শিশুর জন্ম যেমন আনন্দের অনুভূতি দেয় মা-কে, ঠিক তেমনই সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নতুন মায়ের শারীরিক এবং মানসিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। আর এই সমস্যাটিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ। এই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রসবের পরে নতুন মায়েদের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। শুধু দুঃখের অনুভূতি নয়, এর ফলে ক্রমাগত মানসিক, শারীরিক এবং আচরণগত পরিবর্তন আসে, যা নতুন মা-কে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেয়।

প্রসবোত্তর অবসাদের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র ক্লান্তি, প্রচণ্ড দুঃখ, অকারণে উদ্বেগ, স্বাভাবিক কাজে আগ্রহ হারানো, কান্নাকাটি এবং শিশুর সঙ্গে বন্ধন আলগা হওয়া। এই ধরনের অবসাদের সমস্যা গর্ভাবস্থায় কিংবা প্রসবের পরে হতে পারে এবং সঠিক সময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে, এই সমস্যা কয়েক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রসবোত্তর অবসাদের কারণে মা তার সন্তান এবং সঙ্গীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন, এমনকী নিজেকে, স্বামীকে কিংবা সন্তানকে আঘাত করার চিন্তাও মনে আসতে পারে।

আসলে যাদের ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক বিষণ্নতার ইতিহাস আছে কিংবা সুস্থ-স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভালোবাসা কিংবা অর্থ-সম্পদের অভাব আছে, সেই মায়েরাই বেশি প্রসবোত্তর অবসাদের শিকার হন। এই বিষয়ে তুলে ধরা হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং পরামর্শ।

কলকাতা-র ফর্টিস হাসপাতাল-এর কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট দেবশীলা বোস-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ —- 

মাতৃত্বকে প্রায়ই সম্পূর্ণ আনন্দের বিষয় হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু অনেক মহিলার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাটি অপ্রত্যাশিত দুঃখ এবং উদ্বেগের দ্বারা আবৃত থাকে। প্রসবোত্তর বিষণ্নতা নামে পরিচিত এই অবস্থাটি ক্রমশ বাড়ছে।

আসলে, প্রসবোত্তর বিষণ্নতার কারণ জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক কারণগুলির একটি জটিল মিশ্রণ হতে পারে। প্রসবের পরে, ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়, যা মস্তিষ্কের রসায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার, যা মেজাজ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তা প্রভাবিত হয়। যার ফলে বিরক্তি, ক্লান্তি এবং হতাশা দেখা দেয়। এই জৈবিক পরিবর্তনগুলি প্রায়ই ঘুমের অভাব, পুষ্টির ঘাটতি এবং নবজাতকের যত্ন নেওয়ার শারীরিক চাপের কারণে আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাছাড়া, জীববিজ্ঞানের বাইরেও, মাতৃত্বের চারপাশের আবেগগত পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল্যহীনতা কিংবা অযোগ্যতার অনুভূতি মা-কে ভিতর থেকে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয়।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদের লক্ষণগুলির তীব্রতা অনুসারে থেরাপি এবং ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি চিকিৎসার অন্যতম মাধ্যম। প্রথমে নেগেটিভ চিন্তা থেকে মুক্ত করানোর ব্যবস্থা করতে হয়। এর জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয় কাউন্সেলিং এবং ওষুধের মাধ্যমে। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ এক্ষেত্রে ভীষণ কার্যকরী।

পরিবারের সদস্যদেরও সাহায্য চাওয়া হয় এক্ষেত্রে। শিশুর যত্নের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, নতুন মা-কে আশ্বাস দেওয়া এবং পরিবর্তিত আচরণকে মেনে নিয়ে তাকে নেগেটিভ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করা ইত্যাদি দায়িত্ব নিতে হবে নতুন মায়ের পরিবারের সদস্যদের। আর মনে রাখতে হবে, প্রসবের পরে একজন মায়ের মানসিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা কেবল বিষণ্ণতা নিরাময় নয়, বরং এটি মা এবং শিশু উভয়েরই সামগ্রিক স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়।

কলকাতা-র ফর্টিস হাসপাতাল-এর প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী পরামর্শদাতা ডা. সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ —-  

প্রসবের পরবর্তী সময় হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে, তাই মানসিক পরিবর্তনের সূচনাও হয়। গর্ভাবস্থায় বৃদ্ধি পাওয়া ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা প্রসবের পরে তীব্র ভাবে হ্রাস পায়, যা মেজাজ এবং মস্তিষ্কের রসায়নকে প্রভাবিত করে। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের অভাব, শারীরিক ব্যথা এবং নবজাতকের যত্নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম। এই কারণগুলি মানসিক যন্ত্রণার জন্য উপযুক্ত উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।

ঐতিহ্যগত ভাবে, ভারতীয় মায়েদের প্রসবোত্তর পর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা সবরকম সাহায্য করতেন৷ তাই, সন্তান জন্মের পর মা নিশ্চিন্ত থাকতেন এবং বিশ্রামও পেতেন। কিন্তু এখন যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি হয়ে গেছে। এখন তাই নতুন মায়েদের একাই সবকিছু সামলাতে হয়। আর তাই অবসাদের শিকার হন অনেক মা৷ এই সময় ক্রমাগত তৈরি হওয়া দুঃখ, বিরক্তি, আগ্রহ হ্রাস কিংবা অপরাধবোধের মতো লক্ষণগুলিকে প্রায়ই ‘স্বাভাবিক মেজাজের পরিবর্তন’ হিসাবে উড়িয়ে দেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রে, মহিলারা নিজেরাই বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন যে, তারা প্রসবোত্তর মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছেন।

অবশ্য এখন গাইনেকোলজিস্টরা প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের সমস্যা শনাক্তকরণ এবং সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নিয়মিত চেক-আপের সময় মেজাজ, ঘুম এবং মানসিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেন চিকিৎসকরা।

যখন প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা শনাক্ত করা হয়, তখন কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন হয়। এই ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভাবে জেনে রাখা উচিত যে, প্রসবের পরে বিষণ্ণতা মূলত সাধারণ এবং নিরাময়যোগ্য এবং ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়৷ চিকিৎসার জন্য সাধারণত পরামর্শ দেওয়া হয়, মাঝারি কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ নির্ধারিত হয়। অনেক আধুনিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে না। সেইসঙ্গে, চিকিৎসা যদি দায়িত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়, তখন রোগীর উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।

এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের ভূমিকাও সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মা এবং শিশুর আন্তরিক যত্ন নেওয়া, মানসিক উৎসাহ জোগানো এবং ভালোবাসা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সঙ্গী এবং আত্মীয়স্বজনদেরও বুঝতে হবে যে, মায়ের এই চারিত্রিক পরিবর্তন কিংবা অবসাদ আসলে চিকিৎসাগত একটি স্বাভাবিক অবস্থা মাত্র, মাতৃত্বের ত্রুটি নয়।

মনে রাখতে হবে, প্রসবোত্তর সমস্যা আসলে মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, কম ঘুম, ভালোবাসা এবং সাহায্যের অভাব প্রভৃতির মিশ্রিত প্রতিফলন। তাই, এক্ষেত্রে মায়ের আবেগকে গুরুত্ব দিতে হবে, সহানুভূতির সঙ্গে সবকিছু সামলাতে হবে, তবেই নতুন মা প্রসবোত্তর অবসাদ থেকে মুক্তি পাবেন।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...