দুর্ঘটনাটা ঘটেছে অকস্মাৎ। এমনটা হওয়ার কথাই ছিল না। আমার বয়স এখন মোটে বাইশ। সবে বিয়ে পাশ করেছি। রূপ লাবণ্যে ভরা যৌবন আমার। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ— প্রেম প্রস্তাবে উপচে পড়ে। তার কিছু পড়ে দেখলেও, অধিকাংশই আমি তাকিয়ে দেখি না। কারণ এই হ্যাংলাগুলোর জাস্ট কোনও স্ট্যাটাস নেই। আমার তো চাই হিরো। ঋত্বিকের মতো কাউকে। মাসকিউলার বড়ি, অন্তত ছয় ফুট হাইট, মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল, ব্রাইট কেরিয়ার, তবে না লাইফ পার্টনার।

মিতালি চৌধুরীকে বিয়ে করা অত সহজ কথা নয়। এই কারণে আমি আমার দুটো সম্বন্ধ ভেঙে দিয়েছি। এনেছিল আমার পিসি। ওই মহিলা কেন যেন আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। তার মধ্যে একজন স্কুল টিচার। পচর পচর করে পান খায়। এঃ রাম্মো! আরেকজন পোস্ট অফিসের কেরানি। তবে এইবার পিসি খুব জব্দ হবে। আমাকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে ভাগাবে ভেবেছিল। নাও এবার কী করবে করো! অবশ্য পিসি একা নয়, আমার বাবা, মা আর ঠাকুমাও এর পিছনে ছিল। জব্দ এবার তারাও হবে।

আসলে ঘটনাটা ঘটল হঠাৎ। আমাদের বাড়ি তিনতলা। বিয়ে নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। পা পিছলে গড়াতে গড়াতে সোজা নীচে। মাথায় গুরুতর চোট লেগেছিল জানেন। তখনই কোমায়। দুই দিন আইসিসিইউ-তে। তারপর সোজা বৈতরণীর এপারে।

মরে যাওয়া ব্যাপারটা বেশ মজার। আমি তো প্রথমে কিছু বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ নিজেকে কেমন হালকা লাগছিল। যেন একটানা অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে উঠেছি। তারপর দেখি আমার সামনে একটা কালো লম্বা চওড়া লোক দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে কেমন মিটিমিটি তাকাচ্ছে লোকটা। কেমন যেন মুখের ভাবটা। আমার দেখে মনে হচ্ছিল, ব্যাটার মতলব ভালো নয়। দিনকাল যা পড়েছে। একা মেয়ে মানুষ পেলেই হল। সে যাইহোক, আমি তো বরাবর তেজি। সোজা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘অ্যাই আপনি কে?’

কথাটা বললাম বেশ ধমকের সুরে। লোকটা প্রথমে আমার কথার কোনও উত্তর দেয়নি। চুপ করে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখন ওকে একটু ভয় পাওয়ানোর চেষ্টা করলাম।

—জানেন আমি কিন্তু যুযুৎসু জানি। ফল ভালো হবে না।

তবে লোকটা দেখলাম খুব অমায়িক। একটু মাথাটা চুলকে নিয়ে বলল, “আজ্ঞে আমাদের দুনিয়ায় ওসব অচল।”

এইবার আমার মাথা ভীষণ গরম হয়ে গেল।

—আপনাদের দুনিয়া মানে?

—আজ্ঞে, একটু বুঝিয়ে বলি। আমি হলাম যমদূত। আমাদের সঙ্গে ওইসব সু কু কাজ করে না।

রাগে আমার বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড জ্বলে গেল।

—ইয়ার্কি মারার জায়গা পাননি। আপনি যমদূত?

—আজ্ঞে আমি ঠিকই বলছি। আপনি আর বেঁচে নেই। আমি এসেছি আপনাকে নিয়ে যেতে। বিশ্বাস না হয়, ওই দেখুন।

ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে, বেডের উপর আমার বিভিন্ন নল আর কলকব্জা লাগানো নিষ্প্রাণ দেহটা দেখতে পেলাম। বুঝলাম আমি আর নেই। তবে কেন জানি না আমার কোনও দুঃখ হল না। মনটা একটা অন্যরকম আনন্দে ভরে যাচ্ছিল। ‘কী মজা। খেতে হবে না, ঘুমোতে হবে না, কারওর কথা শুনতে হবে না, যখন খুশি যেখানে খুশি যেতে পারব। কেউ দেখতে পাবে না। কী মজা।’ ওদিকে যমদূতটা তার কথা বলেই যাচ্ছিল।

—কিন্তু এদিকে একটা বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে।

—কীরকম? আপনাদের সমস্যা কীসের? মরে গেছি আমি। সমস্যা তো আমার হওয়ার কথা।

এবার একটু ফিক করে হাসল লোকটা। ভাবখানা যেন, আমি এক অবোধ বালিকা। কিছুই বুঝি না।

—যে মরে তার সব সমস্যাই মিটে যায়। তখন সমস্যা শুরু হয় আমাদের।

—কীরকম?

—ধরুন, এই যে আপনি মরে গেছেন, আপনি যদি কারওর থেকে টাকা ধার করে থাকেন, তাহলে তাকে আর টাকা শোধ দিতে হবে না। যদি সামনে পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর ভয় থাকে, সেই ভয় আর থাকবে না। সর্বোপরি মরে যাওয়ার ভয়টাও আর থাকবে না।

—বুঝলাম। তা আপনাদের কীসের সমস্যা?

—ওরে বাবা। এখন থেকে আপনার সব দায়িত্ব তো আমাদের। আর দায়িত্ব মানেই সমস্যা। বিশেষকরে আপনাকে নিয়ে তো বিরাট সমস্যা। জানি না আপনি কী বলবেন।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...