ভারতীয় আহারে স্বাদ আর সুগন্ধের অপূর্ব মিশেল রয়েছে। পঞ্জাবি, রাজস্থানি, মোগলাই বা দক্ষিণ ভারতীয়– যে-কোনও খাবারই হোক না কেন, নাম শুনলেই জিভে জল আসে।

শুধু ভারতবর্ষেই নয়, বিদেশেও ভারতীয় রান্নার যথেষ্ট সুনাম আছে। ভারতে আগত বিদেশি পর্যটকদের যদি ভারত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, তো তারা নিজেরাই ভারতীয় আহার-পানীয়র প্রশংসা করে। ঠিক এই কারণেই বিদেশের সব বড়ো বড়ো শহরেই ভারতীয় খাবারের দোকান খোলা হয়েছে।

উত্তর ভারতের কারি এবং তন্দুর

মশলাযুক্ত গ্রেভি বা ঝোল, যাকে আমরা সাধারণভাবে বলি কারি, এর একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে, যা প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ‘কারি’ শব্দটির উৎপত্তি তামিল ‘কৈকারি’ থেকে। যার অর্থ হল নানা মশলা দিয়ে বানানো সবজি। ব্রিটিশ শাসনকালে কৈকারি, ইংরেজদের এত পছন্দ ছিল যে তারা একে কাটছাঁট করে নাম দিল ‘কারি’। আজ ইউরোপের দেশগুলিতে ‘কারি’ ভারতীয় রান্নারই এক অঙ্গ।

উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলির খাওয়াদাওয়ার কথা বললে পঞ্জাবি, রাজস্থানি, মোগলাই, আওধি স্টাইলে কারি রান্নার কথা বোঝায়। পঞ্জাবি রান্নায় তন্দুরের সাহায্যে বানানো মাংস এবং নান ছাড়াও, ছোলাবাটুরা, মকাইয়ের রুটি, সরষে শাক, ইত্যাদিও বিপুলভাবে জনপ্রিয়।

রাজস্থানি রান্নায় আছে ডালবাটি চুরমা, মুগডালের হালুয়া, গাট্টি এবং পাঁপড়ের সবজি, রাজস্থানি মিষ্টি ইত্যাদি। কাশ্মীরি রান্নার কোনও জবাব নেই। হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছে কাশ্মীরে। এখানকার নিরামিষ এবং আমিষ উভয় রান্নাই সুস্বাদু। রোগনজোশ, কাবাব, কোফতা, রিনতাবা, শোরবা, গোসতাওয়া, আলুর দম, কালিয়া, রাজমা ইত্যাদি।

হিন্দুস্থানি রান্নার বিকাশ সবচেয়ে বেশি হয়েছে আওধে। আওধের কাবাব, দম বিরিয়ানি, হালিম, নহারি, রুমালি রুটি, কাকোরি কাবাব, শামি কাবাব এবং খাওয়া শেষে পৃথিবী বিখ্যাত লখনউয়ের পানের কোনও জুড়ি নেই।

পূর্ব ভারতের রান্না

ভারতের পূর্বভাগের রাজ্যগুলি হল ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, বিহার, বাংলা। ঝাড়খণ্ডে চিড়া, লিটটি, চোখা, ঠেকুয়া, বেসনের সবজি খুবই জনপ্রিয়। বিহারেও এসব রান্নার চল আছে। পূর্ব ভারতে চালের (ভাত খাওয়ার) প্রচলন সবচেয়ে বেশি। বাঙালি রান্নায় মাছ-ভাত, মাছের ঝোল ছাড়াও বেগুনপোস্ত, আলুপোস্ত, ঝিঙেপোস্ত, এঁচোর, মোচা, ধোকার ডালনা, লাউঘণ্ট, ফুলকপির তরকারি, বাঁধাকপির তরকারি অত্যন্ত জনপ্রিয় রান্না। বাঙালি রান্নায় নানাপ্রকার মাছের ঝোলই অধিক জনপ্রিয়। এছাড়া চমচম, রসগোল্লা, পান্তুয়া, সন্দেশ, পিঠা, লবঙ্গলতিকা– বাঙালি মিষ্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। মিষ্টি বানানোতেও বাঙালিদের খ্যাতি আছে।

ওড়িশার রান্নায় রয়েছে দালমা, সন্তুলা, দই-বেগুন, ছানার তরকারি, কোলাথাদালি, মাছবেসরা, রামরোচক তরকারি, মেথিভাত, ডাল পসন্দ।

ছত্তিশগড়ে আছে তসমই, খুরমি, পপচি, দেহরোয়ি, ফরা, চৌসেলা, টেটরি, সোহাড়ি, বড়া এবং চিলা।

নোনতা মিষ্টির মেলবন্ধন

পশ্চিম ভারতে মারাঠি, গুজরাতি কোঙ্কনি এবং পারসি রান্নার নিজস্ব স্বতন্ত্র ধারা আছে। গুজরাতি রান্নার মধ্যে খমণ, ধোকলা, থেপলা, শ্রীখন্ড, খান্ডবি, বাটাটা ভাজি সকলের প্রিয়। মিষ্টির মধ্যে বাংসুদি, ঘেবর, চোলাফালি ইত্যাদি।

মারাঠি রান্নার মধ্যে আমটি, পোহা, মুম্বই চিড়া, কোলাপুরি রাসসা, পুনেরিডাল, পাভতা বাটাটা এবং মুম্বই-এর ভেলপুরি, পানিপুরি, সারা ভারতে প্রসিদ্ধ।

কোঙ্কনী রান্নায় বিম্বিকা, কাঁকড়াকারি, ফিশ কেক, মছলি গাথি, ফিশমোইলি, গোয়ান ফিশকারি, ম্যাকারেল মশালা, তন্দলি ভাজি, মুংগা দালিটোই, মুংগা সারু এবং সুগামত ফ্রাই আছে।ভারতে পশ্চিমি প্রদেশের সিন্ধি আর পারসি রান্না সুপ্রসিদ্ধ।

দক্ষিণ ভারতের জাদুভরা স্বাদ

দক্ষিণ ভারতে আমিষ এবং নিরামিষ দুরকমের খাবারই অনায়াসে পাওয়া যায়। আমিষ রান্নায় যেমন মশলার প্রয়োগ হয়, নিরামিষ সবজি রান্নায় তেমনই অল্প মশলা প্রয়োগ করা হয়।

কেরল, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ দক্ষিণ ভারতের অন্তর্গত। হায়দরাবাদে মোগলাই কাবাব, হালিম, নহারি, মালা-কাবাব, কিমা পোলাও, গোশত্, দিওয়ানি হান্ডি, হায়দরাবাদি কোর্মা, নবাবি বিরিয়ানি, হায়দরাবাদি মুরগি, গজালা, টেংরি কাবাব, হায়দরাবাদি রান্নার অন্তর্ভুক্ত।

দক্ষিণ ভারতীয় খাবারে নারকেল ব্যবহার করা হয়। এমনকী নারকেল দিয়ে চাটনিও বানানো হয়। স্বর, ইডলি, দোসা, বড়া, উপমা, উত্তপম ইত্যাদি হল দক্ষিণ ভারতীয় রান্না। এখানে লোকে ভাতই বেশি খায়।

উত্তরপূর্ব ভারতের রান্না

ভারতের এই অংশে জনসাধারণ আমিষাশী হয়। এইসব অঞ্চলে চালের ব্যবহার অত্যন্ত বেশি। অসম আর মণিপুরের খাবারের সঙ্গে উত্তর ভারতের রান্নার কিছু মিল আছে। এখানে ভাতের সঙ্গে মাছ, মাংস এবং সবজি খাওয়া হয়। ত্রিপুরায় সবজি সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। এখানে শুধুমাত্র মাংস রান্নায় মশলা ব্যবহার করা হয়।

অরুণাচলের জনজাতি খাবারে মশলা ব্যবহার করে না। মাংস শুকনো করে খায়। সিকিম এবং তিব্বতের স্পেশালিটির অন্তর্গত হল চিকেন মোমো, থুকপা, পর্ক মোমো, পনির মোমো ইত্যাদি। সিকিমবাসীদের প্রিয় পানীয় হল ছাং।

Tags:
COMMENT