অভিনেত্রী রুক্মিণী বসন্ত-র ফিলমি সফর (পর্ব-০১)

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘কান্তারা চ্যাপ্টার ১’-এ রাজকুমারী কনকাবতীর ভূমিকায় দেখা গিয়েছে সুন্দরী অভিনেত্রী রুক্মিণী বসন্ত-কে এবং এই ছবিতে দারুণ অভিনয় করে তিনি দর্শকচিত্ত জয় করে নিয়েছেন। রুক্মিণী বসন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রের এমন এক উজ্জ্বল প্রতিভা, যিনি এখনও পর্যন্ত কন্নড়, তেলুগু এবং তামিল ভাষার ছবিতে কাজ করে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন।

লন্ডনের ‘রয়্যাল আকাদেমি অফ ড্রামাটিক আর্ট” অর্থাৎ আরএডিএ থেকে অভিনয় প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর, রুক্মিণী বসন্ত ২০১৯ সালে কন্নড় ছবি ‘বীরবল ট্রিলজি’ দিয়ে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু রুক্মিণীর পরিচিতি বাড়ে ২০২3 সালে তাঁর পরবর্তী মুক্তিপ্রাপ্ত কন্নড় ছবি ‘সপ্ত সাগরদাচে এল্লো সাইড এ অ্যান্ড বি’-র মাধ্যমে, যেখানে রুক্মিণী প্রিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন। এই ছবিতে রুক্মিণীর অসাধারণ অভিনয় শুধু সমালোচকদের প্রশংসাই অর্জন করেনি, পাশাপাশি তাঁকে দিয়েছে সেরা ‘কন্নড় ফিল্মফেয়ার ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড”।

দক্ষিণী ছবিতে অভিনয় এবং পুরস্কার জেতার পাশাপাশি, রুক্মিণী ‘বানা দারিয়াল্লি’, ‘বাঘিরা’, ‘ভৈরথি রানাগল’-এর মতো বহুভাষিক সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। রুক্মিণী শুধু তাঁর চলচ্চিত্রের জন্যই খবরে থাকেন না, বরং তাঁর অসাধারণ সৌন্দর্যের কারণে সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন জাতীয় আইকনও হয়ে উঠেছেন।

‘কান্তারা চ্যাপ্টার ১’-এর নায়িকা রুক্মিণী বসন্ত তাঁর অ্যাক্টিং কেরিয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ‘গৃহশোভা’-কে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে। ১৫ বছর বয়সে কীভাবে তিনি তাঁর অভিনয় সফর শুরু করেছিলেন, তাঁর পরিবার তাঁকে কতটা সাপোর্ট করেছিল, রুক্মিণী কোন পরিবারের সদস্য এবং বলিউডি ছবিতে অভিনয়ের বিষয়ে তাঁর কী বক্তব্য, সবকিছুই রুক্মিণী জানিয়েছেন অকপটে।

রুক্মিণী বসন্তের অভিনয় সফরের কাহিনি তাঁর নিজের বয়ানে—

আমার জন্য এটা ছিল প্রশিক্ষণ সফর

‘কান্তারা চ্যাপ্টার ১” আমার কাছে বিশেষ একটি ফিল্ম, কারণ এই ফিল্মটি আমার কাছে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের চেয়ে কম কিছু নয়। আসলে, এই ছবির শুটিংয়ের সময় আমি তলোয়ার চালানো, ঘোড়ায় চড়া এবং নৃত্যে বৈচিত্র্য ইত্যাদি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। এই ছবির শ্যুটিংয়ের সময় কিছু দৃশ্য খুব কঠিন ছিল আমার কাছে, আবার কিছু দৃশ্য স্মরণীয় হয়ে আছে। এই ছবিতে কাজ করার সময়, আমি প্রতিদিন নতুন কিছু শিখতাম। এই ছবির অভিনেতা, পরিচালক এবং লেখক ঋষভ শেট্টি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আমি তাঁকে অসাধারণ প্রতিভাধর মনে করি, কারণ শুটিংয়ের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে আমি দক্ষতার সঙ্গে মনোনিবেশ করতে দেখেছি। এই ক্ষমতা সবার থাকে না। তাছাড়া, ঋষভ একজন ভালো মানুষ এবং খুব সহজ সরল। তাই তাঁর সঙ্গে কাজ করার সময় আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। এই ছবিতে আমি রাজকুমারী কনকাবতীর চরিত্রে অভিনয় করেছি, যে খুবই সাহসী এবং শিল্পপ্রেমী। এই চরিত্রে অভিনয় করা আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং এবং মজাদার ছিল, যে কারণে ‘কান্তারা চ্যাপ্টার ১’ আমার জন্য সবসময় স্পেশাল ফিল্ম হয়ে থাকবে।

এই প্রসঙ্গে জানাই, আমার পরিবারই আমার শক্তি। নম্রতার পাশাপাশি, আমি শিল্প ও সেবার চেতনা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি। আমার বাবা কর্নেল বসন্ত বেণুগোপাল সেবা, বন্ধুত্ব এবং ত্যাগের জন্য অশোক চক্রে সম্মানিত হয়েছেন। আমার মা সুহাসিনী বসন্ত একজন ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী। আমার মা, যিনি একজন নিয়মানুবর্তিতাপ্রিয় এবং শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগী। অভিনয়ের জন্য তিনিই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তাঁর প্রেরণা-ই আমাকে শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল এবং ১৫ বছর বয়স থেকেই আমি অভিনয় এবং অন্যান্য শিল্পকলার সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে যাই।

আমার অভিনয় সফরের শুরুটা ছিল মজার

আমি তখন কোনও অভিনয় কোর্স না করেও, মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করি। মায়ের উৎসাহে আমার মনের কোথাও একটা ইচ্ছা জাগছিল যে, আমি অভিনয়ের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শিখি। কিন্তু যেহেতু আমি অভিনয়ের কোনও প্রশিক্ষণ তখনও নিইনি, তাই এই ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। তারপর একদিন আমি আমার মা- কে বললাম যে, ঘরে বসে আমার বিরক্ত লাগছে এবং আমি নতুন কিছু করতে চাই। আমি যেহেতু অভিনয়ে আগ্রহী, তাই অন্তত আমাকে থিয়েটার ক্লাসে ভর্তি করাও। আমার ইচ্ছেকে বাস্তবায়িত করার জন্য আমার মা আমাকে থিয়েটার ক্লাসে ভর্তি করিয়েছিলেন।

যেহেতু আমি আগেই ধ্রুপদী ব্যালে নৃত্য এবং ভরতনাট্যমে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম, তাই অভিনয়ের ক্ষেত্রটা আমার জন্য আরও সহজ এবং আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আমি নৃত্যের মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের শিল্প জানি। কিন্তু থিয়েটারের মাধ্যমে, আমার অভিনয় ভাষা পায়। থিয়েটারে অভিনয় প্রশিক্ষণের পর আমি শব্দ এবং মুখভঙ্গীর মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের কৌশল শিখেছি। হৃদয়ের অনুভূতিগুলোকে সামনে এনে মুখের ভাবের সঙ্গে শব্দের মিশ্রণ অভিনয়ের জন্ম দেয়, যা আমি থিয়েটারে শিখেছি। থিয়েটার ক্লাসে অভিনয় শিক্ষা শুরু করার পর, আমি লন্ডনের আরএডিএ অ্যাক্টিং ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই। সেখানে আমি থিয়েটার, মিউজিক্যাল থিয়েটার এবং সিনেমার বিষয়ে পড়াশোনা করি। আর প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণ করার পর, আমি সেরা অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভারতে ফিরে আসি। আমার লক্ষ্য ছিল সিনেমা জগতে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করা এবং তা আমি কিছুটা হলেও করতে পেরেছি বলে মনে হয়।

আমার প্রথম ছবিবীরবল ট্রিলজিসম্পর্কে

ভারতে আসার পর, আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করার চেষ্টা করা, যার জন্য আমি অডিশন দিচ্ছিলাম। আমি একইসঙ্গে মডেলিংও করতাম। তারপর একজন কাস্টিং ডিরেক্টর-এর সঙ্গে দেখা করি। আমি তাকে বলি যে, আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহী। এরপরই ‘বীরবল ট্রিলজি’ ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পাই। যেহেতু এটি আমার অভিনয়ের প্রথম সুযোগ ছিল, তাই আমি যেমন খুশি ছিলাম, তেমনই নার্ভাসও ছিলাম কিছুটা।

কিন্তু আমি আসল স্বীকৃতি পেয়েছি ২০২3 সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সপ্ত সাগরদাচে সাইড এ অ্যান্ড বি’ ছবির মাধ্যমে। এই ছবির জন্য আমি সেরা অভিনেত্রী হিসেবে কন্নড় ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছি। এই ছবির জন্য, আমি ‘কান্তারা চ্যাপ্টার ১’-এর মতো একটি বড়ো ব্যানার-এর সিনেমায় অভিনয়ের অফারও পেয়েছি। আমি কখনও কল্পনাও করিনি যে, আমাকে এত বড়ো ছবির অফার দেওয়া হবে। কিন্তু যখন এটা ঘটল, তখন আমার আনন্দের সীমা ছিল না।

( ক্রমশ )

বনদেবী (পর্ব-০১)

সামনের বড়ো পিয়াল গাছটার সবুজ পাতার ফাঁকে ভোরের আলোয় হলুদ রঙের পাখিটা এ-ডাল ও ডাল করে বেড়াচ্ছে। চারদিক থেকে ভেসে আসছে আরও নানান পাখির ডাক। এখানে আসার আগে যতটা মন খারাপ হয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলে এমন স্বর্গীয় জীবন কলকাতায় কোথাও পেতাম না। একচিলতে ঘরের ছোটো খাটিয়াতে শুয়ে ঘুম ভাঙা চোখে সামনের খোলা জানলাটার দিকে চেয়ে এসবই ভাবছিলাম। আরএফও হিসেবে প্রথম পোস্টিং, এই পিয়ালবনীর জঙ্গলে। তারপর থেকে গত এক মাস হল এই ছোটো বন-বাংলোটাই আমার ঠিকানা৷

হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজে আমার হুঁশ ফেরে। রান্নার ঠাকুর এসে গেছে। সামনের দেয়ালে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আটটা বাজে। আজ অনেকটাই দেরি হয়ে গেল, ঘুম ভাঙার পরেও অলস শুয়ে থেকে। পিয়ালবনীর পূর্বদিকের বিশাল মাঠে আজ বৃক্ষরোপণ চলছে। একবার সেখানে ভিজিট করতে হবে। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে এসে বাইরের দরজা খুলে ঠাকুরমশাইকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিলাম। এবার ঠাকুরমশাই রান্নাঘরে আর আমি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লাম।

হুড খোলা জিপ গাড়িটা বনের সরু রাস্তা ধরে চলেছে। এখান থেকে পিয়ালবনীর পূর্বদিকের মাঠটার দূরত্ব অল্পই। দেড় কিলোমিটারের মতো হবে। এই জঙ্গলটা পেরোলেই মাঠের একপাশে সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম পিয়ালবনী। ওই গ্রামের নারী- পুরুষদেরই গাছ লাগানোর কাজে লাগানো হয়েছে।

গাড়িটা মাঠের একপাশে এসে দাঁড়াতেই কাজের দেখভাল করা বনকর্মী ও অন্যান্য সকলের মধ্যে একটা বাড়তি তৎপরতা লেগে গেল। গাড়ি থেকে নেমে সবকিছু নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। বনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বুঝে নিচ্ছিলাম সব কিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা। এমন সময় এক আদিবাসী ভদ্রলোক, বয়স আন্দাজ ৫০-৫৫-এর মধ্যে হবে, সামনেই একটা গাছ লাগিয়ে কোদালে করে মাটি দিচ্ছিল গোড়ায়। কোদালটা ছেড়ে ঘাড় নিচু করে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। কিছু একটা বলতে চাইছেন বোধহয়। এটা লক্ষ্য করে বললাম, ‘কিছু বলবেন আমাকে?’

নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘হ বাবু, আমার বিটির বিহা আসচে শুকুর বারে, তাই…’

ওনার কথাটাকেই কেড়ে নিয়ে বনকর্মী অজিত বাগদি বলে উঠল, ‘স্যার, এ হল সনাতন সরেন। ওর মেয়ের বিয়ে, তাই আমাদের সকলকে নেমন্তন্ন করছে।’

হেসে সনাতনবাবুকে বললাম— ‘চিন্তা করবেন না, একেবারে ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।’

এরা মাটির মানুষ। এমন সহজ সরল অকৃত্রিম মুখগুলো দেখলেও মনের মধ্যে এক প্রশান্তি আসে।

বাংলোয় ফিরতে বিকেল চারটে বেজে গেল৷ ঠাকুরকে কড়া করে একটু লাল চা করতে বলে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বাংলোর সামনের একফালি ফাঁকা জায়গাতে একটা চেয়ার নিয়ে বিকেলের সময়টা চায়ে চুমুক দিয়ে আর মোবাইল খুলে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে কাটাই। এখানেই একটু আধটু নেট পাওয়া যায়, তাও প্রচুর স্লো। ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলে নেট-এর কানেকশন আসে না। চারদিকে ঘন জঙ্গল, সামনের দিকে একটু দূরেই বন ফুঁড়ে একটা কালো সাপের মতো সরু পাকা রাস্তা চলে গেছে। ওই রাস্তার ধারেই চাঁদু মুর্মুর একমাত্র চা, পান, বিড়ি, সিগারেটের দোকান। ওখানে গিয়েও মাঝে মাঝে বসি। চা সিগারেট পান করতে করতে চাঁদুর মুখে ওদের গল্প শুনি। তেমন কোনও আর্জেন্ট ডিউটি না থাকলে বিকেলটা এভাবেই কেটে যায়।

—বাবু, অন্ধকার নেমে আইচে, আর বাইরে থাকাটা ঠিক হবেক নাই। ঘরের ভিতরে আইসেন।

ঠাকুরের ডাকে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম চারিদিকে বেশ অন্ধকার নেমে এসেছে। ঘড়িতে সবে পাঁচটা পঞ্চাশ। অথচ কী অন্ধকার! এখানে বিকেল বেলাতেই ঘন সন্ধ্যা নামে, আর সন্ধ্যা সাতটায় মনে হয় যেন গভীর রাত্রি গিলে খেয়েছে চারদিক। না, এখানে আর বসা ঠিক হবে না। সাপ তো আছেই, তার সঙ্গে ছোটোখাটো বন্য জন্তুরও অভাব নেই।

আজ সকাল থেকেই প্রচুর বৃষ্টি। কোথাও বেরোনো হবে না। ঠাকুরও আজ আসেনি, মেয়ের বাড়ি যাবে বলে কালকেই ছুটি নিয়ে গেছে। অগত্যা নিজেকেই ভাত আর আলুসেদ্ধ করে নিতে হচ্ছে। চাল আর আলু একসঙ্গে জলে ফুটতে দিয়ে গুনগুন করতে করতে দরজা খুললাম বাইরের বৃষ্টি উপভোগ করব বলে। দরজা খুলেই দেখি একটি যুবতি মেয়ে কার্নিসের ধার ঘেঁষে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার শাড়ির বেশির ভাগ অংশই ভিজে গেছে। এভাবে থাকলে বৃষ্টির ছাঁটে পুরো ভিজে যাবে ভেবে, ঘরের ভিতরে বসতে বললাম। মেয়েটি অতি সংকোচে আমার কথায় ভিতরে এল বটে, কিন্তু সেই জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এখন মেয়েটিকে আমি ভালো ভাবে দেখলাম। হলুদ জমির উপর লাল ডোরা কাটা শাড়ি। নীল ব্লাউজ। শ্যামলা রঙের গায়ে হীরের গুঁড়োর মতো জমে আছে জলের ফোঁটা। মুখের উপর এক আশ্চর্য সরলতা দিয়ে যেন সৌন্দর্যের আলপনা আঁকা আছে। ওকে দেখে মনে হল বৃষ্টিভেজা বনফুল। একটা চেয়ার টেনে ওর দিকে বাড়িয়ে বললাম, ‘বসো’।

(ক্রমশ…)

মহিলাদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য চাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস

কৈশোরের প্রথম হরমোনজনিত পরিবর্তন থেকে শুরু করে গর্ভাবস্থা, মধ্যবয়স এবং মেনোপজ— প্রতিটি ধাপেই আলাদা শারীরবৃত্তীয় চাহিদা তৈরি হয় মহিলাদের শরীরে। এই পরিবর্তনগুলো বিপাকক্রিয়া, হাড়ের শক্তি, হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য, প্রজনন ক্ষমতা এবং দেহের গঠনকে প্রভাবিত করে। ক্রমবর্ধমান গবেষণা থেকে প্রমাণিত যে, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে মহিলারা এই পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেন। এই বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে আলোকপাত করেছেন ডায়েটিশিয়ান ও ওয়েলনেস কনসালট্যান্ট নীলাঞ্জনা সিংহ।

হরমোনের ভারসাম্য, প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এবং কোষের বার্ধক্যকে প্রভাবিত করে প্রতিদিনের খাবারের নির্বাচন, যা শেষ পর্যন্ত শক্তির মাত্রা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নির্ধারণ করে।

Dietician and Wellness Consultant Nilanjana Singh
Dietician and Wellness Consultant Nilanjana Singh

কৈশোর, প্রজননকাল, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজ— এই সময়গুলিতে হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে পুষ্টির চাহিদাও বদলে যায়। শৈশব ও কৈশোর হাড়ের ভর ও বিপাকীয় শক্তির ভাণ্ডার গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, যা ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগ ও বিপাকজনিত ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে। তাই পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, ভিটামিন এবং সুষম ফ্যাট গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। প্রজননকালে যথেষ্ট প্রোটিন, ফাইবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস প্রজনন ক্ষমতা ও হরমোনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থায় প্রোটিন, আয়রন, ফলেট, ভিটামিন বি, ক্যালসিয়াম ও জিঙ্কের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, যা মা ও ভ্রূণের সুস্থ বিকাশে সহায়ক। মেনোপজের পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হৃদ্‌রোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে, তাই এই সময়ে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণ বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

শক্তি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

অনেকেই মনে করেন, শক্তির মাত্রা সরাসরি ক্যালোরি গ্রহণের ওপর নির্ভর করে, কিন্তু এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। শক্তি উৎপাদন কিংবা তার কার্যকর বিপাক শুধু ক্যালোরির ওপর নয়, বরং খাদ্যের পুষ্টিগুণের ওপর নির্ভর করে, যা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সরবরাহ করে। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রোটিন পেশির ভর রক্ষা করে, রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সহজে শোষিত আয়রন অক্সিজেন পরিবহন ও কোষীয় শ্বাস-প্রশ্বাসে সাহায্য করে। আয়রনের ঘাটতি ক্লান্তি, সহনশক্তি হ্রাস এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। ভারতে ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5) অনুযায়ী, প্রজননক্ষম বয়সি মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার এখনও বেশি, যা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতির দিকটি স্পষ্ট করে। অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক খাদ্যাভ্যাসের কারণে নারীরা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কম পরিমাণে গ্রহণ করেন, যা সময়ের সঙ্গে এই ঘাটতি বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্তি, অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা এবং বিপাকীয় ক্ষমতা কমে যায়।

ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্টের বাইরে, খাদ্যের বৈচিত্র্য, বিশেষত উদ্ভিদজাত খাবার, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং জীবনধারাজনিত রোগ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। ফল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম ও বীজে থাকা পলিফেনল ও ক্যারোটিনয়েড অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এই খাবার গুলির বায়োঅ্যাকটিভ উপাদান রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে, কোষকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও বিপাকজনিত বিপদের ঝুঁকি কমায়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস উন্নত বিপাকীয় সূচক, কম ভিসারাল ফ্যাট এবং সুস্থ বার্ধক্যের সঙ্গে যুক্ত।

ফ্যাট, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা

খাদ্যতালিকার ফ্যাট হরমোন ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ার ফলে লিপিড প্রোফাইল খারাপ হতে পারে এবং প্রদাহ বাড়তে পারে। ২০২১ সালে দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে মহিলাদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদ্‌রোগ, বিশেষত মধ্যবয়সের পরে। তাই খাদ্যতালিকায় ফ্যাটের গুণগত মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসম্পৃক্ত ফ্যাট এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ তেল স্বাস্থ্যকর লিপিড প্রোফাইল বজায় রাখতে, রক্তনালীর কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

সাধারণভাবে ব্যবহৃত ভোজ্য তেল, যেমন— জলপাই, পাম, রাইস ব্রান, তিল ইত্যাদি যেগুলিতে টোকোট্রিয়েনল ও ক্যারোটিনয়েডের মতো প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করলে উপকারী বায়ো-অ্যাকটিভ উপাদান সরবরাহ করে। বিটা-ক্যারোটিনের মতো ভিটামিন A-এর পূর্বসূরি উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি এবং প্রজনন স্বাস্থ্যে সহায়ক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন অঞ্চলে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে ভিটামিন A-এর ঘাটতিকে একটি বড়ো সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি ও ভ্রূণের জটিলতার সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভাবস্থার ফলাফল ও হরমোনের ভারসাম্যও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দ্বারা প্রভাবিত হয়। অতিরিক্ত ফ্রি র‌্যাডিক্যাল প্লাসেন্টার কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে এবং ভ্রূণের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া কিংবা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এর সমাধান হল— উদ্ভিদজাত উৎস থেকে পর্যাপ্ত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গ্রহণ করা, যা এই অক্সিডেটিভ চাপ কমাতে সাহায্য করে। এসব পুষ্টি উপাদান কোষের অখণ্ডতা রক্ষা করে এবং হরমোনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

মহিলাদের হাড়ের স্বাস্থ্যের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। বয়স বাড়লে এবং ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় হাড়ের ক্ষয় দ্রুত বাড়ে। পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিন K-এর মতো সহায়ক পুষ্টি উপাদান হাড়ের খনিজ ক্ষয় কমাতে এবং ভাঙনের ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস বিশেষকরে মেনোপজ পরবর্তী ক্ষেত্রে হাড়ের ক্ষয় কমাতে সহায়ক।

সবশেষে বলা যায়, মহিলাদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা সাময়িক খাদ্য প্রবণতার ওপর নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা নিয়মিত অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে। সুষম খাদ্য, অর্থাৎ যাতে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফাইবার, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট থাকে, এগুলি শরীরের শক্তি উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিপাকীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রতিটি খাবারে বৈচিত্র্য ও ভারসাম্য বজায় রাখা একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী পদক্ষেপ, যা দীর্ঘস্থায়ী প্রাণশক্তি ও রোগমুক্ত জীবনের পথে এগিয়ে দেয়। পাশাপাশি, এই খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ যোগ করতে ভুলবেন না, যা আপনি উপভোগ করেন!

সফরের নাম ভিয়েতনাম (শেষ পর্ব)

লাঞ্চের পর আমরা চলে এলাম ভিয়েতনামের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ট্রান কুয়ক প্যাগোডা দেখতে। শহর জুড়ে ঝকঝকে দোতলা লাল বাসের পরিসেবা কলকাতার ডবলডেকার বাসের অতীত দিন স্মরণ করাল। ভীষণ মিষ্টি একটা আমেজ। ট্রান কুয়ক হল রাজধানীর জাতীয় প্রতীক। প্রবেশপথের বিশেষত্ব হল প্রবেশদ্বারটি দূর থেকে বিচ্যুত মনে হলেও, কাছে গেলে বোঝা যায় ধারণাটি ভ্রান্ত। ট্রান কুয়কের স্থাপত্য হ্যানয়ের অন্যান্য প্রাচীন মন্দিরগুলোর অনুরূপ। পবিত্র বাগান এবং অত্যাশ্চর্য কিছু দৃশ্যাবলী নিয়ে ট্রান কুয়ক মনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রলেপ রেখে দিল।

১৯৫৯ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ বোধিবৃক্ষের চারা এই প্যাগোডাকে দান করেছিলেন। অনেকে মনে করেন এটি সেই বোধিবৃক্ষের শাখা, যার নীচে বসে স্বয়ং বুদ্ধদেব আলোকিত হয়েছিলেন। বোধ গয়ার মোহ ছাড়িয়ে হঠাৎই চোখের ভিউফাইন্ডারে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্যাগোডার ঘণ্টাধ্বনি। একটা ঝিমধরা সময়ের বশবর্তী হয়ে ভাবি স্পেশাল এফেক্টের মায়াজালে ওলটপালট হল বুঝি কিছু! পুরাতন নগরী প্যাগোডার শেষ গলিপথে থমকে যাওয়া আমি নিখাদ বিদেশি টুরিস্ট হয়ে নিজের সহযাত্রীদের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজি।

পরের দিনের গন্তব্য হোয়াট কায়েম লেকের পাশে ওয়াটার পাপেট শো দেখা। টিকিট অনলাইনে বুক করেছিল গাইড। এই পাপেট শো-এর একটা ইতিহাস আছে। এগারোশো শতকে রেড রিভার ডেল্টা এরিয়ার সমস্ত গ্রামের ধানজমি বন্যায় জলমগ্ন হয়েছিল। তখন সেখানকার মানুষ জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে মানুষের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করত রোজগারের আশায়। সেই থেকে এই পাপেট শোয়ের শুরু। প্রতি বছর এখানে দেড় লক্ষ পর্যটক শো দেখতে আসেন। এই শোয়ের বিশেষত্ব হল— মঞ্চটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন থাকে। এই জলের উপরেই মসৃণ গতিতে ভাসতে ভাসতেই পুতুল নাচের খেলা দেখায় কলাকুশলীরা। উপর থেকে তাদের দেখা যায় না মোটেই। ভিয়েতনামের গীতবাদ্য ও আঞ্চলিক ফোকআর্ট ড্রাগন নাচকে যথাযথ মর্যাদায় বিদেশি দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হল প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে। পাপেট শোয়ের শেষটুকু দেখে মনে হল— হ্যানয়ের ইতিহাসের পাতা ধরে যে চেক লিস্ট সঙ্গে বয়ে এনেছি, তা আমাকে অনেকটাই পূর্ণতা দিল। ভিয়েতনামের সংগ্রামী জীবনের সার-সত্যের পথে আমার তিনটি রাত গচ্ছিত রইল চির জীবনের মতো।

ইতিহাসের সরণি ছেড়ে ফুরফুরে মেজাজে রওনা দিলাম অন্যতম আকর্ষণ হালং বে বা উপসাগরের পথে। যার আক্ষরিক অর্থ হল- ডিসেন্ডিং ড্রাগন। ড্রাগনের রূপকল্প এই দেশের মাইথোলজিকে প্রভাবিত করেছে নিঃসন্দেহে। আমরা জেটি থেকে বেশ বিলাসবহুল ক্রুজে চেপে রওনা দিলাম। শিক্ষিত গাইডের থেকে জানলাম, ভিয়েতনামীদের বিশ্বাস, স্বর্গ থেকে ড্রাগন তার শিশুসহ নেমে এসে অত্যাচারী শত্রুদের পরাজিত করে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে। আসলে যুদ্ধবিগ্রহ ভালো-খারাপ দুয়ের মধ্যে দিয়ে চলে ভিয়েতনামবাসীর মনে এই বিশ্বাসের জন্ম এবং সেই ধারণাই বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত।

ভিয়েতনামের উত্তর-পূর্ব দিকে জলপথে হালং বে-তে আসতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। Golf of Tonkin-এর মধ্যে অবস্থিত এই অসামান্য নৈসর্গিক জায়গায়টিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা দিয়েছে। প্রায় ১,৯৬৯টি দ্বীপের মধ্যে বেশির ভাগই মানুষের বসবাসের অযোগ্য। আমাদের দুটো দিন বরাদ্দ এই দ্বীপ মালিকার মাঝে ক্রুজসফরে। ক্রুজের ঘর সংলগ্ন বারান্দা থেকেই অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য। চারতলার আপার ডেকে গিয়ে পেয়ে গেলাম পারফেক্ট ক্যালেন্ডার পিকচার। সারি সারি পাতা ডেক-চেয়ারে শুয়ে দেখি প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের বিভাজিকায় প্রবেশ করছে ক্রুজ। বিভিন্ন আকৃতির লাইমস্টোন বিন্যাসে ছোটোখাটো পাহাড় টিলা সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ।

আসন্ন বিকেলে সূর্যদেব গোল্ডেন আওয়ারে নিখুঁত আলো স্পট করেছে এক সুড়ঙ্গের মুখে। সেই অতি দুর্লভ সময়টিতে লোনা হাওয়ায় স্কার্ফ উড়িয়ে নিজেকে রুপোলি পর্দার নায়িকা ভাবা যেতেই পারে। আমি ভাবাভাবিতে না গিয়ে পোজ দিতে শুরু করি। জীবন তো একটাই কালিদা— যতটুকু ঈশ্বর দিচ্ছেন তাকে ভালোবেসে গ্রহণ করাই শ্রেয়। শেষ বিকেলের আলো জলে এবং অদ্ভুত প্রস্তরময় আকৃতির দ্বীপসমূহের মধ্যে ক্রমাগত রঙের খেলা দেখিয়ে ক্লান্ত। সূর্যদেব নিজের মলমল খুলে পাটে পাটে ছড়িয়ে দিয়ে অস্ত যাচ্ছেন দিগন্তে। পর্যটকরা বিস্ময়ে কিছুটা শান্তির নৈবেদ্য চোখে নিয়ে ডেক-চেয়ারে বিভোর।

পরের দিন সকালে প্রাতরাশ-এর পর হালং বে-র মধ্যে স্ট্যালাকটাইট ও স্ট্যালাগমাইট সৃষ্ট লক্ষ বছরের প্রাচীন গুহা দর্শন করতে গেলাম ছোটো মোটর বোটে করে। আইল্যান্ড সাম্রাজ্যে টি-টপ আইল্যান্ড সব থেকে বেশি জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয়। ক্রুজ থেকে ছোটো জলযান করে দ্বীপে নেমে প্রথমে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকি। পুরোদস্তুর ট্রেক, নিজের পায়ের জোরেই চলা। অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছে আমি আত্মহারা, কিন্তু একটু অসাবধান হলেই টুপ করে খসে যেতে পারি বহু নীচে। এমন ধারার গুহা প্রথম দেখেছিলাম পাতাল ভুবনেশ্বরে পিন্ডারী গ্লেসিয়ার ট্রেক শেষ করে। তারপর আরাকুতে আরও একটু বড়ো অভিজ্ঞতা।

বর্তমানে এই টি-টপ গুহা ঠিক যেন মহাকাব্যর মতো। বিশাল তার অলিগলির কাব্য বিন্যাস। গুহার অভ্যন্তরে বিভিন্ন দিকে লোহার সিঁড়ি ভিতরে রকমারি ফ্লুরোসেন্ট আর স্পট লাইটের আলোকসজ্জা মারাত্মক এক হ্যালুসিনেশন তৈরি করেছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে কিছুটা টপকে গুহার ছাদে শত শত আটকে থাকা বাদুড় আর রকমারি গুহাগাত্রের চরিত্র দেখতে দেখতে একেবারে টপে পৌঁছে গেলাম। ভিয়েতনাম সরকার ইউনেস্কোর তকমা পেয়ে ইন্টারন্যাশানাল ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করার জন্য দুর্দান্ত ব্যবস্থা করেছে ওই দুর্ভেদ্য অঞ্চলে, যা আমরা ভাবতেই পারি না।
হাঁপ ধরা বুকে নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনতে শুনতে দেখি ওই সুউচ্চ পাহাড়ের কোনায় কঠিন মাটি আঁকড়ে গাঢ় মেজেন্টা রঙের বোগেনভেলিয়ার ঝাড় উঁকি দিচ্ছে। অনেক নীচে সবজে কোল পেতে বসে আছে অপূর্ব জলজ ধরণীতল আর এক আকাশ গরিমা। ছোটো স্পিড বোটগুলোকে খেলনার মতো লাগছে। চতুর্দিকে ছড়ানো ছেটানো বিভিন্ন শেপের আইল্যান্ড সমষ্টিগত হয়ে নাবিকের মতো জাহাজের মাস্তুল আগলে রেখেছে। ছলছল চোখে পূর্ণতার আনন্দে আবারও নতজানু হই প্রকৃতির কাছে। হে নাবিক তোমারে সেলাম!

(সমাপ্ত)

সহজলভ্য উপাদানে তৈরি লোভনীয় খাবার

বাড়িতে তৈরি খাবার খেয়ে এবং খাইয়ে আনন্দ উপভোগ করা যায়। তাই, হাতের কাছে থাকা সহজলভ্য কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি করে নিন লোভনীয় কয়েকটি খাবার। রইল রেসিপিজ।

মিক্সড পোলাও

উপকরণ: ৫০০ গ্রাম চাল, অল্প পেঁয়াজকুচি, ২৫ গ্রাম ড্রাই ফ্রুটস, ১টা আপেল কুচি করা, ১০ গ্রাম বেদানার দানা, অল্প কাঁচালংকাকুচি, অল্প আদা-রসুন পেস্ট, ২টো তেজপাতা, ৩-৪টে ছোটোএলাচ, ৩টে লবঙ্গ, ৫-৬টা গোলমরিচ, ১টা দারুচিনির টুকরো, ১ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর লংকাগুঁড়ো, ২ বড়ো চামচ গরমমশলা, ১ বড়ো চামচ জিরে, ১৫ মিলি তেল, ১০ মিলি ঘি, অল্প কেওড়ার জল, দুধে ভেজানো সামান্য জাফরান, অল্প কিশমিশ।

প্রণালী: চালটা ১.১/২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। একটা প্রেশার প্যানে তেল গরম করে এতে পেঁয়াজ ভেজে তুলে রাখুন। এবার ঘি গরম করে, ড্রাই ফ্রুটস ভেজে নিন। বাকি তেলে গোটা মশলা ফ্রাই করুন। আদা-রসুন পেস্ট দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। কাঁচালংকা, লংকাগুঁড়ো, গরমমশলা ও নুন দিন। জল ঝরিয়ে চালটা তুলে এর মধ্যে দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। এবার প্রেশার প্যানের ঢাকনা বন্ধ করে চালটা সেদ্ধ হতে দিন। রান্না হলে ভাতের উপরে জাফরান, কেওড়া, পেয়াঁজভাজা, রসুনভাজা দিয়ে ভালো ভাবে ঝাঁকিয়ে নিন। উপর থেকে কিশমিশ, বেদানার দানা ও ড্রাই ফ্রুটস সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

স্পেশাল চিকেন কাবাব

উপকরণ: ২০০ গ্রাম চিকেন কিমা ম্যাশ করা, ৪টে ব্রেড পিস, অল্প গরমমশলা, অল্প আদা-রসুন পেস্ট, অল্প লংকাগুঁড়ো, অল্প কাজু, কিশমিশ ও আখরোটের কুচি, এক চিমটে এলাচগুঁড়ো, এক চিমটে কেসর, অল্প ধনেপাতাকুচি, কোটিং-এর জন্য অল্প পরিমাণে ছাতু, কাবাব সেঁকার মতো তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ব্রেড অল্পক্ষণ জলে ডুবিয়ে হাত দিয়ে চেপে জল ঝরিয়ে নিন। ম্যাশ করা কিমার সঙ্গে সব উপকরণ চটকে নিন। এবার হাত দিয়ে চেপে চ্যাপটা কাবাব তৈরি করে নিন। ছাতুর উপর একটু রোল করে নিন। তাওয়ায় অল্প তেল গরম করুন। কাবাবগুলো ভালো ভাবে দুপিঠ ভেজে নিন। বাদামি রং ধরলে গরম গরম সার্ভ করুন।

সুইট ড্রাই-ফ্রাই

উপকরণ: ১/২ কাপ ওট্স পাউডার, ১/২ কাপ মাল্টিগ্রেন আটা, ১/৪ কাপ বেসন, ১/৪ কাপ সোয়া ফ্লাওয়ার, ১ বড়ো চামচ মিল্ক পাউডার, ১ বড়ো চামচ চিনিগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ মাখানাগুঁড়ো, ১০-১২টা মাখানাকুচি, কাজু, কিশমিশ, বাদাম প্রয়োজনমতো, ১/৪ কাপ সুজি, ৩/৪ কাপ দেশি ঘি, ১ ছোটো চামচ এলাচগুঁড়ো, ৫-৬টা খেজুর বেটে নেওয়া।

প্রণালী: সমস্ত আটা-সুজি-বেসন একসঙ্গে মেশান। ঘি গরম করে মাখানা ভেজে নিন ও আলাদা রাখুন। আটা-সুজির মিশ্রণ দিয়ে ভাজুন। হালকা গোলাপি রং ধরলে আঁচ কমিয়ে গুঁড়োদুধ, চিনিগুঁড়ো, মাখানাগুঁড়ো, এলাচগুঁড়ো, খেজুরবাটা দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। কাজু কিশমিশ ও বাদাম ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

সফরের নাম ভিয়েতনাম (পর্ব-০২)

আজ আধবেলার একটু বেশি সময় হাতে রয়েছে। সকলে আবদার করে বসলাম আমরা সাইক্লো (cyclo) করে ঘুরব। গাইড বাবাজি একটু বিপদে পড়লেও রাজি হয়ে গেলেন। সাইক্লো অনেকটা আমাদের দেশীয় রিক্সার মতো বেশ মজাদার। এই বাহনে স্লিম দু’জন বসা যায়। প্রতিটা সাইক্লোতে নাম্বার প্লেট লাগানো।

অপরাহ্নে পদবাহী সাইক্লো

ইতিহাস সিম্ফনি,

বেঁকে যায় ছায়াপথ

ঝাঁপ দেয় ব্যালকনি।

সাইক্লো চেপে কাছাকাছি বাজার, দোকান ভিয়েতনামিদের রোজকার জীবনের পসরা ঘুরে ফিরে দেখে আমরা গেলাম হো চি মিনের স্মৃতিমন্দির দেখতে। সারাদিন এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। বেশ রাজকীয় স্মৃতিসৌধে চাচা হো চি মিনের দেহ শায়িত। এই স্মৃতিসৌধের একেবারে কাছে অতি আধুনিক স্থাপত্যে তৈরি রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ যা নয়নাভিরাম বিশাল উদ্যান বেষ্টিত।

এই উদ্যানের একেবারে কাছেই রয়েছে ওয়ান পিলার প্যাগোডা। গলিপথে পায়ে হেঁটে চলে এলাম। ফুট চারেক ব্যাসের পাথরের উপর দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক প্যাগোডা। ফরাসিরা ভিয়েতনাম ছেড়ে যাওয়ার আগে এই অতি প্রাচীন প্যাগোডাটির প্রভূত ক্ষতি করেছিল। কিন্তু কালের নিয়তি, স্থানীয় মানুষ ও সরকারের কনজারভেশন পলিসির যৌথ উদ্যোগে আজও কত পর্যটক এই প্যাগোডা দেখতে আসছে। জলাশয়ের কোনার দিকে প্যাগোডা দাঁড়িয়ে, বাকি অংশ শালুক পদ্মের লতানে সৈনিকে ভর্তি। প্যাগোডার একলা নির্বাক সিঁড়ি আচমকা ঘণ্টার ধ্বনি নির্জন সময়কে ছিন্ন করে এক গভীর অভিঘাতে আমার মনকে আচ্ছন্ন করে দিল। প্যাগোডার সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে ওল্ড কোয়ার্টার। একদা ফরাসিরা এখানে বাস করত। গলিপথ, সরু গলিপথে পুরোনো ভিয়েতনাম অতি প্রকট।

অসংখ্য ছোটো দোকানে ভিয়েতনামি এমব্রয়ডারি কাঠের কাজ, জুতো তৈরির কারুশিল্প, রকমারি খাবার দোকান প্রভৃতি নিয়ে ওল্ড কোয়ার্টার বহু আগের ফরাসি মেজাজ বহাল রেখেছে। ফুটপাতে ফলের পসরা নিয়ে যে দোকানি দাঁড়িয়ে, সেও দায়িত্ব নিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার রাখে। মানে আম খেয়ে নির্দিষ্ট প্যাকেটে আমের আঁটি ফেলা হয় এবং অন্য ফল খেলে তার বীজ এবং দোকানি খোসা-সহ অন্যান্য বর্জ্য ফেলবে অন্য প্যাকেটে। প্লাস্টিকের প্যাকেট এক্কেবারে নিষিদ্ধ। প্রতিদিন স্রোতের মতো মানুষ আসছে, বেড়াচ্ছে, খাবার খাচ্ছে, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বেরিয়ে যাচ্ছে— কোনও সমস্যা নেই। পুরো জায়গা নিট অ্যান্ড ক্লিন। সবদিকে মধ্যযুগীয় ঝিমধরা সময় নিয়ে একদম অন্যরকম পরিবেশ।

সার দিয়ে খাবারের দোকানে লোভনীয় সব আইটেম দেখে লাঞ্চের জন্য আমরা ভিয়েতনামি খাবারের দিকেই ঝুঁকলাম। আমি ভ্রামণিক, তাই সব জায়গার স্থানীয় স্পেশাল খাবার চেখে দেখাকে ভ্রমণেরই অঙ্গ ভাবি। বিশ্বায়নের বাজারে ভিয়েতনামি কুইজিনের যথেষ্ট সুনাম। পাক শিল্পে চূড়ান্ত সংযোজন স্কুইড ক্র্যাবের পুরভরা স্প্রিংরোল ময়দার আবরণে ফ্রাই করা নয়। এই স্প্রিং রোলের আবরণ তৈরি হয় রাইস পেপার দিয়ে। এই সুস্বাদু প্যালেটের আমদানি চিনের নাকি ভিয়েতনামের, সে তর্কে আমি যাচ্ছি না। দাম কিছু বেশি হলেও, রসনার তৃপ্তি মনকে আনন্দ দিল। সঙ্গে নিয়েছি অপূর্ব স্বাদের ফল, যার সাইজ আমাদের দেশের ফলের প্রায় দ্বিগুন। লাঞ্চের শেষে কফিশপের সম্মোহিত টানে এগিয়ে গেলাম। ধূমায়িত কফিতে সিপ মেরে মনে মনে লিখে রাখলাম—

কফির কাপে রইল পরিচয়

দুধেলা উষ্ণতা খরচের খাতায়

পকেটে রেখেছি খোঁজ

ঠিকানা কোথায় তোর?

হ্যানয়ের আসল সৌন্দর্য কিন্তু রাতের মালকোষে। নগরীর রাস্তাঘাট, রেস্তোরাঁ দোকানপাট সব কাগজের লণ্ঠনে সেজে উঠেছে। থু-বন নদীতে কাগজের ডোঙায় ভাসানো হয়েছে জ্বলন্ত মোমবাতি। পথেঘাটে গান-বাজনা, হুল্লোড়, নিষিদ্ধ পল্লীর যৌন জীবনযাপন, মশকরা— সবই জেগে উঠেছে জিয়নকাঠির ছোঁয়ায়। বিভিন্ন দেশের পর্যটক সমাবেশে প্রাণোচ্ছল হ্যানয়। আজ যত কথা লিখছি তা রাত ফুরোতেই মিলিয়ে যাবে অলিগলির হাওয়ায়। দ্বিতীয় দিনে নতুন শহরের আখর কী লেখাবে তা অজানা। তবে ঐতিহাসিক যুদ্ধবিদ্ধস্ত শহরের ইতিকথা স্লেট-পেন্সিল হাতে নিয়ে বসে পড়লেই লেখা যায় না। বিগত যুদ্ধের বারুদের গন্ধ নাকে নিয়ে তার ক্ষত বুঝতে হয়, একান্তে অনুভব করতে হয়। সদাব্যস্ত সমস্ত ট্যুরিস্টের সেই সময় কোথায়? আমিই বাউণ্ডুলে বেপথু পথিক অচিরেই মন দিয়ে বসি।

দ্বিতীয় দিন হোটেলের জমকালো ব্রেকফাস্ট শেষ করে চলে এলাম মিলিটারি হিস্ট্রি মিউজিয়াম দেখতে। মিউজিয়ামের সামনেই আছে কয়েকটি বন্দি বিমান এবং ফরাসি ও আমেরিকানদের যুদ্ধ বিমানের ধ্বংসাবশেষ। রয়েছে স্বয়ংক্রিয় এয়ার ডিফেন্স বন্দুক, স্বচালিত বন্দুক এবং আরও অনেক ধারার অস্ত্রসমূহ। ভিতরে রয়েছে চিন, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নথিপত্রে পূর্ণ কক্ষ। দেয়ালে ঝোলানো সাদা কাপড়ের মধ্যিখানে রয়েছে সামরিক বিভাগের প্রধান ব্যক্তিত্বের আবছা অবয়ব। এইসব দেখে মনটা কেমন যেন অসহায় হয়ে গেল। এই ক্রমপরম্পরা যুদ্ধ সামলে ভিয়েতনাম এমন ভাবে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে!

(ক্রমশ…)

সুস্থ থাকুন ঘরোয়া ব্যায়ামে

ঠিক যে-ধরনের জীবনশৈলীতে আমরা ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাতে শরীরকেও খানিকটা মজবুত করে তোলার প্রয়োজন। কারণ প্রতিদিনের রুটিনে নিজেকে চনমনে রাখতে, সময়ের দাবি মেনে সুস্থভাবে বাঁচার একটাই মন্ত্র—-এক্সারসাইজ। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং কৌশল তুলে ধরেছেন স্পোর্টস & অর্থোপেডিক ফিজিয়োথেরাপিস্ট এবং যোগা থেরাপিস্ট ভাস্কর সেনগুপ্ত।

অনেকেরই একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, ব্যায়াম করতে গেলেই হয়তো কোনও একটা জিম বা ফিটনেস ক্লাব-এর সদস্য হতে হবে। কিন্তু প্রতিদিনের ব্যস্ত শেডিউল থেকে সময় বের করে, ক’জনই বা পারেন জিম-এ গিয়ে একটা ‘ফিটনেস রেজিম’ মেনটেইন করতে!

ব্যায়াম আপনাকে শুধু শারীরিক ভাবেই নয়, মানসিক ভাবেও ফিট রাখে। কোনও প্রপস ছাড়াই, ঘরোয়া ব্যায়ামে আপনি চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারবেন, যদি সঠিক প্রক্রিয়াটি আপনার জানা থাকে। কোনও যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই, স্রেফ ওয়ার্কআউট করে ক্যালোরি ঝরিয়ে ফেলা সম্ভব। আসলে উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ জিনিসটা এক ধরনের কমিটমেন্ট, যার মূল উদ্দেশ্য হল নিষ্ঠা সহকারে একটি বিধিবদ্ধ এক্সারসাইজ রুটিন ফলো করা। কারণ, এর ফলে আপনার দেহের আকারে, আপনার খাদ্য-তালিকায় এবং অবশ্যই লাইফস্টাইল-এ একটা বড়ো ধরনের পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য।

আপনি কি জানেন, আপনার হৃদয়ন্ত্রটিকে সুস্থ সবল রাখতে এবং ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ১০,০০০ পদক্ষেপের প্রয়োজন। এটাকে সম্ভব করতে হলে বাড়ির আশপাশের জায়গার কাজগুলো পায়ে হেঁটেই সারতে চেষ্টা করুন। আর সেই সঙ্গে থাকুক কিছু সহজ ব্যায়াম।

যে-কোনও ওয়ার্কআউট রুটিন বাড়িতে শুরু করার আগে ফুল বডি চেক-আপ করিয়ে নেওয়া ভালো। এর ফলে কী ধরনের ব্যায়াম করা আপনার উচিত হবে, তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাবেন। ওয়ার্কআউট রেজিম-এর শুরুতে ওয়ার্ম আপ এবং শেষে কুল ডাউন এক্সারসাইজ করতে ভুলবেন না। এক্সারসাইজ এনজয় করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল অন্য একজনকে সঙ্গে রেখে ব্যায়াম করা। এর ফলে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করার একটা তাগিদ থাকবে এবং পরস্পর-কে মোটিভেট করতে পারবেন।

স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ: দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। দু-হাতে দেয়ালে ভর দিয়ে প্রথমে বাঁ-পা পিছন দিকে যতটা প্রসারিত করা যায় করুন। কয়েক সেকেন্ড এইভাবে দাঁড়িয়ে একই প্রক্রিয়া রিপিট করুন ডান পায়ের ক্ষেত্রে।

আর একটি সহজ স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ করা যায়। মাটিতে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়ুন। দু’হাত দিয়ে প্রথমে ডান হাঁটুটা চেপে বুকের কাছে নিয়ে আসুন, রিল্যাক্স করুন। পুনরায় একই প্রক্রিয়া করুন বাঁ-হাঁটুর ক্ষেত্রে।

কার্ল: মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। মাথার উপর দিকে দু’হাত ছড়িয়ে দিন। এবার হাত ও শরীরের উপরের অংশ মাটি থেকে উপরে তোলার চেষ্টা করুন। এটি পনেরো থেকে কুড়ি বার পুনরাবৃত্তি করুন।

লেগ লিফটস: একটি চেয়ারে বসুন। হাতের পাতা দুটি, শরীরের পাশাপাশি চেয়ারের উপর রাখুন। পা দুটি ৯০ ডিগ্রি অবস্থানে মাটিতে থাকবে। এবার দুটি পা-কে একসঙ্গে যতদূর সম্ভব সামনে প্রসারিত করুন। কোমর ও তার নীচের অংশের মাসল-এ যতটা সম্ভব চাপ দিয়ে এই ব্যায়াম করুন। এবার আস্তে আস্তে পা-দুটি আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনুন। পা’দুটি উপরে তোলার সময় শ্বাস নিন ও পা মাটিতে নামানোর সময় শ্বাস ছাড়ুন। এই ব্যায়াম দশবার রিপিট করুন। এক থেকে দেড় মিনিট রেস্ট নিয়ে আবার এই ব্যায়াম দশবার করুন।

লাঞ্জেস: সোজা দাঁড়িয়ে পা-দুটি ছড়িয়ে দিন। একটা পা সামনে থাকবে অন্যটি পিছনে। দু’পায়ের মধ্যেকার দূরত্ব শোল্ডারের মাপে রাখুন। সামনের এবং পিছনের পা ভাঁজ করুন। পিছনের হাঁটু মাটির দিকে ভাঁজ হবে। দেহের উপরিভাগ সোজা থাকবে। এবার তলপেটের মাসল-এ চাপ দিয়ে শরীরের উপরি অংশ সামনের পা পর্যন্ত ঝোঁকান। দেখবেন হাঁটু যেন কোনও অবস্থায় পায়ের পাতার দৈর্ঘ্যের থেকে বেশি না ঝোঁকে। একই ভাবে এই ব্যায়াম দুটি পায়ের ক্ষেত্রেই করুন। দশবার করতে হবে এই এক্সারসাইজ।

জগিং: টিভি চালিয়ে বা মিউজিক শুনতে শুনতে জগিং করা খুব ভালো ব্যায়াম। জগিং এক জায়াগায় দাঁড়িয়ে থেকেই করা যায়। তবে ব্যায়ামের জন্য নির্দিষ্ট জুতো ব্যবহার করুন, এতে পা স্ট্রেসমুক্ত থাকবে।

পুশআপস: হাতের পাতা মাটিতে রেখে কনুই দুটো সোজা রাখুন অথবা হাত দুটিকে সোজা অবস্থায় রাখুন। দেহের বাকি অংশ ভূমির সমান্তরাল থাকবে দুটি পায়ের টো-এর উপরে। হাঁটু টান টান রেখে মুখ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে গোটা শরীরের পেশি টানটান রেখে পুশ-আপ করুন। তবে যদি কারওর এতে অসুবিধে হয়, তাহলে হাঁটু মাটিতে রেখেও করা যায়। এরপর শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে দুটো হাতকে ভাঁজ করে মাটির দিকে বুক নামাতে হবে। আবার শ্বাস নিতে নিতে হাত দুটিকে সোজা করে বুক বা দেহের উপরের অংশটিকে তুলে আনতে হবে। সাত থেকে দশবার এই ব্যায়াম করতে হবে। শরীরকে আরও টান করে রাখতে পা দুটিকে উঁচু বেঞ্চ-এর উপর তুলে রাখুন আর হাত দিয়ে ভর রাখুন মাটিতে। শরীর মেঝে বরাবর ঝোঁকানোর সময় অর্থাৎ ডন দেওয়ার সময় খেয়াল রাখুন, আপনার বুক যাতে মেঝে স্পর্শ করে।

ডিপস: দুটি চেয়ারকে সমান্তরাল অবস্থায় রাখুন। দুটি চেয়ারের মাঝখানের ব্যবধান নিজের কাঁধের মাপের দেড় গুন (more or less 30 inches) হবে। হাত দুটি চেয়ারে ভর দিয়ে বৈঠক দিন। এই ব্যায়াম করার সময় মাথা সোজা রাখবেন এবং শরীরের মাসল যথাসম্ভব টানটান রাখবেন।

বাড়িতে বসে কম্পিউটারে টানা কাজ করলেও ব্যায়ামের কথা ভুলবেন না। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে পায়ের পাতা উপর-নীচ করুন। এতে পায়ের রক্ত সঞ্চালন ভালো হবে। এক্ষেত্রে অর্ধ-বৈঠকও কার্যকরী। নাচ খুব ভালো ব্যায়াম, নাচ জানলে তাও চর্চা করতে পারেন। তবে যে-কোনও ব্যায়ামের শুরুতে স্ট্রেচিং ওয়ার্ম-আপগুলি অবশ্যই করবেন। ব্যায়াম করতে বোরিং লাগবে না যদি হালকা মিউজিক বা টিভি চালিয়ে ব্যায়াম করেন। লিফট-এর পরিবর্তে যতটা সম্ভব সিঁড়ি ব্যবহার করুন। খাওয়ার পর হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখুন। কোনও পায়ের অথবা নিম্নাংশের ব্যায়াম করার পর বিরতি নেওয়ার সময় সঙ্গে সঙ্গে না বসে, হাঁটাহাঁটি করুন। আর হোম এক্সারসাইজ করার আগে যে-কোনও ফিজিয়োথেরাপিস্ট-এর সঙ্গে কথা বলে, তাঁর পরামর্শ মতো এক্সারসাইজ করুন।

ভাস্কর সেনগুপ্ত: স্পোর্টস & অর্থোপেডিক ফিজিয়োথেরাপিস্ট এবং যোগা থেরাপিস্ট (From AYUSH & Govt. of W.B., Ex. International Sports Person) Certified from FIFA, SAI & IOC.

সফরের নাম ভিয়েতনাম (পর্ব-০১)

নিজের বুকের রক্তে / নক্ষত্রের উজ্জ্বল অক্ষরে / লিখে রেখো নাম / কালের রাখাল তুমি / তুমি ভিয়েতনাম।

ভিয়েতনাম নিয়ে বাঙালির মনে একটা সহজাত আবেগ এখনও কাজ করে। আমারও করেছিল, তাই সফর টিমে নাম লিখিয়ে অক্টোবরের শেষের দিকে ভ্রমণ শুরু করি। নিখাদ ভ্রামণিক হয়ে ভিয়েতনামের অতীত থেকে বর্তমান জীবনযাত্রার কোলাজ ছুঁয়ে আসতে পেরেছি।

কোলকাতা থেকে মাঝরাতের ভায়া ব্যাংকক-এর ফ্লাইট ধরে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় শহরে পা রাখলাম পরদিন সকালে। ভারতের সময়ের অঙ্কে ভিয়েতনাম দেড় ঘণ্টা এগিয়ে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, সম্পূর্ণ ভিয়েতনাম একবারের সফরে দেখে শেষ করা অসম্ভব। তাই মনস্থির করে পকেটের রেস্ত অনুযায়ী ভ্রমণসূচী তৈরি করা প্রয়োজন। এয়ারপোর্ট থেকে ডলার ভাঙিয়ে বেশ কিছু পরিমাণ ভিয়েতনামি কারেন্সি ডং সংগ্রহ করে নিলাম।

আজকের দিনে ভিয়েতনামি ডং বিশ্বের তৃতীয় নিম্ন মূল্যবান মুদ্রা। ইরান এবং ভেনেজুয়েলার পরে। মুদ্রাজনিত চাপ জেনে বুঝেই পর্যটকদের সফর করতে হয়। একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার, যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে ডং-এর মূল্য কম, তাই ভিয়েতনামে সমস্ত জিনিসের দাম ডং-এর হিসেবে খুবই বেশি। আপনাকে এক কাপ কফি খেতে গেলেও অনেকটা পরিমাণ ডং খরচ করতে হবে। যে-কোনও জিনিসে হাত দিলেই স্থানীয় মুদ্রায় দামের ছ্যাঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা। তাই এই সফরে প্রতিদিন জনপ্রতি কত ডং খরচ হতে পারে তার সম্যক ধারণা থাকা দরকার। প্রচুর হোম ওয়ার্ক করে গেলেও, মস্তিষ্কে স্থানীয় মুদ্রায় কনভার্ট করে ক্যালকুলেটরকে দাবিয়ে রাখাই ভালো।

এয়ারপোর্ট থেকে লটবহর সমেত বেরিয়ে দেখি কমলালেবু রঙের রোদ্দুর ভাসিয়ে দিয়েছে বিদেশি আকাশ, ঝাপসা সবুজ দিগন্ত। ইতস্তত মেঘ ছড়ানো আকাশের নীচে আনন্দে একপাক ঘুরেই দেখি সুন্দর এক টেম্পো ট্রাভেলার আমাদের অপেক্ষায়। পাইলট কোমর পর্যন্ত বো করে গাড়ির দরজা খুলে দিলে আমরা হই হই করে গাড়িতে উঠে হোটেলমুখো হলাম। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। মসৃণ রাস্তা, তাই বাহনের গতি মসৃণ। বেশ কিছুক্ষণ টিপিক্যাল ভিয়েতনামি ল্যান্ডস্কেপ উপভোগ করার পর মূল পুরোনো শহরে প্রবেশ করলাম।

জানলা দিয়ে ইতিউতি নজর চালিয়ে দেখি রাস্তার দোকান-পাট খুলেছে। প্রচুর ছেলে মেয়ে সাদা ড্রেস পরে স্কুল যাচ্ছে। রাস্তায় চার চাকা নেই বললেই চলে, কিন্তু চাক ভাঙা মৌচাকের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে দু-চাকার বাহন রাস্তা ঢেকে রেখেছে। শুনেছি, যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম গাড়ি শিল্পে নাকি স্বাবলম্বী নয়। আসলে উদার অর্থনীতির বাজারে গাড়ি শিল্পে বৃহৎ বিনিয়োগ এখনও সম্ভব হয়নি। তাই বিদেশি গাড়ি ব্যবহার না করে তারা যে-কোনও টু-হুইলারেই স্বচ্ছন্দ।

ভিয়েতনাম স্বাধীনতা অর্জন করতে যে মূল্য চুকিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে অল্প দেশেই তার তুলনা পাওয়া সম্ভব। বহু আগ্রাসন প্রতিহত করে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের শেষে ভিয়েতনাম কিছুটা শান্তির আলো দেখেছে। প্রায় বারোশো বছর পদানত থাকার পর খাপছাড়া ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটলেও, মুক্তি এসেছে অনেক পরে। ভিয়েতনামের ভূখণ্ডে প্রথম আস্ফালন ঘটায় চিন। তারপর আসে ফরাসিরা এবং মহাযুদ্ধের সময় জাপান ভিয়েতনাম দখল করে শোষণ নীতি চালায়। এর পরবর্তীতে হো চি মিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি সঙ্ঘবদ্ধ হতে শুরু করে৷ চূড়ান্ত শোষণ নীতির সূত্র ধরে আমেরিকা কমিউনিস্ট নিধনযজ্ঞের পীঠস্থান করে তুলেছিল ভিয়েতনামকে। যা দেখে পৃথিবীর মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। আমেরিকার ভ্রান্ত অক্ষম বিদেশনীতির সাক্ষী গোটা ভিয়েতনাম। আপাত শান্ত ছোটোখাটো চেহারার গোলগাল মুখের ভিয়েতনামিরা যে সাহস আর পরাক্রম দেখিয়েছে অমিত শক্তিধর আমেরিকার বিরুদ্ধে, তার নিদর্শন শহরের বুকে আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে।

এরই মধ্যে আমরা হোটেলে পৌঁছে গেলাম। ওয়াই ফাই-সহ অন্যান্য ব্যবস্থা বেশ ভালোই। ফ্রেশ হয়ে কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট খেয়ে ঘুরতে বের হলাম। প্রাচীন ও আধুনিকতার মিশ্র সংস্কৃতির স্থাপত্য হল হ্যানয়ের বিশেষত্ব। ইউনেস্কো তাই একে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করেছে। হ্যানয়ের আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ভিয়েতনামের ঔপনিবেসিক জীবনের ছোঁয়া।

হ্যানয়ের প্রকৃত অর্থ হল— নিরাপদ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। অতীতকালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত বন্দর এবং চম্পা রাজত্বে এটি ছিল প্রধান বাণিজ্যনগরী। ছিমছাম পথঘাট, মধ্যযুগীয় ঘরবাড়ি, দোকান, সরাইখানা, ছাউনি দেওয়া জাপানি সেতু, চিনা মন্দির-সহ স্মৃতির সিন্দুক বুকে নিয়ে হ্যানয় আজও সময়কে বেঁধে রেখেছে।

(ক্রমশ…)

মেনিংগোকোকাল ভ্যাকসিন

মেনিনজাইটিস এবং সেপসিস-এর মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমায় মেনিংগোকোকাল ভ্যাকসিন (Meningococcal Vaccine)। আসলে, মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের আবরণে প্রদাহ) এবং সেপসিস-এর (রক্তে সংক্রমণ) মতো সংক্রমণ ঘটায় নেইসেরিয়া মেনিনজিটিডিস (সাধারণত মেনিনোকোক্কাস নামে পরিচিত)। অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের তুলনায় এই রোগটি বেশি ক্ষতিকারক। এটি যেমন দীর্ঘমেয়াদী ভয়াবহ জটিলতা তৈরি করতে পারে, ঠিক তেমনই এই রোগের কারণে মৃত্যুও ঘটতে পারে। তবে, এই রোগ প্রতিরোধের জন্য ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে। মেনিনজাইটিস এবং সেপসিস-এর মতো গুরুতর রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর ভ্যাকসিন হল— মেনিংগোকোকাল। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডা. শালিনী ভুট্ট।

মারাত্মক সংক্রামক রোগগুলি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। এর মধ্যে, মেনিংগোকোকাল রোগটি হঠাৎ শুরু, দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং সম্ভাব্য মারাত্মক পরিণতির কারণ হতে পারে। নেইসেরিয়া মেনিনজিটিডিস এমন একটি ব্যাকটেরিয়া, যা মানুষের নাসোফ্যারিনেক্সে বাসা বাঁধতে পারে৷ অনেক ক্ষেত্রে, এটি নিষ্ক্রিয় ভাবে বেঁচে থাকে, আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি রক্তপ্রবাহ এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করতে পারে, যার ফলে গুরুতর অসুস্থতা দেখা দেয়।

মেনিংগোকোকাল রোগ বিশ্বব্যাপী দেখা যায়, তবে এর প্রকোপ ভৌগোলিক ভাবে পরিবর্তিত হয়। সাব-সাহারান আফ্রিকায় ‘মেনিনজাইটিস বেল্ট’ হিসাবে চিহ্নিত অঞ্চলে কয়েক বছর অন্তর বড়ো আকারের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই অঞ্চলে ভ্রমণকারী, সেইসঙ্গে হজের জন্য মক্কায় আসা তীর্থযাত্রীদের বিশেষ ভাবে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে বিবেচনা করা হয়।

এই রোগটি মেনিনোকোক্কাসের বেশ কয়েকটি সেরোগ্রুপ দ্বারা সৃষ্ট। সবচেয়ে সাধারণ রোগ সৃষ্টিকারী গ্রুপগুলি হল A, B, C, W, X, এবং Y। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শক্তিশালী সেরোগ্রুপও থাকতে পারে।

মেনিনজাইটিস: এটি মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের মেনিনজেসের প্রদাহ। লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে হঠাৎ জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং মানসিক অবসাদ।

সেপ্টিসেমিয়া: এটি রক্তে সংক্রমণ ঘটিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অচল করে দিতে পারে, এমনকী মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ হল— ত্বকের নীচে রক্তপাতের কারণে বেগুনি রঙের ফুসকুড়ি। রোগটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেপ্টিসেমিয়ায় মৃত্যুর হার ১০-১৫ শতাংশ। আর বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা শ্রবণশক্তি হ্রাস, স্নায়বিক ক্ষতি বা অঙ্গ অচল হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন।

এই রোগ প্রতিরোধের জন্য নিতে হবে একটি ভ্যাকসিন। আর এই ভ্যাকসিন-এর নাম— মেনিংগোকোকাল ভ্যাকসিন। এই ভ্যাকসিনটি A, B, C, W-135, এবং Y গ্রুপের মেনিনোকোক্কাসের বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে৷ মেনিংগোকোকাল ভ্যাকসিন সাধারণত পেশিতে বা চামড়ার নীচে ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মেনিংগোকোকাল টিকার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা শুরু হয়, প্রাথমিক ভাবে পলিস্যাকারাইড টিকার উপর ভিত্তি করে। যদিও এগুলি অল্পবয়সিদের মধ্যে স্বল্পস্থায়ী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান করত, কিন্তু এর দুর্বল কার্যকারিতার কারণে, এই টিকা প্রদান সীমিত ছিল। কিন্তু কনজুগেট টিকার প্রবর্তনের ফলে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে এবং শিশুদের সুরক্ষা বৃদ্ধি করে।

অতি সম্প্রতি, সেরোগ্রুপ বি মোকাবিলায় প্রোটিন-ভিত্তিক টিকা তৈরি করা হয়েছে, যা একটি অনন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। কারণ এর ক্যাপসুল মানুষের স্নায়ু কোষের অণুর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা ঐতিহ্যবাহী পলিস্যাকারাইড পদ্ধতিগুলিকে প্রভাবিত করে।

মেনিংগোকোকাল ভ্যাকসিনের প্রকারভেদ

পলিস্যাকারাইড ভ্যাকসিন

  • উদাহরণ: MPSV4
  • সেরো গ্রুপ A, C, W, এবং Y থেকে রক্ষা করে
  • বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কম কার্যকর
  • আজকাল বেশিরভাগ দেশে খুব কমই ব্যবহৃত হয়, তবে এখনও এই ভ্যাকসিন একটি বিকল্প, যেখানে কনজুগেট ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না।

কনজুগেট ভ্যাকসিন (MenACWY)

  • উদাহরণ: Menactra® Menveo®, Nimenrix
  • সেরোগ্রুপ A, C, W, এবং Y-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করে
  • গলায় ব্যাকটেরিয়া বহন কমিয়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে
  • শিশু-কিশোর এবং ‘মেনিনজাইটিস বেল্ট’-এ ভ্রমণকারীদের জন্য বেশি সুপারিশ করা হয়।

সেরোগ্রুপ B ভ্যাকসিন (MenB)

  • উদাহরণ: Bexsero, Trumenba®
  • রিকম্বিন্যান্ট প্রোটিন এবং বাইরের ঝিল্লির ভেসিকেল দিয়ে তৈরি
  • বিশেষকরে গ্রুপ বি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করে, যা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটে।
  • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে, নিয়মিত মেনিংগোকোকাল টিকা ১১-১২ বছর বয়সিদের জন্য সুপারিশ করা হয় এবং ১৬ বছর বয়সে বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।
  • মেনবি টিকা ১৬-২৩ বছর বয়সিদের দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ছাত্রাবাসে বসবাসকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, কারণ ছাত্রাবাসে একত্র বসবাস, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে যুক্তরাজ্যে মেনসি কনজুগেট ভ্যাকসিন প্রবর্তনের পর, সেরোগ্রুপ সি রোগের প্রকোপ ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। অন্যান্য অঞ্চলে মেইন এসিডব্লিউওয়াই ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও একইরকম প্রভাব দেখা গেছে৷

নিরাপত্তা এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

মেনিংগোকোকাল কনজুগেট টিকা সাধারণত নিরাপদ এবং সহনীয়। সাধারণ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা, লালভাব, বা ফোলাভাব
  • হালকা জ্বর, মাথাব্যথা, বা ক্লান্তি
  • পেশী বা জয়েন্টে ব্যথা
  • গুরুতর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরল
  • আফ্রিকা: MenAfriVaca (সেরোগ্রুপ A কনজুগেট ভ্যাকসিন) দিয়ে বৃহৎ পরিসরে টিকাদান অভিযান মেনিনজাইটিস বেল্টে মহামারীকে মারাত্মক ভাবে হ্রাস করেছে।

এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য: হজে অংশগ্রহণকারী তীর্থযাত্রীদের জন্য টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রবেশের জন্য মেনিংগোকোকাল কনজুগেট টিকাদানের প্রমাণপত্রের প্রয়োজন।

গজল আলাঘ-এর অসাধারণ জীবন-কাহিনি (শেষ পর্ব)

আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, যেখানে সবাই নিজেদেরকে অন্য কারওর সঙ্গে তুলনা করে, তবুও তাদের বারবার গজল মনে করিয়ে দিতে চান যে, তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব সফর ভিন্ন পথে এবং সেই পথ অনুসরণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট

একজন উদ্যোক্তা এবং একজন মা হওয়ার কারণে, তিনিও মানসিক চাপ অনুভব করেন। তিনি মনে করেন, মানসিক চাপ মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হল নিজের সঙ্গে সময় কাটানো। সকালে ঘুম থেকে ওঠে তিনি প্রথম ১৫ মিনিট কারওর সঙ্গে কথা বলেন না কিংবা ফোন চেক করেন না। ওই সময় তিনি শুধু নিজের সঙ্গে কথা বলেন মনে মনে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, যখন একজন ব্যক্তি নিজের সঙ্গে কথা বলেন, তখন তিনি অনেক গুণ অর্জন করেন এবং বুঝতে পারেন যে, তিনি কী ভাবছেন এবং কী অনুভব করছেন।

গজল জানিয়েছেন, ‘ব্যবসায়িক ক্ষেত্র আমাকে শিখিয়েছে যে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই যা নিয়ন্ত্রণে আছে তার উপর মনোযোগ দেওয়া উচিত। সারাদিন আমি কী করেছি, কী করিনি, কী ঘটেছে এবং তার থেকে শিক্ষা নিয়ে কী করলে ভালো হবে, নিয়ে ভাবি দিনের শেষে। এরই পাশাপাশি, ভালো ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি”
বাচ্চাদের জন্য সেরা উপহার গজল আলাঘের মতে, ‘একজন কর্মজীবী মা তার সন্তানদের যে সেরা উপহার দিতে পারেন তা হল— তাদের রোল মডেল হওয়া। যখন শিশুরা তাদের মায়েদের কঠোর পরিশ্রম করতে, চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই করতে এবং তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে দ্যাখে, তখন তারা ভালো বার্তা পায়। তারা এও শেখে যে, নারীরা সবকিছু করতে পারে। দ্বিতীয় সেরা উপহার হল– কোয়ালিটি টাইম দেওয়া। আমরা যদি পর্যাপ্ত সময় দিতে নাও পারি, তবুও যখনই আমরা সন্তানের সঙ্গে থাকি, ফোন, ল্যাপটপ এবং টেনশন দূরে রেখে আমাদের সম্পূর্ণ ভাবে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সঙ্গ দেওয়া উচিত। তৃতীয় উপহার হল — স্বাধীনতার শিক্ষা। কর্মজীবী মায়েরা তাদের সন্তানদের নিজেদের জন্য দাঁড়াতে, দায়িত্ব নিতে এবং নিজেদের স্বপ্নে বিশ্বাস করতে শেখান।”

একজন কর্মজীবী মায়ের সাফল্যের রহস্য

গজল আলাঘ বিশ্বাস করেন যে, একজন কর্মজীবী মায়ের সাফল্যের সবচেয়ে বড়ো রহস্য হল, অপরাধবোধ থেকে মুক্ত থাকা। এটাই সত্যি যে, আমরা হয়তো সম্পূর্ণ নিখুঁত মানুষ হতে পারব না এবং নিখুঁত পেশাদারও হয়তো হতে পারব না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে, ভালো মানুষ হতে গেলে নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই। দ্বিতীয়ত, সাপোর্ট সিস্টেম-কে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। স্বামী, বাবা-মা, বন্ধুবান্ধব অথবা সাহায্যকারী সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার রেখে তাদের সাহায্য- সহানুভূতি নিতে হবে। তৃতীয়ত, নিজেকে সময় দিতে হবে। আপনি নিজে যদি সুখী এবং সুস্থ না থাকেন, তাহলে অন্যদের সুখ দিতে পারবেন না। তাই নিজেকে অগ্রাধিকার দিতে শিখুন। সবকিছুতে নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করবেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর মনোযোগ দিন। সেইসঙ্গে, নমনীয় থাকা উচিত এবং কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শেখা উচিত। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— নিজের উপর এবং আপনার সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখা
ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য প্রয়োজন।

গজল আলাঘের মতে, ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্যাশন। আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে আপনি কী চান এবং পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আপনার গ্রাহকদের চাহিদা এবং সমস্যাগুলি বুঝতে হবে এবং তাদের সমস্যার সমাধান তৈরি করা সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, একটি ভালো টিম গঠন করা খুবই জরুরি। তাই, সঠিক লোক নিয়োগ করুন এবং তাদের কাজের স্বাধীনতা দিন। সর্বদা নতুন কিছু করার ইচ্ছেও রাখতে হবে মনে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ওঠা- পড়া লেগেই থাকে। তাই সেই পরিস্থিতিও মানিয়ে নেওয়ার মতো মনে শক্তি রাখতে হবে। কারণ, বাজার ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং এর সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও পরিবর্তন করতে সক্ষম হওয়া উচিত। আর নেটওয়ার্কিং উপেক্ষা করবেন না। ভালো সংযোগ তৈরি করুন এবং পরামর্শদাতাদের কাছ থেকে শিখতে থাকুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অধ্যবসায়। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোই আসল সাফল্য।

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব