ভারত একটি ধর্মপ্রাণ দেশ। এখানে মহিলারা কর্মজীবী হলেও, পাশাপাশি সংসার সামলানো, বাড়ির পুরুষ সদস্যদের দেবতা মনে করে তাদের আদেশ পালন করা এবং বাকি সময়টা পূজা-অর্চনা ও পরোপকার করার মধ্যেই তাদের জীবনযাপন সীমাবদ্ধ। এমন একটি দেশে যদি কোনও নারী, কোনও ক্ষমতাবান পুরুষকে প্রশ্ন করেন এবং তাদের খেয়ালখুশিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে বুঝতেই পারছেন যে, এই কাজটি সহজ নয়।
নয়ডা নিবাসী ৫২ বছর বয়সি অঞ্জলি ভরদ্বাজ এমনিতে খুবই কোমল স্বভাবের। তাঁকে দেখে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না যে, তিনি শুধু সমাজে নিপীড়নের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হননি, শাসক কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করতে এবং তাদের জবাব দিতেও বাধ্য করেছেন। সেইসঙ্গে তিনি অন্যদেরও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উৎসাহ জুগিয়েছেন।
অঞ্জলি ১৯৯৯ সাল থেকে, অর্থাৎ ২৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে আরটিআই (তথ্য জানার অধিকার) আন্দোলনের অগ্রদূত। তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এনসিপিআরআই-এর (ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর পিপলস রাইটস টু ইনফরমেশন) সঙ্গেও যুক্ত আছেন। তিনি ২০০৪ সাল থেকে এনসিপিআরআই-এর কার্যনির্বাহী কমিটিতে আছেন এবং বর্তমানে এর সহ-আহ্বায়ক। এই প্রতিষ্ঠান তথ্য জানার অধিকার নিয়ে দেশব্যাপী প্রচারাভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২১ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক অঞ্জলি ভরদ্বাজকে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি-করাপশন চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড” দিয়ে সম্মানিত করা হয়। এছাড়াও তিনি ২০১১ সালে ‘লেডি শ্রী রাম কলেজ অনার রোল’ এবং ২০০৯ সালে ‘অশোকা ফেলোশিপ ফর সোশ্যাল অস্তেপ্রেনিওর’ দ্বারা সম্মানিত হন।
সমাজসেবায় আগ্রহ
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার হওয়ার এই কাহিনি শুরু হয় দিল্লিতে, যখন তিনি ‘লেডি শ্রীরাম কলেজ’-এ পড়তেন। সেই সময় থেকেই সমাজসেবার প্রতি অঞ্জলি-র আগ্রহ ছিল প্রবল। তিনি কলেজের স্টুডেন্ট ইউনিয়ন-এর সভাপতি ছিলেন এবং লেখালেখির প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর মা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা এবং বাবা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। কলেজ শেষ করে তিনি দারিদ্র্য হ্রাস এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কাজে যোগ দেন বিশ্বব্যাংকে। সেখানে তিনি স্বচক্ষে দেখেন, কীভাবে জনগণের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চালু করা হলেও, দুর্নীতির কারণে তা অধরাই থেকে যায়। এই ঘটনা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তাই তিনি এই দুর্নীতি দমনের জন্য কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশগত পরিবর্তন ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন অঞ্জলি। ফিরে এসে তিনি বিশ্বব্যাংকে অল্প সময়ের জন্য কাজ করেন। বিশ্বব্যাংক ছাড়ার পর তিনি অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও মনীশ সিসোদিয়ার সঙ্গে ‘পরিবর্তন’ নামে একটি সংস্থা শুরু করেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘Say No to Bribery’ প্রচার অভিযান চালু করেন। তবে, অঞ্জলির কাছে তাঁদের কর্মপন্থা ভিন্ন মনে হয়। এরপর তিনি সমমনস্কদের সঙ্গে নিয়ে ২০০৩ সালে ‘সতর্ক নাগরিক সংগঠন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থা মূলত দক্ষিণ দিল্লি এবং দক্ষিণ- পশ্চিম দিল্লির ১৫টিরও বেশি বস্তিতে উন্নয়নের কাজ করে।
এই সংস্থার লক্ষ্য হল— বস্তিবাসীদের, বিশেষকরে মহিলাদের সমস্যার সমাধান করা এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত করা। বস্তিবাসীরা সরকারি পরিসেবার উপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। তিনি মনে করেন, রেশন, পেনশন, জল ও স্যানিটেশনের মতো পরিসেবা প্রদানের পাশাপাশি, বিদ্যালয়ে যথাযথ শিক্ষা এবং হাসপাতালে ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা তখনই সম্ভব, যখন দুর্নীতি নির্মূল হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক ভাবে কাজ করবে এবং মানুষ তাদের অধিকার আদায় করবে।
‘সতর্ক নাগরিক সংগঠন’ শুধু আমলাতন্ত্রের কার্যকলাপই পর্যবেক্ষণ করে না, পাশাপাশি তথ্য অধিকার আইনের অধীনে (আরটিআই) আবেদনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজও পর্যবেক্ষণ করে। তাঁরা সাংসদ ও বিধায়কদের কর্মক্ষমতা এবং তাঁদের করা প্রশ্নগুলো পরীক্ষা করে সেইমতো পরবর্তী পদক্ষেপ নেন।
মালব্য নগরে অবস্থিত ‘সতর্ক নাগরিক সংগঠন’-এর অফিসে দেওয়া অঞ্জলি-র বক্তব্য এবার আমরা পরিবেশন করছি আপনাদের জন্য।
দুর্নীতি দমন
অঞ্জলির মতে, ‘দুর্নীতি জন্ম নেয় তখনই, যখন সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং রাজনীতিবিদরা পর্দার আড়ালে কাজ করেন। গণতন্ত্রে, জনগণ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয় এবং যে রাজনৈতিক দল ভোটে বেশি আসন পেয়ে জয়লাভ করে, তারাই সরকার গঠন করে। সরকার জনগণের করের টাকায় চলে। আমাদের ছোটোবেলা থেকে শেখানো হয়েছে যে, গণতন্ত্র জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। গণতন্ত্রে, জনগণের নামে সরকারের কাজ সম্পর্কে জনগণের কাছে তথ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন সরকার এই সবকিছু গোপন করে এবং পর্দার আড়ালে কাজ করে, তখন দুর্নীতির জন্ম হয়।
(ক্রমশ…)





