ঠিক যে-ধরনের জীবনশৈলীতে আমরা ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাতে শরীরকেও খানিকটা মজবুত করে তোলার প্রয়োজন। কারণ প্রতিদিনের রুটিনে নিজেকে চনমনে রাখতে, সময়ের দাবি মেনে সুস্থভাবে বাঁচার একটাই মন্ত্র—-এক্সারসাইজ। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং কৌশল তুলে ধরেছেন স্পোর্টস & অর্থোপেডিক ফিজিয়োথেরাপিস্ট এবং যোগা থেরাপিস্ট ভাস্কর সেনগুপ্ত।

অনেকেরই একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, ব্যায়াম করতে গেলেই হয়তো কোনও একটা জিম বা ফিটনেস ক্লাব-এর সদস্য হতে হবে। কিন্তু প্রতিদিনের ব্যস্ত শেডিউল থেকে সময় বের করে, ক’জনই বা পারেন জিম-এ গিয়ে একটা ‘ফিটনেস রেজিম’ মেনটেইন করতে!

ব্যায়াম আপনাকে শুধু শারীরিক ভাবেই নয়, মানসিক ভাবেও ফিট রাখে। কোনও প্রপস ছাড়াই, ঘরোয়া ব্যায়ামে আপনি চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারবেন, যদি সঠিক প্রক্রিয়াটি আপনার জানা থাকে। কোনও যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই, স্রেফ ওয়ার্কআউট করে ক্যালোরি ঝরিয়ে ফেলা সম্ভব। আসলে উদ্দেশ্য যা-ই হোক, ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ জিনিসটা এক ধরনের কমিটমেন্ট, যার মূল উদ্দেশ্য হল নিষ্ঠা সহকারে একটি বিধিবদ্ধ এক্সারসাইজ রুটিন ফলো করা। কারণ, এর ফলে আপনার দেহের আকারে, আপনার খাদ্য-তালিকায় এবং অবশ্যই লাইফস্টাইল-এ একটা বড়ো ধরনের পরিবর্তন ঘটতে বাধ্য।

আপনি কি জানেন, আপনার হৃদয়ন্ত্রটিকে সুস্থ সবল রাখতে এবং ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ১০,০০০ পদক্ষেপের প্রয়োজন। এটাকে সম্ভব করতে হলে বাড়ির আশপাশের জায়গার কাজগুলো পায়ে হেঁটেই সারতে চেষ্টা করুন। আর সেই সঙ্গে থাকুক কিছু সহজ ব্যায়াম।

যে-কোনও ওয়ার্কআউট রুটিন বাড়িতে শুরু করার আগে ফুল বডি চেক-আপ করিয়ে নেওয়া ভালো। এর ফলে কী ধরনের ব্যায়াম করা আপনার উচিত হবে, তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাবেন। ওয়ার্কআউট রেজিম-এর শুরুতে ওয়ার্ম আপ এবং শেষে কুল ডাউন এক্সারসাইজ করতে ভুলবেন না। এক্সারসাইজ এনজয় করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল অন্য একজনকে সঙ্গে রেখে ব্যায়াম করা। এর ফলে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করার একটা তাগিদ থাকবে এবং পরস্পর-কে মোটিভেট করতে পারবেন।

স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ: দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়ান। দু-হাতে দেয়ালে ভর দিয়ে প্রথমে বাঁ-পা পিছন দিকে যতটা প্রসারিত করা যায় করুন। কয়েক সেকেন্ড এইভাবে দাঁড়িয়ে একই প্রক্রিয়া রিপিট করুন ডান পায়ের ক্ষেত্রে।

আর একটি সহজ স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ করা যায়। মাটিতে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়ুন। দু’হাত দিয়ে প্রথমে ডান হাঁটুটা চেপে বুকের কাছে নিয়ে আসুন, রিল্যাক্স করুন। পুনরায় একই প্রক্রিয়া করুন বাঁ-হাঁটুর ক্ষেত্রে।

কার্ল: মাটিতে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ুন। মাথার উপর দিকে দু’হাত ছড়িয়ে দিন। এবার হাত ও শরীরের উপরের অংশ মাটি থেকে উপরে তোলার চেষ্টা করুন। এটি পনেরো থেকে কুড়ি বার পুনরাবৃত্তি করুন।

লেগ লিফটস: একটি চেয়ারে বসুন। হাতের পাতা দুটি, শরীরের পাশাপাশি চেয়ারের উপর রাখুন। পা দুটি ৯০ ডিগ্রি অবস্থানে মাটিতে থাকবে। এবার দুটি পা-কে একসঙ্গে যতদূর সম্ভব সামনে প্রসারিত করুন। কোমর ও তার নীচের অংশের মাসল-এ যতটা সম্ভব চাপ দিয়ে এই ব্যায়াম করুন। এবার আস্তে আস্তে পা-দুটি আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনুন। পা’দুটি উপরে তোলার সময় শ্বাস নিন ও পা মাটিতে নামানোর সময় শ্বাস ছাড়ুন। এই ব্যায়াম দশবার রিপিট করুন। এক থেকে দেড় মিনিট রেস্ট নিয়ে আবার এই ব্যায়াম দশবার করুন।

লাঞ্জেস: সোজা দাঁড়িয়ে পা-দুটি ছড়িয়ে দিন। একটা পা সামনে থাকবে অন্যটি পিছনে। দু’পায়ের মধ্যেকার দূরত্ব শোল্ডারের মাপে রাখুন। সামনের এবং পিছনের পা ভাঁজ করুন। পিছনের হাঁটু মাটির দিকে ভাঁজ হবে। দেহের উপরিভাগ সোজা থাকবে। এবার তলপেটের মাসল-এ চাপ দিয়ে শরীরের উপরি অংশ সামনের পা পর্যন্ত ঝোঁকান। দেখবেন হাঁটু যেন কোনও অবস্থায় পায়ের পাতার দৈর্ঘ্যের থেকে বেশি না ঝোঁকে। একই ভাবে এই ব্যায়াম দুটি পায়ের ক্ষেত্রেই করুন। দশবার করতে হবে এই এক্সারসাইজ।

জগিং: টিভি চালিয়ে বা মিউজিক শুনতে শুনতে জগিং করা খুব ভালো ব্যায়াম। জগিং এক জায়াগায় দাঁড়িয়ে থেকেই করা যায়। তবে ব্যায়ামের জন্য নির্দিষ্ট জুতো ব্যবহার করুন, এতে পা স্ট্রেসমুক্ত থাকবে।

পুশআপস: হাতের পাতা মাটিতে রেখে কনুই দুটো সোজা রাখুন অথবা হাত দুটিকে সোজা অবস্থায় রাখুন। দেহের বাকি অংশ ভূমির সমান্তরাল থাকবে দুটি পায়ের টো-এর উপরে। হাঁটু টান টান রেখে মুখ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে গোটা শরীরের পেশি টানটান রেখে পুশ-আপ করুন। তবে যদি কারওর এতে অসুবিধে হয়, তাহলে হাঁটু মাটিতে রেখেও করা যায়। এরপর শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে দুটো হাতকে ভাঁজ করে মাটির দিকে বুক নামাতে হবে। আবার শ্বাস নিতে নিতে হাত দুটিকে সোজা করে বুক বা দেহের উপরের অংশটিকে তুলে আনতে হবে। সাত থেকে দশবার এই ব্যায়াম করতে হবে। শরীরকে আরও টান করে রাখতে পা দুটিকে উঁচু বেঞ্চ-এর উপর তুলে রাখুন আর হাত দিয়ে ভর রাখুন মাটিতে। শরীর মেঝে বরাবর ঝোঁকানোর সময় অর্থাৎ ডন দেওয়ার সময় খেয়াল রাখুন, আপনার বুক যাতে মেঝে স্পর্শ করে।

ডিপস: দুটি চেয়ারকে সমান্তরাল অবস্থায় রাখুন। দুটি চেয়ারের মাঝখানের ব্যবধান নিজের কাঁধের মাপের দেড় গুন (more or less 30 inches) হবে। হাত দুটি চেয়ারে ভর দিয়ে বৈঠক দিন। এই ব্যায়াম করার সময় মাথা সোজা রাখবেন এবং শরীরের মাসল যথাসম্ভব টানটান রাখবেন।

বাড়িতে বসে কম্পিউটারে টানা কাজ করলেও ব্যায়ামের কথা ভুলবেন না। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে পায়ের পাতা উপর-নীচ করুন। এতে পায়ের রক্ত সঞ্চালন ভালো হবে। এক্ষেত্রে অর্ধ-বৈঠকও কার্যকরী। নাচ খুব ভালো ব্যায়াম, নাচ জানলে তাও চর্চা করতে পারেন। তবে যে-কোনও ব্যায়ামের শুরুতে স্ট্রেচিং ওয়ার্ম-আপগুলি অবশ্যই করবেন। ব্যায়াম করতে বোরিং লাগবে না যদি হালকা মিউজিক বা টিভি চালিয়ে ব্যায়াম করেন। লিফট-এর পরিবর্তে যতটা সম্ভব সিঁড়ি ব্যবহার করুন। খাওয়ার পর হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখুন। কোনও পায়ের অথবা নিম্নাংশের ব্যায়াম করার পর বিরতি নেওয়ার সময় সঙ্গে সঙ্গে না বসে, হাঁটাহাঁটি করুন। আর হোম এক্সারসাইজ করার আগে যে-কোনও ফিজিয়োথেরাপিস্ট-এর সঙ্গে কথা বলে, তাঁর পরামর্শ মতো এক্সারসাইজ করুন।

ভাস্কর সেনগুপ্ত: স্পোর্টস & অর্থোপেডিক ফিজিয়োথেরাপিস্ট এবং যোগা থেরাপিস্ট (From AYUSH & Govt. of W.B., Ex. International Sports Person) Certified from FIFA, SAI & IOC.

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...