—মানস আমি বাড়ি যাব। অফিসে মেল করছি। যেতে আমাকে হবেই। বাবার শরীর ভালো নয়৷

—ওখানকার পরিস্থিতি ভালো নয়। সাংঘাতিক অবস্থা! আমাদের ইমিউনিটি কি পারমিট করবে?

—আমার মা চলে গেল। বাবার শরীর ভালো নয় আর তুই এখন ইমিউনিটির চিন্তা করছিস? আমি যাবই। যেতে আমাকে হবেই। তুই গেলে ভালো, না হলে আমি একাই যাব

—বাস্তবটাকে বাদ দিই কী করে? আমার ওবেসিটি, সুগার!

—তুই যাস না। বাবাটা তো তোর নয়! আমার। তাই আমাকেই…

—আমিও তবে যাব। তোকে একা ছাড়ার প্রশ্নই নেই। আমি যদি আর না ফিরি তখন বুঝবি! মানসের কথাগুলো রায়ার কানে যায় না। ল্যাপটপ নিয়ে অ্যাপসগুলোতে দ্রুত ফ্লাইটের টিকিট-এর স্টেটাসে চোখ বুলিয়ে নেয় রায়া। কাল ভোরের ফ্লাইট পেলেই সবচেয়ে ভালো হয় ৷

(8)

দমদম এয়ারপোর্টে নেমে রিমির ফোন আসতেই খবরটা পেল রায়া। বাবা আর নেই। গতকাল রাতেই কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা হল— কোনও হসপিটালে বেড পাওয়া যায়নি। ফ্ল্যাটে ঢুকেই বিছানায় শোওয়া বাবাকে দেখে ছুটে যেতে পারে না রায়া। কোভিড প্রোটোকল মেনে মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস। এ ফ্ল্যাটের নাকি অনেকেই সংক্রমিত। ফ্ল্যাটে রিমি আর দীপু জামাইবাবু ছাড়া কেউ নেই। বাইরে স্বর্গযান নামক কাঁচের গাড়ি দাঁড়িয়ে। মুহূর্তেই ঘরের ভিতরটা দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত বাসস্থান মনে হয়। এই ঘরেই বাবা ছিল একা!

শহরের পাঁচটা হাসপাতালেও জায়গা হয়নি রে, অক্সিজেন সিলিন্ডার এনে চেষ্টা করেছিলাম! কিন্তু!

—বাবাও চলে গেল বল! আর কেউ রইল না। কেউ না!

—অনেকবার ওনাকে বেরোতে বারণ করেছি, কিন্তু উনি শুনতেন না। সকাল, সন্ধে নিয়ম করে হাঁটতে বেরোতেন। কিন্তু পরিস্থিতি যে সুবিধের নয়, সেটা বুঝতেন না। ট্রিটমেন্টের সুযোগ না দিয়েই চলে গেলেন। বলেই দীপেন্দ্র মানসের দিকে তাকায়। তবে এই পরিস্থিতিতে তোমরা না এলেই পারতে। আমারও কোভিড পজিটিভ ছিল। তবে অল্পের উপর দিয়ে গেছে।

বাবাকে শেষবারের মতো দেখে, রায়া-রা আর দেরি করেনি। শেষযাত্রায় বাবাকে রওনা করিয়ে দিয়ে একটা ক্যাব বুক করে ওরা গিয়ে উঠল এয়ারপোর্ট লাগোয়া এক পাঁচতারা হোটেলে। সুতো কাটা ঘুড়ির মতোই এখন রায়া নির্ভার! কোনও পিছুটান আর রইল না। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নেয় রায়া আর মানস। বুকের মধ্যে শোকের পাথর থাকলেও মনের মধ্যে একটা কাঁটা খচখচ করছে। দীপু জামাইবাবুর যে কোভিড হয়েছিল, সেটা তো দিদি বলেনি! মানসও ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে। এক কাপ কফি নিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসল মানস, দ্রুত আঙুল চালিয়ে টিকিটের স্টেটাস দেখে নেওয়া আর কী!

—জানি, এ কথা বলার সময় নয় এখন। তবু আমাদের এখানে আসাটা উচিত হয়নি।

—তোর বাবা হলে এমন বলতে পারতিস?

—এখানকার পরিস্থিতি তুই বুঝতে পারছিস না রায়া।

—বুঝতে চাইও না আমি। আমায় একটু একা থাকতে দে প্লিজ।

ভয়টা তাড়া করে বেড়ায় রায়াকেও। ভয় নামক শত্রু এমন ভাবে মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, ঘরটাও একবার ঘুরে দেখা হল না। মায়ের স্মৃতি ঘেঁটে দেখা হল না। বাবাকেও শেষবারের মতো আদর করা হল না। ভিতর থেকে কি তবে মা-বাবার থেকে অনেক দূরে সরে গেছে রায়া! কয়েক হাজার মাইলের দূরত্ব কি দেশ কাল অতিক্রম করে মনেও জায়গা করে নিয়েছে? রিমি আর দীপু জামাইবাবু তো দায়িত্ব ছেড়ে পালাতে পারেনি। এই ভাইরাস আসার আগেই কি তবে সুতোর টানটা ছিঁড়ে গিয়েছিল? নাকি সবই এই পরিস্থিতির জন্য? মা নেই, বাবাও নেই। কিছুই নেই। পিছন ফিরলে এক স্মৃতির পাহাড় উঁকি দেয়।

ছোটোবেলায় বাবা, মা আর দিদির সঙ্গে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিল রায়া। জলপাইগুড়ির চা বাগান পেরোতেই দূরে দেখা যাচ্ছিল ধোঁয়া ধোঁয়া পাহাড়। ঠিক সেরকমই রায়া শুনতে পাচ্ছে বাবার বলা চাঁদের পাহাড়ের গল্প। আলভ্যারেজ, শঙ্কর, আপাং, ফস্টার আরও কত চরিত্রের গল্প। পরে যখন সেই বই পড়েছে তখন বুঝেছে আপাং, ফস্টার এগুলো বাবার মনগড়া। আরও কত স্মৃতি! বাবা-মায়ের কোলে বেড়ে ওঠা একটা গোটা রায়া! সেবক রোড পেরিয়ে যত উত্তরদিকে ছুটে চলছিল গাড়ি, ততই ধূসর পাহাড় নীল রং নিয়ে ধরা দিচ্ছিল রায়ার কাছে৷ তেমন ভাবেই ছোটোবেলাটা রায়ার সামনে ভেসে উঠছে। তার রং নীল। মায়ের কোলে লেপটে থাকা আদুরে বেড়াল ছানার মতো ছোট্ট রায়া।

—টিকিট পাওয়া গেছে। আগামীকাল বিকেলের ফ্লাইটে বেঙ্গালুরু, ওখানে চার ঘণ্টা পর পরের ফ্লাইট। পালাতে পারলে বাঁচি ।

( 5 )

মা, বাবার পর রায়ার জীবনেও এবার এল তৃতীয় ঢেউ। বেঙ্গালুরু এয়ারপোর্ট থেকে ডাচদের দেশে ফেরা আর সহজ হল না৷ মেডিকেল চেক-আপে মানস ক্লিনচিট পেলেও রায়া পেল না। রায়া কোভিড পজিটিভ। তাই আপাতত চোদ্দদিনের কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে। তাই ওদের ঠিকানা আপাতত বেঙ্গালুরুর এক পাঁচতারা হোটেল। এই অযাচিত ভাবে আটকে যাওয়ার ওপারে কী অপেক্ষা করছে তা বোধহয় বিধাতারও অজানা!

অদ্ভুত ভাবেই হোটেলে তখন দেশে না ফেরাদের ভিড়। ভালো স্যুইট পেতে কোনও অসুবিধে হল না ওদের। ভিডিও কলিংয়ে ওদের জেনারেল ফিজিশিয়ান-এর সঙ্গে কথা হল। ওনাকে বলে ওষুধ নিয়ে আসা হল। দিন তিনেকের মধ্যেই রায়া সুস্থ, এমনিতেই ওর সেরকম কোনও সিম্পটম ছিল না। এবার অসুস্থ হল মানস। গুরুতর অসুস্থ। জ্বর, সঙ্গে কাশি। আবার ভিডিও কলিং চলল। ওষুধ এনে দিল রায়া। কিন্তু দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল শরীরের।

সেদিন রাত্রে রায়া যখন গরম স্যুপ খাওয়াচ্ছে মানসকে, আহত বাঘের মতোই মানস গর্জে উঠল, “কেন আমায় টেনে আনলি? আমার আর ও দেশে ফেরা হল না!” বলেই ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা জুস গলায় ঢালল মানস। কিছুতেই থামাতে পারল না রায়া। অত লম্বা, বড়ো চেহারার লোকটাকে কিছুতেই বাগে আনতে পারে না রায়া। শিশুর মতো ছটফট করছে মানস। কী করবে রায়া! এই হোটেলে যদি ধরা পড়ে যায়, কোভিড লুকিয়ে ওরা থাকছে এখানে! কিন্তু কী করবে? আরও একদিন দেখবে?

—হসপিটালে ভর্তি কর মানসকে। দেরি করিস না। ভীত কণ্ঠে রিমি বলছে বারবার। কিন্তু একা রায়া কী করবে? মানুষটা কাশছে, জ্বর আছে গায়ে। ওষুধ তো খাচ্ছে। কখনও মনে হচ্ছে শরীর একটু ভালোর দিকে, আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে বেগতিক। না আর দেরি নয়। তিনদিন হয়ে গেল। যায় যাক এই নিরাপদ আস্তানা!

রায়ার চোখ-মুখ ভাবলেশহীন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় মানুষ নয়, পাথরের মূর্তি। একটা অপেক্ষায় বসে থাকে সে, যে অপেক্ষার ওপারে শুধুই অন্ধকার। এখন অনন্ত সময় তার কাছে। কোনও তাড়া নেই। বডিটা পেলে সোজা যাবে বার্নিংঘাট, একা। হসপিটাল থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সব ব্যবস্থাই হিসেবের মধ্যে বাঁধা এখন। এই অচেনা পরিস্থিতিটা বুঝতে খানিকটা দেরি করে ফেলেছে রায়া।

তিনতলার কোভিড ওয়ার্ডে সাতদিন ধরে ভর্তি ছিল মানস। দিন প্রতিদিন অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমেছে। বুকের পাঁজর হাপরের মতো উঠেছে আর নেমেছে। গেল বছর সুগার ধরা পড়েছিল মানসের। বহুবার রায়া বলেছে, ফার্স্ট ফুড না খেতে, হালকা ব্যায়াম করতে, হাঁটাহাটি করতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

স্থবির হয়ে যাওয়া মানসের চোখে-মুখে ফুটে থাকে আক্ষেপ। রায়ার মধ্যে জন্ম নেয় আর এক রায়া, অনুশোচনা আর ভয় দিয়ে তৈরি যার মুখের অবয়ব। আজ সকালেই মানস চলে গিয়েছে। তাকে নিয়ে আর সত্যিই ফেরা হবে না রায়ার। তৃতীয় ঢেউ ভাসিয়ে নিয়েছে সব।

সাপ সিঁড়ির আটানব্বই নম্বর ঘরে পৌঁছে ঘুঁটিতে দান পড়েছে পুট, সোজা সাপের মুখে। ডানা ছিঁড়ে পড়ে আছে কোথাও সেই সাদা প্রজাপতিটা। মানস বলেছিল ওদের লাইফ স্প্যান মাত্র সাতদিনের।

রায়ার মোবাইলে বিপ বিপ করে মেসেজ আসে ডক্টর সোমের ইনফার্টিলিটি ক্লিনিক থেকে। আইভিএফ-এর প্রসিডিওর-এর জন্য ওরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে চাইছে। দেখা যাক জীবন নামক সাপ সিঁড়ির বোর্ডে পরের ঘুঁটি কী দান দেয়!

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...