যে-গন্ধটা আসছে, সেটা খুব খারাপ গন্ধ। ঠাকুরের আসনের জুঁই-চন্দনের গন্ধ ছাপিয়েও এই গন্ধটা আসে। এই গন্ধে এখনও লোভ হয়। ইলিশ মাছের গন্ধ। মরণ! ইলিশ মাছ হচ্ছে আজ।

ছত্রিশ বছর ধরে ইলিশ খাচ্ছেন না তারাসুন্দরী। উনি গত হয়েছেন ছত্রিশ বছর হ’ল। কোনও মাছই তো খাচ্ছিলেন না, নিউমোনিয়া হবার পর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, ডাক্তার বলল চিকেন সুপ খেতে হবে। তারাসুন্দরী বলেছিলেন, ছি-ছি-ছি, মুরগির ঝোল? বিধবার মুখেও আনতে নেইকো। ডাক্তার বলেছিল, তবে শিঙিমাছের ঝোল খান। সেটাও খেতে চাননি, বলেছিলেন, এসব খেতে পারব না, আঁশটে গন্ধ লাগবে, এতদিন ওসব খাইনি, বমি হয়ে যাবে। ডাক্তার বলেছিল, বমি হবে না। হলে আমি আছি।

কই, আঁশটে গন্ধ লাগেনি তো, ভালোই লেগেছিল বেশ। মাছগুলো ঝোলের ভিতরে চটকে মিশিয়ে দিয়েছিল, বেশ বুঝতে পারছিলেন তারাসুন্দরী। কিন্তু ভালো লাগাটা কাউকে বুঝতে দেননি। দিতে নেই। চামচে করে সুপ খাইয়ে দিচ্ছিল ছেলে বউ, আর প্রতিবার মুখ বিকৃত করেছেন।

তারপরও, জ্বরজারি হলে একটু শিঙিমাছের সুপ খেয়েছেন। নাতনিটা বলেছে নিয়মভঙ্গ যখন হয়েই গেছে ঠাম্মা, রোজই একটু মাছ খাও। শরীর ঠিক থাকবে। একশো বছর টেনে দেবে।

একশো বছর টেনে দেবে কথাটা যে একটা খোঁচা মারা কথা এটা কি বোঝেন না তারাসুন্দরী? বেশ বোঝেন। বাড়ি সারাইয়ের সময় রাজমিস্ত্রিকে বড়ো বউমা বলেছে, ওটা শুনেছেন তারাসুন্দরী, শুনে ফেলেছেন– বাড়ি ভেঙে যাবে, খসে পড়ে যাবে, উনি থাকবেন। উনি মানে কে, সে কি বুঝতে অসুবিধা হয়? মাছ আর খান না। জ্বরজারি হলেও না।

ইলিশ হচ্ছে। গন্ধটা ম’ ম’ করছে। উনি খুব ইলিশ আনতেন। দু’ হাতে দুটো ঝুলিয়ে আনতেন বর্ষার দিনে। তখন তো মাছ কাটিয়ে আনত না আজকালকার মতো, নিজে মাছ কাটতেন। কালোজিরে কাঁচালংকার পাতলা ঝোল– কাঁচা কুমড়ো দিয়ে, সরষেবাটা আর সরষের তেল মাখিয়ে, কাঁচালংকা চিরে দিয়ে টিফিনবাটিতে ভাতের হাঁড়িতে রেখে দিয়ে ভাপা, নারকেলবাটা দিয়ে লাউপাতায় মুড়ে… কত কী…। ওনার শ্রাদ্ধে ছেলেরা ইলিশ খাইয়েছিল– উনি ভালোবাসতেন বলে। তারাসুন্দরী মরে গেলে ওর মৎস্যমুখীতেও হয়তো ইলিশ করবে ছেলেরা। আত্মা কি স্বাদ পায়?

কে জানে?

বলহরি শব্দ শুনলেন যেন তারাসুন্দরী। তখন বারান্দায় ছিলেন। কানের ছিপিটা চেপে ধরলেন। বলহরি। ইলিশ মাছের গন্ধের ভিতরে একটা মরণ চলে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। মালতী বলল, দত্ত-বাড়ির দিদিমা চলে গেলেন। তারাসুন্দরী বললেন– একটু জোরেই, বউমারা যেন শুনতে পায়– এমন দিন আমার কবে আসবে রে মালতী?

মালতী বলল, অমন কথা বোলো না দিদিমা। আমার খুব রাগ ধরে যায়…।

তারাসুন্দরী বললেন, নিরুপমাও চলে গেল। আমার চেয়ে কত ছোটো। ও ঠাকুর, আমাকেও তুলে নাও। জোরেই বললেন, ভগবান শুনতে পান বা না পান, বউমারা যেন শুনতে পায়।

()

এই বাড়িটাকে দারোগা-বাড়ি বলেই সবাই জানে। তারাসুন্দরীর স্বামী ছিলেন ব্রিটিশ আমলের দারোগা। পাড়ায় ছিল খুব প্রতিপত্তি। পাড়ার ক্লাবটার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তারাসুন্দরীর স্বামী শ্রীকান্ত মজুমদার। পাড়ার যে-বারোয়ারি দুর্গাপূজার হীরকজয়ন্তী না কী যেন হচ্ছে এবছর, ৬০ বছর, এই পুজোটাও শুরু করেছিলেন শ্রীকান্ত দারোগা। নবোদয় সঙেঘর ক্লাব ঘরে শ্রীকান্ত মজুমদারের ছবি আছে। বাড়িতে যে-ছবিটা আছে, তার চেয়েও যত্নে আছে। মালা পড়ে। নেতাজি, গান্ধিজিদের সঙ্গে এক লাইনেই নাকি ছবিটা আছে। এক ডাকাতের কাছ থেকে বেলেঘাটা খালপাড়ের কাছে ছ’কাঠা জমি সস্তায় কিনে নিয়েছিলেন শ্রীকান্ত দারোগা। তিনতলা বাড়ি। প্রতি তলায় পাঁচ-ছ’টা করে ঘর। একতলায় দুটো ঘর রেখে বাকি ঘর ভাড়া দেওয়া আছে।

দোতলায় বড়ো ছেলে, তিনতলায় ছোটো ছেলে। মেয়েরা কেউ এলে তিনতলায় থাকে। ওদের আলাদা ঘর রাখা আছে। মূল রান্নাবান্না দোতলাতেই, যদিও ছেলেদের আলাদা আলাদা ছোটো কিচেন আছে। বন্ধুবান্ধব এলে বা শ্বশুরবাড়ির কেউ এলে ওখানে টুকটাক ‘স্পেশাল’ হয়। ছেলেরা আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছে কিন্তু এ বাড়ি ছাড়েনি। ছাড়বে কেন? যতটা ছড়িয়ে থাকা যায়। দুটো নারকেলগাছও আছে, পেয়ারাগাছ, কাঁঠালগাছ। পাখিটাখি আসে। নীচের জমিতে শেড করে গাড়িও রেখেছে। প্রোমোটাররা প্রস্তাব দিয়েছে। এখন জমির দাম আগুন। দুই ছেলেই প্রোমোটারদের জমিটা প্রোমোটিং করার পক্ষে, এ নিয়ে কারওর মতবিরোধ নেই। মতভেদটা হ’ল মা কোথায় থাকবেন। সুতরাং মা যতদিন আছেন, ততদিন মুলতুবি। কিন্তু উনি যাচ্ছেন না তো। বয়েস তো হয়েছে। বয়সের কূলকিনারা নেই। কী করে থাকবে, তারাসুন্দরীর তো কোনও বার্থ সার্টিফিকেট নেই, অ্যাডমিট কার্ডও নেই। জন্ম সালটা কী করে জানা যাবে? তবে শ্রীকান্ত মজুমদারের পেনশনের বইতে তারাসুন্দরীর বয়েস লেখা আছে, হিসেব করলে দাঁড়ায় ৯৭ বছর চলছে। সুগার নেই, প্রেশার নেই, কিডনির গন্ডগোল নেই, চোখেও মোটামুটি দেখতে পান। কানে কম শুনছিলেন, হিয়ারিং এড দেওয়া হয়েছে। হাঁটতে চলতে একটু অসুবিধে, ধরে ধরে হাঁটাতে হয়, স্নান করার পর গা মুছিয়ে দিতে হয়, কাপড়টা পরিয়ে দিতে হয়। কিছুতেই ম্যাক্সি পরবেন না, বলেন শুধু সেমিজ পরে চলা যায়? লজ্জা করে না বুঝি? এইজন্য আয়া রাখা আছে। বেলা দশটা নাগাদ আসে, স্নান করিয়ে গা মুছিয়ে, চুল আঁচড়ে দেয়, দুপুরের খাবারটা দিয়ে যায়। নিজে হাতেই খেতে পারেন এখনও তারাসুন্দরী। এখন যে-আয়াটি আছে, গত সাত বছর ধরে, মালতী, দুপুরবেলা গা, হাত-পা টিপে দেয়, সন্ধেবেলা টিভি খুলে সিরিয়াল দেখায়, তারাসুন্দরী সিরিয়ালের ঘটনাগুলির খেই হারিয়ে ফেললে মালতী ধরিয়ে দেয়– ওই তো ও হ’ল রাশির ছোটো বোন, বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিল, ওর বরটা খুব পাজি, আবার ফিরে এসেছে…। ওই চাপ দাড়িওলা ছোঁড়াটা কে, আর্য? জিজ্ঞাসা করলে বলে চিনতে পারছ না দিদিমা? ওই-যে গো, মেজোবউটা ওর বিয়ের গয়নাগুলো সব তুলে দিয়েছিল যাকে, ওর সোয়ামিকে কিচ্ছুটি বলেনি। ওই লোকটা দুপুর দুপুর আসত… ও হ’ল গে মেজোবউটার… ইয়ে…।

মেজোবউয়ের নাং? বুঝেছি।

নাং শব্দটা শুনে মালতী তারাসুন্দরীর গায়ে ছোট্ট করে একটা কনুই খোঁচা দেয়।

যা গল্পগাছা হয়, মালতীর সঙ্গেই তো হয়।

বুচুর বাবার না ইয়া বড়ো গোঁফ ছিল, আর নস্যি নিত। গোঁফে নস্যি লেগে থাকত। আমার নাকের কাছে ওর গোঁফ গেলে হাঁচি হতো আমার। রাতের বেলা হেঁচে ফেলতুম, কী লজ্জা, কী লজ্জা…। আজকাল ওসব ল্যাটা নেই। ব্যাটাছেলেরা কেউ মোটা গোঁফও রাখে না, নস্যিও নেয় না।

বুচুর বাবা না বডিজ কিনে আনল। বলল, এটা পরবে, মেমরা পরে, বডি ঠিক থাকবে। আমি তো পরতেই পারিনে, আমাদের কালে তো ওসব ছিল না। বড়োজোর সেমিজ। উনি বললেন, এই দ্যাখো পিছনে টেপা বোতাম আছে। উনি বললেন, পরিয়ে দেব নাকি? কী লজ্জা

কী লজ্জা।

মালতীর তো বাড় বেড়ে গিয়েছিল, বলে– দাদু কী করে জানল ওসব কী করে পরতে হয়?

তারাসুন্দরীও কনুই দিয়ে খোঁচা মারে মালতীর গায়ে। হাসে, গোলাপি আভার মাড়ি ঝলকে ওঠে। বলে, সে কথা তো ভাবিনি তখন, ভাবতাম দারোগারা সব জানে। তবে ব্যাটাছেলে বলে কতা। পুরুষজাতি ভোমরা জাতি। ফুলে ফুলে মধু খায়। কে জানে ওর দু’একটা নাং ছিল কিনা? হ্যাঁরে, তোর সোয়ামির ওসব নেই তো? মালতী বলে, আরে ধুস, আমার সোয়ামি তো ঠুঁটো জগন্নাথ। হাত কই যে ওসব করবে?

সে কী রে, হাত নেই? দু’হাতই নেই?

দুটো না, একটা হাত নেই। বোমা বাঁধতে গিয়ে বাস্ট করে একটা হাত কনুই থেকে খুলে গেল।

জেনেশুনে বিয়ে দিল তোকে ওর সঙ্গে?

না, সে তো বিয়ের পর। বিয়ের আগে কলের মিস্তিরি ছিল। এখন কী করবে ও? এক হাতে কী হয় বলো? ঠোঙাও বানানো যায় না। মস্তানি তো করত না যে, হাতকাটা ভজন বলে এখনও কাজকম্ম করবে, তোলা তুলবে।

মস্তানি করত না তো বোমা বাঁধতে গেল কেন?

টাকার লোভে গো দিদিমা। পেটো বাঁধার কাজটা জানত। কী করে শিখেছিল কে জানে? ইলিকশনের আগে ওকে ধরে নিয়ে গেল। ব্যস, হয়ে গেল। এখন কী করবে বলো, তরিতরকারি বেচতে গেলেও তো দুটো হাত লাগে। পাল্লা ধরতে হয়।

এখন কী করে?

কী আর করবে, গাঁজার পুরিয়া বেচত, পুলিশ ধরল। মাসে মাসে টাকা দিতে বলল, বলল পোষাবেনে। এখন রাতের বেলা বাজার পাহারা দেয়, রাতে ঘুরে ঘুরে পিরিপ পিরিপ বাঁশি বাজায়। ক’পয়সাই বা পায়। তুমি ভালো থাকো গো দিদিমা, যেন রাতে তোমার কাছে না থাকতে হয়। বাড়িতে মেয়েটা আছে, একা ফেলে রাখতে পারব না।

এসব কথাবার্তা অনেক আগেকার। তারাসুন্দরী মালতীর মনের কথা জানে। মালতীও তারাসুন্দরীর। যখন ওর স্বামী ভজন হাতকাটা ভজা হয়ে ফিরে এল, তারপর মালতী বুদ্ধি করে হাসপাতালে গিয়ে নাড়ি কাটিয়ে এসেছিল, যেন আর বাচ্চা না হয়।

মালতীর মেয়ের বয়স তখন সাত, ছেলেটা পাঁচ। ছেলেটাও নেই। পাগলা কুকুর কামড়েছিল রাস্তায়। ও এখন মেয়ে অন্ত। ফ্রিজ থেকে চকোলেট চুরি করে মালতীকে দিয়েছে কত দিন– তোর মেয়েকে দিস। বড়োবউমা বুঝেছিল হয়তো, নইলে হঠাৎ একদিন বড়োর ঘরের ছোটো নাতনিটা ইয়া বড়ো একটা ক্যাডবেরি নিয়ে এসে কেন বলবে নাও ঠাম্মা, তুমি চকোলেট খেতে ভালোবাসো, এটা খেয়ো, মেয়েটা মুচকি মুচকি হাসছিল– ঠিক দেখেছিলেন তারাসুন্দরী। চকোলেট নেব বেশ করব– মনে মনে বলেছিলেন তারা। চাইলে কি মেয়েটাকে দিবি তোরা? বলবি আদেখলেপনা। চকোলেট খেতে পারি না? নিজের টাকায় খাব। কতগুলো করে পেনশন পাই। স্বামীর চাকরির পেনশন। যখন বিছানায় ছিলেন উনি, বলেছিলেন তো, যা টাকা রেখে গেলুম, তোমার কোনও কষ্ট হবে না। তা ছাড়া পেনশনের টাকা যা পাবে, হেসেখেলে দিব্যি চলে যাবে। ওরম অলক্ষুণে কথা বোলো না– মুখ চাপা দিয়েছিলেন তারাসুন্দরী। ক্যানসার ছিল কিনা, উনি তো জানতেন। বলেছিলেন কোনও কষ্ট কোরো না, মাথার চুল ফেলো না, মাছ খেয়ো, কোনও দোষ নেই। জীবনমরণ তো ভগবানের হাতে। ওনাকে নিয়েছেন, আমাকে নিচ্ছেন না তো আমি কী করব?

কত টাকা পেনশন পান তারাসুন্দরী জানেন না।

ছেলেরা বলত সই করো, করে দিতেন। পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। তখন একটু একটু লেখাপড়া জানতেন। উনিই চিঠি লেখা শিখিয়েছিলেন, বই এনে দিতেন সতীর পতি, আজব কুটুম৷ রতিবিলাস ও দাম্পত্যলীলা বইটা এনে বলেছিলেন, চুপি চুপি পড়বে। যখন বদলি হয়ে মালদা গেলেন, কত চিঠি লিখেছেন তারাসুন্দরী। ইতি তোমার আদরিণী তারা, ইতি তোমার বিরহিণী তারা, ইতি তোমার প্রেম কাঙালিনি তারা। এখন আর সই করতে পারেন না। হাত কাঁপে। বেশ কিছুদিন হল টিপসই দেন। কতবার জিগ্যেস করেছেন, হ্যাঁরে, আমার পেনশন এখন কত রে? ওরা ঠিক মতো বলে না। কখনও বলে তোমার আয়ার খরচ মোটামুটি হয়ে যায়। কখনও বলে তা দিয়ে তোমার কী হবে? তোমার যা লাগবে বোলো, পেনশনের টাকা আর কত, ছেলেরা আছি কী করতে?

কিন্তু তারাসুন্দরী জানেন ওঁর পেনশন ভালোই। টিভিতেও পেনশন বাড়ার কথা শুনেছেন। একটা সিরিয়ালেও একজন বিধবার মুখে বলতে শুনেছেন– তোমাদের খাই না পরি? নিরামিষ খেতে কত লাগে? তোমাদের ওই মুখে মাখার লোশনের মধ্যে জেনো, আমার পেনশনের টাকাও আছে।

যখন ছোটো নাতনি চুকচুকি ক্যাডবেরিটা এনে তারাসুন্দরীর হাতে দিয়েছিল, নাও ঠাম্মা, চকোলেট ভালোবাসো, খেয়ো…। তারাসুন্দরীও শুনিয়ে দিয়েছিলেন– ফ্রিজ থেকে নিয়েছিলাম তো একটা, খেতে সাধ হয়েছিল। দিস, মাঝে মাঝে দিবি, কেমন? দু’এক বার দিয়েছে তারপর। একবার দু’জনে মিলে ভেঙে খেয়েছে। চকোলেট রস লালা দু’জনের মুখের ভিতরে। ওরা হেসেছিল হিহি, হিহি, শিশুদের মতো। সেদিন টিভিতে গান হচ্ছিল পরান, না ছাইড়া যাইও রে…। মালতী বলেছিল, তুই ছাইড়া গেলে পরান চকোলেট দিমু কারে…? হিহি, হিহি। মালতী ক’দিন আগে রাস্তার আলুকাবলি নিয়ে এল। একটা একটা করে কাঠি দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছিল তারাসুন্দরীকে। তারা বলছিলেন এটা দিল চুকচুকি, এটা দিল ফুলটুসি, এটা দিল বাবুই…।

এরা ওঁর নাতি-নাতনিরা।

তারাসুন্দরীর প্রথম দুটো সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। তারপর বড়োছেলে। ছোটোবেলায় ওর কান ফুঁড়ে দিয়েছিল তারাসুন্দরীর শাশুড়ি, যেন নজর না লাগে। পাঁচ আনায় বেচেও দিয়েছিল কাকে যেন, তাই বড়োছেলের নাম পাঁচকড়ি।

সবাই পাঁচুবাবু বলে ডাকে। পঁচাত্তরের উপর বয়স। ওর সন্তান হয়েছিল বেশি বয়সে। তারপর দুই মেয়ের পর ছেলে। ছোটোছেলে প্রফেসর। এই সবে রিটায়ার করল। ওদের ঘরেই সব চুকচুকি-ফুলটুসি-বাবুই-পুঁচকুরা। ওদের সঙ্গে আর কথাবার্তা তেমন হয় না।

রাত করে খেতে আসে ওরা, অত রাত অবধি জেগে থাকেন না তারাসুন্দরী। আগে খাওয়ার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন।বলতেন, পাঁচুকে আর একটু ছ্যাঁচড়া দাও বউমা, চুকচুকি ফুলটুসিদের বলতেন, এত কম খেলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবি যে…। এখনও পয়লা বোশেখে বাটির উপর জল ঢেলে বাঁহাতের কেড়ো আঙুলে জল কেটে কেটে ফাঁড়া কাটান তারাসুন্দরী– যা কেটে যা পাঁচুর ফাঁড়া, যা কেটে যা নাড়ুর ফাঁড়া, যা কেটে যা বড়োবউমার ফাঁড়া…।

গন্ধটা আসছে, ইলিশ মাছের। জোরে শ্বাস টানলেন তারাসুন্দরী। তারপর বললেন– মালতী… দরজাটা বন্ধ কর।

()

এক রোববার সকালে নবোদয় সংঘ থেকে কয়েকজন ছেলেছোকরা দারোগা-বাড়িতে এল। বলল, এবছরের পুজোটা একটু ধুমধাম করে হবে। হীরক জয়ন্তী হচ্ছে।

সাংসারিক কথাবার্তা বড়োছেলে খুব একটা বলে না। ছোটোছেলে নাড়ুই বলে। ভালো নাম মানবেন্দ্র। বলল সে না হয় চাঁদাটা একটু বাড়িয়ে দেব এবার…।

ক্লাবের ছেলেরা বলল, না, চাঁদা নয়, সে জন্য আসিনি। আমরা এবার আপনাদের মা-কে সংবর্ধনা দেব। এ পাড়ায় তো উনিই সর্বজ্যেষ্ঠ। আপনাদের বাবা এই ক্লাব এবং দুর্গাপূজা পত্তন করেছিলেন। উনি নেই, ওঁর সহধর্মিণীকেই আমরা সংবর্ধনা দেব। উদ্বোধনটাও ওনাকে দিয়ে করাব ভাবছিলাম, কিন্তু অনেকে বলল, হীরক জয়ন্তী বলে কথা, সিনেমা আর্টিস্ট আনতে। কুহু-কেকা-কে রাজি করিয়েছি, সোর্স বেরুল, পঞ্চাশ হাজারে হয়ে যাবে।

কুহু-কেকা কারা?

কুহু-কেকা জানেন না? দুই বোন। নাচও করে। ধ্যাত্তেরিকা, খুকুমণি, মুচুমুচু এসব সিনেমায় অভিনয় করেছে। সিরিয়ালও করে। কুহু-কেকার সঙ্গে দিদিমার ছবি তুলে ক্লাব ঘরে রেখে দেব।

কিন্তু মা যাবেন কী করে? ওঁর তো শরীর ভালো নেই…। ছোটোছেলে বলে।

ভালোই তো আছে। বারান্দায় তো দেখি ওনাকে। বসে থাকেন।

সে নয় বসেন, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারবেন না, তোমাদের স্টেজেও ওঠা সম্ভব নয়…।

ওসব আমাদের উপর ছেড়ে দিন। একদম স্ট্রেচারে শুইয়ে সিধে স্টেজে নিয়ে বসিয়ে দেব। আপনারা শুধু ভালো দেখে একটা গরদের শাড়ি পরিয়ে রাখবেন, ব্যস। আর যদি দুটো একটা কথা বলতে পারেন তবে তো আরও ভালো।

আরে ধুর, একশো বছর বয়েস হ’তে চলল এখন। বক্তৃতা-টক্তৃতা দিতে পারে নাকি?

দিদিমা খালি বলবেন তোমাদের সব্বাইকে আশীর্বাদ করি… ব্যস। তা হলেই হবে। আরে এই পাড়ায় পুরোনো লোক বলতে এখন কজনই বা আছে? সব তো উটকো লোকে ভরে গেল। দারোগা-বাড়ি, রায় ভিলা, নস্করদের বাড়ি… ব্যস। রায় ভিলা তো এবার প্রোমোটিং হবে শুনছি। হ্যাঁ, বলে রাখি, আপনাদের বাড়িটা যদি প্রোমোটিং করেন, আগে আমাকে বলবেন কিন্তু,… ক্লাবের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি বলল।

না, এসব ভাবছি না… অন্তত মা যতদিন আছেন…।

আরে, দিদিমা আর ক’দিন। আগেভাগেই ঠিক করতে হয়। কাগজপত্রগুলো দিয়ে রাখতে পারেন। কিছুটা অ্যাডভান্সও দিয়ে রাখতে পারি…।

অন্য একজন, সম্ভবত সেক্রেটারি বলল, অ্যাই দিলীপ, তোকে নিয়ে পারা যায় না। কী জন্য এসেছিস? বাড়িটার বায়না নিতে নাকি দিদিমার জন্য?

দিলীপ নামের ছেলেটি বলল, ওই আর কী। দিদিমার কথা হতে হতেই তো দিদিমার বাড়িটার কথা এল। থাকগে দিদিমার সংবর্ধনা, ফাইনাল তো?

ছোটোছেলে বলে, মা কে সংবর্ধনা দিচ্ছ বলে গাদাখানেক চাঁদা চেয়ে বোসো না আবার।

জিভ কাটে ছেলেটা। বলে, কী যে বলেন। মাছের তেলে মাছ ভাজব ভাবছেন কেন? মিটিং-এ পাস হয়েছে এটা। আপনারা যদি বলেন, কথার কথা বলছি, এক পয়সাও চাঁদা দেব না, তা হলেও দিদিমাকে সংবর্ধনা দেব। দিদিমার মাথায় মুকুট পরাব, গায়ে চাদর পরাব। আর নস্কর বাড়ির ভুজঙ্গ নস্কর দিদিমা সম্পর্কে বলবেন। উনি দারোগাদাদুর বাড়ি আসতেন, বলছিলেন আমাদের। দিদিমা তালের বড়া ভাজতেন, পাড়ার সবাই সেই তালের বড়া খেতে আসতেন, অষ্টমীর খিচুড়িও নাকি নিজে হাতে রান্না করতেন– ওইসব বলবেন, আর আপনাদের ফ্যামিলির কেউ ওঁর সম্পর্কে দু’চার কথা বলবেন। আমাদের উদ্বোধন কিন্তু পঞ্চমীর দিন হবে। আর হ্যাঁ, একটা কথা, জরুরি কথা। আপনাদের ফ্যামিলির কেউ যদি দিদিমা সম্পর্কে বলেন, তখন কায়দা করে একটা লাইন ঢুকিয়ে দেবেন– যে উনি রামগোপাল জাদু মলম ব্যবহার করতেন। যে-কোনও ফোঁড়া, পোড়া, কাটাছেঁড়ায় অব্যর্থ। ওরাই আমাদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটা স্পনসর করছে কিনা…।

(৪)

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সকাল থেকে জেল্লা দেওয়া জরি-রোদ্দুর। সকাল থেকেই ঢাক বাজছে। মালতী সাবান মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিয়েছে তারাসুন্দরীকে। বিকেলে ফাংশন।

ছোটোছেলে এল ঘরে। বলল মা, একটা বক্তৃতা দিতে হবে তো, কী বলবে ঠিক করেছ?

কী বলব বলে দে না বাবা…।

বোলো দুনিয়ায় কত কী দেখলে। এত কিছু দেখতে পেলে, টিভি, মোবাইল, মেয়েরা সব বিদ্বান হচ্ছে, এসব কথা বোলো, আর এ বাড়িতে ছেলেদের কাছে ভালোই আছো, এটাও বোলো… ভালো আছো তো, না কী?

হ্যাঁ বাবা, খুব ভালো আছি।

সেটা বোলো। আর বোলো সবার ভালো হোক, সবাই ভালো থাকো, এই আর কী।

ছোটোছেলে মানবেন্দ্রবাবু তো প্রফেসর, ইকোনমিক্স পড়ান। প্রবন্ধ লেখেন। খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারেন।

বাড়িতে আজ অতিথি। বিয়ে হয়ে যাওয়া নাতনি এসেছে ওর বর নিয়ে, মেয়ের ঘরের নাতিটাও নাতবউ নিয়ে এসেছে সংবর্ধনা দেখবে বলে। দুপুরে ইলিশ মাছের গন্ধ, আবার।সারা ঘরে। উঃ অসহ্য। দোর দিয়ে দে মালতী।

বন্ধ দোর ঠেলে নাতি আসে, নাতনি আসে, বলে, কার মতো সাজবে? ঐশ্বরিয়া রাই, নাকি বিদ্যা বালন? অন্য কেউ বলে– না, না, দিদিমাদের যুগে ছিল নার্গিস, মধুবালা…।

তারাসুন্দরীর বেশ ভালো লাগছে। এতদিন বাঁচা হল বলেই তো এসব দেখা হচ্ছে। স্টেজে উঠে এই বয়সে মাইকে বলা… বাপরে…। বুক একটু ধুকপুক করছে নাকি? না-না, ও কিছু না।

মালতী সুন্দর করে গরদের শাড়ি পরিয়ে দিল, মুখে ক্রিম ঘষে দিল। নাতনিগুলো দেখতে এল। একজন ফেস পাউডারের পাফ ঘষে দিল। একজন ভ্রূ আঁকার পেনসিল দিয়ে ভ্রূ এঁকে দিল, কেউ একজন লিপস্টিক বাগিয়ে ধরতেই তারাসুন্দরী সদ্য আঁকা ভ্রূ কুঁচকে

বললেন, আমাকে সং সাজাবি নাকি, সং? কী পেয়েছিস? আমি দারোগার বউ।

ওমনি কোরাস হিহি। একটুখানি দেবই দেব।

হালকা করে, হালকা করে।

স্ট্রেচার নয়, চেয়ারে বসিয়েই নামানো গেল। প্যান্ডেল পর্যন্ত গাড়িতে, তারপর চেয়ারে বসিয়ে মঞ্চে। তারাসুন্দরী কানের ছিপিটা ভালো করে চেপে ধরলেন।

হাততালি হ’ল। কুহু-কেকাও এল, আরও অনেক বেশি জোরে হাততালি, অনেকক্ষণ ধরে। কুহু-কেকা নীচু হয়ে তারাসুন্দরীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, এবার আরও অনেক বেশিক্ষণ ধরে হাততালি হল।

ক্লাব সম্পাদক তাঁর ভাষণে কুহু-কেকার উপস্থিতির জন্য গৌরব প্রকাশ করলেন।

এই ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকান্ত মজুমদার, ভীম নস্কর, লালবিহারী রায় এদের স্মরণ করা হল এবং এ পল্লীর সবচেয়ে প্রবীণা মহিলা, যিনি এই অঞ্চলটির অভিভাবিকা, ছাতার মতো, বটগাছের মতো, তাঁকে সংবর্ধনা দিতে পেরে ধন্য। এবং সত্যিসত্যি মাথায় একটা মুকুট পরিয়ে দেওয়া হল। দেখে মনে হচ্ছে রুপোর। বিশ্বসুন্দরীদের এরকম পরানো হয়। পরিয়ে দিল কুহু, চাদর পরাল কেকা। ভুজঙ্গ নস্কর আসতে পারেননি, অসুস্থ, তাই তারাসুন্দরী সম্পর্কে বলতে বলা হল মানবেন্দ্র মজুমদারকে।

মানবেন্দ্রবাবু তাঁর ভাষণে, ভারতে ষাটোর্দ্ধ জনসংখ্যা কত? শতকরা হার, প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি এবং শেষকালে মা মানেই ভরসা, মায়েরা থাকা মানে শ্বাশ্বত মূল্যবোধগুলি বেঁচে থাকা এই বলে বক্তৃতা শেষ করলেন। জাদু মলম বলতে ভুলে গেলেন।

এবারে তারাসুন্দরীর মুখের সামনে মাইক ধরা হ’ল। উনি প্রথমেই হাসলেন, হাসির শব্দ শুনল সবাই। বললেন খুব আনন্দ হচ্ছে বাবা। ক্লাবের সেক্রেটরি বলল– নিজের কথা কিছু বলুন। কী খেতে ভালোবাসেন, কী করে সময় কাটান, কাটা ফোঁড়া ব্যথা হলে রাম গোপালের জাদু মলম ব্যবহার করেন ওই সব বলুন।

তারাসুন্দরী বললেন, আমি কী বলব বাবা, এসব মালতী বলবে।

মালতী… এই মালতী, একবার আয় না মা…।

মালতী সেজেগুজেই এসেছিল, যতটা সম্ভব। কী আতান্তরে পড়ল ও।

এবার কুহু নিজে মাইক নিয়ে ডাকল– মালতী নামে কে আছেন, স্টেজে চলে আসুন।

মালতী গেল। স্টেজের উপর। মাথা চুলকোচ্ছে। সামনে মাইক। কুহু বলল, বলো মালতীদি, বলো।

মালতী জানে প্রথমে কী বলতে হয়। বলল, আপনাদের সবাইকে নমস্কার। আমি দিদিমার দেখাশুনো করি। আমার স্বামীর হাত নেই। নেতাদের ভোটে জেতাতে গিয়ে হাত চলে গেছে। এই দিদিমা সেই হাত দিয়েছে। হাত মানে তো দুটো ভাত। মানুষ বাঁচালেই মানুষ বাঁচে। একা একা বাঁচা যায় নাকো। দিদিমা বেঁচে আছে বলেই আমি স্বামী, মেয়ে নিয়ে বেঁচে আছি। মেয়েটা এলেবেন কেলাশে পড়ছে। দিদিমা বেঁচে থাকলে বিএ পাশ করাব। দিদিমা কী খায় কী বলব। নিরমিষ্যি খায়…। আর কিছু মাথায় আসছে না। খুব আস্তে করে বলেই ফেলল, আর নিজের কামনা, বাসনা…। সবাই শুনতে পেল না। শব্দটা জড়ানো ছিল।

()

বাড়ির সবাই ফাংশন দেখবে। কুহু-কেকা একটু নাচবে। তারপর আরও আছে। ব্যান্ডের গান।

ওরা সবাই ফাংশন দেখবে। তারাসুন্দরীকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হ’ল। মালতীও গেল সঙ্গে। বাড়িতে শুধু মালতী আর তারাসুন্দরী। ওরা কেউ ফিরলে মালতী ওর ঘরে যাবে।

তারাসুন্দরী বললেন, তুই সবচেয়ে ভালো বলেছিস মালতী। একদম মনের কথা। আমার ছেলেটা যে কী বলল কিছুই বুঝতে পারলুম নে।

মালতী ঘর ছেড়ে বাইরে যায়। রান্নাঘরে ঢোকে।

প্লেটে করে এক টুকরো ইলিশ মাছ নিয়ে আসে। দরজাটা বন্ধ করে। অনেকটা বাতাস টেনে নেয় বুকে, তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, দিদিমা ইলিশ, আজ উৎসবের দিন। এটা

তোমার জন্য।

তারাসুন্দরী বলেন ওমা, কী অলুক্ষুণে কথা। বলিস কী। আমি এসব খাই নাকি?

মালতী বলে– অলুক্ষুণে কথা কেন? দারোগাদাদু তো বলেই গেছিলেন মাছ খেয়ো। আমাকে বলেছ তো সে কথা। কেউ দেখবে না। আমি কাঁটা বেছে খাইয়ে দিয়ে পেলেট পরিষ্কার করে দেব। কেউ জানবে না। শুধু তুমি আর আমি।

তারাসুন্দরী মাছের টুকরোটার দিকে চেয়ে থাকেন। সোনালি বরণ। বলেন ভয় করছে।

কীসের ভয় দিদিমা?

জানি না।

ধুর। খাও তো, এটাই তোমার

সংবর্ধনা। হাঁ করো।

তারাসুন্দরী বলেন, তা হলে ওনার মুখে ছুঁইয়ে পেসাদি করে দে।

দেয়ালে গোঁফওলা একটা লোক।তারাসুন্দরীর গোলাপি মাড়ি পদ্ম হয়ে ফুটে ওঠে।

Tags:
COMMENT