ঠাকুমার ডায়ারি (শেষ পর্ব)

ঠাকুমার শেষ কাজকর্মের ঝামেলায় এই ক’দিন আর পূজারিনি বাড়ির বাইরে বেরোতে পারেনি। শ্রাদ্ধশান্তির পর একদিন ইউনিভার্সিটি গিয়ে দেখা হল অরুনাংশুর সঙ্গে। ঘরের টুকটাক খবরাখবর নেওয়ার পর বলল, ‘পরের রবিবার বিকেলে একটু নন্দনে যেতে পারবি?’

পূজারিনি জানত অরুনাংশু লেখালেখি করে, মাঝেমাঝে নানা জায়গায় নানারকম সাহিত্যের অনুষ্ঠানে যায়৷ বলল, “ওসব অনুষ্ঠানে তুই-ই যা, আমার সময় নেই।”

—আরে চল না, সারপ্রাইজ আছে।

—কী সারপ্রাইজ?’ পূজারিনি অবাক চোখে চাইল।

—সেটা হলে গিয়েই দেখতে পাবি, এখন বলব না।

রোববার বিকেলে বাংলা আকাদেমিতে গিয়ে পূজারিনি দেখল— হলভর্তি মানুষের ভিড়। মঞ্চে বিশিষ্ট অতিথিরা বসে আছেন। পিছনে টাঙানো একটি নামি প্রকাশনার ব্যানার। আর সামনের টেবিলে বইয়ের পাহাড়। কিছুক্ষণ পরে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, উদ্‌বাধনী সংগীত ও বিশিষ্ট অতিথিদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপনের সঙ্গে শুরু হয়ে গেল অনুষ্ঠান।

দু’টি প্রবন্ধের বই প্রকাশের পর সঞ্চালিকা বললেন— এবার এমন একজন লেখিকার বই প্রকাশ হতে যাচ্ছে যিনি দুর্ভাগ্যবশত আর আমাদের মাঝে নেই। যাঁর সৃষ্টিশীল মন সংসারের বন্ধন ও প্রতিকূলতার মধ্যে বন্দি হয়েও হারিয়ে যায়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যার কলম ছিল সচল, অপ্রতিরোধ্য। জীবনের ছোটোছোটো উপলব্ধি, আবেগ, আর বাস্তব ও কল্পজগতের টানাপোড়েন তিনি সাবলীল ভাবে তুলে ধরেছেন তাঁর ডায়ারির পাতায়। তাঁর লেখার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই প্রথিতযশা সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর ছায়া। তাঁর ডায়ারির পাতা থেকে তুলে আনা সেই মণিমুক্তাগুলি পুস্তক আকারে প্রকাশ করতে পেরে আমরা গর্বিত। এ ব্যাপারে উদীয়মান কবি অরুণাংশু সামন্তর উদ্যোগ বিশেষ ভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। তার জন্যেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল নির্মলা দেবীর সৃষ্টিকে। বইটি প্রকাশের জন্য এবার মঞ্চে ডেকে নেব কবি অরুণাংশু সামন্ত এবং দর্শকাসনে আসীন নির্মলা দেবীর নাতনি পূজারিনি চৌধুরীকে। প্রকাশিত হচ্ছে নির্মলা দেবীর ‘উপলব্ধি”।

সঞ্চালিকার মুখে হঠাৎ ঠাকুমা আর নিজের নাম শুনে পূজারিনি চমকে উঠল। ‘চল আমাদেরকে ডাকছে” বলে অরুণাংশু পূজারিনির হাত ধরে উঠে গেল মঞ্চে। পূজারিনির মাথায় কিছুই ঢুকছিল না, সম্মোহিতের মতো অনুসরণ করল অরুণাংশুকে।

বইপ্রকাশ শেষ হতে হলের বাইরে গিয়ে পূজারিনি জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই এসব কবে কীভাবে করলি? কখনও কিছু বলিসনি তো?”

—তোর বোধহয় মনে আছে একদিন একটা কাজে আমি তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তখনই কথায় কথায় আমি কবিতা লিখি শুনে ঠাকুমা আমাকে বলেছিলেন তাঁর নিজেরও লেখালেখির অভ্যাসের কথা। আমি সেগুলো দেখার জেদ করতে উনি চুপিচুপি আমাকে আর একদিন যেতে বলেছিলেন যেদিন তুই বাড়িতে থাকবি না। সেইমতো কয়েকদিন পরে আমি আর একদিন গেলে উনি বাক্স থেকে তাঁর পুরোনো ডায়ারিগুলো আর কিছু ছিঁড়ে যাওয়া লেখার খাতা বের করে দেখিয়েছিলেন। লেখাগুলো দেখে আমি অবাক হয়ে যাই এবং একপ্রকার জোর করেই সেগুলো নিয়ে আসি। তবে উনি বলে দিয়েছিলেন, আমি যেন এসব কথা কাউকে না বলি, এমনকী তোকেও না। তাই তোকে কিছু জানাইনি।

পূজারিনির মনে উঠল একই সাথে অভিমান ও বিস্ময়ের তুফান। অস্ফুটে বলল, “ওইটুকু সময়ের মধ্যে তুই ঠাকুমাকে একেবারে বশ করে ফেললি? ঠাকুমা তোকে এত ভালোবেসে ফেলল? দিয়ে দিল তার যত্ন করে রাখা প্রিয় ডায়ারিগুলো?”

—হ্যাঁ দেবিজি’, অরুণাংশুর মুখে দুষ্টুমির হাসি। শুধু কি তাই? ঠাকুমা তাঁর আরও একটি প্রিয় জিনিস আমার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন, করতে চেয়েছিলেন প্রায়শ্চিত্ত।

পূজারিনি তো আরও অবাক, ‘কী জিনিস? আর প্রায়শ্চিত্ত কীসের?”

—কথায় কথায় ঠাকুমা যখন জানতে পারল আমি ঘাটালের সুবিমল সামন্তর নাতি, তখন ভারী গলায় বলেছিলেন, তোর দাদুকে তো কিছু দিতে পারিনি, প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ আমার নাতনিকে তোকে দিলাম। ওকে তুই গ্রহণ করিস।

পূজারিনির মনে পড়ে গেল ঠাকুমার ডায়ারির লেখাগুলো। তাহলে সে যা ভেবেছিল সেটাই ঠিক? মনটা কড়কড় করে উঠল ‘সতিন’-এর জন্যে। আজীবন কত না অপূর্ণ সাধ, অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে বাঁচতে হয়েছে তাকে।

—কী রে, কী ভাবছিস এত?

—কিছু না! চল বাড়ি যাই, বলে পূজারিনি হাতটা বাড়িয়ে দিল অরুণাংশুর দিকে।

সহবাসের কথা শুনলেই স্ত্রী নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়

প্রশ্ন :  আমি ২৮ বছর বয়সি বিবাহিত যুবক। ৩ বছর আগে বিয়ে হয়েছে এবং দেড় বছরের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। বিয়ের প্রথম দুই বছর ঘুরে ফিরে বেড়িয়ে রোমান্স করে আমাদের কেটেছে। তখন মনে হতো এভাবেই সারাটা জীবন কাটবে। কিন্তু ছেলের জন্মের পর থেকেই স্ত্রী-র ব্যবহারে আমূল পরিবর্তন আসে। সহবাসের কথা শুনলেই স্ত্রী দূরে সরে যায় অথচ আগে যৌনসম্পর্কের জন্য ব্যাকুল থাকত। উত্তেজিত করার চেষ্টা করলেও বিশেষ একটা উৎসাহ দেখায় না। কখনও কখনও আমার মনে হয় নিজের স্ত্রীকেই আমি ধর্ষণ করছি। দৈনন্দিন বাড়ির আর-পাঁচটা কাজের মতোই, সেক্সটাকে ও কোনও ভাবে কাটিয়ে যেতে চায় আজকাল। মাঝে মাঝে ভাবি আগের উৎসাহ কোথায় গেল ওর? সব দম্পতিদের মধ্যেই কি এরকমই হয়?

উত্তর:  বাস্তবকে মাথায় রেখে যদি বিচার করেন তাহলে বিয়ের প্রথম বছরগুলোর সঙ্গে পরের সময়ের তুলনা করে শুধু শুধু অবসাদগ্রস্ত হবেন না। বিয়ের প্রথম দিকে শুধু রোমান্স করা সম্ভব হয়, কারণ দায়িত্ব প্রায় কিছুই থাকে না সেই সময়। আপনি শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবছেন, স্ত্রী-র দিকটাও আপনার ভেবে দেখা উচিত। প্রথম, গর্ভাবস্থায় ৯ মাস কাটানো, তারপর সন্তানের জন্ম দেওয়া এবং শিশুর চব্বিশ ঘন্টা দেখাশোনা। এর মধ্যে যদি আপনি স্ত্রী দ্বারা সামান্য অবহেলিত হন, তাহলেও আপনার পরিস্থিতি বোঝাটা উচিত। বরং ঘরের কাজে আর সন্তানের দেখাশোনা করতে স্ত্রী-কে আপনার সাহায্য করা উচিত।

আর্থিক সমস্যা না থাকলে, পরিচারিকা রেখে দিতে পারেন, তাতে আপনার স্ত্রী কিছুটা বিশ্রাম পাবেন। সন্তান কিছুটা বড়ো হয়ে গেলে আবার আপনারা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন। তবে বিয়ের শুরুর দিনগুলোর মতো না হলেও, আপনারা আনন্দ লাভ করতে পারবেন সেটা হলফ করে বলতে পারি।

প্রশ্ন:   আমি ৩০ বছরের বিবাহিতা। আমার দাম্পত্য জীবন সুখের নয়। অবশ্য এর জন্য আমি নিজেকেই দায়ী বলে মনে করি। আমার স্বামী আমাকে খুব ভালোবাসেন। আমিও ওনাকে ভালোবাসি। সবই ঠিকঠাক আছে কিন্তু সহবাসের সময় আমি অসম্ভব আড়ষ্ট হয়ে পড়ি, এমনকী আমাকে চুম্বন বা আলিঙ্গন করতে এলেও আমি বাধা দিই। স্বাভাবিক ভাবেই স্বামী আমার উপর রেগে যান। অথচ স্বামী যখন চোখের সামনে থাকেন না, তখন ওনার স্পর্শ পাওয়ার জন্য আমি ব্যগ্র হয়ে উঠি। ওনাকে যৌনসুখ দেবার জন্য মন আনচান করতে থাকে। এই অবস্থায় আমি কী করব, যাতে স্বামীকে যৌনসুখ দিতে পারি?

উত্তর:  আপনার সমস্যার সমাধান আপনার নিজের কাছেই আছে। আপনার বোঝা উচিত দাম্পত্যে সেক্সের ভূমিকা অপরিসীম। সুতরাং আপনার স্বামী যখন আপনার সঙ্গে সহবাসের ইচ্ছে প্রকাশ করেন তখন আপনার সমর্পণ আশা করেন তিনি। মানসিক ভাবে আপনার আরও সক্রিয় হওয়া দরকার এবং স্বামীকে দৈহিক সুখ দেওয়া আপনার কর্তব্য। আপনি স্বামীকে এর থেকে বঞ্চিত রাখতে পারেন না। সহবাসের সময় নিজেকে সক্রিয় রেখে দেখুন, আপনার দাম্পত্য জীবন সুখে ভরে উঠবে।

ঠাকুমার ডায়ারি (পর্ব ২)

মনটা ডুকরে কেঁদে উঠল পূজারিনির। ফটোটা বুকে চেপে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠল, ‘সতিনকে ছেড়ে কেন পালিয়ে গেলি এত তাড়াতাড়ি? আমি এখন কী করব?”

নির্বাক ছবির সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ পূজারিনির মনে পড়ে গেল কিছুদিন আগে বলা ঠাকুমার একটা কথা— আমি যখন থাকব না আমার ডায়ারিগুলো পড়িস, আমাকে খুঁজে পাবি ডায়ারির পাতায়। মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনের কথা। ঠাকুমা প্রতিদিন শোবার আগে বসত ডায়ারি লিখতে। দাদু যখন বেঁচে ছিল কতবার এই নিয়ে তার ঠাট্টা তামাশা শুনতে হয়েছে ঠাকুমাকে।

দাদু যখন বলত— কাজের মধ্যে তো সারাদিন লুড়ি টানা হেঁশেল থেকে শোবার ঘর আর শোবার ঘর থেকে হেঁশেল। কী এত লেখো ওই ডায়ারিতে ?

ঠাকুমা অন্যমনস্ক ভাবে উত্তর দিত— কথা কইছি নিজের সঙ্গে।

—কী এত কথা বলত ঠাকুমা নিজের সঙ্গে? কী এত লিখেছে ডায়ারিতে?

দেয়ালের তাকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেল এ বছরের ডায়ারিটা। পেড়ে নিয়ে এসে খুলে দেখল দিন চারেক আগে পর্যন্ত লেখা। বিছানায় বসে ডায়ারিটা পড়তে শুরু করল পূজারিনি।

দেখল ডায়ারির পাতায় পাতায় ঝরে পড়েছে পরলোকগত স্বামীর নানারকম স্মৃতির টুকরো টুকরো কথা। বেঁচে থাকার অনাগ্রহের কথা। আর ভগবানের কাছে তাকে তাড়াতাড়ি ডেকে নেওয়ার আকুতি। পড়তে পড়তে হঠাৎ পূজারিনির নজরে এল পাতাভর্তি একটু অন্যরকম লেখা। ভালো করে পড়তে শুরু করল।

‘মনটা মাঝেমাঝে গুমরে গুমরে ওঠে, কী একটা অস্বস্তি বুকের উপরে পাষাণ হয়ে চেপে বসে, নড়তে চড়তে পারি না। যুগান্ত সঞ্চিত না-বলা কথাগুলো বুকের মধ্যে এমন ভাবে চেপে বসে আছে যে, মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে। এই জগদ্দল পাষাণ বুকে নিয়ে মরেও শান্তি পাব না। সারাটা জীবন মুখে দ্বিধাদ্বন্দ্বের কুলুপ এঁটে দিয়ে মনের কথাগুলো চেপে না রাখলে আজ সেগুলো এত ভারী হয়ে উঠত না। জীবনে কত লোককে কত কিছু বলতে চেয়েও বলে উঠতে পারিনি। পারিনি গৃহশিক্ষক সুজিত স্যারকে- তাকে আমার অপছন্দের কথা, বলতে পারিনি স্কুলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঈর্ষায় স্কুলের বান্ধবী নীরার অঙ্ক বইটা পরীক্ষার আগে আমারই সরিয়ে দেওয়ার কথা, বলতে পারিনি ভুল বোঝাবুঝির কারণে দূরে সরে যাওয়া ভাইপোকে আমার অন্তর থেকে তাকে ভালোবাসার কথা, বলার সুযোগ হয়নি রাগে দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেওয়া কাজের ছেলেটাকে আমার অনুশোচনার কথা— এমনি আরও কত কথা। আর কলেজের সেই মুখচোরা পড়াশোনায় ভালো ছেলে সুবিমল? তাকেও বলতে পারিনি সেদিন তাকে আঘাত দিয়ে যা যা বলেছিলাম কোনওটাই আমার মনের কথা ছিল না, মন আসলে চেয়েছিল ঠিক উলটোটা। আজ মনে হয় মনের কথাগুলো সবাইকে সময়মতো খুলে বলে দিলেই ভালো হতো। তাতে হয়তো সাময়িক কষ্ট পেতাম! হয়তো বা জীবনটাও বইত অন্য খাতে! কিন্তু আজ শেষের বেলায় এইরকম আপশোশের বোঝা বইতে হতো না।’

ঠাকুমার লেখাগুলো গোগ্রাসে গিলছিল পূজারিনি। ভাবতে লাগল ঠাকুমা এত কথা চেপে রেখেছিল বুকের মধ্যে? আর কে এই সুবিমল? সেকি ঠাকুমার সঙ্গে মেদিনীপুরে কলেজে পড়ত? সত্যিই কি ঠাকুমা তাকে পছন্দ করত নাকি?

পাতা ওলটাতে ওলটাতে পূজারিনি থমকে গেল আর একটা পাতায়। ঠাকুমা লিখেছে, ‘আজ বড্ড মনে পড়ছে একটা মুখ, যে মনে সাহস জোগাত। বলত সাহস করে জীবনে এগিয়ে চলতে, অন্তরের সুপ্ত ইচ্ছাগুলোকে পূরণ করতে। বয়সে সামান্য বড়ো ছোটোকাকু ছিল আমার বন্ধুর মতো। দু’জনে একসঙ্গে খেলাধুলা মারামারি করে বড়ো হয়েছিলাম। কখনও ভয়ে নিজের কোনও ইচ্ছের কথা বাবা-মাকে না বলতে পারলে সে বলত — কেন এত ভাবিস কে কী ভাববে তাই নিয়ে? কেন এত সংকোচ, কেন এত ভয়? লোকে কী বলবে, ঘরের লোক কী বলবে তাই ভেবে কখনও নিজেকে গুটিয়ে রাখবি না। মন যা চায় তা বলে দিবি। যা ভালো লাগে তাই করবি। এই ভাবে চুপ করে সবকিছু মেনে নিলে লোকের ফাঁপা প্রশংসা ছাড়া জীবনে সত্যিকার সুখ পাবি না কোনওদিন। কিন্তু কাকুর শত উৎসাহেও আমি খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারিনি। পারিনি ঘরের মানমর্যাদার কথা না ভেবে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে। পারিনি লোকনিন্দার ভয় ঝেড়ে ফেলে নাচগানের চর্চা চালিয়ে যেতে। পারিনি শ্বশুরবাড়ির লোকেদের বাঁকা কথার খোঁচা অগ্রাহ্য করে লেখালেখি করতে। কেবলি চিন্তা করেছি লোকের কথা, তারা কী ভাববে, তারা কী বলবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি লোকের কথা ভাবতে গিয়ে সারা জীবন কেবল নিজেকেই বঞ্চনা করেছি, প্রতারণা করেছি নিজের সঙ্গে। সত্যিকার সুখের স্বাদ পাইনি জীবনে।”

অবাক হল পূজারিনি। ঠাকুমার ছোটোকাকু এত উদার মনের মানুষ ছিল? দু’একবার ঠাকুমার মুখে শুনেছে তার এক কাকা কলেজে পড়তে পড়তে মেতে উঠেছিল ষাটের দশকের বিপ্লবী আন্দোলনে, তারপর কোথায় যে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল কেউ জানে না। আরও অবাক হল ঠাকুমার নাচগান আর লেখালেখির নেশার কথা জেনে। ছোটোবেলা থেকে কখনও তো ঠাকুমাকে এসব করতে দেখেনি! কিন্তু লেখালেখি করলে তো সবকিছু যত্ন করেই কোথাও রাখবে, ফেলবে না। অমনি ঠাকুমার খাটের নীচ থেকে টিনের পুরোনো তোরঙ্গটা টেনে বের করল। খুলে দেখে কয়েকটা পুরোনো শাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। এমনকী পুরোনো ডায়ারিগুলোও নেই। নিরাশ হল পূজারিনি। কোথায় গেল সব? তবে কি ঠাকুমা লেখা বন্ধ করে দিয়েছিল, নাকি দাদুর ভয়ে সব নষ্ট করে ফেলেছে?

(চলবে)

ঠাকুমার ডায়ারি (পর্ব ১)

ঠাকুমাকে শ্মশানে নিয়ে চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ গুম মেরে বারান্দায় বসে রইল পূজারিনি। মনে হচ্ছিল যেন অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে সে, বেঁচে থেকেও যেন নেই, এই ঘর, এই সংসার কেবল ছায়াময় অবয়ব মাত্র। কয়েকদিন আগেও যে-মানুষটা তার সঙ্গে কথা বলেছে, আজ সে হয়ে গেছে বিদেহী। কাল যে বর্তমান ছিল, আজ সে অতীত। কাল যার উপস্থিতি ছিল গোটা বাড়িটা জুড়ে, আজ সে কেবলই স্মৃতি।

বাবা আর ভাই পাড়ার লোকেদের সঙ্গে গেছে শেষ যাত্রায়, ঘরে সে আর মা ছাড়া কেউ নেই, নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে গোটা বাড়িটাকে। আস্তে আস্তে উঠে ঠাকুমার ঘরে গেল পূজারিনি। অপলকে তাকিয়ে রইল টেবিলে রাখা গত বছর তার জন্মদিনে ঠাকুমার সঙ্গে তোলা ফটোটার দিকে। ঠাকুমা তাকে পায়েস খাইয়ে দিচ্ছে। দেখে মনে হল যেন এখুনি ঠাকুমা উঠে এসে নিত্যদিনের মতো তার ‘সতিন’-এর সঙ্গে ঠাট্টা তামাশা শুরু করবে! মনে পড়ে যাচ্ছিল কত কথা৷

একদিন সন্ধ্যাহ্নিক সেরে চা খেয়ে বিছানায় বসে মাতৃশক্তি পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছিল নির্মলা। খানিক পরে হঠাৎ চমকে উঠল কানের কাছে কারও ডাকে, ‘টুকি!” মুখ ঘুরিয়ে দেখে পূজারিনি, যথারীতি চুপিচুপি এসে পাশে বসেছে।

কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘দুষ্টু মেয়ে, এত বড়ো হলি এখনও তোর সেই ছোটোবেলার স্বভাব গেল না। খালি পিছন থেকে কানের কাছে ডেকে চমকে দেওয়া।”

—এ স্বভাব মরলেও যাবে না বুড়ি, তুই যে আমার সতিন। বলে দু’হাত দিয়ে ঠাকুরমার গলা জড়িয়ে ধরে গালে মুখ ঘষতে লাগল।

—ছাড় বাবা, উলটে পড়ে হাত-পা ভাঙব যে, বলে নির্মলা তাকে যতই ছাড়াবার চেষ্টা করে ততই নাতনির বাহুপাশ শক্ত হয়৷ অবশেষে পত্রিকাটা রেখে দিয়ে মুখে চুমু খেয়ে একটু আদর করতে তবে মেয়ে ছাড়ে।

—সতিনকে ছেড়ে দু’দিন পরে তো ড্যাং ড্যাং করে চলে যাবি শ্বশুরবাড়ি, তখন তো ভুলেও আমার কথা মনে পড়বে না।

—চিন্তা করিস না, যেখানেই যাব সতিনকেও সঙ্গে নিয়ে যাব। বুঝলি বুড়ি?

—আর বাজে কথা বলিসনি ছুঁড়ি। মনে যখন প্রেমের রং ধরবে তখন আর কারও কথা মনেই থাকবে না।

—ধুস, কী যে বলিস না তুই?’ লজ্জারাঙা পূজারিনি ঠাকুমার কোলে মুখ লুকাল। আর নির্মলা পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল তার মাথায়।

এইরকমই ছিল ঠাকুমা-নাতনির নিত্যদিনের রুটিন। ছোটোবেলা থেকে ঠাকুমাই তার সব— তার কাছে খাওয়া, তার কাছে শোওয়া, যত অভাব অভিযোগ সব ঠাকুমার কাছে। স্কুল মাস্টারনি মায়ের বকুনি আর রাগি মেজাজ তাকে আরও বেশি। করে ঠেলে দিয়েছিল ঠাকুমার দিকে। দাদু যখন তাকে ‘নতুন বউ’ বলে ঠাট্টা করত, আর ঠাকুমা তাকে ‘সতিন’ বলে কপট রাগ দেখাত, সেও অর্থ না বুঝে ‘আমি তোমার সতিন, আমি তোমার সতিন’ বলে ঠাকুমাকে রাগাবার চেষ্টা করত। সেই থেকে তার সতিন ডাকটাই রয়ে গিয়েছিল, হাসিঠাট্টার সময় সতিন বলে রাগাত পরস্পরকে। ছোটোবেলা থেকেই সে ঠাকুমাকে তুই বলে ডাকত, যেটা বড়ো হয়েও আর পরিবর্তন হয়নি।

(চলবে)

কাটা হাত (শেষ পর্ব)

জ্ঞান ফিরতে পল্লব দেখল একটা খাটিয়ায় শুয়ে আছে। বেশ কিছু মানুষ ওর মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। পল্লব উঠে বসতে চাইল। কিন্তু শরীরটা ভীষণ ভারী লাগছে। ও বুঝতে পারল এই মানুষগুলোই ওর জ্ঞান ফিরিয়েছে। পল্লবের চোখে হাজার বিস্ময়! এইমাত্র যা ঘটল যেন একটা সিনেমার ভয়াবহ দৃশ্য। মাথাটা ভারী লাগছে। চোখে একটা ঘোর। পল্লবের গলা শুকিয়ে গেছে। কোনও কথা বের হচ্ছে না।

—কী হল তোমার। অমন দৌড়ে এসে এখানে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে কেন? জনৈক মহিলার প্রশ্ন শুনে পল্লবের সব মনে পড়ে গেল।

একটি ছেলে এক গেলাস ঘোলের শরবত নিয়ে এসে পল্লবের সামনে ধরল। কে একজন বলে উঠল ঘোল-টা খেয়ে নাও। যা গরম পড়েছে। মাথা ঘুরে গিয়েছিল নাকি?

পল্লব খানিক সুস্থ বোধ করতে যা যা ঘটেছে তার সবটা বিস্তারিত ভাবে জানাল। সব কথা শুনে ওরা বলে উঠল— এরকমটা অনেক আগেও কয়েকবার ঘটেছে। সেই থেকে কী দিন, কী রাত কেউ রেল লাইন ধরে যাতায়াত করে না। তুমি জানতে না? খুব জোর বেঁচে গেছ ভাই। আর কখনও লাইন ধরে যাতায়াত করবে না। লাইনে রেলে কাটা পড়া একজন মানুষের বিদেহী আত্মা ওভাবে ঘুরে বেড়ায় দিনেরাতে।

এও শোনা গেছে যে, এর আগে ওই কাটা হাত দুটো নাকি গলায় সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছিল একটি ছেলের! আবার নিজেই ছেড়ে দিয়েছে। যেন একটা মরণ খেলায় মেতে ওঠা। যার সঙ্গে এইসব ঘটেছিল তার মুখ থেকেই শোনা। সেই থেকে কেউ আর লাইন ধরে হাঁটতে চায় না।

পল্লব মনে মনে ভাবতে লাগল। এরকমটা আবার হয় নাকি! কিন্তু এইমাত্র নিজের চোখে যেটা দেখল সেটা দুর্ঘটনার দিনের দৃশ্য, সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো চোখের সামনে ফুটে উঠল।

—আজ আর কোথাও গিয়ে কাজ নেই, তুমি বাড়ি ফিরে যাও বাপু। বলা যায় না শরীর খারাপ হতে পারে।

—হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো। সবারই এক মত।

ওরা সবাই বাড়ি ফিরে যেতে বলল পল্লবকে। এমনকী ওকে একা না ছেড়ে কেউ কেউ ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতেও চাইল।

কিন্তু ওর তো এখন বাড়ি ফিরে যাবার উপায় নেই। ও জানে আজ ডিরেক্টর কল আছে। সময়মতো পৌঁছোতেই হবে। কিন্তু এদের বোঝাবে কী করে। তাই ওদেরকে না করে দিয়ে উঠে পড়ল ট্রেন ধরবার জন্য।

—আমার জরুরি দরকার আছে। এখুনি যেতে হবে। পল্লবের কথা শুনে একটা ছেলে সাইকেলে উঠিয়ে পল্লবকে স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে পল্লব ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার সেই ভয়ংকর মুহূর্তটার কথা ভাবতে লাগল। ভয়ে সে শিউরে উঠল। এরই মধ্যে স্টেশনে ট্রেন এসে যাওয়ায় সে ট্রেনে উঠে পড়ল। তারপর ট্রেন থেকে নেমে একটা ট্যাক্সি ধরে সোজা ডিরেক্টরের অফিসে চলে এল।

চেম্বারে ঢুকে দেখল অনেকেই এসে গেছে। ক্যামেরাম্যান সুকান্তদা, স্ক্রিপ্ট রাইটার দুলাল ভৌমিক, ম্যানেজার ব্রজদা— সবাই হাজির।

ডিরেক্টর অভ্র রায় পল্লবকে দেখে বললেন— বসো বসো। আজ স্ক্রিপ্টটা নিয়ে একটু ডিসকাশন করব। তারপর তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য বোঝাব।

ঠিক তখনই দেয়ালে চোখ গেল পল্লবের। দেখল একটা বড়ো ফেস্টুন ঝুলছে। তাতে দুটো কাটা হাত আড়াআড়ি রাখা। আর সেখান থেকে রক্ত ঝরছে। পল্লব এই ছবিটা দেখে চমকে উঠল! ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া মুহূর্তের কথা মনে পড়ে গেল।

পল্লব চিৎকার করে উঠল। একটা ভয় কাজ করছে তার। সে অদ্ভুত একটা আচরণ করতে লাগল। একটা অস্বাভাবিক মুখভঙ্গি করতে লাগল। ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ল পল্লব।

অভ্র রায় দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে উঠলেন। বাকিরাও তাঁর সঙ্গে তাল মেলাল।

—দারুণ দারুণ। এরকমটাই আমি চাই। ইউ আর সিমপ্লি গ্রেট মাই বয়। ডিরেক্টর পিঠ চাপড়ে দিলেন পল্লবের। এই সিনটার কথাই তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম আমি। অভ্র রায় খুব খুশি।

পল্লব নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে। ব্যাপারটা কিছু বোঝার আগেই পল্লব বসে হাঁফাতে লাগল। ওর মনে হল— ও তো সিনের কথা ভেবে অ্যাক্টিং করেনি। ওর তো…। পল্লব উঠে দাঁড়াল।

—ওকে একটু জল দাও। অভ্র রায় বলে উঠলেন।

বাকিরা একে একে এসে পল্লবকে এই দুর্দান্ত অ্যাক্টিং-এর প্রশংসা করতে লাগল ।

পল্লব মনে মনে কাটাহাতের অশরীরী-কে ধন্যবাদ জানাল। সবটুকু কৃতিত্ব প্রেতাত্মার। হয়তো এই গরমে ঠান্ডা জল খাওয়ানোর ফল পেয়েছে ওই প্রেতাত্মা। সে আজ বেজায় খুশি। অভ্র রায়ের ছবিতে নায়কের সুযোগটা তাহলে শেষমেশ সে পেয়েই গেল।

পল্লবের ভয় কেটে গেছে। একটা আলাদা আনন্দ ও ভালোলাগায় তার মনটা ভরে উঠল।

এই তপ্ত দিনে শীতল বারি ঝরে পড়তে লাগল ছোট্ট অফিস ঘরে। পল্লব চোখ বন্ধ করে অনুভব করল বৃষ্টির সুখ। পরম তৃপ্তির সুখ।

(সমাপ্ত)

কাটা হাত (পর্ব-০১)

আজ সকাল থেকেই প্রচণ্ড তাপদাহ। সূর্য যেন মাটিতে ঝুলে পড়েছে। সবাই গরমে হাঁসফাঁস করছে। অস্থির অবস্থা। এতটুকু হাওয়া নেই। দর দর করে ঘামছে মানুষজন। কিন্তু পল্লবকে আজ বেরোতেই হবে। আজ একটা জরুরি মিটিং আছে ধর্মতলায় চিত্র পরিচালক অভ্র রায়ের চেম্বারে।

গনগনে রোদ মাথায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে পল্লব। আজ ফাইনাল কথাবার্তা। অভ্র রায় তাঁর পরবর্তী ছবি ‘আগুন চোখ’-এর জন্য নায়ক নির্বাচিত করেছেন পল্লবকে। বিকেল চারটের মধ্যে পৌঁছোতে হবে। একটু বেশি মাত্রায় উত্তেজিত পল্লব।

ট্রেন ধরতে তাই আগেভাগে বেরিয়ে পড়েছে পল্লব। লাইন দিয়ে হাঁটলে শর্টকাট হবে। তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছে যেতে পারবে। তাই ও লাইনের ওপর দিয়েই হাঁটা শুরু করে দিল।

লাইন থেকে গরম হলকা উঠছে। লোহার লাইন তেতে উঠেছে। সামনে তাকালে মনে হচ্ছে আগুনের গোলার মধ্যে দিয়ে যেন হাঁটছে। দ্রুত পা চালাল পল্লব। একটা চাপা উত্তেজনা ও ভয় কাজ করছে তার মনে। মোবাইলে দু’বার ফোন এসেছে ম্যানেজারের। ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে, তাও জানিয়ে দিয়েছে।

উলটো দিক থেকে একটা মেল ট্রেন দ্রুত বেগে ছুটে আসছে তীব্র শব্দ করে। পল্লব লাইন ছেড়ে সরে দাঁড়াল। কাছাকাছি আসতেই এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হল। পল্লব দেখল একজন উলঙ্গ মানুষ দৌড়ে আসছে উলটো দিক থেকে ট্রেনের দিকে। পল্লব নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। ট্রেনটা সজোরে হুইসেল বাজিয়ে প্রচণ্ড গতিতে বেরিয়ে গেল। ট্রেনের ধাক্কায় উলঙ্গ মানুষটার দেহটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

পল্লব দু’হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করল। ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিতেই দেখল, কোথাও কেউ নেই। দুর্ঘটনার কোনও চিহ্ন নেই। সব ফাঁকা! এটা কী হল? নিজেকেই প্রশ্ন করল পল্লব। আশেপাশে কোনও লোকজন নেই। একটু আগে যে-মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। তবে কি এই প্রচণ্ড রোদের তাপে ভুল দেখল সে।

পল্লব আবার চলা শুরু করল। কিন্তু মনের ভেতর একটা দ্বন্দ্ব চলছে। কেন দেখল এমন ভয়ংকর দৃশ্য। এর অর্থই বা কী!

কিছুদূর যাবার পর পল্লবের মনে হল কে যেন পেছন পেছন আসছে। ঘুরে তাকায় সে। কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার হাঁটা শুরু করে। খানিকটা এগিয়ে ওর মনে হল পা দুটো বড্ড ভারী লাগছে। টেনে নিয়ে যেতে পারছে না সে। কে যেন পেছন থেকে টানছে! ফিসফিস করে কথাবলা কারও কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

কে যেন বলে উঠল, “দাঁড়া, দাঁড়া বলছি৷’ পল্লব ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। না কেউ তো নেই। কিন্তু একটু খটকা লাগল।

এই ভর দুপুরে নির্জন রেল লাইনে ও একা। কেউ কোথাও নেই। দূরে নীচে সরু রাস্তা চলে গেছে। ক’টা ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর দেখা যাচ্ছে। গরমের জন্য কোনও মানুষকেই দেখতে পেল না।

পল্লব হাঁটা শুরু করল আবার। এবার সে অনুভব করল— কার হাত যেন ওর পা খামচে ধরেছে! নীচের দিকে তাকাতেই পল্লব ভয়ে চিৎকার করে উঠল। একটা কাটা হাত ওর ডান পা-টা সজোরে চেপে ধরেছে। ও পা টেনে টেনে চলবার চেষ্টা করল। গলা শুকিয়ে কাঠ। ব্যাগ থেকে ঠান্ডা জলের বোতলটা বার করে কাঁপা হাতে জল খেতে গিয়ে বোতলটা ছিটকে পড়ে যেতেই অদ্ভুত কাণ্ড!

কাটা হাত ওর পা ছেড়ে দিয়ে বোতলটা তুলে নিয়েছে। কে যেন বোতল থেকে জল খাচ্ছে। অথচ কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু কাটা হাতটা শূন্যে ভাসছে আর বোতল উলটে জল পড়ছে। এ যেন ম্যাজিক। পল্লব ভেবে পেল না কী করবে এখন। ওর পা দুটো যেন রেললাইনে আটকে গেছে!

শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে পল্লব ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। তারপর দৌড়… দৌড়… আর দৌড়। রেললাইন ছেড়ে ঢালু পথ দিয়ে নীচে রাস্তার দিকে নামতে লাগল সে। কোনওরকমে রাস্তায় নেমে টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল পল্লব। ব্যস আর কিছু মনে নেই তার।

(ক্রমশ ……)

স্বামী সারাক্ষণ নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা করেন

প্রঃ অমার স্বামী সারাক্ষণ নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা করেন ও বাড়ির সকলকে সেই মনোভাবের প্রতি প্রভাবিত করেন৷ এর ফলে আমরা পরিবারের সকলেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছি৷ কী ভাবে ওর ইগো হার্ট না করে এই সমস্যা থেকে ওঁকে মুক্ত করতে পারি, তার পরামর্শ দিন৷

 

উঃ স্বামী যতই নেতিবাচক ধারণা মনে রাখুন না কেন, আপনাকে সদর্থক থাকতে হবে। আপনিই পারেন তার মধ্যে সঠিক চিন্তাধারা প্রবেশ করিয়ে দিতে। এখন থেকে তিনি নেগেটিভ কথা বললেই বিরোধিতা করুন। বরং তাঁকে সদর্থক কথা বলুন। দেখবেন কিছুদিন পরই তাঁর ভিতর পরিবর্তন এসেছে। আপনারা অনায়াসে ভালো থাকতে পারবেন। সংসারে নতুন আলোর কিরণ দেখতে পাবেন।

মানুষ কিন্তু এমনি এমনি নেগেটিভ হয়ে যায় না। বরং এমন ধারণা মনে বয়ে নিয়ে চলার পিছনে কিছু কারণ থাকে। তার জীবনে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটেছে। সেই ঘটনার প্রভাবেই তিনি নেগেটিভ কথা বলেন। তাই সমস্যাটা ঠিক কোথায়, তা বোঝার চেষ্টা করুন।। তারপর অন্য কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে অনায়াসে। প্রয়োজনে এই বিষয়ে জানতে তাঁর পরিবারের মানুষদের  সঙ্গেও কথা বলুন।

এই ধরনের ভাবনা চিন্তা জীবনে বিপদ ডেকে আনে। তাই স্বামীকে এই মানসিক অবস্থায় একা ছেড়ে দেবেন না। দিনে দিনে তার মধ্যে নেগেটিভিটি বাড়তে পারে। তাই নিজেই তাঁর কাউন্সেলিং করুন। তাঁকে বলুন, এমন চিন্তা ভাবনা ক্ষতি করতে পারে। এমনকী ভবিষ্যতে খুবই খারাপ দিকে যেতে পারে। যখনই সময় পাবেন, এই ধরনের কথা বলুন। তাতেই আশা করা যেতে পারে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।

মনোবল তুঙ্গে থাকলে বহু কঠিন লড়াইও সহজে জেতা যায়। তবে কিছু মানুষ অহেতুক কনফিডেন্সের অভাবে ভুগতে থাকেন। মনোবলের অভাবেই তাঁরা সহজ থেকে সহজতর কাজ করতে পারেন না। এমনকী সবসময়ই নিজের কমফোর্ট জোনে থাকার কথা ভাবেন। এমন ধরনের মানুষদের নেতিবাচক চিন্তা থাকে। তাই দেখুন আপনার স্বামীর কনফিডেন্সের অভাব নেই তো? আর যদি এর অভাব থাকে তাহলে তা বাড়ানোর চেষ্টা করুন।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলাটাই হল বুদ্ধিমানের কাজ। নেগেটিভ কথাবার্তা যদি উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে, তাহলে আর অপেক্ষা করবেন না। বরং তাঁকে নিয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। কয়েক দফা কাউন্সেলিং করার পরই তাঁর সমস্যা কমতে পারে। তাই প্রথম থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করুন। আশা করছি সব সমস্যা সহজেই মিটে যাবে।

শিশুমন বিকাশে আদর্শ প্রি-স্কুল

শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর প্রথম পৃথিবীর আলো দেখা। তারপর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা। হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখা, মনে হাজারো প্রশ্নের আনাগোনা। জলের রং কেন সাদা, গাছের পাতা কেন সবুজ, আকাশ কেন নীল, এটা-ওটা-সেটা— যার উত্তর দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় অভিভাবকদের। আর এর জন্য ধৈর্যও লাগে। বর্তমানে ব্যস্ত জীবনশৈলীর কারণে, কখনও কখনও অভিভাবকদের পক্ষে সেটা সম্ভবও হয় না। তাই জিজ্ঞাসু শিশুমনের বিকাশে প্রি-স্কুল অত্যন্ত জরুরি। গতানুগতিক শিক্ষার আগে প্রি-স্কুল হল শিশুদের জন্য একটু অন্য ধারার স্কুল।

প্রি-স্কুলে কখন পাঠাবেন:

দুই থেকে আড়াই বছর বয়সই হল প্রি-স্কুলে পাঠানোর জন্য উপযুক্ত সময়। ২৫-৩০ বছর আগেও ছবিটা অন্যরকম ছিল। পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হতো বাচ্চারা। স্কুলের উঁচু শ্রেণির ছাত্রদের দেখে ঘাবড়ে যেত অনেক বাচ্চাই। যার প্রভাব পড়ত সবে স্কুলে পা রাখা শিশুদের উপর। আর এই সমস্যার সমাধান হল, প্রি-স্কুল।

সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ২-৬ বছর বয়সটা হল শিশুমনের বিকাশের উপযুক্ত সময়, যখন হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে তাদের মনে। যার সময়োচিত ও সঠিক উত্তর বিকশিত করে তাদের। পরিবারের ছোট্ট ও ব্যস্ত পরিসরে যা সম্ভব হয় না।

কীভাবে বাছবেন:

বাচ্চাদের Pre-School নির্বাচনের সময় নিম্নলিখিত কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত—

শিশুদের নিরাপত্তা: স্কুলের পরিকাঠামোতে শিশুরা কতটা নিরাপদ, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কী কী ব্যবস্থা রয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব: এই দূরত্ব ৩ কিলোমিটারের বেশি যেন না হয়। ৮-১০ কিলোমিটার কিংবা তার বেশি যাতায়াত করতে হলে ছোটোদের পক্ষে তার ধকল সামলানো মুশকিল। আর স্কুল যাতায়াতেও অনেকখানি সময় চলে যাবে। একই সঙ্গে ক্লান্ত হয়ে পড়বে আপনার বাচ্চা।

স্কুল ম্যানেজমেন্ট: প্লে-স্কুল চালানোর ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষ কতটা অভিজ্ঞ, ভর্তির আগে তা অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত। ছোটোদের সঙ্গে একদম ছোটোদের মতোই আচরণ করতে হবে। যার জন্য অনেক ধৈর্য দরকার। অনভিজ্ঞের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। সেই জন্য এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রাউন্ড ফ্লোরেই স্কুল: প্লে-স্কুল গ্রাউন্ড ফ্লোরে হওয়া উচিত। খোলা জায়গা থাকাটা জরুরি। বাচ্চারা খেলতে ভালোবাসে। তার জন্য নানাবিধ ব্যবস্থা আছে কিনা দেখে নেবেন। যেমন ডল হাউস, জু, স্টেজ ইত্যাদি। স্কুলের লন এরিয়া, খেলাধুলোর জন্য ইনডোর ফেসিলিটি আপনার বাচ্চার জন্য উপযুক্ত কিনা— সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন। স্কুল সংকীর্ণ হলে বাচ্চাদের বিকাশ ঠিকমতো ঘটবে না। তাই Pre-School নির্বাচনের আগে এই বিষয়টিকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রাক্তন ছাত্রদের অভিজ্ঞতা: খুব ভালো হয় যদি প্লে-স্কুল নির্বাচন করার আগে প্রাক্তন ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে নিতে পারলে। তাদের অভিভাবকদের থেকে জেনে নিন সংশ্লিষ্ট স্কুল সম্পর্কে। এ ব্যাপারে প্রাক্তন ছাত্র ও তাদের অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

প্লে-স্কুল বা Pre-School প্রয়োজন কেন:

বর্তমানে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি এবং অভিভাবকদের ব্যস্ততা এর অন্যতম কারণ। পরিবারের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ পায় না শিশুরা। যে- শূন্যতা অনেকটাই পূরণ করে প্রি-স্কুল। সমবয়সি অনেক বাচ্চা থাকার ফলে, খেলার সঙ্গী পায় তারা। আর খেলতে খেলতেই শিখে নেয় অনেক কিছু। অনেক জিজ্ঞাসার উত্তর পেয়ে যায় এভাবেই। শিক্ষকরাও থাকেন গাইড করার জন্য। বাচ্চারা নিজেদের মধ্যে অনেক দ্রুত এবং সহজে ইন্টার‍্যাক্ট করতে পারে। এতে শিশুদের মানসিক বিকাশ দ্রুত আর সহজে হয়। বড়োদের সঙ্গে থেকে বা বড়োদের পরিবেশে যা হয় না।

প্রি-স্কুলের বড়ো প্লাস পয়েন্ট হল বাচ্চাদের একসঙ্গে মিলেমিশে থাকা। এর ফলে শিশুরা ফ্রেন্ডলি পরিবেশ পেয়ে থাকে। শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন অ্যাকটিভিটিস করানো হয়, যা ছোটোদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। অল্প বয়সেই পরিণত করে তোলে শিশুদের। প্লে-স্কুলের পরিবেশ, ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে দেওয়া সম্ভব নয় অভিভাবকদের পক্ষে। আর প্লে-স্কুল থেকে যখন শিশুরা ফর্মাল স্কুলে পা রাখে, অভিভাবকদের সমস্যায় পড়তে হয় না। এমনকী খুব অল্প বয়সে স্কুলের সঙ্গে পরিচিতির ফলে, বাচ্চারাও সহজেই মানিয়ে নিতে পারে ফর্মাল স্কুলে।

অভিভাবকদের সুবিধা:

শহরকেন্দ্রিক জীবনে বাবা-মা উভয়েই কাজে ব্যস্ত থাকে। তবে শুধু শহর নয়, আজকাল শহরতলি এলাকাতেও এই ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। তাই দু’-আড়াই বছরের বাচ্চাকে প্রি-স্কুলে পাঠিয়ে অভিভাবকরা অনেকটা নিশ্চিন্ত হতে পারে।

বাচ্চারা যাতে নিজেরাই খেলার ছলে শিখে নিতে পারে, সেই ধরনের অ্যাকটিভিটিস রাখা হয়। তাছাড়া স্কুলের অন্য বাচ্চাদের দেখাদেখি শেখার, জানার আগ্রহ তৈরি হয়। বাড়িতে খাওয়া নিয়ে সমস্যা হলেও, স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে সহজেই খেয়ে নেয় বাচ্চারা। আসলে সমবয়সিদের সঙ্গে খেলতে, থাকতে, কথা বলতে ভালোবাসে শিশুরা। এই স্কুলে ব্যবহারিক দিকগুলিও শেখানো হয়। বড়োদের সঙ্গে কী করে কথা বলবে, কীভাবে তাদের সম্মান করবে এবং আরও অন্যান্য শিষ্টাচার। যে-শিক্ষা পরবর্তী জীবনে সঠিক দিশা দেখায় শিশুদের।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা ক্ষতিকারক

সন্তানদের নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা শাসনে রাখা এখন মুশকিল হয়ে উঠছে অভিভাবকদের কাছে। সংবাদ মাধ্যমে খবর দেখেশুনে জ্ঞান অর্জন করা আর লাগামছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও কিছু দেখে শেখার বিষয়টি এক নয়। অথচ আজকের প্রজন্ম তাই শিখছে। ভালো কিছুর থেকে তারা এখন নানারকম অশ্লীল ভিডিয়ো দেখার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে মুঠোফোনের মাধ্যমে। তাই, অনেক ছোটো থেকেই যুবক-যুবতিদের মধ্যে মানসিক সম্পর্কের থেকে বেশি গড়ে উঠছে শারীরিক সম্পর্ক। এক্ষেত্রে তাদের নজরে রেখে সঠিক ভাবে শাসন করতে না পেরে অনেক অভিভাবক অসহায় বোধ করছেন। আর তাই ক্রমশ বাড়ছে খুন এবং আত্মহত্যার ঘটনা।

প্রেমে ব্যর্থতার কারণে মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এই সব ঘটনা ছড়িয়ে পড়তে থাকায় যুবসমাজ আরও মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। সবথেকে মর্মান্তিক বিষয় হল এই যে, খবরের কাগজ কিংবা টিভি চ্যানেল-এ খবর প্রকাশ করা হয় নাম-ধাম না প্রকাশ করে কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কেউ এসবের কোনও তোয়াক্কা করে না। নাম, ঠিকানা, এমনকী যোগাযোগের নম্বর পর্যন্ত পোস্ট করা হয়ে থাকে এবং এটা ফরওয়ার্ড হতে থাকে।

প্রেমের শুরুতে প্রেমিক-প্রেমিকা কেউ কারও ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে না কিংবা বায়োডাটাও নেয় না। কেউ মেন্টাল হেলথও চেক করে না। কিন্তু প্রেম যখন পরিণতির দিকে এগোয়, তখন শুরু হয় খোঁজখবর। জাতপাত, ধর্ম, আয় কিংবা পারিবারিক সবকিছুর খোঁজখবর নিতে শুরু করে প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়েই। অথচ প্রেমটা শুরু হয়েছিল শুধু মুখের হাসি দিয়ে আর প্রেম পাকাপোক্ত হয়েছিল হোয়াটস অ্যাপ-এর মাধ্যামে হাজারো, লাখো মিষ্টি প্রেমের কথা লিখে!

দীর্ঘদিন প্রেমপর্বের পর প্রেমিকা তার প্রেমিককে বাড়ি নিয়ে গিয়ে দেখা করায় মা- বাবার সঙ্গে। এক্ষেত্রে ছেলেটির সবকিছু জেনেবুঝে নিয়ে তাকে যদি জামাই হিসাবে মেনে নেন মেয়েটির মা-বাবা— তাহলে সমস্যা নেই, নয়তো শুরু হয় বিভ্রাট। মেয়ের প্রেমিককে যদি ঠিকঠাক মনে না হয়, তাহলে অনেক মা-বাবা মেয়েকে বুঝিয়েসুঝিয়ে প্রেমিকের থেকে আলাদা করে দেন। আর যারা তা পারেন না, তাদের ক্ষেত্রে শুরু হয় সংঘাত।

আসলে প্রেমিক-প্রেমিকার মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার বিষয়টি ঘটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের বোকামির জন্য। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান তারা, অর্থাৎ যারা মানুষ করার চেষ্টায় ছিলেন সেই সব মা-বাবা। আর আজকাল এই সব মর্মান্তিক পরিস্থিতির জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। রিলেশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরা হয় এবং প্রেমে বিফল হলে খারাপ পথে চালিত করার অনেক ইন্ধনও আসে ওই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই!

একটা ঘরে ফেরার গল্প (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

অর্জুন কে চুপ হয়ে যেতে সাঞ্ঝা আবার প্রশ্ন করল, ‘কেন স্কুল থেকে পালালে?’

—যার বাপ-মা নেই, সে তো অনাথ। অনাথের আবার ঘর কীসের! পরিবার কীসের! বাপ-মায়ের পদবি, নিজের নাম থেকে মুছে দিলাম। ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছোলাম এই হাওড়া স্টেশনে। সাথে ছিল আমার স্কুলের বইপত্র ভর্তি একটা স্কুলব্যাগ। রাতে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে একা একা বসে, সেই বইগুলো পড়তাম। খিধে পেলে এর ওর কাছ থেকে খাবার চাইতাম। কেউ কেউ কুকুরের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। কেউ আবার দয়া পরবেশ হয়ে আধ-খাওয়া খাবার ছুড়ে দিত। ধীরে ধীরে রেল পুলিশ থেকে শুরু করে, অনেক নিত্যযাত্রী, শিক্ষক, অধ্যাপকদের নজরে পড়লাম আমি। আসা যাওয়ার পথে, তাদের অনেকেই যেচে এসে আমার সাথে কথা বলতেন। পড়াশোনা করে, পরীক্ষা দিয়ে, বড়ো হয়ে যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি, তার জন্য উৎসাহ দিতেন তাঁরা। এইরকমই একজনের অনুপ্রেরণায়, উদ্যোগে ন্যাশনাল ওপেন স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করলাম। মাঝেমধ্যে হাওড়া স্টেশনে কোনও গণ্ডগোল হলে, পুলিশের তাড়া খেয়ে, কলকাতার দিকে পালিয়ে যেতাম। তখন কোনওদিন ধর্মতলায় মেট্রো-সিনেমার নীচে, কোনওদিন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের সামনের ফুটপাথে শুয়ে রাত কাটাতাম। এইরকম ভাবে চলতে চলতে একদিন মুক্ত-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিয়ে গ্রাজুয়েট হয়ে গেলাম। ইতিহাসে মাস্টার্স কমপ্লিট করলাম। বড়ো এক সরকারি অফিসারের পরামর্শে কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসারের চাকরির পরীক্ষায় বসলাম। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, কলকাতার এক অফিসে অফিসার হিসাবে নিযুক্ত হলাম। কিন্তু হাওড়া স্টেশনের এই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যেতে মন চায়নি কোনওদিন। গত তিন বছর ধরে, এদেরকে নিয়েই আছি এইখানে। আমাকে নিয়ে মোট একুশজনের বাস এখানে। তুমি থাকতে চাইলে, আমরা বাইশজন হব…!

ওর পোষ্যদের সারাদিনের দায়িত্ব শ্রাবণী, বিল্টু আর সাঞ্ঝা’র উপরে চাপিয়ে দিয়ে, এর পরে আরও বছর তিনেক বেশ নিশ্চিন্তে কলকাতায় তার অফিস-কাছারির কাজ সামাল দিয়েছে অর্জুন। রোজ সন্ধ্যায় প্ল্যাটফর্মে ফিরে এসে হ্যাজাক জ্বেলে পোষ্যদের নিয়ে যথারীতি রাতস্কুল চালিয়েছে সে। ইত্যবসরে শ্রাবণী যেমন হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে, সাঞ্ঝাও মুক্ত-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিয়ে গ্রাজুয়েট হয়েছে। বিল্টু আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে বলে কোমর বেঁধে লেগে পড়েছে। কিন্তু অর্জুনের মাথায় ঘুরছে, আরও অনেক বড়ো পরিকল্পনা। গত এক বছরে অফিসের বড়ো কর্তাদের কাছে বেশ কয়েকটা চিঠি দিয়েছে সে— রাঁচি শহরে তার ‘বদলি’ প্রার্থনা করে।

নতুন বছরের শুরু থেকেই শ্রাবণী, সাঞ্ঝা ও অর্জুন— তিনজনের মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে; বিল্টুকে দিয়ে যে করেই হোক মাধ্যমিকে ভালো ফল করাতেই হবে। সেই দিনটা ছিল, বিল্টুর মাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ দিন। বিল্টুকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে, অর্জুন অফিসে ঢুকতেই, বড়োকর্তা অর্জুনের হাতে ওর বহু-প্রার্থিত ‘রাঁচি-বদলির’ অর্ডারটা ধরিয়ে দিলেন।

অগত্যা রাঁচি যাওয়ার আগে, শ্রাবণী, বিল্টু আর সাঞ্ঝার উপর তার পোষ্যদের দেখাশোনার সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে, অর্জুন ওদেরকে জানাল, ‘সামনে আমাদের অনেক বড়ো দায়িত্ব পালনের জন্য তৈরি থাকতে হবে। এখন সবার আগে আমাকে রাঁচিতে গিয়ে চাকরিতে জয়েন করতে হবে। তারপরে আমার সব পরিকল্পনার সার্থক রূপায়ণ করতে পারলেই, এখানে ফিরে এসে তোদের সবাইকে নিয়ে রাঁচি চলে যাব। ততদিন তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের এই রাত-স্কুল চালানোর সব দায়িত্ব তোদের উপরেই রইল।”

এর প্রায় বছর খানেক বাদে, একদিন ঝাড়খণ্ডের রাজরাপ্পার মন্দিরে ছিন্নমস্তা দর্শন সেরে, অর্জুনের কলকাতা অফিসের প্রাক্তন বড়োকর্তা অম্বরীশবাবু ট্রেকারে করে, রামগড় সদর মোড়ে এসে নামলেন। সেখান থেকে ট্রেকার পালটে রাঁচি যেতে হবে। ট্রেকার স্ট্যান্ডে পৌঁছে, রাঁচি যাওয়ার একটা ট্রেকারে উঠে বসতেই, অম্বরীশবাবুর সাথে অর্জুনের দেখা হয়ে গেল।

অর্জুনই প্রথমে কথা বলল, ‘স্যার, আপনি এখানে?’

—এই তো কাল এসেছি এখানে। রাজরাপ্পা গিয়েছিলাম; ছিন্নমস্তা দর্শনে। আজ রাতেই রাঁচি থেকে হাওড়া যাওয়ার ট্রেন ধরব। কিন্তু তুমি এখানে কী করছ? তোমার তো এখন রাঁচিতে থাকার কথা, অম্বরীশবাবু জানতে চাইলেন অর্জুনের কাছে। অর্জুন এই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে, তার পাশে বসা দুই মহিলার সাথে অম্বরীশবাবু’র পরিচয় করিয়ে দিল।

—এদের কথা আপনাকে আমি আগে অনেকবার বলেছি; আজ এদের সাথে দেখা হয়ে গেল আপনার। এর নাম শ্রাবণী, আর এ হচ্ছে সেই সাঞ্ঝা। আপনি তো জানেন, ও ভুটকি গ্রামের মেয়ে। সেই ভুটকি গ্রামে একটা বাড়ি বানিয়ে, সেখানে মেয়েদের একটা স্কুল চালু করেছি। সেটা এখন সাঞ্ঝাই চালায়। আশপাশের গ্রাম থেকে আপাতত জনা পঞ্চাশেক ছাত্রী পাওয়া গিয়েছে। ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে সকলের। সাঞ্ঝাকে ফিরে পেয়ে, শুধু ওর পরিবার নয়, গোটা মহকুমার মানুষ উল্লসিত, গর্বিত। বিডিও, মহকুমা শাসক থেকে শুরু করে জেলা শাসক পর্যন্ত, সকলেই সাঞ্ঝার এই ঘুরে দাঁড়ানোকে, ওর এই কৃতিত্বকে সাধুবাদ জানিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

অর্জুনের কথা শুনে অম্বরীশবাবু’র চোখেমুখে খুশির ঝলক। অর্জুনের কাঁধে হাত রেখে তিনি বললেন, “বাঃ! এ তো দারুণ খবর! তবে এ তো গেল সাঞ্ঝার কথা। শ্রাবণী কী করছে এখন?”

—এই রামগড়ে আপাতত একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে, অনাথ শিশুদের সেখানে রেখে, তাদের পড়াশোনার একটা বন্দোবস্ত করেছি। তবে আমি আমার অফিস সামলে, ওদের দেখাশোনা করার জন্য কতটুকুই বা আর সময় পাই! অনাথ আশ্রমের সবটা শ্রাবণী’ই দেখাশোনা করে।

—আর তোমার হাওড়া স্টেশনের পোষ্যদের কী খবর? তাদেরকে তুমি রামগড়ে নিয়ে এসেছ না-কি!

—না, না! ওরা ওদের জায়গাতেই আছে। প্রতি শনি-রবিবার দুটো দিন হাওড়া স্টেশনের তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের পোষ্যদের কাছে ছুটতে হয় আমাকে। সারা সপ্তাহ ধরে বিল্টুই ওদের দেখাশোনার দায়িত্ব সামলায়। তবে সম্প্রতি ও আবার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আগামী বছর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে সে। ওর পরীক্ষা হয়ে গেলে, ওদের সবাইকে রামগড়েই নিয়ে আসার কথা ভাবছি। কিন্তু এতজনকে রাখতে গেলে, নিজেদের একটা বড়ো বাড়ি হলে ভালো হয়।

কথা বলতে বলতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে অর্জুন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে আবার কথায় ফিরে আসে সে, ‘এই দেখুন, কথা বলতে বলতে আসল লোকের সাথেই তো আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিতে ভুলে গিয়েছি। এ হচ্ছে, আমাদের সেই শান্তা। ও এখন এখানকার স্থানীয় একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস থ্রি’তে পড়ছে। এই রামগড়ের আশ্রমে, শ্রাবণীর হেফাজতেই থাকে ও। শান্তা এখনও একই রকমের শান্ত। তবে ও শুধু আমাকে জানিয়েছে যে, ও বড়ো হয়ে ডাক্তার হতে চায়।’ শান্তাকে আদর করতে করতে অম্বরীশবাবুর সঙ্গে শান্তারও পরিচয় করিয়ে দিতে ভুলল না অর্জুন।

সকলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পরে, মুখে একগাল হাসি নিয়ে, অম্বরীশবাবু অর্জুনের কাছে জানতে চাইলেন, “কিন্তু এই ছুটির দিনের সকালে, এমন সদলবলে তুমি কি হাওড়ায় চললে না-কি?’

না, না, এই সপ্তাহে আমার আর হাওড়া যাওয়া হচ্ছে না। তবে আমার বদলে এই সপ্তাহে শ্রাবণী হাওড়া যাচ্ছে আজ। দু’দিন থেকে, পরশু দিন ফিরে আসবে ও।

অর্জুন আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে, অম্বরীশবাবু ফিরে জানতে চাইলেন, “তাহলে তুমি চললে কোথায়!”

—সম্প্রতি দাদু’র সাথে চিঠির আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। সেই সূত্রেই জানলাম, ইদানীং দাদুর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। দাদুকে আমার বর্তমান কর্মকাণ্ডের কথা সব জানিয়েছি!

—সব! অম্বরীশবাবু’র গলায় এবার অন্য রকমের সুর!

—হ্যাঁ, সব! তাই দাদুর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে, দীর্ঘদিন বাদে আজই প্রথম ঘরে ফিরতে চলেছি আমি। অম্বরীশ চ্যাটার্জীর সাথে কথা বলতে বলতে মুচকি হেসে এবার সাঞ্ঝার দিকে একবার তাকাল অর্জুন!

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব