উপলব্ধি (শেষ পর্ব)

তন্বী পালটা কোনও উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে দরজার কলিং বেল বেজে উঠল। মিতা ফিরে এসেছে। আমায় দেখে অবাক হল। সবকিছু শুনে তন্বীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। আমি কিছু না বলে নীরবে নীচে নেমে এলাম।

এ ঘটনার দিনদুয়েক পরে একদিন সকালে একটু বেলা করেই লনের চেয়ারে বসে আছি। শীতকাল। নরম রোদ্দুর ভালো লাগছে। হঠাৎ একটা লম্বা ছায়া দেখে চোখ তুলে দেখি তন্বী দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি একটা হাসি হেসে সে আমার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল। দেখে অবাক হলাম, মেয়েটার চেহারা থেকে উগ্রতা একেবারে উধাও হয়ে গেছে।

খুশি হয়ে উঠে বললাম, “বল তন্বী, শরীর কেমন আছে? আজ হঠাৎ যে আমার কথা মনে পড়ল?”

তন্বী কিছুক্ষণ কোনও কথা না বলে বসে রইল। যেন কিছু বলার জন্য যে সাহস দরকার হয়, তা জোটানোর চেষ্টা করছে মনে মনে। তারপর থেমে থেমে বলল, “দিদা, সেদিনের আচরণের জন্য পরে আমার খুব খারাপ লেগেছে। তুমি ঠিকই বলেছিলে, সম্পর্কের গুরুত্ব কী আমি সত্যিই সেটা জানি না। পরে ভেবে দেখলাম, জীবনে এই প্রথমবার কেউ এতখানি নিঃস্বার্থ ভাবে আমার উপকার করল, যত্ন নিয়ে দেখভাল করল। অথচ সেই আমি, তার ভালোবাসা, স্নেহ আর মমতাকে মানতেই চাইলাম না। সত্যি আমি খুব খারাপ মেয়ে, দিদা!” আমি আশ্চর্য হলাম ওর উপলব্ধির কথা শুনে!

—তন্বী, আমার কথাগুলোকে তুই যে এভাবে মন দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছিস, এতেই আমার খুব ভালো লাগছে। আমি তোর আচরণে কিচ্ছু মনে করিনি রে! বাচ্চা মেয়ে তুই। মনে করব কেন ?

তন্বী হঠাৎ আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, ‘সত্যি বলছ তো? ক্ষমা করে দিলে তো? আমি তোমার থেকে দূরে যেতে চাই না দিদা!”

আমি বললাম, “আচ্ছা বেশ। ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু তন্বী বল তো, মনের মধ্যে এত বিষ কী করে জমা হল তোর!” তন্বী খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর সহসা গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, “সে অনেক ঘটনা দিদা। কাউকে কখনও বলিনি। কেবল একা কষ্ট পেয়েছি।’

আমি বললাম, ‘আমাকে বলতে পারবি?”

তন্বী অদ্ভুত অসহায় মুখে আমার দিকে তাকাল! তারপর বলতে শুরু করল…

—তুমি হয়তো জানো না দিদা, আমার বাবা আর মায়ের লাভ ম্যারেজ। দু’জনেরই পরিবারের কেউ যখন বিয়েটা মেনে নিল না, তখন ওরা সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই সম্পর্ক ত্যাগ করল। আমার বাবার চেয়ে মা বরাবরই বেশি পরিশ্রমী। কাজেই মায়ের দ্রুত পদোন্নতি হতে থাকল অফিসে। বাবা ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকল। সেটাই কাল হল। অফিসে দু’জনের পদের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান ওদের ব্যক্তিগত জীবনকেও ভেঙেচুরে তছনছ করে দিতে থাকল। ওদের দাম্পত্য জীবনের ব্যবধানটা ক্রমশ বাড়তেই লাগল। ঠিক এমন সময়েই আমি এসে গেলাম পৃথিবীতে। ওরা তখন পাগলের মতো কেরিয়ারের পিছনে ছুটছে। কে কাকে টপকে কীভাবে বেরিয়ে যাবে, তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে যেন।

—বাড়িতে দিনরাতের জন্য রাখা হয়েছিল দু’জন আয়াকে। ওদের হাতেই আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। যখন খুব অসুস্থ থাকতাম, মা-বাবা দু’জনে ঝগড়া করত। কে ছুটি নেবে, ঝগড়া তাই নিয়ে। ওদের কারও কাছে আমার জন্য কোনও সময় ছিল না। আমার মা, খ্যাতি-যশ-বৈভবের কাঙাল। আর সেই অবসরে আয়ারা ইচ্ছেমতো চলতে লাগল। আমাদের অনেক বৈভব থাকা সত্ত্বেও আমি অবহেলায় মানুষ হতে লাগলাম। আমার মনের সেই কষ্টের কথা মা-বাবার কানে পৌঁছাল না। আমি বেড়ে উঠতে থাকলাম সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে। নিঃসঙ্গ, একদম একা!

—আমার কথা আদৌ না ভেবে ঝগড়াঝাঁটি করে ওরা একদিন আলাদা থাকতে শুরু করল। বাবা তো আমার দিকে ফিরেও চাইল না। মায়ের বাধ্যবাধকতা ছিল। মা আর কী করে। খানিকটা বাধ্য হয়েই তাকে আমায় সহ্য করতে হল৷ কিন্তু আমি যেন কারও মেয়ে নই। আমি আশ্রিতা। আশ্রয়দাতা বাবা নাকি মা, তাতে ফারাক কিছু পড়ে না। পড়াশোনা করতে কোনও উৎসাহ পেলাম না। একটা উদ্দেশ্যহীন, নিরর্থক জীবন….।

হঠাৎ থামল তন্বী। একটু উদাস লাগছে ওকে। উঠে পড়ে বাড়ির ভিতরে গেল। টের পেলাম, ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা জল খাচ্ছে। ফিরে এসে আবার বসল আমার পাশে।

—মা আর বাবার প্রতি আমার যে ভীষণ অভিমান আর ঘৃণা, তার শুরুটা হয়েছিল এখান থেকেই। ভিতরে ভিতরে একটা যুদ্ধ হয়ে চলেছে নিরন্তর। নিজেরই সঙ্গে। আমার বাবা-মায়ের জীবনে যাবতীয় সুখশান্তি, সমাজে তাদের মানসম্মান, এমনকী আমার নিজের জীবনকেও তছনছ করে ফেলার আগ্রাসী মনোভাব— আমায় ঘিরে ধরল। যেসব কাজ বাবা-মাকে দুঃখ দেয়, উদ্বেগে ফেলে, বিব্রত করে, সেগুলো করতে আমার ভীষণ ভালো লাগতে থাকে। সত্যি বলতে কী, আজও আমার সেই মানসিকতা এতটুকু বদলায়নি। হয়তো সেজন্যই আমি এরকম। আগ্রাসী, উগ্র, উদ্ধত…!

—আমি অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় তোমার কাছ থেকে যে স্নেহ, ভালোবাসা পেলাম, বিশ্বাস করো দিদা, তা আমার কাছে একেবারে নতুন। একেবারে আলাদা। যা জীবনে কখনও আমি কারওর কাছ থেকে পাইনি। নতুন একটা ভালোলাগা, অন্যরকম ভালোবাসা, স্নেহ, মমতার স্পর্শ পেলাম। সেদিনই মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র তোমার কাছেই আমার মনের চাপা ব্যথাগুলো বলে হালকা হতে পারব। বলো না দিদা, আজকে আমার আচরণ যে কেউ পছন্দ করে না, তার পিছনে দোষ কি একা আমার?

কথা শেষ করে, তন্বী মাথা নিচু করে বসে রইল। মনে হল, ভিতরে ভিতরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

বললাম, ‘কী বোকা মেয়ে রে তুই। সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ না করেই নিজের মাকে-ই শত্রু ভেবে বসলি? তুই কি জানিস, তোর জন্য মিতা কত কষ্ট পায়? একবার তোর মায়ের দিক থেকে ভেবে দ্যাখ তন্বী। বেচারি নিজের মর্জিতে তোর বাবাকে বিয়ে করে আত্মীয়স্বজন সবাইকেই খোয়াল। ও তো বাধ্য হয়েছিল এ জীবন বেছে নিতে। নাহলে নিজের আর তোর ভরণপোষণ কী করে হতো বল তো! ওর তো আরও বেশি রোজগারের প্রয়োজন ছিল। ও তো শখের চাকরি করে না। বেঁচে থাকতে গেলে, এই জীবনটা ওকে মেনে নিতেই হতো। তোর মাকে আমি কেন এত ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি জানিস? এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সে হেরে মাথা নুইয়ে ফিরে আসেনি। কখনও নিজের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চায়নি। অথচ সে সবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত! যে-মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মিতা এতকিছু করল, সে-ই তার সম্পর্কে ভুল ভেবে বসে আছে।”

তন্বী কিছু বলল না। সম্ভবত তার কিছু বলার ছিল না। সে চুপ করে বসে রইল।

আমি বললাম, ‘কোনও জিনিসকে ভাঙতে এক মুহূর্ত লাগে, কিন্তু গড়তে অনেক সময় লেগে যায়, হয়তো সারা জীবন। সম্পর্কও সেরকম একটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে যাক! তোর জীবনে যা ঘটে গেছে তন্বী, তার উপর তোর সত্যিই কোনও হাত ছিল না, এটাও সত্যি। এমনকী মনের উপরেও না। মানুষের মন। তা যে সবসময় অঙ্ক কষে, সাতপাঁচ ভেবে চলবে, এমন তো নয়! অথচ দ্যাখ, তোদের মা-মেয়ের ছোট্ট সুখী সংসারটা কীভাবে দুঃখের সমুদ্রে নিমজ্জিত! কী লাভ? কী পেলি তন্বী?’

আমার কাঁধে হঠাৎ মাথা রাখল তন্বী। ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। ক্লান্ত। যুদ্ধ তো তন্বীও করছিল। এখন বুঝি যুদ্ধ থেমেছে। ওর মসৃণ চুলে অন্যমনস্ক ভাবে খেলা করছে আমার আঙুল। তন্বী নিঃশব্দে কাঁদছে। কাঁদুক। যত কাঁদবে তত মনের বোঝা হালকা হবে। বাধা দেব না।

খানিকক্ষণ পরে সে মুখ তুলল। বলল, ‘আমি খুব অন্যায় করেছি দিদা। মা কি আমায় ক্ষমা করবে? তোমার মতো করে আমায় বুঝবে?”

আমি বললাম, ‘না বুঝুক কিন্তু মা-তো, ঠিক ক্ষমা করে দেবে! দেখিস!”

(সমাপ্ত)

গজল আলাঘ-এর অসাধারণ জীবন-কাহিনি (পর্ব-০২)

গজল আলাঘ প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘যা আপনার পছন্দ নয়, এমন একটি ক্ষেত্রে যতই কঠোর পরিশ্রম করুন না কেন, আপনি খুব বেশি দূর এগোতে পারবেন না। অন্যদিকে, যদি আপনি এমন একটি ক্ষেত্রে থাকেন, যা আপনার খুব পছন্দ, তাহলে আপনি কম পরিশ্রম করেও খুব সফল হতে পারবেন। এই কারণেই আমি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল পরীক্ষায় না বসে, কম্পিউটার- এর শিক্ষা নিয়েছিলাম।’

ব্যাবসা শুরু করার আগে

স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি, গজল NIIT থেকে ডিপ্লোমা কোর্সও করেন। সেই কোর্সটি করার সময়, তিনি প্রথমে চাকরি শুরু করেন। এটি পার্ট টাইম চাকরি ছিল, যা মূলত একটি সমবায় প্রশিক্ষণ শিবিরের কাজ ছিল এবং এই কাজটি উইকএন্ড-এ করতে হতো। এর পর অবশ্য গজল কর্পোরেট জগতে শুরু করেছিলেন তাঁর কর্মজীবন। সেখানে তিনি শিখেছিলেন কীভাবে পেশাদার পরিবেশে কাজ করতে হয়, দলগত ভাবে কীভাবে একসঙ্গে লক্ষ্য অর্জন করতে হয় এবং প্রতিদিন নতুন কিছু শিখে কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়।

গজল এও জানিয়েছেন যে, কর্পোরেট চাকরি তাঁকে ব্যবসায়িক কাঠামো এবং শৃঙ্খলা তৈরি করতে শিখিয়েছে। আর সেই শিক্ষা আজ ব্যাবসা পরিচালনায় তাঁকে অনেক সাহায্য করছে বলেও জানিয়েছেন। কর্পোরেট অভিজ্ঞতা তাঁকে সঠিক চিন্তাভাবনা করতে শিখিয়েছে এবং তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে যে, কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সঙ্গে যে-কোনও লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।

এক মা থেকে কর্মজীবীমা হওয়ার সফর

গজল আলাঘ-এর কথায়, “এই সফর মোটেও সহজ ছিল না। যখন ‘মামাআর্থ” শুরু করি, তখন আমার ছেলে খুব ছোটো ছিল এবং ওই বয়সে সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল একজন মায়ের। ২৪ ঘণ্টা কাজ করা এবং মায়ের দায়িত্ব পালন করা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল তখন আমার কাছে। অনেক সময় অফিসের মিটিং-এও ছেলেকে নিয়ে যেতে হতো। কারণ অন্য কোনও উপায় ছিল না আমার। এমন সময় ছিল যখন আমি আমার সন্তানকে যতটা সময় দেওয়া দরকার ছিল, ততটা দিতে পেরেছি কিনা তা নিয়ে ভেবে অপরাধ বোধে ভুগতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পেরেছি যে, সন্তানদের অহেতুক বেশি সময় দেওয়ার চেয়ে, কোয়ালিটি টাইম দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’’

তিনি নিজেকে অনেক সেলফ-ডাউট থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং শিখেছিলেন যে, একজন ভালো মা হতে গেলে নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়, সন্তানদের সঙ্গে আন্তরিক ভাবে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এই সবকিছুতেই এক স্ট্রং সাপোর্ট সিস্টেম তাঁকে খুব সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন গজল। আর এই সাপোর্টার ছিলেন তাঁর স্বামী, পরিবার এবং সহকর্মীরা। তাঁর মতে, ‘কর্মজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা প্রথমে আমার লক্ষ্য ছিল না। এটি একটি ধারাবাহিক সফর ভেবে নিয়ে আমি যা সঠিক মনে করেছি, তার জন্য কাজ করে গেছি।’

পিতামাতার দেওয়া শিক্ষা সুফল দিয়েছে

গজল আলাঘ চণ্ডীগড়ের একটি যৌথ পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ছিলেন গৃহিণী। গজল জানিয়েছেন যে, ‘বাবা সবসময় বলতেন যে, ব্যাবসা লাভজনক হলেই টাকা ঘরে ফিরে আসে। তাই ব্যাবসা করতে হলেও স্বাধীনতা চাই। আমার বাবা-মা সবসময় তাই আমাকে স্বাধীন এবং স্বাবলম্বী হতে অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁদের থেকে পাওয়া মূল্যবোধ-ই কঠিন সময়ে আমাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে চলেছে।’

কথা প্রসঙ্গে গজল আরও জানিয়েছেন যে, ‘আমার বাবা বলতেন, স্বপ্নের পিছনে ছুটবে নিশ্চয়ই, কিন্তু মূল্যবোধ ত্যাগ করে নয়। তিনি আমাকে কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং নিষ্ঠার মূল্য শিখিয়েছিলেন এবং এই তিনটি জিনিস আজও আমার প্রতিটি ব্যবসায়িক সাফল্যের রসদ। যখনই কোনও অসুবিধা হয়, তখন আমার পরিবারের সমর্থন এবং আমার বাবা-মায়ের শিক্ষা আমার সবচেয়ে বড়ো শক্তি হয়ে উঠেছে। আজ আমি যা কিছু করতে পেরেছি, আমার পরিবার এবং আমার বাবা-মায়ের চিন্তাভাবনা এতে বিশাল ভূমিকা পালন করে। যেমন— সর্বদা গ্রাহকদের জন্য এগিয়ে আসা, প্রোডাক্ট-এর গুণমানের সঙ্গে কখনও আপোশ না করা এবং প্রতিদিন সবার থেকেই নতুন কিছু শিখতে চেষ্টা করা।’

শিল্পকর্মের প্রতি আগ্রহ

বাণিজ্য হল গজলের পরিচয় এবং চিত্রকলা হল এমন একটি থেরাপি, যেখানে তিনি তাঁর চিন্তাভাবনা সৃজনশীল উপায়ে প্রকাশ করতে পারেন। এই প্রসঙ্গে গজল জানিয়েছেন, তিনি সবসময় ছবি আঁকতেন। কিন্তু একদিন তাঁর স্বামী তাঁকে না বলেই নিউ ইয়র্ক আর্ট আকাদেমিতে আবেদন করেন এবং তাঁর এই জীবন-সফর নতুন মোড় নেয়। আসলে গজলের বেশিরভাগ কাজই অ্যাবস্ট্রাক্ট, যেখানে তিনি বিভিন্ন রং এবং টেক্সচার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। ব্রাশের পরিবর্তে অনেক সময় তিনি ছুরি এবং রোলার দিয়েও চিত্রকলা তৈরি করেন।

যখন তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন, তখন তিনি জানেন না যে, এর শেষ পরিণতি কী হবে। এটি এমন একটি সফর, যা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। যখন মন খুব চঞ্চল থাকে, তখন একটি ফাঁকা ক্যানভাস তাঁকে শান্ত করে এবং নতুন ভাবে পথ চলতে অনুপ্রাণিত করে বলে মনে করেন তিনি।

সন্তানদের লালনপালন

গজলের দুই ছেলে— অগস্ত্য এবং আয়ান। অগস্ত্য বড়ো এবং আয়ান ছোটো। গজল জানিয়েছেন যে, তিনি এবং তাঁর স্বামী বরুণ মিলে কিছু মৌলিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়েছেন সন্তানদের। যেমন— সম্মান, সততা এবং দয়ার মনোভাব থেকে তাঁদের সন্তানরা যেন বিচ্যুত না হয়। তিনি আরও চান যে, তাঁর সন্তানরা স্বাধীন হোক, প্রশ্ন করুক এবং ধীরে ধীরে বুঝতে পারুক যে, তারা কী পছন্দ করে, কী তাদের আকর্ষণ করে। আর তিনি চান তাঁদের সন্তানরা যেন শিকড়ের সঙ্গে জুড়ে থাকে।

জেনু ভালগাম সমস্যায় পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার সঠিক উপায়

জেনু ভালগাম, যা সাধারণত নক-নিস নামে পরিচিত, এমন একটি অবস্থা, যেখানে হাঁটু দুটি ভেতরের দিকে বেঁকে একে অপরের সঙ্গে লেগে যায়, কিন্তু গোড়ালি দুটি আলাদা থাকে। নক-নিস আক্রান্ত কোনও শিশু যখন হাঁটু দুটি জোড়া করে দাঁড়ায়, তখন গোড়ালির ভেতরের দিকের হাড় দুটির মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক দেখা যায়। যদিও এটি শৈশবের বিকাশের সময় একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক পর্যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এই সমস্যা ১৮-২০ বছর বয়স পর্যন্ত থাকে। আসলে নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অসুস্থতার কারণেও হতে পারে এই সমস্যা। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন পেডিয়াট্রিক অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সৌম্য পাইক।

জেনু ভ্যালগামের কারণ প্রায়ই ব্যক্তির বয়সের উপর নির্ভর করে। বেশিরভাগ শিশুদের ক্ষেত্রে, এটি বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক অংশ। অনেক শিশুর তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে এই অবস্থাটি দেখা দেয় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাত বা আট বছর বয়সের মধ্যে কোনও চিকিৎসা ছাড়াই তাদের পা স্বাভাবিক ভাবে সোজা হয়ে যায়।

তবে, কিছু ক্ষেত্রে এই অবস্থাটি অন্যান্য কারণের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। যদি এটি হঠাৎ দেখা দেয়, শুধুমাত্র একটি পা-কে প্রভাবিত করে কিংবা গুরুতর বলে মনে হয়, তবে এটি ভিটামিন ডি বা ক্যালসিয়ামের অভাবে সৃষ্ট রিকেটসের মতো পুষ্টিগত ঘাটতি। হাঁটুর কাছের গ্রোথ প্লেটকে প্রভাবিত করে এমন আঘাত বা সংক্রমণ, নির্দিষ্ট কিছু হাড়ের রোগ কিংবা স্থূলতার মতো সমস্যার কারণে হতে পারে, যেখানে অতিরিক্ত শারীরিক ওজন হাঁটুর জয়েন্টগুলিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এবং এর বিন্যাসকে আরও খারাপ করে তোলে।

Paediatric Orthopedic Surgeon Dr. Soumya Paik
Paediatric Orthopedic Surgeon Dr Soumya Paik

যদি এই অবস্থাটি গুরুতর হয় কিংবা এর চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি হাঁটুর জয়েন্টের উপর শরীরের ওজন কীভাবে পড়ে, তা প্রভাবিত করতে পারে। এই অবস্থাটি হাঁটুর বাইরের অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যার কারণ হতে পারে।

এর মধ্যে থাকতে পারে হাঁটু, কোমর বা গোড়ালিতে জয়েন্টের ব্যথা, হাঁটার ধরনে পরিবর্তন এবং লিগামেন্টের ক্ষতি বা হাঁটুর মালাইচাকির স্থানচ্যুতির মতো হাঁটুর আঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি। দীর্ঘমেয়াদে, জয়েন্টের উপর এই অসম চাপ তরুণাস্থির ক্ষয়ের কারণে অকাল অস্টিওআর্থারাইটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

জেনু ভালগাম আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না, যদি না গোড়ালি দুটির মধ্যে ব্যবধান খুব বেশি হয়। অনেক ক্ষেত্রে, শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে এই অবস্থাটি স্বাভাবিক ভাবেই ভালো হয়ে যায়। যেসব ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী হয় কিংবা ব্যথার কারণ হয়, সেক্ষেত্রে চিকিৎসকরা সতর্ক পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে পায়ের কোণ ট্র্যাক করতে এবং অবস্থাটি আরও খারাপ হচ্ছে কি-না তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে নিয়মিত চেক-আপ।

কিছু ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। যেসব শিশু এখনও বাড়ন্ত, তাদের জন্য গাইডেড গ্রোথ নামক একটি পদ্ধতিতে ছোটো প্লেট ব্যবহার করে বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাড়কে ধীরে ধীরে সঠিক দিকে চালিত করা হয়। কিশোর-কিশোরী কিংবা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অস্টিওটমি নামক একটি অস্ত্রোপচার করা যেতে পারে, যেখানে হাঁটুর কোণ ঠিক করার জন্য হাড় কেটে সেটিকে পুনরায় বিন্যস্ত করা হয়।

উপলব্ধি (পর্ব-০২)

ঝরনা দু-কাপ কফি দিয়ে গেল। মালকিনের অনেক পরে ঘুম ভাঙে তার। প্রশ্রয়ও পায়। ছোটো থেকে এ বাড়িতে আছে। আমরা নীরবে কফি খেতে থাকি। কখনও কখনও অখণ্ড নীরবতাও এমন অনেক কথা বলে যায়, যা মুখে প্রকাশ করা অসম্ভব। আমাদের দু’জনের মধ্যেও সহানুভূতির মৌন আদানপ্রদান হতে থাকল।

সেই ভোরের পর থেকে, যাওয়া-আসার সময় মিতা প্রায়ই আমার পাশে লনে খনিকক্ষণ বসে যেত। নিজের গোপন কথাবার্তাও ভাগ করে নিত কখনও কখনও। অনর্থক কৌতূহল দেখানো রুচি বিগর্হিত কাজ। নিজেই বলত।

টুকরো টুকরো কথাগুলোকে জুড়ে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করলাম। মিতার সঙ্গে ওর স্বামী রণজিতের ডিভোর্স হয়নি ঠিক-ই, তবে এই শহরেই রণজিৎ আলাদা থাকে। আট বছর যখন বয়স তন্বীর, মিতা আর রণজিৎ আলাদা থাকতে শুরু করে। রণজিৎ-ই কার্যত মা-মেয়েকে ছেড়ে যায়। তারপর কোনওদিন এমুখো হয়নি। না, মেয়েকে দেখতেও নয়। স্ত্রী ও মেয়ের সব দায়িত্বও কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল সে।

তন্বীর বাড়তে থাকা উগ্র, উড়নচণ্ডী আচরণ মিতার দুশ্চিন্তা আর মানসিক উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলছিল। তন্বীর বন্ধুদের দিকে সরাসরি তাকনো যায় না। ভয় করে। মনে হয় এরা এই পৃথিবীর কেউ নয়। পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা সবই অদ্ভুত। দিনরাত মাল্টিপ্লেক্স আর নাইটক্লাবে ঘুরছে।

মিতাকে দেখে খারাপ লাগে এখন। বেচারি যেন মরমে মরে থাকে। সাজপোশাকের পারিপাট্যও গিয়েছে। চোখের নীচে একরাশ বিষণ্ণতা। অনেক চেষ্টার পরও তথীকে সে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, সেই ব্যথা যেন তার সর্বাঙ্গে ফুটে বের হয়। আমি যে ওকে কোনওরকম সাহায্যই করতে পারছি না, এতে কম কষ্ট পাচ্ছি না আমিও। উদ্ধৃত ওই মেয়েটিকে বাগে আনার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু মিতা তো নির্দোষ। সে চেষ্টাও চালিয়েছিল আপ্রাণ। তাকে কষ্ট পেতে দেখাটা খুব সুখকর বিষয় নয়। আমার কাছে।

একদিন সকাল থেকে লোডশেডিং। দুপুরের মধ্যে ট্যাংকের জল শেষ হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে অলস আঙুলে একটা পত্রিকার পাতা উলটোচ্ছি, দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শুনে উঠতে হল। দরজা খুলে থমকে গেলাম। তন্বী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা জলের জগ। আমার কপালে দু-চারটে বিরক্তির রেখা ফুঠে ওঠার আগেই তন্বী বলে উঠল, ‘একটু জল হবে?’

বললাম, ‘হবে। আমি সবসময় বালতিতে জল ভরে রাখি। হঠাৎ বিপদের সময় কাজে লেগে যায়।”

জগ ভর্তি জল নিয়ে তন্বীর হাতে দিতে গিয়ে সহসা আমার চোখ গেল ওর টকটকে লাল দুটো চোখ আর অত্যধিক ঝুঁকে পড়া ক্লান্ত শরীরটার দিকে। জগটা নেওয়ার সময় আমার হাতে ওর আঙুলগুলো ছুঁয়ে যেতে চমকে উঠলাম। আঙুলগুলো থেকে যেন আগুনের তাপ বের হচ্ছে।

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “আরে, তোমার গায়ে তো ধুমজ্বর!” অজান্তেই আমার হাতটা তখন তার কপালে উঠে গেছে। তন্বী ছটফট করে উঠে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হল। বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না, আমি নিজের খেয়াল রাখতে পারি। আমার অভ্যাস আছে।” তারপর যেভাবে সে ধূমকেতুর মতো হাজির হয়েছিল, সেভাবেই দ্রুত পায়ে ফিরে গেল। যেন উবে গেল।

গায়ে এত জ্বর নিয়ে বাড়িতে একলা থাকা কতটা সংগত সেটা নিয়ে উচিত-অনুচিতের দ্বন্দ্বে পড়লাম। কিন্তু তন্বী যেভাবে তার উদ্ধত ভঙ্গিমা দেখিয়ে চলে গেল, তাতে মনটা যেন বিষিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ যাব কি যাব না-র অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মন সায় দিল না। তুলসীপাতা দিয়ে এক কাপ চা বানিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলাম। দোতলার দরজা খোলাই ছিল। ওদের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি, মাথা পর্যন্ত চাদর টেনে শুয়ে আছে তন্বী। গোটা শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। অদ্ভুত একটা গোঙানির শব্দ উঠে আসছে।

বিছানার একধারে পড়ে থাকা কম্বলটা ভাঁজ খুলে তন্বীর গায়ে চাপা দিয়ে দিলাম। নাম ধরে ডাকতে সাড়া দিল। আমায় দেখে ভ্রূ কুঁচকে উঠল। কিন্তু সেই কুঞ্চন বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না।

ওকে বললাম, “চা-টা খেয়ে নাও। দেখবে, শরীরটা ভালো লাগবে।’

কষ্ট করে আধশোয়া হল তন্বী। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ চলে এল। ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বের করে ওর মাথায় জলপট্টি দিতে বসলাম। বেশ খানিকক্ষণ পরে মনে হল জ্বরটা নামছে। ওকে আগের চেয়ে অনেক সুস্থ দেখাচ্ছে। মিতাকে খবরটা দেওয়া উচিত ভেবে সামনে রাখা ফোনটা তুলে আমি মিতার মোবাইল নম্বর জানতে চাইলাম।

তন্বী কোনওমতে হাত দুটো বাড়িয়ে জোর করে রিসিভারটা কেড়ে নিল।

—না আপনি… আপনি ফোন করবেন না!

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলাম, “কেন?’

তন্বীর কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবু থেমে থেমে বলতে থাকে, ‘মানছি, আপনি আজ আমার জন্য অনেক কিছু করেছেন। তবে, আপনার কাছে একটাই অনুরোধ। দয়া করে আমাদের ব্যাপারে থাকবেন না।”

তন্বীর সপাটে বলা কঠোর কথাগুলো মাথার মধ্যে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাব বলে পা বাড়ালাম। নীচে নেমে এসে এক কাপ কফি বানিয়ে চুমুক দিতে গিয়েই, বিছানায় টানটান তন্বীর কাঁপতে থাকা দুর্বল শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। হঠাৎ মনে পড়ল, ওকে তো জিজ্ঞেস করা হল না, সারাদিন মেয়েটার পেটে কিছু পড়েছে কিনা! যদি না খেয়ে থাকে! স্যুপ বানিয়ে আবার গেলাম ওর কাছে।

—আমি তোমার কাছে আসি এটা হয়তো তোমার পছন্দ নয়। তবু, এক বাটি গরম স্যুপ এনেছি। খেয়ে নাও। তন্বী অশক্ত শরীরটা তুলে ধরে বলল, ‘না, সেরকম নয়!”

আর কিছু না বলে আমার হাত থেকে স্যুপের বোলটা নিয়ে সে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে শুরু করল। ওর চোখমুখে একটা তৃপ্তির ভাব ফুটে উঠল। তলানিটুকু পর্যন্ত খেয়ে মুখ মুছে বলল, ‘থ্যাংকস মিসেস মজুমদার। খুব টেস্টি ছিল স্যুপটা।’ আমার আর সহ্য হল না। ঝাঁঝিয়ে উঠে বললাম, “মিসেস মজুমদার? আমার বয়স কত জানিস? তোর মা আমাকে মাসিমা বলে।”

তন্বীর শান্ত আর তৃপ্ত চোখে হঠাৎ-ই বিরক্তি চলকে পড়ল, ‘তাহলে কী বলব?’

—সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? ঠাম্মা বলতে পারিস, অথবা দিদা…।’

তন্বী কেমন বাঁকা হেসে বলল, ‘আমি সম্পর্কে বিশ্বাস করি না। সেজন্যই কারও সঙ্গে আত্মীয়তা পাতাই না।’ তন্বীর ভিতর থেকে হঠাৎ যেন বয়সোচিত সারল্য উধাও। কিন্তু আমিও মরিয়া জবাব দিলাম, ‘সব কিছুকেই তোরা আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা পাওনাগন্ডার হিসাবে দেখিস। তোরা কী করে জানবি মানুষের জীবনে সম্পর্কের গুরুত্ব কতটা! তাতে কত সুখ, তা তুই কী জানিস?’

(ক্রমশ…)

গজল আলাঘ-এর অসাধারণ জীবন-কাহিনি (পর্ব-০১)

শিল্পের প্রতি আগ্রহ থাকা গজল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সৃষ্টি প্রদর্শন করেছেন এবং তিনি দেশের শীর্ষ ১০ জন মহিলা শিল্পীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। একজন কর্পোরেট প্রশিক্ষক, একজন শিল্পী এবং একজন মা হওয়ার পাশাপাশি, গজল আজ একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী।

গজল জানিয়েছেন, “ব্যবসায়িক ক্ষেত্র আমাকে শিখিয়েছে যে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাই যা নিয়ন্ত্রণে আছে তার উপর মনোযোগ দেওয়া উচিত। সারাদিন আমি কী করেছি, কী করিনি, কী ঘটেছে এবং তার থেকে শিক্ষা নিয়ে কী করলে ভালো হবে, তাই নিয়ে ভাবি দিনের শেষে। এরই পাশাপাশি, ভালো ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি।”

আজকের নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের পতাকা ওড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধু মাতৃত্ব উপভোগ করার জন্য পরিবারের যত্ন নেন না, বরং সাফল্যের নতুন সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠেন। কর্মজীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে, তাঁরা তাঁদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে রঙিন করে তুলছেন। তাঁরা নিজের দক্ষতায় নাম, খ্যাতি এবং অর্থ উপার্জন করেন এবং তাঁদের সন্তানদের জন্য আদর্শ মা হয়ে ওঠেন। তাঁরা শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সাফল্য পাচ্ছেন। আর এই সফল এবং সেলফ-মেড মহিলাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে গজল আলাঘ-এর নামও ।

মা হওয়ার পর, গজল আলাঘ এক অভিনব ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেন এবং কোটি কোটি টাকার একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। বেবি-কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহারের পর অ্যালার্জিতে ভুগছিল তাঁর বড়ো ছেলে। তাই তিনি এক অভিনব উদ্যোগ নিতে শুরু করেন। গজল তাঁর স্বামী বরুণ আলাঘ-এর সহযোগিতায় একটি বেবি কেয়ার ব্র্যান্ড ‘মামাআর্থ’ (Mamaearth) প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ সারা বিশ্বে বিখ্যাত ব্র্যান্ড-এ পরিণত হয়েছে। এটি এশিয়ার প্রথম মেড সেফ সার্টিফায়েড ব্র্যান্ড।

প্রসঙ্গত গজল জানিয়েছেন যে, তাঁর বড়ো ছেলে অগস্ত্যের ত্বক একজিমার কারণে খুব সংবেদনশীল ছিল। তার ত্বকে বারবার র‍্যাশ-এর সমস্যা হচ্ছিল। তাই গজল তাঁর ছেলের জন্য দিনরাত এমন পণ্য খুঁজছিলেন, যা তাঁর ছেলের ত্বকের ক্ষতি করবে না। কিন্তু ভারতে এই ধরনের টক্সিন-মুক্ত পণ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি বাইরে থেকেও পণ্য অর্ডার করেছিলেন কিন্তু সেগুলোও তাঁর ছেলের ত্বকের সঙ্গে মানানসই ছিল না। তারপর মনে হল, তাঁর মতো আরও অনেক বাবা-মা হয়তো একই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে।

তাঁর স্বামী বরুণ এবং গজল একসঙ্গে গবেষণা শুরু করেন, মার্কেট সার্ভে করেন, অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ নেন এবং বুঝতে পারেন যে, ভারতে নিরাপদ এবং বিষমুক্ত বেবি-কেয়ার প্রোডাক্ট-এর ব্যাপক প্রয়োজন। এখান থেকেই তাঁর ধারণা তৈরি হয় যে, এমন প্রোডাক্ট তৈরি করা উচিত, যার উপর বাবা-মায়েরা আস্থা রাখতে পারবেন এবং তারা কোনও টেনশন ছাড়াই তাদের সন্তানদের যত্ন নিতে পারবেন। এই চিন্তাভাবনা মাথায় রেখেই ২০১৬ সালে ‘মামাআর্থ’ ব্র্যান্ড-এর পথ চলা শুরু হয়েছিল।

পরিশ্রমের সুফল লাভ

‘মামাআর্থ’ এমন একটি ব্র্যান্ড, যা একেবারে কোমল এবং বিষমুক্ত বেবি-কেয়ার প্রোডাক্ট তৈরি এবং সরবরাহ করে। গজল তাঁর ব্র্যান্ড-কে এতটাই উচ্চে তুলেছেন যে, এর জন্য তিনি পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার এবং সম্মান। ‘বিজনেস টুডে অ্যান্ড ফরচুন ইন্ডিয়া’-র ২০২৩ সালের ‘মোস্ট পাওয়ারফুল উয়োম্যান’ অ্যাওয়ার্ড, ‘ইটি ৪০ আন্ডার ৪০’, ‘সিএনবিসি ফার্স্ট ফরোয়ার্ড উয়োম্যান অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড’, ‘বিজনেস টুডে’-র ২০২৪ সালের ‘মোস্ট পাওয়ারফুল উয়োম্যান’ অ্যাওয়ার্ড, ‘বিজনেস ওয়ার্ল্ড’-এর ৪০ আন্ডার ৪০’ প্রভৃতি পুরস্কার পেয়েছেন গজল।

শিল্পের প্রতি আগ্রহ থাকা গজল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সৃষ্টি প্রদর্শন করেছেন এবং তিনি দেশের শীর্ষ ১০ জন মহিলা শিল্পীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। একজন কর্পোরেট প্রশিক্ষক, একজন শিল্পী এবং একজন মা হওয়ার পাশাপাশি, গজল আজ একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী। সোনি চ্যানেলের ‘শার্ক ট্যাঙ্ক সিজন ১’ অনুষ্ঠানের অন্যতম বিচারকও ছিলেন গজল।

লেখাপড়ায়ও ভালো ছিলেন গজল, কিন্তু খেলাধুলা এবং পেইন্টিং-এও বিশেষ আগ্রহ ছিল তাঁর। তিনি দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করেছেন, কারণ তাঁর মা এবং বাবা চেয়েছিলেন যে তিনি পরবর্তীকালে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রি অর্জন করুক। কিন্তু গজলের শখ ছিল কম্পিউটার এবং শিল্পকলায়। তবুও, বাবা-মায়ের পছন্দকে অগ্রাধিকার দিয়ে, তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু গজল একসময় বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি এই বিষয় নিয়ে মানসিক ভাবে আর এগোতে পারবেন না। কারণ এই বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভে তাঁর মন সায় দিচ্ছিল না।

(ক্রমশ…)

আগামী বৈশাখ-কে আহ্বান জানানো হল ‘পয়লা পার্বন ২০২৬’ শিরোনামে

কিছুদিন পর বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানাবেন বাংলার মানুষ। আর ঠিক তার এক মাস আগেই ‘পয়লা পার্বন ২০২৬’ শীর্ষক এক সাংস্কৃতিক মহোৎসবের মাধ্যমে, নববর্ষের চেতনাকে জাগিয়ে তোলা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে।

গত ১২ থেকে ১৫ মার্চ সল্টলেকের করুণাময়ী সেন্ট্রাল পার্ক-এর বইমেলার প্রাঙ্গণে আয়োজিত, চার দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক মহোৎসবটি পরিবারবর্গ, শিল্পী, উদ্যোক্তা এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের একত্রিত করেছিল বাংলার ঐতিহ্য এবং সমসাময়িক সৃজনশীলতার এক প্রাণবন্ত উদযাপনের লক্ষ্যে। লাইভ সংগীত এবং হস্তশিল্প থেকে শুরু করে লোভনীয় খাবার, সবকিছু কলকাতার অটল ভালোবাসাকে তুলে ধরেছিল।

চার দিনের এই কার্নিভাল সমসাময়িক বাঙালি সংগীত শিল্পীদের লাইভ পরিবেশনা, তাঁতের বস্ত্র, টেরাকোটা, ডোকরা শিল্প এবং স্থানীয় কারিগরদের হস্তনির্মিত সৃষ্টি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি হস্তশিল্প বাজার এবং একটি প্রাণবন্ত খাদ্য মণ্ডপের মাধ্যমে বাংলার প্রাণবন্ত চেতনাকে মূর্ত করে তুলেছিল। মণ্ডপে খাঁটি বাঙালি খাবার পরিবেশিত হয়েছিল। পাশাপাশি, কলকাতার বিখ্যাত স্ট্রিট ফুডও পরিবেশিত হয়েছিল। সৃজনশীল কর্মশালা এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলোতে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণও ছিল অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। যার ফলে এই উৎসবটি পরিবারবর্গ এবং সংস্কৃতিপ্রেমী উভয় গোষ্ঠীর জন্যই এক প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। সংগীত, শিল্পকলা, ভোজনরসিকতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য উদযাপনের লক্ষ্যে হাজার হাজার দর্শনার্থীর সমাগমে, ‘পয়লা পার্বণ ২০২৬’ কলকাতার উৎসব-পঞ্জিতে একটি অত্যন্ত সমাদৃত সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে নিজের অবস্থানকে আবারও সুদৃঢ় করেছে । এটি এমন এক উদযাপন, যেখানে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক ভাবধারার মিলন ঘটে এবং যেখানে প্রতিটি দর্শনার্থীই ‘বাঙালিয়ানা’-র এক অভিন্ন আখ্যানের অংশ হয়ে ওঠেন।

উদযাপনের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছিল সৌন্দর্যচর্চার বিষয়ও। ‘হিমালয়া ওয়েলনেস’ অংশগ্রহণ করে, তাদের ‘ডার্ক স্পটস ক্লিয়ারিং টারমারিক’ রেঞ্জ এবং ‘ব্রাইটনিং ভিটামিন সি’ রেঞ্জের মাধ্যমে দর্শকদের আকৃষ্ট করে। তারা কলকাতা জুড়ে গ্রাহকদের কাছে ত্বকের যত্নের অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বেশ কিছু কার্যক্রমেরও আয়োজন করেন। এই উপলক্ষ্যে ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ১০ দিন ধরে শহরজুড়ে ভ্রমণ করে এক্সপেরিয়েন্সিয়াল ভ্যান, যা কলকাতা জুড়ে উৎসবের অনুভূতি দিয়েছে। এই উদ্যোগটি শহরের ছাত্র-সমাজের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, যার অংশ হিসেবে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ কলেজ ও নিউ আলিপুর কলেজের মতো দশটি শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। উদযাপনের এই ধারা ‘পয়লা পার্বণ ২০২৬’ -এ এসে পূর্ণতা পায়।

হিমালয়া ওয়েলনেস কোম্পানির সিপিডি-র বিজনেস ডিরেক্টর রাজেশ কৃষ্ণমূর্তি জানিয়েছেন, “পয়লা বৈশাখের আগে এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ব্র্যান্ডগুলিকে গ্রাহকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি মূল্যবান সুযোগ প্রদান করে। ‘পয়লা পার্বন’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে, আমরা ত্বকের যত্নের বিষয়ে আরও বেশি সচেতনতা তৈরি করার লক্ষ্য রাখি। পাশাপাশি, মানুষের সঙ্গে অর্থপূর্ণ ভাবে সংযোগ স্থাপন করি, যখন তারা তাদের ঐতিহ্য এবং ঐক্য উদযাপন করে।”

এই উৎসবের ধারণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হিমালয়া ওয়েলনেস কোম্পানির বিউটি অ্যান্ড পার্সোনাল কেয়ার-এর মার্কেটিং ডিরেক্টর রাগিনী হরিহরণ জানিয়েছেন, “এই উৎসবকে কেন্দ্র করে কলকাতাবাসী তাদের আবেগ প্রকাশ করার জন্য একত্রিত হয়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় আয়োজিত এক্টিভেশনস এবং ‘পয়লা পার্বণ’-এ ভিটামিন সি ও টারমারিক-এর মতো প্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা অনুপ্রাণিত সহজ-সরল ত্বকচর্চার রুটিন তাঁদের সামনে তুলে ধরা হয়।”

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন এবং সতর্কতা

শিশুর জন্ম যেমন আনন্দের অনুভূতি দেয় মা-কে, ঠিক তেমনই সন্তান জন্ম দেওয়ার পর নতুন মায়ের শারীরিক এবং মানসিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। আর এই সমস্যাটিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ। এই পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদ একটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রসবের পরে নতুন মায়েদের স্বাস্থ্যহানি ঘটায়। শুধু দুঃখের অনুভূতি নয়, এর ফলে ক্রমাগত মানসিক, শারীরিক এবং আচরণগত পরিবর্তন আসে, যা নতুন মা-কে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেয়।

প্রসবোত্তর অবসাদের প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র ক্লান্তি, প্রচণ্ড দুঃখ, অকারণে উদ্বেগ, স্বাভাবিক কাজে আগ্রহ হারানো, কান্নাকাটি এবং শিশুর সঙ্গে বন্ধন আলগা হওয়া। এই ধরনের অবসাদের সমস্যা গর্ভাবস্থায় কিংবা প্রসবের পরে হতে পারে এবং সঠিক সময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে, এই সমস্যা কয়েক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। প্রসবোত্তর অবসাদের কারণে মা তার সন্তান এবং সঙ্গীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারেন, এমনকী নিজেকে, স্বামীকে কিংবা সন্তানকে আঘাত করার চিন্তাও মনে আসতে পারে।

আসলে যাদের ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক বিষণ্নতার ইতিহাস আছে কিংবা সুস্থ-স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার জন্য ভালোবাসা কিংবা অর্থ-সম্পদের অভাব আছে, সেই মায়েরাই বেশি প্রসবোত্তর অবসাদের শিকার হন। এই বিষয়ে তুলে ধরা হচ্ছে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য এবং পরামর্শ।

কলকাতা-র ফর্টিস হাসপাতাল-এর কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট দেবশীলা বোস-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ —- 

মাতৃত্বকে প্রায়ই সম্পূর্ণ আনন্দের বিষয় হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু অনেক মহিলার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতাটি অপ্রত্যাশিত দুঃখ এবং উদ্বেগের দ্বারা আবৃত থাকে। প্রসবোত্তর বিষণ্নতা নামে পরিচিত এই অবস্থাটি ক্রমশ বাড়ছে।

আসলে, প্রসবোত্তর বিষণ্নতার কারণ জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক কারণগুলির একটি জটিল মিশ্রণ হতে পারে। প্রসবের পরে, ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়, যা মস্তিষ্কের রসায়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার, যা মেজাজ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তা প্রভাবিত হয়। যার ফলে বিরক্তি, ক্লান্তি এবং হতাশা দেখা দেয়। এই জৈবিক পরিবর্তনগুলি প্রায়ই ঘুমের অভাব, পুষ্টির ঘাটতি এবং নবজাতকের যত্ন নেওয়ার শারীরিক চাপের কারণে আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাছাড়া, জীববিজ্ঞানের বাইরেও, মাতৃত্বের চারপাশের আবেগগত পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূল্যহীনতা কিংবা অযোগ্যতার অনুভূতি মা-কে ভিতর থেকে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয়।

পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন বা প্রসবোত্তর অবসাদের লক্ষণগুলির তীব্রতা অনুসারে থেরাপি এবং ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি চিকিৎসার অন্যতম মাধ্যম। প্রথমে নেগেটিভ চিন্তা থেকে মুক্ত করানোর ব্যবস্থা করতে হয়। এর জন্য আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয় কাউন্সেলিং এবং ওষুধের মাধ্যমে। অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ এক্ষেত্রে ভীষণ কার্যকরী।

পরিবারের সদস্যদেরও সাহায্য চাওয়া হয় এক্ষেত্রে। শিশুর যত্নের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, নতুন মা-কে আশ্বাস দেওয়া এবং পরিবর্তিত আচরণকে মেনে নিয়ে তাকে নেগেটিভ চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করা ইত্যাদি দায়িত্ব নিতে হবে নতুন মায়ের পরিবারের সদস্যদের। আর মনে রাখতে হবে, প্রসবের পরে একজন মায়ের মানসিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা কেবল বিষণ্ণতা নিরাময় নয়, বরং এটি মা এবং শিশু উভয়েরই সামগ্রিক স্বাস্থ্যরক্ষার বিষয়।

কলকাতা-র ফর্টিস হাসপাতাল-এর প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী পরামর্শদাতা ডা. সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ —-  

প্রসবের পরবর্তী সময় হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে, তাই মানসিক পরিবর্তনের সূচনাও হয়। গর্ভাবস্থায় বৃদ্ধি পাওয়া ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের মাত্রা প্রসবের পরে তীব্র ভাবে হ্রাস পায়, যা মেজাজ এবং মস্তিষ্কের রসায়নকে প্রভাবিত করে। এর সঙ্গে যোগ হয় ঘুমের অভাব, শারীরিক ব্যথা এবং নবজাতকের যত্নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম। এই কারণগুলি মানসিক যন্ত্রণার জন্য উপযুক্ত উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।

ঐতিহ্যগত ভাবে, ভারতীয় মায়েদের প্রসবোত্তর পর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা সবরকম সাহায্য করতেন৷ তাই, সন্তান জন্মের পর মা নিশ্চিন্ত থাকতেন এবং বিশ্রামও পেতেন। কিন্তু এখন যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি হয়ে গেছে। এখন তাই নতুন মায়েদের একাই সবকিছু সামলাতে হয়। আর তাই অবসাদের শিকার হন অনেক মা৷ এই সময় ক্রমাগত তৈরি হওয়া দুঃখ, বিরক্তি, আগ্রহ হ্রাস কিংবা অপরাধবোধের মতো লক্ষণগুলিকে প্রায়ই ‘স্বাভাবিক মেজাজের পরিবর্তন’ হিসাবে উড়িয়ে দেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রে, মহিলারা নিজেরাই বুঝতে ব্যর্থ হতে পারেন যে, তারা প্রসবোত্তর মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছেন।

অবশ্য এখন গাইনেকোলজিস্টরা প্রাথমিক পর্যায়ে এই ধরনের সমস্যা শনাক্তকরণ এবং সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। নিয়মিত চেক-আপের সময় মেজাজ, ঘুম এবং মানসিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেন চিকিৎসকরা।

যখন প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা শনাক্ত করা হয়, তখন কাউন্সেলিং-এর প্রয়োজন হয়। এই ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভাবে জেনে রাখা উচিত যে, প্রসবের পরে বিষণ্ণতা মূলত সাধারণ এবং নিরাময়যোগ্য এবং ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন নয়৷ চিকিৎসার জন্য সাধারণত পরামর্শ দেওয়া হয়, মাঝারি কিংবা গুরুতর ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ নির্ধারিত হয়। অনেক আধুনিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে না। সেইসঙ্গে, চিকিৎসা যদি দায়িত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়, তখন রোগীর উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।

এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের ভূমিকাও সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মা এবং শিশুর আন্তরিক যত্ন নেওয়া, মানসিক উৎসাহ জোগানো এবং ভালোবাসা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সঙ্গী এবং আত্মীয়স্বজনদেরও বুঝতে হবে যে, মায়ের এই চারিত্রিক পরিবর্তন কিংবা অবসাদ আসলে চিকিৎসাগত একটি স্বাভাবিক অবস্থা মাত্র, মাতৃত্বের ত্রুটি নয়।

মনে রাখতে হবে, প্রসবোত্তর সমস্যা আসলে মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম, কম ঘুম, ভালোবাসা এবং সাহায্যের অভাব প্রভৃতির মিশ্রিত প্রতিফলন। তাই, এক্ষেত্রে মায়ের আবেগকে গুরুত্ব দিতে হবে, সহানুভূতির সঙ্গে সবকিছু সামলাতে হবে, তবেই নতুন মা প্রসবোত্তর অবসাদ থেকে মুক্তি পাবেন।

উপলব্ধি (পর্ব-০১)

সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ার অভ্যাস, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও গেল না। লালচে আভা ছড়ানো আকাশের ক্যানভাসে ধীরে ধীরে সূর্যের কমলা গোলটির আত্মপ্রকাশ যেন মনটাকে স্নিগ্ধ করে যায়। টের পেয়ে যায় পাখিরাও। তারা চারপাশ থেকে কলরব শুরু করে। কত নাম না-জানা সুন্দর পাখি। তাদের অনেককেই বেলা বাড়লে আর দেখি না। মৃদু হাওয়া দেয়। রাত্রির মৌন রহস্য ভাঙতে থাকে। যেন অপার শান্তি বিরাজ করতে থাকে প্রকৃতিতে। তার-ই ছোঁয়া যেন প্রাণেও এসে লাগে৷

প্রত্যেক ভোরবেলার মতো সেদিনও লনে বসে প্রকৃতির সেই আশ্চর্য রূপ দেখছিলাম। সামনের আমগাছটার ডালে লাগানো দোলনাটা মৃদু দুলছে। এই আমগাছের বীজটা পুঁতেছিল আদিত্য। মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। কিন্তু গাছটার দশাসই চেহারা দেখে সে কথা কে বিশ্বাস করবে। আর সত্যিসত্যিই তো খুব অল্প দিনের ব্যাপার নয়, অন্তত ক্যালেন্ডারের হিসাবে।

আদিত্য আর আমার একটা জায়গায় খুব মিল ছিল। দু’জনেই গাছপালা ভালোবাসতাম খুব। আমার মতো ও কোথা থেকে সব নানা ধরনের গাছ এনে বাগানে বসাত। এক বছরের জন্য আদিত্যকে যখন নিউইয়র্কে পাঠাল ওর কোম্পানি, যাওয়ার আগে সে বলে গেল, ‘মা, আমার গাছগুলোর দেখভালের দায়িত্ব এই ক’দিনের জন্য তোমাকে দিয়ে গেলাম। দেখো, একটাও যেন না মরে। এক বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে।’

সেই আদিত্য ওদেশে ছ’মাস কাটতে না কাটতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, ওখানেই পাকাপাকি ভাবে থেকে যাবে। প্রিয় গাছগুলোর কথা সে ভুলে তো গেলই, নিজের মায়ের কথাও তার একবারও মনে পড়ল না। মা এই নিঃসঙ্গ জীবন কীভাবে কাটাবে, আদিত্য ভাবল না সে কথা একবারও। আমিও তাকে আর সে কথা মনে করাইনি। কী লাভ ওকে খামোখা বিব্রত করে? আমার কথা ভাবার সময় কোথায় ওর? সাত সমুদ্র পারে সে নিজের পার্থিব সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখন শুধু ভাবি, ও সুখে থাক। আনন্দে থাক। নিজের স্বপ্নগুলো সত্যি হোক।

সমীর, আমার স্বামী, ওদের পারিবারিক ব্যাবসার একমাত্র উত্তরাধিকারী হওয়ায়, হামেশাই ব্যস্ত থাকে। বেশিরভাগ সময় সে শহরের বাইরে। আমার চাকরিটা যতদিন ছিল, আমাকে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি থেকে দূরে রেখেছিল। এখন অবসর গ্রহণের পর সে-ই যেন ভারী পাথরের মতো চেপে বসল বুকের উপর। আমগাছটার দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম। আর ঠিক তখন-ই দোতলা থেকে একটা তীব্র চিৎকার কাঁপিয়ে দিয়ে গেল আমায়।

বেশ বুঝতে পারছিলাম, ভোরবেলা থেকেই তন্বীর সঙ্গে তার মা মিতার জোর খিটিমিটি লেগেছে। তন্বী যখন মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে, আমার অস্বস্তি হয়। ভয়ও করে। তন্বী-রা নতুন প্রজন্ম। ওদেরকে ভালো করে বুঝতে পারি না। আমাদের মতো করে ওদেরকে বিচার করা যায় না! তন্বীকে দেখে আমি অবাক হয়ে ভাবি, ওরা কি বড়োদের সম্মান দিতেও জানে না? সঠিক আচরণ কি ওরা শেখেনি? নাকি আমরাই ভুল ভাবছি, ঠিকমতো বুঝতে পারছি না ওদের।

মাত্র দু’জনের সংসার ওদের। মা আর মেয়ে। এত বড়ো বাড়িতে একা থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠে, শেষমেশ উপরতলাটা ভাড়া দিয়ে দিলাম ওদেরকে। ভেবেছিলাম, মাত্র দু’জন মহিলার ঝাড়া হাত-পা সংসার, ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট নেই!

মিতা একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে বড়ো চাকরি করে। তন্বী কলেজে পড়ে। বিএ সেকেন্ড ইয়ার। প্রথমদিকে ওর মা জোর করে আমার কাছে পাঠাত ওকে, ইংরেজি সাহিত্যটা একটু ভালো করে বুঝে নিতে। কিন্তু তন্বী আমায় হতাশ করল। ও আমার ভাবনাচিন্তার এতটাই বিপরীত যে, ওর সঙ্গে বেশিক্ষণ কথাবার্তা বলতেই ভয় হয়। কে জানে কেন, মা-মেয়ের মধ্যে দেখা হলেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তন্বী প্রেম করে কিনা কে জানে!

সিঁড়িতে ধুপধাপ শব্দ শুনে সচকিত হলাম। যা ভেবেছি তাই। খানিকক্ষণ পরেই দেখি তন্বী কাঁধে ব্যাগ নিয়ে গটগট করে লন পেরিয়ে, গেট খুলে বড়ো রাস্তার দিকে চলে গেল। পিছনে পিছনে মিতাও উদ্‌ভ্রান্তের মতো দৌড়ে এল গেট পর্যন্ত। বোঝাই যাচ্ছে, তন্বীকে সে আটকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তন্বী একটা চলন্ত অটোরিকশাকে থামিয়ে উঠে পড়ল।

মিতার মুখোমুখি যাতে না হতে হয়, সেজন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে আমি ফুলের বাগানে গাছগুলির পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। যেন, একটু আগে গেটের সামনে মা-মেয়ের যে সংঘাত হয়ে গেল তার কিছুই দেখিনি, কিছুই জানি না।

আড়চোখে দেখলাম মিতা ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও এড়িয়ে যাওয়া গেল না। ঠিক চোখাচোখি হয়ে গেল। মিতা দুঃখী হাসি হাসল। তারপর কী তার মনে হল কে জানে, বিধ্বস্ত শরীরটা নিয়ে এসে বসল আমার চেয়ারের পাশে রাখা বেতের আসনে।

নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইতস্তত করে বলল, ‘কী বলব মাসিমা, আজকালকার বাচ্চারা ছোটো ছোটো কথায় এত রেগে যায় যে, এদের সঙ্গে কথা বলাই যায় না। আমাদের সময়ের থেকে এরা কত আলাদা! এরা গুরুজনদের সম্মান দেখালেও মনে হয় তাতে সম্মান কম, অপমান-ই বেশি। আমাদের সময় কি জেনারেশন গ্যাপ ছিল না মাসিমা? আপনারা তো তখন কলেজে পড়াচ্ছেন। তখন গুরুজনদের সঙ্গে মতভেদ হতো, কিন্তু এরকম উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল কি?’

নিজেকে যতই শান্ত রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে মিতা, ততই যেন ভিতরের ক্লেদ বেরিয়ে পড়তে চাইছে। ম্লান হাসির আড়ালেও মিতা তার মনের ছন্নছাড়া ভাবকে লুকাতে পারছে না।

আমিও মলিন হেসে তারই সুরে সুর মেলাতে থাকলাম। তা সত্ত্বেও তার চোখের কোল ভরে আসা জল, কপালে বিষাদের রেখা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল, মনের ভিতরটা কীভাবে জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। তন্বীর আচরণ তাকে খুব দুঃখ দিয়েছে। আদিত্যর আচরণও আমায় খুব দুঃখ দিয়েছিল। তার প্রকাশভঙ্গিটা হয়তো একটু অন্যরকম। কিন্তু দুয়েরই মূল জায়গাটা একই— অবহেলা!

(ক্রমশ…)

স্ত্রী দাসী নয়

স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সঙ্গী, স্বামীর দাসী নয় স্ত্রী। যারা দাম্পত্য সুখ চান, তারা অনেক বিবাদ এড়িয়ে চলেন। কারণ তারা জানেন, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য যেমন অনেক আইন তৈরি করা হয়েছে, তেমনই আবার সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের অপব্যবহার রোধ করারও সুবিধা রয়েছে।

যেমন ধারা ২১ একজন ব্যক্তিকে বেআইনি গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা করে, তেমনই বুঝিয়ে দেয় যে, স্বামী এবং স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক, মালিক এবং কর্মচারীর সম্পর্ক নয়। সংবিধানের ধারা ২১-এও স্পষ্ট করে দেয় যে, একজন নাগরিক সরকারের দাস নন বরং শাসনব্যবস্থার একজন অংশগ্রহণকারী। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করে কিন্তু যখন আইনের অপপ্রয়োগ নাগরিকদের অধিকারকে চূর্ণ করে, তখন ধারা ২১ রক্ষক হিসেবে কাজ করে।

পরিতাপের বিষয় এই যে, বৈবাহিক জীবনে কোনও ধর্মের আইনই স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের পরিপূরক হতে দেয়নি এবং স্ত্রীকে স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইন কার্যকরী হওয়ার পর, সংবিধানের ২১ ধারা অনুসারে স্ত্রীর কিছু বিশেষ অধিকার রয়েছে, কিন্তু ২১ ধারাকে যেভাবে আদালতের আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হয়েছে, এর ফলে, এই ধারা থেকেও না থাকার মতো অবস্থা হয়েছে। আসলে, ১৯৫৫ সালের আইন অনুসারে স্ত্রীর অধিকার আজও সমাজ গ্রহণ করে না। দীর্ঘদিন নির্যাতনের পর স্ত্রী যদি আদালত থেকে ন্যায্য বিচার পানও, তাহলে সেই বিচার পেতে-পেতে তার যৌবনকাল অতিক্রম করে যায়।

মনে রাখবেন, তারাই একমাত্র সুখী দম্পতি, যারা ধর্মের আদেশ নয় বরং মানুষের মৌলিক অধিকারগুলি বোঝেন এবং গ্রহণ করেন। যারা বিয়ে করেছেন এবং তাদের স্ত্রীকে সবকিছুর সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছেন, তারা দাম্পত্য-সুখ উপভোগ করছেন।

আসলে, সংসার-জীবনে স্ত্রী-র অবদান অনেক, অথচ কিছু মানুষ তাকে অবহেলা করেন এবং তার অবদানের স্বীকৃতি দেন না। সমাজও বিবাহিত নাগরিকদের সুখ কেড়ে নেয় নানারকম ভাবে, তাই বেশিরভাগ বিবাহই এখন বোঝা হয়ে উঠছে।

অনেকে মনে করেন, স্ত্রী মানেই দাসত্ব করবে। কিন্তু যারা এমন ধারণা নিয়ে আছেন, তারা মনে রাখবেন, স্ত্রী-কে যদি দাসী ভাবেন, তাহলে হয়তো স্ত্রীর সেবা পাবেন কিন্তু মন পাবেন না। এও মনে রাখবেন, স্ত্রী কোনও যৌনকর্মী নন, তিনি আপনার জীবনসঙ্গী। অনেকে তো আবার স্ত্রীকে জেলবন্দি দাগী আসামী ভাবেন এবং তার সঙ্গে সেইরকম আচরণ করেন। আর এই মানসিকতার পরিবর্তন কবে হবে জানা নেই।

ভাবতে অবাক লাগে যে, কত ভাবে দোষারোপ করা হয় স্ত্রী-দের! কালসর্প দোষ, মাঙ্গলিক দোষ, বৈধব্য দোষ, বিষকন্যা দোষ, নিঃসন্তান দোষ— এমন আরও কতশত দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয় তাদের উপর। এখানেই শেষ নয়, এইসব দোষ কাটানোর জন্য তাদের মন্দিরে গিয়ে সময় নষ্ট করতে হয় কিংবা কোনও ভণ্ড জ্যোতিষের খপ্পরে পড়তে হয়।

স্ত্রীর প্রতি যদি এইরকম অন্যায়-অত্যাচার চলে, তাহলে সেই স্ত্রীর কাছ থেকে কীভাবে সুখ আশা করা যায়? যেখানে স্ত্রী ঘরে ঢোকার আগেই তাকে দোষারোপ করা হয়, দোষ কাটাতে তার প্রতি আরও অন্যায় করা হয়, সেখানে তার মন পাওয়া কি সম্ভব? আবার এও সত্যি যে, কিছু স্ত্রীও ধর্মের ভয়ে দাসত্ব করে চলেছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, পতিব্রতা হওয়ার জন্য মহিলাদের মগজধোলাই করেন ধর্মীয় প্রচারকরা কিন্তু সংবিধানের অধীনে প্রদত্ত অধিকারের বিষয়ে প্রচার করার কেউ নেই!

তবু দেখা হল শেষবেলায় (শেষ পর্ব)

সেবার বাপের বাড়ি হুগলি থেকে শিফট হয়েছে হাওড়ায়। অনেকদিন ওদিকের খবর আসেনি। দু’বছর আগে স্বামী গত হয়েছেন। এখন আর তেমন কেউ নেই যে, কর্তব্যের জন্য জোর করে গৃহকোণে পড়ে থাকবেন। মঞ্জু নিজেও এতদিন একটা সরকারি চাকরি করেছেন। এখন রিটায়ার্ড লাইফ কাটছে। চুল পেকেছে, দাঁত পড়েছে, কিন্তু এখনও চেহারায় অদ্ভুত একটা লাবণ্য বেঁচে আছে। ছোট্ট মুখে ছোটো কালো টিপ পরলে হয়তো তরুণী মনে হয়। অনেকে অবাক হয়ে বলেন, তোমার উপর নিশ্চয়ই ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে। নয়তো এখনও এত সুন্দর আছো কী করে? না বললে কেউ বিশ্বাস করে না বয়স ঘাট পেরিয়েছে।

স্বামী মারা যাওয়ার পর খুব একা লাগত। টাকার অভাব নেই। একটা ভালো বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেলে কেমন হয় ভাবতেন। শেষ কিছুদিনে বুঝতে পারলেন, সংসার শেষ করে সংসারে আটকে থাকার মানেই হয় না। যাবতীয় বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি করে, কিছু দান করে, নিজের জন্য সামান্য কিছু রেখে এখন ঝাড়া হাত-পা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অমৃতর কথা শেষ পর্যন্ত মিলে গেছে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে। একবার যদি দেখা হতো।

ক’দিন আগে এক ট্রাভেল এজেন্সির বারাণসীতে বেড়াতে আসার প্রস্তাবটা হাতছাড়া করতে পারলেন না। আরও অনেক জায়গায় ঘোরা বাকি আছে। একে একে সব জায়গা দেখবেন এই ইচ্ছে। আসার পর থেকেই মনে হচ্ছে একবার যদি দেখা হয়ে যায়। অনেক আশা নিয়ে এসেছেন এবার, বেঁচে থাকলে দেখা হতেই পারে। রাস্তায় কোনও সাধুকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে চেনার চেষ্টা করেছেন। না, মিল পাননি। সাধুরাও এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হচ্ছেন।

পড়ন্তবেলায় পৌঁছে সব প্রশ্নের উত্তর জেনে নেবেন অমৃতর কাছে। জিজ্ঞেস করে নেবেন, ভালোবাসি কিনা কেন জানতে চেয়েছিলেন? আমার উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হতো তাহলে কি আপনি গৃহত্যাগী হয়ে আমার প্রতি সুবিচার করেছেন বলে মনে হয়? আর একটা অস্বস্তিও আছে। অমৃতর দেখা পেলে ক্ষমাও চেয়ে নেবেন। এক-দু’বছর নয়, টানা চল্লিশ বছরে একবার অন্তত অমৃতর খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল।

মঞ্জিমাদেবী সেদিন কোনও উত্তর না দিয়ে বাড়ি চলে গেছিলেন। একদিকে অবশ্য ভালোই করেছিলেন। এরপর হুগলির বাড়িতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে শুনেছিলেন, স্যারও নিখোঁজ হয়েছেন বলে ওঁর দাদা, বাবা-মাকে কলকাতায় নিয়ে যান। সে সবই জানত, তবু কাউকে কোনওদিন বলেনি।

এখন মনে হয়, অনেক আগে সব বলে দেওয়া উচিত ছিল। গতমাসে অবশ্য বলে দিয়েছেন। বলতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছেন। অমৃতর ভাইয়ের ছেলে কোথা থেকে মঞ্জিমার ফোন নম্বর জোগাড় করে, ফোন করে জানাল, ‘আপনারা অমৃত স্যারকে চিনতেন। তিনি পড়াতেন আপনাদের। আপনাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন কাকা। ঠাকুরদা, ঠাকুমা যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাবা অসুস্থ, কাকাকে দেখতে চাইছেন।’

মঞ্জিমা ভাবলেন— অমৃত কেমন আছেন, কোথায় আছেন, কে বলতে পারে। একটা প্রাচীন পুণ্যভূমি বারাণসী। পাশেই এলাহাবাদ। সেখানেও থাকতে পারেন। অবশ্য আদৌ বেঁচে আছেন কিনা কেউ জানে না! কোথায় আছেন? আর দেরি কেন, বলে দেওয়াই ভালো। বাচ্চা ছেলেটা হয়তো খোঁজ করে দেখলে ওর কাকার খোঁজ পেলেও পেতে পারে। ওঁর বাবা, মা মৃত্যুশয্যায় কাছে পাননি, দাদার অস্তিম সময়ের ইচ্ছেটা অন্তত পূর্ণ হবে। শেষ পর্যন্ত নামটা বলে দিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল ভুল করেননি।

—দ্যাখো হয়তো বারাণসীতে পেলেও পেতে পারো। এটুকু বলেই ফোনটা মঞ্জিমা কেটে দেন।

এরপর আর ফোন করেনি কেউ। পেরিয়ে গেল কয়েকটা মাস। একদিন ভাবলেন, সন্ধান পেয়েছে কিনা জানাল না ছেলেটা। তাহলে নিশ্চয়ই এখনও সন্ধান পায়নি। মঞ্জিমা আর ফোন করেননি। এর মধ্যেই ট্যুর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে এদিকে ঘুরতে আসার প্ল্যান হয়। বেড়াতে এসে মনে হচ্ছে, আরও আগে আসা উচিত ছিল। এ জন্মে আর দেখা হবে না। এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েছেন।

একটু আগে সব নৌকা স্থির হয়ে দাঁড়ানোর পর, আরতি শুরু হয়েছে। আরতি চলল অনেকক্ষণ। একটা প্রদীপ কিনে জলে ভাসিয়ে দিলেন সকলে। মনস্কামনা পূর্ণ করার কিছুই অবশিষ্ট নেই। একে একে সবাই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। একমাত্র অমৃত যদি পৃথিবীতে থাকেন, তাহলে তাঁর ভালো হোক, চোখ বন্ধ করে এটাই চাইলেন।

এরপর সব নৌকাগুলো ফিরে যাচ্ছে। ফেরার সময়ও একই ছবি। সব ঘাটগুলো মারাত্মক আলোকোজ্জ্বল। অনেক ঘাটের নাম জানেন না। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। কতগুলো চিতা একসঙ্গে জ্বলছে ভাবা যায় না। নৌকার কোনও এক যাত্রী মাঝিভাইকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করলেন, একবার ওই হরিশচন্দ্র ঘাটটার কাছে নিয়ে যেতে।

মাঝি বললেন, “না! ধোঁয়ার গন্ধে শরীর খারাপ লাগবে। এখান থেকে দেখুন।’

লোকটা পীড়াপীড়ি করাতে নিয়ে যেতে হল ঘাটের খুব কাছে। এখানে নামা যাবে না। অশৌচের কাজকর্ম চলছে।

মঞ্জিমা দেখলেন অবিকল অমৃতর মতো চেহারা। ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে একটা যুবক। কিন্তু বয়স কম। এই যুবক কি অমৃত হতে পারে? হয়তো ওর দেখার ভুল। তাঁর বয়স হয়েছে এমন চেহারা থাকার কথা নয়। সাধুরা যোগাসনে বয়স ধরে রাখতে পারেন নাকি? তিনি কি সত্যিই সাধু হয়ে গেছেন? সত্তর বছরের বৃদ্ধকে তিরিশ বছরের যুবক মনে হচ্ছে কেন! তাহলে বারাণসীতে এসে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। তারপর মনে হল, হয়তো অমৃতর ছেলে হতে পারে। কিন্তু এখানে কী করছেন। এত আলুথালু বেশে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছেন কেন? অমৃতদের ছাদের ঘরে যেমন ভয় পেয়ে হাত-পা কাঁপছিল, এখন তার থেকেও সহস্রগুণ বেশি ভয় চেপে বসল তাঁকে।

মাঝিকে অনুরোধ করলেন— যেভাবেই হোক, আমাকে এই ঘাটে নামিয়ে দিন। আর তো আসা হবে না, ভালো করে দেখে যাই।

—এখানে সাধারণ যাত্রীদের নামার অনুমতি নেই। চলুন যেখান থেকে উঠেছেন সেখানে নামিয়ে দেব। মঞ্জুর অস্থিরতা দেখে মাঝি বললেন, ‘লাফিয়ে নামতে পারবেন?” ট্যুর ম্যানেজার উৎসাহ দিলেন, “মাসিমা নামতে পারলে নামুন। ইচ্ছে হয়েছে যখন। বারবার আসা হবে না। আমরা ওদিক থেকে ঘুরে ঘাট ধরে ধরে এখানে আসছি আবার।’

সন্ধের সময় জলে পড়লে ভিজে যাবেন। সাঁতার জানলেও এই গভীর নদীতে সাঁতরাতে পারবেন না। এতসব ভাবলে চলে না। পাড়ের কাছে আসতে সাহস করে নেমে গেলেন তাড়াতাড়ি। ভাগ্যিস জলে পড়েননি। মানুষ পুড়ছে, তার আঁচ গায়ে লাগছে, এমন সময়ে বোধহয় যম শীতও লজ্জায় লুকোয়। শীতে আচ্ছাদন দিলেও আগুন নগ্ন করে ছাড়ে। যুবকটি আসলে কে জানতে হবে। না জেনে কিছুতেই ফিরবেন না। ছেলেটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘শোনো, তোমার পদবি কি বসু?’

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যাঁ।’

পা কেঁপে উঠল আবার। কে এই ভদ্রমহিলা সে চেনে না। এমন জায়গায় এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন! অবাক হল ছেলেটা।

—কী হয়েছে তোমার?

—বাবা আজ চলে গেলেন। অসুস্থ অবস্থায় কাকার কাছে এসেছিলেন। আমার কাকা মুখাগ্নি করছেন। ওই দেখুন, এখানেই দাহ হচ্ছে। ওই তো৷ যুবককে কেউ ডাকছিলেন। ভালো করে দেখে বোঝা গেল ছেলেটি অমৃত নয়। পিছন পিছন গিয়ে দাঁড়ালেন মঞ্জিমা। চিতার খুব কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছেন, খুব চেনা। কে, স্যার না!

অমৃত বসুকে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখে একটুও ভয় লাগছে না। আগের মতো রোগা দীর্ঘকায় আছেন। মানুষটা যে সাধু হয়েছেন, একটুও তা মনে হচ্ছে না। মঞ্জুর দিকে একবার তাকিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বোধহয় চিনতে পারেননি। সাধু হলে সাধুর বেশে থাকতে হবে কেন? তাকে দেখেও কি চিনতে পারলেন না অমৃত? আসলে তিনি নিজেও যে এখন বৃদ্ধা। সেদিনের কথা কি তাঁর মনে আছে? হয়তো সেটাও মনে নেই। আবার মনে হল, মানুষটা চিনতে পারেননি তাঁকে, কিন্তু এখনও অমৃত যে জীবিত আছেন— এই কি যথেষ্ট নয়!

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব