এক বস্ত্রেই বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। এতক্ষণে বাড়িতে নিশ্চয়ই উৎসব লেগে গেছে। ওদের আজ বড়ো আনন্দের দিন। এক দীর্ঘ চিঠিতে সব লিখে পোস্ট করেছেন নিজের ঠিকানায় গতকাল। বাড়ির লোক চিঠিতে সব জেনে বলবে— আপদ বিদেয় হয়েছে।
খানিক বিশ্রামের পর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সন্ধ্যার আগে আরও খানিকটা পথ পেরিয়ে যেতে হবে। রাতে কোনও এক স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। নদীর জলে হাত মুখ ধুয়ে নিলেন। চোখেমুখে জল দিয়ে অনেকটা ভালো লাগছে তাঁর। হাঁটুজল পেরিয়ে নদীর ওপারে উঠলেন। এক চায়ের দোকানে একটু জল চেয়ে খেলেন। দোকানের মালিক কী ভেবে যেন সমরবাবুকে চা বিস্কুট খেতে দিলেন। সমরবাবু প্রথমটা আপত্তি জানালেও পরে খেলেন। অবশ্য দামও মেটালেন।
—কোথা থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন আপনি? দোকানের মালিক গুণধর শুধালেন।
সমরবাবুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ক্লান্ত শরীরে তিনি খালি বেঞ্চটায় শুয়ে পড়লেন। দোকানি ছুটে এলেন। সমরবাবু হাত নেড়ে বললেন, ‘ক্লান্ত লাগছে তাই একটু শুলাম। আপনার আপত্তি নেই তো।”
—না না ঠিক আছে। গত রাতে ঘুমাননি, তারপর এতটা পথ সারা সকাল জুড়ে হাঁটছেন। স্বাভাবিকভাবেই অসুস্থ বোধ করলেন। একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন সমরবাবু।
রাতে দোকানি দোকান বন্ধ করার সময় ডাকলেন সমরবাবুকে। তিনি একপ্রকার জোর করেই সমরবাবুকে নিজের বাড়ি নিয়ে গেলেন।
রাতটুকু এখানে থেকে না হয় কাল সকালে চলে যাবেন। গুণধরের কথায় সমরবাবু অনিচ্ছা সত্ত্বেও থেকে গেলেন। রাতে খাওয়ার পর সব জানালেন তিনি। সংসারে তার অবস্থান কোথায়।
আসলে তিনি হারিয়ে যেতে চান। সবার অলক্ষ্যে অদৃশ্য হয়ে যেতে চান। এই সংসারে তার কাজ শেষ হয়েছে। এবার নিজ নিকেতনে ফেরার পালা।
পরদিন ভোরবেলা বেরিয়ে পড়লেন সমরবাবু। আবার চলার পালা। চলতে চলতে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে ধীরে। এভাবেই চলতে চলতে তাঁর পোশাক একে একে খুলে ফেলে দিলেন। লজ্জা নিবারণের জন্য একটুকরো কাপড় কোমরে বেঁধে এগিয়ে চললেন তিনি। ওদিকে পশ্চিমের আকাশ বেয়ে আঁধার নামতে শুরু হয়েছে। তিনি দ্রুত পায়ে এগোতে লাগলেন।
এক শিবমন্দির দেখে মনস্থির করলেন রাতটা ওখানেই কাটাবেন তিনি। মন্দির চাতালে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু খিদের জ্বালায় পেটে মোচড় দিচ্ছে। আশপাশে কোনও দোকানও নেই যে, কিছু কিনে খাবেন। খিদে আর ক্লান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখলেন মাকে। অনেক কথা হল মায়ের সঙ্গে। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই একটা অব্যক্ত কষ্ট অস্থির করে তুলল। আর এ জীবন রেখে কী লাভ। কিন্তু কীভাবে শেষ করবেন নিজেকে। ক্লান্ত পায়ে আবার যাত্রা শুরু করলেন তিনি।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সমরবাবুর মনে হল কে যেন ওনাকে অনুসরণ করছে। পিছনে পিছনে হাঁটছে কেউ। পিছন ফিরে বার বার দেখছেন অথচ কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না। সমরবাবু খানিক থামলেন। পিছনে ফিরে তাকালেন আবার। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। কিন্তু অনুভব করছেন কে যেন ওনাকে অনুসরণ করছে। সমরবাবু দ্রুত হাঁটতে লাগলেন। তাছাড়া সন্ধে গড়িয়ে রাত নামছে চুপিসারে।
সমরবাবু এবার দৌড়াতে শুরু করলেন। বুকের ভিতর হাঁফ ধরে। পাঁজরখানা এবার বুঝি খান খান হয়ে পড়বে। এই বয়সে কি আর দৌড়ানো যায়। একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন তিনি। ওঠবার চেষ্টা করতে গিয়ে একেবারে অন্ধকার খাদে গড়িয়ে পড়লেন। নরম মাটিতে পড়ে একটু দম নিলেন। হাপর টানা বুকের ভিতর দমবন্ধ বাতাস থমকে গেছে। নিকষ অন্ধকার। কিছু দেখা যাচ্ছে না।
সমরবাবু হাতড়ে হাতড়ে হামাগুড়ি দিয়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন। কতক্ষণ এভাবে চলেছেন জানা নেই। মনে হচ্ছে এই বুঝি প্রাণটা বেরিয়ে যাবে শরীর থেকে। ক্লান্ত অবসন্ন। শরীর একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। আর ঠিক তখনই একটা আলোর বিন্দু চোখে পড়ল তাঁর। এবার মনে বল পেলেন। আলোর বিন্দু লক্ষ্য করে তিনি এগোতে লাগলেন। ক্রমশ আলো বড়ো হচ্ছে। সমরবাবু প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারছেন। একসময় গুহামুখে এসে পড়লেন। তারপর আলো শুধু আলো। চোখ ঝলসানো আলো। নিমেষে চোখ বন্ধ করলেন তিনি৷
একটা হইচই কানে এল। ধীরে ধীরে চোখ খুললেন সমরবাবু। দেখলেন অনেকগুলো মুখ তাঁর মুখের সামনে ঝুঁকে আছে। ঝাপসা চোখে দেখতে দেখতে তিনি ক্রমশ মুখগুলো চিনতে পারছেন। আরে এঁরা তো সব তারই পূর্বপুরুষ। সবাই এসে দাঁড়িয়েছেন। হাত বাড়িয়েছেন তাঁর দিকে। মহা আনন্দে আত্মহারা সমরবাবু হাত বাড়িয়ে দিলেন। উনি উঠে দাঁড়ালেন। সবাই ঘিরে ধরেছেন তাঁকে। এবার সব স্পষ্ট দেখতে পারছেন আর চিনতেও পারছেন।
এক উন্মুক্ত প্রান্তরে নরম ঘাসের উপর তিনি দাঁড়িয়ে দেখছেন সামনে চিতা জ্বলছে দাউ দাউ। তাঁর পূর্বজরা, যাঁরা আর ইহলোকে নেই, তাঁরা গোল করে এক বৃত্তের মধ্যে করজোড়ে দাঁড়িয়ে।
কখন যেন অরণ্য এসে দাঁড়িয়েছে। ওর হাতে জ্বলন্ত কাঠ। ক্রমশ এগিয়ে আসছে সে। ওর দু’ চোখে অশ্রুধারা। সমরবাবু খুশিতে কিছু বলতে গেলেন আর তখুনি দেখলেন, চিতায় পুড়ছে যে শরীর সে তো তার নিজের। কী আশ্চর্য। একসময় চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চিতার আগুন নিভে গেছে। একটা ধোঁয়াশা। হালকা নীলচে ধোঁয়া আকাশমুখী। সমরবাবু এখন তাঁর পূর্বপুরুষদের হাতে হাত রেখে ভেসে চলেছেন পিতৃলোকে। নীচে তাকিয়ে দেখলেন হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় ভাইপো অরণ্য।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিধারা ধুয়ে দিচ্ছে অলৌকিক প্রান্তরের মায়াবী আচ্ছাদন। ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে ধোঁয়াশা। সমরবাবু এতদিনে সংসার সমর জিতে ফেলেছেন। আর কোনও ধোঁয়াশা নেই।
(সমাপ্ত)