গৃহ-অশান্তির সাক্ষী যখন নিজেদেরই সন্তান – (শেষ পর্ব)

মা বাবার সঙ্গে বাচ্চার Relationship কেমন হওয়া উচিত বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মা বাবা নিজেদের মধ্যে কীধরনের আচরণ করছেন সেটা শিশুর বেড়ে ওঠার ওপর খুব গভীর প্রভাব ফেলে। এতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য কেমন হবে, পড়াশোনায় সে কেমন করবে, এমনকি ভবিষ্যতে এই শিশু যেসব সম্পর্কে জড়াবে সেগুলো কেমন হতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। কখনও সখনও বড়োদের মধ্যে কলহ এতটাই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যে, স্বামী-স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের পথে পা বাড়ায়। একে অপরকে সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। শুধু ডিভোর্সই নয়, অনেক সময় স্বামী-স্ত্রী কেউ একজন বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে যদি জড়িয়ে পড়েন, তাহলে বাড়িতে থাকা বাচ্চার উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। কিন্তু সমস্যা হল এই পরিস্থিতি হলে বাচ্চাটি কোথায় যাবে? সে কী করবে আর না করবে বুঝে উঠতে পারে না।

কী কী কারণে বড়োদের আচরণ শিশুমনে প্রভাব ফেলে সেটা আমাদের জানতে হবে। আগেই বড়োদের নিজেদের মধ্যে ডিভোর্সের হুমকি এবং ব্যবহারে পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, বাকি কারণগুলোও এখানে আলোচনা করা হল।

আর্থিক সমস্যার প্রভাব বাচ্চার উপর

কলকাতার বাসিন্দা অলোকের চাকরি চলে যাওয়ার পর থেকে প্রায়শই বাড়িতে টাকা-পয়সা নিয়ে স্ত্রীয়ের সঙ্গে ঝগড়া চলতেই থাকত। ভালো আবাসনে ফ্ল্যাট ছিল, ছেলেমেয়েরাও ভালো কলেজে পড়ত। চাকরি যেতেই নিজের বাড়ি, ভাড়ায় দিয়ে, অল্প টাকায় বাড়ি ভাড়া করে পরিবার নিয়ে এসে উঠেছে টাকা সাশ্রয়ের জন্য। কম ফি যেখানে সেই স্কুলে বাচ্চাদের ভর্তি করে দিয়েছে। কিন্তু ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোথাও থাকতে হলে সংসারে লড়াই ঝগড়া তো হবেই।

বাড়িতে সারাদিন বসে থেকে অলোক স্ত্রীয়ের গতিবিধির উপর নজর রাখা আরম্ভ করল। স্ত্রী কী করছে, ওটা কেন করছে না ইত্যাদি বলতে আরম্ভ করল স্ত্রীকে। স্ত্রীয়েরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। একে তো অর্থের সমস্যা তার উপর স্বামীর এই নজরদারি। ঝগড়া এতটাই বেড়ে গেল রাগের মাথায় দু’জনেই সন্তানদের গায়ে হাত তুলতে আরম্ভ করল।

দুটি সন্তানই কৈশোর ছাড়িয়ে সবেমাত্র যৌবনে পদার্পণ করেছে। মা-বাবার কাছ থেকে টাকার খোঁটা শুনতে শুনতে বড়ো হচ্ছিল। কিন্তু ভাইবোন দু’জনে মিলে ঠিক করল নিজেদের খরচ ওরা নিজেরা চালাবে এবং বড়োদের ঝগড়ার প্রভাব নিজেদের জীবনে পড়তে দেবে না। অলোকের মেয়ে আশেপাশে বেশ কয়েকটা টিউশন জোগাড় করে নিজের হাতখরচের ব্যবস্থা করে নিল আর ছেলে একটা স্টোরে পার্ট টাইমের চাকরি জোগাড় করে নিল। এতে দুটো লাভ হল— মা-বাবার রোজের খিটমিট বন্ধ হল আর সন্তানরা আত্মনির্ভরও হতে শিখল।

বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক

অজয়কে প্রায়ই ব্যাবসার কাজে শহরের বাইরে যেতে হয়। দুটি সন্তান, মেয়ে দশম শ্রেণিতে আর ছেলে দ্বাদশ ক্লাসে। অজয়ের স্ত্রী চাকরি করে না। বাড়িতে থাকে বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ক্লাব পার্টি করে বেড়ায় সময় কাটাবার জন্য। অজয়ের নির্দেশ ওর অনুপস্থিতিতে বাচ্চারা যেন মায়ের কথা শুনে চলে এবং মন দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যায়।

একদিন ছেলে রাত করে পড়াশোনা শেষ করে নীচে বাগানে একটু হাঁটাহাঁটি করছিল। তখনই মা-কে এক অচেনা পুরুষের গাড়ি থেকে নামতে দেখে। তাও সবই ঠিক ছিল কিন্তু নিজের মা-কে পরপুরুষের বক্ষলগ্না হতে দেখে ও নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারে না। ছেলে চুপ করে থাকলেও এ ধরনের কথা বেশিদিন চাপা থাকে না।

কয়েকদিনের মধ্যেই পাড়াতে অজয়ের স্ত্রীকে নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। এ ফ্ল্যাট ও ফ্ল্যাট করে অজয়ের কানে এসে পৌঁছোল গুঞ্জন। শুরু হল অশান্তি। অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীকে কথা বলতে দেখলেই অজয়ের মনে সন্দেহ বাসা বাঁধতে আরম্ভ করত। সংসারে অশান্তি শুরু হল। বাচ্চাদের কানেও প্রতিবেশীদের চাপা ফিসফিসানি এসে পৌঁছোত। অনেকে ওদের দেখে হাসাহাসিও করত। বাচ্চাদের খারাপ লাগত আবার মা-বাবার উপর রাগও হতো। কিন্তু ছেলের নিজের কেরিয়ার তৈরির চিন্তা ছিল, ও ভালো করেই জানত পড়াশোনা না করলে রেজাল্ট খারাপ হবে।

অজয় এবং ওর স্ত্রী মাঝেমধ্যে সন্তানদের কাছে একে অপরের নামে নিন্দে করত। ছেলে একদিন স্পষ্টই জানিয়ে দিল, ‘তোমাদের ঝগড়া নিজেদের মধ্যেই রাখো, আমাদের নিজেদের জীবন নিজেদের মতো করে চালাতে দাও। ছেলে পড়াশোনা করে সময় পেলে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে একটু ঘুরে আসত বা সিনেমা দেখতে যেত। ছোটো বোনও দাদার দেখাদেখি ওটাই করত।

নিজের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া

শো বিজনেস-এ থাকা নিহাল নিজের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে খুব ভালো এবং সৎ ব্যবহার করত ঠিকই কিন্তু নিজের স্ত্রীয়ের সঙ্গে নয়। সবসময় নিজের সন্তানদের বয়সি মেয়েদের দ্বারা ঘিরে থাকতে ভালোবসত নিহাল এবং নিজের স্ত্রীকে অসম্মান করত। অশান্তি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল ওদের ডিভোর্স প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করা হলে ওরা জানায় মা-বাবা কারও সঙ্গে ওরা থাকতে চায় না। ওরা একলা কোথাও থাকতেও রাজি কারণ মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া ওরা সহ্য করতে পারে না।

আসলে অজয়ের সন্তানরা ওদের মা-বাবার ঝগড়া দেখতে দেখতেই বড়ো হয়েছে। তাই ওরা মা-বাবাকে কোনওদিন ভালোবাসতে পারেনি, তারাও কি সন্তানদের আদৌ ভালোবাসা দিয়েছিলেন? ঝগড়ার কারণে অনেকদিন বাড়িতে খাবার পর্যন্ত রান্না হতো না। কত উৎসবে হয়েছে, বাড়িতে যখন অতিথি এসেছে খুব এলাহি ভাবে তাদের খাতির করা হয়েছে। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পরেই বাড়ির পরিবেশ আবার আগের অবস্থাতেই ফিরে গেছে। বাচ্চারা এই সত্যটা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিল বলেই মা- বাবার সঙ্গে থাকতে তারা অস্বীকার করে।

এই প্রতিটা ঘটনায় বাচ্চারা মানসিক ভাবে মা-বাবার ঝগড়ার কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে ঠিকই কিন্তু এটাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে বড়োদের ঝগড়ার প্রভাব কিছুতেই নিজেদের জীবনে পড়তে দেবে না। সম্পর্ককে সম্মান করাটা সকলের উচিত আর বাচ্চাদের বড়োদের ঝগড়ায় কখনও টেনে আনা উচিত নয়। বাচ্চাদেরও বড়োদের এই ঝগড়ায় নিজের মন মেজাজ এবং জীবন নষ্ট করা বাঞ্ছনীয় নয়।

এখন বাচ্চারা অনেক বেশি মানসিক ভাবে পরিণত। তারা মানে যে, মা-বাবা যদি পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করে, Relationship  মেনটেইন করে পরিবারের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারে তাহলে সেই ভুলের দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই নিতে হবে।

 

দাম্পত্যে ‘তোমার-আমার’

একটি মেয়ে বিয়ের Married Life পরে প্রবেশ করে নতুন এক পরিবারে। এই পরিবারের একটি মাত্র সদস্যই তার একান্ত আপন। কিন্তু কোনও স্ত্রী, স্বামীর সব কথা শুনে চলার পর তার শ্বশুর-শাশুড়ির সব কথা ভালো মনে মেনে নিতে না-ও পারে। ঠিক তখনই দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। কীভাবে? গৃহবধূরা আজকাল প্রায়শই শ্বশুর-শাশুড়ির সংসার থেকে ভিন্ন হয়ে বেরিয়ে আসতে চায়। কেন এমন হয়, আপাতদৃষ্টিতে আমরা তা বুঝি না। এখন ঘরে ঘরে একটাই পুত্রসন্তান – তবুও এমন হচ্ছে। অ্যাডজাস্টমেন্টের কি কোনও পথ নেই? হয়তো আছে, কিন্তু সে পথে কেউ হাঁটতে চায় না।

শ্বশুর-শাশুড়ি বদমেজাজি, এমন অভিযোগ বউমাদের তরফ থেকেই আসে। স্বামীটি ভেবে পায় না বাবা-মা’র কত আদর-যত্ন-ভালোবাসায় সে বড়ো হয়েছে, আর তাদেরকেই তার স্ত্রী বলছে বদমেজাজি স্বভাবের? অন্যদিকে শ্বশুর-শ্বাশুড়ির প্রশ্ন, বউ-মা-তো নিজের মুখ সামলেই কথা বলতে শেখেনি, শ্বশুর-শাশুড়িকে কীভাবে সামলাবে? এদিকে বউমা ভাবে অফিস-সংসার সব সামলে সংসারে যদি একটু উষ্ণতার ছোঁয়া পাওয়া না যায়, তাহলেই বা কীভাবে চলে? স্বামী কিন্তু সবসময়ই একথাই বোঝাতে চায় যে, তার বাবা-মা বদমেজাজি নয় বরং স্পষ্টবাদী। স্ত্রীও ছাড়বে কেন, সে ভাবে স্পষ্টবাদী হওয়া আজকাল শোভনীয় নয়। আবার সে নিজেই সব কথা স্পষ্টভাবে জানায় তার স্বামীকে।

এমন ঘটনাই ঘটল বৃন্দা আর সুফলের জীবনে, বৃন্দার স্বামী সুফল কিছুতেই বুঝতে চায় না, ত্রুটি-টা বৃন্দার তরফে নয়, বরং সুফলের বাবা-মা’র মধ্যেই অ্যাডজাস্টমেন্টের অভাব। চোখে জল আসে বৃন্দার। কথা না বলে চুপ করে যায়। কান্না পায় এই ভেবে যে, স্বামী যদি একবারও তার দুঃখটা বুঝত। যদি বলত ‘আমি তোমার কষ্টটা বুঝতে পারছি, তুমি এভাবে চলো।’ কিন্তু সেই পথে সুফল হাঁটল না।

এখন শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে স্বামীর প্রতিও একধরনের উষ্মা দেখা দিয়েছে বৃন্দার মনে। সুফল আর সে যে, শপথ করেছিল দুটি মন একটি প্রাণের! কিন্তু স্বামীই সে কথা ভুলে গেল? একদিন স্বামীকে যখন বৃন্দা সে কথা জানাল, সে নির্বিবাদে বলল, ‘তুমিও তো বলছ আলাদা হবে, আমার বাবা-মা বদমেজাজি।’ সুফল আরও বলল, ‘সেদিন তোমার পিসিমা এসেছিলেন বারেবারে বললেন আমার বাবার মতো মানুষ হয় না, আমি কোনওদিনই আমার বাবার মতো হতে পারব না। এসব কথার মানে আমি বুঝি না? এতে বাবার আর আমার সম্পর্কের চিড় ধরানো হয়, বুঝি না?’

প্রত্যুত্তরে বলে ওঠে বৃন্দা, ‘দ্যাখো আমি তোমাকে অনেকদিনই বলেছি যে, আমার পিসিমা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেন। আমি মানছি।’

‘মানছ তো কুটুম্বিতা করতে তাকেই কেন পাঠান তোমার বাবা-মা?’

‘বাঃ, এখন তুমি ‘আমার পিসিমা’, ‘আমার বাবা-মা’ বলছ?’

হ্যাঁ, আমরা জানি অনেক সংসারেই তোমার-আমার থেকে ‘তোমরা-আমরা’ অনুভূতি অর্থাৎ ‘উই ফিলিং’, ‘দে ফিলিং’ তৈরি হয় যা কখনওই কাম্য নয়।

এই ‘দে ফিলিং’ মনোভাব তখনই ‘উই ফিলিং’-এ পর্যবসিত হয়, যদি আমরা একবার নিজেদের একটু শুধরে নিয়ে সহযোগিতা, সহমর্মিতার আশ্রয় নিই।

যেমন, সব স্ত্রীকেই বুঝতে হবে, বিয়ের আগে তার বাবা-মা-ও তাকে শাসনে আদরে রেখেছিলেন। প্রায়শই বন্ধু নির্বাচন নিয়ে মা’র কাছে বকুনি শুনতে হয়েছে। অনেক কাজে মা বাধা দিয়েছেন, মা’র কথা শুনে চলতে হয়েছে। বিয়ের পরেও আর-একটা পরিবারে, আর-একটা সংসারের চরিত্র একই রকম। সেখানে স্বামীর ভালোবাসা-আদরই শেষ কথা নয়, শাসন-বারণও থাকবে।

আবার স্বামীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্ত্রী-এর দোষগুণ যেমন সে মেনে নিয়েছে, ঠিক একই রকমভাবে তাকে মেনে নিতে হবে স্ত্রীর আত্মীয়স্বজনের দোষত্রুটি বা তার বাবা-মার ব্যবহার। তবেই ‘এটা তোমার, এটা আমার’ ধারণার অবসান হবে।

স্ত্রী ভাবতে শিখবে বৃহত্তর পরিবারে সে আর-এক যুগল অভিভাবক পেয়েছে, স্বামীও ভাবতে শিখবে, একটি মেয়েকে তার পরিবার-সহ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশ ভারতবর্ষ, পারস্পরিক সম্প্রীতির ভিত্তিতেই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে তুলে ধরে। আমরাও আশা করব, আমাদের পরিবারগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের এই আদর্শই প্রতিফলিত হবে।

বিবাহ-সমস্যা

সাধারণভাবে ‘বিবাহ সমস্যা’ বিষয়ে বলা যায় যে, মুদ্রার মতোই বিয়েরও Married Life দু-পিঠ। একদিকে এটি যেমন নির্ভরতার আশ্বাস ও সামাজিক সুরক্ষাবোধ বহন করে, অন্যদিকে বিয়ে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও সমস্যাদীর্ণও হয়ে উঠতে পারে। বিয়ের ‘তেমন ভালো দিক নয়’-এর প্রসঙ্গে বলা যায় যে, শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে দ্বন্দ্ব হল মুখ্য সমস্যা, একটি দম্পতিকে যার সম্মুখীন হতে হয়। শ্বশুর-শাশুড়িরা হয় দারুণ সহযোগী হবে নয়তো এর পুরো বিপরীত হবে। পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিষয় একটু জটিল ও বুদ্ধির পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। উভয়তরফে মানিয়ে চলতে না পারা থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমরা জানি যে জীবন চ্যালেঞ্জপূর্ণ, সেটা আমাদের কাটিয়ে উঠতে হয়। অতএব আপনি কখনওই ইনলজ-দের জন্য নিজের বিয়ে ভাঙতে দেবেন না। কে জানে হয়তো সমস্যার সমাধান হলে বধূটি একজোড়া বুঝদার অভিভাবক পাবে।

বিবাহ সমস্যার সমাধান

–    বিয়ের পর বিয়ের বন্ধন অটুট রাখাই হোক মুখ্য প্রাধান্যের বিষয়। বাকি যা কিছু সরিয়ে রেখে, সেইসব উপায়ের কথা ভাবা উচিত যে, কীভাবে সম্পর্ক সুদৃঢ় করা যায়। শ্বশুরবাড়ি এবং স্বামীই হল বিবাহোত্তর জীবনের মুখ্য বিষয়।

–    শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনের প্রতি সম্মান, সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একবার যদি শ্বশুরবাড়ির মানুষজনের প্রতি সম্ভ্রম তৈরি হয়, সম্পর্ক অনেক মসৃণ হবে। অভিভাবকদের দাবি অধিকাংশ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কম থাকে বা থাকেই না। তারা যা চান, তা হল শ্রদ্ধা আর সম্মান। যদি আপনার মনে হয়েও থাকে যে, ইনলজ-রা প্রকৃত অর্থেই এসবের উপযুক্ত নন, তবু তাদের উদ্দেশে প্রশংসা বর্ষণ করাই শ্রেয়।

–    শ্বশুর-শাশুড়ি আপনার স্বামীর বাবা-মা একথা মনে রাখবেন। তারা আপনার থেকে আনুগত্য দাবি করেন। সুতরাং আপনারও কিছুটা অনুগত হওয়া জরুরি। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান হবে।

–    ইনলজ-দের সমালোচনা করবেন না। তাদের সব স্বভাব বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আপনার পছন্দ না-ও হতে পারে। যদি স্বামীও তাদের বিরুদ্ধে কোনও মন্তব্য করেন, শুধু শুনে যাওয়াই ভালো, কোনও মন্তব্য না করে। আপনার মন্তব্য বিদ্যমান সমস্যাকে বাড়াবে। পরিষ্কার প্রশ্নও বিরাট সমস্যা তৈরি করতে পারে।

–    ইনলজ-রা আপনার বিষয়ে কী ভাবেন সেটাও জানা দরকার। কে জানে হয়তো শুধুমাত্র শুনেই আপনি সমস্যার মূল কারণ চিনতে পারবেন এবং সমাধানও পাবেন।

–    অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তার অভাব সমস্যার মূল কারণ হয়। অধিকাংশ শ্বশুর-শাশুড়িই, তাঁদের ছেলের বিয়ের পরে নিজেদের অবাঞ্ছিত বা হেয় বোধ করেন এটি খুবই স্বাভাবিক। কারণ, অন্য কেউ একজন তার সন্তানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ বা অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠেন। এই নিরপত্তাহীনতা অত্যন্ত কঠিন সমস্যা। কিন্তু আপনারই তাঁদের নিশ্চিন্ত করা উচিত যে, তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং একটি বিশেষ স্থান অধিকার করেন।

–    ইনলজ-দের সঙ্গে সমস্যা হলে স্বামীর সঙ্গে কথা বলুন– তিনিও আপনাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন। যার ফলে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে।

–    অনেক সময় ছুটি কাটানো নিয়েও ভিন্ন মত থাকে শ্বশুর-শাশুড়ি আর বউমার। ভালো পরামর্শ হল আগে থেকেই অনুভূতি, আকাঙ্খা আর চিন্তায় সীমারেখা টেনে দেওয়া।

–    মনে রাখা জরুরি আপনি এবং আপনার ইনলজ-দের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকবে। এই পরিস্থিতিতে, যদি উভয়পক্ষে বিবাদ হয়, তাহলে মধ্যপন্থা খুঁজে নিয়ে সমস্যার সমাধান করাই ভালো।

 

ডাক্তারি পরীক্ষায় আমার, এইচআইভি পজিটিভ এসেছে

বিয়ের পর আমার এইচআইভি ধরা পড়লে জানতে পারি স্বামী এবং তার পরিবারের লোকজন স্বামীর এই অসুখ গোপন রেখেই আমার সঙ্গে তারা বিয়ে দিয়েছেন। এখন স্বামীর মৃত্যুর পর আমার বাপের বাড়ির লোকেরা আমাকে আবার বিয়ের জন্য জোর করছেন। এই পরিস্থিতিতে আমি বিয়ে করতে ইচ্ছুক একেবারেই নই।

আমি ২১ বছর বয়সি যুবতি। আমার মা-বাবা সম্বন্ধ করে ১৭ বছর বয়সেই আমার বিয়ে দিয়ে দেন। ৪ বছর পর হঠাৎই আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং ডাক্তার দেখাই। ডাক্তার আমাকে ।অনেকগুলো টেস্ট করাতে দেন। পরীক্ষায় আমার, এইচআইভি পজিটিভ নির্ধারণ হয়। অসুখ ধরা পড়ার পর আমি স্বামীর কাছ থেকে জানতে পারি যে, বিয়ের আগে থেকেই ও এইচআইভি পজিটিভ ছিল কিন্তু এই তথ্য ও এবং ওর পরিবারের লোকজন সম্পূর্ণ গোপন করেছে। এখন আমার স্বামী পুরোপুরি এড্স দ্বারা সংক্রামিত। এতকিছু জানার পর আমি আমার মেয়েকেও পরীক্ষা করাই তবে জানা গেছে ও সম্পূর্ণ সুস্থ। গতবছর আমার স্বামী মারা যান। আমার পরিবারের সকলে এখন আমাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করার জন্যে জোর দিচ্ছেন। আমি বাড়ির কাউকে আমার অসুখের কথা জানাইনি। ওরা জানতে পারলে প্রচণ্ড আঘাত পাবেন। কিন্তু এই অবস্থায় আমার কী বিয়ে করা উচিত?

আপনার সঙ্গে যা ঘটেছে তা সত্যিই দুঃখজনক কিন্তু আপনার ভাগ্য ভালো যে আপনার মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ। আপনি চিকিৎসাধীন কিনা সে বিষয়ে কিছুই জানাননি। এখন এমন ওষুধ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে যা বহুদিন পর্যন্ত এই অসুখকে কনট্রোল করে রাখে। সরকারি ক্লিনিকে এই ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। সবথেকে ভালো হয় আপনি এইরকম একটি ক্লিনিকে আপনার নাম রেজিস্ট্রি করান যাতে আপনার প্রপার ট্রিটমেন্ট হতে পারে।

আপনি যদি ঠিকমতো সাবধানতা অবলম্বন করতে পারেন, তাহলে আপনি স্বাভাবিক বিবাহিত জীবনযাপন করতে পারবেন। কিন্তু ভবিষ্যতে যাকে বিয়ে করবেন, তাকে আপনার অসুখের ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়ে রাখবেন কারণ বিয়ের পর অনেক ব্যাপারেই আপনার স্বামীর সহযোগিতার প্রয়োজন পড়বে। সম্বন্ধ করে বিয়ে করতে হলে, আপনার পরিবার এবং ছেলের পরিবারের কাছে আপনাকে নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে জানাতে হবে। অথচ এতদিন যখন এই সত্যিটা বাড়ির সকলের কাছে গোপন করে এসেছেন তখন আমার মনে হয়, আপনি কারও সঙ্গেই এই তথ্য শেয়ার করতে আগ্রহী নন।

সুতরাং বিয়ে করতে অস্বীকার করুন। চাকরি খুঁজে নিন এবং নিজের ও মেয়ের ভালো ভাবে দেখাশোনা করুন। কে বলতে পারে, ভবিষ্যতে হয়তো কেউ আপনাকে ভালোবেসে, আপনার অসুখের কথা জেনেও আপনাকে বিয়ে করে সুখী করবে। জীবনের প্রতি আস্থা রাখুন এবং ভরপুর জীবনের আনন্দ গ্রহণ করুন। তবে প্রিকশান (কন্ডোম) ছাড়া সেক্স করবেন না।

 

রোজদিনের রাস্তা

মানস বোস, কেউ বলে মানসা, কেউ বা আরও ভালোবেসে মা মনসা। পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির রোগা চেহারার লোকটি জেলা অফিসের একটি দফতরের বড়োবাবু।

বছর ছাপ্পান্নর ভদ্রলোকটি ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস বাদ দিলে, বাকি সময় হাফশার্ট আর চটি পায়ে অফিসে আসেন। বাকি মাসে পাম শু, ফুল শার্ট আর হাফ সোয়েটার। মাথার বাঁ দিকে সিঁথে, চুল এক্কেবারে পেতে ছড়ানো।

আটটা একত্রিশের লোকাল ট্রেনের নির্দিষ্ট কামরাতে উঠলেই, সবাই যে-যার খুশিমতো ডেকে ঠাট্টা ইযার্কি আরম্ভ করে। মানস বোস রাগেন না, বা রাগলেও প্রকাশ করেন না। বেশির ভাগ দিনেই ট্রেনে বসার জায়গাটা রাখা থাকে, না পেলে দাঁড়িয়ে চলে যান। কারও-র সাথে কোনও রকম বিরোধে সচরাচর যান না। কম কথা বলেন, হাসেন কম, আসা-যাওয়ার মাঝে এই টুকটাক যা কথাবার্তা এই নিয়ে চলে মানস বোসের নিত্যযাত্রা।

শনি, রবি বা অন্যান্য ছুটির দিন বাদে মানসবাবুর প্রতিদিনের কাজকর্মও এক্কেবারে নিয়মমাফিক। ঘুম থেকে ওঠেন সাড়ে চারটে থেকে পৌনে পাঁচটার মধ্যে। নিজের হাতের তৈরি এক কাপ চা পান করে একটু হেঁটে যোগব্যায়াম করে বাড়ি ফেরা। তারপর ভাতের জল চাপিয়ে স্নান সেরে রান্নার কাজ আরম্ভ করেন।

মানসবাবু সকাল সাড়ে সাতটায় ভাত খেয়ে পৌনে আটটার বাস ধরেন। বাস থেকে নেমে ট্রেন, ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে বা কোনও দিন অফিসের গাড়িতে অফিস পৌঁছন।

সকালে বউয়ের সাথে কথা বলা মানে আলু পটলের নাম গোত্র অথবা একমাত্র মেয়ে কলেজ বা টিউশন বা হাত খরচের টাকা নেওয়া সম্পর্কিত। কোনও দিন বউয়ের মনটা বাগান বাগান থাকলে বা সকালে ভালো ভাবে পেট পরিষ্কার হয়ে গেলে, আরও দু-একটা কথা বলেন তার মধ্যে বেশির ভাগটাই নিজের বাপের বাড়ি নিয়ে।

মানসবাবুর মেয়ে কলেজে পড়ে, গড়ন রোগা হলেও মায়ের মতো গায়ে রং-টা ফরসা। এখনকার চালচলন সম্পর্কে খুব বেশি সচেতন। নিয়মিত বিউটি পার্লার যায়, বন্ধু বান্ধবদের সাথে সিনেমা-টিনেমা তো আছেই। এখনও পর্যন্ত কোনও বিশেষ বন্ধু হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে জানা না গেলেও, মায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাবার গায়ে হুল ফোটাতে বেশ পটু হয়ে গেছে। মায়ের আশীর্বাদে এই দক্ষতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মাধ্যমিক পাশ করেই মোবাইলের জন্য তীব্র অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে মানসবাবুকে হারিয়ে নিজেকে মায়ের যোগ্য কন্যা হিসাবে প্রমাণও করে দিয়েছে।

মানসবাবুও কোনও আঠারো ইঞ্চির কপাল নিয়ে জন্মাননি। তাঁর বউও পৃথিবীর সেই একমাত্র ব্যতিক্রমী ভদ্রমহিলা হবেন, যিনি সব কিছু ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে একমাত্র নিজের স্বামীর স্বার্থটাই দেখবেন। অন্তত মানসবাবু কোনও দিন স্বপ্নেও একথা ভাবেননি! বউএর পাশে দাঁড়ালে তাঁকে আরও নিরীহ অসহায় লাগে।

সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে মানসবাবু যখন বাড়ি ফেরেন, বউ তখন টিভির সাথে মধুর সহবাসে ব্যস্ত থাকেন। পেমেন্টের দিন বা অন্য কিছু বিশেষ দরকারের দিনে এক কাপ চায়ের সাথে কিছু খাবার মানসবাবুর মুখের সামনে পৌঁছে দেন। আর না হলে বলেন, চা করা আছে, গরম করে নাও, অথবা গিলে নাও।

এই বিশ বছরের বৈবাহিক জাঁতাযন্ত্রে বউএর রাগ, মন খারাপের রূপ, রং, গন্ধ, স্পর্শগুলো খুব ভালো ভাবে বুঝে গেছেন। যেমন যেদিন নিজে দরজা খুলে হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা টেনে নেন, তার মানে আবহাওয়াটা বাগান বাগান। তা না হলে মেঘ জমেছে। সেদিন কোনও কথা না বলে চুপচাপ জামাকাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুয়ে নিজের চা গরম করে নেন। মুড়ির কৌটো থেকে মুড়ি বের করে চায়ে চুমুকের সাথে মুড়ি চিবোতে চিবোতে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেন, রুটি হয়ে গেছে? উত্তরটাও সেদিনের আবহাওয়ার মতোই আসে।

সন্ধের থেকে রাতটা আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। একটা শীতল জড়বস্তুর পাশে শুয়ে নিজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সব নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অন্তত মানসবাবুর নিজের সেই রকমই মনে হয়। তবুও কোনও কোনও দিন শরীর হালুম হালুম করে ওঠে। পাশে শুয়ে থাকা শীতল যন্ত্রটাকে নিজের দিকে টেনে নিতে গেলে স্পিকার বেজে ওঠে, সেই কয়েকটা বুলি, লজ্জা লাগে না, মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। বা মরণ! কখনও আদিখ্যেতা!

মানসবাবুর জেগে ওঠা রঙে আলকাতরা মিশে যায়। জেগে যাওয়া শরীর নুয়ে পড়ে, জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেন। কোনও কোনও দিন শরীর বাগ মানে না। জেগে উঠে, বিছানা নড়ে। পাশের শীতল যন্ত্রের স্পিকারে শোনা যায, বাথরুমে যাও। তার পরেই ফুলস্টপ।

মানসবাবুর মেয়ে খুব ব্যস্ত। সকালে অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পরেই ঘুম থেকে ওঠে। ফেরার সময় বেশির ভাগ দিনেই ব্যস্ত থাকে নিজের কাজে। কী কাজ, মানসবাবু জিজ্ঞেস করেন না। করলেও উত্তর আসে, তোমাকে বলে কী করব? কিছু বুঝবে কি? সেই তো সেকেলেই রয়ে গেলে। মায়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হুল ফোটায়। মানসবাবুর ব্যথা লাগলেও কিছু বলা যায় না। বউ মেয়ে সাঁড়াশি আক্রমণে বেচারা বোসবাবুর যা অবস্থা, তা বর্ণনা করতে গেলে দক্ষতার প্রয়োজন হয় না।

মানসবাবুর অফিসটাও খুব অদ্ভুত। সকাল থেকে দুপুর হয়ে বিকাল শুধু কিছু ফাইল আর লেখা। না হয় পেপার পড়া। ডিপার্টমেন্টের না আছে কোনও ঘুসের ব্যবস্থা, না আছে কোনও মহিলা কর্মচারী। আগে দুএকজন যা ছিল ফাঁক-তোল, ভাঁজ-খাঁজ দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর আগে অন্য জায়গায় বদলির পরে শুধু ফাঁকা মরুভূমি।

তবে খুব ভালো লাগার জায়গা হল ট্রেনের কামরা। যদিও তিনি খুব একটা সক্রিয় যাত্রী নন। এমনকী তাঁকে নিয়ে ইয়ার্কিতে ফাজলামিও বেশি হয়। তাও অন্য কেউ কিছু বললে শোনেন, অন্যের ইয়ার্কিতে মন পুলকিত হয়ে ওঠে। তাঁদের নজনের নিত্যযাত্রীর দলে কোনও মহিলা সঙ্গী নেই। বোসবাবু ছাড়া বাকি সবাই কম-বেশি নেশা করেন, খিস্তিখাস্তাও চলে। মহিলা নিত্যযাত্রী থাকলে অসুবিধা হয়।

এমনি যাত্রীদের সেরকম পাত্তা দেওয়া না হলেও, মহিলা যাত্রীদের আড় চোখে দেখে নেওয়া হয়। বোসবাবুও এই রস নেওয়া থেকে বাদ যান না। বিশুদা এলে খুব ভালো লাগে, তিনদিন আসেন বিশুদা। ওষুধ সাপ্লাই করেন, জামার বাঁ দিকের পকেট থেকে প্যাড বের করে ফোনে জিজ্ঞেস করেন, কপাতা? সঙ্গে একটা দামি মোবাইল থাকে। নিজের কাজ হয়ে যাওয়ার পরে মোবাইলটা বেশির ভাগ দিনেই বোসবাবুকে দিয়ে দিলে, তিনি ওটাকে আড়ালে নিয়ে চলে যান। একমনে দেখেন, আর শরীরের ঘুম ভাঙান। অনেকেই এই ব্যাপারটা দেখে টিপ্পনি কাটে, তবে তাতে বোসবাবুর কোনও কিছু এসে যায় না, হেসে উড়িয়ে দেন।

নজনের নিত্যযাত্রীদের প্রায় সবাই বযস্কদের জায়গা ছেড়ে বসতে দেন। আর জায়গা ছাড়েন ছেলে কোলে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা যাত্রীদের। শুধু কম বয়সী মহিলা, কলেজ পড়ুয়াদের বসতে জায়গা ছাড়েন না। তবে সেদিন এর ব্যতিক্রম ঘটল এবং ঘটালেন সেই মানস বোস।

লোকাল ট্রেনে সেদিন অস্বাভাবিক রকমের ভিড়। দেওঘরের কোনও এক আশ্রমের উৎসবের জন্য ট্রেনের সব কামরা তাদের দখলে। ট্রেনে ওঠার আগে এই খবরটা পেলেও কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন না থাকার কারণে সবাইকে লোকালেই উঠতে হয়। উঠতেই পিছনের থেকে কেউ একজন বলে উঠল, কাকা, আজ মাছিও গলবে না। বোসবাবু তাকে কোনও উত্তর না দিয়ে আস্তে আস্তে ভিতরের দিকে এগিয়ে যান।

অন্যদিনে যে-সিটে তিনজন বসে থাকে আজ সেখানেই পাঁচজন। বোসবাবু কোনও রকমে একটা জায়গায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেনাজানা কাউকে দেখতে পাওয়া যায় কিনা দেখতে লাগলেন। মাথা নাড়িয়ে নিজের উপস্থিতি জানালেন। কেউ আবার তাঁকে দেখে বলে উঠল, বোসদা আমাদের এদিকে আসুন, গল্প করা যাবে।

না ভাই, আজ যে এখানে দাঁড়াবার জায়গা পেয়েছি এটাই অনেক।

কেউ আবার বলে উঠল, কি রে মানসা, কোনও এক্সপ্রেস পেলি না? ভিড়ে মরতে এলি, না মারাতে?

বোসবাবু এবারেও হেসে উত্তর দেন, উৎসব চলছে তো তাই এত ভিড়।

নিত্যযাত্রীদের অনেকেই সেদিন পেপার বা পলিথিন পেতে দরজার সামনে বসেছিল। বোসবাবুর একবার এভাবে বসতে গিয়ে প্যান্ট ফেটে গেছিল! সে এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। সারাটা দিন ভগবানকে গালাগালের সাথে, জামা দিয়ে ফাটা জায়গা ঢাকতে হয়েছিল। তবে এইদিন মানসবাবুর ভাগ্যটা হয়তো একটু প্রসন্ন ছিল। পরের স্টেশনে একটা জায়গা পেয়ে গেলেন। গোটা সিট না হলেও এই বাজারে সেই সিটের যে কী মহিমা, তা আর বোঝাতে হবে না। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে শুনলেন, বোসদা আজ একটা লটারি কেটে নিন।

বোসবাবু কিছু না বলে হালকা হাসলেন। বুঝতে পারলেন নজর লেগে গেল, হলও তাই। এক স্টপেজ যেতে না যেতেই একটা মেয়ের গলা কানে এল, কাকু কাইন্ডলি আমাকে একটু বসতে দেবেন, পায়ে খুব ব্যথা করছে, আজ আমার পরীক্ষা আছে। বোসবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখলেন। তাঁর মেয়ের মতোই বয়স, একটু বড়োও হতে পারে। জিন্স-এর প্যান্ট আর কুর্তি পরে আছে। গায়ে রং-টা চাপা হলেও মুখটা বেশ ভালো। কোনও ছেলে হলে এতক্ষণ জবাব না দিয়ে উলটো দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকতেন। সেই জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বোসো, তবে জায়গাটা খুব কম। মেয়েটি বোসবাবুর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে, থ্যাংক ইউ বলে বসেই হাতে থাকা একটা খাতাতে চোখ ডুবিয়ে দিল।

বোসবাবু আবার আগের জায়গায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে আড়চোখে মেয়েটিকে দেখতে লাগলেন। দুএকজন চেনা নিত্যযাত্রী দাঁড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি চোখের ইশারাতে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পরেই মেয়েটি বলে উঠল, কাকু তোমার ব্যাগটা দাও, আমি ধরছি। বোসবাবু, না, ঠিক আছে বললেও মেয়েটি মানসবাবুর হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় কেড়ে নিজের কোলে নিয়ে তার ওপর খাতা রেখে পড়তে আরম্ভ করল।

হাতের ভার কমলেও বোসবাবু আর মেয়েটির কুর্তির কোনও ভাঁজ দেখতে পেলেন না। তবে সারাদিন মনটা বেশ বাগান বাগান হয়ে থাকল। অলিগলি থেকে ট্রেনের মেয়েটার ভেসে ওঠা মুখটা শরীরটাকেও নাড়িয়ে দিচ্ছিল। কাজ করবার সময় গুনগুন গান আঙুলগুলোর মধ্যে একটা অনুঘটকের কাজ করছিল। এমনকী বাড়ি গিয়ে বউয়ের মুখ ঝামটা শুনেও সেরকম কোনও প্রতিক্রিযা হয়নি।

বাড়ি ফিরে বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এক ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে অথবা হাওয়ার সাথে মিশিয়ে নিজের গাওয়া দু-এক কলি গান গাওয়ার মধ্যেও মেয়েটি চলে আসে। রাতে শুয়ে ঘুম আসেনি। বন্ধ চোখের সামনে সেই মুখ মনে শরীরে এক অদ্ভুত তৃপ্তি এনে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য বউয়ের ভয়ে বাথরুম চলে যেতে হল।

তার পরের দিনও সেই একই রকমের ভিড় ঠেলে কিছুটা ট্রেনের ভিতরে গিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই, আগের দিনের মেয়েটিকে বসে থাকতে দেখে একটু রাগই হল। নিশ্চয়ই আবার কারওর পি… মেরে জায়গা করে নিয়েছে। কিছু না বলে একটু ইতস্তত করে আরও ভেতরের দিকে যাওয়ার পরেই পিছনের দিক থেকে শুনলেন, ও কাকু, আমি এখানে, দেখতে পাওনি?

বোসবাবু আর না এগিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, না, মানে দেখতে পাইনি।

বুঝেছি, আর বলতে হবে না। না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলে।

মানসবাবুর মাথাতে আর কোনও জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা এল না। আমতা আমতা করে বললেন, তুমি পড়ছিলে তো তাই।

কই আজ তো আমি পড়িনি।

পরীক্ষা শেষ?

কাল একটা ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা ছিল।

তারপরে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কাকু, আজ তুমি বোসো।

না না ঠিক আছে। আমরা তো প্রতিদিন জায়গা পাই না। দাঁড়িয়ে যাওয়ার অভ্যাস আছে।

পাশে বসে থাকা আর একজন যাত্রী বললেন, আপনি বসুন, আমি পরেরটাতেই নেমে যাব।

মেয়েটির পাশে কুঁকড়ে বসতেই মেয়েটি বলে উঠল, ও কাকু, তুমি ওরকম জড়ভূতের মতো বসে আছো কেন? বি কমফর্টেবল।

না না, আমি ঠিক আছি।

দূর কিছু ঠিক নেই।

মানসবাবু মেয়েটির দিকে আরও একটু সরে বসলেন।

আজও আগের দিনের মতোই জিন্স আর টপ পরেই এসেছে। ডান কাঁধের সাথে বোসবাবুর বাঁ কাঁধ লেগে আছে, কনুইটা বুকের কাছাকাছি।

পিছন থেকে নিত্যযাত্রী ভোম্বল বলে উঠল, বোসদা লটারি কিনেছিলেন? আজ মিলিয়ে নেবেন, ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে গেছেন। শুধু বউদিকে একটু সাইজে আনতে হবে।

ওষুধের বিশুদা বলে উঠল, নতুন ডাউনলোড করেছি দেখবেন নাকি? দেব ওখানে। বোসবাবু কিছু সময় মেয়েটির কাছে বসে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, তুমি এখানে বোসো, আমি একটু বন্ধুদের কাছে যাই, ওরা আবার কী ভাববে।

ওরা তোমার লেগপুল করছে?

না না। আসলে প্রতিদিন একসাথে যাই তো, তাই একটু মজা করছে।

কথাগুলো শেষ করেই জায়গাটা ছেড়ে পিছনের দিকে চলে গেলেন। কিন্তু নিত্যযাত্রীদের কাছে রীতিমতো টোন টিটকিরি সহ্য করতে হল। সেটা অবশ্য প্রতিদিনই হয়। তবে সেদিন এতটাই মাত্রা ছাড়াল যে, বোসবাবু তাদের থেকে পাশে সরে দরজার সামনে একাই দাঁড়িয়ে থাকলেন। হাওয়া আসছিল, মনটাও ভেসে ভেসে যাচ্ছিল। কিন্তু সব কিছু কেমন যেন অস্থির। সব সময় ইয়ার্কিও ভালো লাগে না।

কাকু বসবে না তুমি? কথাটা শুনে ঘাড়টা ঘোরাতেই দেখলেন আবার সেই মেয়েটি, এক্কেবারে কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বোসবাবু একটু কঠিন ভাবে বললেন, কী ব্যাপার তুমি উঠে এলে?

তুমি বসবে না?

তুমি বোসো।

মেয়েটি আর কথা না বাড়িয়ে আস্তে আস্তে নিজের জায়গাতে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর মানসবাবুর মনটা হু হু করে উঠল। মেয়েটিকে এরকম ভাবে না বললেই হতো। বেচারি শুধুমাত্র বসতে বলবার জন্য এসেছিল।

মেয়েটির কাছে গিয়ে ওকে সরিয়ে নিজের বসবার ব্যবস্থা করলেন। কিছু সময় পরে মেয়েটি, বোসবাবু কোথায় কাজ করতে যান থেকে আরম্ভ করে, বাড়িতে কে কে আছে, সব জেনে নিল।

মানসবাবুও জানলেন ওর নাম অনুশ্রী। এবার নিত্যযাত্রীরা কেউ কিছু বললেও, বোসবাবু কাউকে কোনও পাত্তা দিলেন না। সারাটা রাস্তা অনুশ্রীর সাথে গল্প করে যেতে লাগলেন।

ট্রেন থেকে নেমেই অনুশ্রী বলে, কাকু তোমার অফিস তো কাছেই, পরের ট্রেনে তো আসতে পারো। দশটার মধ্যে ঢুকে যাবে।

ট্রেনের কামরাতে থাকবার সময় অনুশ্রীর কথাটা সেরকম ভাবে না শুনলেও, অফিসের রাস্তায় হাঁটবার সময় কথাগুলো কানের কাছে গুন গুন করতে আরম্ভ করল। সত্যিই তো পরের ট্রেনটাতেও আসা যায়! বাড়িতে আরও আধ ঘন্টা বেশি সময় পাওয়া যাবে। আর একটু বেশি সময় ঘুমানো যাবে। ট্রেনেও শুধুমাত্র অনুশ্রী। তাছাড়া অফিসে তাড়াতাড়ি এসেই বা কী করবেন, সেই তো বসে বসে পেপার পড়া। না হয়, এর ওর সাথে গল্প করা। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে।

অনুশ্রীর মোবাইলে ফোন করতেই সঙ্গে সঙ্গে ওপার থেকে উত্তর আসে,

বলো কাকু…

ক্লাসে?

না, এই তো নামলাম।

শোনো কাল থেকে পরের ট্রেনেই আসব।

বেশ কাকু তাই হবে। পিছনের থেকে তিন নম্বর কামরাতে উঠবে, আমি জায়গা রাখব।

পরের দিন থেকেই মানসবাবু সব কিছু আধঘন্টা পরে করতে আরম্ভ করলেন। সেই ঘুম থেকে ওঠা থেকে আরম্ভ করে বাস ধরা পর্যন্ত সব কিছু আধ ঘন্টা পিছিয়ে গেল। বাকি সব কিছু একই ভাবে চললেও আরেকটা বড়ো পরিবর্তন বউয়ের চোখে পড়ল। অফিসে যাওয়ার সময় এই প্রথম জামা ইন করে পরতে আরম্ভ করলেন, সঙ্গে জুতো। এমনকী মেয়ের বডি স্প্রে-র গন্ধও জামার ঘামের গন্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। বউ সব কিছু দেখেও কিছু বললেন না। কিন্তু মাস দেড় পরে স্বামীর সাজ বেড়ে উঠতে দেখে, একদিন মানসবাবু বেরিয়ে গেলে, মেয়ের সাথে আলোচনা করলেন, হ্যাঁ রে তোর বাবার হল কী? এত চকচকে পোশাক, উড়ো উড়ো ভাব, বুড়ো বয়সে প্রেমে পড়ল নাকি?

মেয়ে সব কিছু দেখে শুনে, মাকে চিন্তা করতে বারণ করলেও নিজের কাছে অস্বস্তি গোপন থাকল না। ট্রেনে কিন্তু বোসবাবুর যাতাযাতের মজা আরও দ্বিগুন বেড়ে গেল। পরের ট্রেনটা তুলনামূলক ফাঁকা আসে। অনুশ্রীও প্রতিদিন বোসবাবুর জন্য জায়গা রেখে দেয়। সারাটা রাস্তা দুজনে গল্প করতে করতে চলে যান। শনি, রবি বা অন্যান্য ছুটির দিনে মন খারাপ লাগে। অনুশ্রীকে ফোন করেন।

বিশুদা কথা প্রসঙ্গে মোবাইলে আরও নতুন কিছু আনার খবর দেয়। মানসবাবু উত্তরে শুধু হাসেন। কিন্তু ট্রেন বা কার সঙ্গে কোন কামরাতে উঠলেন, সে সম্পর্কে কোনও কথাই বলেন না। রাতে ফিরে একা বসে প্রায়ই গুনগুন করে গান করেন। শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তাড়াতাড়ি। বউ ঘুমিয়ে থাকা বোসবাবুকে দেখে বোঝার চেষ্টা করেন। কিছু বুঝতে না পেরে পরের দিন বোসবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পরে, আবার মেয়ের সাথে আলোচনা করতে বসেন।

 

সেদিন অফিস থেকে ফিরে মানসবাবু অবাক হয়ে যান। বেল বাজাতেই বউ তাড়াতাড়ি এসে হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে চেযার টেনে বসতে দেন। হাত মুখ ধোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে চা তৈরি করে দেন। মেয়ে ডিম পাঁউরুটি তৈরি করে দাঁড়িয়ে থাকে। মানসবাবুর খাওয়ার আগে অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকাতে থাকেন।

বিবাহবার্ষিকী, দু-একটা পূজাপার্বণ আর মেয়ের জন্মদিন ছাড়া, অফিস থেকে ফিরে এরকম জলখাবার আর কোনও দিন হয় কিনা মনে করতে পারলেন না। তাই অত খাবার দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আজ কি কোনও অনুষ্ঠান আছে? কোনও পুজো-টুজো!

না না, অনুষ্ঠান কেন থাকবে? রোজ ওই এক মুড়ি। তাই মাম্পি বলল, ডিম পাঁউরুটি করবে। এই টিফিনটা শুধুমাত্র একদিনের জন্যেই নয়। এরপর অফিস থেকে ফিরলেই বিভিন্ন রকমের টিফিন নিয়ে মা, মেয়ে হাজির থাকত।

এখন রাতে শুয়ে বউ নিজের থেকে নিজের দিকে টেনে, বিয়ের প্রথম কয়েক বছরের সেই সব দিনের কথা আলোচনা করে। তারপর মাঝে মাঝেই জানলাতে মুখ রেখে মাম্পি ঘুমিয়ে গেছে কিনা দেখে নিয়ে নিজেদের ঘরের দরজার ছিটকিনিটা তুলে দেয়। বোসবাবুর এখন ঘুম থেকে উঠতে একটু বেশি দেরি হয়। তবে অসুবিধা হয় না, হেঁটে এলেই হাতে রেডি চা পেয়ে যান।

এখন আর আনাজ কাটতে বসতে হয় না, ভাতের জলও চাপাতে হয় না। সব কাজ মা আর মেয়ে মিলেই সামলে দেয়। বোসবাবু ট্রেনে যাওয়ার সময় অনুশ্রীর সাথে সব কিছুর আলোচনা করেন, তবে পরিবর্তনের কারণ বুঝতে পারেন না। অনুশ্রীও কিছু বলে না।

একদিন প্ল্যাটফর্মের ওভারব্রিজে উঠতে উঠতে পুরোনো নিত্যযাত্রীদের দলের তপন ফোন করে, কী ব্যাপার বোসদা, আমাদের ছেড়ে নতুন বান্ধবী পাতিয়েছেন শুনলাম! বউদি সব জানে তো? গা পিত্তি জ্বলে উঠল। কাছে থাকলে টেনে দুথাপ্পড় কষাতেন।

বেশ জোর গলাতেই উত্তর দিলেন, সে খবরে তোমার কী দরকার? বলেই ফোনটা কেটে দিলেন।

ট্রেন আসতে মিনিট দশ দেরি হল। পিছনের দিক থেকে তিন নম্বর কামরাতে উঠলেন। অনুশ্রী বাঁ দিকটাতে বসে। বোসবাবু বাঁ দিক দেখলেন, ডান দিক দেখলেন, কই নেই তো! সামনে উঠল নাকি? চলন্ত ট্রেনের ভিতর হেঁটে সেই কামরার সামনের দিকে এলেন। না নেই। ভালো লাগছে না। মোবাইলের কন্ট্যাক্ট-এ গিয়ে অনুশ্রীকে ডায়াল করলেন। কী আশ্চর্য! ফোন বন্ধ! তাহলে? একটা জায়গাতে বসলেন বোসবাবু, কিন্তু অনুশ্রী কই? আসেনি, নাকি সামনের দিকে উঠল? এরপর কি পুরো ট্রেনটা দেখতে হবে? শরীরে একটা অস্বস্তি আরম্ভ হল। না আর বসা যাবে না।

অফিসেও সেদিন কোনও কাজ করা তো দূর, ভালো করে বসে থাকতেই পারলেন না। একটা চাপা কষ্ট তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বাড়িতে সেই এক অবস্থা। পরের দিন একটু আগে আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আগের ট্রেনে অনুশ্রীর কলেজে পৌঁছলেন। বহু কষ্ট করে ভিতরে গিয়ে ডিপার্টমেন্টও পৌঁছোলেন। কিন্তু নাম বলতে কেউই বুঝতে পারল না। একজন তো বলেই দিলেন, অনুশ্রী নামে এই ডিপার্টমেন্ট-এ কেউ নেই।

কলেজের রাস্তা ধরে অফিসের রাস্তায় আর যেতে ইচ্ছে করল না। কী রকম একটা লাগছে! তার মানে আগামীকাল থেকে সেই জীবন! সেই ট্রেন? সেই বউ মেয়ে?

কলেজের রাস্তার পাশে থাকা বেঞ্চে বসলেন। কত হাজার হাজার কমবয়সী ছেলে-মেয়ে কলেজে ঢুকছে। বোসবাবু তাদের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকলেন।

হঠাৎ দুকানে ও কাকু… ডাক শুনে একটু চমকে উঠলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে আরম্ভ করলেন। না মানুষটা ধারে কাছে নেই!

 

 

অকল্পনীয়

রাখিবন্ধনের ঠিক একদিন আগে মনোজের হাতে কিছু টাকা এল। তাই, কিছুটা আবেগবশতই সে তার মা-বাবার জন্য কিনল কিছু আকর্ষণীয় উপহার। বাদ গেল না তার মণিদিদিও। ওর জন্য কিনল একটি সুন্দর হাতঘড়ি। মণিদিদি শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছে রাখি পরাতে।

সব টাকা আমার ঘড়ির জন্য খরচ করে দিয়েছিস নাকি মা-বাবার জন্য কিছু কিনেছিস? ভাইকে প্রশ্ন মণিমালার।

মুখ টিপে হাসল মনোজ। আর বলল, আজকের দিনটা অপেক্ষা কর দিদি, কাল জেনে যাবি মা-বাবাকে কী উপহার দেব, বলেই নিজের ঘরে ঢুকে গেল মনোজ।

আসলে মনোজ তার অনেক দিনের ইচ্ছেপূরণ করতে চলেছে। সে এখন সফটওয্যার ইঞ্জিনিয়র। মোটা মাইনের চাকরি। প্রথম মাসের বেতন হাতে আসতেই সে তার দীর্ঘদিনের লালিত শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে চায়। মা, বাবা, দিদি, সবাইকে খুশি করতে চায়। আধুনিক সাজে সাজাতে চায় নিজের বাড়িটাকে। বন্ধুদের সঙ্গে ফার্নিচার-এর শোরুম-এ গিয়ে সে কিছু জিনিসও পছন্দ করে এসেছে।

রাখিবন্ধনের দিন খুব সকালে উঠে স্নান সেরে নিয়েছে মনোজ। তার দেওয়া হাতঘড়িটা পরে মণিদিদি খুব খুশী। আদর করে রাখিও বাঁধল ভাইয়ের হাতে। এবার মা-বাবাকে উপহার দিয়ে চমকে দেওয়ার পালা। কিন্তু বাবা কোথায়?

মনোজের প্রশ্ন শুনে মা হাসলেন। মনোজ অবাক হল। তা দেখে মণিদিদি বলল, বাবা তো রাখি পরতে চলে গেছেন।

কিন্তু কোথায়?

মনোজের কৌতহল মেটার আগেই মনোজের বাবা অর্থাৎ সরোজবাবু এসে হাজির। তাঁর হাতে রাখি বাঁধা রয়েছে দেখে দ্বিগুন কৌতহলে মনোজের প্রশ্ন, বাবা, কে রাখি পরাল তোমায়?

সরোজবাবু জানালেন, দিদির সঙ্গে তো আর যোগাযোগ নেই, তাই, কৃষ্ণ মন্দিরের সেবাকর্মী এক দিদির হাতে রাখি পরে এলাম। গরিব মানুষ, এই ছুতোয় কিছু টাকাও সাহায্য করে এলাম।

নিজে একটা সাধারণ চাকরি করলেও, সরোজবাবু চিরকালই পরোপকারী। শুধু তাই নয়, কিছুটা আবেগপ্রবণও। বাবাকে এমনটাই এতদিন দেখে এসেছে মনোজ এবং মণিমালা। কিন্তু বাবার হাতে দুটো রাখি কেন, সে প্রশ্নের উত্তর পায়নি ভাইবোন।

যাইহোক, বাবার পরোপকারের বিষয়টি সামনে আসতেই আবার কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল মনোজ। সে নিজের ঘর থেকে মা-বাবার জন্য রাখা উপহারটা এনে তুলে দিল বাবার হাতে।

উপহারটা হাতে নিয়ে সরোজবাবু প্যাকেট খুলে দেখলেন একটা দামি স্মার্ট ফোন।

তোর তো স্মার্ট ফোন আছে, আবার কিনে টাকা নষ্ট করলি কেন?

না বাবা, এটা আমার জন্য নয়। এটা মা এবং তোমার জন্য। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেছে, তাদের সঙ্গে আবার ভিডিযো কল করে কথা বলবে। ফেসবুকও করতে পারবে। অবসর সময়টা ভালো ভাবেই কেটে যাবে তোমাদের।

মনোজের কথা শুনে সরোজবাবু আপত্তি তুলতে গিয়ে পারলেন না, কারণ মনোজের মা গীতা বললেন, খোকা যখন শখ করে কিনে এনেছে, তখন আর আপত্তি কোরো না।

মণিমালা বলল, বাবা তুমি চিন্তা কোরো না, আমি সব শিখিয়ে দেব।

দিদি, মোবাইলটা নিয়ে চার্জ-এ বসিয়ে দে এবার। মনোজের অনুরোধ মণিদিদিকে।

বিকেলবেলা মুখরোচক কিছু স্ন্যাক্স তৈরি করে গরম গরম পরিবেশন করল মণিমালা। সবাই একসঙ্গে বসে খাবারের স্বাদ নিল। এক ফাঁকে কথায় কথায় মনোজ জানাল, পুরোনো ফার্নিচার বদলে নতুন ফার্নিচার আনার ইচ্ছের কথা। কিন্তু এবার ওর মা আপত্তি তুললেন, পুরোনো হলেও এত বড়ো খাট রয়েছে তো ঘরে, আবার কিনবি কেন? এটাতে কী সুন্দর আমরা সবাই একসঙ্গে শুতে পারি ইচ্ছে হলে। নতুন খাট তো আর এত বড়ো হবে না!

মনোজ বুঝল মায়ের আবেগ-অনুভতির বিষয়টা। কিন্তু সে তার গার্ল-ফ্রেন্ড পৃথা-কে কথা দিয়েছে যে, বিয়ের আগে ঘরগুলিকে গুছিয়ে কিছু জিনিসপত্র চেঞ্জ করে একেবারে আধুনিক রূপ দেবে। এরপর দিদি মণিমালা-ই অবশ্য মাকে মনোজের ইচ্ছের কথা বুঝিয়ে রাজি করাল।

আসলে, মনোজ এবং পৃথা-র সম্পর্কের বিষয়ে অনেকটাই জানত দিদি মণিমালা। ওদের ভাইবোনের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক, একেবারে বন্ধুর মতো। তাই, চাকরি পাওয়ার পর মনোজ যে পৃথাকে বিয়ে করে ঘরে আনতে চায়, এ কথা জানত ওর মণিদিদি। সে তাই মায়ের কানে কানে মনোজের ইচ্ছের কথা জানিয়ে দেওয়ার পর, মা মুচকি হেসে মনোজকে নতুন ফার্নিচার ঘরে আনার অনুমতি দেন। ভাই মনোজের কাছ থেকে ওর হবু শ্বশুরের মোবাইল ফোনের নাম্বারটা নিয়ে মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল মণিমালা।

মেয়ে মণি, শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার পর কেটে গেছে আরও এক মাস। এর মধ্যে সরোজবাবু এবং গীতা মনে মনে ছেলের বিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। সরোজবাবু একদিন ফোন করে আলাপ-পরিচয় সারলেন ছেলের হবু শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে। মনোজের সঙ্গে পৃথার বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। পৃথার বাবা-মা অবিনাশ এবং সুনীতা তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন সরোজবাবু এবং গীতাকে।

মনোজের মতো পৃথাও চাকরি করে। তবে সে মনোজের মতো ইঞ্জিনিয়র নয়, একটি বহুজাতিক সংস্থার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেড। শিক্ষিত এবং আধুনিক মনস্ক। তাই মনোজ এবং পৃথা চেয়েছিল, ওরা রেজিস্ট্রি ম্যারেজ-এর পর একটা রিসেপশন পার্টি দেবে। কিন্তু পৃথার দিদিমা চান বিয়ে  সামাজিক মতে হইহুল্লোড় করেই হোক। পৃথা যেহেতু তার দিদিমাকে ভীষণ ভালোবাসে, তাই তাঁর আদেশ অমান্য করতে পারল না। অগত্যা মনোজও সামাজিক বিয়েতেই মত দিতে বাধ্য হল।

দুই বাড়ির মধ্যে মনোজ এবং পৃথা-র বিয়ের কথা এগোতে থাকল। প্রস্তুতিও শুরু হল জোর কদমে। নির্দিষ্ট দিনে আংটি বদলও করে নিল মনোজ এবং পৃথা। অবশ্য ওইদিন শুধু দুই বাড়ির লোকেরাই একটা ছোটো মতো অনুষ্ঠান করে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া সারল। এরপর বিয়ের দিন এগিয়ে আসতে লাগল। মনোজ সমস্ত দায়-দাযিত্ব ভাগ করে দিতে শুরু করল আগাম। দিদি-জামাইবাবুকে জানিয়ে দিল তাদের অতিথি আপ্যায়নের দাযিত্ব নেওয়ার কথা। আর মা-বাবাকে জানাল, ওরা যেন পৃথা-র দিদিমার কথামতো সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলেন।

কিন্তু বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে লাগল, সরোজবাবু এবং গীতাকে খুব চিন্তান্বিত মনে হল। বিশেষ করে সরোজবাবুকে খুব মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখা গেল। এই দৃশ্য মনোজের চোখ এড়াল না।

বাবা, তোমাদের কী হয়েছে? খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছে মনে হচ্ছে! এনি প্রবলেম?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সরোজবাবু ছেলেকে বললেন, না তেমন কিছু নয়, আসলে বয়স হয়েছে তো, তাই ভাবছি যদি পৃথা-র দিদিমার ইচ্ছেমতো সমস্ত রীতিনীতি ঠিক মতো মেনে চলতে না পারি! না, মানে তিনি খুশি না হলে তো বউমাও দুঃখ পাবে, তাই ভাবছি…

তোমরা এত ভেবো না তো। বাবা-মা হিসাবে যা রীতিনীতি মানার তাই মানবে, বাড়াবাড়ির তো কোনও প্রযোজন নেই।

না, মানে পৃথার দিদিমা একটু প্রাচীন ধ্যান ধারণার মানুষ তো, যদি তাঁর মন ভরাতে না পারি।

এবার মনোজ ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, মা, বাবাকে তো এমন করে সাধরণ একটা বিষয় নিয়ে ভাবতে দেখিনি। বাবা তো এত সংস্কার মানে না। এখন কী যে হল! যাকগে, তুমি বাবাকে একটু খুশিতে থাকার ব্যবস্থা করো তো। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি কালই দিদিকে চলে আসতে বলছি। জামাইবাবু না হয় ব্যস্ত মানুষ, পরে আসবে। দিদি এলে তোমাদের মাতিয়ে রাখবে।

মণিমালা এখনও মা হয়নি। তাই ভাই অনুরোধ করতেই চলে এল মা-বাবাকে খুশিতে রাখার জন্য। দিদি আসার পর বাবা-মাকে অনেকটা চিন্তামুক্ত দেখে, মনোজও বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিল। কিন্তু এক সন্ধ্যায় সূচনা হল এক রহস্যজনক অধ্যায়ের।

দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। মণিমালা তখন বাড়িতে থাকলেও, মনোজ ছিল না। ছেলেমেয়ের সামনে দিনেরবেলা মা-বাবাকে কখনও দরজা বন্ধ করে থাকতে দেখেনি মণিমালা। তার কাছে বিষয়টি আরও বিস্ময়ের এবং ভয়ের মনে হল, যখন সে ডাকাডাকি করেও দরজা খোলাতে পারল না। অগত্যা মণিমালা ভাই মনোজকে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলল সব জানিয়ে।

অফিস ছুটি থাকার কারণে পাড়ার মোড়ে বসেই আড্ডা দিচ্ছিল মনোজ। দিদির ফোন পেয়ে সে দ্রুত ফিরে আসে বাড়িতে।

ছেলে এসে দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে গেল। মা খুললেন দরজা। তাঁকে বেশ গম্ভীর দেখতে লাগছিল।

কী হয়েছে তোমাদের? শরীর খারাপ? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মনোজ।

না, তেমন কিছু হয়নি। একটা বিষয় নিয়ে আমরা একান্তে কিছু আলোচনা করছিলাম। ভেতরে আয়। উনি তোদের ভাইবোন-কে কিছু বলতে চান আজ।

ভয় এবং বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা কাটানোর পর ভাইবোন দুজনে ঘরে ঢুকল মায়ের সঙ্গে।

কী হয়েছে বাবা? প্রশ্ন ছুড়ে দিল মনোজ।

ওদের ভাইবোনকে ইশারায় বসতে বললেন সরোজবাবু। তারপর কয়েক সেকেন্ড বাদে ঘরের নিস্তব্ধতা কাটিয়ে মুখ খুললেন তিনি। প্রশ্নের সুরে বললেন, আচ্ছা, তোরা বলতো, বিয়ের মতো শুভ কাজে বাইরের একটা উটকো লোকের রীতিনীতি পালনের অধিকার আছে? মানে, যে-কেউ কি বাবার ভমিকা নিতে পারে?

এমন হেঁয়ালিপূর্ণ কথা শুনে ভাইবোন প্রায় সমস্বরে বলে ওঠে, মানে!

হ্যাঁ, মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে জিতে গেছি, তাই আজ বলতে দ্বিধা নেই। আমি আসলে তোদের বাবা নই, সম্পর্কে মামা! তাও আবার নিজের রক্তের সম্পর্কের মামা নই, প্রতিবেশী পাতানো মামা। এই পর্যন্ত বলে সরোজবাবু থামলেন এবং মনোজ ও মণিমালার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করতে লাগলেন। গীতা তখন মাথা নীচু করে খাটের উপর বসে রয়েছেন।

কিছুটা থমকে থাকার পর, মায়ের দিকে তাকিয়ে মনোজ জিজ্ঞেস করল, মা, বাবা ভুল বকছে কেন? শরীর ঠিক আছে তো?

মনোজের প্রশ্নের উত্তরে সরোজবাবু আবারও শান্ত গলায় জানালেন, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি মনোজ। আজ তোদের কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতেই হবে। নয়তো আমি হয়তো সত্যিই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলব।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মণিমালার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে গেল, কী সত্যি…!

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সরোজবাবু। তারপর ডুব দিলেন স্মৃতির গভীরে। বলতে শুরু করলেন, তোদের মা এবং আমি জলপাইগুড়ির একটি গ্রামে পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। বলতে গেলে একই পরিবারের মতো। ছোটোবেলা থেকেই আমরা ভাইবোনের মতো ছিলাম। তোদের মা আমাকে ফোঁটা দিত, রাখি পরাত। আমরা একই স্কুলে, একই ক্লাস-এ পড়তাম। বড়ো হয়ে দুজনে হায়ার এডুকেশনের জন্য কলকাতায়, মানে এখানে এলাম। আমি যে মেসবাড়িতে থাকতাম, তার থেকে খানিক দূরে লেডিজ হস্টেল-এ থাকত তোদের মা। দেখা হতো নিয়মিত। ভাইবোনের বেশ আড্ডাও হতো।

একদিন আমাদের সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিল জামশেদপুরের ছেলে সুনির্মল। আমি আর সুনির্মল একই মেস-এ থাকতাম। কিন্তু সুনির্মল চাকরি করত একটি প্রাইভেট সংস্থায়। আমিই সুনির্মলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলাম তোদের মায়ের। ব্যস, ওই পর্যন্তই। তারপর কবে, কীভাবে ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল, সম্পর্ক গভীর হয়েছিল, তা আমি জানতাম না।

হঠাৎ একদিন তোদের মা কাঁদতে কাঁদতে এসে দেখা করল আমার সঙ্গে। এত হাসিখুশি বোনটাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে আমি অবাক হযেছিলাম। কিছুতেই ও বলতে পারছিল না ওর দুঃখ-কষ্ট কিংবা সমস্যার কথাটা। তারপর সব জানলাম অনেক অনুরোধের পর। কিন্তু সুনির্মল যে-মেস ছাড়ার আগে গীতার সর্বনাশ করে গেছে, তা জেনে মর্মাহত হলাম। কারণ, সুনির্মলের ব্যবহারে কোনও দিন অবিশ্বাসের চিহ্নও খুঁজে পাইনি। চাকরিসূত্রে অন্যত্র বদলি হয়ে যাচ্ছে বলে মেস ছেড়েছিল সে। তখন কে জানত যে, আসলে ও পালিয়েছে!

অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া গেল না সুনির্মলকে। উলটে, পুলিশের মাধ্যমে অন্য এক মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়েছিলাম। সুনির্মলের ওই অপকর্ম করে পালিয়ে বেড়ানোর খবর পেয়ে বালিগঞ্জে বাপের বাড়িতে এসে আত্মহত্যা করেছিল তার বিবাহিত স্ত্রী। আর তার বৃদ্ধা অসহায় মায়ের কাছে রেখে গিয়েছিল একরত্তি মেয়েকে। মণি তুই তখন কথা বলতেও শিখিসনি।

সব জেনে গীতা চমকে দেওয়ার মতো একটা পদক্ষেপ নিয়েছিল। পুলিশের সাহায্য আর আইনি অনুমতি নিয়ে বালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে মণিকে নিয়ে এসে নিজের মেয়ে পরিচয় দিয়েছিল। অথচ নিজেই তখন অসহায়। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। গীতা-র ওই অদ্ভুত মানসিক শক্তি, মহানুভবতা আর সাহস দেখে আমি হতবাক হয়েছিলাম। কিন্তু ঘোর কাটতেই আমার মনে হযেছিল, একা একটা মেয়ের পক্ষে এত বড়ো লড়াই চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই হাত বাড়িয়ে দিলাম সাহায্যের।

আর জলপাইগুড়িতে নিজেদের বাড়িতে ফেরা হল না আমাদের। সমাজের রক্তচক্ষু এড়াতে গিয়ে আমরা একসঙ্গে থাকতে শুরু করলাম স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে কিন্তু সে তো শুধু সমাজের চোখে, আসলে তো আমরা দুটি ভাই-বোন। পবিত্র সে সম্পর্ক। আজও সে পবিত্রতা বজায় রেখে চলেছি দুজনে এবং দাযিত্ব পালনেও কোনও ত্রুটি রাখিনি। তোরা দুজনেই সুনির্মলের সন্তান হলেও, তোদের মা আলাদা। কিন্তু গীতা তোদের দুজনকেই সমান স্নেহে মানুষ করেছে। আর আমি শুধু পাশে থেকে সাহস জুগিয়ে গেছি মাত্র। কিন্তু এতদিন এই স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি। আর লুকিয়ে তোদের মায়ের হাত থেকে রাখি পরতে পারব না। এবার তোদের সামনেই গীতার হাত থেকে ফোঁটা নিতে চাই, রাখি পরতে চাই। তোরা সে অনুমতি দিবি তো?

এতক্ষণ সরোজবাবুর কণ্ঠস্বর ছাড়া আর কোনও শব্দ ছিল না ঘরে। কিন্তু তার কথা শেষ হতেই কান্নার বাঁধ ভাঙল মণিমালার। গীতাকে আঁকড়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদছে সে। গীতার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, সরোজবাবুর পা ধরে মাটিতে বসে পড়েছে মনোজ। সরোজবাবুর স্বার্থত্যাগ ও মহানুভবতার কাহিনি শুনে মনোজের তখন বাকরুদ্ধ অবস্থা।

একসময় ঘরে দেখা গেল এক স্বর্গীয় সুখময় দৃশ্য। সরোজবাবু, গীতা, মণিমালা, মনোজ সবাই একে অন্যকে জাপটে ধরে রয়েছে। সবার চোখেই জল। দুঃখ, যন্ত্রণা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার সেই অনুভতি যে কেমন ছিল, তা ওরা চারজন ছাড়া অনুভব করা অন্যদের কাছে দূরূহ বিষয়।

যাইহোক, মনোজের মর্মান্তিক অতীত এবং গীতা ও সরোজবাবুর এই সংবেদনশীল কাহিনি শুনে পৃথা, ওর মা-বাবা, এমনকী দিদিমাও বিস্ময় প্রকাশ করেন ও মুগ্ধ হন। তারপর, মনোজের অনুরোধ মতো রীতিনীতি ছাড়াই বিয়ের অনুমতি দেন পৃথার দিদিমা। আর এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি খুশি হন সরোজবাবু। কারণ, তাঁকে আর অসহায় ভাবে বাবা সাজতে হবে না।

 

আলমারি

–হ্যাঁ মা বলো।

–কোথায় আছিস রে? এতক্ষণ ধরে ফোন করেই যাচ্ছি কোনও রেসপন্স নেই।

–কেন আমি তো টিউশনে ছিলাম। তোমাকে তো বলেই এলাম, কলেজ ফিরতি টিউশন করে ফিরব। কিছু কি দরকার আছে? এতগুলো মিস্ কল!

–তোর বাবার ফোন অনেকক্ষণ ধরে বন্ধ আছে। তোকে কি কিছু বলে গেছে?

–না তো। দুটো নম্বরই বন্ধ?

–হ্যাঁ। অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি। সেই দুপুর থেকে।

–কোথাও গেছে হয়তো।

–আজ পর্যন্ত কোনও দিন তোর বাবা না বলে কোথাও গেছে? অফিসে দেরি হলেও ফোন করে জানিয়ে দেয়।

–তুমি চিন্তা কোরো না, আমি দেখছি। তুমি একবার বীরেনকাকুকে ফোন করে দ্যাখো।

–তিন্নি, অফিসে ফোন করেছিলাম। বলল, সেই দুপুরেই বেরিয়ে গেছে।

তিন্নি আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে বাবার নাম্বার ডায়াল করল। বাবা ওয়ান, বাবা টু। সুইচড অফ। মোবাইলে দেখল আটটা কুড়ি। স্ট্যান্ডে না গেলে অটো পেতে সমস্যা হবে। কিন্তু বাবা গেল কোথায়? একে একে ব্যাচের ছেলে মেয়েরা সব বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তিন্নির সাথেও দুজন এল। একজন মাঝ রাস্তাতেই অটো পেয়ে গেল। তিন্নি অন্য আরেক ব্যাচমেটের সাথে কয়েকটা পা এগিয়ে এসে একটা এটিএম কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে সঙ্গীকে এগিয়ে যেতে বলে, নিজে এটিএম কাউন্টারের ভিতরে ঢোকে। টাকা তুলে স্ক্রীন-এ চোখ রাখতেই চমকে ওঠে। একি! এত টাকা! প্রিন্ট বের হল না। এই এক নতুন সমস্যা এসেছে, অর্ধেক কাউন্টারে প্রিন্ট বের হয় না। মেসেজটা বাবার মোবাইলে যাবে, তিন্নির নাম্বার ট্যাগ করেনি। কিন্তু এতগুলো টাকা হিসেব মিলছে না। কেউ কি, তাহলে ইচ্ছে করে এতগুলো টাকা ব্যাংকের আকাউন্টে ফেলে দিল? তাও আবার দু’লাখ। বাবার চিন্তার মাঝে আচমকা এই টাকার চিন্তাও পেয়ে বসল। এত সমস্যা এই ভাবে চলে আসবে ভাবেনি, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। বাবা এতক্ষণেও না ফিরলে মা এখন একা।

(২)

এক কথা বলতে বলতে প্রকাশের জিভে পলি পড়ে গেল। একেক সময় রেগে যায়, পরেক্ষণেই নিজেকে বোঝায়, বেচারা এরাই বা কোথায় যাবে, কয়েকদিন আগেই সেই টাক মাথার ভদ্রলোক এসে প্রকাশের ডেস্কে চেল্লাতে আরম্ভ করেছিলেন, ‘এর থেকে আমাকে একটু বিষ এনে দিন, খেয়ে সবাই মিলে বাঁচি। কোথায় ছিল আর কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।’প্রকাশ সেদিন রাগেনি। ক্যাজুয়াল স্টাফ সমীরকে বলে, ‘এনাকে এক গেলাস ঠান্ডা জল দাও তো।’ জল পান করে ভদ্রলোক বেশ শান্ত স্বরেই বলেন, ‘বলুন তো ম্যানেজারবাবু, এভাবে ইন্টারেস্ট কমালে খাব কি? রাজ্য সরকারের চাকরি করতাম, রিটায়ার করে কতই বা পেয়েছি। এতে খাব, ডাক্তারকে দেব, না জমাব।’

ভদ্রলোকও সব বোঝেন, কিন্তু কী করা যাবে, নিয়ারেস্ট গায় দ্য গিলটি ওয়ান। এদিকে দিন দিন কাজের চাপটাও বাড়ছে। টিফিন খেতেই সময় পায় না। দুটো থেকে আড়াইটের সময় কিছু না কিছু কাজ এসে যায়। নিদেন পক্ষে লিংক ফেলিওর। একে ওকে ফোন করা তো আছেই। তবে কাস্টমাররা ভাবে এটা হয়তো ব্যাংকের লোকেদের ফাঁকিবাজির নতুন অস্ত্র। কথায় কথায় লিংক ফেলিওর। অর্ধেকজন বোঝে না এই ভার্চুয়াল ব্যাংকিং-এর যুগে অন্তর্জালই প্রধান স্তম্ভ। এত বোঝা সবার কম্ম নয়। ঘরের ভদ্রমহিলাই বোঝে না। কাজ করবার ফাঁকে একবার মোবাইলের স্ক্রীন-এ চোখ রাখল। না, এখনও পর্যন্ত মিস কল নেই। ভালোই আছে, দরকার হলে মিস্ কল দিয়ে ছেড়ে দেয়। কিছু বললে জবাব দেয়, ‘তুমি কেন্দ্রীয়, আমি রাজ্য। জানোই তো কতটাকা কম বেতন পাই।’ মায়ের দেখে মেয়েটাও হয়েছে ওইরকম। কথা বলতে না বলতেই, ‘বাপি কিছু ফান্ড ট্রান্সফার করে দেবে?’

–কত?

–বেশি নয়, হাজার পাঁচেক দিলেই হবে।

–হাজার পাঁচ! ভগবান, বাড়ি ভাড়া লাগে না নিজেরা রান্না করে খায়, তাও হাত খরচ হাজার পাঁচ, সেটা আবার শেষ মাসে। প্রথমে আরেক প্রস্থ পাঠানো হয়। মায়ের থেকে টাকা নেওয়া তো আছেই। প্রকাশ ঘড়িটার দিকে আরেকবার তাকাল। দুটো চল্লিশ। সিগারেট খেতে হবে। খিদেও পেয়েছে। কী টিফিন দিয়েছে কে জানে? প্রকাশ ব্যাগ খুলে টিফিন কন্টেনার বের করল। মুড়ি, একটুকরো শসা। প্রতিদিন এক। নিকুচি করেছে টিফিনের। উঠে ডাস্টবিনে পুরো টিফিনটা ফেলে সমীরকে বলল, ‘রায়বাবুকে বলবে খেতে যাচ্ছি। দেরি হবে একটু।’ম্যানেজার শোনে, কিন্তু রুমা শোনে না। ব্যাংকের দরজার বাইরে পা দেওয়া মাত্র মিস্ কল। একসাথে পাঁচবার। প্রকাশ একটু বিরক্তির সাথেই ফোন ডায়াল করে বলল, ‘কী হলটা কী? এত তাড়া কীসের?’

–কোথায় আছো?

–ভাগাড়ে। এইসময় কোথায় থাকি তুমি জানো না?

–শোনো আমি আজ বিকালেই তিন্নির কাছে যাচ্ছি। ওর শরীর খারাপ। তুমি এই কটা দিন একটু হোম ডেলিভারি থেকে আনিয়ে চালিয়ে নেবে। আমি কবে ফিরব জানি না।

–তিন্নির কী হয়েছে? চমকে ওঠে প্রকাশ।

–শরীর খারাপ বললাম না।

–শরীর খারাপ শুনলাম, কিন্তু কী হয়েছে সেটা তো জানতে হবে।

–তোমায় এইসব মেয়েলি ব্যাপারে নাক গলাতে হবে না।

–অদ্ভুত তো। মেয়েটা কি তোমার একার?

–শোনো অতো বকার সময় নেই। আমি রাখছি, আর হ্যাঁ কিছু টাকা ট্রান্সফার করে দেবে।

–কেন সিরিয়াস কিছু, ভর্তি করতে হবে?

–তুমি বড্ড ইনকুইজিটিভ হয়ে যাচ্ছ।

–এক কাজ করো কার্ড নিয়ে যাও সে রকম হলে কোথাও ভর্তি করে দেবে। ক্যাশলেস হয়ে যাবে।

–তোমাকে যা করতে বললাম তাই করো। এরকম বেসলেস কথা বোল না। আমি চিন্তা ভাবনা করে যেটা ভালো ভাবব, সেটাই করব। তোমাকে কিছু বলতে হবে না।

–ভালো। আমি টাকা দেব, কিন্তু কোনও আলোচনাতে থাকব না? আমার মেয়ে অথচ শরীর খারাপ হলে কী করবে সেটা বলবারও অধিকার নেই। এই না হলে বাবা। তা তুমি যাচ্ছ যে তোমার অফিস কী হবে?

–ইন্টিমেশন দিয়ে যাচ্ছি, ছুটি নিয়ে নেব। আর শোনো ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল প্রকাশ। এখন ওসবের সময়ও নেই, লেট হার কিওর সুন।

প্রকাশ অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা একটা শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি একবার তিন্নিকে ফোন করছি।’

– না না। রুমা প্রায় চমকে উঠল।

–না না মানে?

–ওকে এখন ফোন করতে হবে না। আমি পৗঁছে সব কিছু তোমাকে জানাব।

রুমার ফোনটা রাখবার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ কিছুসময় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী হল তিন্নির! আর খাবার মুখে উঠবে না। এক কাপ চা বলল। বিস্কুটটা ভিজিয়ে মুখে তোলার আগেই মাটিতে পড়ে গেল। এরা বড্ড বেশি চিন্তা দেয়। রুমার এই স্বভাবটা ইদানীং হয়েছে। আগে এরকম করত না! কথাবার্তা সমস্ত কিছু শেয়ার করত। এমনকী চাকরি পাওয়ার বছর দুই পরে আপার ডিভিশনের একটা ছেলেকে ভালো লাগত। সে কথাও গোপন করেনি। তিন্নির স্কুলে পড়বার সময় অঙ্কে রিপিটেড কম নম্বর পাওয়া, বা এক বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে ড্রিংক করে বাড়ি আসা, সবই প্রকাশের থেকে রুমাই বেশি বলত। সেসময় বরং প্রকাশ বোঝাত, শান্ত করবার চেষ্টা করত। এইচএস পাস করবার পরেই সব হিসাব কেমন যেন গোলমাল হয়ে যেতে আরম্ভ করল। উলটে যেতে লাগল সব কিছু। তিন্নি কোনওরকমে ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করল। প্রকাশ বলল, ‘শোনো ওর যা মেরিট তাতে সাধারণ লাইনে গ্র্যাজুয়েশন করুক। তারপরে না হয় কোনও একটা প্রফেশনাল কোর্স করানো যাবে। রুমা প্রথমে সব কথা শুনেও ছিল। প্রকাশের কথাতে রাজিও হল। কিন্তু বাধা এল রুমার দিদির কাছ থেকে। দিদির ছেলেটাও হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে। জামাইবাবু একটা সরকারি জীবনবিমা কোম্পানির ডেভেলপমেন্ট অফিসার। হাবেভাবে টাকা আছে জাহির করে। কথায় কথায় বলে, ‘বুঝলে ভায়া সন্ধেবেলা ঠিক জল খেতে ইচ্ছে করে না।’ ঘরে ড্রিংক ক্যাবিনেটও আছে। বছরে দু’একবার প্রকাশও যায়। তবে দুইবোনের সাথে কী সব কথা হয় কে জানে?

একদিন অফিস থেকে প্রকাশ বাড়ি ফিরতেই রুমা বলে, ‘তিন্নিকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি করে দাও। রাকাও ভর্তি হচ্ছে।’

–কোথায়?

–কলকাতায়।

কথাগুলো শুনে প্রকাশ এক্বেবারে আকাশ থেকে পড়ল। রুমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আরে দাঁড়াও, আমি সব কিছু আগে ভেবে দেখি। কোন কলেজ, কি তার ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ক্যাম্পাসিং কী হচ্ছে, এই সব কিছু না দেখে শুনে তো আর ভর্তি করা যায় না। তাছাড়া এখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বাজার ভালো নয়।’

–ও সব কিছু তোমাকে দেখতে হবে না। তুমি ও-সব বুঝবেও না, তার থেকে যে দেখছে তার ওপরেই সব কিছু ছেড়ে দাও।

–কার ওপর, তোমার জামাইবাবু? তা হলেই হয়েছে।

–সে তো হবেই দু দুটো ফ্ল্যাট, গাড়ি, সব তো তুমি কিনেছ তাই না?

– বাদ দাও।

–বাদ দেওয়ার কিছু নেই, জামাইবাবু সব কিছু দেখে এসেছে। খোঁজ খবরও নিয়েছে। রাকা তিন্নি দুজনেই ওখানে ভর্তি হবে।

–থাকবে কোথায়?

–কেন, গড়িয়াতে জামাইবাবু অতো বড়ো ফ্ল্যাট কিনেছে, ওখানেই থাকবে।

–শুধু দু’জন এই বয়সে এক সাথে! ব্যাপারটা ক্রুশিয়াল হয়ে যাবে না?

–তোমার কাছে হতে পারে, আমার কাছে নয়, ওদের কাছে তো নয়ই। তাছাড়া মাঝে মাঝে আমরা যাব, জামাইবাবুরা যাবে।

প্রকাশ আর কথা না বাড়িয়ে উত্তর দিল ‘ভালো। সবই যখন ঠিক করেই নিয়েছ তখন আর আমাকে বলবার কী আছে?’

রুমার কথামতোই তিন্নি ভর্তি হল। ক্লাসও চলল। সাত মাস কেটেও গেল। তারপরেই একদিন অফিসে ফোন করে রুমার এই সব কথা বলে, তিন্নির শরীর খারাপ নিয়ে এই রকম অদ্ভুত নাটক তৈরি করে, এই রকম আচমকা চলে যাওয়া।

রুমা ফোন করতে বারণ করলেও প্রকাশ তিন্নিকে ফোন করে। এক, দুই, তিন বার। না ফোন সুইচ অফ। রাকাকেও ফোন করে। বেজে গেল, ধরল না।

রুমার ফিরতে ফিরতে দিন দশ কেটে গেল। এর মাঝে প্রতিদিনই প্রকাশ ফোন করে যাওয়ার কথা বলতেই রুমা বলে ওঠে, ‘না না আমি যখন তোমাকে বারণ করেছি তখন তুমি আসবে না।’ একদিন অফিস ফেরত রাকাকেও ফোন করে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। রাকাও কোনও স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দিল। সীমা আবার নিজের বোন রুমাকে দোষ দিয়ে বলল, ‘আমার বোনটাই বাজে। সাধারণ একটা ঘটনাকে তাল বানিয়ে দিল।’ ভাইরাভাই আবার হাসতে হাসতে বলে উঠল, ‘আমি আবার ওসব মেয়েলি ব্যাপারে থাকি না।’

তিন্নি বাড়িতে ফিরে আসার পরেও প্রকাশ কিছুই জানতে পারেনি। তিন্নি সব সময় চুপ থাকে। রুমাকে কিছু প্রশ্ন করলেই রেগে রেগে উত্তরটা দেয়, ‘তুমি বড্ড বেশি মেয়েলি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছ। মেয়ের গাইনিকোলজিক্যাল প্রবলেম, তোমাকে সব জানতে হবে? যেগুলো মেয়েলি ব্যাপার সেগুলো আমাদের মধ্যেই রাখতে দাও। তুমি ফল টল আনো। ওকে এখন বেশি করে ফল খেতে হবে। আর একটু সুস্থ হলে এখানকার কোনও একটা কলেজে ভর্তি করে দাও, ও আর ওখানকার কলেজে পড়বে না।’

এরপর প্রকাশ আর একবারের জন্যেও কাউকে কোনও প্রশ্ন করেনি। অফিস থেকে দেরি করে বাড়ি ফিরে খেয়ে শুয়ে পড়ে। ছুটির দিনে কোনও না কোনও কাজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। রুমার কথা মতো তিন্নিকে একটা প্রাইভেট কলেজে একটু বেশি ফিজ দিয়ে ভর্তি করে দিয়েছে। এরপর শুধু ফল কেনা, টাকা পয়সা দেওয়ার কোনও রকম গাফিলতি করে না। প্রয়োজনের থেকে বেশিই কেনে। ফল পচে যায়, জামাকাপড় আলমারি ছাড়িয়ে যায়। কারওর সাথে কোনওরকম অতিরিক্ত কথা বলে না। একদিন শুধু একটা দরকারে তিন্নির আলমারি খুলে একটা ব্যাগ বের করে প্যান কার্ড আর আধার কার্ড বের করেছে, তাও অবশ্য তিন্নিকে বলেই। এর বেশি আর কিছু না।

(৩)

প্রকাশের নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রায় মাস সাত হয়ে গেল। তিন্নি ও রুমা অনেক চেষ্টা করেও প্রকাশের কোনও ঠিকানা জোগাড় করতে পারল না। এমনকী মানুষটা বেঁচে আছে না মারা গেছে, প্রথম কয়েক দিন তো সেটাই বুঝতে  পারেনি। সাতদিন পরেই তিন্নির মোবাইলে ব্যাংকে দ্বিতীয়বারের জন্যে টাকা ক্রেডিট হওয়ার মেসেজ আসে। ব্র্যাঞ্চে গিয়ে শোনে ড্রপ বক্সের চেক থেকে ক্যাশ করা হয়েছে। যে ফেলেছে তার ঠিকানা বলা সম্ভব নয়। প্যান নম্বর দেওয়া থাকায় সমস্যা হওয়ারও কোনও কথা নয়। তবে ব্রাঞ্চের এক চেনাজানা কাকুকে প্রকাশের কথা জিজ্ঞেস করতে উনি বলেন, উনি তো ভিআরএস নিয়ে নিয়েছেন, এখন কোথায় আছেন কেউ জানে না। টাকা পাওয়ার আগে মাঝে মাঝেই আসতেন, সব টাকা পেয়ে যাওয়ার পরে আর তো আসেননি। এর মাঝে মা মেয়েতে অবশ্য অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বাদ পড়েনি কেউই। সবার মুখে সেই এক কথা। মাঝে অবশ্য বেশ কয়েকবার তিন্নির মোবাইলে টাকা জমা পড়বার মেসেজ এসেছে। রুমা ও প্রকাশের জয়েন্ট আকাউন্টেও টাকা জমা পড়বার মেসেজ এসেছে। এই কয়েকমাসে দিদির সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেও দিদি জামাইবাবু এমনকী রাকাও এসেছে। সব শুনে পাশে থাকবার আশ্বাস দিয়ে গেছে। প্রকাশকে খোঁজার চেষ্টা করবার কথাও বলেছে। কিন্তু সেখানে কিছুই লাভ হয়নি।

দিনদিন তিনকামরার ফ্ল্যাটের ভিতরের শূন্যতা দুটি মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছে। সেই একাকিত্ব এতটা তীব্র, কষ্টদায়ক, এর আগে কোনওসময় কেউই বোঝেনি। অথবা বোঝবার চেষ্টাও করেনি। প্রয়োজনের আগেই প্রয়োজন মেটানোর যে দায় একজন কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছিল, তার কাঁধের ব্যথা বা না ব্যথার কথাও কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু আচমকা কাঁধ অর্ধেকটা সরে যাওয়াতে ভূমিকম্পের আরম্ভ। সেখান থেকেই টালমাটাল অবস্থা। রুমা বা তিন্নিকে হাতে হাতে সব কাজ করা আরম্ভ করতে হল। সেই দোকান, বাজার, ইলেকট্রিক বিল এমনকী ব্যাংকে লাইন দিয়ে টাকা তোলা। দুজন এক সাথে এই প্রথম তৃতীয় আরেকজনের জন্যে অকাতরে কাঁদতে আরম্ভ করল। অবশ্য এই কান্না তৃতীয়জনের অলক্ষে।

রুমা এই কয়েকমাসে নিজের অফিস আর বাড়ির চাপে আরও অসুস্থ হয়ে গেল। কথায় কথায় রেগে যায়, তিন্নির ওপর তো এক্বেবারে খাপ্পা হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে হাতও চালিয়ে দেয়। তিন্নিও গুম হয়ে থাকে। কিছু বলতে পারে না। কলেজেও নিয়মিত যায় না, টিউশনেও অনিয়মিত। নিজেকেই সব সময় দোষারোপ করে, মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও ভাবে, পরেই আবার নিজেকে সামাল দেয়। মাকে মাঝে মাঝেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। এমনি চেক আপ হলেও ডাক্তার বলেন, টেনশনের থেকে হাই সুগার ধরেছে, সঙ্গে প্রেশার, কোলেস্টেরল, রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেশি থাকায় কিডনিও কিছুটা আক্রান্ত হয়ে গেছে। নিশ্চিন্তের বিশ্রাম দরকার, শারীরিক ও মানসিক। অফিস থেকে ছুটি নেয়, কিন্তু মানসিক বিশ্রাম?

আরও দুই মাস পরে এক দুপুরে খেতে বসে ভাতের থালাতে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করবার সময় দিদির ফোন পেয়ে রুমা চমকে ওঠে। ফোনটা রেখেই মাখা ভাত ফেলে তিন্নিকে বলে, ‘রেডি হয়ে নে, মাসিরা আসছে। তোর বাবাকে খুঁজে পাওয়া গেছে, তবে কোথায় জানি না, মেসো জানে।’

কলকাতা শহর ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটে যায় উত্তর চবিবশ পরগণার বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। রুমা, তিন্নি ছাড়াও দিদি জামাইবাবু এমনকী রাকাও সঙ্গে থাকে। অবশ্য রাকা আর তিন্নি দুজন বসে দু’প্রান্তে। একজন পিছনের সিটে  একজন সামনের সিটে। গ্রামের মেঠো রাস্তার বুক ধরে কিছুটা গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল একটা ছোটোগাছ আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায়। অনেকটা জায়গা। ভিতরে ছোটো ছোটো ঘর। গাড়িতে যেতে যেতে রুমা শুনল জামাইবাবু আগে একবার নিজে এসে সব খোঁজ খবর নিয়ে গেছে। প্রকাশের সাথেও দেখা করে সবাইকে নিয়ে আসবে কিনা জিজ্ঞেস করে গেছে। প্রকাশের একটা জীবনবিমার পলিসি ম্যাচিওর হয়ে যাওযার সূত্র ধরেই গোপনে খোঁজ খবর চালিয়ে প্রকাশের ডেরা খুঁজে পেয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে দিদি জামাইবাবু, রুমা আর তিন্নিকে ভিতরে যেতে বলে নিজেরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। রুমা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিল, ‘তোমরা আগে যাও আমরা একটু পরে যাচ্ছি।’

বাইরে তখন পচা ভাদ্রের রোদ। শরীরে আছড়ে পড়া ঝলসানো আলো আর তাপ সহ্য করে রুমা আর তিন্নি এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘেরা জায়গাটার ভিতরে ঢুকে এগিয়ে চলে। কিছুদূর যাওয়ার পরেই কমবয়সি একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি কাউকে খুঁজছেন?’

রুমা একটু আমতা আমতা করে সব কিছু বলতেই সেই নাম না জানা ছেলেটি একটা ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে, ‘উনি এখন ওই ঘরে ক্লাস নিচ্ছেন।’

– ক্লাস নিচ্ছেন!

চাকরি পাওয়ার আগে প্রকাশ চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি টিউশন করত। চাকরি পাওয়ার পরেও প্রথম দিকে অভ্যাসটা চালিয়ে গেছিল। তারপর টুকটাক একে ওকে এমনি দেখিয়ে দিলেও আর টিউশন আরম্ভ করেনি। তিন্নিকে পড়াত। নিজেও অবসর সময়ে চাকরির বিভিন্ন বইপত্র নাড়াচাড়া করত। রুমা কিছু জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘আপডেট থাকা যায়।’

কিন্তু সেদিন কথাগুলো শুনে দুজনেই অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ছেলেটির দেখানো ওই ঘরটির দিকে এগিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। ঘরের ভিতর তখন তিন্নির বয়সি বা ছোটো বড়ো, জনা কুড়ি ছেলেমেয়ের সামনে ক্লাস নিচ্ছে প্রকাশ। দরজার বাইরে দুজনকে আকস্মিক দেখে প্রথমে কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। কিছু সময় পরে প্রকাশ বলল, ‘আমার ঘরে গিয়ে বোসো আমি আসছি।’ তারপরেই একজন ছাত্র এগিয়ে এসে রুমা আর তিন্নিকে প্রকাশের ঘরে বসিয়ে এল।

রুমা ও তিন্নি ঘরের ভিতরে একটা তক্তার ওপর বসে চারদিকটা দেখতে লাগল। সাদামাটা ছিটে বেড়ার ঘর। দুটো জানলা আছে। একটা টুলের ওপর রাখা রয়েছে একটা টেবিল ল্যাম্প। চারদিকে ঝোলানো রয়েছে কয়েকটা শার্ট, প্যান্ট কয়েকটা গেঞ্জি। এককোণে থাক থাক করে বেশ কয়েকটা বই। দরজার বাঁদিকের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে রুমার শ্বশুর-শাশুড়ির একসাথে একটা ছবি। নতুন ঘরে আসার পরে ছবিটা স্টোররুমের স্ল্যাবে তোলা ছিল।

কিছুসময় পরে প্রকাশ ঘরের ভিতর আসতেই রুমা বেশ উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘এর মানে কী? এরকম ভাবে কাউকে কিছু না বলে চাকরি বাকরি ছেড়ে, এই অজ গ্রামে এসে তুমি কী আরম্ভ করেছ?’

–চা খাবে? এই কয়েকমাসেই তো খুব রোগা হয়ে গেছ।

–যা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দাও।

প্রকাশ একটা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমাকে আর তোমাদের দরকার নেই এই সত্য উপলব্ধি করেই চলে এলাম। তবে তোমাদের কাউকে ঠকাইনি। ব্যাংক থেকে একপয়সাও তুলিনি। যা টাকা পেয়েছি সব দিয়ে দিয়েছি।’

–বাবা সব কিছু কি টাকার হিসাবে মেলে, না চলে?

–ঠিক তো আজ তোরা বুঝেছিস, কিন্তু যেদিন আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করে মায়ের কথা শুনে রাকার সাথে থাকতে গেলি, তারপর…। প্রকাশ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কথা বন্ধ করে দিল।

পাশ থেকে তিন্নি বলে উঠল, ‘থামলে কেন? বলো…’

–থাক। আমার কাছে তো সব কথাই গোপন করেছিলি, তাই না। খুব রাগ হয়ে ছিল, ভাবলাম এবার তোরা তোদের মতো করে থাক আমি আমার মতো। তবে এখন আর অতটা রাগ নেই, তোদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল।

প্রকাশের কথা শুনেই রুমা তিন্নি দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুসময় পরে তিন্নি বলে, ‘আমি তো কিছু গোপন করিনি বাবা।’

প্রকাশ মুচকি হাসে, ‘সবাই খরগোশ নয় রে। তারপর আবার কিছুসময় চুপ থেকে বলে, ‘জানিস আমাদের সমাজ, শাস্ত্র, কাছের আত্মীয়দের সাথে বিয়ের অনুমতি দেয় না, তবে আগে দিত। মহাভারতে অনেক উদাহরণ আছে। আবার তুতেনখামেন তার নিজের বোন আনাক-সু-নামুনকে বিয়ে করেছিল। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিয়ে এখনও প্রচলিত।’

–এসব আমাকে বলছ কেন? আমি জেনে কী করব?

প্রকাশ তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, আসলে এখানে ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে শুধু তোর কথাই ভেবেছি, ভেবেছি ভুল কার তোর, না আমার?’

–তুমি যে কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না।

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রকাশ বলে উঠল, ‘তোরা কিছু না বললেও আমি কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। তোর মনে আছে একদিন তোর আলমারি খুলে তোর প্যান কার্ড বের করেছিলাম, সেদিন ব্যাগের মধ্যে নার্সিংহোমের একটা ফাইল পাই। প্রথমে ভয় লেগে গেছিল তারপর কয়েকটা পাতা পড়তেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। তাও রাকাকে ফোন করে ওর কলেজ গেলাম। প্রথমে রাকাও সব অস্বীকার করছিল, একটু জোর করতে হয়েছিল, বুঝলাম এত বড়ো ঘটনা যখন আমার কাছেই গোপন করা হল, তখন তোদের কাছে আমার কোনও মূল্যই নেই।’

রুমার গলাতে অবাক হয়ে যাওযার স্বর।

‘না শোনো তুমি ব্যাপারটা ওরকম ভাবে ভেব না। আসলে তিন্নির সাথে আমার নিজেরও খুব লজ্জা করছিল। তিন্নি যে এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে ভাবতে পারিনি।’

–এটা তোমার দূরদৃষ্টির অভাব রুমা। আমি কিন্তু প্রথমদিনেই বলেছিলাম। তুমি বিশ্বাস করোনি আমার ওপরেই রেগে উঠে বলেছিলে, ‘নোংরা হয়ে যাচ্ছ তুমি, ভাই বোন একসাথে থাকবে তাতে এরকম ভাবাটাই অন্যায়।’

–তুমি বিশ্বাস করো আমার খুব খারাপ লেগেছিল।

–খারাপ! কীসের খারাপ? সব কিছু হয়ে যাওয়ার পরে খারাপ? রুমা আমরা তো বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি। এখানে খারাপ ভালোর তো কোনও প্রশ্ন নেই। দুটো টিনএজ ছেলেমেয়ে এক সাথে এক ঘরে থাকলে অনেক কিছুই হতে পারে, সেখানে অনেক সম্পর্কই গৌণ হয়ে যায়। আবার একটা দুর্ঘটনাও ধরা যায়।

–তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুমি এখন সব সাপোর্ট করছ। এমনি ভাবে তুমি সবকিছু মেনে নেবে? তুমি এমন ভাবে বলছ যেন কোনও ব্যাপারই ঘটেনি। বিয়ে, মহাভারত সব কিছু নিয়ে আসছ।

–আমাদের এই বাংলার হিন্দু সমাজে এইরকম মাসতুতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের প্রচলন নেই। তবে ওদের ক্ষেত্রে আমার মেনে নেবার বা না নেবার সাথে কি কিছু এসে যায়? যেটা ওরা ঠিক করবে সেটাই হবে। আমি অবশ্য এটাও জানি না ওদের এটা প্রেমশূন্য না অন্যকিছু?

–না, ওদের ঠিক করবার কিছু নেই। রাকার সাথে তিন্নি এখন আর মেশে না।

–বেশ ভালো তো। তবে বিপদের আগে সাবধান করতে হয়, কিন্তু বিপদে পড়লে তো সাহায্য করতেই হবে। প্রকাশ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল।

তিন্নি থামিয়ে বলে উঠল, ‘বাবা, তুমি কবে ফিরে আসবে বলো?’

প্রকাশ হালকা হেসে উঠল, ‘মা’ রে তোদের জন্যে মন খারাপ করলেও এখানে দিব্যি আছি। সকালে একটা স্কুল চলে বিকালের দিকে আশেপাশের ছেলে মেয়েদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়। আজকে অবশ্য স্কুল ছুটি তাই ওরা এই সময় ক্লাস করছে। এরা সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। বেশ ভালো আছি বুঝলি, বেশ ভালো।’

–তাহলে আমরা কী করব? রুমা প্রকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

–তোমার দিদি জামাইবাবু এসেছে তো?

–রুমা কিছুসময় চুপ থেকে উত্তর দিল, হ্যাঁ। কথাতে জড়িয়ে থাকা কান্নাটা প্রকাশের কানে গেল।

–ওদের ডাকো। তারপরেই তিন্নির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘কিরে তুই কি করবি? রাকাকেও ডাকব?’

রুমা তখন সেই মাত্র উঠে বাইরে দিদি জামাইবাবুদের ডাকতে যাচ্ছিল। তিন্নি পিছন থেকে ডেকে বলে উঠল, ‘মা, দাঁড়াও। মাসিদের ডাকতে হবে না।’ তারপরেই প্রকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা যেটা বেরিয়ে গেছে সেটা শুধু মাত্র একটা প্রাণ ছিল না। তাও বলছি সব দোষও আমার, ভুলও। আমাকে আর একটা সুযোগ দেবে না? আমি আর ওই সম্পর্কের কথা ভাবতেও চাই না। শুধু তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তুমি বাড়ি ফিরে চলো।’

বাইরে তখন দারুণ রোদ। গরম হাওয়া দরমার ঘরে ঢুকলেও প্রকাশের বেশ শান্তি লাগল। তিন্নিকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠল, ‘খেপি একটা।’

অবনীবাবুর গ্রাম

জিনিসটা কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছেন না অনুপমা। এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কী করে যে হারিয়ে ফেললেন ভেবেই অবাক হচ্ছেন। অবশ্য একে হারিয়ে ফেলা বলা চলে না। ঘরের মধ্যেই হয়তো কোথাও রেখে ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু কোথায়? সকাল থেকে এখনও অবধি সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় খুঁজে দেখেছেন।

ইদানীং ভুলে যাওয়ার সমস্যাটা চরমে গিয়ে পৗঁছেছে। কিছুদিন আগের ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে চশমা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চোখের যা অবস্থা চশমা ছাড়া সমস্তটাই ঝাপসা লাগে। সেই ঝাপসা দৃষ্টি দিয়েই সকাল থেকে বাড়ি ওলটপালট করলেন। দুপুরে কাজে এসে চুন্নি চশমা পেল ডালের কৗটোর ভেতর। এরকম বহু ঘটনা আছে। তাই সেই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো টেবিলের উপর নির্দিষ্ট একটা বাক্সের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সুশান্ত।

ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে টর্চটা নিয়ে অনুপমা এবার খাটের তলায় আলো ফেললেন। স্তূপীকৃত ব্যাগ, বাসন, ট্রাঙ্কের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো যতটুকু পৗঁছোল তাতে কোথাও সেই জিনিস নজরে এল না। অনুপমা ক্লান্ত বোধ করলেন। আজকাল একটুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। টর্চ অফ করে এসে বসলেন খাটের উপর।

বাতের ব্যথার জন্য শরীর নড়াচড়াতে কষ্ট। তবুও মরিয়া হয়ে খুঁজে যাচ্ছেন সকাল থেকে। নইলে সন্ধ্যার পর থেকে আর নিস্তার নেই। অনুপমা চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন। দিন চারেক আগে সুশান্ত এসে যখন জিনিসটা দিয়ে গেল তারপর ঠিক কোথায় রাখলেন…।

আচমকা মনে হল জিনিসটা চুরি হয়নি তো? কিন্তু চুরি কে করবে? চুন্নি? পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে। ও ঘর মুছতে গিয়ে এক টাকার কয়েনও কুড়িয়ে পেলে ফেরত দেয়। আর থাকল রামলাল। রামলাল কবে এই ঘরে ঢুকল অনুপমা মনে করার চেষ্টা করলেন। ধুসস! যতসব আজেবাজে ভাবনা। প্রতিদিন বাজারটা পৗঁছে দিয়েই বেরিয়ে যায় ও। বাড়িতে বিশেষ কেউ আসে না। তাই চুরির প্রশ্নও আসে না। তাছাড়া এই জিনিস আদৌ কি চুরি হবার মতো..? ভাবনায় ছেদ পড়ল। পাশের ঘর থেকে বিকট এক চিৎকার ভেসে এল হঠাৎ।

‘ফুটো করে করে সব শেষ করে ফেলল। ভেঙে পড়বে এবার’ অবনীবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন।

অনুপমা দরজার সামনে এসে বললেন ‘কী হল আবার?’

‘সব শেষ করে ফেলল।’

‘কে?’

‘শুনতে পাচ্ছ না নাকি? কখন থেকে ঠোকর মেরেই যাচ্ছে’

অনুপমা কান পেতে শুনলেন একটা কাঠঠোকরা পাখি অনবরত ঠোকর মারছে গাছে।

‘বাবার নিজে হাতে লাগানো গাছ। ঢিল মেরে তাড়াও ওটাকে।’

‘তাড়াচ্ছি দাঁড়াও। অত চিৎকার কোরো না’ বিরক্ত কণ্ঠে কথাটা বলে অনুপমা বেরিয়ে গেলেন বাইরে।

অবনীবাবু নিশ্চিন্ত হলেন। ঠোকরের আওয়াজ আর পাওয়া যাচ্ছে না। নিশ্চিন্তে আবার পা নাচানো শুরু করলেন। সব গাছ বাবার নিজে হাতে লাগানো। রোজ ঘন্টার পর ঘন্টা রোদ, বৃষ্টি, মাটি মেখে নিজের শখের বাগান বাড়িয়ে তুলতেন বাবা। সার সার সুপুরি বাগানের পেছনের জঙ্গলেই আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারকেলের ভিড়। বেলা বাড়লে অনেক চেনা-অচেনা পাখির ডাক শোনা যায়।

নারায়ণগঞ্জের পনেরো বিঘে জমি ঠাকুরদার নিজের কষ্টের পয়সায় কেনা। এত জায়গা এ তল্লাটে আর কারও নেই। সুপুরি, আর মাঠের ফসলের ব্যাবসায় টাকাও আসত ভালো। সেই টাকায় এলাকার সবচেয়ে প্রথম পাকা বাড়ি হল তালুকদার বাড়ি। পাকা বাড়ি হলেও বাবা ইচ্ছে করেই ছাদ দিতে দেননি।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। টিনের চালে বৃষ্টি আছড়ে পড়ার আলাদা একটা শব্দ আছে। সেই শব্দ শুনেই বোঝা যায় বৃষ্টির গতি। অবনীবাবু বুঝলেন জোরে নয়। হালকা, ঝিরঝিরে বৃষ্টি।

বর্ষার সময়। যখন তখন বৃষ্টি নামে। প্রতিবার রাস্তার ওপাশের ডোবাটা এই সময় জল, কচুরিপানায় টলমল করে। পিন্টুদের পুকুরের সাথে যুক্ত থাকায় প্রচুর মাছ আসে সেখানে। টাকি, রুই, খোলসা, কই। বিকেলে গ্রামের বাচ্চাগুলোর মাছ ধরার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পান অবনীবাবু। কথাটা মনে হতেই চেঁচিয়ে উঠলেন ‘বাচ্চাগুলো এলে গোটা কয়েক মাছ দিয়ে যেতে বলো তো। অনেকদিন ভাজা খাই না। আগে আমি ধরতাম, আর মা ভাজত। ঘি, মাছ ভাজা…’ বলে অবনীবাবু হাসলেন। বেশ জোরেই। কিন্তু ও-ঘর থেকে কোনও প্রত্যুত্তর শোনা গেল না।

(দুই)

কথাটা অনুপমার কানে এসে পৌঁছোল না। সারাদিনই কিছু না কিছু বলতে থাকেন অবনীবাবু। আর সেই অনুযায়ী উত্তর দিয়ে যেতে হয় তাকে। কিন্তু আজ ও-ঘরে বসে থেকে উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নেই। জিনিসটা পাওয়া না গেলে আজ রাতেও ঘুমোতে পারবেন না।

ছালবাকল ওঠা মান্ধাতা আমলের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোন থেকে নম্বর বের করে কারও সাথে কথা বলা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কানে ঠেসে না ধরলে কিছুই ঠিকঠাক শোনা যায় না। ছেলে অর্কপ্রভ অনেকবার বলেছিল টাচ ফোন কিনে দেবে। অনুপমা প্রত্যেকবারই প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেছেন, ‘তিনকাল গিয়ে এককাল আছে। এখন আর টাচ ফোন দিয়ে কী করব?’

অর্ক মাকে বোঝানোর চেষ্টায় বলেছে, ‘অনেক সুবিধে হয় তাহলে। অ্যানড্রয়েড ফোন দিয়েই আজকাল সব কাজ হয়।’

অনুপমা প্রতিবারই প্রবল আপত্তি জানিয়ে না করে দিয়েছেন, ‘এর মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝব না। যেভাবে চলছে বরং সেভাবেই…’

অর্ক আর কথা বাড়ায়নি। সে কথা বাড়াতে পছন্দ করে না। ছোটোবেলা থেকে প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন গম্ভীর প্রকৃতির অর্কপ্রভ বাইরের নামি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বিটেক করেছে। এখন চাকরি সূত্রে বছর সাতেক ব্যাঙ্গালোরে বউ বাচ্চা নিয়ে সেটেলড। দেড় বছর আগে যখন ঘটনাটা ঘটল চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসতে চেয়েছিল। অনুপমা বাধা দিয়ে বলেছিলেন ‘বললাম তো আসতে হবে না। আমি সামলে নিতে পারব। তাছাড়া চুন্নি, রামলাল তো আছেই।’

অর্কপ্রভ আসেনি। ফোনের ওপাশ থেকেই যতটা পারা যায় দায়-দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে।

অনুপমা লোহার মতো শক্ত কি-প্যাড গুঁতিয়ে ফোন লাগালেন। দু’বার রিং হয়ে কেটে গেল। তিন নম্বর বার অর্ক ফোন তুলে বলল, ‘মিটিং-এ আছি। বেরিয়েই কল ব্যাক করছি।‘ আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না অনুপমা।

ভেবেছিলেন ছেলেকে বলে যদি কিছু উপায় বের করা যায়। অনুপমা আবার চেষ্টা করলেন সুশান্তকে। সুইচড অফ। ওর দেওয়া দুটো নম্বরেই কাল থেকে অসংখ্যবার ট্রাই করেছেন। কোনওটাতেই পাচ্ছেন না। এসব ভাবতে ভাবতে আচমকা একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। সুশান্তর ওখানে গিয়ে উপস্থিত হলে কেমন হয়? তাহলেই তো সমস্যা চুকে যায়। টেবিলের উপর রাখা কার্ডটা ভালো করে দেখলেন। কন্ট্যাক্ট নম্বরের নীচে ঠিকানা লেখা। ছয় মাস আগে অর্ক যখন এসেছিল তখন দু’বার গিয়েছিলেন তার সাথে। চিনতে অসুবিধে হবে না।

পরক্ষণেই মাথায় আসল অবনীবাবুর কথা। ঘরে একা রেখে যাবেন কীভাবে! আরেকটু পরেই চুন্নি কাজে আসবে। ওর উপর ভরসা করে রেখে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? এছাড়া আর উপায়ও বা কী! সুশান্তকে কবে ফোনে পাওয়া যাবে তার নেই ঠিক। অতদূর থেকে অর্কও মনে হয় না বিশাল কোনও সাহায্য করতে পারবে। এর চেয়ে ভালো সশরীরে নিজে গিয়ে নিয়ে আসা। তাহলে অন্তত কিছুদিনের জন্য রেহাই।

অনুপমা মনস্থির করলেন চুন্নিকে রেখেই বেরোবেন। ও সমস্তটাই জানে। তাও আরও একবার বলে যেতে হবে। বাসন মাজা, কাপড় কাচার সাথে ওর আজকের এক্সট্রা কাজ হবে দাদুর সাথে বসে গল্প করা। অ্যাক্সিডেন্টে চোখ দুটো খোয়ানোর পর থেকেই অবনীবাবু রোজ জানালার দিকে মুখ করে ইজিচেয়ারে বসে পা নাচান। আশপাশ থেকে ভেসে আসা গ্রামের এক একটা শব্দ খুব মন দিয়ে শোনেন। শুকনো পাতা মাড়িয়ে যাবার শব্দই হোক বা বর্ষাকালে কাদা মাখা স্যান্ডেলের চটচট শব্দ। কোনও কিছুই কান এড়ায় না তার। চোখে দেখতে না পারলেও শব্দ শুনেই চলমান গ্রাম অনুভব করেন।

সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার পরই অবনীবাবুকে ধরে ইজিচেয়ারে বসিয়ে দেন অনুপমা। তারপর চা নিয়ে এসে নিজেও বসেন পাশে। সেই থেকে শুরু হয় কথা। সুপুরির খোল পড়ার আওয়াজ পেলেই অবনীবাবু শুরু করেন ছোটোবেলায় কীভাবে সেটাকে টানা গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করতেন সেই গল্প। ‘একজন খোলের উপর চড়ে বসত আর সামনের জন মাটিতে টেনে হিঁচড়ে এগিয়ে নিয়ে চলত’, বলে অবনীবাবু হাসেন। অনুপমাও হো হো করে হেসে ওঠেন।

সবচেয়ে মুশকিল হয় নারকেল পড়লে। ঝুপ করে নারকেল পড়া মাত্রই অবনীবাবু নাড়ু খাওয়ার হাজারটা গল্প জোড়েন। সাথে বারবার খাবার আবদার। অনুপমা ক্লান্ত বোধ করেন। শরীরের বয়স তেষট্টি হলেও তিনি আরও বেশি বুড়িয়ে গেছেন। মাথা ভর্তি পাকা চুল, কুঁচকে যাওয়া চামড়ার সাথে বাড়তি পাওনা বাতের ব্যথা। এত ধকল আর সইতে পারেন না। তবুও জান ঢেলে যতটা সম্ভব করার চেষ্টা করেন। একাত্তর বছরের এই বৃদ্ধ মানুষটার জন্য। এতগুলো বছর ধরে শুধু…

‘দিদা ঝাঁটা কোথায়?’ অনুপমা পেছন ফিরে দেখলেন চুন্নি এসে গেছে।

(তিন)

‘তোর দিদা বকুলদের বাড়ি থেকে কখন ফিরবে?’ অবনীবাবু প্রশ্ন করলেন।

‘বলেছে সন্ধ্যা হবে।’

‘কটা বাজে এখন?’

‘সাড়ে তিনটা’

‘শুনেই বুঝেছিলাম।’

‘কী?’ চুন্নি অবনীবাবুর দিকে তাকাল।

‘বালতির আওয়াজ। পটলার বাবা এই সময় মাঠ থেকে ফেরে। কুয়োর পারে বসে সাবান ঘষে ঘষে স্নান করে।’

কী কান রে বাবা! চুন্নি মনে মনে ভাবল।

‘আগে তো আমাকে আর পটলাকে এক সাথে বসিয়ে পিঠে সাবান ঘষে দিত। স্নান করাত, অবনীবাবু মুচকি হাসলেন। ঝগড়ার পর থেকে আর কথা বলে না। উঠোনে তো বেড়াও দিয়ে দিল।’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবনীবাবু বললেন ‘যা মাড়টা ঢেলে দিয়ে আয়। গরুগুলো না খেয়ে আছে।’

‘দিচ্ছি’

‘অল্প পোয়ালও দিস।’

‘আচ্ছা’

আচমকা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে বৃষ্টি আছড়ে পড়ার তীব্র আওয়াজ। সাথে মেঘের ডাক।

‘জানালাগুলো আটকে দে’ অবনীবাবু চেঁচিয়ে বললেন।

এই সময় প্রচন্ড মনখারাপ হয়ে যায় অবনীবাবুর। বৃষ্টির জন্য অন্য কিছু শোনা যায় না। যদিও চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির আওয়াজ শোনার মধ্যে একটা মজা লুকিয়ে আছে। ছোটোবেলায় মাটির বারান্দায় বসে কাগজের ছোটো ছোটো নৗকা ভাসিয়ে দেওয়ার খেলা চলত। বৃষ্টি থামলে দেখা হতো কারটা কতদূর পৗঁছেছে। প্রতিবারই জিতে যেত শিমুল। এত জলের মধ্যেও কীভাবে যেন শুধু তার নৗকাই ডুবত না। অনেক চেষ্টা করেও তাকে কোনওবারও হারানো যেত না। অবনীবাবু শিমুলের অস্পষ্ট মুখ দেখতে পেলেন।

সেবার ঘোর বর্ষা। শিলাবতি নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পাড় ঘেঁষে ইতিমধ্যে অনেক ঘর জলের তলায়। অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রচুর লোকসান। নদী আয়তনে বেড়ে উপরে উঠে এসেছে অনেকটাই। গ্রাম জুড়ে সতর্কতা। পারে যাতে কেউ না যায়। শিমুলের বাবা সামান্য ভাগচাষি। তারও প্রচুর লোকসান হয়ে গেছে।

একদিন বিকেলে শিমূল এল। সঙ্গে ওমু আর টিটু। বলল মাছ ধরতে যাবে। শিলাবতির পাড়ে। বাড়িতে না জানিয়েই ভয়ে ভয়ে সেখানে পৌঁছোল ওরা। চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। যেদিকেই চোখ যায় জল আর জল। পারের বট, ডুমুর সব কোমর জলে দাঁড়িয়ে। জলে ভেসে যাচ্ছে ভাঙা বাড়ি-ঘরের অবশিষ্টাংশ। নদীর এই ভয়ংকর রূপ দেখে ওরা তিনজন ঘাবড়ে গেলেও শিমুল ধার বরাবর আরও এগোতে থাকল। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরের কিছু বাড়িতে দেখা যাচ্ছে কুপি, হ্যারিকেনের আলো। তিন বন্ধু বলল আর যাবে না। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শিমুল তাদের বাড়ি চলে যেতে বলে ছিপ হাতে এগিয়ে যেতে থাকল সামনে।

পরদিন সকাল। তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। হঠাৎ দূর থেকে একটা হই হই শোনা গেল। অনেকেই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল শিমুলের বাবা সেই প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে খালি গায়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে ছুটে যাচ্ছে। পেছনে তার দাদা, মা, গ্রামের আরও কিছু লোক। দুপুরে শোনা গেল শিমুলের লাশ পাওয়া গেছে। আগেরদিন সন্ধ্যায় মাছ ধরতে গিয়ে পাড়ের মাটি ভেঙে জলে ডুবে যায় শিমুল। বর্ষায় ফুলে ওঠা শিলাবতি সেই দেহ টেনে নিয়ে চলে যায় অনেকদূর। মাঝিরা লাশ দেখে খবর দেয় গ্রামে।

প্রচন্ড বৃষ্টিতে মনখারাপ হয়ে যায় অবনীবাবুর। শিমুলের বাবার সেই অসহায় চিৎকার কানে বাজে।

‘একি! কাঁদছ কেন?’ চুন্নি অবাক হল।

অবনীবাবু নাক টেনে একটু কেশে নিয়ে বললেন ‘শিমুলটা মারা গেল। কেন যে আটকাইনি আমরা।’

চুন্নি কী বলবে ভেবে পেল না।

দেখল চোখের কোণ বেয়ে এক বিন্দু জল গড়িয়ে এসে পড়ল ইজিচেয়ারের হাতলে।

(চার)

লোকগুলো দৌড়োচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। হাসপাতালের করিডোর।

আশপাশে বসে থাকা সমস্ত পেশেন্টের ভিড়, নার্সদের কোলাহল কাটিয়ে লোকগুলো এগিয়ে যাচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের দিকে। স্ট্রেচারে শোয়ানো মানুষটার চোখ বন্ধ। মাথার পেছনে বাঁধা কাপড়ের টুকরো শুষে নিচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত। আর এক মুহূর্ত দেরি হলেই বাঁচানো যাবে না। লোকগুলো দৌড়োচ্ছে।

‘আরে দিদি চেপে বসুন না একটু। এত জায়গা থাকতে…’

পরের কথাটা অনুপমার কানে গেল না। সাইড দিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে প্রচন্ড গতিতে একটা অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে গেল। তাই শোনা গেল না। অনুপমা জানলার ধারে চেপে গেলেন। মহিলাটি পাশে এসে বসল।

বাসে উঠে ঘুম এসেছিল একটু। তিনরাত ধরে ঘুমোতে না পারার ফল। একটা মানুষ অনবরত একই কথা বলে গেলে কে-ই বা শান্তিতে ঘুমোতে পারে। তাই শরীরে হাজার ব্যথা, কষ্ট নিয়েও আজ সুশান্তর কাছে যেতে হচ্ছে।

শান্তি শব্দটা অনুপমার অভিধান থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে অনেকদিন। বাসে উঠে চোখ বন্ধ হওয়া মাত্র আবার সেই আজেবাজে স্বপ্ন!

পরশুদিন অর্ক ফোন করে জানিয়েছিল ওর কথা হয়েছে ডক্টর চৌধুরীর সাথে। পরের মাসে একবার চেক আপ করিয়ে আনতে বলল।

জানলা দিয়ে শোঁ শোঁ হাওয়া ঢুকে পেকে যাওয়া চুলগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনুপমা জানলার বাইরে চোখ রাখলেন। অনেকদিন আসা হয় না এদিকে। বাজার হাট সব রামলালই করে দেয়। তাই বাড়ি থেকে বের হতে হয় না বিশেষ। রামলাল কাজে ব্যস্ত। তাই দু’দিনের বাজার আগেই করে রেখে গেছে। নাহলে আজ ওকেই পাঠানো যেত। ক্ষয়ে যাওয়া শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলতে হতো না।

অবনীবাবুকে বাড়িতে একা রেখে কোথাও বের হন না অনুপমা। একান্তই দরকারে চুন্নিকে রেখে…। গ্রামের ঠাকুর বকুল মাস্টারের বাড়িতে মনসা পুজোর নেমন্তন্ন আছে। কথাটা বলে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। চুন্নি ঠিকঠাক সামলাতে পারছে তো? একরাশ দুশ্চিন্তা গ্রাস করল হঠাৎই। অনুপমা অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

‘থাকেন কোথায়?’ প্রশ্নটা পাশ থেকে এল। সেদিকে না তাকিয়েই অনুপমা উত্তর দিলেন ‘নারায়ণগঞ্জ’।

‘বাপরে! সে তো অনেকদূর।’

জানলা থেকে চোখ ফিরিয়ে অনুপমা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই…

‘ওখানে আমার মামাবাড়ি ছিল বলে’ মহিলাটি হাসলেন।

অনুপমা আর কিছু বললেন না।

‘সেই ছোট্টবেলা থেকে ওখানকার মাটি মেখে বড়ো হয়েছি। মামাবাড়ি গেলেই হ্যারিকেনের আলোয় গল্পের বই পড়তাম। এখন তো বোধহয় ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে।’

মহিলাটির ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি দেখে অনুপমা বুঝলেন অনেক পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে তার। মানুষ স্মৃতিমেদুর হলেই এভাবে হাসে।

‘হ্যাঁ এসেছে।’

‘শেষ গিয়েছিলাম আট-ন বছর আগে। মামা মারা যাবার পর সব জায়গা জমি বিক্রি করে দাদারা শহরে চলে এল। তারপর আর যাওয়া হয়নি।’

‘ওহ’

অনুপমা সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মহিলাটি আবার বলল, ‘আচ্ছা গ্রামে কি এখনও সেই রেওয়াজটা আছে?’

‘কীসের?’

‘ওই যে জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় শিলাবতির পাড়ে খাওয়া-দাওয়া, রাত কাটানো। কী যে মজা হতো…’

কয়েক মুহূর্ত ভাবতেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো পরপর কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল চোখের সামনে।

নারায়ণগঞ্জে বিয়ে হয়ে আসার মাত্র কয়েকমাস হয়েছে তখন। অনুপমা শহরের মেয়ে। প্রত্যন্ত গ্রাম নারায়ণগঞ্জে এসে প্রথম প্রথম বেশ অসুবিধে হতো। একদিন সন্ধ্যায় অবনীবাবু হাট থেকে বাড়ি ফিরে নদীর পাড়ে রাত কাটানোর কথা বললেন। সাথে জানালেন, খাওয়া-দাওয়া ওখানেই হবে। কথাটা অনুপমা ঠাট্টার সুরে নিলেও রাতে সত্যিই সেখানে বউ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অবনী তালুকদার। অনুপমা পরে জেনেছেন বছরের একটা দিন জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় প্রতিবছরই গ্রামের লোক জড়ো হয় সেখানে। নদীর পাড় দিয়ে গিজগিজ করে মানুষ। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বেলে করা হয় রান্না।

সেদিন চারিদিকের হই হই কাটিয়ে অনুপমার চোখ গিয়ে ঠেকল মেঘহীন আকাশের থালার মতো গোল চাঁদটার গায়ে। নিজেকে উন্মুক্ত করে সমস্ত আলো ঢেলে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। পূর্ণিমার পূর্ণাঙ্গ চাঁদকে এত কাছে দেখে অনুপমার মনে হয়েছিল এক্ষুণি বোধহয় ছুঁয়ে ফেলা যাবে!

মাঝরাতে আচমকাই ঘুম ভেঙে গেল বিকট এক জন্তুর আওয়াজে। নদীর পাড় দিয়ে সমস্ত মানুষ তখন ঘুমিয়ে পড়েছে ঘাসের নরম বিছানায়। প্রচন্ড ভয় পেয়ে অনুপমা উঠে চুপচাপ বসেছিলেন। নদীর কুলকুল শব্দ, ঝিঁঝির ডাকের মাঝে জেগে থাকা চাঁদটাকে অপূর্ব লাগছিল দেখতে। কিছুক্ষণ পর অবনীবাবু টের পেয়ে বললেন– ‘শেয়ালের ডাক এটা। দূরের জঙ্গলে আছে। ভয় পাবার কিছু নেই।’

কিন্তু ভয়টা পুরোপুরি কাটেনি। ভেতর ভেতর ছিলই। অনুপমা কাছে চেপে এলেন। অনেক কাছে। অবনীবাবুর স্পর্শে কেমন যেন একটা সাহস পাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে।

খোলা আকাশের নীচে দুটো না-ঘুমোনো মানুষ জোৎস্নার আলো মেখে পড়ে রইল সারারাত। কিন্তু কেউ কোনও কথা বলল না। শুধু সেই স্পর্শ! অনুপমা চোখ বন্ধ করলে আজও টের পান।

‘কী হল বললেন না তো?’

মহিলাটির কথায় সম্বিৎ ফিরল।

‘হ্যাঁ এখনও মানে…’ অনুপমা কথাটা শেষ করতে পারলেন না।

‘দেখি ভাড়াটা করবেন’ কনডাক্টর এগিয়ে এল। অনুপমা ব্যাগ থেকে দুটো দশের নোট বের করে বললেন ‘একজন’।

‘কোত্থেকে?’

‘এভিনিউ রোড।’

কনডাক্টর থুথু লাগা টিকিট সমেত চার টাকা খুচরো ফেরত দিয়ে বললেন– ‘সামনের দিকে এগিয়ে যান’।

অনুপমা সিট ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় পেছনে না তাকালেও বুঝতে পারলেন সেই মহিলা ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

(পাঁচ)

‘মারা যাবে কেন? বললাম তো সব বেঁচে আছে।’ বেশ বিরক্ত হয়ে কথাটা বলে পাশ ফিরে শুল চুন্নি। এই নিয়ে চার বার একই কথার উত্তর দিতে দিতে মাথাটা চটে গেছে।

অবনীবাবু নম্র ভাবে বললেন– ‘এত বৃষ্টি হল কিন্তু একটা ব্যাঙেরও ডাক শুনতে পেলাম না।’

চুন্নি কোনও কথা বলল না। চোখের পাতা জুড়ে ঘুম ঘুম ভাব। এক হাত মাথার নীচে দিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে ও। ঘর অন্ধকার। অবনীবাবু খাটে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে আছেন।

ঝিঁঝিগুলো একনাগাড়ে কিছুক্ষণ ডেকে কয়েক সেন্ডেকের বিরতিতে আবার ডেকে উঠছে। সেই শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরময়। বর্ষাকালে ঝিঁঝির ডাক আরও তীব্র হয়। রাত বাড়লে ডাকও বাড়ে অবনীবাবু মুচকি হাসলেন।

রাতের অন্ধকারে ঘরে বসে ঝিঁঝির ডাক শোনায় যে কী আনন্দ! পড়া ফাঁকি মেরে দুই ভাই, দিদি-বোন সবাই একসাথে লুকোচুরি খেলার কথা মনে পড়ল অবনীবাবুর। বাবা ওই সময় তনুদের বাড়ি যেত আড্ডা দিতে। বারান্দায় বসে মা উনুনে সবে ভাত চড়িয়েছে। সেই সুযোগেই দুরন্তপনা শুরু। ফুটন্ত ভাতের গন্ধ নাকে ধাক্বা মেরে বাড়িয়ে দিত খিদে। সেই জন্য আরও জোরে দৗড়। একবার গোয়ালঘরের পেছনে লুকোতে গিয়ে দাদাকে সাপে কাটল। সে কী চিৎকার! কোনওমতে জানে বেঁচে গিয়েছিল। দাদা সুস্থ হওয়ার পর বাবা সবক’টা ভাইবোনকে পরপর দাঁড় করিয়ে কাঁচা কঞ্চি দিয়ে পিটিয়েছিলেন। বাবা মারা যাবার পর কঞ্চিটা গোয়াল ঘরের বেড়াতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ করে সেই কঞ্চির কথা মনে পড়ল। খাটের থেকে উঠে মেঝেতে পা বাড়াতেই হাত লেগে কিছু একটা পড়ল। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেল চুন্নির।

‘কী হল? কোথায় যাচ্ছ?’

‘গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখতে কঞ্চিটা আছে কিনা। অনুপমা ফেলে দেয় যদি…’

‘তুমি বসো। আমি দেখে আসছি।’

অবনীবাবু আশ্বস্ত হয়ে খাটে হেলান দিলেন।

ক্লান্ত বিধবস্ত অনুপমা যখন ঘরে এসে লাইট জ্বালালেন ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে। ভয়ংকর জ্যামের জন্য এত দেরি হল ফিরতে। সমস্ত শরীর টনটন করছে ব্যথায়। বাস যেখানে নামিয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে আরও অনেকটা হাঁটতে হয়েছে। চুন্নিকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। ধীর পায়ে এসে দেখলেন অন্ধকারে খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে এক ছায়ামূর্তি।

অনুপমা ধীর কণ্ঠে বললেন– ‘প্রসাদ খেয়ে আস্তে দেরি হয়ে গেল।’

অবনীবাবু তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করলেন না ‘সব ব্যাঙগুলো কি মারা পড়ল নাকি? এত বৃষ্টি হল কিন্তু…’

অনুপমা পাশের ঘরে এসে ব্যাগ থেকে জিনিসটা বের করলেন। কয়েক সেকেন্ড উলটে পালটে দেখে গুঁজে দিলেন মেশিনটার ফুটোয়। ইউএসবি পোর্টে পেনড্রাইভটা ঢোকানো মাত্রই অসংখ্য ব্যাঙের ছন্দবদ্ধ ডাকে ভরে উঠল ঘর। অনুপমা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন সেই অন্ধকারের মধ্যেই অবনীবাবু হেসে যাচ্ছেন আপনমনে।

ক্লান্ত বিধবস্ত শরীরের উপর দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল আচমকা। ব্যাঙের ডাক লোড করা পেনড্রাইভটা কাল থেকে খুঁজে না পাওয়ার জন্যই আজ সুশান্তর কাছে যেতে হল। বেন্টিং স্ট্রিটে ওর বিশাল স্টুডিও। ওখানেই এডিটিং আর সাউন্ড ডিজাইনিং-এর কাজ করে। অনুপমা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে এভিনিউ রোডের এই টুবিএইচকে ফ্ল্যাটে চলে আসার আটবছর হয়ে গেল। জায়গা জমির ভাগ নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে তুমুল অশান্তি। শেষে অনুপমাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শহরে চলে আসার। অবনীবাবুকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে এলেও বারবার ফিরে চলে যেতেন সেখানে। বিক্রি হয়ে যাওয়া সাতপুরুষের ভিটেটাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইতেন। এভাবেই বেশকিছু বছর কাটল। কিন্তু দেড় বছর আগের সেই দুর্ঘটনা দুম করে বদলে দিল সব।

অনুপমা রান্নাঘরের লাইট জ্বাললেন। শেল্ফ থেকে একটা বাটি নিয়ে কিছু নাড়ু ঢাললেন তাতে। ফেরার সময় কিনেছিলেন। লাইট অফ করে বেরিয়ে এলেন বাইরে।

দুর্ঘটনায় চোখ খোয়ানোর সাথে ব্রেনেরও কিছু পার্ট ড্যামেজ হয়েছিল অবনীবাবুর। অপারেশনের পর কাউকেই ঠিকঠাক চিনতে পারতেন না। শুধু উন্মাদের মতো নারায়ণগঞ্জের বহু পুরোনো কথা আউড়ে যেতেন দিনরাত।

ডক্টর চৗধুরী বলেছিলেন– মেমরি ডিসঅর্ডার। নতুন কিছুই মনে থাকবে না। পুরোনো স্মৃতিই আঁকড়ে বেঁচে থাকবেন। এসব কেসে রিকভারির চান্স কম।

অবস্থা আরও খারাপ হল কিছুদিন পর। চোখের আড়াল হলেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন। ঘরে আটকে রাখা যেত না।

অবস্থা দেখে ডক্টর চৌধুরীই বুদ্ধিটা দিলেন। সাউন্ড থেরাপি। রিকভারি হবে না কিন্তু পাগলামিটা অনেকাংশেই কমতে পারে।

অর্ক খোঁজ লাগিয়ে সুশান্তকে পেল। বিভিন্নরকম সাউন্ড মেকিং, ডিজাইনিং, ফোলি নিয়ে ওর কারবার। টুবিএইচকে ফ্ল্যাট সাউন্ডপ্রুফ করার জন্য চার দেওয়ালে লাগানো হল অ্যাকুস্টিক ফোম প্যানেল। গাড়ির হর্ন, শহরের কোলাহল, লোকের চিৎকার কোনওকিছুই আর ঢুকতে পারল না ভেতরে।

নাড়ুর বাটিটা অবনীবাবুর হাতে ধরিয়ে অনুপমা বললেন– ‘সেদিন যেই নারকেলটা পড়ল। সেটা দিয়ে বানিয়েছি।’

অবনীবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। মুচকি মুচকি হাসলেন।

ঘরের চারিদিকে সেট করা সাউন্ড সিস্টেম থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে অজস্র ব্যাঙের ডাক, ঝিঁঝির আওয়াজ। থ্রিডি সাউন্ড এফেক্টে তা যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যন্ত্রের কী অসীম ক্ষমতা! অনুপমা মনে মনে ভাবলেন।

পাঁচদিন ধরে বর্ষার সমস্ত আওয়াজ শোনানো হচ্ছে অবনীবাবুকে। এত বৃষ্টি অথচ ব্যাঙের ডাক নেই কথাটা বলে বলে মাথা খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই শরীরে হাজার কষ্ট নিয়েও অনুপমা আজ বেরোলেন।

প্রতিদিন অবনীবাবুর সাথে গ্রাম নিয়ে হাজার হাজার মিথ্যে কথা বলা অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেছে। চুন্নিও ব্যাপারটা জানে। সকাল হলেই পেনড্রাইভ পোর্টে গুঁজে দেন অনুপমা। এক একদিনের জন্য মার্ক করে রাখা এক একটা পেনড্রাইভ। সেগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনাতে হয়। গ্রামের অনেক শব্দই নিপুণ ভাবে ডিজাইন করে দিয়েছে সুশান্ত। মোরগের ডাক, বৃষ্টির শব্দ, বালতির আওয়াজ, সাইকেলের বেল… এসব শুনতে শুনতে অনুপমার নিজেরও মাঝে মাঝে মনে হয় শহর নয়, এটা সত্যিই যেন সেই প্রত্যন্ত গ্রাম নারায়ণগঞ্জ। মুখ ফসকে অনেক সময় বেরিয়েও যায়। আজকে বাসের সেই মহিলাটার কথাগুলো মনে পড়ল অনুপমার।

অনেক রাত। অদ্ভুত একটা উত্তেজনায় ঘুম ভেঙে গেল। মাথার ভেতর অসংখ্য দৃশ্য চিলের মতো পাক খাচ্ছে। অনুপমা পাশ ফিরে দেখলেন অবনীবাবু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন। হালকা ভলিউমে ঝিঁঝির ডাকে গমগম করছে ঘর। চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে কাচের জানালায়।

অনুপমা টের পেলেন অস্বস্তিটা পুরো শরীর জুড়ে হচ্ছে। জানালার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে উঠে পাশের ঘরে গেলেন। তারপর কাঁপা হাতে টেবিলের উপর রাখা বাক্সের ভেতর শেয়ালের ডাকের পেনড্রাইভটা খোঁজা শুরু করলেন।

মা ও মেয়ের দ্বন্দ্ব

সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের দায় কার? মা না যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তার মেয়েটির? এভাবে ভাবলে হয়তো পারিপার্শ্বিক সমাজ-কেও কিছুটা দায়ভার গ্রহণ করতে হবে বই-কি। মেট্রো শহরগুলিতে মেয়েদের সেফ্টি-টাও অবহেলা করার নয়। রোজই নানা ঘটনা ঘটছে।  এখন কিন্তু উঠতি বয়সি মেয়েদের নিয়ে মায়েরা অনেক বেশি সচেতন। তার কারণও আছে। সব বাড়িতেই প্রায় বয়ঃসন্ধির ছেলে-মেয়েরা একটু যেন বেশি উগ্র স্বভাবের। অদ্ভুত একটা চাপানউতোর তাদের চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশেপাশে তাকালেই বোঝা যায়, ব্যবহারে নম্রতা হারিয়ে ফেলছে আজকের নতুন এই প্রজন্ম। কাঠিন্যের বর্মে সহূদয় কোমল প্রাণ আজ শৃঙ্খলবদ্ধ।

বয়সের তুলনায় শারীরিক এবং মানসিক ভাবে একটি মেয়ে যেন খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে উঠছে এবং এর জন্য বর্তমান সামাজিক পরিবেশ কিছুটা হলেও দায়ী। তাদের ম্যাচিওরিটি লেভেল খুব তাড়াতাড়ি বাড়ছে, ফলে অভিভাবকেরা চিন্তিত হতে বাধ্য।

সাধারণত বয়ঃসন্ধির সময়টাতে একটি মেয়ের সৌন্দর্য সবচাইতে বেশি আকষর্ণীয় হয়ে ওঠে। জীবনীশক্তিতে ভরপুর মেয়েটির তখন একটাই লক্ষ্য, সঠিক সুযোগ এলেই ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার। অথচ মানসিক ভাবে তখনও কিন্তু সে প্রায় সদ্যোজাত শিশু, সবেমাত্র পা ফেলে দাঁড়াতে শিখছে। সুতরাং চলার পথে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। গন্তব্য কী সেটাও সঠিক জানা নেই। আপামর জনসাধারণের চোখে নিজের পরিচিতিকে সুষ্ঠু করতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়িয়ে বসে, যার ফলাফল মাঝেমধ্যে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। যার জন্য নিজেও দুঃখ পায় এবং মা-বাবাও পরিবারেরও অসম্মানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

যৌবনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ের মানসিকতাকে বোঝাটা খুব দরকার তার অভিভাবকদের। কারণ এই সময়টা তাদের জীবনের একটা কঠিন অধ্যায় এবং বেশিরভাগ টিনএজাররা প্রায় একই রকম মানসিকতার মধ্য দিয়ে এই পুরো সময়টা অতিবাহিত করে।

বয়ঃসন্ধির মেয়েরা নিজেদের প্রাপ্তবয়স্ক প্রমাণ করে দেখাতে সাধারণত নিজেদের শরীরকে ব্যবহার করে বসে। প্রাণপণ চেষ্টা করে বড়োদের কপি করতে এবং এর শুরুটা হয় সাজগোজ দিয়ে এমনকী ‘যৌনতা-কেও কাজে লাগাতে তারা দ্বিধা করে না। কাজটা ভালো না লাগলেও তারা ভেবে বসে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার এটাই বুঝি একমাত্র পাসপোর্ট। এই বয়সটাতে না তারা তাদের থেকে বয়সে ছোটোদের সঙ্গে মিশতে পারে কারণ ম্যাচিওরিটির তারতাম্য, আবার প্রাপ্তবয়স্করাও তাদের নিজেদের দলে ঢোকাতে নারাজ। ফলে একাকিত্ব, ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয় তারাই সব থেকে বেশি। জীবনের গাড়িকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জ্বালানি মজুত থাকলেও অভিজ্ঞতার অভাবে সঠিক দিশা তারা নিশ্চিত করতে পারে না।

এই পরিস্থিতিতে বাড়ির বড়োদের সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়া শুরু হয় মেয়েটির। অভিভাবকেরা ভালো কিছু বললেও সেটা ডিফাই করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যদি তর্ক করার কোনও কারণ না থাকে তাহলেও তারা একটা কারণ তৈরি করে নেয় নিজেরাই।

সমস্যা সমাধানের উপায়

হাত বাড়ালেই বন্ধু। ঠিক এই বন্ধুর স্থানটাই মা-কে নিতে হবে। সাহায্য এবং পরামর্শ-র জন্য সন্তান যদি অভিভাবককে পাশে না পায়, তাহলে অন্য কারও কাছে সে সাহায্যের প্রত্যাশা করতেই পারে। এই অন্য কারও বলতে, কোনও সুযোগসন্ধানী টিনএজার ছেলে অথবা প্রাপ্তবয়স্ক কোনও লোক হতে পারে যে-কিনা সুযোগ পেয়েই মেয়েটির ক্ষতি করতে পারে। অভিভাবককে নিজের ব্যবহার সংযত রাখতে হবে। মেয়ের কোন ব্যবহার সঠিক এবং কোনটি ভুল সেটা বুঝিয়ে বলতে হবে এবং নিজের ডিসিশনে ফার্ম থাকাটা একান্ত প্রয়োজন। এর জন্য পরিবারে শৃঙ্খলা রাখাটাও খুব দরকার। সাধারণত মায়ের থেকেই মেয়ে সামাজিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা লাভ করে। বয়ঃসন্ধিক্ষণে ভুল হওয়াটা অসম্ভব নয় এটা অভিভাবককে বুঝতে হবে এবং সেই ভুল-টা মেনে নেওয়ারও সৎ সাহস নিজেদের মধ্যে তৈরি করতে হবে। পরিস্থিতি এমন ভাবে সামলে নিতে হবে যাতে মেয়ের না মনে হয়, মায়ের আদর্শ লঙঘন করার জন্য তাকে কোনওভাবে শাস্তি দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়েছে।

কখনও কখনও পরিস্থিতির সঙ্গে আপস করার দরকার পড়ে বড়োদেরও। ছোটো ছোটো জিনিসে সময় ও শক্তির অপচয় করা অনুচিত। আবার কিছু জিনিসের সঙ্গে আপস করা চলে না যেমন বন্ধু নির্বাচন, যৗনতা, পার্টিতে কী ধরনের আচরণ করছে এবং মদ ও ড্রাগের প্রতি আসক্তি। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার অবস্থা হলে মেয়ের বাবাকে পরিস্থিতি সামলাবার দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ মেয়ের সবথেকে কাছের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষটি হল তার ‘বাবা’।

কিছুটা প্রাইভেসি টিনএজার মেয়েকে দিতে হবে কারণ এটা খুবই সংবেদনশীল জায়গা। মেয়ে নিজেকে বড়ো ভাবতে শুরু করলেও তার মনের মধ্যে সব সময় একটা ভয় থেকেই যায় যে, কেউ ওর উপর লক্ষ্য রেখেছে।

ভাবার চেষ্টা করতে হবে মেয়ে যেটা করছে সেটা কেন করছে। নিজেকে প্রশ্ন করুন, ‘আমি কি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সতর্ক? আমি কি যথেষ্ট সময় দিচ্ছি মেয়েকে? ডিসিপ্লিনের ক্ষেত্রে আমি কি বেশি সহজ? মেয়ের প্রতি আমার প্রত্যাশা কি অনেক বেশি? মেয়ের সঙ্গে যত বেশি সময় কাটাবেন তত বেশি ভালো করে মেয়েকে বুঝতে পারবেন।

মেয়ে যদি কোনও ভুল করেও ফেলে, তাহলে সেটাই তার পতনের সূচনা এই বোধ, এই অনিশ্চয়তা মেয়ের মনে যাতে না আসে, মা-কে তার খেয়াল রাখতে হবে। কোনটা ভুল সেটা বুঝিয়ে দেওয়াটা মায়ের দায়িত্ব যাতে মেয়ে দ্বিতীয়বার সেই ভুল না করে। প্রয়োজনে সব সময় তার পাশে থাকুন, যদি সে ভুলও করে থাকে। এমনিতেই ভুল করলে তার মনে হতে থাকে সবাই বুঝি তার বিরোধী হয়ে উঠেছে ভুল করার জন্য। এই দলে তার মা-বাবাও আছে এই বোধ যেন তার মনে না আসে এটা দেখার দায়িত্ব কিন্তু মায়ের। মেয়ের মনে যদি ঢুকে যায় একটা ভুল করে সে সকলের কাছে নীচ প্রতিপন্ন হয়েছে এবং এই অসম্মান থেকে বেরোনো আর তার পক্ষে সম্ভবপর নয়, তাহলে মনে রাখবেন এই হার শুধু আপনার মেয়ের নয় আপনাদের উভয় স্বামী-স্ত্রী-রও। এটা প্রমাণ করবে যে আপনারা এই পরিস্থিতি সামলাতে অসমর্থ।

মেয়ের প্রশংসা করুন, তাকে উৎসাহ দিন কিন্তু কিছু করার জন্য তাকে বাধ্য করবেন না। পরিবারের একজন হিসেবে তাকেও মতামত প্রকাশ করার অধিকার দিন। বাড়ির পরিবেশ এমন রাখুন যেখানে মেয়ে তার বন্ধুদের নিয়ে আসতে গর্ববোধ করবে। যদি মেয়ের কাছে তার বাড়ি মনের মতো জায়গা হয়ে ওঠে তাহলে তাকে এখানে-ওখানে সময় কাটাবার জন্য ভাবতে হবে না। মা-বাবার তার প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা, সম্মান আছে বুঝতে পারলেই, বাড়ি তার কাছে আকষর্ণীয় হয়ে উঠবে।

স্বভাবে নম্র, ভদ্র ভালো একটি সন্তান যার অভিভাবকেরাও অত্যন্ত ভালো, হঠাৎ করে সে ‘খারাপ-এ পরিণত হতে পারে না। সন্তানের সঙ্গে সুস্থ, স্বাভাবিক ভালো সম্পর্ক যদি ধরে রাখা যায় তাহলে তার সামান্য ভুল বা অশোভন আচরণ বড়োদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে না। সুতরাং প্রপার গাইডেন্স-এর মাধ্যমে ভুল পথে চলে যাওয়া টিনএজার মেয়েকে সঠিক রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে আসতে পারে তার মা বা তার অভিভাবকেরা।

স্বামীর সঙ্গে শারীরিক মিলনে আমি কোনও সুখ পাই না

আমি ২৩ বছর বয়সি যুবতি। ১ বছর আগে আমার বিয়ে হয়েছে। আমার স্বামী খুবই ভালো কিন্তু বিয়ের পর থেকেই আমি একটাই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। স্বামীর সঙ্গে শারীরিক মিলনে আমি কোনও সুখ, আনন্দ অনুভব করতে পারি না। সংসার করছি, এক ছাদের তলায় আছি, দায়িত্ব, কর্তব্য, পরিশ্রম সবই হচ্ছে কিন্তু কারও মনে কোনও আনন্দ নেই৷  অথচ সহবাসের সময় আমি পুরোপুরি ভাবে স্বামীকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। বিয়ের আগে যদিও আমার কোনও অ্যাফেয়ার ছিল না তবুও এই বিয়ে করতে একেবারেই রাজি ছিলাম না। আমার এখন কী করা উচিত?

 

বিয়েতে বা সেক্স-এর প্রতি আপনার উদাসীনতার কারণ ঠিক বুঝতে পারলাম না। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ আপনার পছন্দ হয়নি নাকি স্বামী আপনাকে ভালোবাসেন না? সেক্স-এ রুচি কমবেশি সকলেরই থাকে। সেক্স-এর প্রতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কি স্বামীর সঙ্গে সহবাস করতে বাধ্য হন?

পারস্পরিক সমঝোতার উপর সেক্স-এর কোয়ালিটি ডিপেন্ড করে৷ আপনাদের মধ্যে সেক্সুয়াল কম্পাটিবিলিটি ঠিক কতটা এটা আপনাদের নিজেদের কাছে পরিষ্কার হওয়াটা খুবই জরুরী৷ অনেক সময় দেখা যায়, মহিলাদের মেনোপজের সময় এই ধরনের চাহিদা অত্যন্ত বেড়ে যায় বা কমেও যায়৷ এটি হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে ঘটে থাকে৷কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে তো তা নয়৷

আমার মনে হয় আপনাদের কাপল কাউন্সেলিং করানো উচিত৷ জোর দেওয়া উচিত পারস্পরিক সহমর্মিতাকে ফিরিয়ে আনার উপর৷মনে রাখবেন তথাকথিত সেক্স বলতে আমরা যা বুঝি তার বাইরেও অনেকভাবেই দাম্পত্য জীবনে সেক্সুয়াল প্লেজার নেওয়া যায়৷ সঠিক কাউন্সেলিংয়ে দু’জনেই এগুলো শিখে নিজেদের জীবনের আনন্দ ফিরিয়ে আনতে পারবেন৷

জীবনকে পজিটিভ অ্যাঙ্গেলে দেখার চেষ্টা করুন। কোনওরকম সমস্যা থাকলে স্বামীর সঙ্গে বসে, কথা বলে নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। বৈবাহিক জীবনে সেক্স-এর একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে সুতরাং এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে স্বামীকেও সুখী করতে পারবেন না এবং বিয়ে ভেঙে যাওয়ারও একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে। তার চেয়ে মনে আনন্দ রাখুন। পরিবেশ রোমান্স এবং ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলুন। নিজে ভালো এবং আনন্দে থাকলে স্বামীকেও সুখী করতে অসুবিধা হবে না।

চার বছরের শারীরিক সম্পর্ক ভেঙে ছেড়ে চলে গেছে প্রেমিক

আমি ২৮ বছর বয়সি টিভি সিরিয়ালের প্রোডিউসারচার বছর আগে আমার থেকে দুই বছরের ছোটো একটি ছেলেকে ভালোবেসে ফেলি এবং শারীরিক সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়িকিন্তু সেই সময় আমার প্রেমিকের উপর অনেকরকম দায়িত্ব ছিল ফলে আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারিনিআমাকে বলেছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায়িত্বগুলো মিটিয়ে আমাকে বিয়ে করবেআমি ওর কথা বিশ্বাস করেছিলাম এবং আমরা স্বামী-স্ত্রীর মতো একসাথে লিভ ইন শুরু করি এই শহরে যেখানে আমরা কাজের সূত্রে থাকি, এখানে আমাদের দুজনেরই পরিবারের কেউ থাকে নাসুতরাং আমাদের এই সম্পর্কের কথা বাড়িতে কেউই জানত নাআমরা বন্ধুবান্ধব এমনকী সহকর্মীদেরও ব্যাপারে কিছু জানাইনি কারণ আমরা ধুমধাম করে যখন বিয়ে করব তখনই সকলকে জানাব ঠিক করেছিলাম

আমরা চার বছর এই সম্পর্ক মেনটেন করেছিলামওকে বিয়ের জন্য আমি কোনও দিনই জোর দিইনি কারণ অমি জানতাম কেরিয়ার নিয়ে খুব টেনশনে আছেযতটা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আশা করেছিল ততটা সফল হতে পারেনিএদিকে আমার পেশায় আমি এতটাই সাফল্য পেয়েছিলাম যে আর্থিক সমস্যা আমাদের একেবারেই ছিল না

এই চার বছরে আমি তিনবার প্রেগন্যান্ট হই এবং আমাকে অ্যাবর্শান করাতে হয়আমার ডাক্তার আমাকে সাবধান করেন যে আবার এই ভুল করলে আমি আর কোনও দিন আমার শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখাতে পারব না

দুসপ্তাহ আগে আমার বয়ফ্রেন্ড হঠাৎ-জানায় আমাকে ছেড়ে, এই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাচ্ছে বাড়িতে, কারণ ওর বাবা তাঁর কোনও বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক করেছেওর পক্ষে মা-বাবার অবাধ্য হওয়া নাকি সম্ভব নয়আমি ওর কথায় এতটাই অবাক এবং শক্ড হয়েছি যে জিনিসপত্র গুছিয়ে চলে যাওয়ার সময় আমি একটা শব্দও মুখ থেকে বার করতে পারিনিবাড়ির ভাড়া, পেনডিং সমস্ত বিল আমার ঘাড়ে চাপিয়ে পালিয়ে গেছে

সেইদিন আমার বাবাও হঠাৎই আমার ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হন এবং সত্যিটা জেনে ফেলেনআমিও দু-তিনজন ভালো বন্ধুর কাছে ভেঙে পড়ি এবং চার বছরে কী কী ঘটেছে সব খুলে বলিওরা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেছে যে এতদিন ধরে এই ব্যাপারাটা কীভাবে আমি কারও কাছে প্রকাশ হতে দিইনিওরা পরামর্শ দিচ্ছে যে কোর্টে গিয়ে ছেলেটির বিরুদ্ধে কেস ফাইল করতে তাহলে ছেলেটি বাধ্য হবে আমাকে বিয়ে করতেআমার কি এটাই করা উচিত?

আপনি অবশ্যই আদালতের সাহায্য নিতে পারেন। একজন ভালো আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করুন যিনি আগেও এই ধরনের কেস হ্যান্ডল করেছেন। উনিই আপনাকে বলে দেবেন কেস করার ভালো এবং খারাপ দিকগুলো।

লিগাল দিক ছাড়াও আরও কয়েকটা বিষয়ে আপনার ভাবা উচিত যে আইনের সাহায্য নিলে কতটা এফেক্ট আপনার উপর পড়তে পারে। আপনার বাবা পুরো ব্যাপারটা জেনে ফেলেছেন এবং সম্ভবত আপনার মা-কেও জানিয়ে থাকবেন। আপনার পুরো পরিবারে ব্যাপারটা রাষ্ট্র হয়ে গেলে আপনার সম্মান তো ক্ষুণ্ণ হবেই এরপর কেসটা আদালত অবধি পৌঁছোলে আপনার দিকে আঙুল উঠতে দেরি লাগবে না।

কেস আদালতে পৌঁছোলে আপনার ‘এক্স’-এর প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটাও ভাবার বিষয়। এমনিতে আপনাকে ছেড়ে যেতে ছেলেটি এক মুহূর্তও ভাবেনি। কিন্তু কেস শুরু হলে ওর ফ্যামিলি এবং বন্ধুদের সামনে ওর মুখোশ খসে পড়বে এবং বিয়ের সম্বন্ধটাও ভেঙে যাওয়ারও চান্স রয়েছে। এতে ছেলেটি রেগে গিয়ে আপনার আরও ক্ষতি করার চেষ্টা করবে এমনকী আপনার কর্মক্ষেত্রের সুনাম কলঙ্কিত করতেও পিছু হটবে না। আপনার সব কথার বিরোধিতা করবে, কোর্টে দাঁড়িয়ে আপনার বলা সত্যগুলো, মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করবে। আপনাকে চরিত্রহীন প্রমাণ করে দিতে পারে। সম্পূর্ণ অস্বীকার করতে পারে যে ও আপনার কাছে কোনও প্রমিস করেছিল বলে অথবা এমনও বলতে পারে যে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার আগেই ও আপনাকে সাবধান করে দিয়েছিল যে এইটা একটা ক্যাজুয়াল রিলেশনশিপ। এই ক্ষেত্রে কোর্ট এবং ফ্যামিলির সামনে আপনাকে হিউমিলিয়েট্ হতে হবে। ফেলে আসা চারটে বছর আপনি কিছুতেই ফিরে পেতে পারবেন না। ম্যাক্সিমাম কোর্ট ছেলেটিকে আদেশ দিতে পারে, কমপেনসেশন হিসেবে কিছু টাকা আপনাকে দিয়ে দিতে। সত্যি করে কি এইরকম একটা মেরুদণ্ডহীন ছেলেকে আপনি বিয়ে করতে আগ্রহী? বিয়ে হলেও সারজীবন আপনি ওকে কীভাবে বিশ্বাস করবেন! অপরদিকে কেস করলে প্রতারক ছেলেটিকে একটা শিক্ষা দেওয়া হবে, এটাই একমাত্র আপনার সান্ত্বনা।

সুতরাং কোনও কিছু করার আগে সব দিকগুলো ভালো করে ভেবে দেখবেন এবং তারপরই ডিসিশন নেবেন।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব