ধর্মান্ধ লোকেরা বড়ো ভয়ংকর। কারণ, তারা অন্য ধর্মের মানুষদের শত্রু মনে করে। যখন থেকে ধর্মকে ক্ষমতা অর্জনের জন্য এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়েছে, তখন থেকেই ধর্ম শব্দটি শুনলেই ভয় ধরে যায় মনে। আর তাই যারা সব ধর্মের মানুষকে সমান চোখে দেখে, তাদের ‘দেশের শত্রু’ মনে করা হয়। অথচ কানাডায় শিখরা সবার সঙ্গে মেলামেশা করে। আসলে, কানাডিয়ান সরকারের নিজস্ব কোনও ধর্ম নেই। আমেরিকা একসময় খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ ছিল, কিন্তু যখন থেকে গির্জার একটি শাখা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ প্রভাব বিস্তার করে, তখন থেকে গির্জাগামী শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা প্রতিটি অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।

স্পেন, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি এখন ধর্মীয় বিষয়ে ‘গুড বুক’-এ রয়েছে। কিন্তু থাইল্যান্ড এই বিষয়ে পিছিয়ে নবম স্থানে। ধর্মীয় নিরপেক্ষতার বিচারে মালয়েশিয়া ২২তম স্থানে, সিঙ্গাপুর ২৪তম স্থানে, ইন্দোনেশিয়া ৩৩তম স্থানে এবং ভিয়েতনাম ৩৫তম স্থানে রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩৫টি দেশের মধ্যে নেই, দ্বিতীয় ধনী দেশ চীনও নেই এবং সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারতও নেই। এই তিনটি বিশাল দেশের নাগরিকদের মানসিকতা বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। আমেরিকার নাগরিকদের মানসিকতা এতটাই বন্ধুত্বহীন যে, সেখানে মানুষের চেয়ে বন্দুকের সংখ্যা বেশি, যেগুলো সেখানকার লোকেরা তাদের আশেপাশের মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য অপ্রয়োজনীয় ভাবে ব্যবহার করে।

আমাদের দেশে, শুধুমাত্র পুলিশের কাছেই বন্দুক থাকে, যা তারা যে-কোনও ধরণের সংঘর্ষে ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সবার হাতেই লাঠি থাকে। গান্ধী বৃদ্ধ বয়সে লাঠি ব্যবহার করতেন, কিন্তু আমাদের দেশে লাঠিওয়ালারা লাঠি ব্যবহার করেন সাহায্যের জন্য নয়, মাথা ফাটানোর জন্য। ছোটোবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয় যে, ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষার বন্ধু থাকতে পারে না। আমাদের কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে, পাড়ায়, এমনকি একটি একক সমাজে কিংবা ৪০০-৫০০টি পরিবারের মধ্যেও ধর্মীয় দলাদলি চলতে থাকে। আর প্রতিটি গোষ্ঠীই অন্য গোষ্ঠীর শত্রু এবং এর মধ্যে কোথাও না কোথাও কোনও ধর্ম, উপ-ধর্ম, কোনও দেবতা বা দেবীর পুজোকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ তৈরি হয়।

ধর্ম-নিরপেক্ষ বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা তাই দেশ তথা অঞ্চলভেদে ভিন্ন। কিন্তু গড়পড়তা মানুষ একা বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব রাখতে চাইলেও পারে না। কারণ, আজকের সমাজ এবং রাজনীতি সবাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই, যদি সমাজ আমাদের বিভাজন শেখায়, তাহলে এর ভাইরাস আমাদের ঘরেও প্রবেশ করে এবং এটি স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে, ভাই-বোনের মধ্যে এবং আত্মীয়দের মধ্যেও বিরোধ তৈরি করে।

দেখা গেছে যে, ছোটো অথচ ধনী দেশগুলির নাগরিকদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা রয়েছে। যে কারণে তাদের ত্বকের রং, ভাষা এবং ধর্ম ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও, তারা কোনও ভেদাভেদ করে না কিংবা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে না। ব্রাজিল, আইসল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং ক্রোয়েশিয়া প্রভৃতি দেশগুলির এই বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা না থাকলেও, কোনও ধর্মীয় লুণ্ঠন হয় না, কারণ তারা পুলিশ বাহিনীকে ভয় পায়।

অবশ্য একথা মনে রাখতে হবে যে, বন্ধুত্ব মানে কারওর সঙ্গে সহবাস করতে হবে এমনটা নয়। এর সহজ অর্থ হল— আপনি অন্য ধর্মের লোকেদের ঘৃণার চোখে দেখবেন না কিংবা প্রতিবেশীরা আপনাকে দেখে ভয় পাবে না। অর্থাৎ, ধর্ম যার যাইহোক-না কেন, বিপদের সময় একে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা রাখতে হবে। বিপদে পড়লে দেবতাদের পায়ে টাকা উৎসর্গ করে সাহায্য চাওয়া হয়, অথচ প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখলে বিপদের দিনে সাহায্য পাওয়া যায় খুব সহজে। এই সাধারণ বিষয়টি মানুষ যেদিন বুঝতে শিখবে, সেদিন থেকেই হয়তো ধর্মীয় ভীতি আর থাকবে না।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...