিজ্ঞাসা করল, আপনি শম্ভু রাহা?

হ্যাঁ। কিন্তু আপনি?

মেয়েটি হেসে জবাব দেয়, সে-ই আত্রেয়ী। বড়ো একটা শ্বাস নিয়ে শম্ভুদা অনেকক্ষণ ওর চোখে তাকিয়ে ছিল। কোনো অনুযোগ করেনি। পোশাক পালটানোর কারণও জিজ্ঞাসা করেনি। পরে অবশ্য জেনেছিল, ইচ্ছা করেই আত্রেয়ী নিজের পোশাকের ভুল বিবরণ দিয়েছিল যাতে না-দেখা পরিচয়ের শম্ভুদাকে অপছন্দ হলে নিঃশব্দে কেটে পড়তে পারে। শম্ভুদা বলল কোথায় বসে কথা বলা যায়! চলুন কাছেই কাফে দ্য মণিকা-র দোতলায় কফি খেতে খেতে গল্প করা যাক। কফি খেতে খেতে শম্ভুদা আত্রেয়ীর রূপে মজে যায়। বলে সংশয় ছিল, না না-দেখা আত্রেয়ীর ঘোর, দেখা আত্রেয়ী এসে যদি নষ্ট করে দেয়। কিন্তু এখন দেখছি আমার ভাবনা পেরিয়েও আপনি অপরূপা। আত্রেয়ী অল্প হাসে এবং ঘড়ির কাঁটা দ্রুত সাড়ে আটটা পার করে দেয়। আত্রেয়ী উঠব উঠব করে। শম্ভুদা বলে, রাত হয়ে গেছে। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। আত্রেয়ী সশব্যস্ত হয়ে বলে, না না আমি একাই যেতে পারব। শ্যামবাজার। আপনি আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দিন শুধু। তারপর হাতব্যাগ খুলে ব্যাগের ভেতর খুঁজতে খুঁজতে মুখ চুন করে বলে, কিন্তু আমার মানিপার্স বাড়িতে ফেলে এসেছি। শম্ভুদা ব্যস্ত সমস্ত হয়ে নিজের মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকা বার করে হাতে গুঁজে দিয়ে তাকে ট্যাক্সিতে তুলে দেয়। এরপর প্রায় প্রতিদিনই শম্ভুদার বিকেল কেটেছে আত্রেয়ীর সাথে আড্ডায়। কখনও সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের কফিহাউসে, কখনও ইডেনে, কখনও গঙ্গার ঘাটে, কখনও সেন্ট্রাল লাইব্রেরির চত্বরে, কখনও মেট্রো সিনেমা হলে। প্রায় একবছর শম্ভুদা হাবুডুবু। এই হাবুডুবুতে শম্ভুদা নজর করেনি আত্রেয়ী তার বাড়ির ঠিকানা, পরিবার পরিজন নিয়ে কোনও কথাই বলেনি কোনও দিন। কিন্তু প্রতিদিনই আত্রেয়ী হাত পেতে তার কাছ থেকে দুশো-পাঁচশো টাকা নিয়ে গেছে। এই রহস্যটা ভেঙেছিল দুর্গাপুজোর সময়। হঠাৎ কলেজস্কোয়ারের ঠাকুর দেখতে এসেছিল, ভিড়ের ভেতর একটু ছাড়াছাড়ি হয়েছে। শম্ভুদা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে, একটা ছেলে আত্রেয়ীর হাত ধরে টানাটানি করছে। শম্ভুদা কাছে এসে সজোরে এক থাপ্পড়। ছেলেটি ছিটকে পড়ে, আর সোরগোল ফেলে দেয়। এন্টালিতে থাকা শম্ভুদাকে কলেজস্কোয়ারের অনেকেই চেনে। তখনই ও জানতে পারে, আত্রেয়ী বউবাজারের হাড়কাটাগলির যৌনকর্মী। পাঁচ মিনিটেই সামলে নিয়েছিল এই সত্যতার ঝটকা।

তারপর সেই প্যান্ডেল থেকে সোজা লালবাজার। পরিচিত পুলিশ অফিসারকে সব ব্যাপারটা খুলে বলে। রাত্রেই পুলিশ রেইড ক’রে হাড়কাটাগলি থেকে এক মাসি সহ গোটা চারেক মাস্তানকে তুলে আনে। লালবাজারে আত্রেয়ীকে দেখিয়ে অফিসার বলেছিল, এ আমার বোন, এর দিকে আর কোনও দিন চোখ তুলে যদি তাকিয়েছিস তোরা, মার্ডার কেসে সোজা সবকটাকে যাবজ্জীবন ফাঁসিয়ে দেব। তারপর দিনই কোর্ট-ম্যারেজ। ওই অফিসার তার নিজের বোনের পরিচয়ে পরিচিত করিয়ে শম্ভুদার বাড়িতে আত্রেয়ীকে তুলে দিয়েছিল। তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে শম্ভুদার সুখী পরিবার এখন! শম্ভুদা সে গল্পও করে। শম্ভুদার এই সোজা-সাপটা খাদহীন ভালোবাসার কাহিনিকে আদর্শ মেনেছে উত্তম।

উত্তম, মানে উত্তমকুমার দাম এই মধ্য-চল্লিশেও মেদহীন ধনুকের ছিলার মতো শরীর রেখেছে। মাথায় কদমছাঁট চুল। শহর, শহরতলীর কোথায় কোন পাড়ায় ফুটবল টুর্নামেন্ট সেসব ওর এখন মুখস্থ। কলকাতার মাঠে কম যায়। জেলায় জেলায় খেলোয়াড় হিসেবে নিজের পরিচয়ের সুযোগে সোর্স কাজে লাগায়। যেভাবে পুলিনের কথায় আজ দুটো কুড়ির বনগাঁ লোকালে উঠে যাবে হাবরা। পুলিন হাবরা লিগ ম্যাচে রেফারিগিরিও করে। আজ সবুজ সংঘ ও প্রগতির ম্যাচ। সোর্স পুলিন টেলিফোনে প্রথমে নাটা দেবাশিসের কথা বলেছিল। অসাধারণ ট্যালেন্ট। বল পায়ে চুম্বকের মতো লেগে থাকে আর দারুণ প্রেডিক্ট করতে পারে। মাঠে নামলেই একটা না একটা গোল করবেই। উত্তম সরাসরি নাকচ করে দেয়। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির নীচের কোনও প্লেয়ার নিয়ে ও ভাববে না। ফুটবল বডি গেমও।

ক্রমে যত দিন যাচ্ছে, বিদেশিরা যত আসছে তত রাগবির মতো হতে চলেছে ফুটবল। শরীর কতটা ধকল নিতে পারবে তা কিছুটা উচ্চতা নির্ভরও। সোর্স পুলিন দু’নম্বরটির কথা জানায়। সবুজ সংঘের গোপাল। ভালো হাইট, আর ফুটবলারের চেয়ে বেশি ও দৌড়বীর। এমন চোঁ চোঁ দৌড় লাগায় এদিক ওদিক মনে হয় কিছু একটা যেন হতে চলেছে। অথচ বল হয়তো উলটো দিকে আছে। উত্তম সোর্সের এই তথ্যটাকেই আজকের প্রাইম হিসেবে ঠিক করেছে। চোখে মুখে কিছুটা উল্লাস। এরকমই খুঁজছিল। নাস্তানাবুদ করা স্প্রিন্টার। তারপর ফুটবল তো কোচের হাতে পড়লে কথা বলবে।

উত্তম যা ভেবেছিল তার চেয়ে বেশি। এ একদম ইউরেকা। ছেলেটা একটাও গোল করেনি। কিন্তু ওর টিম দু’গোলে জিতল। বিরতির পরপরই ছেলেটা মাঝমাঠ ক্রস করে হঠাৎ লেফ্ট উইং থেকে

চোঁ-চোঁ করে দৌড় লাগাল রাইট উইং-এর দিকে। দু’টো ডিফেন্ডার কেটে গেল। পেছন থেকে ওই নাটা ছেলেটা সম্ভবত উইথড্রয়াল স্টপার খেলছিল– গোল মেরে দিল মাখনে ছুরি দেবার মতো। ব্রিলিয়ান্ট! গোলটা হবার পরে উত্তম চ্যাঁচাল, তারপর পকেটে হাত দিল পেন আর কাগজ নেবে বলে। কী যেন নাম! হাত চালিয়ে বুক পকেটে পেন, ছোটো ডায়েরি খুঁজে না পেয়ে চোখ নামাল।

আরে আশ্চর্য! আমি তো পেন-টেন নিয়েই বেরিয়েছি। কী মনে করে পেছনের পকেটে হাত দিয়ে দেখে লেপাপোছা। অর্থাৎ জিনসের হিপ্পকেটে তখন কিছুই নেই। উত্তমের বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। সোর্স পুলিনের জন্য হাজার খানেক টাকা ছাড়াও যাতায়াতের খরচ ইত্যাদির জন্য আরও শ’পাঁচেক ছিল। এসবিআই ডেবিট কার্ড, জরুরি কাগজপত্র, কিছু তথ্য, নোট– এতক্ষণের আনন্দে এসময় ভাঁটার টান।

বনগাঁ লাইনের ভিড়। শিয়ালদা থেকেই বসার জায়গা পায়নি। ভেতরের দিকে দাঁড়িয়ে ছিল মনে পড়ছে। দমদম আসতে চারপাঁচজন তরুণী ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়েছিল। সকলেই খুব উচ্ছ্বল। নিজেদের ভেতর নানারকম কথাবার্তা চালাচ্ছিল। টুকরো ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা মিশিয়ে। মাই নেম ইজ খান থেকে ম্যানিকিউর সবই তাদের বিষয়। উত্তম এসময় খেলাপাগল। নারী নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। ও মাঠের কথা ভাবতে ভাবতে চলেছে। ভিতরে একটা আর্জ। এবছর এই বড়ো তিনটি ক্লাবের জন্য অন্তত গোটা পাঁচ-ছয় সোনার ছেলে তুলে দিতে হবে। আনকোরা কিন্তু সলিড। বড়ো ক্লাবগুলিরও তাতে লাভ। দু’তিন বছর খুব কম পয়সায় এদেরকে কাজে লাগাতে পারে। হিসেবে অন্তত কোটি টাকার ফয়দা। উত্তমের মনে হচ্ছে আজ একটা হিল্লে হবে।

একটা মেয়ে ওর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। ভিড়ের ভেতর প্যাসেজেও ডাবল লাইন। মেয়েটির সমুন্নত বুক মাঝে মাঝেই ওর খোলা কনুই ঘষে দিচ্ছিল। উত্তম একবার তাকাতেই মেয়েটি মিষ্টি হাসে। দীর্ঘ সুশ্রী চেহারার। চুড়িদারে লোকাট ফ্রেম। উত্তাল বুকের অনেকটাই প্রকাশমান। ডান দিকের অপেক্ষাকৃত শ্যামাশ্রী মেয়েটি একটু চেপে দিলে ও আরও একটু বাঁয়ে এই সুন্দরীর দিকে ঘেঁষে আসে। এ মেয়েটি তেমন নড়ে না আর তার কোমল বুক সেঁটে উত্তমের গোটা বাহুতে লগ্ন হয়ে যায়। এবার মেয়েটির দেহ থেকে একটা সুগন্ধ টের পায় যা ওর চেনা চেনা লাগে। উত্তমের তখন কাঠকাঠ ভাব। হাত-পা নড়ানোর জায়গা রাখেনি সপ্রতিভ মেয়ে দুটো। জগন্নাথপম অবস্থা। এই স্থির অবস্থায় উত্তম অনুভব করে দুদিক থেকেই দু’টো মেয়ে বুক মেলে ওকে ঘঁষে চলেছে।  ও কোনও দিকে তাকাতে পারছে না। অসহায়ের মতো নিম্নগামী মুখমণ্ডল। উত্তম মাঠের ফুটবল, বল দখল, পজিশন মেকিং– এসবের ভেতর ভাবনা চারিয়ে দিয়ে রাস্তাটুকু পার করে দিতে চাইল।

এই মেয়েগুলিই কি ওকে এতখানি বিপদে ফেলল! এত সুন্দর সুন্দর কথা বলছিল মেয়েগুলো– তবে সেটা ট্র্যাপ! অন্তত ডেবিট কার্ড আর মোবাইল ফোনের জন্য থানায় কমপ্লেইন লজ করতেই হবে। পুলিনকে নিয়ে তাই ও হাবরা থানায় এসে বসেছে।

বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে হঠাৎ ওর মনে ঝিলিক দিল– বাঁদিকে যে-মেয়েটি বেশি লগ্ন ছিল, একটু বেশি বয়সের, সে কোনও কথা বলছিন না কেন! মেয়েটি হাসবার জন্য মুখ ঘোরাতেই ওর চোখ পড়েছিল কানের নীচের তিলটির ওপর। তখন মাঠের ভাবনায় মত্ত থাকায় ফোকাস্ড ছিল নতুন ছেলে রিক্রুটিং নিয়ে। চুলটা মাথার উপরে চুড়ো করে রেখেছিল সে। ফলে মুখটা একটু গোল লাগলেও ওই তিলটি তো ওর চেনা। ওই-ই কি করবী! বাবুঘাটে কতবার ওই তিলের উপরেই চুম্বন রেখেছে সে। না না, তা কী করে সম্ভব! করবী পকেটমারের গ্যাং করেছে! উত্তমের এই একলা একা জীবনের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্নিগ্ধ প্রতিমা প্রতীম করবী পকেটমার!

থানায় বসে শিউরে উঠল। গা সিরসির করতে লাগল। ওই নিষ্পাপ মুখমণ্ডলের মেয়েটি, যাকে একদিন এই জীবন তুলে দেবে ভেবেছিল, সোনারপুরের ওই গ্রাম্য মেয়ে করবী নিশ্চয়ই ওকে চিনেছে। এখনও সেরকম ছিমছাম চেহারা উত্তমের। শুধু দুটো জুলফির কাছের কিছু চুল পেকেছে। তবুও ও আমার পকেট কাটল! এখন নিশ্চিত হচ্ছে ওই যে চেনা চেনা লাগছিল গন্ধটা, তা করবীই ব্যবহার করত। ভিক্টোরিয়ার মাঠে সন্ধ্যায় অনেকবার করবীই উত্তমের ঝাঁকড়া মাথা ওর আধখোলা বুকে টেনে নিয়েছে। সুগঠিত স্তনের খাঁজে নাক গুঁজে গেছে। কিন্তু উত্তম কখনও শরীরে হাত দেয়নি। শুধু ওর বুকের ওই মিষ্টি গন্ধটা ও প্রাণ ভরে নিত। ও চেয়েছিল অপাপ করবীকে গৃহলক্ষ্মী করবে।

এসময় উত্তমের খুব শীতবোধ হতে থাকে। গা-হাত-পা ছেড়ে দেয়। থানার বেঞ্চে এলিয়ে পড়ে। পুলিন দাস ফুলস্কেপ সাদাকাগজ কিনে এনে মোবাইলে মিসিং কমপ্লেইন ডায়েরি লেখাতে লেখাতে পেছন ফিরে তাকিয়ে বুঝে যায় শরীর খারাপ হয়েছে উত্তমের। থানার গায়েই হাবরা হাসপাতাল। ধরাধরি করে সেখানে নিয়ে যায়। পুরোনো দিনের খেলোয়াড় পরিচয়ে খুব দ্রুত ডাক্তার অ্যাটেন্ড করে। সেরিব্রাল অ্যাটাক। ম্যাসিভ। ডাক্তার রেফার করে এনআরএস। অ্যাম্বুলেন্স দেয়। মুখে অক্সিজেন সিলিন্ডার। সোর্স পুলিন দাস, হাবরা হাসপাতালের একজন নার্স ও অচেতন উত্তম যশোর রোড ধরে চলেছে। এসময় উত্তম দেখে, সাদা পোশাকের এক মিষ্টি মেয়ে, মুখটা খুব চেনা চেনা, কোনও পরি হবে, তার কপালে আলতো করে দু’টো চুমু খেল। আর কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি উত্তম। এই প্রথম উত্তম তার সারাজীবনের কাঙিক্ষত শব্দকটি শুনতে পেল। এবং এই প্রথম তার কান্না পেল। বোজা চোখের দুই কোল ঘেঁষে দুফোঁটা জল গড়িয়ে নামল সাদা চাদরে ঢাকা বালিশের উপর।

এনআরএস-এর এমার্জেন্সির ডাক্তার কয়েক মিনিট দেখেই বললেন, অনেকক্ষণ আগেই প্রাণ দেহ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।

 

কুড়ি বছর আগে পরে

খুব গরম আজ।

একটা কোল্ড ড্রিংক্ আনি? – আরে না না। ঠিক আছে। বরং একটু ঠান্ডা জল পেলে ভালো হয়।

– হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই…

বলে লোকটা জল আনতে গেল। লোকটার চামচাগিরি এই গরমে একদমই ভালো লাগছিল না। কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি। আমি একটু একা থাকতে চাইছিলাম।

পার্কটার এককোণে বিরাট স্টেজ করেছে। বড়ো বড়ো স্ট্যান্ড ফ্যান চললেও গরমের তাতে বিশেষ যাচ্ছে-আসছে না। কারণ স্টেজটার মাথায় ত্রিপল। যেটা থাকলে হাওয়া চলাচল করতে পারে না। ফলে গরম আরও বেড়ে যায়। যদিও পার্কটায় প্রচুর বড়ো বড়ো গাছ ভর্তি। বিশ বছর আগেও জায়গাটা এমনই ছিল। আসার সময় দেখছিলাম সেই বাড়িটা এখনও একই ভাবে আছে, কুড়ি বছর আগের মতো।

আসলে আজ এখানে আমার সংবর্ধনা। সরকারের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান প্রাপ্ত হবার পর এরকম অনেক জায়গাতেই আমার এমন সংবর্ধনা পর্ব চলছে। তবে অধিকাংশ আমন্ত্রণই আমি গ্রহণ করছি না। যেগুলো কোনও ভাবেই এড়াতে পারছি না কেবল সেগুলোতেই যাচ্ছি। ওরা যখন আজকে এখানে আসার জন্য আমন্ত্রণ করেছিল তখন জায়গাটার নাম শুনে এককথায় রাজি হয়ে যাই। কারণটা কি? কারণ হল, কুড়ি বছর আগে এখানে আমি থাকতাম।

সেই লোকটা একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে আবার হাজির হল। সাথে একটা দামি সিগারেট প্যাকেট। আমার দিকে সেসব বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

– নিন স্যার।

জলটা বেশ ঠান্ডা। গলায় ঢালতেই শরীরটা জুড়িয়ে গেল। এবার একটা সিগারেট ধরালাম।

– আপনি এখানে আসতে এককথায় রাজি হয়ে যাবেন আমরা ভাবতেও পারিনি…

লোকটা আবার আহ্লাদে গদগদ হয়ে বকতে লাগল। যে-ক্লাবটা আমায় সংবর্ধনা দিচ্ছে ও তার সেক্রেটারি। নিমন্ত্রণ করার সময় যখন এসেছিল তখন জেনেছিলাম ও এই এলাকার সব থেকে বড়ো চালের কারবারি। ও সবসময়, মানে আমি যে দু’বার দেখলাম দুধসাদা জামা প্যান্ট জুতো পরে থাকে। কুড়ি বছর আগে অবশ্য ও এত সাদা জামা প্যান্ট পরত না। সিগারেটটা টানতে টানতে মনে পড়ে গেল কুড়ি বছর আগের কথা। তার আগে সিগারেট প্রায় খেতামই না বলা চলে। এখানে এসেই ধরেছিলাম একরকম। সিগারেট ধরাতে দেখলেই সুতপা রাগ করত খুব।

– আগে তো খেতে না। হঠাৎ ধরলে কেন?

অনুযোগ করেছিল ও। ভাবত টেনশন থেকেই আমার এই সিগারেট ধরা।

আস্তে আস্তে পার্কটার নির্জনতা কমে আসছে। টুকটাক করে লোকজন আসতে শুরু করেছে। মাইকে ঘোষণা চলছে– আর কিছুক্ষণ পরেই আমাদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। বিখ্যাত সাহিত্যিক হীরক মিত্র আমাদের মধ্যে এসে গেছেন…

বাড়িটা সেই একইরকম আছে। কোথাও কোনও বদল নেই। শুধু রংটা বেশ আবছা হয়ে গেছে। দু’একটা সবুজ পাতা এদিক ওদিক কার্নিশে দেখা যাচ্ছে। পুরোনো পুরোনো একটা ভাব এসেছে বাড়িটার শরীরে। যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম তখন বাড়িটা সবে হয়েছে মাত্র। যাকে বলে সদ্যোজাত। আমরাই প্রথম ব্যবহার করি তিনতলার ফ্ল্যাটটা।

বাড়িটা সাহাদের। আমাদের চুক্তি হয়েছিল বড়ো ভাই শংকর সাহার সাথে। তিন ভাইয়ের যৌথ সম্পত্তি। আগে টিনের বাড়ি ছিল। কলোনি এলাকা। তখনই সবে শেষ হয়েছিল টিনের বাড়ি থেকে ফ্ল্যাট বাড়িতে উত্তরণের। পুরো এলাকাটাই এরকম ছিল। আস্তে আস্তে বদল ঘটেছিল কলোনির চরিত্রে।

সুতপা ভাবত আমি সিগারেট খাই টেনশনের জন্য। আমি কিছুতেই ওকে বোঝাতে পারতাম না যে আমার কোনও টেনশন নেই। সামান্য একটু-আধটু টেনশন থাকলেও ওটা বলার মতো বা ভাবার মতো কিছু না। অমন একটু-আধটু সকলেরই থাকে। আসলে সুতপা যবে থেকে আমার জীবনে এসেছিল তবে থেকে আমার সব টেনশন ভ্যানিশ হয়ে গেছিল। একটা সময় অবধি আমার অনেক অনেক বাঁচতে ইচ্ছে করত। সুতপা আসার পর সে ইচ্ছেটা চলে গেছিল। কথাটার ভুল মানে করলে হবে না। যেটা ঘটনা হয়েছিল, সেটা হল সুতপা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। আর ভালো জিনিসের দীর্ঘায়ু হয় না। আমি তাই বুঝতে পারতাম এর কোথাও একটা শেষ আছে। আর সেই শেষের আগে চলে যেতে পারলে ভালো। মানে সুখ ফুরোবার আগে পালাও। ফলত, আগে সিগারেট খাবার যে অস্বস্তিটা ছিল, এসব ভাবনায় তা হারিয়ে গেল। সুতপা ভাবত আমি হতাশা থেকে মৃত্যুর কথা ভাবছি। আসলে ব্যাপারটা একদমই উলটো।

স্টেজের সামনের চেয়ারগুলো প্রায় ভরে গেছে। মাইকের গমগমানি বেড়েছে। স্থানীয় কলেজের একদল ছাত্র-শিক্ষক আমাকে আলাদা কোণে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বকাল।

আমরা সবাই স্টেজে উঠলাম। আমার বাঁদিকে স্থানীয় এমএলএ। ডানদিকে ক্লাব প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি। শুরুতেই একদল লাল পাড় শাড়ির যুবতি কোরাস গাইল। তারা নেমে যেতে শুরু হল পরের পর ভাষণ পর্ব। ভক্তি গদগদ ভাব নিয়ে এমএলএ, ক্লাব-এর সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট বলে গেল। সবই আমার প্রশংসা, ওদের ক্লাব কত মহান! একটি কমবয়সি ছেলে আমার লেখা থেকে পাঠ করে শোনাল। তারপর আমার হাতে মানপত্র, ফুলের স্তবক, মিষ্টি– আরও কী সব তুলে দেওয়া হল। সেক্রেটারি আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল– ফুলের ভিতর টাকার খামটা আছে।…

কুড়ি বছর আগে সাহাদের ফ্ল্যাটটায় আমি ঘর বেঁধেছিলাম সুতপার সাথে। একটা স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। মাত্র তো একটা মাস আমরা ছিলাম। তবু এখনও ভাবলে মনে হয় অনেকদিন।

আমরা দুজনে একটু একটু করে ফ্ল্যাটটাকে সাজাচ্ছিলাম। প্রতিদিন কিছু না কিছু হাতে করে কিনে নিয়ে ঘরে ঢুকতাম। পর্দা, পাপোশ, ফুলদানি, বেডকভার আরও কতো কি! এমনকী দুটো খতম হওয়া রেড ওয়াইনের বোতলে দুটো মানি প্ল্যান্টও এনে লাগাল সুতপা। ওর জন্য আমি পছন্দ করে কিনে এনেছিলাম একটা লাল রঙের নাইটি। প্রতিদিন গল্প করতে করতে রাত ভোর হয়ে যেত আমাদের। রাত্রির গাঢ় অন্ধকার কাটিয়ে যখন সূর্যের হালকা আমেজ দেখা যেত, পাখিদের ডাক শোনা যেত, তখন আমরা ঘুমিয়ে পড়তাম তৃপ্তির আমেজ মেখে। আমরা দুজনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাকি জীবনটা একসাথে কাটাব। সে প্রতিজ্ঞা শেষ অবধি সুতপা রাখলেও আমি পারিনি। মাত্র একমাস পরেই আমাদের এই তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নমহল ভেঙে চুরমার হয়ে গেছিল।

এবার আমায় বলতে ডাকা হল। আমি আয়োজক এবং স্থানীয় মানুষদের অভিনন্দন জানিয়ে বলা শুরু করলাম।

‘আপনাদের সকলকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। এই পাড়াটা আমার অত্যন্ত প্রিয় পাড়া। এই পার্ক আমায় অনেক স্মৃতি মনে পড়ায়। আপনারা হয়তো কেউ জানেন না এই পাড়াটায় আমি একসময় থেকে গেছি।’  আমার এই কথায় চারদিকে একটা বিস্ময়ের গুনগুন শুরু হল। এই তথ্য কেউই জানত না। না জানাটাই স্বাভাবিক। বা ভুলে যাওয়াটা। আয়োজক দাদারা মনে হল সবথেকে বেশি অবাক-অপ্রস্তুত হল। এতক্ষণ ওদের ভাষণে মনে হচ্ছিল আমার বিষয়ে ওরা সব জানে। মানে পাবলিককে তাই বোঝাচ্ছিল আর কী। আমি বলা থামালাম না।

– আজ থেকে কুড়ি বছর আগে এই পাড়ায় আমি এসে উঠেছিলাম একটি ভাড়া বাড়িতে। সেই বাড়িটা আজও আছে একই ভাবে। কিছুদিন ছিলাম। মাস খানেকের মতো। এই সময়েই আমি ‘লাইফলাইন চলছে’বলে গল্পটা লিখেছিলাম। এই বাড়িতে বসেই। আপনারা জানেন যা এখন দু-দুটি ইউনিভার্সিটির সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এবং দেশি-বিদেশি মিলিয়ে অন্তত পনেরোটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে। তাই বিশ বছর পর আজ যখন আমি এই গলিতে পা রাখলাম, আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি বুঝতে পারলাম আরও একটি গল্পের জন্ম হতে চলেছে… গোটা পার্কটা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল আমার কথা। একটা চিনতে না পারা পোকা পার্কের সব থেকে উঁচু গাছটার টঙে ভনর ভনর করলেও শোনা যাবে এমন এক স্তব্ধতা। বলতে বলতে আমার মন পার্কের আকাশের দিকে উড়ে যেতে লাগল। আমি হারিয়ে যেতে লাগলাম বিশ বছর পিছনে…

আমি হীরক মিত্র। আমার সব থেকে দীর্ঘস্থায়ী পেশা লেখা। যা আমি আজও করে চলেছি। দীর্ঘস্থায়ী পেশা কথাটা বললাম এই কারণে যে, তার আগে আমি অনেক কিছু করেছি। কম্পিউটার অপারেটর, টিউশন, রাজনীতি আরও কত কিছু। কিন্তু শেষ অবধি বুঝলাম আমার দ্বারা ওই লেখাটাই হবে। দুম করে কোনও কিছু ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করে দেওয়াটা আমার মজ্জাগত। কলেজ জীবনে হঠাৎ গ্র্যাজুয়েশন শেষ না করে একটা সেলসের কাজে ঢুকে পড়েছিলাম। পয়সাটা খুব দরকার মনে হয়েছিল সে সময়। বছর খানেক কাজটা করার পর আমারই মনে হল অন্তত গ্র্যাজুয়েশনটা রাখা প্রয়োজন। সারাজীবন একটা খিঁচ থেকে যাবে। বয়স থাকতে থাকতে করে ফেলা জরুরি। চাকরি ছেড়ে আবার কলেজে ঢুকে পড়লাম। একদম ফার্স্ট ইয়ার থেকে। পাশ করার পর ভাবলাম ফোটোগ্রাফার হব। কোর্স-এ ভর্তিও হলাম। কিন্তু লাস্টে পরীক্ষা দিলাম না। ভেবে দেখলাম ফোটোগ্রাফির প্রাইমারি ইনভেস্টমেন্ট আমার পক্ষে অনেক। অনেক কিছু কিনতে হবে গোড়াতেই। তারপর কম্পিউটার অপারেটর হলাম। কিছুদিন পর সেটাও ছেড়েছুড়ে রাজনীতিতে। ট্রেড ইউনিয়নে হোলটাইমার। তাও ছাড়লাম নেতাদের কারবার দেখে। লাস্টে এই লেখা।

লিখতে লিখতেই আলাপ হয়ে গেল সুতপার সাথে। বিবাহিত। তবে স্বামীর সাথে থাকত না। পেশায় আর্কিটেক্ট। ইন্ডিয়ান রেলে।

ও-ও লিখত। তবে আমার মতো গদ্যের লোক ছিল না। কবিতা লিখত। খারাপ লিখত না। অনেকেই চিনত। প্রথম দেখাতেই ভালোবেসেছিলাম ওকে। লভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট আর কী। বুঝেছিলাম এই আমার মানুষ। এর জন্যই আমি অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন। এর জন্যই জন্মেছি আমি। তখন আমার বছর চল্লিশ বয়স। ভবঘুরে মানুষ। তিনকুলে কেউ নেই। একটা বাড়ি আছে। তাতে থাকি, আর ভাড়ার টাকায় ভাত-বিড়ি হয়ে যায়। কিছুদিন মেশার পর বুঝলাম, ওরও আমাকে ভালো লেগে গেছে। সে সময়ে ওর বর সমানে চেষ্টা চালাচ্ছিল ওকে ফিরিয়ে নিতে। নরমে গরমে নানা ভাবে। সুতপা আমার থেকে বছর তিনেকের ছোটো। অর্থাৎ বয়সটা কম নয়। বাড়বে আরও। একা থাকার যন্ত্রণাও বাড়বে। তাই ও প্রায় সিদ্ধান্ত করেই ফেলেছিল বরের কাছে ফিরেই যাবে। সমস্যা যা আছে মানিয়ে নেবে। ঠিক এরকম একটা সময়ে ওর জীবনে আমি ঢুকে পড়লাম। সুতপার সব ভাবনা চিন্তা সিদ্ধান্ত আমূল বদলে গেল রাতারাতি। ডিভোর্সের মামলা করল ও। ওর বর এরকম পাকা গুটি কেচে যাওয়ায় ব্যাপক খেপল। চাকরি করা বউ কে আর ছাড়তে চায়। আমাদের পিছনে পড়ে গেল লোকটা।

ডিভোর্সের মামলা চলতে লাগল অনন্তকাল ধরে। কবে কি হবে জানি না। আদৌ হবে কিনা বুঝতে পারছিলাম না। তাহলে আমরা কী এভাবেই কাটাব বৃদ্ধবয়স অবধি! শেষমেশ দুজনে একদিন ঠিক করে ফেললাম গোপনে বিয়েটা সেরে একসাথে থাকা শুরু করব। যা আইনের চোখে মান্যতা পায় না। আর সুতপার বর জানতে পারলে এটা নিয়ে ঝামেলা পাকাবেই। যা হয় হোক, আগুনকে সাক্ষী রেখে আমি সুতপার সিঁথি রাঙিয়ে দিলাম এমনই এক বৈশাখে। তারপর এসে উঠলাম সাহাদের তেতলায়।

সংবর্ধনা সভা শেষ হয়ে গেছে। আমি স্টেজ থেকে নেমে এসে মাঠের মধ্যে চেয়ার টেনে বসলাম। সাথে সাথে চারপাশে গুণমুগ্ধদের জটলা তৈরি হল। যাদের মধ্যে অনেকেই আমার নিয়মিত পাঠক, সামনে পেয়ে নানান প্রশ্ন করতে চায়। আবার অনেকে শুধু আমার নামটুকুই জানে। বইপত্তর কিছু পড়েনি। একজন বিখ্যাত লোকের

সংস্পর্শে আসতে ভিড় করেছে শুধু।

এখন আমি সত্যিই একজন বিখ্যাত জন। প্রায়দিনই নানা অনুষ্ঠানে মন্ত্রীদের সাথে আমাকে ডাকা হয়। প্রায় সব পুজো সংখ্যাতেই আমার গল্প বা উপন্যাস থাকে। বিভিন্ন সরকারি কমিটি, আকাদেমিতে আমার নাম থাকা প্রায় বাধ্যতামূলক পর্যায়ে। কুড়ি বছর আগে যখন এখানে থাকতাম তখন আমায় প্রায় কেউ চিনত না। কলেজ স্ট্রিট, নন্দন চত্বরে ফেকলুর মতো ঘুরে বেড়াতাম। কাঁধে ব্যাগ, মুখে বিড়ি, না-কাটা দাড়ি। সুতপার যে আমাকে কী দেখে ভালো লেগেছিল, জানি না।

অনেকগুলো অটোগ্রাফের খাতা আমার সামনে এখন। একটা একটা করে সারতে লাগলাম সেগুলো। এমএলএ মশায় আমার সামনে চেয়ার টেনে বসলেন।

– আমি এখানে চল্লিশ বছর ধরে রাজনীতি করছি। দু’বারের এমএলএ। তার আগে কাউন্সিলারও ছিলাম বহুদিন। আপনার মতো একজন বিখ্যাত মানুষ এখানে থেকে গেছেন অথচ আমরা কেউ সেটা জানতাম না!

ওনার এই অবাক হওয়া দেখে আমিও হেসে বললাম, আপনিও আমায় চিনতেন। মনে করতে পারছেন না।

– চিনতাম! কোন বাড়িটায় থাকতেন বলুন তো?

– পার্কের উলটোদিকের ওই বাড়িটায়। সাহাদের বাড়ি। তেতলায়। এমএলএ সাহেব জট ছাড়াতে না পেরে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললেন। তারপর ক্লাব প্রেসিডেন্টকে বললেন, শংকরদা? তোমার কিছু মনে পড়ছে?

– নাহ্, তবে যেদিন ওনার বাড়িতে প্রোগ্রামটার ব্যাপারে যাই, সেদিন ওনাকে সামনে থেকে দেখে খুব চেনা চেনা লাগছিল। কোথায় যেন দেখেছি। মনে করতে পারছি না।…

আস্তে আস্তে ভিড়টা হালকা হয়ে এল প্রায়। মাথারা ছাড়া সকলে চলে গেছে একরকম। আমরা ক’জন মিলে পার্কের কোণের ক্লাবঘর খুলে বসলাম। সেক্রেটারি হাত কচলে বলল, একটু জলখাবারের আয়োজন রাখা হয়েছে। বসুন একটু।

এমএলএ সাহেবের কাজ ছিল। কিন্তু উনিও যেন আটকা পড়ে গেছেন আমার সম্বন্ধে পুরোটা জানার কৌতূহলে।

সুন্দর কাচের প্লেটে গরম গরম ফিশফ্রাই এল। সেক্রেটারি আমার একদম সামনে এসে বলল, স্যার, এমন সুযোগ তো বারবার আসে না, আপনি অনুমতি করলে একটু হুইস্কি দিয়ে সেবা করি।

আমি হেসে বললাম,

– তাও আছে! ঢালুন এক পেগ…

প্রথম পেগ শেষ করেই এমএলএ আমায় চেপে ধরলেন,

– দাদা আর হেঁয়ালি করবেন না। বলুন না, আপনার সাথে আগে কি আমার কখনও মোলাকাত হয়েছিল?

কৌতূহলে ওর গোল গোল চোখগুলো চকচক করছিল ওর দু’হাতের তিনজোড়া আংটির মতোই। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা টান মেরে বললাম, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে সাহাদের তেতলায় আমি থাকতাম। একটা ঘটনার পর আপনার নেতৃত্বে একদল ছেলে এসেছিল আমার ফ্ল্যাটে…

…আমার এখনও মনে আছে দরজাটাকে ঢাকের মতো দুমদুম করে বাজিয়েছিল ওরা ‘দরজা খুলুন’ বলে চিৎকার করে। সুতপা ভয়ে সিঁটিয়ে গেছিল ঘরের কোণে। আমি দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বলেছিলাম, এভাবে দরজা ধাক্বাচ্ছেন কেন, এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।

প্রায় তেড়ে আসার ভঙ্গিতে ওরা বলেছিল, চোপ। বড়ো একেবারে ভদ্দোলোক এয়েছে। শুনে রাখুন, এটা ভদ্দোরলোকের পাড়া। সব শিক্ষিত মান্যগণ্য লোকেরা এখানে থাকে। এসব নষ্টামি এখানে চলবে না। তিনদিনের মধ্যে পাড়া ছেড়ে চলে যাবেন…

পরে শুনেছিলাম সেদিন দুপুরে সুতপার স্বামী এসে বাড়িতে হুজ্জোত করে গেছিল, যখন আমি বা সুতপা কেউ ছিলাম না।

ক্লাবঘরটা মর্গের ঠান্ডা ঘরের মতো হয়ে গেল যেন। অসম্ভব নিস্তব্ধতা। এমএলএ, ক্লাব প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি সবাই মাথা নীচু করে বসে। আমি নিজেই বোতল থেকে আরেকটা পেগ ঢেলে নিলাম গ্লাসে। এক চুমুকে সেটা শেষ করে উঠে পড়লাম।

– আচ্ছা চলি তাহলে। ভালো থাকবেন।

পার্কের গেট অবধি ওরা সবাই চুপ করে অনুসরণ করল আমাকে। সংবর্ধনায় পাওয়া ফুল, মালা ও যাবতীয় সব কিছু ক্লাবঘরেই পড়ে রইল। সেটা দেখেও ওরা কেউ কিছু বলতে সাহস করল না। আমি গেটের কাছে এসে বললাম, আপনাদের আর আসতে হবে না। আমি একটু সাহাদের বাড়ি ঘুরে যাব, যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে।

এমএলএ ভদ্রলোক আমার দু’হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, কি বলছেন! আপত্তি! আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। কুড়ি বছর আগে কম বয়সের তেজে অনেক কিছু বলে ফেলেছিলাম আমরা, জানি আপনি সে অপমান কোনওদিনও ভুলতে পারবেন না। তবু ছোটো ভাই ভেবে ক্ষমাঘেন্না করে দেবার চেষ্টা করবেন।

আমি মাননীয় এমএলএ-র পিঠে হাত রেখে বলি, আমি কিছু মনে রাখিনি। তাহলে কি আসতাম? মনে রেখে কি হবে বলুন, তাতে তো কিছু বদলাবে না।

ক্লাব সেক্রেটারি ছলছলে চোখে জিজ্ঞেস করল, বউদি এখন কেমন আছেন? উনি কি আপনার সাথেই আছেন?

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। মানা করার জন্য তো আর সুতপা নেই। ওরা আমার উত্তরের জন্য প্রতীক্ষারত। পার্কের গেটে দাঁড়িয়ে পরপর দু’তিনটে টান মারলাম সিগারেটে। হুইস্কির নেশাটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে মাথায়। সন্ধ্যা নেমে এসেছে পুরোপুরি। পার্কটা এখন নিকষ কালো। সোডিয়াম ভেপারের আলো তাতে খুব বেশি নাক গলাতে পারছে না বড়ো বড়ো গাছপালার জন্য। আমি ওদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললাম, সেদিনের ঘটনার পরদিন আপনাদের বউদি, মানে আমার সুতপা রেললাইনে সুইসাইড করেছিল।

 

ধন্যবাদ

ঘড়িটাতে প্রায় নিভে যাওয়া টর্চের আলো ফেলতেই সুনন্দর একটা ঝটকা লাগল। অন্ধকারে এগারোটা বেজে গেছে। বাজবে না-ই বা কেন, সেই কতক্ষণ আগে সাড়ে দশটা দেখে গুটিগুটি পায়ে শেষ মোমবাতিখণ্ডটা জ্বালিয়ে, খাওয়া শেষ করেই নিভিয়ে দিয়েছে। কিছুটা গাফিলতি থেকেই ঘরে আর মোমবাতি কিনে রাখেনি। সেরকম দরকারও পড়েনি। কোনওদিন এই তিন বছরে দু পাঁচ মিনিটের জন্য কারেন্ট গেলেও সেটা ধরা ছোঁয়ার মধ্যে নয়। কিন্তু গত রাতে ঝড়ে সব লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর, কত যে ইলেকট্রিকের পোল উপড়ে পড়েছে তার কোনও হিসেব নেই। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোথাও তার ছিঁড়েছে তো কোথাও গাছের ডাল বা আস্ত একটা গাছই পড়ে গেছে পোলে ।

সকালে স্কুলে যে যার খুশি মতো কারেন্টের কথা বলতে আরম্ভ করেছিল। তবে ইতিহাসের তাজমুল সাহেব একটু আশার কথা শোনাল, ‘ম্যাক্সিমাম কালকের দিন, কারেন্ট চলে আসবে, জোর কাজ হচ্ছে।’ সবাই শুনে বলে উঠল, ‘আপনার মুখে ফুল চন্দন পডুক।’ সুনন্দ কিছু মন্তব্য করেনি, যে বিষয় জানে না, সে বিষয়ে কোনও রকমের মন্তব্য করা থেকে সবসময় নিজেকে সরিয়ে রাখে। তাছাড়া মাত্র তিনবছর হল এখানে এসেছে। এখনও এখানকার ইতিহাস ভূগোল সম্পর্কে কোনও জ্ঞান হয়নি বলে নিজে মনে করে। কারেন্ট না থাকলেও অর্থদফতরের একটা বিশেষ বিজ্ঞপ্তির জন্য স্কুলের সবাই বারবার মোবাইলের নেট খুলেছে। সেখানে সুনন্দের মোবাইলটাও বাদ পড়েনি। বাড়িতেও মা, ঝুমা এমনকী বিটকুর সাথে কথাও বলেছে, সকালে সন্ধেবেলাতেও। ঝুমা কারেন্টের কথাও জিজ্ঞেস করেছে। আসেনি, শুনে বলেছে, ‘তাহলে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ো।’

‘সেটা এমনিতেই করতে হবে। যা দু-এক টুকরো মোমবাতি আছে তা দিয়ে কোনও রকমে খাওয়াটুকু হবে।’ সুনন্দ বলে।

ঝুমা প্রতিবারের মতো সেই একই রেকর্ড করা কিছু বুলি আউড়ে ফোন বন্ধ করে। সুনন্দ ফোনটা কাটবার সময় লক্ষ্য করে চার্জ শেষ। ইন্ডিকেটরটাও ব্রিম করছে। উপায় না দেখে ফোনটা পুরোপুরি বন্ধ করে চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। মাঝে একবার উঠে মোম জ্বেলেই খান চার রুটি তৈরি করে দুধ গরম করে নেয়। তরকারি করতে আর ইচ্ছে করে না। আধপো দুধ, একটা মিষ্টি, তিনটে রুটি খাওয়া হয়ে যাবে। একটা বাড়তি করা থাকল। কোনদিন কীরকম খিদে থাকে। না হলে সকালে ভুলো তো আছেই। প্রতি সকালে গোপালদা দুধ দিতে আসার সময় ওটাও চলে আসে, লেজ নাড়ে। সুনন্দ রুটি, বিস্কুট কিছু একটা দিলে খেয়ে পালিয়ে যায়, পরের দিনের আগে আর ওর পাত্তা পাওয়া যায় না। এই বাড়িতে ভাড়া আসার মাস কয়েক পর থেকেই ভুলোর রুটিন মোটামুটি এই রকম। অবশ্য মাঝে কোনওসময় আর ঘুরতে আসে কিনা সুনন্দ জানে না। সারাদিন স্কুল, ফিরে সামনের লাইব্রেরিতে ছোটোখাটো একটা আড্ডা দিয়ে, রুটি তৈরি করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া। বেশির ভাগ শুক্রবার বাড়ি চলে যায়, ফেরে হয় রবিবার রাতে না হয় সোমবার সকালে। এই প্রোগ্রাম বদল বলতে মাঝে মাঝে স্কুলের কোনও স্যার বা দিদিমণিদের বাড়িতে গেট টুগেদার, তাও সব সময় যায় না।

প্রথম প্রথম ভাড়ার এক কামরার এই ঘরটাও গিলে খেতে আসত। কোনওদিন বাবা-মাকে ছেড়ে একা থাকেনি। ভালো কাজ পেয়েও ভিন রাজ্যে যায়নি। তবে সব সময় তো সবকিছু নিজের মর্জি মতো হয় না। বাবা মারা গেল। সেই বছরই আবার স্কুলে চাকরি পেল। প্রথম বছরটা প্রতিদিন আড়াইশো কিলোমিটার আপ ডাউন যাতায়াত করে শরীরের কলকব্জা সব ঢিলে হতে আরম্ভ করল। তারপরেই স্কুলের কয়েকজন স্যার দিদিমণির পরামর্শে বাড়ি ভাড়া করে মাকে এনে রাখলেও, মায়ের শরীর মন কোনওটাই জায়গাটার সাথে খাপ খাওয়াতে পারল না। অগত্যা আবার ডেলি-প্যাসেঞ্জারি। তারপরেই ঝুমা এল, এক বছরের মাথায় বিটকু। বিটকু জন্মাবার পরেও কয়েকটা মাস

ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করে বাধ্য হয়ে স্কুলের কাছাকাছি ঘর ভাড়া নিল, একটাই ঘর সঙ্গে বাথরুম। বাড়ি মালিকের সাথে দেখা হওয়ার কোনও উপায় নেই। তবে ভাড়া দেওয়ার সময় প্রায় কান কামড়ে বলে দিয়েছিল, ‘সামনের স্কুলের মাস্টার তাই ঘরটা দিলাম, না হলে একা পুরুষ মানুষকে কোনওমতেই ঘর ভাড়া নয়।’ সুনন্দ কথাগুলো ঝুমাকে বলতেই সে কি হাসি। মজা করে বলে উঠল, ‘তাহলে আমি সব থেকে নিশ্চিন্ত, কিছু হলে ঠিক খবর পেয়ে যাব, ফোন নম্বরটা দিয়ে আসতে হবে।’

আবার বৃষ্টি নামল। সন্ধে থেকে একভাবে হয়ে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে আবার। মাঝে কয়েকটা ঘন্টা হুডুম হাডুম থাকলেও বৃষ্টিটা পড়েনি। সুনন্দ ঘরে চেয়ারে বসে বসে পাশে গোয়ালঘরের ছাদে বৃষ্টির ফোঁটা পড়বার শব্দ শুনতে পেল। জানলার পর্দা টেনে মশারি খাটিয়ে শুতে যাবে, এমন সময় দরজার কড়া নাড়াবার শব্দ পেল। সুনন্দ প্রথমবার কোনও আমল না দিয়ে আগের মতোই শোওয়ার ব্যাবস্থা করতে লাগল। কিন্তু আবার শব্দটা পেতে চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। ঠিক বিপদে পড়লে কেউ কড়া নাড়লে যেমন শব্দ করে, তেমনি শব্দ।

চেষ্টা করেও মনের ভুল এটা নিজেকে বোঝাতে পারল না। দরজাটাও খুলতে সাহস হল না। কানের বা মনের কোনও ভুল নয় তো? তাও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল কিছু সময়। আবার সব চুপচাপ। অন্ধকার এখন আরও প্রকট। ঘরের ভিতরটা আরেকবার দেখে নিল। একটু গিয়ে দরজার উলটো দিকের জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখবার চেষ্টা করল। সেই অন্ধকার, আর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলকানি। দরজার কড়াটা আবার নড়ে উঠল। সুনন্দ আস্তে আস্তে দরজার কাছে গিয়ে কাঁপা গলায় ‘কে…?’ জিজ্ঞেস করতে ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলা শুনল, ‘একটু দরজাটা খুলবেন, খুব বিপদে পড়ে গেছি।’

মেয়ের গলা পেয়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। মেয়েটিরও গলাতে শব্দগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল। পাশের বাড়ির কাকুর কি কোনও বিপদ হল? বউদি এসেছে নাকি না, বউদি হলে তো নাম ধরে ডাকত। কিছুসময় দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, বাইরের কড়া নড়ে উঠল আবার।

আস্তে আস্তে দরজাটা একটু ফাঁক করে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু মেঘে ঢাকা। অন্ধকার রাত্রি চোখ দুটো আটকে দিল। কিছু বুঝতে পারল না। কিছু সময় পরেই একটা গলা শুনতে পেল, ‘ভিতরে আসব, বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে , দরজাটা ভালো ভাবে খুলুন।’

–আপনি কে, হঠাৎ আমার এ ঘরে তাও রাত্রিবেলা?

–সব পরে বলছি আপনি আগে দরজাটা খুলুন।

সুনন্দ দরজাটা ভালো ভাবে খুলে কিছু বলবার আগেই আগন্তুক ঘরের ভিতর সুনন্দকে পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি ঢুকে দরজার কাছে, সুনন্দের বিপরীতে বাঁদিক থেকে হাত পাঁচ দূরে দাঁড়িয়ে, বলে উঠল, ‘একটা গামছা টামছা কিছু দিতে পারবেন?’

সুনন্দের ঘোর তখনও কাটেনি। অন্ধকার হলেও চোখের সামনে দিয়ে একজন ভিতরে ঢুকল। রোগা নয় বোঝা গেল, সুনন্দের শরীরের সঙ্গে  হালকা ধাক্বা লাগল। চুড়িদার বা পাঞ্জাবি কিছু একটা পরে আছে।

আগন্তুকের পোশাকের জল গায়ে লাগার পরে দরজার ছিটকিনিটা তখনও না লাগিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল ,‘আপনি এভাবে ঘরে ঢুকে গেলেন?’

–দেখছেন না বাইরে কি অবস্থা!

–বাইরে এমন অবস্থা তো আমার বাড়িতে এলেন কেন? আর বাড়ি ছিল না?

–আসলে রাস্তার থেকে এই বাড়িটাই সামনে পেলাম, আলোও জ্বলছিল একটু আগে।

–আমি এ বাড়িতে একা থাকি।

–সেটা আমি বাইরে থেকে কীভাবে জানব?

–এবার তো জানলেন, তাহলে আসুন এবার। আমি আপনাকে পাশের বাড়ির বউদির কাছে দিয়ে আসছি।

–ভয় পাচ্ছেন? আপনার অতো ভয় কীসের?

–দিনকাল তো ভালো নয়।

–সে ভয় তো আমারও থাকবার কথা।

বাইরের বৃষ্টির ঝাপটা খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর আসছে দেখে মেয়েটি বলে উঠল, ‘দরজাটা লাগিয়ে দিন, জল আসছে।’ সুনন্দ বুঝল মেয়েটির কথাগুলো একটু স্বাভাবিক হয়েছে। একটু আগেই হাঁপাচ্ছিল।

ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। সুনন্দ মেয়েটিকে ভালো করে দেখতে না পাবার জন্য মেয়েটির বয়স, কালো না ফরসা, মুখ শরীর কিছুই বুঝল না।

–আপনি এত রাতে আমার দরজায় কড়া নাড়লেন, ঘরে ঢুকলেন, কি অসম্ভব আতান্তরে পড়লাম বলুন তো।

–সব বলছি, তার আগে কিছু একটা দিন মাথাটা মুছতে হবে। একটু খাবার জল পাওয়া যাবে?

একটু কষ্ট করে হেঁটে আগন্তুককে একটা বোতল ধরিয়ে বললাম, ‘জলটা নিন, গামছা দিচ্ছি।’ পিছনের দিকে ফিরতেই মেয়েটির জল পানের শব্দ শুনতে পেল। তার পরে একটা তৃপ্তির শব্দ এল, ‘আঃ।’

সুনন্দর হাত থেকে গামছা নিয়ে মাথাটা মুছে বলে উঠল, ‘আমি নন্দিতা। যাত্রাাদলে কাজ করি, কুশপুর গ্রামে যাচ্ছিলাম, কমলপুর চেনেন? এখান থেকে এক কিলোমিটার হবে নাকি?

–আরও বেশি। আমাদের স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী আসে।

–ও আপনি স্যার? কোন স্কুলে পড়ান?

–এই গ্রামের হাইস্কুলে।

–যাই হোক। কমলপুরে আমার মাসি থাকে। ওখানে দেখা করে ভেবেছিলাম হেঁটে বা ভ্যানে কুশপুরে চলে যাব। বেরিয়েও ছিলাম। মাঝরাস্তায় এই বৃষ্টি।

–আপনি কি পাগল, রাত্রিবেলা এই গ্রামে ভ্যান কোথায় পাবেন?

–না না, রাত্রিবেলা নয়। আমি সন্ধের আগেই বেরিয়ে ছিলাম।

–তাহলেও এই গ্রামে-ঘরে এমনি ভাবে সন্ধেবেলাতে একা বের হতে নেই।

–আসলে আমি তো এদিককার কিছু জানি না। মাসিও একা থাকে। বাসে চেপেছিলাম। ঠিক চললে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতাম। কিন্তু মাঝরাস্তায় বাস খারাপ। বাসেই বলল, ‘ভ্যান পেয়ে যাবেন।’ ভ্যানের আশায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলাম। মোবাইলে চার্জ নেই, তার উপর জল ঢুকে গেছে, দলের কারোর সাথে কথাও বলতে পারলাম না। মাঝরাস্তায় বৃষ্টি নামতে একটা মন্দিরে দাঁড়ালাম।

–কোন দিকে

এই বাড়ির পূর্ব দিকে মনে হয়।

–পূর্ব দিকে কোনও মন্দির নেই, উত্তরে আছে, ধর্মরাজের মন্দির।

–যাই হোক, সেই মন্দিরের চাতালে বসেছিলাম।

–আপনি তো অদ্ভুত, একে অন্ধকার, তার উপর এই বৃষ্টি, আর আপনি একা মন্দিরে বসেছিলেন! যে-কোনও রকম বিপদ হতে পারত।

–প্রথমে একাই ছিলাম, তাতে অসুবিধা হয়নি, কিছুক্ষণ পরে কোথা থেকে তিন-চারজন ছেলে এসে বিরক্ত করতে আরম্ভ করল, তাই পালিয়ে এদিকে চলে এলাম। আপনাদের গ্রামে তো সন্ধেবেলাতেই রাত্রি নেমে আসে দেখছি।

–আপনি এখানে কখন এসেছেন?

–আধঘণ্টা হবে।

–এখন এগারোটার বেশি বাজে, এই বৃষ্টিতে কি সবাই বাইরে নাচবে? কারেন্ট নেই, খেয়ে শুয়ে পড়েছে। আপনি কটার সময় মাসির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?

–ক’টা হবে, সাড়ে ছটা, সাতটা।

–তখন তো বৃষ্টি পড়ছিল।

–সেই রকম জোরে পড়েনি।

–আপনার কথাবার্তাতে কীরকম সন্দেহ হচ্ছে। গ্রামে রাতেরবেলা কেউ বের হয় না, তারপর ওই মন্দিরেও সন্ধেবেলা কেউ যায় না।

–স্যার পৃথিবীর সব কিছু কি অঙ্কের নিয়মে হয়?

কিছু সময় দুজনেই চুপ থাকল। বাইরে তখনও সমানে বৃষ্টি পড়ছে, কমবার কোনও লক্ষণই নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক ঘরের ভিতরের অন্ধকারকে কাঁপিয়ে আরও অন্ধকার করে, অদৃশ্য হয়ে নিজে সেই আগন্তুককে আরও রহস্যের চাদরে ঢেকে দিচ্ছে।

–আমি আজকের রাতটা আপনার ঘরে থাকব।

নিঃশব্দ অন্ধকার ঠেলে কথাটা কানে যেতেই সুনন্দের গলাতেও বজ্রপাত হল– মানে?

–মানে, যেটা বললাম।

–ক্ষ্যাপা পেয়েছেন নাকি আমাকে?

–কাল সকালেই চলে যাব।

–শুনুন একা থাকি, তাতে আবার স্কুলটিচার, কেউ জানতে পারলে আমাকে পিটিয়ে পায়েস বানিয়ে দেবে, সঙ্গে উপরি পাওনা বদনাম। বাড়ি থেকেও বের করে দেবে।

–এই যে বললেন আপনি এখানে একা থাকেন, তাতে আপনাকে কে বের করবে?

– বাড়ির লোক জানতে কতক্ষণ।

–কে আছে বাড়িতে?

–মা, বউ, ছেলে।

–তার মানে আপনি বউকে ভয় পান।

– আপনি খুব বাজে বকছেন।

–কেউ কিছু জানতে পারবে না, আমি খুব ভোরেই বেরিয়ে যাব।

–যত ভোরেই বের হন, এটা হতে পারে না। এমনি ভাবে রাতে আপনাকে আমি থাকতে দিতে পারি না।

–আপনি এক কাজ করুন, বউয়ের ফোন নম্বরটা দিন। আমি সব জানিয়ে দিচ্ছি।

–আপনি তো আমাকে আচ্ছা ঝামেলাতে ফেললেন, এটা সম্ভব নয়। আপনি প্লিজ বোঝবার চেষ্টা করুন। দরজা খুলে দিচ্ছি আপনি বাইরে চলে যান। সুনন্দর গলার উষ্মা বাড়তে লাগল।

–আপনি আস্তে আস্তে কথা বলুন, সবাই চলে আসবে।

সুনন্দ একপা এগিয়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলতে গিয়ে ডান হাতে আরেকটা নরম হাতের ছোঁয়া পেল, সেই সঙ্গে ডান কানে একটা ফিসফিস হাওয়া, ‘আমাকে বের করে দেবেন না প্লিজ।’

সুনন্দর সারা শরীর ঝন্ঝন্ করে উঠল। ছিটকিনি থেকে হাতটা সরিয়ে দরজার ডানদিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতেই সামনের জন বলে উঠল, ‘এই মুহূর্তে আমি যদি বাইরে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করি, কী হবে বলুন তো?’

–মানে! কথাটা বলবার সময় সুনন্দ ঢোঁক গিলল।

–মানে কাল সকালের আগেই আপনার স্কুল, বাড়ি, সবাই জানতে পারবে আপনি…

–কিন্তু আমি তো আপনাকে কিছু করিনি।

–রাতটা থাকি। কাল আলো ফোটার আগে বেরিয়ে যাব, কেউ কিছু জানতে পারবে না, কথা দিলাম।

সুনন্দ একটা শ্বাস ফেললেও বৃষ্টির শব্দে নিজের জায়গায় ঢাকা পড়ে গেল। কিছু সময় চুপ থেকে বলল, ‘আপনি কিন্তু ভোর তিনটে সাড়ে তিনটের সময় বেরিয়ে যাবেন, এখানে চারটে সাড়ে চারটে নাগাদ সবাই উঠে পড়ে। কেউ দেখতে পেলে আমাকে সুইসাইড করতে হবে।

–আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি আমার এত উপকার করলেন আর আমি এইটুকু করব না?

সুনন্দ সামনের দিকে এগোতেই মেয়েটি বলে উঠল, ‘আপনার ঘরে শাড়িটাড়ি তো নেই। আমার সালায়োরটা ভিজে জবজব করছে। এখানটাও ভিজে গেছে। এটা পড়ে থাকলে তো সমস্যা।

– লুঙ্গি চলবে ?

–লুঙ্গি! দারুণ। যাত্রাতে অনেকবার পরেছি। তাছাড়া র‍্যাপার তো পরি।

–তাহলে লুঙ্গি আর একটা শার্ট দিয়ে দিচ্ছি। তবে আর একটা সমস্যা হবে। আপনি এই ভিজে জামা কাপড়গুলো নিয়ে কী করবেন, এখানে তো রাখা যাবে না।

–না না এখানে রাখব কেন? চার পাঁচ ঘন্টাতে জল ঝরে যাবে, তারপর আমি পরে চলে যাব। সুনন্দ অন্ধকার হাতড়ে দেয়ালে ঝোলানো দড়ি থেকে লুঙ্গি আর শার্ট নিয়ে আগের মতোই অন্ধকার হাতড়ে এসে মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, ‘এই যে, সোজা আস্তে আস্তে হেঁটে বাথরুমে গিয়ে পোশাকটা ছেড়ে নিন।’

–অত দূর যাওয়া যাবে না। আপনার ঘরটা পুরো ভিজে যাবে। আমি এখানে চেঞ্জ করে নিচ্ছি, আপনি একটু দূরে দাঁড়ান।

–বাথরুমে গেলে ভালো হতো না?

–এখানেও খারাপ হবে না।

সুনন্দ সেই ছায়ানারীর কথামতো চেয়ারে বসল। অন্ধকারে ছায়ানারীর পোশাক বদলানো না- দেখতে পেলেও, বুঝতে পেরে চোখদুটো বন্ধ করে নিল। বন্ধ চোখেও মাঝে মাঝে ভালো দেখা যায়।

কিছু সময় পরে কানে এল, ‘ঘরে কিছু খাবার হবে?

কথাটা শুনে সুনন্দ চোখ খুললে সামনেটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল।

কিছু বললেন?

–ঘুমিয়ে গেছিলেন?

না না, চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম।

–ও! কিছু খাবার হবে?

–একটা রুটি আছে। মুড়ি হতে পারে। আর তো কিছু নেই।

–চিনি গুড় কিছু?

–চিনি আছে।

–ব্যস ব্যস। একটা রুটি চিনি মুড়ে দিয়ে দিন। প্লেট-ফেট দিতে হবে না।

–তা কি করে হয়, আমি প্লেটেই দিচ্ছি, আপনি ততক্ষণ ভিজে জামাটামাগুলো বাথরুমে মেলে দিয়ে আসুন। সোজা, আস্তে আস্তে হাঁটুন অসুবিধা হবে না। আমার টর্চটারও ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে।

–ভালোই হয়েছে, মাঝে মাঝে অন্ধকার ভালো।

কিছুসময় পর একটা জোরে শব্দ আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উফ্ কথাটা শুনেই সুনন্দ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল, কোথায় ধাক্বা লাগল?’

–এই যে শক্ত মতন কিছুতে।

–বিছানা, একটু আস্তে আস্তে চলুন।

আগন্তুক বাথরুমে গেলে সুনন্দ একটা প্লেটে চারটে বিস্কুট, রুটি, চিনি নিয়ে বিছানাতে রেখে বলল, ‘এই বিছানাতে রাখলাম, খেয়ে নেবেন।’

আবার চেয়ারের জায়গায় ফিরে বসতেই বাথরুম থেকে ছায়ানারীর গলার আওয়াজ পেল, ‘বাথরুমে মেলব কোথায়?’

–একটা দড়ি আছে, দেয়ালের দিকে, সাবধানে দেয়াল ধরে ধরে যাবেন। চেয়ারে বসে থাকবার কিছুসময় পরেই কাঠের আলমারির উপর কিছু একটা পড়বার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠে বলল ‘কিছু ফেললেন নাকি?’

– এখানে ধাক্বা লাগল।

–আপনি ওদিকে গেছেন কেন, সোজা যেভাবে গেছিলেন সেভাবেই চলে আসুন। আস্তে আস্তে আসুন, বিছানাতে খাবার দেওয়া আছে।

চেয়ারে বসেই সুনন্দ পায়ের আওয়াজ এবং কিছুপরে বিছানার ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ পেল। কিছু সময় পরে মেয়েটি বলে উঠল, ‘আপনি বিস্কুটও দিয়েছেন, ভালো।’

সুনন্দের কানে চেবানোর আওয়াজ এল।

–আপনার বাড়িতে বউ মা আর ছেলে, বাঃ বেশ ছোটো পরিবার।

প্রথমবার কথাটার কোনও জবাব না পেয়ে আগন্তুক খেতে খেতেই বলে উঠল, ‘ঘুমিয়ে গেলেন?’

–আপনি তো ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন।

–আপনি রেগে গেছেন?

–কী হবে আপনার এই সব জেনে?

–মাত্র তো কয়েক ঘন্টা, চাপ নেবেন না।

–আপনার খাওয়া হয়ে গেছে?

–হ্যাঁ।

–শুয়ে পডু়ন। আমি মশারি টাঙিয়ে দিচ্ছি।

–আপনি?

–আমার কথা অনেক ভেবেছেন, ঘুমোন।

–ছিঃ ছিঃ। তা কি করে হয়। তার থেকে আপনি ঘুমোন আমি বসে থাকি। আমার রাত জাগা অভ্যাস আছে।

–বিছানাতে শুলে আমি আর উঠতে পারব না। ভোরে আপনাকে ডাকতেও পারব না। ।

–বাঃ বাঃ আপনি সেই একই কথা ভাবছেন। আমি তো আপনাকে কথা দিয়েছি।

–ঠিক আছে আপনি শুয়ে পড়ুন।

–আমি কি এই বিছানাতে শোবো?

–তাছাড়া, মাটিতে শুতে পারবেন না, জায়গাও নেই।

কিছুসময় দুজনেই চুপচাপ। বাইরে বৃষ্টির সাথে ঝড় উঠেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো। ঘরের ভিতর দুজন অচেনা অল্প জানা মানুষদের একে অপরের কাছে কিছুসময়ের জন্য দৃশ্যমান করেই আবার নিজেকে লুকিয়ে দিচ্ছে।

–শুনুন না, আমার খুব খারাপ লাগছে, আপনি এইভাবে সারারাত বসে থাকবেন, আর আমি শুয়ে থাকব। তার থেকে আপনি শুয়ে পড়ুন।

–অনেক জ্বালিয়েছেন এবার একটু ক্ষ্যামা দিয়ে শান্তিতে বসতে দিন। রাতে ঘরে ঢুকেছেন, খেতে পেয়েছেন, শুতে পেয়েছেন, এবার ঘুমোন। আমাকে শুধু চাদরটা বের করে দিন। বালিশের নীচে পাবেন।

চাদর ঢাকা নিয়ে পাদুটো সোজা করে বসতে সুনন্দ স্পষ্ট বুঝতে পারল আগন্তুক শুয়ে পড়েছে।

সুনন্দ চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। এই অন্ধকার বৃষ্টির রাতে ঝুমা থাকলে অন্যরকম সমীকরণ তৈরি হতো। সুনন্দ চারদিকটা আরেকবার দেখে নিল। ছায়ানারী শুয়ে আছে। সুনন্দের শরীরের অনেক অঙ্ক, অসমীকরণ ঝাঁপাঝাঁপি আরম্ভ করলেও উত্তর নেই, পাতা উলটে সমাধান করবার উপায় নেই। এক একটা দিনের উচ্চতা, দূরত্ব বাকি সব দিন বা রাতের সূচক ছাড়িয়ে যায়। উত্তর মেলে না, শুধু পাতার পর পাতা ব্যর্থ কষা। সমীকরণ, অসমীকরণের গ্রাফ, লগ, বা পাটিগণিতে শরীর নষ্ট হয়, পায়জামা, লুঙ্গি ভিজে দাগ হলেও শুধু জয় জগন্নাথ বলে রণে ভঙ্গ দেওয়ার অঙ্ক শিখে নেওয়ার মধ্যেই তো সব গ্রাফ, সব জটিল বিষয়ের মিল!

–মাস্টারদা, ও মাস্টারদা।

বাইরের আওয়াজে থতমত খেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সুনন্দ। ঘরের ভিতরে সব আলো জ্বলছে। মশারিটা এখনও খাটানো রয়েছে। তার মানে গতরাতের মেয়েটা এখনও শুয়ে আছে। মাথার ভিতরটা দপ্দপ্ করতে লাগল। জীবন, জীবিকা সবের বারাটো বেজে যাবে। তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে দুধের বাটি নিয়ে দরজার কাছে আসতেই জলে হালকা পিছলে গেলেও সামলে নিয়ে, ছিটকিনি খুলে ডান হাতটা বের করে দুধ নিল।

–কি ব্যাপার মাস্টারদা, আজ এত ঘুম, কখন থেকে ডাকছি।

–কাল সারারাত কারেন্ট ছিল না, ঘুম হয়নি, ভোরে ঘুমিয়ে গেছি।

বেশি কথা আর না বাড়িয়ে দরজায় ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিল। মেয়েটা কথা রাখল না। বলেছিল ভোরে চলে যাবে। এবার কী হবে? সুনন্দ মশারির কাছে আসতেই দেখল বিছানা ফাঁকা। মেয়েটা? বাথরুমে!

সুনন্দ বাথরুমের কাছে এসে দরজায় টোকা দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল। তাহলে মেয়েটা!

চোখ পড়ল বাথরুমের দেয়ালের টাঙানো দড়িটাতে, ওই তো, লুঙ্গি, শার্ট।

তাহলে মেয়েটা! চলে গেল? না, তাহলে তো দরজার ছিটকিনিটা ভিতর থেকে দেওয়া থাকত না। কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। মেয়েটা তো গতকাল রাতে ঘরে এসেছিল, অন্ধকার হলেও সুনন্দ এতটা ভুল দেখেনি।

সুনন্দ রুটির জায়গাটা খুলল, কী আশ্চর্য এই তো রুটিটা আছে। কিন্তু কাল রাতে নিজে একটা প্লেটে মেয়েটাকে রুটিটা দিয়েছিল, তাহলে!

মশারিটা তাড়াতাড়িতে খুলতে গিয়ে দুটো দড়ি ছিঁড়ে ফেলল। দলা পাকিয়ে একপাশে সরিয়ে রেখে বিছানাতে হাত দিল। এই তো পায়ের দিকটা ভিজে। বালিশটাও সাঁতস্যাত করছে। চাদরটা কুঁচকে আছে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কেউ শুয়ে ছিল।

সুনন্দর শরীরে একটা অসমীকরণের স্রোত বইতে আরম্ভ করলেও, এবারেও কোনও সমাধান বা উত্তর মেলাতে পারল না। বালিশটা সরাতে একটা ভাঁজ করা ছোটো কাগজ দেখতে পেল। হাতে নিয়ে খুলতেই বুঝল বাসের টিকিট। ভাড়ার টাকা কিছু না লেখা থাকলেও টিকিটের নীচের দিকে ধন্যবাদ লেখাটাতে চোখদুটো আটকে গেল।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব