মা (পর্ব – ১)

রোজকার মতোই তুষার চায়ের ট্রে হাতে করে বেডরুমে এসে ঢোকে। সাইড টেবিলে ট্রে-টা নামিয়ে রেখে জানলার পর্দাগুলো সামান্য সরিয়ে দেয় ঘরে আলো ঢোকার জন্যে। জানলা দিয়ে একফালি কমলালেবুরঙা স্নিগ্ধ আলো এসে পড়ে রঞ্জনার মুখের উপর। রঞ্জনা চোখ বুজেই খাটে পাশ ফিরে শোয়। হাত দিয়ে চোখটা ঢাকার চেষ্টা করে। তুষারের মুখে একটা পরিতৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। বিছানায় বসে রঞ্জনার চুলে হাত রাখে তুষার, ‘ম্যাডাম, উঠুন। দাস আপনার চা নিয়ে হাজির।’

তুষারের গলা শুনেও রঞ্জনার চোখ খুলতে ইচ্ছা করে না। চোখ খুললেই তো কাজের পাহাড়। যদিও সকালটা তুষারই সামলে দেয়। দেরি করে ওঠাটা রঞ্জনার অভ্যাস। তুষারের ঘুম খুব সকালে ভেঙে যায়। উঠেই চোখে মুখে জল দিয়ে বেডরুমে রাখা মিউজিক সিস্টেম চালিয়ে দেয়। দু’জনেরই মিউজিক প্রিয়। হালকা করে চলতে থাকে আমজাদ আলি বা রবিশংকর। ঘরের জানলাও খুলে দেয় ভোর থাকতে যাতে কিছুটা ফ্রেশ হাওয়া এসে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে যেতে পারে তাদের শরীরে।

শুয়ে শুয়ে রঞ্জনা বুঝতে পারে তুষার পাশে বসে তার জেগে ওঠার অপেক্ষা করছে। চা এনেছে যখন না খাইয়ে ছাড়ছে না। এরই মধ্যে তুষারের কথা কানে আসে, ‘কী হল ম্যাডাম? বিছানার ওম ছেড়ে ওঠার কি ইচ্ছে নেই? সকাল সকাল তোমার সম্পাদক সাহেবের ফোন এসেছিল। কোনও একটা স্টোরির গন্ধ পেয়েছেন মনে হল, তাই তড়িঘড়ি তোমার খোঁজ পড়েছে।’

‘সম্পাদক’ শব্দটা বোধের উপর আঙুল ছোঁয়াতেই রঞ্জনা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে। ‘মিস্টার সেনের কি চোখে ঘুম আসে না যে সাতসকালে ফোন করেছেন?’

‘তোমার এডিটর সাহেবটি খুব ভালো করেই জানেন যে তুমি দেরি করে ঘুম থেকে ওঠো। তা সত্ত্বেও সাত সকালে ফোন করে আমার ঘুমটাও বরবাদ করেন। ‘

তুষার, রঞ্জনার হাতে চায়ের কাপটা তুলে দিয়ে নিজের কাপটাতে চুমুক মারে। হাতে আর বেশি সময় নেই। ঘরের টুকটাক কাজকর্ম মিটিয়ে অফিসের জন্য বেরোতে না পারলে নির্ঘাত দেরি হবেই। সুতরাং উঠে পড়ে তুষার। দুধ নিয়ে এসে গ্যাসে ফুটতে বসিয়ে টোস্ট তৈরি করাটা তুষারের রোজকার কাজ। বাকি রঞ্জনা উঠে যা করবার করবে।

মাত্র বছর দেড়েক হয়েছে দু’জনের বিয়ের। লভ ম্যারেজ। অবশ্য দুই পক্ষের পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটা হয়েছে। কিন্তু ওরা ভবিষ্যতের প্ল্যানিং ছাড়াই জীবনটা সুন্দর কাটিয়ে দিচ্ছে। সংসারের কাজটাকে দুজনে অলিখিত নিয়মে সুবিধামতো ভাগ করে নিয়েছে।

বিয়ের আগে অন্য ছেলেদের মতোই তুষার রান্নাঘরের কোনওদিন পা বাড়ায়নি। বাড়ির সব কাজ মা-ই করতেন। তুষার বড়ো হয়ে থেকে দেখে আসছে রান্নাঘরে মায়ের একাধিপত্য। আলস্য বস্তুটা মায়ের মধ্যে দেখেছে বলে তুষারের মনে পড়ে না। বাড়ির কেউ মা-কে সাহায্য করতে চাইলেও, মা সঙ্গে সঙ্গে তাকে না-করে নিতেন, বলতেন, ‘তোমরা নিজেদের কাজ করো। রান্নাঘরের কাজটা ভগবান মেয়েদের জন্যেই বেছে রেখেছেন।’

তুষারের বড়ো ভাই বিনয়, গ্রিন কার্ডহোল্ডার একটি মেয়েকে বিয়ে করে আমেরিকায় চলে যায় বেশ কয়েক বছর আগে। বড়ো ভাইয়ের চলে যাওয়াটা মা-বাবার মনে একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। তারপর থেকেই তুষারের মনে হতো মা তাকে আগলে আগলে রাখছেন। চাকরি নিয়ে বাইরে চলে যাওয়ার একেবারে বিপক্ষে ছিলেন মা। বাবাও চাইতেন পরিবারের ব্যাবসা-টা তুষারই দেখুক। কিন্তু তুষারের ভালো লাগত বই আর খবরের কাগজের পাতার কালো অক্ষরগুলো। রাত্তিরে বই নিয়ে শুলে, বাবা এসে পাশে বসে ব্যাবসার কথা বোঝাবার চেষ্টা করতেন। ছেলের বিরক্তি দেখে মা হেসে বাবাকে বোঝাবার চেষ্টা করতেন, ‘কেন শুধু শুধু ছেলেটাকে বিরক্ত করছ তুমি। পড়তে ভালোবাসে তাতে চিন্তার কী আছে? তোমারই তো রক্ত। একদিন দেখবে নিজেই ব্যাবসায় আগ্রহ দেখাচ্ছে।’

কিন্তু অসীমাদেবীর এই ভবিষ্যতবাণী মিথ্যাই প্রমাণিত হয়। পড়াশোনা শেষ করে তুষার চাকরির সন্ধানে ঘুরতে থাকে। পেয়েও যায়। একটি প্রতিষ্ঠিত খবরের কাগজের দফতরে সাব-এডিটরের চাকরি। কাজের প্রতি একাগ্রতা দেখে অসীমাদেবী এবং পরিমলবাবু বুঝে যান, পরিবারের ব্যাবসার ভার ছেলে কোনওদিনই কাঁধে তুলে নেবে না।

সেদিন বিকেলে স্বামী-স্ত্রী দুজনে বসার ঘরে বসে কোনও কিছু নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, এমন সময় তুষার এসে ঘরে ঢোকে। ছুটির দিন। দুপুর থেকে তুষার বাড়িতেই রয়েছে। প্রথমটা অসীমাদেবী সামান্য আশ্চর্য হয়েছিলেন কারণ ইদানীং ছুটির দিনগুলোতেও তুষার বাড়িতে থাকত না। অফিসের কাজের অজুহাতে সারাদিন বেপাত্তা।

“যাক ভালোই হল। তোমরা দু’জনেই দেখছি এখানে রয়েছ। তোমাদের সঙ্গে আমার কিছু কথা রয়েছে। তুষারের গলা শুনে পরিমলবাবু এবং অসীমাদেবী তাকান ছেলের দিকে। কথা বলতে বলতে দুজনে কেউই খেয়াল করেননি ছেলে কখন এসে ঘরে ঢুকেছে।

“মা, কিছুদিন আগে রঞ্জনা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয়। মেয়েটিও জার্নালিজম নিয়ে ডিপ্লোমা করেছে। ওর বাবা নামি একটি সংবাদপত্রে সিনিয়র জার্নালিস্ট, নাম দেবরঞ্জন রায়। তোমরা নিশ্চই ওনার নাম শুনে থাকবে। রঞ্জনার মা কলেজের প্রফেসর এবং ভাই ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত। আমি রঞ্জনাকে বিয়ে করতে চাই।’

তুষারের মুখে হঠাৎ-ই সব শুনে পরিমলবাবু এবং অসীমাদেবী খানিক্ষণ চুপ করে থাকেন। কী বলবেন বুঝে পান না। তারা যে মানসিকতা নিয়ে সন্তানদের বড়ো করে তুলেছেন, তার সঙ্গে পুরো ঘটনাটার কোনও সাযুজ্য খুঁজে পান না। ছেলে যেখানে নিজেই মেয়ে দেখে বিয়ে স্থির করে ফেলেছে সেখানে তাদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ তে কিছুই যায় আসে না। পরিমলবাবু নিজের ভাবনার গতিবেগকে সংযত করেন, “বাঃ সে তো বেশ ভালো কথা। একটা দায়িত্ব থেকে তাহলে তুমি আমাদের নিষ্কৃতি দিলে। একটা দিন দেখে তাহলে দুটো পরিবারের মধ্যে প্রয়োজনীয় কথাবার্তাগুলোও সেরে ফেলা দরকার। তোমাদের যেদিন সুবিধা হবে মা-কে জানিয়ে দিও।’

ক্রমশ…

গর্ব (পর্ব ১)

বহুদিন পর নিজের জন্মস্থানের মাটিতে পা রাখলেন রমেন্দু সমাজপতি। মনে মনে হিসেব করে দেখলেন তা প্রায় কুড়ি বছর তো হল বটেই! বড়ো ছেলে রঞ্জন মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক দুটোতেই অসাধারণ রেজাল্ট করে আইআইটি-তে খুব সহজেই চান্স পেয়ে গিয়েছিল।

ছোটো ছেলে রাহুলও দাদার মতো দুর্দান্ত রেজাল্ট করে যাচ্ছিল। এইসময় রমেন্দুর ট্রান্সফার অর্ডার এল কলকাতায়। ওদের পড়াশোনোর কথা চিন্তা করে রমেন্দু কলকাতায় একটা ফ্ল্যাটও কিনে ফেললেন। এরপর হঠাৎ করেই পর পর দু’বছরের মধ্যে বাবা মা দু’জনেই গত হলেন।

সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে অহেতুক কিছু বিবাদ তৈরি হল পরিবারে। রমেন্দু দেখলেন, কলকাতাতেই যখন তাঁর সবকিছু তখন দেশের বাড়ি ঘরদোর রেখে লাভ কী? ভাগের সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেন। শিকড়টা ছিঁড়ে গেল চিরদিনের মতো।

সবকিছু বিক্রি করার যে খুব ইচ্ছে ছিল তা নয়, কিছুটা অভিমানেই অমনটা করেছিলেন রমেন্দু। বাবা মারা যেতেই ভাইয়েরা সম্পত্তির ভাগ নিয়ে এমন শুরু করে দিল যে, রমেন্দুর মন একদম ভেঙে গিয়েছিল। রাতারাতি ডিসিশন নিয়ে ফেললেন, আর এখানে কোনও দিন আসবেন না, ওদের মুখ দর্শনও করবেন না। যে-ব্যবহারটা ভাইয়েরা করেছিল তাতে ভবিষ্যতে ওদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছিল। জ্যাঠতুতো ভাই তিনুর কাছে রমেন্দু প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন নিজের অংশ।

বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটি আর নেই। ওরা কেটে ফেলেছে, কিংবা একা একাই মরে গিয়েছে। তিনু তিনতলা বাড়ি হাঁকিয়েছে। নীচে ওপরে ভাড়া, মাঝের তলায় তারা থাকে। তিনু এখন বেশ বড়োলোক। অঢেল টাকার মালিক।

অভিমান ভুলে ছোটো ভাই রাখালের বাড়িতেই উঠেছেন রমেন্দু। সম্পত্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি গোলমাল পাকিয়েছিল রাখালই। এখন বিশেষ ভালো নেই রাখাল। একটা কিডনি ড্যামেজ। ছেলে মেয়ে দুটো একেবারেই মানুষ হয়নি। কোনওরকমে চলছে তার।

ভাইদের জন্য নয়, জন্মভূমি আর বাল্যবন্ধু শিবতোষের টানেই এসেছেন রমেন্দু। শিবতোষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ আছে। শিবতোষ সুযোগ পেলেই বলে, একবার এসে ঘুরে যা। কাদের ওপর অভিমান করছিস? কত পালটে গেছে আমাদের জন্মভূমি, একবার দেখতে ইচ্ছে করে না তোর?

রিটায়ার করার পর রমেন্দুর মনে হয়েছে, জীবনের মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। সত্যি তো, কার ওপর অভিমান করছে সে! উপলব্ধির দরজা কখন যে খুলে যায়!

বুনিয়াদপুরের মাটিতে পা রেখেই মনে মনে হেসেছিলেন রমেন্দু। শিবতোষের কথাটা ডাহা ভুল। মায়ের শরীরের গন্ধটা কুড়ি বছর পরেও একইরকম অমলিন। মায়ের শরীরের গন্ধ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পারফিউম এবং সেটা যে-কখনও মুছে যায় না, বুঝতেই পারেননি শিবতোষ।

—অবশেষে এলি তাহলে!

অনেকটা বুড়িয়ে গেলেও শিবতোষের হাসিটা একইরকম ঝকঝকে। কতকাল পরে সামনাসামনি দেখা! ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলতে হয় শিবতোষকে। একটা অ্যাক্সিডেন্টে বাঁ-পা কাটা পড়েছে। রমেন্দু তখন চেন্নাই, খবরটা পেলেও আসা হয়নি। শিবতোষদের বাড়িটা একসময় টিনের ছিল। টিনের দেয়াল, টিনের চাল, মেঝেটা পাকা। বৃষ্টির সময় টিনের চালে অদ্ভুত সুন্দর একটা মিউজিক তৈরি হতো। এখন সবকিছু পাকা। তবে তেমন শৌখিনতার ছাপ নেই, নেহাতই আটপৌরে।

—ভালো আছিস তো সবাই? ভেলভেটের গদি আঁটা একটা কাঠের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন রমেন্দু।

বছর বাইশ তেইশের ভারি মিষ্টি মুখের একটা মেয়ে জলের গেলাস হাতে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর।

শিবতোষ বললেন, “আমার ছোটো বউমা। গতবছর বিয়ে হয়েছে ওদের। তোকে কিন্তু চিঠি পাঠিয়েছিলাম।’

রমেন্দু সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, “তোর ছোটো ছেলে এখন কী করছে? কী যেন নাম ওর?’

—রাজা। ভালো নাম রণতোষ। বিএসসি পাশ করার পর কিছুদিন বসেছিল। চেষ্টা চরিত্র করে একটা প্রাইমারি স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়েছি। চাকরি করে, সঙ্গে টিউশনিও করে, সব মিলিয়ে ভালোই আয় করে। বড়ো ছেলে শেখর বাজারে বইখাতার দোকান করেছে।

রমেন্দু, রাজার বউয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার নাম কী মা?”

—রিনি।

রিনি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। রমেন্দু মনে মনে ভাবলেন, আগে জানলে কিছু একটা উপহার আনতে পারতেন। কিন্তু সেটা যখন হয়নি তখন এখান থেকেই কিছু একটা কিনে দেবেন। প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে ভালো লেগে গিয়েছে তাঁর। কী সুন্দর প্রতিমা প্রতিমা গড়ন! টানা টানা চোখে অদ্ভুত এক মায়া মেশানো।

রিনি হেসে বলল, “বাবার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। বাবা তো আপনাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আপনাদের কথা উঠলে আর থামতেই চায় না।’

—তাই? কী কী বলে তোমার শ্বশুর? হাসলেন রমেন্দু।

—সে অনেক কথা। আপনি কত্তবড়ো চাকরি করতেন। আপনার এক ছেলে ইঞ্জিনিয়র, এক ছেলে ডাক্তার— দু’জনেই বিদেশে থাকে। আরও কত্ত কী। একটা কথা জিজ্ঞেস করব কাকাবাবু? না মানে আমার কৌতূহল আর কি…।

রমেন্দু অবাক হয়ে বললেন, ‘কী?’

—শুনেছি আপনার বড়ো ছেলের বউ বিদেশিনি, মেমসাহেব। আপনারা ওর সঙ্গে কোন ভাষায় কথা বলেন? ইংরেজিতে? হো হো করে হেসে উঠলেন রমেন্দু। প্রাণখোলা হাসি। মনে হল বহুদিন পর যেন অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে একটা বিশুদ্ধ হাসি উঠে এল। রিনি কিছুটা অপ্রস্তুত, মুখে বোকা হাসি!

—না না মা, তোমার কৌতূহল যুক্তিসঙ্গত। আমার বিদেশিনি বউমা বাংলার ‘ব’ও বোঝে না। ইংরেজিতেই কথা হয়। তবে এবার দেখলাম দু’চারটে বাংলা শব্দ শিখেছে সে। সবমিলিয়ে ভাব বিনিময় ঠিক হয়ে যায়। ওরা যখন আসে ক’টাদিন খুব মজা হয়। মারিয়া মানে আমার পুত্রবধূটি বেশ মিশুকেও বটে।

শিবতোষের বড়ো বউমা প্লেট ভর্তি করে মিষ্টি নিয়ে এসেছে। প্রণাম পর্ব সে আগেই সেরে নিয়েছিল। টুল টেনে প্লেটটা রাখতে রাখতে বলল, “আপনার বউমার কথা শুনেই খুব দেখতে ইচ্ছে করছে কাকাবাবু। অবশ্য দেখা হলে আমরা দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না। কী কথা বলব? আমাদের ইংরেজি শুনলে সে নিজের মাতৃভাষাই ভুলে যাবে, এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবুও দেখতে ইচ্ছে করছে।’

রিনি বলল, ‘আমারও। মেমবউ তো জীবনে কোনও দিন দেখিনি।’

—বেশ বেশ, সুযোগ পেলে একবার নিশ্চয়ই দেখাব তোমাদের। কিন্তু এত মিষ্টি কে খাবে? আমার যে সুগার।

শিবতোষের বড়ো বউমার নাম ইন্দ্রাণী। সবাই টুকি বলেই ডাকে। দেখতে শুনতে অতি সাদামাটা। পড়াশোনোর গণ্ডিও যৎসামান্য। তবে ভীষণ আন্তরিক আর দায়িত্বশীলা। রমেন্দু এসে অবধি দেখছেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রয়োজন- অপ্রয়োজনের খবর রাখে মেয়েটা। যথাসাধ্য সেসব পূরণও করার চেষ্টা করে। তার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের কাজকর্ম করে চলেছে দিব্যি।

ক্রমশ…

পাথর-প্রতিমা (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

একপ্রকার আমার জোরাজুরিতেই আমি আর সিদ্ধার্থ বড়োদিনের সন্ধেবেলা হাজির হলাম আদিবাসীদের গ্রামে। দূর থেকে দেখেই বিরজু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আরও অনেকে রয়েছে। আয়োজন ভালোই। মহুয়া আর মেঠো ইঁদুরের মাংস ধনেপাতা দিয়ে। সিদ্ধার্থ আমাকে চোখ দিয়ে ইশারা করল, না খাওয়ার জন্য। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে যে-নেশার বীজ শরীরের অলিতে গলিতে ছড়িয়েছে তাকে এড়ানো বড়ো মুশকিল। তার ওপর আবার যদি ছোটোবেলার স্যাঙাতদের অনুরোধ থাকে। বেশ কয়েক ভাঁড় মহুয়া মেরে দিলাম ইঁদুরের মাংস দিয়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছি অনেকগুলো আধখাওয়া চাঁদ। তার মানে ভালোই নেশা হয়েছে।

সিদ্ধার্থ বলল, ‘চল এবার উঠি।’

আমার তখন ওঠার শক্তি নেই। হাতের ইশারায় আর একটু অপেক্ষা করতে বললাম। সিদ্ধার্থ তাড়া দিল। বিরজু ভরসা জোগাল, ‘সিধু তুই যা, আমি একটু পরে শুভকে এগিয়ে দেব।’ সিদ্ধার্থ আমার পিঠে হাত বুলিয়ে ভরসা দিয়ে চলে গেল।

আমি আর বিরজু আবার শুরু করলাম। উল্লাস! কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, বিরজুর-ই ওঠার ক্ষমতা নেই। ও আমাকে কীভাবে এগিয়ে দেবে! আমার শরীর ছেড়ে দিয়েছে। মনের জোরে উঠে দাঁড়ালাম। ভাবলাম, নদীর ধার দিয়ে কোয়ার্টারে ফিরতে অনেক সময় লাগবে। তার চেয়ে বরং পাহাড়ি জঙ্গলের মেঠো পথ দিয়ে শর্টকাট মারি।

ধীরে পাহাড়ের ঢাল ধরলাম। চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ। থকথকে অন্ধকার। চারপাশের কালো পাহাড়গুলো যেন আমার বুকের ওপর চেপে বসছে। পা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। আর চলতে চাইছে না। হঠাৎই পিঠে একটা শক্ত কিছু দিয়ে ধাক্কা মারা অনুভব করলাম। মুখ থুবড়ে সামনে পড়ে গেলাম। তারপরেই সেই গল্পের শুরুর ঘটনাটা।

আমার যখন হালকা জ্ঞান ফিরল, তখন দেখি আমি একটা পাহাড়ের গুহায় হাত বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছি। দূরে আবছা দেখতে পেলাম একটা আগুন জ্বলছে। চারদিকে গোল হয়ে জলপাই রঙের পোশাক পরা কয়েকটি ছেলেমেয়ে। বসে খাওয়াদাওয়া করছে। একজনকে পিছন থেকে দেখে, যেন মনে হল বুধিয়া। আমার আর বুঝতে অসুবিধে হল না যে, আমি একটি জঙ্গি সংগঠন দ্বারা অপহৃত হয়েছি। কিন্তু এখন মুক্তির উপায় কী? আপাতত চুপ করে বসে থাকা ছাড়া আমার এই মুহূর্তে আর অন্য কোনও পথ নেই।

রাত ক্রমশ গড়াচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম চাঁদ দিক বদল করছে। ক্লান্তিতে আমার আবার চোখ জুড়ে আসতে লাগল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ ঘুম ভাঙল একটা উষ্ণ হাতের কোমল স্পর্শে। ভারী চোখের পাতা খুলে চমকে উঠলাম। চাঁদের আলোয় দেখি বিজলি। পরনে জংলা রঙের পোশাক। পিঠে একটা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। দূরে আগুনটা নিভু নিভু। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কয়েকজন শুয়ে আছে।

পায়ের জুতোর ফাঁক থেকে ছোটো ছুরিটা বার করে বিজলি আমার হাতের বাঁধনটা কেটে দিল। তারপর ঠোঁটের ওপর আঙুল দিয়ে শব্দ করতে বারণ করল। হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। আমি বিজলির হাত ধরে উঠে দাঁড়ালাম। মাথা নীচু করে বেরিয়ে এলাম গুহা থেকে। অন্ধের মতো ওর হাত ধরে পাহাড়ি পথে জঙ্গল চিরে হাঁটতে লাগলাম। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জানি না।

কিছুক্ষণ পরে পিছনে শুনি শুকনো পাতার খসখস আওয়াজ। মনে হয় কেউ বা কারা যেন আমাদের অনুসরণ করছে। আমরা হাঁটার গতি বাড়ালাম। কতক্ষণ হাঁটছি খেয়াল নেই। শুধু মনে হচ্ছে মৃত্যুর মুখ থেকে জীবনের দিকে হাঁটছি। হঠাৎ আমরা একটা উঁচু টিলার ওপর এসে দাঁড়ালাম। দূরে দেখা যাচ্ছে নীচে আমাদের রাজগাঙপুর। টিপটিপ করে জ্বলছে কোয়ার্টারের কয়েকটা আলো। মুহূর্তের মধ্যে বিজলি আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। আমি পাহাড়ের বুকে আবার হারিয়ে যেতে লাগলাম। একটা আদিম চুম্বন আমার সংবিৎ ফেরাল। মনে হল খুব কাছেই কোনও মানুষের উপস্থিতি। ভারী বুটের আওয়াজ। বিজলি আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “পালা…ও। যত তাড়াতাড়ি পারো।’

আমি রুদ্ধশ্বাসে দৌড় শুরু করলাম। আচমকা পিছনে একটা গুলির আওয়াজ। একটা মেয়েলি গলার বিকট চিৎকার। চারদিকের পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই গগনভেদী শব্দ। সে শব্দ কীসের! সে কি কোনও নারীর মৃত্যুর আর্তনাদ? নাকি তার দলের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার বিচারহীন ভবিতব্য শাস্তির প্রতিবাদ? বা জাতপাতের অন্ধবিশ্বাসে এক নিষ্পাপ ভালোবাসার মৃত্যুর বিরুদ্ধে জেহাদ! জানি না৷

এক দৌড়ে এসে থামলাম একেবারে সিদ্ধার্থদের বাড়ির সামনে। দরজা খুলে আমার অবস্থা দেখে সিদ্ধার্থ অবাক। আমি নিশ্চুপ। আমার এক চোখে তখন বাঁচার আনন্দ, অন্য চোখে ভালোবাসার মরণের অশ্রু।

পরদিন কলকাতা ফেরার ট্রেন ধরলাম। সিদ্ধার্থ স্টেশনে ছাড়তে এল। ট্রেন ছাড়ার পর, আমি হাত নাড়তে থাকলাম। আমার পিছনে পড়ে রইল পাহাড়ঘেরা আমার জন্মস্থান, আমার ছোটোবেলার বেড়ে ওঠার স্মৃতিবিজড়িত পাহাড়ের পাদদেশের এক আদিবাসী গ্রাম আর আমার পবিত্র ভালোবাসার মৃত্যু উপত্যকা।

 

 

পাথর-প্রতিমা (পর্ব- ২)

পর্ব – ২

অসতর্ক মুহূর্তের সব ফেলে আসা কথা। আমাকে আবির মাখিয়ে দাঁড়িয়েছিল সামনে। চোখের ইশারায় বোঝাতে চাইছিল আবির হাতে আমাকে, ওর শরীরের দখল নেওয়ার জন্য। তবে বিজলির সাথে আমার সম্পর্ক চরমে পৌঁছে ছিল সে বছর বড়োদিনের দিন। যখন ও আমায় মহুয়া খাবার পর জঙ্গলের পথ ধরে রাতেরবেলা বাড়ি পৌঁছে দিতে আসছিল।

খরস্রোতা কিশোরীর মতো পাহাড়ি ঝরনা দুকুল ছাপিয়ে উপচে পুরো পাহাড় ভিজিয়ে দিয়েছিল সেদিন। পাহাড়ের কোলে শিশিরে ভেজা ঘাসের ওপর আধখাওয়া চাঁদের দুধ গড়িয়ে পড়েছিল আমাদের দু’জনের গা বেয়ে। পাহাড়ি ঝরনার সাদা ফেনার মতো আমার ফরসা শরীরে কালো পাহাড়ের মতো বিজলি চেপে বসেছিল। পাহাড়ের বুক ফেটে ঝরনা নেমে এসেছিল আদিম গহ্বর থেকে শহুরে সভ্যতার বুকে। ব্যস! সেই শেষ রাত। তারপর আর বিজলির সাথে সেভাবে কোনওদিন যোগাযোগ হয়নি। কারণ দু’পক্ষেরই বাড়ির চাপে অবাধ মেলামেশার উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছিল। তবে শেষ দেখা হয়েছিল, বাবা যেদিন বদলি হয়ে গেল। তখন আমি কলেজ শেষ করেছি সবে। ও দূরে দাঁড়িয়েছিল পাথরের মতো। যার বুকে অনেক হিমবাহ জমে আছে।

শুধু দু’চোখের কোণা বেয়ে তিরতির করে গড়িয়ে পড়ছে ঠিক কোয়েল নদীর মতো একটা ক্ষীণ ধারা। তারপর এই আবার এখানে এলাম বছর দুই পর। শীতের ছুটিতে। ছোটোবেলার শিকড়ের টানে। তবে তখন পাহাড় আর তার এই উপত্যকার ছবি এক থাকলেও রং পালটে গেছে অনেক। তবে এসে যা শুনলাম, তাতে বুঝলাম, তার জন্য দায়ী ওরা নয়। দায়ী আমরাই, শহুরে মানুষেরাই।

এবার বাঁক নিয়ে গল্পের শুরুর দিকে আবার ফিরে যেতে হবে। এ বছর আমি এসেছি বড়োদিনের ছুটিতে। এসে উঠেছি বাবারই এক বন্ধুর কোয়ার্টারে। ওনার ছেলে সিদ্ধার্থ আবার আমার স্কুলের বন্ধু। আমরা দু’জনেই গিয়েছিলাম বড়োদিনের সন্ধেবেলা আদিবাসীদের গ্রামে। ওখানে সব ছোটোবেলাকার খেলার সাথি এখনও কিছু আছে। তবে সিদ্ধার্থ প্রথমে যেতে চাইছিল না। তার কারণ ও যা বলল, আমি তো শুনে অবাক। ওর কথাটাই এখানে হুবহু তুলে ধরি।

—শোন শুভজিৎ, তোর এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু জানা দরকার। তোরা এখান থেকে চলে যাওয়ার পর, অনেকেই কোয়ার্টার ছেড়ে চলে গেল। তুই আগের ধারণা নিয়ে এখানে এখন ঘোরাফেরা করলে বিপদ হতে পারে। তাই আগে থেকেই তোকে একটু সাবধান করে দিচ্ছি।

—বিপদ! আমাদের এই উপত্যকা তো স্বর্গরাজ্যের মতো সুন্দর ছিল। সেখানে আবার সমস্যা কী হল?

—না… আগে তো সত্যিই কোনও ঝামেলা ছিল না। কিন্তু এখন কারখানাগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। নানারকম অশান্তিও শুরু হল একটার পর একটা। প্রথমে যেটা ঘটল, সেটা ভয়ংকর। তোরা চলে যাবার মাসখানেক পরেই। তুই তো জানতিস হাতিশালায় প্রতি হাতিপিছু দশ কেজি করে আটা দিনে বরাদ্দ ছিল। সেই আটা চুরি করত প্রভাকরদা, মানে প্রভাকর মাহাতো। চিনতে পারছিস তো?

—হ্যাঁ, চিনব না কেন? প্রভাকরদাই তো হাতিদের মাহুত ছিল। আমাকে কতবার হাতির পিঠে চড়িয়েছে।

—হ্যাঁ ঠিক। জানিস তো হাতিরা এমনিতেই খুব সংবেদনশীল আর বুদ্ধিমান। ওদের আধপেটা খেয়েই দিন কাটত। একদিন এক আদিবাসী সাফাইওয়ালা যেই না ঢুকেছে হাতিশালা পরিষ্কার করতে। আর ব্যস! তখনই একটা হাতি শুঁড়ে করে পেঁচিয়ে তাকে দেয়ালে ঠেসে পিষে মেরে দিল। সেই প্রথম খেপল আদিবাসীরা। আসলে প্রভাকরদার অসততায় বিনা দোষে একজন আদিবাসী মারা গেল।

—তারপর?

—তোর রমণীকাকুকে মনে আছে?

—হ্যাঁ রমণীমোহন কর। ডলোমাইট খনির ক্যাশিয়ার ছিল।

—তুই তো জানিস। রমণীকাকুর স্বভাব চরিত্র কোনও দিনই ভালো ছিল না। নিরক্ষর মজদুরদের হিসেব গুলিয়ে সবাইকে পয়সা কম দিত। ঠকাত। আর একটা রেজা (মহিলা কুলি) ছিল, একটু ধোঁড়ো গোছের, নাম লছমী এক্কা। তোর মনে আছে?

আমি হাসলাম। কারণ এই ‘ধোঁড়ো’ হল এই অঞ্চলের ভাষা। মানে শহুরে লোকেরা যাদের আর কী হস্তিনী নারী বলে। শ্রাবণের পুকুরের মতো টইটুম্বুর। হেসে বললাম, ‘ওই বয়সে লছমীকে কি ভোলা যায়?”

—সেই লছমীর সাথেই রমণীকাকুর লটরপটর, আদিবাসীরা একদিন হাতনাতে ধরে ফেলেছিল। তারপর সেটা নিয়ে বিরাট গণ্ডগোল হয়। মোটামুটি আদিবাসীদের সঙ্গে শহুরে মানুষদের একটা শ্রেণিশত্রুতার বীজ তখনই বোনা শুরু হয়ে গেল। আচ্ছা একটা কথা সত্যি করে বলতো, “তুই কি সত্যিই বিজলিকে ভালোবাসতিস?’

—ভাই আমাকে আবার এসবের মধ্যে জড়াচ্ছিস কেন? তবে একটা আগ্রহ চেপে রাখতে পারছি না, হ্যাঁরে সেই বিজলির কোনও খবর জানিস?

—এই তো গুরু, এবার পথে এসো। শোন, তোর আর বিজলির ব্যাপারটা নিয়েও পরবর্তীকালে আলোচনা হয়েছিল। আসলে এইসবের নাটের গুরু হল বুধিয়া। ও মনে মনে বিজলিকে খুব ভালোবাসত। যেটা আমি পরে বুঝতে পারি। যদিও বিজলি ওকে খুব একটা পাত্তা দিত না। তুই না চলে গেলে, ও হয়তো তোকে শেষই করে দিত।

—না না, বুধিয়া আমার ভালো বন্ধু ছিল।

—ভুল করছিস। প্রেম মানুষকে অন্ধ আর বুদ্ধিহীন করে দেয়। কারণ বিজলিও তোকে খুব ভালোবাসত।

—ওসব ছাড়! যে-সম্পর্কটা আমার বাবা-মা বা ওদের সম্প্রদায়, কেউই মেনে নেবে না, সেটা নিয়ে আর আলোচনা করে লাভ কি? তার চেয়ে বরং ওদের খবর বল।

—দ্যাখ, বুধিয়া আমাদের সাথে ওই পাহাড়ি আদিবাসীদের সম্পর্কের যাবতীয় ফাটলের জন্য একমাত্র দায়ী। বুধিয়া স্কুল পাশ করে রাউরকেল্লা কলেজে ভর্তি হল। ঠিক তারপর থেকেই ওর ভেতর একটা পরিবর্তন হতে শুরু করল। মনে হয় কলেজে কেউ ওর মগজ ধোলাই করেছিল। কোনও আদর্শবাদী দলের সব নীতিকথা ওর মস্তিষ্কে গুঁজে দেওয়া হয়েছিল। ও তলে তলে অনেক আদিবাসীকেই নিজের দলে টানতে শুরু করল। কিছু মেয়েও ওদের দলে ভিড়ল। তুই তো জানিস, ওর ছোটোবেলা থেকেই ধূর্ত শিকারির মতো প্রখর চোখ। বিজলিকেও হাত করে নিল মগজ ধোলাই করে। শুনেছি ওরা সবাই নাকি এক নিষিদ্ধ সংগঠনে যোগ দিয়েছে। এখন ওরা ওই পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। পুলিশ ওদের খুঁজছে। তাই ওপর থেকে তুই কিছুই বুঝবি না। ক’দিন থাকলেই সব টের পাবি, চারদিক থমথম করছে। সেই অনাবিল আনন্দ আর নেই রে…

আমি সব শুনে বাকরুদ্ধ। শুধু একটা ঢোঁক গিলে বললাম, ‘তার মানে আদিবাসীদের গ্রামে যাওয়া যাবে না?”

—তুই কলকাতা থেকে এত আশা করে এসেছিস। কী বলি বল! তবে গেলেও বেশি রাত করা যাবে না। সাবধানে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে।

ক্রমশ…

 

পাথর-প্রতিমা (পর্ব – ১)

হঠাৎ নাকে একটা অদ্ভুত সবুজ গন্ধ এসে লাগল। যদ্দুর মনে হয়, পাহাড়ের গায়ের ভিজে শ্যাওলার গন্ধ। মুখের ওপর ভারি টর্চের আলো। চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। আলোর পিছনে আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আলো আর আমার চোখের মাঝখানে একটা কুয়াশার টুকরো ঝুলে আছে। হঠাৎ দপ করে আলোটা নিভে গেল। আলকাতরার মতো একটা অন্ধকার কে যেন ঢেলে দিল আমার চোখে। তারপরই একটা হিমশীতল ধাতুর স্পর্শ লাগল আমার পিঠে। পরক্ষণেই গুরুগম্ভীর একটা প্রশ্ন কালো রাত ফুঁড়ে আমার দিকে ধেয়ে এল, ‘আপনি কে? কোত্থেকে আসছেন?”

আমার গলা তখন ভয়ে আর মহুয়ার নেশায় পুরো জড়িয়ে গেছে। বেশির ভাগটাই হাতের ইশারায় আর বাকিটা অস্ফুট শব্দে বলে উঠলাম, ‘বাড়ি রাজগাঙপুর। জঙ্গলে পথ হারিয়ে গেছি।’ আমার দুটো হাত দু’জনে ধরল। তারপর মাটিতে হেঁচড়েই ওরা পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠতে লাগল। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।

এবার আমার কথা একটু বলে নেওয়া দরকার। আমার বেড়ে ওঠা উড়িষ্যার রাজগাঙপুরে। রাউরকেল্লা থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। চারপাশে পাহাড়ের পরিখা দিয়ে ঘেরা ছিল আমাদের এলাকা। পাহাড়ের গায়ে থোকা থোকা শালের জঙ্গল, আবার কোথাও রুক্ষ। তবে সেই শুষ্ক পাথরের বুক ফেটেই নেমে এসেছে একটা রুপোলি ফিতের মতো নদী। নামটি ভারি মিষ্টি, কোয়েল। সেই নদীর গা ঘেঁষেই আমাদের কোয়ার্টার। মাঝেমধ্যে চাঁদের আলোয় দেখতাম সেই পাহাড়ের গা বেয়ে ভাল্লুক নেমে আসতে।

খুব গরমের সময় ভুট্টা খেতে পাহাড়ি জঙ্গল থেকে হাতির পালও নেমে আসতে দেখেছি। ভুট্টা খেয়ে নদীতে দাপিয়ে চান করত তারা। তবে ওই অরণ্যে চিতাবাঘ আছে শুনলেও কোনও দিন দেখিনি। কিন্তু আছে এটা বিশ্বাস করতাম, কারণ মাঝেমধ্যে দু’একটা গরু ছাগল উধাও হয়ে যেত। তবে এখন সবচেয়ে ভয় মানুষের। কেন? সে কথায় একটু পরে আসছি।

গ্রামে মূলত দু’ধরনের মানুষের বাস। এখানকার বেশিরভাগ মানুষই হল আদিবাসী সম্প্রদায়ের। অনেকেই অভাবের তাড়নায় খ্রিস্টান। ব্রিটিশ সাহেবরা খাবার আর পোশাকের লোভ দেখিয়ে এদের খ্রিস্টান করেছিল। আর কিছু আশেপাশের কারখানায় কর্মজীবী শহুরে মানুষ। যেমন আমরা। আমার বাবা কাজ করতেন কাছেই উড়িষ্যা সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে। আমি পড়তাম ওখানকার ‘রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়’ স্কুলে। গ্রামের আদিবাসীরাও ওই স্কুলেই পড়ে।

বাবার কারখানার পাশেই ছিল আমাদের কোয়ার্টার। তার পাশেই বিরাট হাতিশালা। হাতিশালায় দশ বারোটা হাতি ছিল। গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার দূরেই ডলোমাইট খনি। কারখানায় লাইমস্টোন আসত মালগাড়িতে। ইঞ্জিন মালগাড়ি রেখে দিয়ে চলে যেত। হাতি সেসব কামরা ঠেলে আনত। আমরা ছোটোবেলায় খুব মজা করে সেই সব দৃশ্য দেখতাম।

সবার ঘরেই হাঁস মুরগি ছিল। বিকেলে মাঠ থেকে খেলে ফিরে, বাড়ির হাঁস মুরগি চই চই করে ঘরে ঢোকানোর দায়িত্ব ছিল আমার। বিনিময়ে আমি ডিমের বেশি ভাগ পেতাম। সকালবেলা দুধ আনতে গেলে ঝগড়ু ভালোবেসে খেতে দিত পূর্ণ গর্ভবতী গরু মোষের সাঁজো দুধ। ধোঁয়া ওঠা গাঢ় হলুদ রঙের দুধ। ওটা বেচার নয়। এসব খেয়ে আদিবাসীদের মতোই বেশ তাগড়াই হয়েছিল চেহারাটা। তবে গায়ের রংটা শুধু ফরসা ছিল, এই যা! পাহাড়ি গ্রামের ছবি আঁকার ফাঁকে একটু স্কুলবেলার কথা বলে নিই।

আমার সাথে স্কুলে পড়ত যেমন আমাদের কোয়ার্টার-এর চাকুরিজীবীদের ছেলেরা, তেমনি আসত অ্যালেক্স ওঁরাও, জুয়েল মূর্খ, বিরজু মুণ্ডা, শিবু হেমব্রম, এইসব আদিবাসী ছেলেরা। ওদের গ্রাম ছিল পাহাড়ের কোলে মহুয়া গাছ দিয়ে ঘেরা। শীতকালে আদিবাসীরা এই মহুয়া জ্বাল দিয়ে ‘মাহুল’ বানাত। মহুয়ার গন্ধে সারা এলাকা ম-ম করত। সেই গন্ধে অনেক সময়েই পাহাড় থেকে ভাল্লুক নেমে আসত। তারপর দু’হাত দিয়ে মানুষের মতো মহুয়ার হাঁড়ি তুলে ‘মাহুল’ খেত। খাওয়ার পর সে কী হাঁটা! টলতে টলতে মাতাল পায়ে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে যেত।

এছাড়াও ওরা ভাত পচিয়ে হাঁড়িয়া বানাত। নেশা বেশি হওয়ার জন্য তাতে ‘বাখর’ বলে একরকম গাছের ফল মিশিয়ে দিত। তবে হাঁড়িয়া ফুটিয়ে ঠান্ডা হওয়ার সময়, হাঁড়ির গায়ে যে-বাষ্প জমা হতো, তার নাম ‘রাশি’। এর নেশা মারাত্মক। আদিবাসীরা খেত। আমি কোনও দিন খাইনি। পাকা নেশাড়ু ছাড়া অন্য কেউ সহ্য করতে পারবে না। বুধিয়া বারলা বলে আমার এক বন্ধু ছিল। পাখি মারায় ওস্তাদ। গুলতি দিয়ে কত নানা জাতের পাখি মেরে যে, তার মাংস আমায় খাইয়েছে, এখন ভাবলে প্রায়শ্চিত্ত করতে ইচ্ছে হয়।

আর একটা সাংঘাতিক কথা না বললে গল্প সম্পূর্ণ হবে না। ওরা ঠিক সন্ধে হওয়ার আগে ঘুড়ির সুতোয় বঁড়শি দিয়ে বাদুড় ধরত। বাদুড়ের ডানার চামড়ায় বঁড়শি গেঁথে যেত। তাই বলে আমি কোনও দিন বাদুড়ের মাংস খেয়ে দেখিনি। তবে বাদুড়ের হাড় ফোটানো তেল বাড়ি নিয়ে আসতাম। ব্যথায় বেশ কাজ দেয়। এই সবের ফাঁকেই কখন স্কুল পেরিয়ে গেলাম, বুঝতেই পারলাম না। এবার একটু অন্য কথায় যাব।

আমরা যখন মাঠে বিকেলে ফুটবল খেলতাম, তখন দূরে কবাডি খেলত মুনিয়া, নাচনী, বিজলি। এরা সব আদিবাসী গ্রামেরই মেয়ে। এই বিজলি আবার বিরজুর বোন। ওদের বাবা বীরসা মুণ্ডা হল আদিবাসীদের সর্দার। বিজলির শরীর ছিল কালো পাথরের মতো। যত বড়ো হতে লাগল, মনে হল যেন কোনও ভাস্কর ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ওকে কেটে কেটে নির্মাণ করছে। কষ্টিপাথরের মূর্তির মতো। গোধূলির আবির মাখা আকাশে যখন সূর্যটা কপালের লাল টিপের মতো হয়ে যেত, পাহাড়ের কালো ছায়া এগিয়ে আসত ওদের গ্রামে। কিন্তু ভুট্টা খেতটা তখনও সোনালি বাগিচা। ঠিক যেন কানে মাকড়ি, নাকে নোলক আর হলুদ ফ্রক পরা বিজলি।

আমি এখনও যেন বিজলিকে দেখতে পাই বউবাজারের সোনার দোকানে। কাচের শো-কেসের ভেতর। কালো পাথরের গয়না পরা আবক্ষ মূর্তি, ঠিক যেন বিজলি! এখনও মনে হয় সেই দোলের দিনের আবির মাখানোর আবদার কাচ ভেঙে পূরণ করে দিই। সে এক আমার জীবনের উথালপাথাল ঘটনা। আজও মনে পড়ে সেই দোলের দিনের কথা। মানে ওরা যাকে বলত ‘ফাগুয়া’।

ক্রমশ…

 

মণিদা আমি এলাম (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

অমরেশ অবশ্য থাকে সব সময়ই ওর হাতের নাগালে। ওকে কাল থেকেই কাজে শামিল করে নিতে হবে। এমনিতেই অমরেশ তিওয়ারি পত্রিকার কার্যনির্বাহী সহ-সম্পাদক৷ কাজেই কোনও সমস্যা নেই। কালই স্ক্রিপ্টগুলো ডিটিপি-র জন্য অমরেশকে দিয়ে বাবুলের কাছে পাঠিয়ে দেবে। বাবুল-ই ওদের সমস্ত ডিটিপি করে থাকে। ও জানে কীভাবে কী করতে হয় এবং মোটামুটি ঠিকঠাকই করে। এখন দেখা যাক সকালে অমরেশ কখন হাজির হয়।

বেলা দশটা নাগাদ অমরেশ এল। করিতকর্মা ছেলে। ব্যাটার খরচের হাতটা একটু বেশি, তবে নিজের পকেট বাদ দিয়ে। মণি ওটা দেখেও দেখে না। কারণ জানে কিছু কিছু জিনিস মেনে নিতে হয়। কাল ও বাবুলকে ভালো করে বুঝিয়ে দেবে। বাবুলকে কাজে লাগিয়ে তবেই ফিরবে। প্রায় সারাদিন ওখানেই কাটাবে। চা টিফিন দুপুরের খাবার সব মণির পকেট থেকে যাবে। কিন্তু কাজ দিয়ে নিশ্চিন্ত। ফেরার সময় কাজের কতটা কী হল জানিয়ে যাবে। সারাদিনের রাহা ও খাই খরচটুকুও চেয়ে নেবে। ভালো ছেলে। কথা শোনে। মোটামুটি মাসখানেক লাগবে বলেছে ডিটিপি হাতে পেতে। অবশ্য যেমন যেমন শেষ হবে এক এক করে কবি লেখকদের কাছে পৌঁছে যাবে প্রুফ দেখার জন্য। ফাইনাল হলে প্রেসে যাবে।

বাঁকুড়া আর সিউড়ির দু’টো প্রুফ ক্যুরিয়ারে পাঠাবে, ওরাও আবার প্রুফ দেখে রিটার্ন ক্যুরিয়ারে মণির কাছে পাঠিয়ে দেবে। কাছেপিঠের পাঁচজনের কাছে তো মণি নিজেই যাবে আবার নিয়েও আসবে, বলাই বাহুল্য। মানে দশদিনের জন্য চা টিফিন দুপুরের খাওয়া দাওয়া ফ্রি — ভাবা যায়! মণির মনে এখন যেন কোটি টাকার লটারি পাওয়ার আনন্দ, ডগমগ করে ফুটছে। এবার তো পোয়াবারো কারণ সাত সাতখানা বইয়ের প্রত্যেক কবি লেখকরা তাদের মণিদাকেই উৎসর্গ করছে। মণির আলতো অনিচ্ছা — এই এটা আবার আমাকে কেন আমাকে কেন…! ধোপে টেকেনি। কিন্তু মনে মনে ভীষণ খুশি।

সময় তো নয় যেন ভরা বর্ষার জলস্রোতের দামোদর। হু হু করে বয়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে অমরেশ তিওয়ারির তাগাদার পাল্লায় পড়ে পঁচিশে বৈশাখের দিন পনেরো আগেই সব বই এখন মণির জিম্মায়। মণি দেখে নিয়েছে প্রোডাকশন লা জবাব! প্রত্যেক লেখক কবিকে একটা করে কপি পাঠিয়ে দিয়েছে। মলাট উন্মোচনের পর বাকি কপিগুলো হ্যান্ডওভার করবে। কিন্তু মণির কড়া শর্ত অন্তত ওই সাতজন কবি লেখকদের প্রত্যেককেই যুগলে উপস্থিত থাকতে হবে। কেউ না করেনি, সবাই সম্মতি জানিয়েছে একবাক্যে। মণির উত্তেজনা প্রত্যেক দিন একটু একটু তুঙ্গে উঠছে পঁচিশে বৈশাখ যত এগিয়ে আসছে। অবশ্য অমরেশ সব সময়ই আছে ওর ছায়াসঙ্গী হয়ে। এটাই যা রক্ষে। পেমেন্ট থেকে টাকা পয়সার হিসাব রাখা ব্যস্থাপনার সিংহভাগ অমরেশের নিয়ন্ত্রণে। যদিও মণির ডেরা থেকেই ঘটছে সবটাই এবং অবশ্যই তার সম্মতিক্রমে।

পঁচিশে বৈখাশ মঞ্চের উপরে সাজানো চেয়ার টেবিল। রবি ঠাকুরের একটা বড়ো বাঁধানো ছবি। ফুলমালা ধূপধুনো প্রদীপের সমারোহে। রবীন্দ্রগান দিয়েই সভার উদ্বোধন। তারপর রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি ছোটো বড়ো সকলের জন্য। আজকের সভার প্রথম চমক ছিল মঞ্চের উপরে — যেখানে সব নতুন কবি লেখকরা সভা আলোকিত করলেন। না কোনও কেউকেটা নেই। মণি এখন তিতিবিরক্ত হয়ে গেছে কেউকেটাদেরকে সামাল দিতে দিতে। ব্যাটাদের হাজার বাহানা। তার ওপর পান থেকে চুন খসার যো নাই। এই মারে কি সেই মারে। বিরুদ্ধতায় নেমে পড়বে গালিগালাজ করতে করতে। পরিবর্তিত সময়ের প্রয়োজনে মণি এখন তাই নতুনদের উপরই ভরসা রাখছে। উপস্থিত সমবেতের অনেকেরই চোখে মুখে জিজ্ঞাসা উপচে পড়ছে — বইগুলোর মলাট উন্মোচন কারা করবেন? সে রকম কাউকেই তো চোখে পড়ছে না। মণি মুচকি হেসেছে। সময়ে জানতে পারবে। একটু সবুর করো না ভাই, আছো তো এখন! অত তাড়া কিসের?

এবার মলাট উন্মোচনের সময়। মণি মাইক হাতে একে একে মঞ্চে ডেকে নিলেন অজানা পাঁচজন পুরুষ ও দু’জন মহিলাকে৷ দর্শক তো অবাক। আরে এরা কারা? এদেরকে তো আগে কখনও কোনও সভায় দেখিনি, নাম শোনা তো দূরের কথা।

মণি আবেগপ্লুত গলায় বলতে শুরু করল— জানি আপনাদের এখন অনেক প্রশ্ন, মঞ্চে উপবিষ্ট এই সাতজন যারা আজ মলাট উন্মোচন করবেন। তবে শুনুন, এনারা সেই মানুষজন যাদের প্রতিদিনের যাপনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক একজন কবি লেখকের উত্থানকথা। এদের সক্রিয় ও হার্দিক সহযোগিতা ছাড়া উদীয়মান এই সাতজন কবি সাহিত্যিকের চর্চার খবর আমরা কোনওদিনই জানতে পারতাম না। আজকের এই মঞ্চ যে আলোকিত, এ তাদেরই অমূল্য অবদান ধন্য। আহা, হাততালির কলরবে ফাটাফাটি সভাগৃহ! উপচে ওঠা উচ্ছ্বাস সভাস্থলের বাইরেও মুখরিত।

মণি প্রথমেই তনুকে ডেকে নিল মঞ্চে। তারপর সদর্পে ঘোষণা করল বইটির মলাট উন্মোচনের জন্য উপস্থিত, মাননীয় অনুপম নাগরাজ মহাশয় যিনি কবির হাজব্যান্ড, সাহিত্যপ্রেমী এবং সরকারি সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ সফল আধিকারিক। আবার হাততালির রোল উঠল। মোবাইল ক্যামেরা ঝলসে উঠল, ভিডিও হল। বাপরে বাপ! অনুপম মনে মনে ভাবল — কে জানে শালা, সে যে এত কিছু সে কি নিজেই জানত নাকি কোনওদিন। মণি ঘোষাল মালটা তো খতরনাক আছে!

যাইহোক, তারপর একই ভাবে একে একে বাকি ছ’খানা বইয়েরও মলাট উন্মোচন হয়ে গেল। অমরেশ মঞ্চে উঠে উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে সভা সমাপ্তির ঘোষণা এবং একটু চা পান করে যাবার আমন্ত্রণ রাখল সবার কাছে।

মণি বাড়ি ফিরে এসে— আহা, লাখ দুয়েক টাকার ওমটা একটু স্পর্শ করে নেবার জন্যে তালা খুলে, বাক্সের ভিতর একদম ফাঁকা দেখে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল ধপাস করে।

কিছুক্ষণ পর একটু ধাতস্থ হলে ফোন করে অমরেশকে এক্ষুনি একবার জলদি আসতে বলল। কেন জিজ্ঞেস করাতে বিরক্ত হয়ে বলেছে— আসতে বলছি আয় না, অত কেন কিসের? আর এলেই তো জানতে পারবি। যত্তসব…

কয়েক মিনিটের মধ্যে অমরেশ হাজির। মণির দুঃখের কথা শুনে অমরেশের আর বলা কিংবা করারই বা কী আছে! নিশ্চুপ কয়েকটা সেকেন্ড কাটিয়ে, পিঁপড়েতে খেয়েছে বলে স্বগতোক্তি করতেই মণি বলল, “তুই কি কিছু বললি?”

—না না, পিছন ফিরে চলে যেতে যেতে অমরেশ বলল, মণিদা আমি এলাম। ভালো থেকো।

 

 

মণিদা আমি এলাম (পর্ব-৩)

পর্ব ৩

বাড়ি ফিরেই তনু ওর মণিদাকে ফোন করে জব্বর খরটা দিল। মণি তো আত্মহারা! লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে পা মচকে ফেলার জোগাড়। ভাবা যায় কড়কড়ে আড়াই লাখ জাস্ট আড়াই লাখ। খরচ খরচা বাদ দিয়ে আরামসে দেড় থেকে যাবে পকেটে। এত বড়ো দাঁও ওর জীবনে এই প্রথম।

—আরে মণিদা, কী হল শুনতে পাচ্ছ?

—হ্যাঁ হ্যাঁ বলো বলো….। হ্যাঁ নিশ্চয় নিয়ে আসবে সামনের রোববার। দেখবে ওদের যেন কোনও অসুবিধা না হয়। আর সঙ্গে করে ওরা যেন অবশ্যই নিজের নিজের লেখার স্ক্রিপ্টগুলো নিয়ে আসে। ওখান থেকেই ওরা কবিতা পাঠ করবে সাহিত্যবাসরে। আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে রাখো। দেখা হবে। বাই।

কোমর থেকে আলগা হয়ে ঝুলে পড়া লুঙ্গিটার, অবস্থা মণি এতক্ষণ খেয়াল করেনি। ভাগ্যিস ঘরে একলা ছিল। একহাত জিভ কেটে মণি যথাস্থানে বেশ শক্ত করে লুঙ্গিটাকে বেঁধে নিল। অনেক দিন চিকেন খাওয়া হয়নি। মণি বাজারের থলি হাতে, গায়ে কোনওরকমে একটা ফতুয়া গলিয়ে হাওয়াই চটি ফটফট করতে করতে দ্রুত বেরিয়ে গেল।

রাতে অনেক দিন পর ভরপেট মুখরোচক খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে সিগারেটে লম্বা একটা টান— আহা কী আনন্দ! সামনের সুখের দিনগুলোর কথা ভেবে মশগুল হয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তাহলে ভগবান এতদিনে মুখ তুলে চেয়েছেন। এখন শুধুই সুদিন আর সুদিন। সামনে শুধু আলো আর আলো। ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’– যাকে বলে! তবে আনন্দের আতিশয্যে সেই রাতটি তার নির্ঘুম গেল। তা যাক। এরকম নির্ঘুম এই রাত তার একটা অমূল্য অর্জন বলেই সে ভেবে নিল।

সারাজীবন এইরকম নির্ঘুম কেটে গেলেও তার আপত্তি নেই এখন। কত হেনস্থা, কত কটূক্তি, যাচ্ছেতাই অপমান— কত কিছুই যে তাকে হজম করতে হয়েছে। তার স্বপ্ন এই ‘আসানসোলের দিনরাত্তির’-র প্রকাশনা নিয়মিত রাখতে গিয়ে, তা তার চাইতে আর বেশি কে জানে!

বিজ্ঞাপন চাইতে গেলে দেবে তো না-ই উলটে আঁকাবাঁকা কত কথা শোনাবে। পত্রিকা কেউ কিনবে না। তার ওপর সৌজন্য সংখ্যা পাঠাতে হবে। ভালো লেখক কবিরা সাম্মানিক না দিলে লেখা দেবে না। আবার ভালো লেখা না থাকলে পত্রিকা বিক্রি হবে না। স্টলওয়ালারা বেশি কমিশন না পেলে বিক্রির জন্য স্টলেই রাখবে না। এত ‘না’ হলে কি আর পত্রিকা চালানো যায়! তবে এখন থেকে আর এই ক্রাইসিস থাকবে বলে মনে হয় না। জয় মা কালী দুগ্গা দুগ্গা।

পরের রোববার তনু-সহ পাঁচ বন্ধুই হাজির যথাসময়ে মণির সভা আলো করে। ওরা এক্কেবারে সামনের সারিতে। সাড়ে এগারোটা নাগাদ মণি হাতে মাইক তুলে নিয়ে সদর্প ঘোষণায় নতুন চার সদস্যের, মানে রূপা গোপা সীমা ও মণিকার উজ্জ্বল উপস্থিতি বরণ করে নিল। তারা প্রত্যেকেই মঞ্চে উঠে নিজের নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জ্ঞাপন করল।

মণি এরপর ভবিষ্যতের সাহিত্যের গতিপ্রকৃতির দিকনির্দেশ করার ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগের অবদান সম্পর্কে একটা ভয়ানক জ্বালাময়ী বক্তিমে ঝাড়ল প্রায় আধঘণ্টার মতন। সভাস্থল ঘিরে তখন হুলুস্থুলু ভাবে হাততালির হুল্লোড়! কেউ কেউ আবার বলে উঠল, আহা, এই না হলে সম্পাদক! কী ভীষণ একখানা লেকচার দিল বটে!

তনু গোপা সীমা-রা তো অভিভূত। ওরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল যে মণিদার সাহিত্যসভায় ওদের অনেক আগেই জয়েন করা উচিত ছিল। যাক যা হবার তা হয়েছে। এখান থেকেই না হয় শুরু হল আজ। ওরা পাঁচজনের প্রত্যেকেই পাঁচটি করে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে খুব খুশি। মণিদাও ওদের সকলের লেখার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে। আনন্দে ডগমগ ওরা যেন হাতে এক একখানা করে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছে!

অনুষ্ঠান শেষে মণি ঘোষাল স্ক্রিপ্টগুলো চাইলে ওরা খুব কুণ্ঠিত হয়ে বলল— কয়েকটা দিন সময় চাই। লেখাগুলো একটু গুছিয়ে নিতে হবে। উলটো পালটা হয়ে আছে। কমপ্লিট হলেই আপনাকে খবর দেব। মণি বলল— আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। খবর পেলেই আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসব। তোমাদেরকে আসতে হবে না কেমন। চাপ নিও না তোমরা যতক্ষণ আমি আছি। আর আমি তো আছিই আছি।

মোটামুটি সপ্তাহ দু’য়েকের ভিতর মণি আলাদা আলাদা দিনে ওদের সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্ক্রিপ্ট সংগ্রহ করে গান্ডেপিন্ডে গেলাকোটা সেরে, তারপর সন্ধেনাগাদ ফিরে এসেছে। সাথে পঁচিশ পঁচিশ করে অগ্রিম নিতেও ভুল করেনি। মণি বাড়ি ফিরে অন্ধকার একটু গভীর হলে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সোজা ছাদে। আকাশের তারাদের দিকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গুন গুন করে ‘ও আমার ময়না রে…’ গাইতে গিয়ে তালেগোলে গেয়ে উঠল— ‘ও আমার সোনার ডিম পাড়া হাঁস ৱে এএএ…..!’

যখন একটি দু’টি তারা খসে পড়ল ঠিক পায়ের পাশটিতে। তারার আলো যে এত তরল হয় সে আগে জানত না। পা-টা কেমন যেন একটু হালকা ভিজে মতন বোধ হতেই তার মোহাচ্ছন্ন ভাবের ঘোরটা যাকে বলে এক্কেবারে ঘেঁটে ‘ঘ’ হয়ে গেল।

সিউড়ি আর বাঁকুড়ার দু’টো নিয়ে মোট সাত সাতখানা বইয়ের ডিটিপি এবং প্রিন্টিং-এর কাজে নেমে পড়তে হবে কাল থেকেই। প্রেসের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে। ডিটিপিও হয়ে যাবে, তারপর প্রুফ দেখা। প্রচ্ছদ সাতটা তো আগেই এসে গেছে। করেছেন প্রখ্যাত কিন্তু নিতান্ত প্রচারবিমুখ শিল্পী মণির অন্তরঙ্গ একদা শান্তিনিকেতনি আপাতত কলকাতাস্থিত ব্যাংক ম্যানেজার শুক্রাচার্য সান্যাল।

ক্রমশ…

 

মণিদা আমি এলাম (পর্ব-২)

পর্ব ২

মণি ঘোষাল গল্প কবিতার বাঘ-সিংহ-ভল্লুক সব একসাথে। কলম দিয়ে কলকল করে কাব্যি ছোটে ঝরনাধারার মতো। এককালে তার নাকি দুর্ধর্ষ এক গুরু সঙ্গ হয়েছিল। ওর মতো আর কেউ নাকি গুরুকে তেমন করে পায়নি। আর গুরুও মণি বলতে অজ্ঞান ছিল। তা সেই গুরুই একদিন সত্যি সত্যিই মণির একটা কবিতা পড়তে গিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে মুখে লালা উঠে এই মরে কি, সেই মরে অবস্থা! অন্য যারা ছিল তারা গুরুকে হাসপাতালে গ্যারেজ করাতে কোনও মতে সে যাত্রা গুরুর পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়নি।

তা মণি নাকি কবিতার কাটাছেঁড়ায় অদ্বিতীয়ম বলে মনে করে নিজেকে। এটাকে সে তার গুরুর দান বলেই ভাবে। কবিতার নাড়িভুঁড়ি ঘেঁটে সে তার পেটের কথা বার করে নিয়ে আসবে। হুঁ হুঁ বাবা কারওর নিস্তার নেই! বিটকেল হিংসুটে সতীর্থরা বলে— ও ব্যাটা নিজে কোনওদিন একটা সম্পূর্ণ কবিতা লিখতে পারেনি আজ পর্যন্ত। আর সে করে কিনা সমালোচনা! কালে কালে কতই হল, পুলি পিঠের ল্যাজ গজাল। যাইহোক, তা বলে সাহিত্যচর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সংবর্ধনা পাওয়াতে কোনও ঘাটতি ছিল না, আর এগুলো সে পেয়েছে ঠিক তারই মতন অন্যান্য সব সম্পাদকদের থেকে।

এখন নভেম্বর। হালকা শীতের আমেজ পোশাক চুঁইয়ে শরীর ছুঁয়ে দিচ্ছে শিরা উপশিরা ছাড়িয়ে অন্তরে অন্তরে। সামনের এপ্রিল আসতে হাতে আর মাস পাঁচেক মতন। সামনের পঁচিশে বৈশাখে এবার অন্তত পাঁচখানা বই প্রকাশ করতেই হবে। তবে মলাট উন্মোচনে এবার এমন সব আনকমন এক একজন থাকবে না, যা দেখে সবাই চমকে (পড়ুন ঘাবড়ে যাবে! মণি ওর ফিল্ডের পাকা মাথার লোক। টিকে থাকতে হলে যা যা করার দরকার, সবই করে সাধ্যমতো এবং পরিকল্পনা মাফিক।

একটা নেটওয়ার্ক ভালো মতন তৈরি করেছে আশেপাশের দু’তিনটে জেলা জুড়ে। সেখানের বিভিন্ন অঞ্চলে এক একজন কবি সাহিত্যিক রিপ্রেজেন্টেটিভের কাজ করে। তারা নতুন লেখক জোগাড় করে, প্রকাশিত বই পুশসেল করে। মণি অবশ্য পরিশ্রম করে যথেষ্ট। ফোনে যোগাযোগ তো থাকেই তাছাড়াও মাঝেমধ্যে ওইসব জায়গায় গিয়ে সাহিত্যবাসরও বসায়। দরকার হলে এক আধদিন থেকেও যায় সেখানে। দূরের কবি সাহিত্যিকরাও মণির আসানসোলে আসে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মার্চ নাগাদ দু’দিন ব্যাপী চলা আসানসোল লিটলম্যাগের মেলাতে তো আসবেই আসবে। আপাতত তিনটে বইয়ের মেটেরিয়াল প্রায় হাতের মুঠোয়। এখানকার বলতে তনুরটা আর বাকি দু’টোর একটা সিউড়ি আর একটা বাঁকুড়ার। এর মধ্যে একটা ছোটোগল্পের সংকলন, অন্য দু’টি কবিতার।

ফেসবুকে লেখার সূত্রে এখন অনায়াসে অনেকের সুপ্ত প্রতিভা ফেটে বেরোতে পারছে জনসমক্ষে। মন্দ না। যেমন সেদিন দেখলাম একজন লিখেছেন— বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদেয় এলো বান/ আমার বর দেখতে এমন যেমন জাম্বুবান। অথবা, সেদিন গোধূলিবেলা/ তোমার রাঙা ঠোঁটে আমার ওষ্ঠ চকাম চকাম করিছে খেলা। ইত্যাদি ইত্যাদি।

মণি মূলত ফেসবুক ঘেঁটে এই জাতীয় কবি লেখকদেরকে ট্যাপ করে। প্রথমে মেসেঞ্জারে প্রশংসা তারপরে ফোন, তারপর সোজা কবির বাড়িতে হানা। মহিলা কবি হলে তো সোনায় সোহাগা। বরের সামনে বউ-কবির কবিতার ফাটিয়ে প্রশংসা। দুপুরে গান্ডেপিন্ডে খাওয়াদাওয়া তারপর একটা জম্পেশ ঘুম। বিকেলে স্ন্যাক্স সহযোগে চা সাঁটিয়ে খানকতক কবিতা ব্যাগে পুরে নিয়ে চলল মদন। তনুকে মণি এভাবেই কবি বানিয়েছে। তনু বলেছে ওর কয়েকজন বন্ধুও লেখালেখি করছে ফিলহাল। মণি বলেছে— তা ওদেরকেও পরের কবিতা পাঠের আসরে নিয়ে এসো না। তনু রাজি হয়েছে বলেছে, দেখি যোগাযোগ করে। আপনাকে জানাব। তনু, ওর বন্ধু মানে রূপা গোপা সীমা আর মণিকার সাথে ফোনে কথা বলেছে। ওরা খুবই আগ্রহী।

একদিন রোববার বিকেলে বিগবাজারে, ওদের সবার সঙ্গে সপরিবারে হঠাৎই দেখা হয়ে গেল। আর যায় কোথা! ওরা সবাই যে যার বরকে কেটে পড়তে বলল। তারপর সোজা চারতলার ফাঁকা একটা খাবার দোকানের একটি টেবিল দখল করে পাঁচটা ঠান্ডা পানীয় নিয়ে গল্পে মেতে উঠল।

বেচারা বরসকল একটা চায়ের দোকানে মাটির ভাঁড়ে চা আর মুখে সিগারেট নিয়ে হোস্টেল জীবনের স্মৃতিচারণে মিনিট কুড়ি পঁচিশ কাটিয়ে যে-যার মতন যাবার তোড়জোড় করছে, ঠিক তখনই তনুর বর বলল, ‘জানিস তো তনু লেখালেখি করছে। কিছু টাকা গচ্চা যাচ্ছে বটে তবে শালা মুক্তি পেয়েছি বলতে পারিস একরকম। কাজকম্ম নেই শুধু ভুলভাল বকত আর আমার মাথা চেটে সাফ করে দিত। এখন মাঝে মধ্যে দু’একটা আগডুম বাগডুম লেখা শুনে বাঃ বাঃ বলে দিলেই ছুটি।’

বাকিরাও সবাই বলল— বাব্বা তুমি একা নও আমরাও তোমার মতনই ওই একই পথের পথিক। তবে এখন আছি বিন্দাস কিন্তু বস! বেঁচে থাকুক ওদের সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা— তাতে যদি হয় হোক আমাদের খরচা। তনুর বর অনুপম বলল— আরিব্বাস বস তুমিও তো দেখছি কাব্যি করে কথা বলছ, কী ব্যাপার রূপার ছোঁয়া লেগেছে মনে হচ্ছে।

বিরূপাক্ষ প্রবল প্রতিবাদ জানিয়ে বলে উঠেছে— আরে না না… ওটা বাইচান্স মিলে গেছে, এই আর কি!

—আমি? তাও আবার কাব্যি! বাংলায় প্রায় ফেল মারতে মারতে পাশ করে গেছিলাম হায়ার সেকেন্ডারিতে কোনওরকমে।

এদিকে তনুদের আড্ডা জমে উঠেছে। তনু বলল— হ্যাঁরে তোদের চারজনের লেখা কবিতা আমি ফেসবুকে পড়েছি। তোরা কী ভালো লিখিস রে৷ ফেসবুক না থাকলে তো কোনওদিন জানতেই পারতাম না। এই শোন তোদেরকে না বলা হয়নি, জানিস তো আমার না একটা কবিতার বই বের হচ্ছে।

—ওহ তাই নাকি তাই নাকি। তা কবে?

—মণিদাই সব করছে। এই সামনের পঁচিশে বৈশাখ। শোন না মলাট উন্মোচনের দিন কিন্তু আমি তোদের সবাইকে অনুষ্ঠানে চাই।

রূপা বলল— আচ্ছা, দিদি কমপক্ষে কতগুলো কবিতা হলে একটা বই করা যেতে পারে?

—অতটা তো জানি না। তবে আমারটা করতে মণিদা সত্তর থেকে বাহাত্তরটা দরকার বলেছে। তা’ তুই বের করবি নাকি একটা?

—হ্যাঁ দিদি হতে পারে। আমার স্টকে এখনই প্রায় সত্তর আশিটা হয়ে যাবে।

—বলিস কী রে? তাহলে করে ফেল। মণিদাকে বলি ?

—দাঁড়াও। দু’টো দিন ভেবে নিই। তা খরচ খরচা কেমন গো?

—তেমন কিছু না। ওই পঞ্চাশ মতো সাকুল্যে!

গোপা সীমা মণিকাও ততক্ষণে জেগে উঠেছে। তাহলে তো অতগুলো কবিতা আমারও আছে। আমারও আছে করে কলকল করে উঠল ওরা সকলে।

তনু বলল— থাম থাম। ধীরে। এক কাজ কর তোরা। সামনের সপ্তাহে একটা সাহিত্যবাসর হচ্ছে। চল না তোরা। মণিদা এমনিতেই বলেছে আগ্রহী বন্ধুদেরকে নিয়ে যেতে। রেডি থাকিস বেলা এগারোটা নাগাদ আমি তোদের প্রত্যেককে বাড়ি থেকে তুলে নেব আমার গাড়িতে। তোদের সবাইকে আর আলাদা করে গাড়িতে যেতে হবে না। তাহলে ওই কথাই রইল। ততক্ষণে তো ওদের সবার মনে ওই যাকে বলে লাড্ডু ফুটতে আরম্ভ করেছে।

ক্রমশ…

মণিদা আমি এলাম (পর্ব ১)

মণি ঘোষাল। ইন্টেলেকচুয়াল। ছুঁচলো তার দাড়ি, অনেকটা আব্দুল মাঝির মতন। চোখে রিমলেস। ষাটোর্দ্ধ। টানটান আপাদমস্তক। ঠোঁট সতত একটা আলগা হাসির ক্লান্তিতে ঝুলন্ত। লম্বা চুলের মাথা সাহিত্যে খচাখচ। পায়ে কোলাপুরি। কাঁধে পত্রিকা ঠাঁসা শান্তিনিকেতনি ঝোলাব্যাগ। নীল জিনস-এর সাথে সাদা পাঞ্জাবি। সেই কোন বছর চল্লিশ আগে পথ চলা শুরু।

মণি তখন বছর কুড়ির উঠতি কবি সাহিত্যিক। দু’চারজন ঘনিষ্ঠকে সাথে নিয়ে প্রকাশ করল— ‘আসানসোলের দিনরাত্তির’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা। তখন তো তার বিশ্বজয়ের আনন্দ। দু’টো ছোটোগল্প আর খান চল্লিশেক কবিতার প্রশ্রয়কে সঙ্গী করে তার সদর্প আবির্ভাব আসানসোলের সাহিত্যজগৎকে আলোকময় করে তুলল।

তারপর তো দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটা দশক কেটে গেছে। মণি ঘোষালের সোসিও—ইকনমিক ফান্ডাও নাকি বাড়তে বাড়তে এখন দারুণ শক্তিশালী! কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেছিল পত্রিকা প্রকাশের সাথে সাথে বই প্রকাশনাটাও একান্ত জরুরি। পত্রিকা কুনকি হাতির কাজ করবে— যাতে করে বই প্রকাশনাটাও নিয়মিত থাকে৷ এইভাবেই মণি মূলত অর্থকরী দিকটা সামাল দেয়।

পত্রিকা নতুন নতুন কাব্য প্রতিভার সন্ধানের একটা ইন্সট্রুমেন্ট আর তারপর কিছু সময় অপেক্ষা এবং একদিন ঝপাং করে বই প্রকাশনার যাঁতাকলে পড়ে ছটপটাবে বেচারা কবি সাহিত্যিক কমপক্ষে হাজার পনেরোর ধাক্কায়! আর পায় কে? মণি তার মলাট উন্মোচনের জন্য পকেট কাটবে, তাকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য পকেট কাটবে। পুশসেলের সব পয়সাই যে মণির পকেটস্থ হবে সেটা বলাই বাহুল্য। নামডাকে মণি কিন্তু বেশ তুখোড় পরিচিতির নিরিখে। নিন্দুকেরা সময় সময় তার সম্পর্কে মন্দভালো কিছু না কিছু বলেই থাকে। তাতে অবশ্য তার কিছু যায় আসে না। সে নাকি আদ্যোপান্ত নিবেদিত সুমহান এক সাহিত্য প্রাণ। অক্ষরকর্মী শব্দকর্মী এরকম নানা বিশেষণেই নাকি তার ঝুলি বিভূষিত।

লোকে পিছনে তাকে ‘মাল ঘোষাল’ বললে কী হবে, সামনে তো গদগদ ভাব দেখিয়ে দাঁত কেলিয়ে হে হে… করতে থাকে! মণি এটাও জানে লোকে ঈর্ষা থেকেই এইসব অপপ্রচার করে থাকে। যাইহোক, নেগেটিভ হলেও প্রচার তো একটা বটেই। লাদেনের নাম কে না জানে— সে যে- জন্যই হোক! জানে কি না? একশোবার হাজারবার অস্বীকার করে সাধ্যি কার? মণি তার প্রবল অস্তিত্বটার গোড়ায় নিয়মিত জল সার দিতে ভুল করে না কখনও। মাসে দু’তিনটে গল্প আলোচনা কবিতা পাঠের আসর জমাবেই জমাবে। দশ পনেরো জন তো এমনি এমনিই জুটে যায়। অবশ্য তাদের অধিকাংশই একদা চাকুরিজীবী বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। সময় কাটাতে কবি সাহিত্যিক হতে গিয়ে মণির খপ্পরে।

কিংবা হয়তো একদা গৃহকর্মে নিপুণা এখন প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়ে কবি কিংবা গল্পকার হয়ে ওঠার বাসনায় মণির ভেল্কিবাজি ধরতে না পেরে গল্পপাঠের আসরে দিস্তাখানেক কাগজ নিয়ে হাজির। মাঝবয়সিরা থাকে না এমন নয় তবে সংখ্যারলঘু পর্যায়ের। আর অবশ্যই অকর্মণ্য কিছু গ্র্যাজুয়েট, বাপের হোটেলে খেয়ে সাহিত্যের খোলনলচে পালটে তাকে উত্তর আধুনিকের পথ দেখানোর প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কিছু দামড়া ছেলে। লিটল ম্যাগের মাহাত্ম্যে তার বিপ্লবী ইমেজ সম্পর্কে মাইক হাতে টানটান বক্তিমের জোরে হল ফাটানো হাততালি। ওরে বাপরে! শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে শুধু নয়, সেই কাঁটা আবার ফুটেও যায়। সাথে মণির উস্কানির উত্তেজনা কামাল করে দেয় তাদের।

আঃ ভাবা যায়— ছোটোগল্পের কী দুর্দান্ত আলোচনাটাই না করলি রে অমরেশ। আর বোঝাতে গিয়ে তোর নিজের লেখা যে গল্পটা পড়ে শোনালি— তার জন্য কোনও তারিফই যথেষ্ট নয় রে! আয় আয় আমার বুকে আয়। একটা হামি দিইরে তোকে। আমার চাঁদের ছেলে আমার সোনার ছেলে। তারপরই গলাটা একপর্দা খাদে নামিয়ে বলে— বিমল করের মতো লেখকও তোর মতন এমন একটা লিখতে পারলে ধন্য হয়ে যেত রে। অমরেশ বিনয়ে মাটিতে মিশে যেতে বসেছে আর ভিতরে ভিতরে ফুলে ফেঁপে ঢোল— যে-কোনও সময় বিস্ফোরণের দিকে চলে যেতে পারে আপ খেতে খেতে। অমরেশ কিন্তু ফাটল না, যেহেতু আনকোরা নতুন নয়। তবে ফুলেফেঁপে থাকবেই এখন দিনকয়েক।

এবারের শারদসংখ্যায় তনু নাগরাজের গুচ্ছ কবিতা প্রকাশ করেছে মণি। তনু নাগরাজ বাড়িতে প্রায় সারাদিন একা। ছেলে বাইরে। বর একটা কোম্পানির ম্যানেজার। রান্নার লোক কাজের লোক বাগানের মালি ঠাকুর চাকর— কী নেই তার। নিজহাতে তাকে কুটোটি কেটে দু’টো করতে হয় না। বয়কাট চুল, তাও আবার আঁচড়ে দেওয়ার জন্য একটি মেয়ে আসে, তার পার্লারে যাওয়ার আগে ম্যামকে সাইজ করে দিয়ে যায়। তারপর সে তার লেডিস পার্লারের দোকান খোলে। আর সাহিত্যসভাতে গেলে তার তো আবার বিশেষ প্রস্তুতি থাকে, সেদিন সে মেয়ে তনু ম্যাডামকে একেবারে চিকনাই করে ছেড়ে দেয় ঘণ্টা দুয়েকের পরিচর্যায়।

মণির আদরের তনু কবিতাগুচ্ছ পাঠ করে শোনাল। মুগ্ধ হলঘর করতালি মুখরিত। মণি এবার তনুর একটা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কথা ভাবছে। পাঁচ ফর্মার করার প্ল্যান আছে। সত্তর বাহাত্তরটা কবিতা হলেই হবে। তা তনুর সংগ্রহে এখন ষাটটার মতন আছে। বলেছে সপ্তাহ দু’য়েক সময় পেলেই নাকি নামিয়ে ফেলবে। মণির আদেশ লেখা শেষ হলেই যেন তনু তাকে ফোন করে। কোনও কালক্ষেপ না, সাথে সাথেই ডিটিপি-র জন্য চলে যাবে যথাস্থানে।

মণি খরচখরচা বাবদ দু’টো ইনস্টলমেন্টে পঁচিশ পঁচিশ করে মোট পঞ্চাশ দিতে বলেছে। বাকিটা নাকি মণি বুঝে নেবে। নীচে কোথাও কোনও ফুটনোট নেই, কোনও শর্তাবলী নেই, এমনকী নেই কোনও হিডেন কস্ট-ও। ফার্স্ট অ্যান্ড ফাইনাল যাকে বলে। হাতি কা দাঁত মরদ কা বাত। এই হচ্ছে মণি ঘোষাল।

ক্রমশ…

বলিদান (শেষ পর্ব)

সার্থক আর অনন্যার সম্পর্কের কথা অফিসে কারওরই অজানা ছিল না এবং সকলেই চাইত ওরা দু’জনে বিয়ে করে নিক। ওদের দু’জনেরই বডি ল্যাঙ্গুয়েজ প্রমাণ করত দু’জনের মধ্যের ভালোবাসাটা কতটা গভীর।

—সার্থক, কবে বিয়ে করছ অনন্যাকে? অফিসের সহকর্মী আশিস অফিস ফাঁকা দেখে সার্থককে জিজ্ঞাসা করল। সার্থক আর আশিসের বন্ধুত্ব প্রায় নয়-দশ বছর গড়াতে চলল। অফিসেরই এক কলিগের মেয়ের বিয়েতে গেছে অফিসের বেশির ভাগ লোকজন। অফিস মোটামুটি ফাঁকা দেখেই আশিস প্রশ্নটা করেছিল।

অনন্যা বেরোবার সময় নিজের পার্সটা নিতে ভুলে গিয়েছিল, সেটাই নিতে অফিসে ফিরে এসেছিল। না চাইতেও আশিস আর সার্থকের কথোপকথন ওর কানে গেল। আশিসের মুখে নিজের নাম শুনে কৌতূহলবশত অনন্যা দাঁড়িয়ে গেল।

—অনন্যাকে আমি পছন্দ করি আশিস, ও খুব ভালো মেয়ে। কুশলও ওকে ভালোবাসে। কিন্তু অনন্যা এখন কুশলকে পছন্দ করলেও যখন ওর নিজের সন্তান হবে তখন কুশলকে ওর ভালো না-ও লাগতে পারে। আমি আমার ছেলের জন্য জীবনে কোনওরকম রিস্ক নিতে রাজি নই। আশিসের প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেয় সার্থক৷

এই কথা শোনার পর অনন্যার আর দাঁড়িয়ে কিছু শোনার ক্ষমতা ছিল না। পার্সটা নিয়ে অফিস থেকে ও বেরিয়ে গেল।

তিন-চারদিন অনন্যা অফিস এল না। মোবাইলও বন্ধ ছিল ওর। সার্থক কোনওরকম খবর না পেয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠল। দুই বছরে এই প্রথমবার অনন্যার অনুপস্থিতি ওকে ভিতরে ভিতরে চিন্তায় পাগল করে তুলল। ও বুঝতে পারছিল না কী করে অনন্যাকে ছাড়া ওর জীবন চলবে? অফিসের প্রত্যেকে, সার্থকের এই মানসিক অস্থিরতা উপলব্ধি করতে পারছিল এবং বুঝতেও পারছিল ওর ব্যবহারে এই অসংলগ্নতার কারণ।

পাঁচদিন কেটে যাওয়ার পর সন্ধের দিকে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল সার্থকের বাড়ির সামনে। ট্যাক্সি থেকে নেমে অনন্যা সার্থকের দরজায় কলিংবেল বাজাল। দরজা খুলে অনন্যাকে সামনে দেখে সার্থক হতবাক হয়ে গেল।

অনন্যাকে খুব দুর্বল লাগছিল দেখতে। দেখে মনে হচ্ছিল কোনও শক্ত অসুখ থেকে সবেমাত্র সুস্থ হয়ে উঠেছে। দুশ্চিন্তা চেপে রেখেই সার্থক জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার অনন্যা, পাঁচদিন কোথায় ছিলে তুমি?’

ততক্ষণে কুশলও এসে দাঁড়িয়েছে অনন্যার কোল ঘেঁসে। ব্যাগের থেকে দুটো চকোলেট বার করে কুশলের হাতে দিল অনন্যা। সস্নেহে ওর নরম গালে হাত বুলিয়ে কাছে টেনে নিয়ে ওর চুলের মধ্যে ঠোঁট ঠেকাল অনন্যা।

প্রতিবারের মতোই ‘থ্যাংক ইউ’ বলে কুশল অনন্যার কোলে মুখ লুকাল।

—কী হল অনন্যা, বললে না তো তোমার কী হয়েছে। পাঁচদিন কোথায় ছিলে? অনন্যার উত্তরের অপেক্ষায় অধীর হয়ে উঠছিল সার্থক।

অনন্যা একটা গভীর নিশ্বাস নিল। হাতের ফাইলটা থেকে একটা কাগজ এগিয়ে দিল সার্থকের হাতে।

—এটা কী? সার্থক চোখ রাখল কাগজটিতে। বিস্ময়ে এবং হতচকিত হয়ে তাকিয়ে রইল কাগজটির দিকে। অস্ফুট একটা আওয়াজ বেরোল সার্থকের মুখ দিয়ে, ‘অনন্যা এটা তুমি কী করেছ?”

অনন্যাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে সার্থক বলে উঠল, “তুমি নিজেকে এভাবে মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করলে? কেন তুমি নিজের অপারেশন করালে?’ হাতের মেডিকেল সার্টিফিকেটটা নিয়ে সার্থক পাথরের মতো বসে রইল। এবার অনন্যা মুখ খুলল।

—সার্থক তুমি আমাকে বিয়ে করতে এই জন্যই রাজি ছিলে না বা ভয় পাচ্ছিলে যে, আমাদের সন্তান হলে আমি কুশলকে আর ভালোবাসব না। ওর খেয়াল রাখা বন্ধ করে দেব। এই ভাবনাই তোমাকে ভিতরে ভিতরে শেষ করে দিচ্ছিল। কিন্তু আমি চেয়েছি যে, কুশলই আমার একমাত্র সন্তান হয়ে থাকুক। তাই ভবিষ্যতে যাতে কোনওদিন নিজে মা হতে না পারি সেজন্য সকলের আশঙ্কাই শেষ করে দিতে আমি নিজের অপারেশন করালাম। সার্থক আমি তোমাকে কোনওভাবে হারাতে চাই না। অনন্যার কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসে।

—অনন্যা, আমাদের সকলের জন্য তুমি এই নিয়ে তিন তিনবার চরম স্যাক্রিফাইস করলে। তোমার হৃদয়ের এই বিশালতার কাছে আমার কিছু বলা অতি তুচ্ছ! আমি তোমাকে দেখে কিছু বলার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছি, বলে সার্থক অনন্যাকে নিজের বুকে টেনে নিল। অনন্যা অবাক হয়ে দেখল সার্থকের দু’গাল বেয়ে নামছে অশ্রুধারা!

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব