একটানা কথাগুলো বলে কোকিলা থামল। আমি ওর দিকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিলাম। একটু চুপ করে বসে জল খেয়ে আবার বলতে শুরু করল, ‘ক্রমশ নেমে এল আমার জীবনে চরম অন্ধকার। জানতে পারলাম রাজীবের কোনও হাই-ফাই ব্যবসা নেই। বড়ো ব্যাবসাদারকে খুশি করে অর্ডার পাওয়াই তার কাজ। অল্প কিছু দিনের মধ্যে তার এই ব্যাবসাদার বন্ধুরা বাড়িতে যাতায়াত শুরু করল। রাজীব বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসত। হুইস্কি-সোডা-রাম, আরও কী যে আমি অত নামও জানি না। এসব নিয়ে আমায় যেতে হতো রাজীবের তথাকথিত বন্ধুদের সামনে। আমায় সময় দিতে হতো, হাস্যময়ী-লাস্যময়ী হয়ে সময় কাটাতে হতো গভীর রাত পর্যন্ত। রাজীব আরও এগিয়ে দিত আমাকে। অর্ডারটা যে পেতেই হবে। পরে আপত্তি জানালে রাজীবের হাতে উত্তম-মধ্যমই জুটত। কাকে জানাব? প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, কেন গুরুজনদের কথা শুনিনি? মা-বাবার বারণ, বিশেষত মায়ের চোখের জল জীবনের চলার পথ কখনওই মসৃণ রাখে না। মা-তো। সন্তানের মঙ্গল কামনা কোন মা না চায়। আমি রাজীবের মা-বাবার সাথে আবার কথা বললাম। কিন্তু ওনাদের উদাসীনতা আমায় অবাক করল। নিজের বাবা-মাকে কী বলব! কুনাল, যে আমার সাথে রাজীবের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল সে-ও হেসে উড়িয়ে দিল, রাজীব নাকি এমন হতেই পারে না। আমিই সবকিছু মানিয়ে নিতে পারছি না। ভেবেছিলাম রাজীবকে ছেড়ে চলে যাব কিন্তু সাহসে কুলোয়নি। কী খাব, কোথায় রাত কাটাব, আবার যদি অন্য রাজীবের খপ্পরে পড়ি! ভয়ে আমি রাজীবের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ত্যাগ করলাম। এই রাজীবের জন্যই আমায় দু-দু’বার গর্ভপাত করাতে হয়েছে। আমি চাইনি কিন্তু ওর ভয়, আমার ফিগার খারাপ হয়ে যাবে তাই বাধ্য হয়েই আমি রাজি হই। কী কষ্ট যে হয়েছিল। কোন মেয়ে না মা হতে চায়! মনে হয়েছিল একটি শিশু বোধহয় দু’পক্ষের মা-বাবাকে হাসিখুশিতে ভরিয়ে তুলবে। আবার সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। শুধু একটা শিশু– আমার স্বপ্ন, আমার জীবন। কিন্তু সবই বৃথা, রাজীবের নির্দয় আচরণ, তার সিদ্ধান্ত, আমায় কোন অন্ধকারে ঠেলে দিল! আর রাজীবের হাত থেকে আমার মুক্তি নেই। আমি রাজীবের তুরুপের তাস। তাই তো আমার সাজসজ্জার দিকে ওর এত নজর। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।’

আবার কোকিলা চুপচাপ। ফোঁপানির শব্দ। নিশ্চুপ আমি শুধু নির্বাক হয়ে শুনে গেলাম। আমার কিছু করার নেই। কোকিলার এ অবস্থার জন্য অনেকাংশে ও নিজেই দায়ী। আমি কিছুই করতে পারি না। কোকিলা হঠাৎ ঘুরে চলে গেল। আমি কোকিলাকে কোনওদিন কোনও পরামর্শও দিইনি। এ ঘটনার মাস চারেক পরেই আমি বদলি হলাম।

চাকরি সূত্রে বদলি হয়ে চলে এলাম আরব সাগরের তীরে, মুম্বাইতে। আসার সময় রাজীব-কোকিলা দুজনকে একসাথে গুডবাই জানিয়ে এসেছিলাম। বিশেষ করে রাজীবকে, নানা অসুবিধা সত্ত্বেও থাকতে দেওয়ার জন্য। কোকিলা একটা কথাও বলেনি আমার সাথে কিন্তু ওর চোখ বলে দিচ্ছিল অনেক অনেক কথা। হাসির আভাসমাত্র দিয়ে কোকিলা আমায় বিদায় জানিয়েছিল।

মুম্বাই এসে নিজেকে গুছিয়ে নিতে মাস দেড়েক কেটে গেল কোথা দিয়ে বুঝতেই পারিনি। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে একটু যেন বেশি সময় লেগে গেল। তবে মাঝেমধ্যেই কোকিলার বিবর্ণ মুখটা কেমন যেন আমায় উদাস করে দিত। সব জেনেও আমি নিরুপায়, হাত-পা বাঁধা, কিছুই করার নেই। দু’একবার কোকিলাকে ফোন করেছি, ওপ্রান্তে রাজীবের গলা। সাদামাটা কথার পর ফোন নামিয়ে রেখেছি। কোকিলার সাথে কথা বলতে চাইলে রাজীব যে ভাবেই হোক এড়িয়ে গেছে। কোকিলা যেন হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে। দিন তার নিজের ছন্দে চলে। অবসরে কখনও আরব সাগরের ধারে বসে দেখি অনন্তের রূপ। সমুদ্রেরও এক নিজস্ব ছন্দ আছে, ওঠানামা, ভাসানো, ফিরে যাওয়া। একা-একা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে যাই মাঝেমধ্যে, আবার ঝাড়া দিয়ে বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে আসি নিজেকে। একদিন অফিস গিয়ে নিজের নামে চিঠি দেখে বেশ চমকে গেলাম। এই মোবাইলের যুগে কেউ আর ব্যক্তিগত চিঠি লেখে না। খুলে দেখি চিঠির তলায় লেখা কোকিলা।

বিনা সম্বোধনেই সে লিখেছে – ‘জানি এতদিন বাদে আমার চিঠি পেয়ে তুমি চমকে যাবে। আমার কথা মনে আছে তো? নাকি সব ভুলে গেছ? মাত্র অল্প কয়েক মাস তুমি ছিলে আমাদের কাছে, তবু তোমায় আমি আমার ব্যক্তিগত অনেককিছু উজাড় করে দিয়েছিলাম। তুমি জানতে চাওনি তবুও। তোমার নীরবতাই আমায় টেনেছিল তোমার দিকে। সে যাইহোক, কুণালকে মনে আছে নিশ্চয়ই। আমার কলেজের বন্ধু যে রাজীবের সাথে আলাপ করিয়েছিল। আমি জানতাম কুণাল আমায় ভালোবাসে, তবু ওই বয়সে রাজীবের অত টাকাপয়সা, ব্যবসা, সব আমায় গুলিয়ে দিয়েছিল। আমি কুণালের ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করে রাজীবের হাত ধরেছিলাম। কুণাল বেশ ভেঙে পড়লেও আমায় কিছু বলেনি। জানি ও এখনও বিয়ে করেনি। এও জানি এখন ও চেম্বুরে কোনও এক ন্যাশনালাইজড ব্যাংকের অফিসার। প্লিজ ওর সাথে যোগাযোগ কোরো, বলো বিয়ে করতে। কেন বলছি জানি না, তবু একদিন আমি ওকে ভালোবাসতাম, ও হয়তো আজও বাসে। আমায় ভুলে যেতে বোলো। প্লিজ শুধুমাত্র একসময়ে বন্ধুত্বের দাবিতে তোমায় হয়তো বিরক্ত করলাম। ভালো থেকো। আমি কেমন আছি জানতে চেও না।’

অফিসে কাজ করা মাথায় উঠল। হাফ-ডে করে বেরিয়ে পড়লাম কুণালের খোঁজে। অফিস টেলিফোন ডাইরেক্টরি ঘেঁটেই কুণালের খোঁজ পাওয়া গেল। কিন্তু দুজনে মুখোমুখি হতে আরও চার-পাঁচদিন কেটে গেল। ফোনে আমি কোকিলার কথা সেভাবে কিছুই জানাইনি। শুধু বলেছিলাম, ওকে চিনি। কুণালকে কোকিলার চিঠির কথা বলতে কুণাল চুপচাপ শুনল, যখন চিঠিটা ওর হাতে দিতে গেলাম নিল না। অদ্ভুত স্থির হয়ে বলল ‘চিঠিটার কোনও মূল্য আর নেই বোধহয়, গতকাল রাতে কোকিলা সবকিছুর ঊর্দ্ধে চলে গেছে। আমি চমকে প্রায় চিৎকার করে উঠলাম ‘কি! তুমি কি করে জানলে? কে খবর দিল? কি হয়েছিল?’ কুণাল ধীর গলায় বলল, ‘বিজয় চেম্বুরে এসেছে, ওর মাসির বাড়ি এখানেই। কাকতালীয়ভাবে আমিও সেই বাড়িতে পেয়িংগেস্ট থাকি।’

কোনও কথা না বলে আমি ফিরে এলাম নিজের ঘরে। এক অদ্ভুত ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম না খেয়েই। পরের দিন যথারীতি অফিস। পৌঁছোতেই আবার এক চমক। চিঠি। হাতের লেখা দেখেই বুঝলাম, কোকিলা। যে-মানুষটার চিঠি আমার হাতে, সে যে পৃথিবীতে নেই, ভাবতেই কেমন যেন এক বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে। চিঠিটা হাতে নিয়ে নিজের টেবিলে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে বসে রইলাম, সামনে কোকিলার চিঠি। চিঠিটা খুললাম, এক সুন্দর গন্ধের ছোঁওয়া চিঠির পাতায়। একইরকম ভাবে সম্বোধনহীন চিঠি।

‘কী হল, কুণালের সাথে দেখা হল? তোমার চিঠির অপেক্ষায়।’

—- কোকিলা

পুনশ্চঃ  তোমায় বলা হয়নি, আমি আর ভালো নেই। হাসপাতালে রয়েছি। এইচআইভি পজিটিভ। তাড়াতাড়ি যোগাযোগ কোরো। মনে হয় তুমি দেরি করে এলে, তোমারও মনে হবে বড়ো দেরি হয়ে গেলো।

Tags:
COMMENT