বাগড়ু প্রিন্ট আপনাদের অনেকেরই খুব চেনা। বিশেষ করে যাঁরা প্রাদেশিক শাড়ি পড়তে ভালোবাসেন। জয়পুর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। রাজস্থানের গন্ধমাখা গ্রামটায় গেলেই চোখে পড়ে ইতস্তত মাটির বাড়ি, উটে টানা গাড়ি, আর কারিগরদের পসরা সাজানো। এ এক শৈল্পিক গ্রাম যেখানে মানুষের জীবিকার আধার বাগড়ু প্রিন্টিং করা।

রাস্তার উপরেই এক তোরন যা দিয়ে ঢুকলেই বাগড়ু শ্রমিকদের ঘর সংসার চোখে পড়ে। বাড়ির উঠোনে, ছাদে, সর্বত্র মেলে দেওয়া আছে সার সার কাপড়। এখানে ওখানে রঙের চৌবাচ্চা।কেউ তৈরি করছেন কাদামাটির মিশ্রণ, কেউ বা ভেষজ রঙ। এই রঙ বানানোকেই বলা হয় ডাবু করা। প্রত্যেকটি পরিবারের বিশেষ কিছু ফর্মুলা থাকে নিজেদের রঙটির স্থায়িত্ব এবং সৌন্দর্য দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য।

চারশো বছরের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে এই গ্রামের মানুষরা বেঁচে থাকার লড়াই করছে, এই শিল্পকে জীবিকা করে। এখানে কৃষ্ণমৃত্তিকা থেকে নিংড়ে বের করা হয়েছে রঙ। যে রঙ রঙীন হয়ে, আমাদের অঙ্গে তুলে দেয় একটি জায়গার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, পরম্পরাকে টিকিয়ে রাখার অদম্য প্রয়াস। এখানে সঞ্জারিয়া নদীর আর তার রৌদ্রময় বেলাভূমি একসময় ছিপা সম্প্রদায়কে আকৃষ্ট করেছিল এখানে বসত গড়তে।পাশাপাশি ছিল রাজানুগ্রাহিতা। এখন জলের সংকট, নদী আর আগের মতো ভরা নেই, শুকিয়ে যাচ্ছে, আর তাই বেঁচে থাকার সংগ্রামও আরো কঠিন হচ্ছে।তাই এই শিল্প ফ্যাশনে উঠে আসা মানে,কিছু মানুষের বেঁচে থাকাও।১৯৭০ সালের হিপি আন্দোলন প্রায় টিমটিম করে চলতে থাকা ব্লক প্রিন্টিং এর এই গ্রামে একটি নতুন তরঙ্গ নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত হয় বাগড়ু ব্লক প্রিন্টিং। দেখতে সহজ সরল প্রিন্টিং এর মূল সুরকে বজায় রাখে তার ভেষজ সত্তা।

Bagdu Saree in Fashion

বাগড়ু প্রিন্ট এই অঞ্চলেরই বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। এর উৎস, ইতিহাস আর টেকনিক সবই খুব ইন্টারেস্টিং। প্রকৃতি নির্ভর শৈলির উপাদানও প্রাকৃতিক। বেদানার খোসা, কাঁচাহলুদ, ইন্ডিগো, চুনজল এবং লতাগুল্মের শিকড় থেকে তৈরি রং বা ন্যাচরাল ডাই ব্যবহার করা হয় এই শাড়িতে। নদীর কাদামাটি, সোডা ও লাইমের জলে চুবিয়ে কাপড়গুলোকে প্রথমে বিশেষ মেটে রঙের আবহ দেওয়া হয়। তারপর কাঠের তৈরি ব্লক দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় বছরের বছরের পর বছর চলতে আসা ফুল, পাতা নক্সার বাহার। প্রিন্টিং শেষে সমস্ত কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে দেয়া হয় কাঠের গুঁড়ো, নাহলে রঙগুলো ধেবড়ে যাবার সম্ভবনা থাকে। তাই প্রয়োজন সূর্যের প্রখর তাপ। রঙ তৈরির আরও একটি প্রধান উপকরণ হরিতকী। হরিতকীর সঙ্গে আঠা এবং এখানকার বিশেষ কৃষ্ণমৃত্তিকা, পচা আটা, লাইমস্টোন, গোবর মিশিয়ে রেখে দেওয়া হয়। সেটা থেকেই তৈরি হয় ফ্যাব্রিক। ঘন নীলের দীপ্তিহীন আভিজাত্য।

নজরকাড়া বাগড়ু ডিজাইন এখন উঠে এসেছে বিশ্বের ফ্যাশন মানচিত্রে। ট্র্যাডিশনাল নক্সা থেকে বেরিয়ে এখন অবশ্য ফিউশনের সমারোহ। জেগে উঠছে তার মধ্যে অন্য অলঙ্করণ। এই শাড়ি হয়ে উঠছে আরও বেশি আন্তর্জাতিক।।বাগড়ু গ্রামের ছিপা মহল্লা থেকে দেশেবিদেশে পৌঁছোচ্ছে শাড়ি, ড্রেস মেটিরিয়াল, বেড কভার বা থান। ইকো ফ্রেন্ডলি মেটিরিযাল আর সফট আরামদায়ক ফ্যাব্রিক–এই দুইয়ের কারণেই বাগড়ু প্রিন্টের শাড়ি বা কুর্তি, হয়ে উঠেছে সবার পছন্দের পরিধান।

Tags:
COMMENT