বসুন্ধরার নিপুণ টানে জব্দ হব বলেই বোধহয় এই নদীটির কাছে আসা। দূর আকাশের ছায়াতলে চঞ্চলা নদীর নূপুরধ্বনির রিনরিন ও নদী-অববাহিকা সমূহ যেন রোদ্দুর ও ছায়ামাখা সংলাপ। আমি সেই জলজ মজলিশের পানে বুঁদ হয়ে শুনে যাচ্ছি অসম্ভব এক নদীগান। কখনও উথলে উঠছে তার কোমল বাচালতা। কখনও বেবাক নিরিবিলি।
কালিম্পং তালুকের, প্যারেন-গোদক খাসমহলে, ভুটান সীমান্তে ফুটে আছে অপরূপ একফালি গ্রাম বিন্দু। বিহ্বল করে দেওয়া স্থানিক দৃশ্য। যেখানে জলঢাকা নদীর মিশেলে থেমে গেছে বিন্দুখোলার একাকী পথ চলা। ২০০০ ফুট উচ্চে বিন্দু জলাধার বা জলঢাকা জলাধার ভারত ও ভুটানের সংযোগ চিত্র। বাংলায় ‘বিন্দু” অর্থাৎ “ফুটকি” বা “বিন্দু চিহ্ন’। জলঢাকা নদী এখানে সংযোজিত করেছে জলের সঙ্গে আরও জল জমিয়ে বিন্দুখোলা, দুধপোখরির সঙ্গে বিশুদ্ধ মিলনে। দিগন্তের দিকে তার আশ্চর্য ভ্রমণ। মনোহর পার্বত্য দৃশ্যপটে দেখা হয়ে যায় জলঢাকা ও বিন্দুখোলা নামের দুই পাহাড়ি নদীর সঙ্গে।
আমরা রয়েছি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঝালং বনবিশ্রামাগারে। ঝালং, জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লোকালয়। শহরের প্রবেশপথে ঝালং নদী। অপাঙ্গে বিছিয়ে থাকা নুড়ি ও পাথরে ঝালং-এর ছলাৎছল। ঝালং সেতুপথ পেরোতেই চেকপোস্ট। অঞ্চলটি ভুটান সাম্রাজ্য লাগোয়া হওয়ায়, অনুমতিসাপেক্ষে ঝালং পার হতে হয়। চেকপোস্ট পেরিয়েই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের খুচরো বাজার। বুধবারে হাট বসে। বাজার পেরিয়ে উত্তরের পথ ধরে আরও ৯.৩ কিলোমিটার পথ উজিয়ে বিন্দু। ঝালংয়ের পরে জলছবির মতো আরেক পাহাড়িয়া জনপদ প্যারেন। এবার আঁকাবাঁকা পথটা আগাগোড়াই আরোহণের।
পথের ডানদিকে নাব্যতা, গান ও ছন্দ উৎসবে আমার সহযাত্রী জলঢাকা নদীর চলন। সুন্দর মসৃণ রাস্তাটা ডানপাশে জলঢাকা নদীকে রেখে আপন খেয়ালে চলেছে। ভিউপয়েন্ট দেখে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা হল। গৈরিবাস ভিউ পয়েন্ট থেকে আগেই দেখা পেয়েছিলাম পাহাড়ের নীচে এঁকেবেকে বয়ে চলা জলঢাকা নদীর। চারদিকে পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের ওপাশেই নাকি ভুটান। অবাক হয়েছি, একটা পাহাড়ি নদী, জলঢাকা, দুটো দেশের প্রাকৃতিক সীমানা, মাঝে কোনও কাঁটাতার নেই। পাহাড় ঘেঁষে ওপারেই ভুটান সাম্রাজ্যের টেন্ডু নামের এক অরণ্যছায়া অঞ্চল।
মজা হিম ঘাপটি মেরে আছে, জলঢাকার ডানায়। নদী এখানে স্রোতস্বিনী। উচ্ছল কিশোরীর মতো প্রাণবন্ত। ছোটো বড়ো পাথরে ধাক্কা খেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছে আরও। এই পথে রয়েছে গাছেদের নিস্তব্ধ কোলাহলে আরও এক সুন্দর গ্রাম প্যারেন। প্যারেন থেকে উত্তর-পশ্চিমে নিস্তব্ধ উচ্চারণে পথ চলে গেছে ছোট্ট পাহাড়গ্রাম গোদকে নির্জনে সীমান্তের অন্য পারে ভুটান। ঝালং থেকে দীর্ঘ পাকদণ্ডী পথে গোদক ১৫ কিলোমিটার। এখানকার আদিবাসী মানুষজন একটি পাথরকে সরল বিশ্বাসে দেবতাজ্ঞানে পুজো করেন। জলধারা অবিরত আছড়ে পড়ায়, পবিত্র পাথরটি কখনও শুকিয়ে যায় না। ১ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে উৎকৃষ্ট এলাচের ক্ষেত্র। এখানকার এলাচ প্রক্রিয়াকরণের পর দেশের সেরা এলাচ হিসাবে বিদেশে পাঠানো হয়।
গোদক থেকে আরও উত্তরে ৭ কিলোমিটার দূরে তোদে। উপজাতি অধ্যুষিত জনজাতির ঘরবসত, খেতি জমি। আরও একটু হাঁটাপথেই চলে যাওয়া যায় তাংতা। এখানে একটি পাহাড়ি নদীর নাম “দাবাইখোলা”। স্থানীয়স্তরে বিশ্বাস এই জলে রোগের নিরাময় হয়। পাশেই কেরামটার। “টার’ অর্থে পাহাড়ের সমতল অঞ্চল। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি থেকেই তোদে-তাংতা হয়ে ওঠে নানান রূপে বর্ণে ফুল্লকুসুমিত। রুকস্যাক কাঁধে এই পথটিতে তখন পাড়ি জমান তামাম পর্যটক। যাত্রাপথের উজান সাঁতরিয়ে উত্তরে আরও কিছুটা গেলেই রোচে-লা-পাস। আমরা অবশ্য এযাত্রায় ওদিকে যাইনি। আমাদের গন্তব্য প্যারেন থেকে এবার বিন্দু অভিমুখী ৬ কিলোমিটার উতরাই ইন্দো-ভুটান সীমান্তের বিন্দু।
‘ভারতের শেষ গ্রাম’ বিন্দুর রূপে সম্মোহিত হতে তখনও বাকি ছিল। গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিল, তার দুই পাশে শাল, শীতের রকমারি পোশাক, হোমমেড চকোলেট, হরেক প্রজাতির ক্যাকটাসের সম্ভারে নার্সারি, হস্তশিল্প সামগ্রীর দোকান ইত্যাদি। দোকানিরা এন্তার হাঁকডাক দিচ্ছেন তাদের দোকানে এসে দেখার জন্য। দরদামও চলে বিস্তর। ঝালং হিমালয়ান ড্রাইভার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে গাড়ি রাখার জন্য ৩০ টাকা দিতে হল। সেখান থেকে প্রায় ৫০ ডিগ্রি খাঁড়াই হাঁটাপথ বেয়ে সংগ্রহযোগ্য ভ্রমণটুকু নিয়ে কিছুটা উঠে যাই। খুবই সংবেদনশীল এলাকা। আধাসামরিক বাহিনীর নিরাপত্তারক্ষীরা অতন্দ্রপ্রহরায়।
ওপাশে ভুটানের অরণ্যাবৃত পাহাড়। বিন্দু সত্যিই এক ব্যতিক্রমী সৌন্দর্যবিন্দু। জলঢাকার উদ্দাম জলধারা ও লাবণ্য নিয়ে অসামান্য পরিবহ। বিন্দুর আসল চমকটা ঠাহর হল বাঁধের কাছে এসে। বাঁধের ওপর পোক্ত রেলিং দেওয়া চওড়া পথ চলে গেছে অন্যদেশ, অন্য সাম্রাজ্যে। নীচে আধখোলা লকগেট। নদীর উত্তাল জলধারা উচ্ছ্বাসে জড়ো হচ্ছে নীচে। ডাইনে ভুটান পাহাড়ের গিরিখাত বেয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ক্ষীণতনু অন্য এক নদী। অসংখ্য ছোটো-বড়ো-মাঝারি পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে তার বয়ে চলা। কুলকুল সুরে ধ্বনিত হচ্ছে চারপাশ। সুরেলা সেই নদীটির নাম— বিন্দু।
(ক্রমশ……)