অন্তর দিয়ে অজন্তা দেখে, যাত্রা করেছি ঔরঙ্গাবাদ। পথ দূরত্ব প্রায় ৭৬ কিমি। ঘণ্টা তিনেকের মকদ্দমা। পিচঢালা পথ মাখন সদৃশ। ফলে বাসজার্নিতে সেরকম ক্লান্তি নেই। বাসে স্থানীয় মানুষজনের ভিড়। আর ভিনদেশী পর্যটক বলতে কেবল আমরাই। শেষপর্যন্ত শেষ বিকেলে গাড়ি এসে পৌঁছোয় ঔরাঙ্গাবাদে।

শহরটা কিন্তু খুবই ঘিঞ্জি। কেমন একটা মধ্যযুগীয় আমলের গন্ধ যেন তার গায়ে। ঔরঙ্গজেবের স্মৃতি বিজড়িত এই ঐতিহাসিক জনপদ, বর্তমানে মহারাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক শিল্পনগরী। ঔরঙ্গাবাদকে কেন্দ্র করেই দেখে নিতে হবে, বিশ্ববিখ্যাত ইলোরা গুহা, দউলতাবাদ দুর্গ ও অন্যান্য দ্রষ্টব্য। বাসস্ট্যান্ডের বাজারটা ছাড়িয়ে যেতেই চোখে পড়ে চমকদার বেশ কিছু হোটেল। তারই একটায় লাগেজ নামিয়ে চটপট ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর রিসেপশনে গিয়ে পরদিন ঘোরার জন্য গাড়ির ব্যাপারটা ফাইনাল করে নিলাম। পরপর বেরিয়ে পড়লাম আলো ঝলমলে শহরটাকে দেখতে। তবে এত ভিড়-ভাট্টা, বেশিদূর যাওয়ার আদৌ ইচ্ছা হল না। ডিনারের পর ডুব দিলাম ঘুমের দেশে।

সাকিলের গাড়িতেই সারাটা দিন ঘুরব। দ্বিতীয় রাউন্ড চা-পর্ব মিটতেই সে এসে হাজির। চাকা গড়াতেই চলে এলাম পানি চাক্বি। মধ্যযুগে এখানে জলশক্তির সাহায্যে চাকা ঘুরিয়ে শস্য পেষাই করা হতো। টিকিট সংগ্রহ করে ভিতরে প্রবেশ করলাম। প্লেনটা অনেকটা অঞ্চল জুড়ে পরিব্যপ্ত। জলের উৎস অবশ্য কাছাকাছি নেই। শুনলাম, প্রায় ছয় কিমি দূরের পাহাড়ি জলাধার থেকে মাটির পাইপ লাইনে জল আসত। উঠে গেলাম ওপরে। উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখলাম মধ্যযুগীয় সব কলকবজা। আধুনিক শিল্পবিপ্লবের আগে মধ্যযুগীয় এই শিল্পভাবনা বেশ অবাক করল! জলাভাবে এখন পেষাই যন্ত্র অচল। তবে লাগোয়া জমিতে গাছ-গাছালিতে ঘেরা এক সুন্দর বাগান। আর বাঁধানো এক জলাধার। সেই জলে খেলে বেড়াচ্ছে একাধিক রঙিন মাছ। পাশেই দেখে নিলাম, ঔরঙ্গজেবের সুফি ধর্মগুরু বাবা শাহি মুসাফির সাহেবের দরগা। এসব দেখে উঠে পড়লাম গাড়িতে।

এবার ‘দক্ষিণের তাজ’ দেখতে ছুটে চলে গাড়ি। ‘বিবি-কা-মকবরা’ ই ‘দক্ষিণের তাজ’ নামে খ্যাত। জায়গাটা অনেকটা এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। ছড়ানো সবুজের মাঝে এক শান্তির পরিবেশ। স্থানীয় মানুষজন ইলোরা ও ঔরঙ্গাবাদের আশপাশ সম্পর্কে গাইডবুক, ম্যাপ বিক্রি করছেন। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। দূর থেকে কিন্তু অনেকটাই মিল পাওয়া যায় আসল তাজের সঙ্গে। তবে যত কাছে যাচ্ছি, ভুলটা ভাঙছে। তাজের মতোই মাঝে শ্রেণিবদ্ধ ফোয়ারা রেখে কেয়ারি করা লনের দু’দিকে পায়ে চলা পথ। তবে অযত্নের ছাপ সর্বত্র।

ঔরঙ্গজেবের প্রথম স্ত্রী বেগম রাবিয়া দুরানির স্মৃতিতেই এই সমাধিসৌধ। তবে সৌধের নির্মাণ স্রষ্টা কে? এ নিয়ে অনেকেই দ্বিমত। কেউ বলেন স্বয়ং ঔরঙ্গজেব, আবার কারও মতে তাঁর পুত্র আজমশাহ এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন। ১৬৫৩-১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পারস্যের স্থপতি উস্তাদ আতাউল্লার নেতৃত্বে একদল কারিগর এটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। তাজমহলের রেপ্লিকা হলেও, এর গঠনশৈলী কিন্তু নেহাত মন্দ নয়। এর উপরের অংশ শ্বেতশুভ্র মার্বেল দিয়ে মোড়া। কিন্তু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে নীচের অংশে রয়েছে পাথরের ওপর মিহি প্লাস্টারের কারুকার্য।

জুতো খুলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এলাম। সামনেই আড়ম্বরপূর্ণ রাবিয়া দুরানির স্মৃতি সমাধি। ফুলে-ফুলে ভরা সমাধিস্থল দেখে মন ভরে গেল। সমাধির চারপাশে পাথরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারুকাজ। শিল্পীগণ নিপুণ হাতে পাথরের বুকে তাদের দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। পাশেই রয়েছে বেগমের নার্সের সমাধিও। পূর্ণ শান্তির বাতাবরণ সমাধিক্ষেত্র জুড়ে।

এবার যাত্রা তুঘলকি রাজধানী দউলাতাবাদে। পথ দূরত্ব মাত্র ১৪ কিমি। ঔরঙ্গাবাদ থেকে ইলোরা যাওয়ার সময়, বহু দূর থেকেই দৃষ্টিগোচর হয় এই দুর্গ। বিস্তীর্ণ সমতলের মাঝে এক আগ্নেয় পাহাড়ের উপরেই এর অবস্থিতি। দুর্ভেদ্য এই দুর্গের অনেকটাই ধবংসপ্রাপ্ত। ধনদৌলত, দামি-দামি আসবাব চুরি হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবু যা আছে, ভালো ভাবে দেখতে একবেলা কেটে যাবে।

ইতিহাস বলছে, যাদবরাজ ভিল্লাসার ১১৮৭ খিস্টাব্দে এই দুর্গ নির্মাণ করেন। প্রথমে এই দুর্গের নাম ছিল দেবগিরি। পরবর্তীতে বহুবার হাতবদল হয়েছে এই দুর্গের। শেষ পর্যন্ত ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ-বিন-তুঘলক,  এর অধিগ্রহণ করেন। তিনি বৈদেশিক আক্রমণ থেকে রাজধানীর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে, দিল্লি থেকে রাজধানী স্থায়ী স্থানান্তর করেন এখানে। তুঘলকের ইচ্ছানুসারে এখানকার নতুন নাম হয় দউলতাবাদ। রাজধানী প্রতিষ্ঠার পরবর্তীতে জলাভাবে জেরবার হয় এখানকার মানুষজন। এই জলকষ্টের স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হয়নি, দীর্ঘ খরা ও দুর্ভিক্ষের জন্য। শেষ পর্যন্ত সব দিক বিবেচনা করে (১৭ বছর পর) তিনি দিল্লি প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে এখানে রাজত্ব কায়েম করেন জাফর খান। মুঘল সম্রাট শাহজাহান ও মারাঠাদের হাত ঘুরে হায়দরাবাদের নিজামের দখলে আসে এই দুর্গ।

এএসআই-এর কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে দুর্গ চত্বরে প্রবেশ করলাম। ঢুকতেই চোখে পড়ে এক জলের ট্যাংক। মধ্যযুগীয় এই প্রকাণ্ড জলাধার বর্তমানে নেট দিয়ে ঢাকা। অনতিদূরে টাওয়ার সদৃশ চাঁদমিনার। দক্ষিণ ভারত বিজয়ের স্মারক হিসাবে ১৪৩৫ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দিন বাহমনি, পার্সি আদলে এই মিনারটি নির্মাণ করেন। ৩৩ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট গোলাপি রঙের এই মিনারটি, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিনার হিসাবে পরিচিত। চাঁদমিনার আসলে এক নজর মিনার। যেখান থেকে দুর্গের চারপাশে নজরদারি করা হতো। পাশেই ইতিহাসসাক্ষী হিন্দু মন্দিরের ধবংসাবশেষ।

এবার চারপাশ দেখতে-দেখতে চড়াই পথে উঠতে থাকি। সামনেই গজাল গাঁথা প্রকাণ্ড হাতি দরওয়াজা। ভাবতে অবাক লাগে সে সময় মানুষজন কেমন ভাবে এই দুর্গে ওঠানামা করত। ৬০০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এই দুর্গকে আরও দুর্ভেদ্য করা হয়েছে কৃত্রিম পরিখার পরিমণ্ডলে। পরিখা পার হওয়ার জন্য ছোট্ট ব্রিজ, সে আমলে কাঠের তৈরি ছিল, বর্তমানে তা লোহার। সেতু পার হতেই সামনে ভুলভুলাইয়া পথ। টানেলের গোলক ধাঁধার অন্ধকার পথ পার করতে এক সরকারি গাইড এগিয়ে এল। হাতে তার জ্বলন্ত মশাল। এই পাহাড়ি টানেলের মধ্যেই ছিল শত্রুনিধনের নানাবিধ পদক্ষেপ। গরম তেলের ছ্যাঁকা, হিংস্র কুমিরের কামড় আর কষ্টদায়ক কাঁটার জ্বালার গল্প শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। টানেলের ইউ টার্ন শেষে উপরে ওঠার ধাপ সিঁড়ি। অনেকটা আঁধার পেরিয়ে শেষে এবার আলোকিত দুর্গ-দুয়ারে।

সিঁড়ির সিরিজ শেষ করে চলে এলাম চিনি মহলে। এককালে চিনিমহল চিহ্নিত ছিল বিলাসমহল প্রাসাদ হিসাবে। কালের নিয়মে আজ তা জীর্ণ, মলিন, ধবংসপ্রাপ্ত। এই প্রাসাদেরই এক কক্ষে বন্দি ছিলেন গোলকুণ্ডার শেষ নবাব আব্দুল হাসান তানাশাহ। ঔরঙ্গজেবের আদেশেই তাঁর এই বন্দিজীবন। ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে দীর্ঘ তেরো বছর বন্দিজীবন কাটিয়ে তিনি এখানেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

দুর্গ ইতিহাসকে ভালো ভাবে জানতে, এবার চিনি মহলের ছাদে উঠলাম। যেখানে আছে ২০ ফুট লম্বা ভেড়ার মুখ খোদাই করা দীর্ঘ এক কামান। অবশ্য ছোটো ছোটো আরও অনেক কামান দেখেছি, দুর্গ পথের আনাচে-কানাচে। ধাপ ধরে আর একটু উঠতেই দেখলাম বরাদরি। যাদব রানির খাস প্রাসাদই বরাদরি। দুর্গের বিভিন্ন দিকে আরও রয়েছে ভারত মাতার মন্দির, শিব মন্দির, জৈন তীর্থংকরদের মূর্তি। তবে প্রাসাদ শীর্ষে আজও অক্ষত-অটুট যাদববংশীয় রাজাদের নির্মিত বিষ্ণুর পাদপদ্ম। অবশ্য এতদূর পর্যন্ত ওঠা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে এখান থেকে পাখির চোখে ঔরঙ্গাবাদ শহরটাকে দেখতে লাগছিল বেশ। দুর্গের বরফিকাটা দেয়াল, অলিন্দ, ফটক সৌন্দর্য,   কার্নিস, আর্চ, রেলিং ইত্যাদি নিঃসন্দেহে মনকে আবিষ্ট করে। এক অসমাপ্ত স্বপ্ন প্রাসাদের নিঝুমপুরীর গল্প যেন শেষ হয়েও রেশ থেকে যায় মনের কোণে।

এবার খুলতাবাদ। তবে এই এলাকার খোলামেলা ঘিঞ্জি বাজারটা যেন রাস্তাজুড়ে। পরপর বেশ কয়েকটা তোরণদ্বার পেরোতেই পেয়ে গেলাম কাঙিক্ষত সমাধিস্থল। এখানেই শায়িত আছেন পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট ঔরঙ্গজেব। খোলা আকাশের নীচে অনাড়ম্বর পরিবেশে এই সমাধি। এই ইচ্ছা সমাধির অনুপম স্বপ্নটা তিনি জীবদ্দশাতেই প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সৎ পথে স্বল্প সঞ্চয়ের এক ফান্ড তৈরি করেন। টুপি সেলাই ও কোরান নকল করেই এই আমানত। যা তিনি মৃত্যুশয্যায় অর্পণ করেছিলেন পুত্রদের। এই অতি সাদামাটা সমাধি দেখে ধর্মান্ধ, ভ্রাতৃঘাতী, পিতৃঘাতী সম্রাটের ভাবমূর্তিটি কোথায় যেন হোঁচট খায়। পাশেই রয়েছে আর এক বিখ্যাত দরগা। মুসলিম ধর্মগুরু সৈয়দ জৈনউদ্দিন এখানে শায়িত। তিনি ঔরঙ্গজেবেরও ধর্মগুরু। তবে এই দরগার ক্ষেত্রে অবশ্য এতটুকু কার্পণ্যতা করা হয়নি– যথেষ্টই জাঁকজমকপূর্ণ। ফুল, আতর ও ধূপের সৌরভে আমোদিত।

ছুটে চলা গাড়ির এবার গন্তব্য গুহাভাস্কর্যের আঁতুড়ঘর ইলোরায়। প্রবেশপথেই ব্যক্তিপ্রতি ১০ টাকার টিকিট কাটলাম। গাড়ি প্রবেশের জন্যও নিতে হল বাড়তি টিকিট। গেট লাগোয়া এক ঢালু জমির উপর এমটিডিসি-এর সুন্দর রেস্টুরেন্ট। ছিমছাম পরিবেশে মধ্যাহ্নভোজনের পর আবার গাড়িতে। চলেছি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটখ্যাত ইলোরা গুহায়। সাথে রয়েছে সরকারি গাইড। সে গাড়ির মধ্যেই শুরু করে দেয় ইতিহাস কথা। জানলাম প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে পরিব্যাপ্ত এই ইলোরা গুহাগুলি। সমস্ত গুহা ভালো ভাবে দেখতে গেলে কয়েক ঘণ্টা নয়, সারাটা দিনই সদ্ব্যবহার করতে হবে। এখানে মোট চৌত্রিশটি গুহা পরিবার নিয়েই ইলোরা ঐতিহ্যের অনন্যতা। এর মধ্যে মাঝের সতেরোটি গুহা হিন্দুদের। দক্ষিণের বারোটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের। আর বামের পাঁচটি জৈনধর্মাবলম্বীদের। এ যেন রাষ্ট্রকূট রাজাদের সর্বধর্ম সমন্বয়ের চোখে আঙুল দেওয়া বড়োসড়ো উদাহরণ।

এই পাহাড় কেটে গুহা ভাষ্কর্য নির্মিত হয়েছিল ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতক জুড়ে। হাজার-হাজার শিল্পী শ্রমিকের উদয়াস্ত পরিশ্রমের মিলিজুলি ফসল এই চোখ জুড়ানো স্থাপত্য সম্ভার। তবে অজন্তার মতো ইলোরা কোনও কালেই লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল না। ফলে বহু বিদেশি পর্যটকের যেমন ভূয়সী প্রশংসা মিলেছে, অন্যদিকে মুসলিম আক্রমণের হাত থেকেও নিস্তার পায়নি এই গুহা-ভাস্কর্য। গাইড আরও জানায় গুহাগুলি অজন্তার মতো একই সারিতে ঠিক-ঠাক নেই। ফলে এক গুহা থেকে অন্য আর এক গুহায় প্রবেশ ও প্রস্থান মিলিয়ে সময় লাগে যথেষ্টই।

অর্ধ চন্দ্রাকৃতি এক পাহাড়ের সামনে এসে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। সামনের রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ষোলো নম্বর গুহার অভ্যন্তরে। তার মানে সেই বিখ্যাত কৈলাস-গুহা। ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারী’ ছবির সিংহভাগ শুটিং হয়েছিল এই গুহাতেই। ভিতরে ঢুকতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল। অবাক চোখে শুধু তাকিয়ে থাকি! যেন খোদাই শিল্পের সমুদ্রে এসে পড়েছি। একটা আস্ত পাহাড়কে সুনিপুণ ভাবে কেটে, কী নিখুঁত ছেনি-বাটালির শিল্পভাবনা পরিস্ফুট হয়েছে– না দেখলে কোনও ভাবেই বিশ্বাস করা যাবে না। গাইড উল্লেখ করে, তৎকালীন সময়ে এই মন্দিরটি নির্মাণে সাতশো শ্রমিক নিযুক্ত ছিল। সময় লেগেছিল প্রায় দেড়শো বছর।

ত্রিতলধর্মী এই গুহামন্দির শিবের নামেই উৎসর্গীকৃত। শিবই এখানকার প্রধান দেবতা। মন্দির অভ্যন্তরে এখনও পূজিত হয় এক বৃহৎ শিবলিঙ্গ। শিব কখনও দৈত্যবধ করছেন, কখনও তান্ডব নৃত্য করছেন, কখনও পার্বতীর সঙ্গে বসে পাশা খেলছেন, কখনও তিনি অর্ধনারীশ্বর। এছাড়া লক্ষ্মী, দুর্গা, গনেশ, কুবের, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব অনুচর নন্দী এখানে বিরাজমান। আছে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণকথার দেয়াল স্থাপত্য। মিলবে, কিন্নরীদের কামকলার মোহগ্রস্ত পাথর ভাস্কর্যও।

কৈলাস গুহা থেকে বেরিয়ে ১ থেকে ১২ নম্বর বৌদ্ধগুহাগুলি দেখতে গেলাম। বাছাই-এর নিরিখে গাইড ৫, ৬, ৭, ১০ ও ১২ নম্বর গুহাগুলি দেখালেন। গাইডের কথা থেকে জানা যায় যে এই বৌদ্ধগুহাগুলিতে বৌদ্ধমূর্তি, পিপুল বৃক্ষতলে উপবিষ্ট বুদ্ধদেব, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বৃহৎ ক্লাসঘর, বোধিসত্ব, পদ্মপাণী ও বজ্রপাণীর অবস্থান। ৫ নম্বর বিশাল গুহাটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ক্লাসঘর হিসাবে ব্যবহূত হতো। অন্যদিকে ১০ নম্বরটি আবার বিশ্বকর্মা গুহা নামে পরিচিত ছিল। এই গুহার দেয়াল জুড়ে আবার বিভিন্ন পশুর পরপর ছবি। তাছাড়া বুদ্ধের বোধিসত্ব লাভের বহু চিত্র এই গুহার আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলেছে। দ্বাদশ গুহাটিকে বলা হয় তিনতাল। গুহাটি তিনতলা বিশিষ্ট। প্রথম দুটি তলে তেমন কিছু লক্ষ্যণীয় নয়। কিন্তু তৃতীয় তলে রয়েছে সাত-সাতটি বুদ্ধের অভাবনীয় মূর্তি। গুহা নম্বর ৬, ৭, ৮-এও বিভিন্ন ভঙ্গিমায় বুদ্ধের মূর্তি লক্ষ্যণীয়– যা গান্ধার শিল্পরীতির আদলে নির্মিত।

আবার মাঝের হিন্দুগুহাগুলির কাছে ফিরে এলাম। দেখে নিলাম দশাবতার বিশিষ্ট ১৫ নম্বর গুহা। গুহা জুড়ে যেন ৩৩ কোটি তামাম দেবদেবীরই সহাবস্থান। আছে নটরাজ, শিবপার্বতীর পাশা খেলা, নন্দী, কালী, নৃসিংহ অবতারের মতো নানান মূর্তির নিদর্শন। ২৮ নম্বর গুহায় অক্ষত-অষ্টভূজা দেবীমূর্তি। আর ২৫ নম্বর গুহায় মেলে সাত ঘোড়ার রথে অধিষ্ঠিত সূর্যদেব। ইলোরার ঝরনা সম্মুখে যে গুহা, শুনলাম সেটি সীতানাহালি গুহা নামে পরিচিত। সীতা নাকি এখানে এসে স্নান করতেন। সীতা সত্যিই স্নান করতেন কিনা জানি না, তবে বিরামহীন ঝরে পড়া প্রপাতটি চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করলাম। প্রপাত সম্মুখের গুহা অভ্যন্তরে রয়েছে নানান দেবদেবীর মূর্তি। বিশেষত শিবের ভয়াল এক রুদ্ররূপ, যা দেখে সত্যিই গায়ে কাঁটা দেয়। তবে মূর্তি ভাষ্কর্যের মাঝে তল্লাসি চালিয়ে মিলল না সীতার সন্ধান।

এবার শেষ পাঁচটি জৈন ধর্মাবলম্বীদের গুহা দেখতে গাড়ি নিয়ে পাহাড়ের অন্য প্রান্তে চলে এলাম। এখানে পার্শ্বনাথ, গোমতেশ্বর, মহাবীর, ঋষভদেব ও অন্যান্য তীর্থংকরদের উপস্থিতি নজর কাড়ে। আর বত্রিশ নম্বর ইন্দ্রসভা গুহার দোতলায় জৈন তীর্থংকরদের ভাস্কর্য দেখে চোখের পলক ফেলা যায় না। এসব দেখতে দেখতেই ইলোরা পাহাড়কে সাক্ষী রেখেই অস্ত গেল সূর্যদেব। সময়ের বাধ্যবাধকতায় ফিরতে হল। ছুটে চলেছি ঔরঙ্গাবাদের পথে। সকালেই সিরডি হয়ে চলে যাব নাসিকের পথে।

প্রয়োজনীয় তথ্য –

কীভাবে যাবেন – হাওড়া থেকে গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস, মুম্বই মেল, আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসে নামুন জলগাঁও। জলগাঁও থেকে ১৬২ কিমি দূরে ঔরঙ্গাবাদ। এই রুটে বহু সরকারি বাস মিলবে। সময় বাঁচাতে গাড়ি ভাড়াও করতে পারেন। অন্যথায় হাওড়া-মুম্বই রুটে মানমদ স্টেশনে নেমে, গাড়ি বদল করে প্যাসেঞ্জার ট্রেনে ১১৪ কিমি দূরে ঔরঙ্গাবাদ যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন – ঔরঙ্গাবাদে থাকার জন্য পাবেন এমটিডিসি-এর হোটেল হলিডে রিসর্ট (২৩৩১৫১৩)। এছাড়াও রয়েছে প্রচুর বেসরকারি হোটেল। দ্বিশয্যার ঘর মিলবে ৬০০ থেকে ১৮০০ টাকার মধ্যে। ঔরঙ্গাবাদের এসটিডি কোড ০২৪০।

কখন যাবেন – গ্রীষ্মের দিনগুলো বাদ দিয়ে সারা বছরই যাওয়া চলে। তবে অক্টোবর থেকে মার্চ উপযুক্ত সময়।

কীভাবে ঘুরবেন – ঔরঙ্গাবাদ থেকে গাড়ি বুকিং করে দউলতাবাদ, ইলোরা-সহ বাকি দ্রষ্টব্যগুলি দেখে নিতে হবে। গাড়ি ঘুরতে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকার মধ্যে পড়বে।

কেনাকাটা – ঔরঙ্গাবাদ থেকে সংগ্রহ করতে পারেন পৈথানি শাড়ি।

জেনে রাখুন – প্রতি মঙ্গলবার ইলোরা গুহা বন্ধ থাকে। সকালের তুলনায় বিকালের দিকে ইলোরা গুহাভ্যন্তরের ভাস্কর্য দেখতে সুবিধা হয়।

অতিরিক্ত – কলকাতায় মহারাষ্ট্র টুরিজমের সরকারি কোনও অফিস নেই। ঔরঙ্গাবাদের রুম বুকিংয়ের জন্য মহারাস্ট্র টুরিজমের অনুমোদিত সংস্থায় যোগাযোগ করুন। যেমন প্ল্যানেট টুর অ্যান্ড ট্র্যাভেলস, হিমালচূড়া, ট্রাভেলস অ্যান্ড টুর, ডায়মন্ড টুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, হিন্দুস্থান ট্রাভেলস্ ইত্যাদি।

 

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...